প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় ‘আরব আলীর ডুবসাঁতার’
লেখক পরিচিতি || প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরী
গল্পকার ও লেখক। জন্ম ১২ মে ১৯৮৬ সালে, সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগরে। পড়াশোনা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। নিয়মিত লিখছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। এখনো পর্যন্ত তার কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। কথাসাহিত্য তার প্রিয় বিষয়। বর্তমানে বসবাস করেন সিলেটে।
আরব আলীর ডুবসাঁতার || গল্পের সারাংশ
টাংঙ্গুয়ার হাওড়ের জলে-জঙ্গলে বেড়ে ওঠা এক চৌকষ মাছ ও পাখি শিকারীর জীবন সংগ্রামের গল্প ‘আরব আলীর ডুবসাঁতার’। তার যাপিত জীবনে মিশে আছে আদি লোকগাথা ও কিংবদন্তীর সুর। এই গল্পে যাদু-বাস্তবতার নিপুণ ছোঁয়ায় ফুটে উঠেছে পরিযায়ী পাখি, পৌরাণিক কাছিম থেকে শুরু করে লোকজ সাপলুডু খেলার চক্রে সীমান্ত জীবনের অদম্য বাস্তবতা।
‘আরব আলীর ডুবসাঁতার’ গল্পের চুম্বক অংশ
যাত্রাদলের কয়েকজন বাঁশে করে ঝুলিয়ে নিয়ে যায় কাছিমটারে। কিভাবে কৌশলে দাম চাইতে হবে কানে কানে বলে দিল মুতালিব চাচা। সেসব বুঝে নিয়ে আরব আলী তাদের সাথে যায়। ‘হেইয়ো হেইয়ো’ বলে অন্ধকার রাস্তা হাঁটে যাত্রাগানের দল। হাঁটার তালে বাঁশের মটমট শব্দ হয়। তাদের পিছে কিছুটা তফাতে হাঁটে আরব। সে প্রথমে ভাবে এটা বুড়া বাঁশের শব্দ, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় বাঁশের দোষে নয়, শব্দটার আসল কারণ হল কাছিমের ওজন। আর তা মনে হতেই যাত্রাদলের একেবারে কাছে ঘেঁষে হাঁটতে শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতে বাঁশের শব্দ শুনে কাছিমের ওজন অনুমান করার চেষ্টা করে এবং ওজনের সাথে দামের সামঞ্জস্য ঘটানোর জন্য মনে মনে আরও কিছু হিসাব নিকাশ করে নেয়। মাঠের একপাশে যাত্রাদলের বসবাস ও রিহার্সালের ঘর, অন্য পাশে যাত্রার প্যান্ডেল। যত কাছে যায় হ্যাজাক বাতির জ্বলজ্বলে আলো ততোই আরব আলীর চোখে মুখে লেপ্টে যেতে থাকে। টাংগুয়ার মাছশিকারীদের নিভু নিভু বাতির তুলনায় এ বাতি কয় গুণ বেশি আলো দেয় একবার মনে হল এ হিসাবটাও করে নেয়, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, আগের কাছিমটার একটা ব্যবস্থা হোউক পরে এইসব কুঁটিনাঁটি হিসাব করা যাইব নে। মুছলমানের ছেড়ায় কাছিম শিকার কইরা বিপদে পড়ছে, ছেঁড়ারে ভিতরে লইয়া যা, ভাত খাওয়াইয়া আমরার রিহার্সেল দেখা, দরদাম যা করার সকালে করমুনে। কথাবার্তার ধরন দেখে আরব আলী বুঝতে পারে এই লোকই যাত্রাদলের ম্যানেজার। ভাবখানা এমন যে কথা কওয়ার সময় নাই, কালকেই যাত্রা শুরু, ঠিকঠাক মতো রিহার্সেল না হলে বিপদ হইয়া যাইব। লোকটা দ্রুত চলে যায়, আরব আলী কিছু না বলে কাছিম দেখতে আসাদের ভীড়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
এতো বড় কাছিম দেখে যাত্রাদলের একেকজন একেক ধরনের কথা বলে। সেইসব কথা শুনতে আরবের মজা লাগে। একটা মেয়ে এসে তারে ভাত খাওয়ার কথা বলে, সে হ্যাঁ-না কিছুই না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মেয়েটা হাসতে হাসতে ‘বেভূতা মানুষ’ বলে হাত ধরে টেনে নিয়ে ঘরে বসায়। ঘর মানে চারিদিকে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাত লম্বা নতুন টিনের বেড়া, মাটিতে বিছানো খড়ের উপর পাতা পাতলা চাদর। দলের সবাই সারিবদ্ধ হয়ে ঘুমায়। কয়েকটা দিন মাত্র, এর বেশি দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না বলে ঘরের নতুন টিনগুলো হ্যাজাকের আলোয় চিকচিক করে। পাছায় সরু খড়ের গুতা লাগলেও বসে থাকতে ভালই লাগছে আরব আলীর। কিন্তু মেয়েটার মতিগতি বুঝতে পারছে না সে। সেই যে এনে বসিয়েছে, এরপর আর কোনো কথা নাই। সে চেয়ে চেয়ে দেখল মেয়েটা গামছা দিয়ে চোখমুখ ডলে নিল, চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াল, একটা ট্রাংক থেকে কিছু টাকা বের করে ব্লাউজের ভেতর গুজে দিল, এরপর ‘আও সাপলুডু খেলাই’, বলে হাতে একটা লুডু নিয়ে সামনে এসে বসল। টেকা তাইলে এই ছেড়ির কাছেই থাকে, আরব আলী ভাবে, ম্যানেজারের অপেক্ষা না কইরা এই ছেড়ির কাছ থাইকা টেকা চাইয়া লইয়া গেলেই তো সুবিধা হয়। তোমার পাঠ নাই? কথা কয়টা বলার সুযোগে এই প্রথম সে মেয়েটার মুখের দিকে ভাল করে তাকায়। মনে হল গ্রামের কার চেহারার সাথে যেন মেয়েটার আদলের মিল আছে, কার যেন? কার যেন?—আরব আলী ভেবে পায় না। আগেরটায় অভিনয় ভালা হইছে না দেইখা এইডায় ছোডো পাঠ দিছে, আমিও বাঁচছি, আর ভাল লাগে না। লুডোর গুটি সাজায় মেয়েটা, ছোট বড় সাপের মধ্যে ছড়ানো গুটিগুলোরে চান্দা মাছের মতন লাগে আরব আলীর। কাছিমডারে কি আইজ রাইতেই কাটব? কাছিমের আলাপ জিইয়ে রেখে সে টাকার কাছে পৌঁছাতে চায়, একবার আড়চোখে মেয়েটার বুকের দিকে তাকিয়ে দেখেছে গুজে রাখা টাকাগুলা দেখা যায় কিনা। টাকার গভীরে যেতে হলে তো কাছিমের আলাপ তুলেই যেতে হবে। কিন্তু মেয়েটা বিরক্ত হয়, তুমি না মুছলমানের ছেড়া, অতো কাছিম কাছিম করতাছো কেরে?
বিচারকের মন্তব্য
জীবনে আশ্চর্যের স্বাদ নিতে সবসময় গদ্য বা পদ্যের দিকে হাত না বাড়ালেও হয়। কেননা, কোনো কোনো মানুষের জীবনেই বাস্তবতার অঙ্গে অঙ্গে আশ্চর্যরাজি সানন্দে এসে ধরা দেয়। আরব আলীর ডুবসাঁতার-এর অনিন্দ্য সহজিয়া গদ্য পড়লে বোঝা যায়, জীবনের সকল যাদুময়তা কেবল মনগড়া কল্পনা নয়; বরং তা অনেক ক্ষেত্রে এক অনিবার্য বাস্তবতা। আমরা শুধু যথেষ্ট কাছ থেকে দেখি না, অথবা গভীরভাবে জানার চেষ্টা করি না।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন