রজনীর এক রাত
তখন ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। চোখে আধো ঘুম আধো জাগরণ। কার্তিকের ঠান্ডা বাতাস বইছে। সকালের শুরুতেই কেমন শীত শীত অনুভূতি। যখনই কাঁথাটাকে ভালোভাবে গায়ে জড়িয়ে ভাবছিলাম আরও কিছুটা সময় ঘুমাব, ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে বারকয়েক কাশির শব্দ শুনে হুড়মুড় করে উঠে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি—বেলা বেশ গড়িয়েছে। আকরাম সাহেবের ওষুধ খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। বয়স তার সত্তরে ছুঁই ছুঁই। শরীরে বিভিন্ন রোগ বাসা বেঁধেছে। দেহে যে ক’টা দিন প্রাণ আছে সুস্থ থাকার জন্য নিয়মমতো ওষুধ-পথ্য খান। তাকে এই রজনী ছাড়া অর্থাৎ আমি ছাড়া আর কেউ দেখার নেই। বেশ কয়েকবছর ধরে তার দেখাশোনার কাজটা আমিই করছি। সেজন্য মাস শেষে বেতনও দেয়, তার ওপর থাকা, খাওয়াটাও তাদের খরচেই চলে।
বিছানা ছেড়ে উঠে চোখে-মুখে এলোপাথাড়ি পানি দিয়ে ফ্র্রেশ হয়ে আকরাম সাহেবের ঘরে ঢুকলাম। দেখি তিনি হাতের ওপর ভর দিয়ে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বিছানায় বসে আছেন। মুখ হা করে নিঃশ্বাস নেয়ার চেষ্টা করছেন। পরনে সাদা আর ধূসর রঙের চেক লুঙ্গি, গায়ে সাদা হাফ হাতা গেঞ্জি। এক পলক দেখেই মনে হলো, তার দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। এখনি বোধ হয় চোখগুলো কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে। কাছে গিয়ে বললাম, ‘আপনেরে কি পানি দিব?’
উপর নিচ মাথা নেড়ে ভাঙা ভাঙা গলায় বললেন, ‘দাও।’
আমি আকরাম সাহেবকে পানি দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলাম। ফ্রিজ থেকে আগের দিন বিকেলে বানানো রুটি বের করে তাওয়ায় ছেঁকে প্লেটে সাজিয়ে তাকে নাস্তা দেই। খাবার শেষে ওষুধ খাইয়ে জানতে চাইলাম, ‘এখন কেমন লাগছে?’
‘আগের চাইতে ভালো।’ বসা থেকে বালিশের উপর মাথা রাখতে রাখতে বললেন আকরাম সাহেব।
আচ্ছা, বলে রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। এ-সময়টা তিনি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবেন। হয়তো টিভি ছেড়ে হাদিস শুনবেন নয়তো কোরআন তেলওয়াত। আপাতত এ-বেলার কাজ শেষ। বেশ কিছুটা সময় এবার নিশ্চিন্তে কাটাতে পারবো।
নিজের ঘরে ঢুকে বিছানার মাথার দিকের জানালাটা খুলে দিলাম। সকালের মৃদুমন্দ বাতাসে নীল রঙের পর্দাটা দুলে উঠল। বাইরে বাতাসের দোলায় গাছের পাতারা তির তির করে দুলছে। আমি বিছানায় রাখা বালিশটা খাটের সাথে হেলান দিয়ে আধশোয়া হলাম। সকালের কাজের চাপে শরীরটা বেশ ক্লান্ত লাগছে। মনটাও বিষণ্ন। ইদানীং সবকিছু কেমন শূন্য মনে হয়, তুচ্ছ লাগে। অবশ্য শূন্যতা ছাড়া আমার আর আছেই বা কি? খুব চেয়েও তো কিছুই আঁকড়ে ধরে রাখতে পারিনি। এমনকি রেশমাকেও নয়। কিন্তু একটি মুহূর্তের জন্যও রেশমাকে আমার প্রতিদিনের যাপিত জীবন থেকে দুরে সরাতে পারিনি। তবুও নিজেকেই নিজে সান্ত্বনা দেই, বলি—ভালো আছি, বেশ আছি। এই ভেবে বলি—যাতে মনের চারপাশে যে বিষণ্নতা ঘিরে রয়েছে তা যেন অন্তত এ-বেলা আমায় ছেড়ে দূরে কোথাও হারায়। কিছুক্ষণ চোখ দুটো বুঁজে থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু আমায় ঘিরে থাকা বিষণ্নতারা কোথাও হারায় না। আরও যেন ঝেঁকে বসে আমারি অন্তর্জগতে। তখন ক্লান্ত চোখ দুটি মেলে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে দেখি মাথার উপর ঝুলন্ত ফ্যানটি ঘুরছে। ভাবি—এখন চাইলেই অথবা সুইচ অন করলেই ফ্যানের মাতাল হাওয়া ছোট্ট এই ঘরটা জুড়ে দাপাদাপি করে বেড়াবে। অথচ সেই ছোটবেলায় যখন ঢাকা শহরের ছোট্ট একটা ঘরে আমার বাবা-মা তাদের তিন মেয়ে নিয়ে থাকতো তখন বাবার খাট বা চৌকি কিছুই কেনার টাকা ছিল না। মাটির উপরেই একটা চাটি আর চাটির উপরেই দুই তিনটা কাঁথা বিছিয়ে আমরা থাকতাম। এই ঢালাও বিছানায় শুধু দুইটা মশারি আলাদা। একটা মশারির ভিতরে বাবা-মা, অন্যটির ভিতরে আমরা তিন বোন। কিছুটা আড়াল বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলতে ছিল এইটুকুই।
গ্রীষ্মের গরমে অসহ্য কষ্ট হতো আমাদের। টিনের চাল। সারাদিন সূর্যের তাপে গরম হয়ে থাকতো আর রাতে সেই তাপটা যেন অসহনীয় লাগতো। গরমে কিছুটা প্রশান্তির জন্য বাসায় কোনও ফ্যান ছিল না। একমাত্র তালপাতার হাতপাখাই ছিল ভরসা। সেই হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে হাতে ফোসকা পড়ার উপক্রম হতো। ছোট বোনটা প্রায়ই বলতো—‘গরমে অনেক কষ্ট হয়, একটা ফ্যান কিনেন না আব্বা...’
তিনবেলা খাবার জোগাতেই হিমশিম খেতে হয় বাবার, সেই অবস্থায় ফ্যান কিনবেন কোথা থেকে। এখন এটা বুঝলেও তখন সেই অল্প বয়সে এই ব্যাপারটা বোঝার ক্ষমতা ছিল না আমাদের কোনও বোনেরই। উত্তরে বাবা শুধু হাসিমুখে বলতেন, ‘কিনবোরে মা কিনবো।’
‘কবে কিনবেন?’ ছোট্ট বোন শাহানা পাল্টা জিজ্ঞেস করলে বাবা বলতেন, ‘কয়টা দিন বাদেই কিনমু। হাতে কিছু পয়সা জমুক!’
বাবার হয়তো আমাদের মিথ্যা আশ্বাস দিতে ভালো লাগতো না কিন্তু এছাড়া আর কিইবা করার ছিল তার!
সারাদিন বাবার পাশাপাশি মাও খেটে মরেন, সংসারটা যেন একটু ভালোভাবে চলে, সেই আশায়। মা ব্লাউজ, পেটিকোট সেলাই করে যে টাকা পেতেন তা দিয়ে হয়তো বস্তির ভাড়াটা দিতেন কিংবা বাজারে মুদি দোকানের বাকি পড়ে গেলে তার কিছুটা পরিশোধ করতেন। আর সংসারের অন্য সব খরচ বাবার টং দোকানের আয়ের টাকায় কোনওভাবে চলে যেতো। টানাটানির সংসার কোনও কিছুরই ঠিকঠাক প্রয়োজন মিটতো না। সেইসব দিনগুলো মনে পড়লেই সবকিছু কেমন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যেন আজও জীবন্ত, বিষাদে ভরা আর করুণ।
ভেবে অবাক লাগে-জীবন কত অদ্ভুত! কতভাবেই না তাকে যাপন করতে হয়। কত কিছুই না লুকিয়ে থাকে প্রতিটি জীবনের ভাঁজে ভাঁজে। সে জীবনকে উপলব্ধি না করে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনও উপায় নেই।
সারাদিন টং দোকানে গরমের মধ্যে পুড়ে মরতে মরতে বাবার শরীরটা একেবারে ভেঙে পড়ল। অবসাদে, ক্লান্তিতে হাত-পা ভেঙে আসতে চায় তার। গলা শুকিয়ে যায়। বুকেও থেমে থেমে ব্যথা হয়। তাই দুই দিন ধরে দোকান খোলেনি বাবা। শরীর ভালো না থাকলে কাজ করবেন কেমন করে! গরিব মানুষের শরীরটাই তো সব।
এর কিছুদিন পরে হঠাৎ করেই বাবার খুব জ্বর হলো। সারা শরীর জ্বরের তাপে পুড়ে যাচ্ছিল। বাবা কিছু খেতে পারেন না। শোয়া থেকে উঠতে পারেন না। সপ্তাহখানিক অসুস্থ থাকার পর এক সকালে সংসারের কাজ করতে করতে মা বাবাকে ডেকে বললেন, ‘কি ব্যাপার, উঠতাছেন না ক্যান? কত বেলা হইয়া গেল!’
বাবা মায়ের কথার কোনও উত্তর দেন না।
মা আবার বাবাকে বলেন, ‘কি অইলো, কথা কন না ক্যান? আইজ কি আপনার শরীরটা বেশি খারাপ?’ বাবা এবারও কিছু বলেন না। কাছে গিয়ে মা আরও কয়েকবার বাবাকে ডাকলেন, ‘রজনীর বাপ ও রজনীর বাপ!’কোনও উত্তর না পেয়ে অজানা আশংকায় মায়ের চোখে মুখে আঁধার ঘনিভ‚ত হলো! তিনি এগিয়ে গিয়ে বাবার নাকের কাছে হাত নিলেন, বুকে কান পেতে নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শব্দগুলো নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
বাবা মারা যাওয়ার পর আমার আর পড়াশুনা হলো না। ক্লাস এইট পর্যন্তই পড়েছিলাম। সংসারে অভাব তখন ঝাঁক বেঁধে এলো। তিন মেয়ে নিয়ে মা কীভাবে সংসার চালাবেন, কীভাবে আমাদের মানুষ করবেন এই নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়লেন। মা বাইরে কাজ করতে গেলে আমরা ঘরে একা থাকি। আমাদের একা রেখে বাইরে যেতে খুব ভয় পেতেন মা! তার ভয়টা অন্য বোনদের তুলনায় আমাকে ঘিরেই বেশি ছিল। ভাবতেন, মেয়েটা বড় হয়েছে, একলা ঘরে থাকে, যদি ওর কোনও সর্বনাশ হয়ে যায়! কার মনে কী আছে তা তো বলা যায় না। এসব দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে মা তাড়াতাড়ি আমার বিয়েটা দিয়ে দিলেন। কিন্তু দিনমজুরের গরিব মেয়েকে কি কেউ ভালোবাসতে পারে? আর ভালোবাসলেই তো তা চিরদিনের হবে এমন নয়! চিরদিন ভালেবাসা টিকে থাকে কেবল গল্প, উপন্যাসে কিংবা সিনেমায়।
বিছানায় বসে পুরনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে শুনি দরজায় সুর তুলে বেল বাজছে। এই অসময়ে আাবার কে এলো? আলসেমি কাটিয়ে উঠে দরজা খুলে দেখি হকার এসেছে। আমি কিছু বলার আগেই সে বলল, ‘এ মাসের পত্রিকার বিলটার জন্য আসছি।’
ও। দাঁড়ান। বলে ঘর থেকে টাকাটা নিয়ে হকারকে বিদায় করি। সে যাওয়ার পর দরজা লাগিয়ে দিয়ে শোবার রুমে ঢুকে জানালার বাইরে চোখ পড়তেই দেখি, মেঘ পূর্ববর্তী বাতাসে ঘরের পর্দটা এলোমেলো দুলছে। বাইরের ঘন গাছপালাগুলোয় যেন আনন্দের জোয়ার বইছে। বাতাসের তোড়ে বাইরের ধুলাগুলো হুড়মুড় করে জানালা দিয়ে ঢুকতে লাগল। ধুলাবালিতে ঘর নোংরা হবে ভেবে জানালাটা বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু বন্ধ কাচের জানালার পর্দাটা দুই হাত দিয়ে দুদিকে সরিয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকাতেই মনে হলো, মেঘলা আকাশের সাথে মানুষের মনের একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। হৃদয়ের গহিনে থাকা ভুলে যাওয়া কত স্মৃতিরা জেগে ওঠে সেই মুহূর্তে! আবার কখনও কখনও অকারণেই মন খারাপ হয়। অযথাই কত কি করতে ইচ্ছা করে! এমন মেঘলা দিনে ফেলে আসা দিনগুলো অন্তরে জাজ্জ্বল্যমান হয়ে ফিরে আসে বারবার। ঠিক এরকমই এক মেঘলা দিনে আমার সাথে রাজুর বিয়ে হয়েছিল।
রাজু দেখতে লম্বা, গায়ের রং শ্যামলা। বয়সও বেশি না। আমার চেয়ে মাত্র পাঁচ বছরের বড়। তখন ওকে দেখে ভীষণ ভালো লেগে গেল। ওকে খুব ভালোবাসতে ইচ্ছা করতো। ওর হাসি, ওর চাহনি, কথা বলা সবকিছুই ভালো লাগতো। আমার দুচোখে তখন আকাশ ভরা স্বপ্ন। কোমরে আঁচল গুঁজে কাজ করি ছোট্ট সংসারে।
তখন যৌবনের জোয়ারে মাতাল শরীর। দেহের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকে কাম। সময়ে-অসময়ে বাইরে থেকে ফিরেই রাজু আমার শরীরে হাত দিতো। জড়িয়ে ধরতো। আদর করতো। আমার ভালো লাগতো। সুখ আর সোহাগের কোনও কমতি ছিল না সংসারে। শুধু স্বামী আর আমি।
রাজু ভালো গাইতেও জানতো। খুব মিষ্টি কণ্ঠ তাঁর! এলাকায় গানের একটা সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিল সে। প্রায় সময়ই গানের অনুষ্ঠানে দলবল নিয়ে ছুটে যেতো বিভিন্ন জায়গায়। গভীর রাত পর্যন্ত চলতো অনুষ্ঠান। ঢাকার বাইরে গেলে দুই-তিন দিন পর বাড়ি ফিরতো। আয়-উপার্জন যা করতো তাতে সংসার কোনও ভাবে চলে যেতো। বাবার বাড়ির মতো অভাব ছিল না। তিনবেলা খাবারের জন্য হা-পিত্যেশ করতে হতো না।
একসময় ঘর আলো করে এলো আমাদের মেয়ে রেশমা। কিন্তু রাজু তখন গানের দল নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। আমার বা রেশমার প্রতি তার তেমন কোনও মনোযোগ ছিল না। অকারণেই রেগে যেতো। এমনকি সংসারের কোনও প্রয়োজনীয় কথা বললেও বিরক্ত হতো। দিনের পর দিন যেন এই তিক্ততা বেড়েই চলছিল।
কোনও উপায় না দেখে একসময় মায়ের বাড়িতে গিয়ে উঠি। কিন্তু দুই মাস কেটে যাবার পরও রাজু আমাদের খোঁজ নিতে যায়নি। এদিকে প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনেরা নানা কথা বলাবলি শুরু করে দিলো। তাদের ধারণা, রাজু তাড়িয়ে দিয়েছে আমায়।
অন্যদিকে একার উপার্জনের টাকা দিয়ে দুই বোনকে নিয়ে সংসার চালাতে মায়ের খুব কষ্ট হতো। তার মধ্যে আবার যোগ হয়েছি আমি আর রেশমা। মা বেশ কিছুদিন ধরে তার সেলাইয়ের কাজের পাশাপাশি বাসার কাছেই গাজিপুরের একটা সোয়েটার ফ্যাক্টরি থেকে অল্পস্বল্প কিছু কাজের অর্ডার এনে এলাকায় গরিব মানুষদের দিয়ে করিয়ে নিতেন। সেইখান থেকে যে কমিশন পেতেন তাতে কোনওভাবে দুবেলা মুখে ভাত জুটতো। সারাদিন হাড় ভাঙা খাটুনি খাটতেন। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে একবার কাজ দিয়ে আসতেন আবার তাদের কাজ শেষ হলো কিনা গিয়ে দেখতেন! কেননা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ জমা দিতে না পারলে পরবর্তী সময়ে আর কাজ পাওয়া যাবে না ভেবে কী চৈত্রের রোদ আর কী বৃষ্টি কোনও কিছুতেই ঘরে বসে থাকার উপায় ছিল না। মায়ের সেই রোদেপোড়া, ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যেতো।
এ অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেই, স্বামীর সংসারে ফিরে যাবো। সেখানে গিয়ে দেখি কিছুই বদলায়নি। এতগুলোদিন পর আমাদের দেখেও তার দৃষ্টিতে কোনও ভালোবাসা বা খুশির রেশটুকুও খুঁজে পাইনি। এমনকি রান্না করতে গিয়ে দেখি চাল, ডাল, তেল, নুন কিছুই নাই। রাজুকে বললাম—‘ঘরে চাইল নাই, এই বেলা চাইল না আনলে না খাইয়া থাকা লাগব।’ রাজু তখন বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। কথা শুনেই আমার দিকে তেড়ে আসে। রেগে গিয়ে চিৎকার করে বলে, ‘চাইল না থাকলে আমি কি করুম! না থাকলে খাবি না। আর এত যদি খাওনের শখ হয়, মায়ের বাড়িত থেইকা আইনা খা!’
‘কি কইতাছ এগুলাইন?’
‘ক্যান, আমি তো বাংলা কথাই কইছি। বুঝোস না? আইচ্ছা, তোর মায়ে যে পয়সা-কড়ি ছাড়া এক ফকিরনি গছাইছে আমারে, ওইডা তো বুঝোস! আমার বউ পরিচয়ে যে এই ঘরে থাকিস সেইটাই তো অনেক। তোরে আমি বিয়া না করলে কে বিয়া করতো. শুনি?’
কথাগুলো শুনে বুকের মধ্যে ধাক্কা লাগল। হঠাৎ করে মানুষটার কী হলো! কীভাবে এত বদলে গেল! দিনরাত এই ভেবে ভেবে দিশেহারা আমি। এরপর বহুদিন কেটে যায়, রাজু আর আমার বিছানায়ও আসে না।
অভাবের দিনগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল আজ বাজারে যেতে হবে। আকরাম সাহেবের বাসার সপ্তাহের বাজার ফুরিয়ে গেছে। তাছাড়া নিজের ইচ্ছেমতো বাজার করার মধ্যে আনন্দ আছে। অবশ্য সাধ আর সাধ্যের মধ্যে যদি মেলবন্ধন তৈরি হয়!
বাইরে তাকিয়ে দেখি আকাশের মেঘ সরে গিয়ে নরম রোদ উঠেছে।
তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ি বাজার করার জন্য। বেছে বেছে সবুজ শাক-সবজি আর প্রয়োজনীয় সব কেনাকাটা করে ফেরার পথে চোখ আটকে যায় একটি কনফেকশনারির দোকানে। দেখলাম-একজন ভদ্রমহিলা দোকান থেকে কী সব জিনিসপত্র কেনাকাটা করছে আর তার সাত-আট বছরের কোঁকড়া চুলের লাল ফ্রক পরা ছোট্ট মেয়েটি মায়ের হাত ধরে টানছে আর বলছে-‘মা আইসক্রিম খাবো। কিনে দাও না।’ কী চমৎকার দৃশ্য! কত আবেগ, অধিকার আর ভালোবাসায় মোড়ানো সেই শব্দগুলো। ঠিক তখনি বুঝলাম—পৃথিবীতে শব্দ খুব দামি। সবাই চাইলেই যখন তখন যত্রতত্র সব শব্দ ব্যবহার করতে পারে না। যদি পারতো তবে মানুষের অন্তর্জগতে এত দুঃখ, হতাশা থাকতো না।
কেননা ইচ্ছে হলেই তো যে কারও কাছে আবদার করা যায় না। আবদার করার জন্য সেই মানুষ থাকা চাই। এখন যেমন ইচ্ছ হলেই এই মুহূর্তে আমাকে কেউ এসে বলবে না, ‘মা, আইসক্রিম খাবো। কিনে দাও।’ কিংবা হৃদয় জুড়ানো শব্দ ‘মা’ বলেও কেউ আমায় ডাকবে না। ভাবি—রেশমা যদি আমার থাকতো হয়তো ওর মতো করেই বায়না করতো। আচ্ছা, ওকি আইসক্রিম খেতে চাইতো, না কি অন্যকিছু? চকলেট, চিপস কি জানি! ওর ভালোলাগা, মন্দলাগা এগুলো জানার সময় তো পাইনি। এখন কেবলই মনে হয়, জীবনে প্রতারিত হয়েও নিজের জন্য কোনও দুঃখ নেই। দুঃখ হয় রেশমাকে কাছে না পাবার জন্য। ওকে হারিয়ে এ জীবন বয়ে বেড়ানোটাই দুঃখের। আমি কিছুতেই ওকে এড়াতে পারি না। মাঝে মাঝে ওকে খুব ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছা হয়। স্পর্শের সামান্য একটু হীরার টুকরার জন্য মন আচমকা আনচান করে ওঠে।
এলোমেলো ভাবনাগুলো ভাবতে ভাবতে বাসায় ফিরে বাজারগুলো ফ্রিজে গুছিয়ে রেখে রান্না করতে যাই। কিন্তু তখনও ভাবনাগুলো পিছু ছাড়ে না। কিছু অতীতকে মানুষ হয়তো চাইলেও এড়াতে পারে না। বর্তমানের মাঝেই সেই অতীতকে সঙ্গে নিয়েই জীবনকে যাপন করতে হয়।
মনে পড়ে—রাজুর সাথে কাটানো সেই দিনগুলোর কথা। তখন এক দুপুরে মায়ের কাছে গিয়েছিলাম কিছু টাকা চাইতে। ফিরে এসে দেখি, রাজুর ঘরের দরজাটা ভেজানো। কিন্তু দরজা ভেজানো কেন? আমি তো ঘরে তালা দিয়ে গিয়েছি। তাহলে তালা খুলল কে? বিস্মিত আমি দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখি, বিছানায় রাজু আর তার বুকের উপর মুখ রেখে তারই দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল একটি মেয়ে। যেন জগৎ-সংসারের সবকিছু ভুলেই তাকিয়ে ছিলো। বুকের ভেতরটা মুষড়ে উঠল।
মেয়েটিকে হঠাৎ দেখেই চেনা চেনা মনে হচ্ছিল। কিন্তু কে? কোথায় দেখেছি? মনে পড়ছিল না। তাদের দুজনের পরনের কাপড় তখন এলোমেলো। আমাকে দেখেই মেয়েটি তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তার যাওয়ার পরপরই মনে পড়ে, মেয়েটিকে দেখেছি আগে রাজুরই গানের দলে। তারা একইসাথে গান করতো। তখন আমার বোঝার আর কিছুই বাকি রইল না। আমি চিৎকার করে উঠেছিলাম।
দেওয়ালে মাথা ঠুকে বলেছিলাম, হায় আল্লাহ! কি কপাল আমার! এটাও দেখতে হইল আমারে!
রাজু গলা উঁচিয়ে বলেছিল, ‘বেশ করেছি, আমার ঘরে আমি যারে ইচ্ছা আনবো! তাতে কার কী? তোর ভালো না লাগলে বাইর হইয়া যা। দরজা খোলা আছে। মুক্তি দে আমারে।’
রাজুর কথা শুনে তখন দুপুরের ঝকঝকে আলোর মাঝেও দু’চোখে যেন অন্ধকার দেখেছিলাম। মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। মাথার দুপাশের রগ মনে হলো তখনই ছিঁড়ে যাবে। রাজু আমার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
আমি রেশমার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবি,বাচ্চাটা নিয়ে আমি এখন কি করব! কোথায় যাবো, জানি না। গলায় দড়ি দিব, নাকি পানিতে ডুবে মরব? তাতে হয়তো আমি এ-জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচব। কিন্তু আমার মেয়ের কি হবে? ওকে কে দেখবে?
কোনো উপায় না দেখে মায়ের কাছে যাই। গরিব মা ছাড়া আমার তো আর কেউ নেই। মাকে সব কিছু খুলে বলি। রাজু যে অন্য মেয়েকে নিয়ে ঘরে এসেছে সে কথাটাও জানাই। সব কথা শুনে রাজুর প্রতি মা’র কোনও রাগ তো হয়ইনি উল্টো মা আমাকে বললেন, ‘মাইয়া মানুষের এত তেজ থাকতে নাই। সামান্য বিষয় নিয়া ঝামেলা কইরা ঘর ছাইড়া আসা তোর ঠিক হয় নাই। যা হওয়ার হইছে। নিজের ঘরে ফিরা যা।’
মাকে তখন অনুরোধ করে বলি, ‘মা। তুমি খালি একটু থাকবার জায়গা দাও। আমি কাম কইরা আমার আর রেশমার খরচ চালাইয়া আনমু। তুমি কোনো চিন্তা কইরো না।’
‘শোন, তোরে সাফ সাফ একটা কথা জানায়া রাখি—আমার এখানে তোরে আমি রাখতে পারুম না।’
বুঝলাম, আমার অনুরোধে কোনো কাজ হবে না। শেষ পর্যন্ত মায়ের কাছেও যখন আশ্রয় মিলল না তখন কোথায় যাব, কি করব এরকম ভাবতে ভাবতে দূর সম্পর্কের এক চাচার কথা মনে পড়ল। যদি তিনি একটু আশ্রয় দেন, সেই আশায় তার কাছে যাই। সেখানে গিয়ে দেখলাম, চাচার অনেক বড় বাড়ি। বাড়িতে চাচি আর চাচা ছাড়া আর কেউ নেই। তাদের দুই ছেলে আর এক মেয়ে সবাই বিদেশে থাকে। সব কথা শুনে তিনি আমাকে তার ঘরের পাশে ছোট্ট একচালা একটি টিনের ঘরে থাকতে দিলেন। সেখানে ঘর-দোর পরিষ্কার করা, থালা-বাসন ধোয়া, সবার কাপড়চোপড় ধোয়া—এসব করে দিন কাটে। ভাবি-কষ্ট হলেও একটা আশ্রয় তো জুটলো। আর দুবেলা খাবারের জন্য কারও মুখাপেক্ষীও হতে হবে না। তাছাড়া আমার রেশমাকে চাচি খুব ভালোবাসেন। যখন বাড়ির কাজ করি, তখন চাচিই রেশমাকে সামলান। কোলে নিয়ে আদর করেন, এটা ওটা খেতে দেন। একবার রেশমার খুব জ্বর হয়েছিল, তখন তিনিই ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন।
সেবা যত্ন করে সুস্থ করেছেন। রেশমাও চাচির সঙ্গ ভালোবাসে।
এ-বাড়িতে চাচির কোনও কিছুরই অভাব নেই। শুয়ে বসে তাঁর দিন কাটে। শুনেছি, চাচির সাথে চাচা গলা চড়িয়ে কথা বলেছেন এমন ঘটনা খুব কম। আর গায়ে হাত তোলা তো অনেক দূরের ব্যাপার। তার মানে যে, চাচা চাচিকে খুব সম্মান করেন বা ভালোবাসেন আমার তা মনে হয় না। মনে হয়, তাকে তিনি যতটা না ভালোবাসেন তার চেয়ে বেশি ভয় পান। কেননা চাচি ছিলেন চেয়ারম্যানের মেয়ে। তার বাবার টাকাতেই এ বাড়িটি তৈরি করেছেন। তাই শ্বশুরবাড়ির লোকজন বেড়াতে এলে চাচা তাদের খুব সমীহ করতেন। বাজার থেকে তাজা মাছ, মুরগি এনে রান্না করে খাওয়াতে বলতেন।
তবুও চাচাকে ঠিক বুঝতে পারতাম না। তিনি বরাবরই চুপচাপ থাকতেন। খুব প্রয়োজন না হলে সামনে আসতেন না। তবে পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও তাকে কখনও খারাপ মানুষ মনে হয়নি। কিন্তু চাচার সম্পর্কে আমার এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো কিছুদিন পরেই।
একদিন রাতে বিছানায় শুয়ে আছি। ঘরের আলো তখন নিভানো।
দরোজাটা ভেজানো ছিল। আমার চোখ সারাদিনের ক্লান্তিতে বুঁজে আসছিলো। হঠাৎ কখন যে চাচা আমার ঘরে ঢুকেছেন তা টের পাইনি। যখন চাচার হাত আলতোভাবে আমার স্তন ছুঁয়ে গেল, তাঁর ঠোঁট দুটো আমার গাল ছুঁয়ে ঠোঁটে চেপে বসল, আমি তখন চোখ মেলে আবিষ্কার করলাম, এক কামুক পুরুষকে।
এরপর তার অনুসন্ধিৎসু আঙুলগুলো স্তনের বোঁটায় হাত ঘুরাতে ঘুরাতে ক্রমেই আমার উরু হাতড়াতে হাতড়াতে নিচের দিকে নামতে থাকে। আমার সারা শরীর তখন কাঁপতে লাগল। আমি তখন কি করব বুঝতে পারছিলাম না। এ দিকে চাচা ক্রমাগত আমার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে, এ ছুঁয়ে যাওয়া আমায় এক অজানা, অনির্বচনীয় সুখানুভূতি দিয়ে যাচ্ছে। আমি সেই সুখানুভূতিকে অস্বীকার করতে পারিনি সেদিন। যে অনুভূতি অনেকদিন হলো হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে। মনে হলো, আমার শরীরের দূরাগত কোনও বিন্দু থেকে কোনও পুরুষের স্পর্শে তা নতুন করে আবার জেগে উঠেছে। আমি সেই স্পর্শ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারিনি।
কিন্তু যখন সব শেষ হয়ে গেল আমার ভিতরে তখন বিবেক জেগে উঠল। মনে হলো এ আমি কী করলাম, কেন নিজেকে সঁপে দিলাম! আবার ভাবলাম, এছাড়া আমার কিইবা করার ছিল!
কিন্তু এরপরই মনে হলো, যার আশ্রয়ে থেকে, খেয়ে-পরে আমি আর আমার সন্তানের দিন কেটে যাচ্ছে, তার জীবনে অশান্তির ঝড় তুলতে পারি না। এ অন্যায়। সিদ্ধান্ত নিলাম, এখান থেকে চলে যাব। কিন্তু কোথায় যাব?
কার কাছে যাব? কেউই তো নেই! আর আমার মেয়ে রেশমা, ওরই বা কী হবে! ভেবে ভেবে কোনও কূল কিনারা করতে পারছিলাম না। সেদিন আবারও বুঝলাম সহায় সম্বলহীন কোনও নারীর জীবনের পথ চলাটা সহজ নয়। তাদের ঘর যতটা শৃঙ্খলে আবদ্ধ, বাহির তার চেয়ে ঢের বেশি।
রেশমার দিকে চোখ পড়তেই দেখি ও ঘুমাচ্ছে! বাইরে চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে পৃথিবী। জানালার গ্রিল গলে সেই আলো এসে পড়ছে রেশমার মুখে! কী মায়াময় লাগছে ওর মুখটা! ইচ্ছা করছিল শুধু তাকিয়েই থাকি।
হঠাৎ তখন কোনো বিভ্রান্ত দার্শনিকের মতো যেন মন বলে গেলো, সব মায়া সবার জীবনে মঙ্গল বয়ে আনে না। কিছু মায়া ত্যাগেই হয়তো সুখ লুকিয়ে থাকে। আমার মাতৃত্বের সবটুকু মমতার বিসর্জনে রেশমার জীবন যদি নিরাপদ হয়, তাতে ক্ষতি কী! যে নিরাপদ জীবন অর্থাভাবে কখনও আমি পাইনি, সে নিরাপদ জীবন যদি রেশমা পায়, চাচির কাছে যদি ও ভালো থাকে তবে মা হয়ে সন্তানের প্রতি সব অধিকার থেকে নিজেকে স্বেচ্ছায় মুক্তি দিতে আমার কোনও দ্বিধা নেই। হয়তো চাচি রেশমাকে নিরাপদ একটা জীবন দিতে পারবে। যা আমি দিতে পারব না। এমন অনেক কিছু ভেবে সেদিন সিদ্ধান্ত নেই, চলে যাব। যে আমার একমাত্র অবলম্বন ছিল এতদিন, তাকে রেখেই চলে যাব এখান থেকে দূরে কোথাও।
শেষবারের মতো ঘুমন্ত মেয়ের কপালে একবার চুমু খেলাম। ওর মাথায় হাত বুলালাম। তখন বুকের ভেতরটায় যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। কান্না পাচ্ছিল খুব। সেই ঝড়ের আঘাতে আঘাতে বারবার নিজেকে সামলে নিয়ে আবার যেন নিজের কাছে নিজেই হেরে যাই। ঘুমন্ত রেশমাকে ছেড়ে যেতে দু’পা এগুলোই আবার কিসের এক অদৃশ্য সুতোর টানে ফিরে আসি।
অবশেষে মনকে স্থির করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। রাত্রির গভীর নীরবতার মাঝে বটগাছটার মোড় পেরিয়ে যখন সামনে এগোচ্ছি ঠিক তখনই বুকের ভেতরটা হুহু করে কেঁদে উঠল। আমার বুকের মানিকের জন্য। আমার নাড়ি ছেঁড়া সন্তানের জন্য। ওকে ছেড়ে থাকব কি করে, ভাবতেই দুচোখ বেয়ে ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিল সেদিন। আজও ঝরে অশ্রু। প্রতিটি রাত নির্ঘুম কাটে ওকে ভেবে। জানি না, কখনও এই কান্নার অবসান হবে কি না? ‘রজনী, তুমি কোথায়?’ আকরাম সাহেব ডাকছেন। এখন তাকে আরেক কাপ চা দিতে হবে। মনে হচ্ছিল—দূরে কোথাও থেকে আবার যেন ফিরে এলাম নিজের কাছে। হ্যাঁ আমি এখন অন্য এক রজনী। অন্যের সংসারের দেখাশোনা করি। তবুও ভালো যে, আকরাম সাহেবের মতো একজন ভালো মানুষের সেবা করতে পারছি। এটাকে গভর্নেন্সের কাজই বলা চলে। যেদিন রেশমাকে ছেড়ে এসে কোথায় যাব, কার কাছে যাব কোনো কূল কিনারা করতে না পেরে হাসপাতালের নীচতলার সিঁড়ির কোনায় বসে অশ্রুভেজা চোখে আকাশ পাতাল ভাবছিলাম। আকরাম সাহেব সেদিন রুটিন চেকআপ সেরে ছেলের হাত ধরে হাসপাতাল থেকে বেরুচ্ছিলেন। আমাকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। কাছে এসে বললেন, ভদ্র ঘরের মেয়ে বলেই তো মনে হচ্ছে। এই মেয়ে, কি হয়েছে? কাঁদছ কেন? তোমার পেশেন্ট আছে এখানে?’
‘না স্যার। আমার এখানে কেউই নেই। একটা কাজের খোঁজে বসে আছি। কত লোকইতো আসেন এখানে। যদি কিছু হয়, সেই আশায়...’
সবকিছু শুনে আকরাম সাহেব ছেলের সাথে আলাপ করে বললেন, ‘যাবে আমার সাথে? ভয় নেই। তোমার মতো আমিও একা। ওয়াইফ মারা গিয়েছেন বেশ কিছুদিন হলো। একমাত্র ছেলেটাও চলে যাচ্ছে বিদেশে। এই বুড়োটার একটু দেখাশুনা করতে পারবে না?’
বুড়ো মানুষটার কথা শুনে খুব মায়া হলো। তাছাড়াও ভাবলাম-ভদ্রলোকের বয়স আশির কাছাকাছি। অন্তত শরীরের লোভটা হয়তো নেই। তাই আর বেশি কিছু না ভেবে রাজী হয়ে গেলাম। ব্যস, চাকরিটা হয়ে গেল। এখন আমার জীবনে নতুন করে কিছু হারাবার বা পাবার কিছু নেই। শুধু আফসোস, কাউকে নিজের করে কাছে রাখতে পারিনি।
অথচ আমিও চেয়েছিলাম, স্বামী, সন্তান নিয়ে ছোট্ট একটা সংসার হবে আমার। তাদের নিয়ে অন্য দশজন নারীর মতোই সুখে-দুঃখে একসাথে বাঁচব। হলো না। নিজের বলে আজ আর কিছুই রইলো না। এমনকি রেশমাও আর আমার নেই। সে বেড়ে উঠছে অন্য কারো আশ্রয়ে। আমি যে তার মা এ সত্যটুকু সে হয়তো কোনোদিন জানবে না। হয়তো আমি বা সে কখনো পাশাপাশি থাকলেও একে অপরকে চিনতে পারবো না। হায় নিয়তি, তোমাকে বোঝা বড় কঠিন।
চা দিতে যাবার আগে কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আমার গাল বেয়ে নিঃশব্দ্যে কয়েক ফোঁটা জল ঝরে পড়লো! তারপরপরই হু হু কান্নায় ভেঙে পড়লাম। যেন পাড়ভাঙা নদীর পানির তোড়ে খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছি আমি...।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন