বিবাদের রাত
|| এক ||
‘এ ভাবেই কি বেঁচে থাকতে হবে?’, এই সামান্য আত্মজিজ্ঞাসার বাক্যটা লিখে তারেক কি-বোর্ডের স্পেইসবারে তার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলটা আলতো করে ছুঁয়ে রাখলো। তর্জনীটা রাখতে গিয়েও পারলো না। কয়েকবার নাড়াচাড়া করার পরও আঙুলটা স্পেইসবার স্পর্শ করতে পারলো না। গাঢ় শূন্যতা নিয়ে ঝুলে রইলো। অন্ধকার ঘরটিতে কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে বৈদ্যুতিক রশ্মি কি-বোর্ডের উপর একটা মহাজাগতিক বার্তাবরণের মতো সৃষ্টি করে আছে। তারই মাঝে আঙুল দুটির অবস্থান এমন একটা জ্যামিতিক নকশা ধারন করেছে, দেখলে মনে হবে মাটির পৃথিবীর কানাগলিতে মধ্যরাতের আধখানা চাঁদের পোড়া আলোতে একটা নেড়ী কুকুর তার বাম পা মাটিতে রেখে ডান পা শূন্যে উঁচিয়ে প্রস্রাব করে যাচ্ছে।
তারেক তার কাধটা একটু নিচের দিকে হেলে দিয়ে মাথাটা ষাট ডিগ্রি নত করলো। নিস্তরঙ্গ ঢেউ যেমন সৈকতের বালিয়াড়িতে ছাড়া ছাড়া খাঁজ তৈরি করে তেমনি মস্তিষ্কের ভেতর থেকে একটা বায়বীয় বিমর্ষতা তারেকের কপালে তপ্ত লাভার মতো ছড়িয়ে পড়তে পড়তে ভ্রু-কুঞ্চন যুগলে এসে থেমে গেলো। চোখের পাতার রেখাচিত্র গুলো ফুলকির মতো ধিকিধিকি স্পন্দিত হতে লাগলো। একটা কুসুম-জলের উষ্ণতা চোখের পাতা থেকে শ্যামল পাপড়ির চিক্কন পথ বেয়ে নাকের ডগায় এসে থেমে গেলো। তারপর তা নাসিকা-ছিদ্র দুটির পরিধিতে ছড়িয়ে চক্কর দিতে লাগলো। তারেক চোখ দুটি পলকে বন্ধ করে জোরে চেপে রাখলো। দাঁতের উপরের পাটি দিয়ে নিচের পাটিকে সমানুপাতে চাপ দিলো। নিচের ঠোঁটটাকে আধ ইঞ্চি ভেতরের দিকে ঠেলে দাঁতের পাটির সাথে ঠেস দিয়ে লাগিয়ে রাখলো। উপরের ঠোঁটটা দিয়ে ঢেকে রেখে জোরালো একটা গভীর শ্বাস নিতে যাবে এমন সময় একটা দম আটকানো ঘোমট গন্ধ এসে তার নাসিকা রন্ধ্রের ভেতর দিয়ে নিমিষে ফুসফুসে ঢুকে গেলো।
একদল যুবক সেনা যেভাবে বন্ধ দরজায় বেয়োনট দিয়ে আঘাত করে, তেমনি তপ্ত হাওয়ার সাথে একটা তীব্র দুর্গন্ধ তার শ্বাস নালিতে আঘাত করতে করতে ফুসফুসে একটা প্রকট ঘূর্ণিপাক তৈরি করে যখন মুখ দিয়ে প্রশ্বাস হয়ে ফিরে আসলো, তখন জিহ্বায় নষ্ট আখরোটের সাথে ডিমের পঁচা কুসুমের মিশ্রিণের তিক্ত একটা বিস্বাদ পেলো। তারেকের বুঝতে আর বাকি রইলো না এমনটা কেন হলো। এমনটা প্রায়ই হচ্ছে আজকাল। আচমকা নয় তারেকের নিজের দোষেই হয়। তাই বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে কি-বোর্ডের ব্যাকস্পেসে চেপে রেখে লেখাটা মুছে দিলো। আর মনে মনে একবার বললো, ‘বে হ তে ক থা চে বেঁ কি ই বে ভা এ…’
টেবিল থেকে ওরিস সিগারেটর প্যাকেটা নিয়ে খুলে দেখলো। ভেতরটা একদম ফাঁকা। কি করা যায়? তারেক ভাবতে লাগলো। এখন তো অনেক রাত। প্রায় একটা বেজে চল্লিশ মিনিট।
বাইরে কোন কুকুরের ডাক অব্দি নেই। দোকানপাট খোলা থাকার তো প্রশ্নই উঠে না। কি করা যায়? জিহ্বাটা কেমন তেতো হয়ে আছে। একটা সিগারেট না হলেই নয়। পাঞ্জাবীর পকেটে হাতড়ে দেখলো। নাহ, লাইটার ছাড়া আর কিছু পাওয়া গেলো না। বিছানার কাছের সুইচবোর্ড হাতড়ে অনুমানে করে চাপতেই ডিমলাইটটা জ্বলে উঠলো। পায়ের কাছে ময়লা ফেলার ঝুড়িতে চোখ পড়তেই দেখলো একটা আধা খাওয়া সিগারেট ঝুড়ির বাইরের দিকে পড়ে আছে। সিগারেটের চারপাশে ছাইগুলো এমন ভাবে ছিটিয়ে আছে, যেমন করে আকাশে আতশবাজির আলোর ছটা ছড়িয়ে থাকে।
তারেক উপুর হয়ে সিগারেটটা হাতে তুলে নিলো। পুরোপুরি সোজা হয়ে বসার আগে সুইচটা চেপে বাতিটা নিভিয়ে দিলো। পাঞ্জাবীর পকেট থেকে লাইটারটা বের করে সিগারেটটা জ্বালিয়ে নিলো। চেয়ার ছেড়ে দাড়িয়ে জ্বানালার দিকে ফিরলো। বাইরে সত্যি সত্যিই চাঁদ উঠেছে। চাঁদের পোড়া আলো জালানায় টাঙ্গানো পর্দার পাতলা ছিদ্র দিয়ে ঢুকে দুপাশে দুটি টবে রাখা কৃত্রিম পাতাবাহার গাছের পাতার ফাঁক গলে মোজাইক করা মেঝেতে পড়েছে। পাতার উপর আলোর ছায়া আর মেঝের উপর পাতার ছায়া মিলেমিশে ঘরটাকে যেন আরণ্যক করে তুলেছে।
তারেক দুই পা এগিয়ে গেলো। ফালি ফালি বাঁকা আলোর ধারা থেকে এক পা দূরে দাড়িয়ে মুখ থেকে এক রাশ ধূয়া ছড়িয়ে দিলো আলোর মাঝে। জ্যোৎস্নার দ্যুতি আর সিগারেটের ধূয়ার মিথস্ক্রিয়ায় এক অতিবাস্তব দৃশ্য তৈরি হলো। তারেক আরেকটা ফু দিলো। এবার ধূয়া ছাড়া শুধুই হাওয়া। আলো থেকে ধূয়া দূরে সরে গেলো না আলোতে মিশে গেলো খালি চোখে দেখা গেলো না। তারপর এগিয়ে গিয়ে বা হাতে পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে জানালার গ্রিলে হাত রাখলো। ধূম্রালোক নিয়ে খেলতে খেলতে সিগারেটটা প্রায় শেষপ্রান্তে। তাই এক দমে ঢেনে শেষ করে দিলো। সিগারেটের গোড়াটা দুই ঠোঁটের মাঝে রেখে দিলো কিছুক্ষণ। তারপর ফুসফুস থেকে আসা প্রশ্বাসের তোড়ে সিগারেটের শেষাংশটি রাস্তার দিকে ছুড়ে ফেললো।
বাইরে বড় রাস্তার দুপাশে সোডিয়াম বাতির আলোতে নির্জনতার নিঃশব্দ আলাপন চলছে যেন। রাস্তার মাঝখানে মাঝখানে দুপাশের দালানের ছায়াতে মিহি চাঁদের আলোর হঠাৎ অনুপ্রবেশ এই আলাপনকে করে তুলেছে আরো রহস্যময়। জানালা বরাবর ল্যাম্প পোস্টটির সাথে একটা রিক্সা বাঁধা। পাশেই চালকটি বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। সোডিয়াম বাতির হলদে আলোয় শ্বাস প্রশ্বাসের তালে পেটের উঠানামা বুঝা যাচ্ছে। পেটটা এতোটা গভীরে ঢুকে যাচ্ছে যে মনে হচ্ছে আজ রাতে কিছু না খেয়েই ঘুমিয়েছে। সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত শহরে আজ হরতাল ছিল। রাস্তায় বোধ হয় লোকজন তেমন একটা আজ বের হয়নি। আর বের হলেও হয়তো রিক্সা ব্যবহার করেনি। হয়তো হেঁটেই কাজ সেরেছে। রিক্সায় উঠলে কখন কোন দিক থেকে পাথরের ঢিল এসে কপালে বা চোখে লাগবে তার তো কোন হদিস নেই। তাই পায়ে হাটাই নিরাপদ ছিল। এর জন্যই বোধহয় চালকটি আজ খাবারের টাকার ব্যবস্থা করতে পারেনি। খালি পেটেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
আধখানা সিগারেট মাত্র তিন দমে শেষ হয়ে গেলো। ধোয়াটা বাতাসে মেলাতেই সে ঘাড়টা একবার ডানে ঘুরিয়ে বামে নিতেই নিজের ছায়ামূর্তির দিকে চোখ আটকে গেলো। ডান হাতের তর্জনীটা এখনও একইভাবে শূন্যতায় স্থিত হয়ে আছে। ‘এ জগতে এমন কি আছে যা আমার অধীন। এ দুনিয়ায় জন্মেছি তো অন্যের ইচ্ছায়। এ দুনিয়া ছেড়ে যাবো তো আমার অনিচ্ছায়। এই দুইয়ের মধ্যবর্তীকালীন বেঁচে থাকার নামে যে জীবন তাকে নিজের ইচ্ছায় যাপন করবো, এতোটা যৌক্তিক নিয়মে কি এ জগৎ চলে?’
এই চিন্তাটা মাথায় আসতে না আসতেই পিত্তি জ্বালানো ভোটকা গন্ধ নারায়ে নারায়ে বলতে বলতে তারেকের ঈষৎ আলগা করে রাখা দুই ঠোঁটের ফাঁক গলে ঢুকে পড়লো। পথের পাশে সন্ধ্যা থেকে জ্বলতে থাকা সোডিয়াম বাতি যখন ভোরের শুকতারার ম্রিয়মান আলোয় নিভে যাওয়ার পূর্বমূহূর্তে শর্টসার্কিটে পুড়ে গেলে, যে তীব্র তামাটে গন্ধ হয়, তার একটা তিক্ত স্বাদ যেন পুরো জিহ্বায় লেপটে রইলো। যেন এক নিশাচর গন্ধগোকুল রাত জাগা ঢুলুঢুলু চোখে তার নাকে নাক ঠেকিয়ে স্বশব্দে শ্বাস ছেড়ে দিলো। পঁচা পান্তা পোলাওয়ের ঘ্রাণে তার গা গুলিয়ে উঠলো।
তারেকের বুঝতে বাকি রইল না। এই দম আটকানো বিরুদ্ধ প্রতিবেশ তৈরি হওয়ার কারণ কি? ওই পরিস্থিতি থেকে প্রাণে বেচে ফিরে আসার পর থেকেই এই সমস্যাটা দেখা দিচ্ছে। সহজ, সুন্দর, সাবলীল কোন চিন্তা করলেই এই তিক্ত ঘ্রাণের আক্রমণ শুরু হয়। জগতের প্রতিষ্ঠাকে চ্যালেঞ্জ করে এমন কোন ভাবনা। জীবনকে প্রশ্নের মুখোমুখি করে এমন এক একটা শব্দের পিছন পিছন এক একটা দুর্দান্ত গন্ধ এসে তারেককে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। মনে মনে কতোবার সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছে। যতো দিন বেঁচে থাকবে ততোদিন আর কখনো এমন ধারার চিন্তা মাথায় আসতে দিবে না। শুধু হাওয়ার মতো বেঁচে থাকবে। জীবন যে পথে নিয়ে যাবে সে পথে হাটবে। কোথাও পৌছাতে হবে এমন কোন গন্তব্য ঠিক করা যাবে না। বাতাসকে সঙ্গে নিয়ে কোন প্রশ্নহীন, দ্বিধাহীন চিত্তে জীবন চালিয়ে যাবে। আর তাই বুঝি এমন চিন্তা, এমন প্রশ্ন মাথায় আসলেই বাতাস এমন ভারী হয়ে উঠে। বিষাক্ত মনে হয়। হয়তো জানান দেয়। এমন করে ভাবছো কেন? এই শব্দটা ভুলে যাও। এবার থামো তবে।
তোতো স্বাদটা জিহ্বায় এমন করে লেপটে আছে, ঝাঁঝালো গন্ধটা নাকের রন্ধ্রে এমন ভাবে আবর্ত তৈরি করছে যে পুরো শরীরটা গুলিয়ে উঠছে। তারেক আর সময় ক্ষেপণ না করে দুই হাটু আড়াআড়ি করে ভাজ করে মেঝেতে বসে পড়লো। ঘাড়ের একটু উপর স্পাইনাল কর্ডটা শক্ত করে মাথাটাকে সোজা করলো। মুহূর্তে গ্রীবার কশেরুকাগুলো কটিদেশীয় হাড়ের সাথে একটা শক্ত উলম্বরেখা তৈরি করলো। বুকের পাজরগুলো সামান্য ফুলে সামনের দিকে এগিয়ে আসলো। কিছুক্ষন শ্বাস বন্ধ করে মুখটা খুলে জোরে কিছুক্ষণ শ্বাস নিয়ে মুখটা বন্ধ করে দিলো। শ্বাসটা ছেড়ে না দিয়ে ফুসফুসে আটকে রেখে তারপর নাক দিয়ে ছেড়ে দিলো। স্বাদ আর গন্ধের মিশ্র বিবমিষা পুরোপুরি না সরে গেলেও আগের চেয়ে একটু হালকা হালকা লাগলো। অন্ততপক্ষে বৈলাম গাছের মগ ডালের শুকনো পাতার মতো নিচের দিকে ঝরে পড়তে থাকার যে স্মৃতি ফিরে আসে তার থেকে তো নিস্কৃতি পেলো।
ডা. শুভাশিস মন্ডল গত সেশনে ঠিক এই কপালভাতি প্রাণায়ামের পদ্ধতিটাই বলে দিয়েছিলেন। কোন রকম ঔষধে ঠিকঠাক কাজ করছিল না। ব্যাপারটাকে প্রথমে শারীরিক রোগ ভেবেই চিকিৎসা করে আসছিলেন লিভার ও গ্যাস্ট্রো বিশেষজ্ঞ ডা. মামুনুর ভূইয়া। অনেক প্যাথলজিকাল পরীক্ষা ও এন্টিবায়াটিক খাওয়ার পরও যখন কোনভাবেই কোন সুরাহা হচ্ছিল না। তখন ডা. মামুনুরই নিরাময় হাসপাতালের মনোচিকিৎসক ডা. শুভাশিস মন্ডলকে একবার দেখানোর জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত ডাক্তার শুভাশিসের সাথে দুইবার বসা হয়েছে। শেষ বসেছিলো গত মাসের পাঁচ তারিখ। মাঝখানে দুই সপ্তাহের জন্য ডা. শুভাশিস প্রাগে গিয়েছিলেন। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে। ফিরে এসে নতুন শিডিউল দেয়ার কথা ছিল। হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ দিয়ে রাখবেন বলেছিলেন। গত সোমবার চলে আসার কথা। আজ বৃহস্পতিবার। কিন্তু এখনও কোন খোঁজ নাই। হয়তো এখনো ফিরে আসেন নাই। আটকে গেছেন কোন জরুরী কাজে। এই বিষয়টা নিয়েও তারেকের মন কিছুটা বিচলিত। ফোন দিয়ে সমস্যাটার কথা বলা যেতো। কল করলে উনি হয়তো কিছু মনে করতেন না। কিন্তু তারেকের মন সায় দেয়নি। ছেলেবেলা থেকেই ও এই রকম। ধৈর্য্যের শেষ সীমা অব্দি অপেক্ষা করবে। তবুও অন্যের ব্যক্তিগত বা ব্যস্ত সময়ে বিরক্ত করবে না।
তারেক ঠিক চাঁদের মুখোমুখি বসেছিল। চোখ খুলতেই দেখলো জ্যোৎস্নার মখমলী আলোটা হাটু থেকে সরে গিয়ে জানালার গ্রিল ধরে ঝুলে আছে। আলোটা আরেকটু সরে গেলে ঠিক নিচে পড়ে যাবে। বুঝলো রাত বাড়তে বাড়তে জ্বলন্ত সিগারেটের মতোই ছোট হয়ে আসছে। এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে বিছানায় পাশ বালিশের নিচে রাখা মোবাইলটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনে চোখ রাখলো। দুইটা বেজে ছত্রিশ মিনিট। অনেক রাত হয়ে গেছে। মধ্য রাত। ঘুমানো জরুরী না হলে উঠতে উঠতে বেলা হয়ে যাবে। সকাল নয়টার মধ্যে চোখের ড্রপটা না দিতে পারলে সারাদিন মনটা খচখচ করবে। নিয়ম করে ঔষধ সেবন করাটা তারেকের জন্য একটা বাতিক হয়ে গেছে। ঔষধ খাওয়ার রুটিন সেনা শৃঙ্খলার মতো মেনে চলে আজকাল। মনের মাঠে যতোই উইপোকার বানানো এবড়ো থেবড়ো টিলা গজিয়ে উঠুক না কেন। শরীরের ঘাটের জল নিস্তরঙ্গ হয়ে বইতে থাকবে এই তার পণ। শরীরই তো মহাশয়। মনকে মনের মতো না রাখলেও বেঁচে বর্তে থাকা যায়। শরীরকে শরীরের মতো না রাখলে প্রকৃতির রোষানলে পড়ে পৃথিবী প্রস্থান ছাড়া গতি আছে কি?
মোবাইলটা স্লিপ মুডে রাখতে গিয়ে কয়েকটা নোটিফিকেশন ভেসে উঠে উপর থেকে নিচ অব্দি একসাথে ছড়িয়ে পড়লো। অনেকটা চুলায় বসানো ভাতের মার যেভাবে বুদ্বুদ হয়ে ফুটতে থাকে সেরকম। প্রথম নোটিফিকেশনটা মোবাইল সিম অপারেটরের কাছ থেকে এসেছে। তারেকের ইন্টারনেট ব্যালেন্স ৯৫% শেষ তাই অতি দ্রুত ইন্টারনেট লোন নেওয়া জন্য *১২৩*০০৩#-এ ডায়াল করার প্রস্তাব দিয়ে একটা ছোট্ট বার্তা। পড়ার নিমিষেই তার মাথায় একটা ভাবনা খেলে গেল। মানুষ এই দৃশ্যমান জগতকে জানার জন্য অসংখ্য অদৃশ্যমান জগৎ তৈরি করে রেখেছে। মানুষ তার সসীম জানার ক্ষেত্রটাকে অসীম অজানা বিন্দু দিয়ে দিয়ে ঢেকে রেখেছে। তাই তার দৃশ্য অদৃশ্যের হাতে বন্দী। তাই তার জানা অজানার পায়ে শৃংখলিত। ভাবনাটা আর সামনে এগোতে পারলো না। বাতাসে লি-আইয়োন ব্যাটারির পোড়া গন্ধ কেমন ঘোমট করে তুলছে। ভাবনাটা বন্ধ করতেই কেমন সব কিছু হালকা হয়ে উঠলো।
শৈবাল রঙের হোয়াটস অ্যাপের আইকনটিতে অনামিকা আঙুলটাকে ছোঁয়াতেই সায়মা নামটি ভেসে উঠলো। একটা ফেইসবুক লিংক পাঠিয়েছে। শিরোনামে শুধু লেখা ‘গার্ডিয়ান জলবায়ু অঙ্গীকারনামা’। সেই বিকেলবেলা পাঠিয়েছে। তারমানে এই সময়ের মাঝে মোবাইল চেক করা হয়নি। কারো সাথে কথাও বলেনি। এতোটা নিঃসঙ্গতায় কেটে গেছে অর্ধেকটা দিন। নিস্তবদ্ধতা, নির্জনতা আর নিঃসঙ্গতার যে আলাদা অনুভূতি আছে, আলাদা অর্থ আছে সেটা তার চেয়ে কে আর ভালো জানে? সেই অপার্থিব অন্ধকার সময় তাকে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়েছে।
শিরোনামটাতে কয়েক মুহূর্ত অপলক তাকিয়ে রইলো। চোখে একটা ক্রুর হাসির উজ্জ্বলতার আভা খেলতে লাগলো। মানুষ যে এই প্রকৃতির একটা অংশ হয়েও নদী, সমুদ্র, ঘাস, পাতা, অরণ্য, পর্বত, মেঘ, বায়ু, বৃষ্টি সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠছে।
তারেক ভাবলো, ‘অবিনশ্বর জগতের কোন নরক নিয়ে ভয়ের কোন ভিত্তি নাই। যখন এই নশ্বর জগতে নিজেদের পছন্দ মতো একটা নরক বানাতে সবাই ব্যস্ত? জাহান্নামের পূর্বরাগ তো এই দুনিয়ায় আমরা খেলে যাচ্ছি।’
ভাবনাটা এর পরে আর এগোতে পারলো না। বধ্যভূমিতে মানুষের শরীরের পঁচা হাড় মাংসের সাথে লেপ্টে থাকা গা গোলানো দুর্গন্ধ তারেকের নাকের উপত্যকায় এসে একটা ঘূর্ণিবায়ু তৈরি করলো। শ্বাসটা প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম হলো। তারেক আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। এক দৌড়ে ওয়াশ রুমে চলে গেলো। কোন কিছু না ভেবেই শাওয়ার হেডটা ছেড়ে দিলো। সেকেন্ডের মধ্যে ২.৫ জিপিএম ধারায় পানি তার মাথায় ঝরে পড়তে লাগলো। দুই হাতের কব্জিটা কোমরের দুপাশে শক্ত করে ধরে পেটটাকে এক ইঞ্চি ভেতরে দিকে ঢুকিয়ে দিলো আর বুকটা সমান অনুপাতে সামনের দিকে এগিয়ে আসলো। একইভাবে ধড়টাকে সামান্য সামনের দিকে বাঁকা করতেই মাথাটা পিছনের দিকে নেমে যেতেই একটা ধনুকের আকৃতি নিলো।
মুখটা ঠিক জলের ধারার বরাবর স্থাপিত হলো। ওষ্ঠ দুটি পদ্মপত্রের মতো আস্তে আস্তে মেলে ধরতেই জলের ধারা কিছু মুখে ঢুকে গেলো। কিছু জলকনা নাক দিয়ে ঢুকতেই যেন শরীরটা জেগে উঠলো।
এই পদ্ধতিটা তারেকের নিজেরই আবিষ্কার। যখনই বাতাস ভারী হয়ে উঠে। গুমট লাগে। গা গুলিয়ে উঠে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কোন কিছুতেই স্বাভাবিক হয় না। তারেক জলের কাছে চলে আসে। বাতাস যখন অফুরন্ত অক্সিজেন ফিরিয়ে নেয়। তখন জলের কাছে না এসে উপায় থাকে না।
মনে মনে সায়মার প্রতি ভীষণ রাগ হচ্ছিল। ও ভালো করেই জানে এমন একটা সংবাদের শিরোনাম দেখে তারেকের মাথায় কি ভাবনা আসতে পারে। মনের মধ্যে কি অনুভূতি কাজ করতে পারে। তবুও কেন? ওকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরানোর জন্য হতে পারে এটা একটা অন্ধের পদক্ষেপের মতো।
সায়মা, তারেকের ছোট বোন। চার বছর নয় মাসের ছোট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের মাস্টার্সে পড়ছে। স্নাতক শেষ করার পরপর একটা এনজিওতে তিনমাসের ইন্টার্ন করেছিল। কাজ করতে গিয়ে উদ্বাস্তু নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের সাথে জাতিগত রাজনীতির সংযোগ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তারপর মাস্টার্সের থিসিস করার সময় বিভাগীয় একটা ফান্ডের সাথে বাংলাদেশ সোশ্যালিস্ট ব্যাংকের স্পন্সর পাওয়াতে আড়াই মাসের জন্য কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে গবেষণায় ব্যস্ত আছে। যে পরিমাণ অর্থ পেয়েছে তাতে করে দিব্যি একটা মানসম্মত হোটেল বা রিসোর্টে থাকতে পারতো। কিন্তু ওর বান্ধবী সুবর্ণলতা চাকমার বাড়ি রোহিঙ্গা শিবিরের কাছাকাছি থাকায় সুবর্ণলতার বাবার জোরাজুরিতে অগত্যা সেখানেই উঠেছে।
সায়মা সহিংসতার শিকার দুঃস্থ নারীদের জীবন বৃত্তান্ত শুনতে গিয়ে অবসাদ ভরা হৃদয়ে বাজতে থাকা ভাঙ্গা সুর শুনে যাচ্ছে। তীরে আছড়ে পরা নোনাজলে ঢেউয়ের গর্জন শুনতে গিয়ে জমে থাকা পাথরের হোঁচট খাওয়া পায়ের রক্ত-ছাপ দেখে যাচ্ছে। থেকে থেকে উঁচু নিচু পাহাড়ের গায়ে গায়ে দিনকে দিন এই ছাপ আরো ঘন হচ্ছে। সায়মাকে জানানো হয়নি যে ডাক্তার শুভাশিসের সাথে শেষ অ্যাপয়েন্টম্যান্টটা ক্যানসেল হয়েছে। তারেক রিপ্লাইয়ে চাপ দিয়ে লিখতে থাকলো:
ডাক্তার কিছু প্রাণায়াম করতে দিয়েছে।
যোগচর্চা নাকি শরীরে রুদ্ধশ্বাসকে মুক্ত করে।
অনেকটা বাতাস দিয়ে বাতাস কাটার মতো।
আজকে খুব সমস্যা হচ্ছিল। তাই কপালভাতি প্রাণায়াম করেছি।
সকালে ভ্রামরী প্রণায়াম করবো।
এখন আবার প্রশ্ন করিস না কপালভাতি কিভাবে করে? ভ্রামরী কি?
ফিরে আয়।
নিজ চোক্ষে দেখতে পারবি।
এই কথাগুলো পরপর লিখে একটু থামলো। সায়মার পাঠানো ফেইসবুক লিঙ্কটা পড়ার পর কেমন পরিস্থিতি হলো লিখবে ভাবলো। কিন্তু ব্যাপারটা সায়মাকে অনুতাপ ফেলে দিতে পারে ভেবে আর লিখলো না। দেখা হলে বুঝিয়ে বলবে ডাক্তার কি কি বলেছে। তারেকের ঘ্রাণ আর শ্বাস সম্পর্কিত সমস্যা যে এই ভাবনাগুলো ঘিরে তৈরি হয়, জানাবে সেসব খুঁটিনাটি। হোয়াটস অ্যাপে জানালে আতঙ্কিত হয়ে যেতে পারে। শুধু লিখলো,
‘কবে ফিরবি?’
|| দুই ||
‘আমি জানি কোন রোগের জন্য কি ঔষধ দিতে হয়’, ডা. শুভাশিস কথাটা বলে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে রইলেন। পরের কথাটা কি বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না মনে হলো। ক্লাসে পড়া মুখস্ত বলতে গিয়ে ভুলে গেলে মুহূর্তের জন্যে মনে হয় শব্দহীনতায় ডুবে রইলো ঘরটা।
তারপর আবার বললেন, ‘কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে ঔষধ কি ভাবে কাজ করবে তা আমাকে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে।’
‘আপনাকে যারা জানে এবং যারা জানে না সবাই যেন একই সমতলে দাঁড়িয়ে আছি।’
‘বিষয়টা নিয়ে ভাবলে আমি নিজেও একটা চরম অস্বস্তি বোধ করি।’
‘মাঝে মাঝে মনে হয় আমি নিজেও আপনার অভিজ্ঞতার অংশ।’
‘ঠিক শব্দ দিয়ে বোঝানো কঠিন।’
বাক্যগুলো একটানে বলে ফেলে তারপর থামলেন।
ডাক্তার শুভাশিস যখন কথাগুলো বলছিল তারেক তখন চুপ করে শুনে যাচ্ছিল। কথাগুলো আলাদা করে কোন অভিঘাত সৃষ্টি করছিল না। কান দুটো শব্দের দিকে খাড়া করা থাকলেও চোখ দুটো তারেকের মুখোমুখি খোলা জানালার দিকে তাক করা ছিল।
ডাক্তার শুভাশিসের ধানমন্ডির ২৭ নম্বর রোডের এই বিল্ডিংয়ের ১২ তলায় অবস্থিত চেম্বার ঘরটার উত্তর দিকের দেওয়ালের দুই তৃতীয়াংশ জুড়ে একটা জানালা কাটা আছে। কোন গ্রিল লাগানো নেই। স্লাইডিং গ্লাসটা এমন করে লাগানো যে পুরো কাচটা স্লাইড করে সরিয়ে রাখা যায়। কোন পর্দা লাগানো নেই। ফলে পুরাটাই খোলা। অপর দিকে আকাশ ছোঁয়া কোন দালান না থাকায় আকাশের সব শূন্যতা যেন জানালার কাছে এসে ভীড় করেছে।
বিকেলের পড়ন্ত পানসে কমলা রোদে প্রবাল সাদা মেঘগুলোকে খুব কাছের মনে হচ্ছে। দূরে চন্দ্রিমা উদ্যানের সারি সারি আকাশমণি, মেহগনি, কড়ই, কৃষ্ণচূড়া, হরিতকী আর উঁচু উঁচু নিম গাছের পাতার ঘন বিন্যাস এক অপরূপ চিত্র তৈরি করেছে। পাখির চোখে আমাজান বনের মিনিয়েচারের মতো লাগছিল। মাঝখানে থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়ার লাল লাল ফুলের উঁকিঝুঁকি আর একপাশে সংসদভবনের অষ্টাভূজি ব্লকের ত্রিকোণী ও বৃত্তাকার নকশাগুলো যেন অলক্ষ্যে ঘোষণা দিল:
‘না, এই শহর তোমার শহর, ঢাকা শহর!’
এমন আবেশ করা নির্লিপ্ততা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে তারেক তার চোখ দুটোকে বন্ধ করে ফেললো। চোখের পাতা দুটিতে এমন জোরে চাপ দিলো যে আই ব্রো ও আই ল্যাশ একটা আনুভূমিক রেখা বরাবর ঘেষে রইলো।
‘কি ঘটেছিল? আপনি যখন নিখোঁজ হয়ে গেলেন। উদ্ধার কর্মীরা যখন আপনাকে খুঁজে পেলো। এই মধ্যবর্তী সময়ে কি ঘটেছিল?’, ডাক্তার শুভাশিস তার শব্দ উচ্চারণে কোন রকম অযাচিত ঔৎসুক্যের ইঙ্গিত না রেখেই জিজ্ঞেস করলো। এই বারের সেমিনারে রোগীর সাথে চিকিৎসকের আত্মিক যোগ তৈরির ব্যাপারে যে প্রবন্ধটা পড়েছে সেটার আইডিয়া তারেকের সাথে কথা বলার সময়ই মাথায় এসেছে। প্রশ্ন-উত্তর পর্বে শ্রোতাদের প্রবল আগ্রহ শুভাশিসকে একটা আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছে। তখনই ভেবে ফেলেছে এই বিষয়টা নিয়ে আরো বৃহৎ পরিসরে লিখতে হবে।
তারেকের ব্যাপারটা এতোটা স্পর্শকাতর যে শুভাশিসের করা ‘কি ঘটেছিল?’ প্রশ্নটি বুমেরাং হয়ে শুভাশিসকেই যেন আঘাত করলো। তারপরের বাক্যটি, ‘আপনি যখন নিখোঁজ হয়ে গেলেন’ যেন শুভাশিসের মুখ থেকে তারেকের কান পর্যন্ত না গিয়ে টেবিল গড়িয়ে মেঝেতে নেমে হামাগুড়ি দিতে দিতে দরজার দিকে অগ্রসর হলো। ভাগ্য ভালো দরজা খোলা ছিল না। অগত্যা প্রশ্নটা তারেকের কানের দিকে ফিরে আসলো।
তারেক দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাক হয়েই বসে ছিল। কি বলবে? কোথা থেকে শুরু করবে? ভেবে না পেয়ে টেবিল থেকে পানির বোতলটা নিলো। ক্যাপটা খুলে এক ঢোকে পানিটা খেতে লাগলো। এক নিঃশ্বাসে খাওয়া ফলে কিছুটা পানি ঠোঁটের কোণ উপচে গলা দিয়ে নামতে গিয়ে অ্যাপল কর্ডে আটকে রইলো। গড়িয়ে পড়বে কি পড়বে না এই দোলাচলে আটকে রইলো। তরঙ্গহীন জলের ফোঁটাটা যেন ধ্যানমগ্নতায় আটকে গেলো। গড়িয়ে মেঝেতে পড়া মানে এর অস্তিত্ব লীন হয়ে যাওয়া। আটকে থাকা মানে জলের আত্ম-প্রকৃতিকে অস্বীকার করা। জলের ধর্মই বয়ে যাওয়া। তাই ধ্যান ভেঙ্গে জলের ফোঁটাটা পতিত হলো।
পানি পান শেষে তারেক বোতলটা টেবিলে না রেখে হাতের মুঠোয় শক্ত করে আকড়ে রাখলো।
শুভাশিস বুঝতে চেষ্টা করলো তারেকের মনে কি ঘটছে। গত দুই সেশনে এই ব্যাপারটা এখনো ধরতে পারে নাই। এমনটা ওর পেশা জীবনে এই প্রথম। সেটা সে সহজে মেনেও নিয়েছে। না মেনে কোন গতিও তো নেই। এমন ব্যাকগ্রাউন্ডের রোগী খুব কম চিকিৎসকের জীবনেই আসে। কে আর একটা জীবনকে ভেতর থেকে জানার সুযোগ পায়? মানুষ নিজেই তো জানে কি কি ঘটে যায় তার নিজের জীবনে।
গলার স্বরে একটা প্রচ্ছন্ন শ্লেষ রেখে তারেক বললো, ‘যখন আমরা অচেতনের পাতলা শৈবাল মতো সারফেইসে থাকি তখন আমাদের সংবেদনকে কি হুবহু মনে করতে পারি?’
প্রশ্নটা শুনে শুভাশিসের মনে পুলক জেগে উঠলো। মানুষের এই অলীক অবস্থা যে এখন জগতের একাডেমিগুলোতে চিন্তার খোরাক যোগাচ্ছে তার একটা বাস্তবভিত্তি যেন তারেকের এই প্রশ্ন।
‘কোন গ্রন্থ থেকে নয় নিজের জীবন থেকেই জানি মানুষের কত শত অনুভূতি আছে যা এখনো আবিষ্কার করা হয়নি। অসংখ্য আবেগ আছে যাকে পরিমার্জন করতে হবে।’ তারেক এক প্রশ্বাস সমান সময় থেমে আবার বলতে লাগলো, ‘মানব সহিংসতার যে রূঢ় অভিজ্ঞতা আমার হলো তা আপনার কাছে যেমন পুরোটা অজানা। তার কিছুটা আমার স্মৃতিই জায়গা দেয় নাই। মনের গহীন কোথাও হয়তো জমে আছে অথবা মহাবিশ্বের অসীমতায় আশ্রয় নিয়েছে। সব মনে রাখা হয়তো আমার প্রশান্ত জীবন যাপনের জন্য একটা হুমকি।’
‘কিছু স্মৃতি আমাদের চেতনা থেকে এমন ভাবে পালিয়ে যায় বা লুকিয়ে থাকে, যেন কখনো ঘটেইনি,’ কথাটা শেষ করে তারেক একটা লম্বা শ্বাস নিলো।
শুভাশিস কেমন থ মেরে গেলো। তারেক ও শুভাশিসের মাঝে রাখা পানির গ্লাসের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তারেকের উচ্চারিত প্রতিটা শব্দ যেন বর্শার তীক্ষ্ণ ফলকের মতো শুভাশিসের মগজে এসে বিঁধল। ফলকটি করোটির অলিগলিতে ছুটতেই থাকলো। যতোক্ষণ না তারেক বললো, ‘তার চেয়ে ভালো আমাকে একটু সময় দিন। আমি বরং লিখে দেই।’
‘আমরা যখন কথা বলি তার মাঝে এমন কিছু কথা থাকে যা আমরা বলতে চাই না। বলে ফেলি। এমন কিছু কথা থাকে যা বলার জন্য সঠিক শব্দ খুঁজি। ঠিক সময়ের অপেক্ষায় থাকি। এই যথাযথ সময় ও শব্দের অভাবে অনেক কথা না বলা থেকে যায়। তবে...,’ পরের বাক্যটি বলার শুরুতেই তারেক লেদারে জমা থাকা পানির দুর্গন্ধ পেলো। তাই একমুহূর্ত ভাবার অবকাশ নিয়ে বললো, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন শুভাশিস দা। আমার শুদ্ধ চিন্তার বিশুদ্ধ শব্দের উপস্থিতির সাথে পাঁকে-ভরা দুর্গন্ধের সংযোগ আছে।’
শুভাশিস কিছুটা নড়ে চড়ে বসে বললো, ‘তাই নাকি, অনুমান তাহলে মিলে গেলো।’
এতোদিন শুভাশিস শুধু এই রকম শুনে এসেছে। বেশিরভাগই অনুমানের স্তর অতিক্রম করতে পারেনি। আজ তাহলে একটা ক্লু পাওয়া গেলো।
কিছুটা আশ্বস্তের সুরে বললো, ‘একটা মারাত্মক খবর দিলেন। আপনার সমস্যা কিছুটা কমে আসার সাথে সাথে আমি এর একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও দাড় করার একটা পথ দেখতে পাচ্ছি।’
তারেক কৃতজ্ঞতা মেশানো একটা হাসি দিয়ে বললো, ‘আমারও ভালো লাগবে। যদি সত্যি কোন পথ্য আবিষ্কার করতে পারেন।’
বোতলের ক্যাপটা খুলে তলানিতে জমে থাকা শেষ জলটুকু এক ঢোকে খেয়ে নিলো। তারপর বললো, ‘জানি না, যতদিন বেঁচে আছি কারো কোন কাজে আসবো কিনা?’
‘যদি এই বিষয়ে কোন কাজে আসতে পারি তাহলে বেঁচে থাকাটা সার্থক মনে হবে।’
‘অবশ্যই, অবশ্যই। আপনার যখন ভালো লাগে লিখুন। বলার চেয়ে লেখার সময় মানুষের চিন্তা গুছিয়ে প্রকাশিত হয়। কিংবা ভুল কথা বা অসত্য কথা বললেও তা ঠিক করার সময় পাওয়া যায়।’
‘ঠিক আছে, আপনি লিখুন। যতোদিন লাগে নিন। যখন দেখাতে হচ্ছে হয় আমাকে ইমেইলে পাঠিয়ে দিন। অথবা সরাসরি চলে আসুন।’
কথাটা শেষ করে শুভাশিস ডান হাতে ড্রয়ার খুলে কালো চামড়া দিয়ে বাধাই করা একটা নোটবুক আর একটা বলপয়েন্ট কলম বের করে তারেকের সামনে রাখলো। উপরে প্রাগ রাস্টিক জার্নাল কথাটা বোল্ড করে লিখা। বুঝা যাচ্ছে প্রাগের ভাচলাভ হাভেল বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের ডিউটি ফ্রি শপ থেকে কিনে এনেছেন।
শুভাশিস বললো, ‘নোটবুকটা রাখেন। এখানে লিখবেন। আমার কাছে আরো দুটো আছে। কাজে লাগবো ভেবে কিনেছিলাম। আপনাকে দিয়েই শুরু করি।’
‘না থাক। আমি কাগজে কলমে লেখা ছেড়ে দিয়েছি। মুখের কথা তো তাও ভুলে থাকা যায় কিন্তু কলমের লেখা সহজে মুছে ফেলা যায় না। আমি স্ক্রিনে লিখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। ভালো না লাগলে মুহূর্তে ডিলিট করা যায়। জগতের কোথাও এর ভাবনা বা কথার কোন চিহ্ন থাকবে না। আরাম লাগে এই ভাবে লিখতে।’ কথাগুলো শেষ করে তারেক আবার জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো। বাইরে চন্দিমা উদ্যানের সবুজ পাতাগুলো আস্তে আস্তে কালো হয়ে উঠছে। ঠিক এই রকম একটা দৃশ্য ইদানিং প্রায়ই তারেকের স্বপ্নে এসে হাজির হয়। ক্ষণকালের জন্য এটাও মনে হলো। তারেক যেন এর আগেও কয়েকবার ঠিক এই জায়গাটায় বসে ঠিক এই দৃশ্যটাই দেখেছে। সন্ধ্যা নামার আগে আগে একটা আবছা ছাই রংয়া আধার এসে দিনে আলোকে ছেয়ে ফেলছে। কিংবা দিনের আলো ক্রমে সন্ধ্যার আবছায়াতে ঢুকে যাচ্ছে।
শুভাশিস চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ডানহাতের সবগুলো আঙুলের মাথা ধনুকের মতো সামান্য নামিয়ে ইশারা করে অপেক্ষা করতে বললো। কিছুক্ষণ পর হাতে একটা বাক্স এনে তারেকের হাতের কাছে রাখলো। তারেক দেখলো বাক্সের উপর গাঢ় কালিতে খোদাই করে লেখা ব্রাজিলি রিও কফি।
তারেক সামান্য শব্দ করে হেসে বললো, ‘আসলে, আমি… আমি কফি পানে অভ্যস্ত নই।’
‘এটা কয়েকদিন ট্রাই করে দেখেন। গরম ধোঁয়ায় হেজেলনাট আর চকোলেটের সুঘ্রাণে পুরো ঘর মৌ মৌ করবে। না খেলেও ঘ্রাণ নিয়েই শোধ করে দিবেন। খেলে অবশ্য সামান্য অ্যাসিডিটি হবে। তবে এতো ভালো জিনিস খেয়ে একটু কষ্ট মেনে নিবেন আর কি।’ বলে শুভাশিস সবগুলো দাঁত বের করে ফিক করে হেসে বাম হাতে তারেকের কাধে হালকা চাপড় দিলো।
তারেক আর অমত না করে উঠে দাড়িয়ে বললো, ‘ঠিক আছে, আজ তবে যাই।’
‘ঠিক আছে,’ শুভাশিস বুকের কাছে দুহাতের তালু জোড়া করে বললো, ‘আবার আসবেন।’
|| তিন ||
ডাক্তার শুভাশিসকে কথা দিয়েছিলাম। আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সেই সব বিবাদের রাতের ঘটনাগুলো লিখে তাকে পাঠাবো। পাক্কা দুই রাত কেটে গেলো। একটা শব্দও লেখা হলো না। আজ রাতে যে করেই হোক লেখাটা শুরু করতে হবে। না, এখনই শুরু করতে হবে। কিবোর্ডের পাশেই ডাক্তার শুভাশিসের দেয়া নোটবুকটা পড়ে আছে। কাগজে কলমে লিখতে পারলে সত্যি খুব ভালো হতো। কিন্তু মনের উপর আর চাপ না দিয়ে শেষ পর্যন্ত ওয়ার্ড ফাইলে লেখা শুরু করলাম।
প্রথম যে শব্দটা আমি শুনতে পাই তা আমার নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। চেতনা ফিরে পাওয়ার অনেকক্ষণ পর চোখটা খোলার চেষ্টা করলাম। বাম চোখটাকে শক্ত করে কুচকে ফেললাম। ডান চোখের পাতাকে জোড়ে ভ্রু দিকে টান টান করে রাখলাম। কি একটা শক্ত শুকনো আঠা দিয়ে পুরো চোখটা আটকে আছে। এবার ডান চোয়ালের মাংস পেশী লিভার হিসাবে উপরের দিকে চেপে দিতেই আঠাটা সরে গেলো। চারপাশটা অন্ধকারে জমাট বেঁধে আছে। কোথায় আছি একদমই বোঝা যাচ্ছে না। অনেক সময় ধরে এমন নিথর হয়ে পড়ে রইলাম। একটা বিড়ালের মিয়াওঁ মিউঁ কান্নার প্রতিধ্বনি উচু কোথাও থেকে নিচের দিকে নেমে আমাকে লক্ষ্য করে আসতে আসতে মাঝপথে হঠাৎ মিলিয়ে যাচ্ছে। প্রতিধ্বনি এমন মাঝ পথে থেমে উল্টো পথে তার উৎসের কাছে ফিরে যাওয়া থেকে বুঝতে পারছি আমি ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেকটা নিচে কোথাও আছি।
এমন ভাবনা ভাবতে ভাবতেই মনে হলো কিছু একটার ভর আমার দিকে নেমে আসছে। যাই পড়ছে তার গতিমুখ আমাকেই লক্ষ্য করে আসছে। মনে হচ্ছে যা পড়ছে শুধু কি সেই বস্তুই আমার দিকে ছুটে আসছে না কি আমিও সমানভাবে তার দিকে ছুটে যাচ্ছি। যেমন করে আমি জানি না অন্ধকার কি আলোর দিকে ছুটে আসে? নাকি আলোও অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যায়? দুনিয়ার সবকিছুই কি সবকিছুকে আকর্ষিত করে? বস্তুটি যতোই কাছাকাছি আসছে বুঝতে পারছি এটা আমার হাত, পা, বুক, পেট বা অন্য কোথাও পড়বে না। একেবারে আমার ঠোঁটের উপর পড়বে। ভাবনাটা শেষ না হতেই ঠোঁটের উপর শুকনো পাতার আলতো স্পর্শ অনুভব করলাম। যে পাতাটা পড়েছে তার থেকে আমার ঠোঁট দুটো একটু বেশিই ভেজা। ঠোঁটের যে জায়গাটাতে পাতা ছুঁয়ে আছে সেই অংশটুকু ক্রমে শুকোতে লাগলো। বুঝতে বাকি রইলো না পাতার শুকনো অংশ ঠোঁট থেকে কিছুটা তরল শুষে নিচ্ছে। একদিকে ঠোঁট হালকা হচ্ছে, অপর দিকে পাতা ভারী হচ্ছে।
পাতার বোঁটার অগ্রভাগ আমার নাকের ছিদ্র ছুঁয়ে ছিল। শুকনো পাতার তামাটে গন্ধ নাকের গহ্বরে একটা ঝাঁঝালো স্বাদ তৈরি করলো। মনে হলো এই ঝাঁঝে পোড়া রক্তের সাথে পুঁতি গন্ধময় মাংসের ঘ্রাণের বাধা অতিক্রম করতে চাচ্ছে। না পেরে নিজেই আরো তীব্রতা নিয়ে ঘূর্ণি তৈরি করছে। বুঝতে পারলাম নাকের ভেতরের ক্ষত পচে এক পাক তৈরি হয়েছে। এই গন্ধ বাইরের কিছুর না আমার নিজের শরীরের।
আমি আবার পুরো চোখ খোলার চেষ্টা করলাম। আলো দেখার জন্য মনের মধ্য একটা উচাটন দেখা দিল। চোখের পাতায় যেন পাথর ভর করেছে। বেশিক্ষণ খোলা রাখা গেলো না। তাই আবার চোখ বুজে ফেললাম। কিছুই যেহেতু দেখা যাচ্ছে না। হয়তো এখন অনেক রাত।
এতো সময় পরে মনে হলো আমার এই সংবেদনগুলো এতো স্পষ্ট কি করে হলো? বাস্তবতা এতোটা ইন্দ্রিয়স্পর্শী কবে হয়ে উঠলো। এতো ডিটেইলসে স্পর্শ আর ঘ্রাণকে বোঝার এতো তীক্ষ্ণতা তো আমার মধ্য কোন কালে ছিল না। এতোক্ষণ হয়ে গেলো তারপরও নিজেকে প্রশ্ন করছি না কেন? আমি এই অবস্থায় এলাম কি করে?
এভাবে চিৎ হয়ে আর পড়ে থাকা যায় না। আমি মাথাটা তুলে ধরতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। হাতের কব্জিটা তুলতে কুনইতে ভর দিলাম। কিন্তু ব্যার্থ হলাম। ডান হাতের তর্জনীটা নড়াতে চাইলাম। এই রকম একটা আঙুল যে আছে টেরই পেলাম না। বাম হাতে তর্জনীটা নড়াতে গিয়ে কনিষ্ঠা আঙুলটা অল্প নড়ে উঠলো। আঙুলটা দিয়ে মাটিতে আচড় কাটতে লাগলাম। নখের ভেতর একটা নুড়ি ঢুকে গিয়ে প্রথম একটা অস্বস্তির অনুভূতি দিলো। কিন্তু মাটিটাকে একটু ভেজা ভেজা আর আঠালো লাগলো।
বাড়ির কথা খুব করে মনে পড়লো। সায়মা নিশ্চয় এতক্ষণে কুমিল্লা থেকে ফিরে এসেছে। দরজা বন্ধ পেয়ে হয়তো বাইরে দাড়িয়ে আছে। হয়তো মনে মনে আমার নামে কতো না আনাপ শানাপ বলে যাচ্ছে। দোষটা আমারই। যাওয়ার আগের দিন রাজু ভাস্কর্যের সামনে কাল ভৈরবের তান্ডব নৃত্য নাট্যের মহড়া ছিল। শেষ স্তবকের মধ্যবর্তী দুটি চরণ সবসময় আমাকে টানে।
জ্ঞানমুক্তি-সাধনং বিচিত্রপুণ্য-বর্ধনম।
শোকমোহ-দৈন্যলোভ-কোপতাপ-নাশনং।
পুরো অষ্টকের এই অংশে শুধু আমার পার্ট ছিল। এই প্রতীকী বিক্ষোভ মহড়ায় ছাত্র সংগঠন আচানক হামলা চালায়। আমরা যখন বিক্ষিপ্ত ভাবে ছুটোছুটি করছি। তখনই মানিব্যাগটা পড়ে যায়। তাতে রাখা ঘরের চাবিটাও হারাতে হয়েছিল। উপায় না দেখে সায়মার চাবিটা রেখে দিয়েছিলাম। তারপর একটা ডুপ্লিকেট চাবি বানিয়ে আনা সুযোগ ছিল। কিন্তু মিটিং মিছিলের ঘোরপ্যাচে করার সময়ই করতে পারিনি। এতোক্ষণ হয়তো একটা কল দিয়েছে। কিন্তু কোন রিংটোন তো বাজলো না। কোন শব্দই তো শুনতে পেলাম না। তার মানে মোবাইলটা আমার সাথে নেই।
কতো সময় পার হলো ঠাহর করা যাচ্ছে না। কতো ঘণ্টা বা কতদিন মাপা যাচ্ছে না। সূর্য কি উঠেনি। যদি রাত হয়ে থাকে তাহলে এতো দীর্ঘ কেন? পৃথিবীর সময় তো এতো ধীরে চলে না। শুনেছি পাহাড়ে সময় নাকি ধীরে চলে। মাটির গভীরে সময় কী আরো ধীরে বহে? ভূগর্ভের বাতাসে কি মাদকতা আছে? আমি কি নেশায় বুদঁ হয়ে আছি? কয়েকবার চোখ দুটো খুলে আবার বন্ধ করে এখন অনেকটা স্বাভাবিক ভাবে খুলে রাখতে পারছি। মনে হচ্ছে আলকাতরা মাখনো একটা মোটা ত্রিপল আমার চোখের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ত্রিপলটা সরিয়ে ফেললে শুধু আলো আর আলো ভরা দুনিয়া দেখা যাবে।
অন্ধকারের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে হাঙরের মতো কামড় বসানো ব্যাথা। আমার হাড়ের উপর যেন চাকুর আচড় বসিয় যাচ্ছে। ক্ষুধা আর তৃষ্ণার তীব্রতা যেন আমার রক্তের শিরা উপশিরার ভেতর ফলা ফলা করে দিচ্ছে। সময় যাচ্ছে আর আমি পাখির পালকের মতো হালকা হয়ে উঠচ্ছি। আমার শরীর যেন সৌরজগতের দিগন্ত ছাড়িয়ে দূরে কোথাও ভেসে যাচ্ছে। আমি কি মারা যাচ্ছি? নাকি আমি আর বেঁচে নেই?
কি করে বুঝবো যে আমি বেঁচে আছি? একবার ডান পাশে ফিরে দেখবো? একবার হাটতে পারলে তো বুঝবো বেঁচে আছি। কিন্তু উঠতে গেলে তো ঘাড়টাকে সোজা করতে হবে। বসতে গেলে কোমরে পুরো শরীরের ভারটাকে রাখতে হবে। আমর ঘাড়টা যে জমাট জলের মতো শক্ত হয়ে আছে। এক ফোঁটা উষ্ণতার রেশ মাত্র নেই।
কি করি এখন। অন্ধকার কেটে আলো আসার সময় পর্যন্ত তো আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। আলো তো একটা সময় আসবেই। কিন্তু কতো সময় পার হলে জানবো আলো আসবে। যদি আলো নাই আসে। তাহলে কি ধরেই নিবো আমি এমন এক জায়গায় আছি যেখানে সূর্যের আলো আসে না। হয়তো বাইরে এখন আলোর বন্যা বয়ে যাচ্ছে। শুধু আলো আসার পথটা বন্ধ করা আছে। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত সময় যদি গোনে গোনে পার করতে পারি তারপরে বা আগে যদি আলো না দেখি তাহলে ধরে নেবো এমন জায়গায় আছি যেখানে আলো আসে না। ভাবতে লাগলাম সেকেন্ডের বিরতি দিয়ে মিনিটে কিভাবে পৌঁছাবে। মিনিট থেকে কি করে ঘন্টার হিসাব রাখবো হিসাব করে ফেললাম।
ষোল হাজার সাতশ ছত্রিশ সেকেন্ড পার করেও এক সুতো পরিমাণ আলোর নিশানা দেখা গেলো না।
|| চার ||
আমরা একটা গাছের নিচে দাড়িয়ে ছিলাম। আমার পিছনে একটা আধ ভাঙ্গা চাঁদের আলো গাছের পাতার ফাঁক গলে কনকলতার মুখের উপর এসে পড়ছিল। তিনটা গাছ পরেই একটা কাঠ গোলাপ গাছের ঝোপ আছে। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে একটা মিষ্টি ঘ্রাণ চারপাশটা আচ্ছন্ন করে ফেলে। একবার এই দিকে আসলে আর ফিরে যেতে মন চায় না। হলুদ সাদা মেশামেশি ফুলে জ্যোৎস্নার আভায় একটা সম্মোহন তৈরি করে রাখে। একবার তাকালে আর চোখ ফেরানো যায় না। ঘাসের উপর পাতার ছায়া গুলো ঝরা পালকের কারুকার্য তৈরি করে রেখেছে। পাতাগুলো যেন পাখির পালক। পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের ফাঁক গলে ঝরে পড়তে পড়তে এক একটা গাছে আটকে আছে। আর মৃদু হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। কনকলতা আজ এক রঙা একটা সুতোর কাজ তোলা সাদা শাড়ি পড়েছে। গতকাল বিকালে কার্জন হলের পুকুরঘাটে বাঁশিওয়ালা চাচার কাছ থেকে কিনেছিলাম। বাশি বাজিয়ে বাজিয়ে পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে শাড়ি বিক্রি করে বলে চাচার আসল নাম ভুলেই গেছে।
আজ শুল্ক পক্ষের ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথি। আজকে দিনে ওর প্রতি আমার প্রেমের অনুভূতি জানিয়েছিলাম। ফেসবুক থেকে নাম না জানা এক কবির একটা কবিতার দুটি লাইনের সাথে আমার দুটি লাইন যোগ করে দিয়েছিলাম। চিরকুটটা আজও সাথে নিয়ে এসেছে ও।
আমার হাতে দিয়ে বললো, ‘আজ আরেকবার পড়ে শোনাও।’
দুবছর আগে দিয়েছিলাম। এ বছর আমি পড়াশোনার পার্ট চুকিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নিবো। পহেলা বৈশাখের পরদিন থেকে মাস্টার্সের সেকেন্ড সেমিস্টার ফাইনাল দিতে বসবো।
কনক আরো একবার বললো, ‘পড়ো, তোমার মুখে শুনতে ভালো লাগে।’
আমি মোবাইলে টর্চলাইট জ্বেলে পড়া শুরু করলাম:
জলের গভীরে যাও তুমি,
নক্ষত্রের দূরে চাও তুমি।
নয়নতারায় খুঁজে দেখো,
কাছাকাছি ডেকে দেখো।
এই তো আমি! এই তো আমি!
আমি কবিতাটা পড়া শেষ করে মোবাইলের আলোটা কনকের মুখের উপর ফেলে বললাম, ‘শেষ লাইনটা তুমি লিখেছো?’
কনক কিছু বললো না। শুধু এক চিলতে হাসি দিয়ে ওর দুই হাতে আমার শার্টের কলারটা ধরে আরো একটু কাছে টেনে নিলো। আমিও নিজেকে ভাবার সময় না দিয়ে আমার ডান হাতটা ওর বা হাতের নিচ দিয়ে মাথার বেণীতে আলতো করে ধরলাম। বা হাতটা ঠিক ওর শিরদাঁড়ার মাঝামাঝিতে রাখলাম। কনকলতাও কেমন আবেগে সিক্ত হয়ে ওর কপাল আমার বুকের একটু উপরে ঠেকালো। এমন অন্তরঙ্গ মুহূর্তে কেন জানি কামোদ্দীপত্ত না হয়ে নিখাঁদ ভালোবাসা থেকে গভীর করে জড়িয়ে রাখলাম।
আমরা তখনও জানতাম না কয়েকটি ছায়া মুখে ক্রর হাসি মাখিয়ে আমাদের থেকে কয়েক পা পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। অনেক আগেই তাদের ছায়াগুলো আমাদের গায়ে এসে চাঁদের আলোকে ঢেকে দিয়েছে। হঠাৎ একটা স্পর্শ আমাদের কাঁধের উপর এসে পড়লো। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম কনক হয়তো হাত রেখেছে। তাই কোন ভ্রুক্ষেপ করিনি। একটা অমসৃণ ভরাট কণ্ঠ যখন আমার নাম ধরে ডাকলে তখন খেয়াল হলো। এতো কনকের গলার স্বর নয়।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম ওরা ছয়জন দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম দুজনকে খুব ভালো মতোই চিনতে পারলাম। আমারই হলের তিনতলার ভিআইপি রুমে থাকে। অন্যদের নানা জায়গায় মাঝে মাঝে দেখেছি কিন্তু সরাসরি পরিচয় নাই। সবাই সরকারি দলের মদদপুষ্ট ছাত্র সংগঠনের প্রথম সারির নেতা। এদের সবার একটাই কাজ। বিরোধী বক্তব্য বা প্রতিবাদী কর্মকাণ্ডের মইয়ের প্রত্যেকটা সিঁড়িকে নিজের হাতের মুঠোয় রাখা। পছন্দ না হলে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া। পছন্দ মতো কোন সিঁড়ি জোড়া তালি দিয়ে লাগিয়ে রাখা। উপরের সাদা দাঁতের পাটি যেমন করে নিচের ঠোঁটকে কামড়ে ধরে রাখে। এই ছাত্র সংঘ তেমনি সবকিছুকে আকড়ে রাখে।
‘তোর সাথে কথা আছে,’ তাদের মধ্যে একজন বললো।
আমার বুঝতে বাকি রইলো না ওরা কোন বিষয় নিয়ে কথা বলবে। ভেতরে ভেতরে খুব সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লে বাইরে একটা শান্ত সৌম্য ভাব বজায় রাখলাম। জানি কি ভয়ানক বিপদে পড়তে যাচ্ছি। তারপরও চেহেরায় কোন ভয়ের ছাপ প্রকাশ করলাম। সাথে কনকলতা আছে। কোন উত্তেজক পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়। মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।
‘না ভাই, এখানে না, জায়গা ঠিক করা আছে। ওখানে চলেন।’ পিছন থেকে আরেকজন বলে উঠলো।
কনকলতা মাঝখান থেকে বলে উঠলো, ‘সিফাত ভাই, যা বলার এখানেই বলেন। না হলে চলেন হলের গেষ্টরুমে গিয়ে কথা বলি।’
আমি চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে কনকের দিকে তাকালাম। দেখতে চাইলাম কনকের চোখে কোন ত্রাসের ছায়া দেখতে পাওয়া যায় কিনা। কনকের চোখের অভিব্যক্তি পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না।
আমি বললাম, ‘কনক, তুমি হলের গেষ্টরুমে গিয়ে বসো। আমি কথা শেষ করে আসতেছি।’
‘না, আমি এখানেই তোমার সাথেই থাকবো,’ কনক কথাটা বলে সিফাত ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আপনাদের অসুবিধা হলে আমি একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি।’
সিফাত তার তর্জনীটা সামান্য উঁচু করে কিছু বলতে উদ্যত হচ্ছে এমন সময় কনক বললো, ‘আপনাদের যতো কথা সব এখানেই বলেন আর আমার সামনেই বলতে...।’
কনক কথা শেষ করার আগেই সিফাতের কথার শ্বাসাঘাত এসে থামিয়ে দিলো।
সিফাত বললো, ‘তোমরা জানো না। তোমাদের কর্মকান্ড পরিস্থিতি কতো ঘোলাটে করে তুলেছে।’
সাথে সাথে আরেকজন চিৎকার করে বলে উঠলো, ‘তোমরা চাইলেও এখন আর এর সমাধান করতে পারবে না। তাই আমরাই এসেছি। চলো। আমাদের সাথে চলো। যেখানে যেতে বলি সেখানে চলো।
‘না’, কনক গলার পঞ্চমস্বরে চেঁচিয়ে বলে উঠলো।
আমি এবার সত্যি সত্যি ভেতর থেকে ভয় পেয়ে গেলাম। এইবার ভয়ের অভিব্যক্তি আর গোপন রাখা যাবে না। চোখের চাহনিতে ভেসে উঠবে ঠিক।
আমি ইতস্তত করে বললাম, ‘আমার মনে হয়...’
আমার মুখ থেকে কথাটা কেড়ে নিয়ে কনক বললো, ‘না, তোমার কিছু মনে করার দরকার নাই। কোন কিছু ভাবতে হবে না।’
সিফাতের পিছনে দাঁড়ানো রুক্ষ চেহেরার একজন বলে উঠলো, ‘শোনেন, আমরা এই ভর সন্ধ্যায় চুড়ই ভাতি খেলতে আসি নাই। আমাদের আরো কাজ আছে। অনেক প্রেসার আছে। আপনারা যেমন আমাদের কথা মানতে চাচ্ছেন না। আমরা আপনাদের কথা শুনতে রাজি না। বলছি চলেন। তো চলেন।’
ছেলেটার কথার সাথে মিলিয়ে অন্যসবাই একসাথে সমস্বরে বলে উঠলো, ‘আমরা শুনবো না, শুনবো না।’
|| পাঁচ ||
কনকলতা চাকমা চারুকলায় পড়ে। শামসুন্নাহার হলের আবাসিক ছাত্রী। ওর আঁকা নান্দনিক গ্রাফিতির জন্য পুরো ক্যাম্পাসে এক নামে সবাই চেনে। এথনিক গ্রাফিতি এঁকে পাহাড়ী জীবন বৈচিত্র্যকে ফুটিয়ে তুলে কনক শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুরের একটা শিল্প প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছিল। যদিও এটা একটা ভার্চুয়াল অংশগ্রহণ ছিল। তবে প্রত্যেকটা জুম মিটিং সেশনে আমি ওর পাশেই বসে ছিলাম। একটা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী থেকে উঠে এসে ওর প্রতিভার যথাযথ মূল্যায়ন হতে দেখে আমার মনে পুলক জেগে উঠতো।
কনক প্রায়ই নিজেকে রেশমি পোকার সাথে তুলনা করতো। যার মুখ সবসময় অন্ধকার থেকে আলোর দিকে মুখ করে থাকে। দিনের আঁধারের মধ্যে মিশে থেকে যে রাতের আলোতে ছড়িয়ে যায়।
কিন্তু সবকিছু চলছিল ঠিকঠাক। বিপত্তি বাধলো তখন যখন কনক একটা মিছিলে সবার প্লেকার্ডে সরকার বিরোধী একটা স্লোগান লিখে দিতে আমার কাছে এসেছিল।
সেদিন আমি জগন্নাথ হলের মন্দির চত্বরে বিনায়কের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বিনায়ক টিউশনি করতে সিদ্ধেশ্বরী গিয়েছে। ফিরতে আরো ঘন্টা খানেক সময় লাগবে। এই ঠা ঠা পড়া রোদে ফুলার রোড দিয়ে বঙ্গবন্ধু হলে আর যেতে ইচ্ছে করছে না। তাই মন্দিরের পাশে গৌতম বুদ্ধের মূর্তির ধার ঘেষে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ কনক পিছন থেকে বলে উঠলো, ‘চলো।’
আমি ঘুরে দাঁড়াতেই কনককে দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম।
‘কি ব্যাপার? এই সময়?’ আমি জানতে চাইলাম।
কনক সবগুলো দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বললো, ‘চানখাঁর পুল থেকে তোমার পছন্দের নান্নার কাচ্চি বিরিয়ানি আনলাম। খাবে চলো। পুকুর পাড়ের নারকেল গাছটার নিচে বসি।’
‘পুকুরের জলের মাঝে স্বরস্বতী মূর্তিটা কেমন ঝিনুক সাদা হলো বলো তো?’
‘চলো, তোমার কাছে একটা মামা বাড়ির আবদার নিয়ে এসেছি। খেতে খেতে শুনবে। চলো।’
খাওয়ার মাঝ পথে কনক বললো, ‘কালকে একটা মিছিল বের হবে। আমার কিছু গ্রাফিতির প্লেকার্ড সবার হাতে হাতে থাকবে। তোমাকে একটা শ্লোগান লিখে দিতে হবে। না করতে পারবে না।’
আমি খাবারটা গিলে এক ঢোক পানি খেয়ে বললাম, ‘কখন লাগবে?’
‘সন্ধ্যার আগে আগে দিলে ভালো হয়। রাতে ছাপতে পাঠাবো। আর কিছু হাতে লিখবো। সময়ের ব্যাপার তো।’ কনক থেমে থেমে কথাগুলো বললো।
‘গ্রাফিতি গুলোর কোন ছবি আছে?’, আমি জানতে চাইলাম।
কনক মোবাইলের ফটো গ্যালারিতে গিয়ে আমাকে হোয়াটস অ্যাপে ছবিগুলো পাঠালো। আমি ছবিগুলো এক এক করে দেখে নিলাম।
আমার দুটো ফেসবুক স্ট্যাটাস আছে যেগুলো এই গ্রাফিতি আর মিছিলের ইস্যুর সাথে যায়। তুমি চাইলে সেখান থেকে যে কোন একটা নিতে পারো। আমি আমার এফবি অ্যাকাউন্টে ঢুকে তারিখটা ফিল্টার করে কনককে পড়তে দিলাম।
কনক পরপর দুইবার পড়ল। একবার মনে মনে। আরেকবার শব্দ করে।
তারপর মুখে হাসির একটা ঝলক দিয়ে বললো, ‘ব্যাস, একেবারে কাঁটায় কাঁটায় মিলে গেছে। এমন কিছু একটাই চাচ্ছিলাম। কিন্তু চার লাইন বড় হয় যায়। প্লেকার্ডে এতো জায়গা হবে না।’
‘ওয়েট, নো টেনশন। আমি দুই লাইন করে দিচ্ছি।’ আমি আশ্বস্ত করে চার লাইনকে দুই লাইন বানিয়ে বললাম, ‘এখন পড়ো।’
তুমি চাইলে শান্তি না চাইলে দ্বন্দ্ব।
আমি চাইলে ভ্রান্তি না চাইলে বন্ধ
কনক পড়ামাত্র বললো, ‘পারফেক্ট!’
কনক কিছুটা গর্জন করে বললো, ‘কাল দেখবা ওইসব মরা গাছের প্যারাসাইট গুলা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়।’
‘আজ রাতে সারা ক্যাম্পাসে কিছু পোস্টার লাগানো হবে। টিএসসি, শহীদ মিনার আর সেন্ট্রাল লাইব্রেরির দেয়ালে কিছু গ্রাফিতি আর তোমার স্লোগানটা আকাঁ হবে।’
‘তোমার কি মাথা খারাপ হইছে?’, আমি হতবাকের মতো কেটে কেটে কথাটা বললাম, ‘ছেলেরা সারারাত টহল দিচ্ছে। সেদিন নাকি সব ডিপার্টমেন্টের সেমিনার রুমে খোঁজ লাগিয়েছে তোমাদের এইসব তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য।’
‘ভেবো না, ফজরের নামাজের আগে আগে ওরা চলে যায়। তখন কাজটা শেষ করতে হবে,’ কনক খুব বাহাদুরের ভঙ্গিতে বললো।
আমি একটা তাচ্ছিল্য আর শঙ্কা থেকে বললাম, ‘তুমি একটা ভুল স্বপ্নে আছো। শেষটা কি হতে পারে তার হিসাব তুমি জানো। তারপরও বুঝতে চাচ্ছো না কেন?’
‘তুমি যখন কোন ভুল স্বপ্নে থাকো তখন তুমি ঠিক বুঝটা বুঝবা কি করে?’, কনক একটা অভিযোগের সুরে একটানে বললো, ‘সরকার আমাদের ভুল স্বপ্নের বোতলে বন্দী করে চাবিটা কার্জন হলের পুকুরে ফেলে দিয়েছে। আমরা চাবি খুজে সময় নষ্ট করতে রাজি না। বরং বোতল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার সংগ্রামে বিভোর আছি।’
‘ঠিক আছে। এই অবেলায় ডেকে ডেকে তোমাদের বিভোরের ঘুম ভাঙ্গানোর ইচ্ছা আমার নেই।’ আমি বললাম।
এই বাক্যটা লিখে শেষ করতে না করতেই হেঁচকি উঠা একটা সোঁদা গন্ধ আমার নাক দিয়ে ঢুকে ফুসফুসে গিয়ে একটা ঘূর্ণি তৈরি করলো। আমার চিন্তার ক্রমবিন্যাস ওয়াশিং মেশিনের জলের মতো আবর্তিত হতে লাগলো।
পরের কথাটা কি লিখবো, কি লিখবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। শুধু মনে হচ্ছে আমার এই ডান হাতের আধা কাটা তর্জনীটা কিবোর্ডের যে যে অক্ষর চেপে ধরে যে যে বাক্য তৈরি করবে তাই সই।
সিফাত বললো, ‘চলো প্রথমে ক্যাফেটেরিয়ার দিকে যাই।’
আমি কনকের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তুমি নাহ হলে চলে যাও। কাল সকালে হাকিম চত্বরে এসো। একসাথে নাস্তা করবো।’
‘না, আমি থাকচ্ছি তোমার সাথে। কথা শেষ হলে রাতে একসাথে খাবো।’ কনক অনেকটা জোর গলায় বললো।
‘তুমি কি বুঝতে পারছে না? নাকি বুঝতে চাচ্ছো না। এতোটা বোকা তুমি নও।’
‘সব বুঝে আমি সব হারাতে চাই না। বোঝার বাইরে কিছু বুঝ আছে। তুমি না করো না। চলো তো।’
আমরা যখন হাঁটছিলাম, কনক তার ডান হাত দিয়ে আমার বা হাত শক্ত করে মুঠো বন্দি করে রেখেছে। আমি একবার ডানে আরেকবার বামে তাকিয়ে দেখলাম সিফাতরা আমাদের তিনপাশে ছড়িয়ে গিয়ে একটা ঘের দিয়ে রেখেছে।
সবাই চুপচাপ হাঁটছি। পায়ে তলে চৈত্রের শুকনো পাতা পিষ্ট হয়ে মচমচে শব্দ করে উঠছে। কয়েক গজ পথ হেটে আসলাম কিন্তু মনে হচ্ছে কয়েক বর্গমাইল হেঁটে ফেলেছি। পায়ের আঙুলগুলো ঘামের জলে সিক্ত হয়ে উঠছে। কনকের হাতের তালুর সাথে ঘর্ষণে আমার হাতের তালু কেমন পিচ্ছিল হয়ে উঠছে।
আমরা যখন হল মিলনায়তনের গেটের দিকে যাচ্ছিলাম, সিফাত আচমকা বললো, ‘তারেক, এখানে না আরো একটু সামনে চলো। ওই ভাঙ্গা মন্দির পেরিয়ে সামনের মাঠটাতে। আমি জানতাম মন্দিরের পাশে যে রাস্তাটা আছে ঐটা বন্ধ। অন্যপাশে একটা নতুন রাস্তা করা হয়েছে। সবাই নতুন রাস্তা ধরেই মাঠে যায়।
এই ভাঙ্গা মন্দিরটা শত বছর পুরোনো। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার আগে থেকেই আছে। কিন্তু ব্যবহার না করতে করতে জীর্ণ শীর্ণ হয়ে আছে। অশীতিপর বটবৃক্ষের ডালাপালার আড়ালে পুরো এলাকা দিনের বেলাতেই অন্ধকার হয়ে থাকে। শুধু ক্যাম্পাস নয় পুরো ঢাকা শহরে এই জায়গাটাই বোধহয় একমাত্র অসূর্যস্পর্শ্যা।
একটু আগে যা অনুমান ছিল। এখন তা নিশ্চিয়তা পেলো। আমরা একটা ঘূর্ণিতে পড়ে গেছি। একটা ফাঁদে পা বাড়িয়েছি। আমার ডানে বায়ে কোন রাস্তা নেই। পিছনের পথ বন্ধ। সামনের ঝোপে যে ফাঁদ পাতা আছে তাকেই ঢাল হিসাবে ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু কনককে নিয়ে কি করবো। তাল মেলাতে না পারলে যে দুজনেরই বিপদ। যেখানে বিপদই একমাত্র পথ। সেই পথকে আলিঙ্গন না করে কোন উপায় নেই।
আমার বাম হাতে আচমকা একটা হেঁচকা টান খেয়ে পাশ ফিরতেই দেখলাম ওদের মধ্যে দুজন কনকলতার মুখ চেপে ধরে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নিলো। আমি ক্রোধে একটা শব্দ উচ্চারণ করার আগেই আমার মাথায় একটা লোহার আঘাত পড়লো। মুহূর্তের জন্য কনকের আর্তচিৎকারের ছবিটা ফ্রিজ হতে দেখলাম। চোখের সামনে আঁধারটা আস্তে আস্তে সাদা হতে হতে মিলিয়ে গেলো।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন