প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এ সংক্ষিপ্ত তালিকায় ‘কুরছিয়ানা’
লেখক পরিচিতি || রোমেল রহমান
গল্পকার ও লেখক। জন্ম ১১ নভেম্বর ১৯৮৯ সালে, খুলনায়। পড়াশোনা হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত গ্রন্থ—কবিতা: বিনিদ্র ক্যারাভান, আরোগ্যবিতান, বর্ষামঙ্গল; গল্প/গদ্য: মহামারী দিনের প্যারাবল, প্রোপাগান্ডা, বাঘ, দাস্তান; নাটক: চম্পাকলি লেন ও অন্যান্য নাটক। নিয়মিত লেখেন বাংলাভাষার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং ওয়েবজিনে। গল্পে পেয়েছেন পেন ‘বাংলাদেশ সাহিত্য পুরস্কার ২০২০’। তিনি বসবাস করেন খুলনায়।
কুরছিয়ানা || গল্পের সারাংশ
বিত্তবান ও নিঃসন্তান দম্পতি আবুল কাশেম ও জোনাকীর জটিল, বহুস্তরীয় জীবন-জালে হঠাৎ আবির্ভাব হয় দারিদ্র্যে ক্লিষ্ট শেফালীর। আর তারই সূত্র ধরে বদলে যায় গল্পের পুরো দৃশ্যপট। আবুল কাশেমের বংশধারার নিষ্ঠুর ইতিহাস পাঠককে কৃষ্ণগহ্বরের মতো টেনে নেয় এক গভীর আকর্ষণে। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে আয়নাল, জয়নাল, মিছরি বেগম, চিনি, মধু—এই সব চরিত্রের জীবন-আখ্যান। ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সময়ের অমোঘ সংঘর্ষের এক মহাকাব্যিক আলেখ্যই হলো এই ‘কুরছিয়ানা’।
‘কুরছিয়ানা’ গল্পের চুম্বক অংশ
পরের দিন শহরের বাড়িতে শেফালীকে তুলে দিয়ে আসার সময়, আবুল কাসেম বলে; একটা কথা জিজ্ঞাস করি? শেফালী বলে, বলেন! যেই লোকটা তোমার বাড়িতে আসতো সে কে? শেফালী বলে, আমার স্বামী! আবুল কাসেম বলে, এইটা কি তার? শেফালী বলে, জি! আবুল কাসেম বলে, বাচ্চা বিক্রি করে দিচ্ছ কষ্ট হবো না? শেফালী বলে, নাহ! আগে হইলে হইত! আবুল কাসেম ভ্রু কুঁচকে বলে, মানে? শেফালী বলে, প্রথম বাচ্চা ফেইলা দেওন লাগছে। কাজ নাই নিজেরাই খাইতে পারি না। বাচ্চা পালবো কেমনে? আবুল কাসেম বলে, মানে? শেফালী বলে, মানে ব্যাঙ ভাজা! যান বিদায়। আবুল কাসেম বলে, বাচ্চা ফেইলা দিলা? শেফালী বলে, এই বাচ্চাটা তাও তো বাইচা থাকবে। সে যে দুনিয়ায় আছে এইটা তো জানবো। আর মা হওয়ার একটা তৃপ্তি তো পাবো। আবুল কাসেম বলে, কিন্তু কাছে তো পাবা না, কষ্ট হবে না? শেফালী বলে, খালি প্যাচান ক্যা? বললাম তো, এই বাচ্চার জন্য আমি আর আমার স্বামী বাইচা যাবো। সেও বাইচা থাকবে। এই তো আনন্দ। খিদার কষ্ট বড় কষ্ট। আবুল কাসেম বলে, মানে। শেফালী বলে, আপনার উত্তরের খাল আমি বিক্রি কইরা নগদ টেকা কইরা নিয়া ফিরা যাবো। চাইলে আপনার বিল আপনি আমার থিকা কিনা নিতে পারেন। আবুল কাসেম হেসে ফেলে। শেফালী মুখ শক্ত করে বলে, সাহস নাই বুঝলেন... সাহস থাকলে বাঁইচা থাকাটা নিভায় দিতাম, তখন দেখতাম খিদা কার সঙ্গে পাল্লা দেয়। কিন্তু আবার ভাবি, মইরা লাভ কি একটু বাঁইচা দেখি। লোভ জাগে বাঁইচা থাকার। মজা নেয়ার। মরাটা তো এক নিমিষের খেলা কিন্তু বাঁচার মধ্যে আসল কারিকুরি! আবুল কাসেমের ভালো লাগে শেষ কথা গুলো তিনি বেরিয়ে যান। কিন্তু গ্রামের লোকেরা বলে, কেচ্ছার মইধ্যে থাকে আরেক কেচ্ছা... চোখের সামনে ভুল নজরে পড়ে না। সময় হয়ে গেলে, যেদিন শেফালীর ব্যাথা ওঠে। সেদিন সবাই শহরের ক্লিনিকে যায়। শেফালীর স্বামী আসে। চুক্তির পরে আর রাখঢাক করে লাভ নাই। আবুল কাসেম তার স্ত্রী আর আকরাম মাস্টার বসে আছে বাইরে। কখন বাচ্চার কান্না শোনা যায়। এবং একসময় কান্না শোনা যায়, সবাই যখন বাচ্চা দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তখন দেখা যায় পাশাপাশি দুইটা বাচ্চা। আকরাম মাস্টার হেসে ফেলে বলে, কাসেম লাভটা তোমারই হইলো। কিন্তু শেফালীর স্বামীর মুখে শঙ্কা। শেফালীর জ্ঞান ফেরার পরে আবুল কাসেম বলে, শেফালী লাভ তো আমার হইলো। চুক্তিতে কিন্তু বাচ্চার সংখ্যা লেখা ছিল না। শেফালী ম্লান বলে, জি! আবুল কাসেম ধীর কণ্ঠে বলে, তোমারে একটা বাচ্চা দিয়া দিবো কেমন? তবে শর্ত তার বিনিময়ে তুমি উত্তরের বিল আমারে ফেরত দিবা। শেফালীর মুখে সকল রক্ত যেন চুপসে যায়। আবুল কাসেম শেফালীর স্বামীকে বলে, কেমন মরদ আপ্নে? পারবেন না এই বাচ্চা বাঁচাইতে? লোকটা চুপ করে থাকে। ডাক্তার এসে তাদেরকে বলে, আসুন একটু, ডাক্তার জানায় বাচ্চা দুটোর মধ্যে একটা বাচ্চার সামান্য সমস্যা আছে। দুটোই কন্যা সন্তান কিন্তু একটা মেয়ের একটা পা অন্য পায়ের চেয়ে ছোট! আবুল কাসেম এই কথা শোনা মাত্রই কেঁপে ওঠেন।
বিচারকের মন্তব্য
‘কুরছিয়ানা’ মানুষের সহজাত প্রকৃতি চাতুর্যতা-নির্বুদ্ধিতা, ক্রুরতা-উদারতা, জিঘাংসা-আত্মত্যাগ এবং মৃত্যুর ওপর জীবনের জয়গানকে প্রতিকৃত করেছে। ছোটগল্পে একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের বিচিত্র ধরনের চরিত্রের মাধ্যমে বিবিধ চমকপ্রদ কাহিনীর সমাবেশ গল্পটি মহাকাব্যিক আমেজ সৃষ্টি করেছে। সামষ্টিক স্বরে লৌকিক বাংলা গদ্যে বলা গল্পটি হয়ে উঠেছে সাবলীল ও স্মরণীয়।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন