বড়দের জন্যও কিছু ভৌতিক গল্প থাকা উচিত: সালেহা ফেরদৌস
‘নতুন গল্পের সন্ধানে’ শিরোনামে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক জার্নাল প্রতিধ্বনি আয়োজিত প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। বিগত ৩০ অক্টোবর ২০২৫-এ প্রকাশিত ১০টি দীর্ঘ তালিকার গল্প থেকে বিচারকমণ্ডলী সংক্ষিপ্ত তালিকার জন্য ৫টি গল্প বাছাই করেছেন। প্রতিধ্বনি এবার নতুনভাবে সংযোজন করেছে—সংক্ষিপ্ত তালিকার পাঁচজন গল্পকারের বিশেষ সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎকার || নিজেদেরকে সুরক্ষিত রাখতে নিজেদেরকেই রুখে দাঁড়াতে হয় || সালেহা ফেরদৌস
প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় মনোনীত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন! সংক্ষিপ্ত তালিকায় আপনার নাম দেখার পর প্রথম অনুভূতি কেমন ছিল?
সালেহা ফেরদৌস: শুধু সংক্ষিপ্ত তালিকায় নয় প্রথমে দীর্ঘ তালিকায় আমার নাম দেখেও অনেক বেশি খুশি হয়েছিলাম। আমিই একমাত্র নারী লেখক যার গল্প নির্বাচিত হয়েছে এই আনন্দ প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। দীর্ঘ তালিকা প্রকাশের কিছুদিন পরে সংক্ষিপ্ত তালিকায় আবারও আমার নাম দেখে আবেগে আপ্লূত হয়েছি। প্রতিধ্বনিকে অসংখ্য ধন্যবাদ এরকম একটি আয়োজন করার জন্য।
গল্পটি কখন লিখেছিলেন? আর এই গল্পটি লেখার পেছনে বিশেষ কোন ভাবনা বা অনুপ্রেরণা কী কাজ করেছিল?
সালেহা: গল্পটি লিখেছিলাম ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে। আগস্ট মাসে অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল এ বছর। কোনো এক ঝুম বৃষ্টির নির্জন দুপুরবেলায় ভৌতিক এই গল্পের আবহ আমার মাথায় এসেছিল।
লৌকিক বিশ্বাস নির্ভর ভৌতিক গল্পের আঙ্গিক ও কাঠামো বেছে নিলেন কেন?
সালেহা: আমার দাদা ও নানাবাড়ি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। যেখানে এখনও ঠিক মধ্য দুপুরে এবং রাত একটু গভীর হলে ভূতুরে একটা পরিবেশ অনুভূত হয়। গা ছমছম করে রাতের বেলা একলা বের হতে চাইলে। ছেলেবেলায় গ্রামে বেড়াতে গেলে আমার নানী ভূতের গল্প, জিন–পরিদের গল্প শোনাতেন। শুনেছি আমার নানীর উপরেই অনেকবার জিন আছর করতে চেয়েছিল। তিনি খুবই বুদ্ধিমতী ছিলেন বলে সেইসব বিপদ এড়িয়ে যেতে পেরেছেন। আসলে এই ধরনের গল্পের প্লট অনেক আগে থেকেই আমার মননের মধ্যে গেঁথে রাখা ছিল। শব্দের পর শব্দ জুড়ে দিয়ে আগস্ট মাসে লিখে ফেলা হয়েছে কেবল।
ভৌতিক গল্প সাধারণত শিশু পাঠকদেরও উপযোগী করে লেখা হয়ে থাকে। কিন্তু আপনার গল্পের বিষয়বস্তু ও ভাষাশৈলী শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের উপযোগী করার পিছনে বিশেষ কোন ভাবনা কাজ করেছে কি?
সালেহা: শিশু-কিশোরদের জন্য এই গল্পটি লেখা হয়নি এ কথা সত্যি। কিন্তু শিশুরাই তো এক সময় বড় হয়। তাদের শারীরিক বয়স বাড়লেও মনের শিশু কিন্তু একেবারে হারিয়ে যায় না। আমার মনে হয়েছে বড়দের জন্যও কিছু ভৌতিক গল্প থাকা উচিত যেখানে তাদের মনে বড়দের মতামত বা যুক্তিতর্ক থাকবে আবার সেই সঙ্গে তারা ছেলেবেলার শোনা বা পড়া কোনো ভূতুরে গল্পের আবহটাও অনুভব করতে পারবেন। এই গল্পের মাধ্যমে আমি সেই চেষ্টাটাই করেছি। সফল হয়েছি কিনা তা পাঠক ভালো বলতে পারবেন।
ভূতের শিকার হিসাবে নববধূ/ প্রসূতি এবং নবজাতক চরিত্রদের বেছে নেওয়ার পিছনে বিশেষ কোন ভাবনা কি কাজ করেছে বা পরোক্ষ কোনো ইঙ্গিত কি রেখেছেন?
সালেহা: কারণ এই কুসংস্কারটি এখনও গ্রামে প্রচলিত রয়েছে বলে আমি দেখেছি। এখনও নবজাতকের মাথার বালিশের পাশে লাইটার বা লোহা জাতীয় কিছু রাখা হয়। আমার এক নিকটাত্মীয়ের গাঁয়ে হলুদের দিন সন্ধ্যায় হঠাৎ করে পুরো বাড়ি হ্যাজাক বাতির মতো আলোয় আলোকিত হয়ে গিয়েছিল। কথিত কোনো এক জিন তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবার জন্য এসেছিল বলে শুনেছি। গ্রামীণ গল্প আলোচনায় বা পটভূমিতে নতুন বউ এবং নবজাতক শিশুদেরকেই সাধারণত জিনদের লক্ষবস্ত বলে মনে করা হয়।
মনে রাখবেন এই জগত, এই গ্রাম আমাদের, তাদের না।’—এই দ্যোতনা ও দ্রোহ উদ্রেককারী বাক্যের কি আলাদা কোন অর্থ বহন করে? মানে, ‘আমাদের বনাম তাদের’—এই চিরায়ত দ্বন্দ্বকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
সালেহা: এই দ্বন্দ্বের উৎপত্তি কিন্তু বহু প্রাচীন। সৃষ্টির শুরুর দিকে হযরত আদম ও ইবলিশ শয়তানকে নিয়ে যে চিরায়ত গল্প আছে সেই চিরায়ত দ্বন্দ্বকে বোঝানো হয়েছে। জিন জাতি মানুষকে কখনও ভালোভাবে মেনে নেয়নি। হিংসা ও অহংকারে তারা মানুষকে প্রতিযোগী ভেবেছে, ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে। স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করার দিকে ঠেলে দিয়েছে, আবার পৃথিবীতে এসেও মানুষকে ভুল পথে ধাবিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষও শিখেছে এবং বুঝেছে যে ওদেরকে পরাজিত করেই আমাদের এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হবে। মূলত শুধু জিন জাতি নয় (রূপক অর্থে) সমস্ত মন্দ সত্তার বিরুদ্ধে বা বাইরে থেকে আসা যে কোনো শত্রুর আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকতে এবং নিজেদেরকে সুরক্ষিত রাখতে নিজেদেরকেই রুখে দাঁড়াতে হয়। নিজেদের জায়গা নিজেদেরকেই নিরাপদ রাখতে হয়। কেউ বাইরে থেকে এসে বিপদমুক্ত করে দিয়ে যায় না। শত্রুপক্ষ তো সবসময় চাইবেই আপনাকে হারিয়ে দিয়ে আপনার সব দখল করে নিতে। কিন্তু নিজেকে প্রস্তুত করে শত্রুকে হারানোর পথ আপনাকেই খুঁজে বের করতে হবে এবং শত্রু আপনার আশেপাশে ঘাঁটি গাড়ছে কিনা সেই বিষয়ে আগে থেকেই সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
‘মেয়েদের জীবন তো কোথাও সহজ না রে বইন’—এই আপ্তবাক্যটি যদি নারীবাদী দৃষ্টি থেকে বৃহৎ পরিসরে ব্যাখ্যা করতে চান তাহলে কিভাবে করবেন?
সালেহা: এই কথাটির ব্যাখ্যা তো খুব সহজ বলে আমার মনে হয়। আমাদের দেশের, সমাজের বা পরিবারের মেয়েদের দিকে লক্ষ করলেই তো আমরা এর উত্তর পেয়ে যাই। বিয়ের আগে মেয়েদের বাবাবাড়ি হোক আর বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি হোক নানা বিধিনিষেধে মেয়েদের পায়ে অদৃশ্য শিকল পরানো থাকে। বিয়ে ধনী লোকের সঙ্গে হোক বা গরিব লোকের সঙ্গে মেয়েটিকেই সেই জীবনে মানিয়ে নিতে হয়। মেয়েটির উপর নির্যাতন হলেও বেশিরভাগ সময় মেয়েটিকেই বোঝানো হয় সে যেন ধৈর্য ধরে তাহলেই একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে। স্বামীসংসার ছেড়ে (তা সে যে কারণেই হোক) কোনো মেয়ে যদি বের হয়ে যেতে চায় সেই মেয়ের আশ্রয় দিতে আমাদের সমাজ এখনও কুণ্ঠাবোধ করে। তার জীবন হয়ে ওঠে আগের চেয়েও দুর্বিসহ। গল্পে মেয়েদের এই কঠিন জীবনের সামগ্রিক রূপের কথা বলা হয়েছে।
পাঠক হিসেবে আপনার প্রথম গল্প এবং লেখক হিসেবে আপনার প্রথম গল্প—সেই স্মৃতিগুলোর কথা শুনতে চাই।
সালেহা: পাঠক হিসেবে ওভাবে প্রথম পড়া গল্পের কথা তো নির্দিষ্ট করে মনে পড়ছে না। তবে কিশোর বয়সে যে বইটি পড়ে ভয় পেলেও এক অমোঘ আকর্ষণে বইটি পড়ে শেষ করেছিলাম সেই বইটির নাম মনে আছে। ‘অশুভ সংকেত’ নামের সেবা প্রকাশনীর একটি পিশাচ কাহিনী ছিল। ডেভিড সেলজার, জোসেফ হাওয়ার্ড ও গর্ডন ম্যাকগিল—এই তিনজন লেখক মিলে লিখেছেন ‘দি ওমেন’ কাহিনীর তিন খণ্ড আর ওই তিনটি গল্পকে একত্রে রূপান্তর করেছিলেন মাহবুব হোসেন। কিশোর বয়সের ভয় মিশ্রিত কল্পনাকে অনুভব করতে শিখেছিলাম আমি বইটি পড়ে। অদ্ভূত উপায়ে শিয়ালের পেটে জন্ম নেয়া ডেমিয়েন দত্তক সন্তান হিসেবে বড় হয় এক মার্কিন ডিপ্লোম্যাটের কাছে যিনি জানতেন না তিনি দত্তক নিয়েছেন এক পিশাচ পুত্রকে। প্রচণ্ড ক্ষমতা অর্জন করে ধীরে ধীরে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে ডেমিয়েন। ভালো আর মন্দের লড়াইয়ে কে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে সেটি আর বলছি না। কেউ আগ্রহী হলে পড়ে দেখতে পারেন গল্পটি।
এবার আসি লেখক হিসেবে লেখা প্রথম প্রকাশিত গল্পটির কথায়। ‘আলো এনে দেবো’ নামে প্রথম গল্পটি লেখি আমি ২০২১ সালে। এই গল্পের প্রেক্ষাপটও নারী চরিত্র নিয়ে। আমাদের সমাজে এক্সিডেন্টলি বা দুর্ঘটনাবশত কোনো মেয়ে যখন ধর্ষিত হয় তখন তার শরীর ও মনোজগতের মধ্যে নিজেকে শেষ করে দেবার যে প্রচণ্ড আলোড়ন বা ঝড় চলে সেই অবস্থা থেকে কাছের মানুষের সহযোগিতায় কীভাবে সে স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসতে পারে সেই গল্প লেখার চেষ্টা করেছি। মানুষের জীবন যেমন অমূল্য সম্পদ তেমন নারী শরীরও অমূল্য। কেউ একজন চাইলেও সেই শরীরকে এতোটা অপবিত্র করতে পারে না যে নিজেকে নিজে ধ্বংস করে দিতে হবে। অন্ধকার থেকে বের হতে পারবে ওরা যদি পরিবারের কেউ বা কাছের কেউ একটু আলো এগিয়ে দিতে পারে ওদের দিকে। আমার খুব প্রিয় একটি গল্প ‘আলো এনে দেবো’।
আপনার পাঠ্যতালিকায় কোন কোন দেশি ও বিদেশি গল্পকার বা ঔপন্যাসিক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন? কাদের লেখনী আপনাকে গল্প বলতে বা লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে?
সালেহা: অনেক অনেক লেখক আছেন আমার পছন্দের তালিকায়। সংক্ষেপে নাম বলতে গেলে বিদেশি লেখকদের মধ্যে আছেন হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড, পাওলো কোয়েলহো, ড্যান ব্রাউন, কিয়েগো হিগাশিনো, জর্জ অরওয়েল। বাংলাভাষাভাষী লেখকের মধ্যে আছেন সমরেশ মজুমদার, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশংকর বন্দোপাধ্যয়, হুমায়ুন আহমেদ, আশাপূর্ণা দেবী, সেলিনা হোসেন প্রমুখ।
আমার গল্প লেখার পেছনে প্রভাব আছে মূলত দুইজন লেখকের। প্রথমজন হলেন হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড। তার লেখা বই পড়ে আমি গল্প বা দৃশ্যায়ন কল্পনা করতে শিখেছি। কল্পনার সীমা-পরিসীমা বলে কিছু হয় না তার কাছ থেকে জেনেছি। আর সেই কল্পনা সহজ ভাষায় লিখে ফেলতে সাহস করেছি হুমায়ুন আহমদের লেখা পড়ে। গল্প লেখা খুব কঠিন কাজ নয় এই সাহস হুমায়ুন আহমেদ আমাদেরকে দিয়েছেন।
বর্তমানে আপনি কী পড়ছেন? আর আপনার সৃজনশীলতার পাতায় নতুন কোন লেখার কাজ চলছে?
সালেহা: বর্তমানে বিদেশি লেখকের মধ্যে আমার প্রিয় লেখক ড্যান ব্রাউনের নতুন বই ‘সিক্রেট অফ সিক্রেটস’ পড়ছি। আর দেশি লেখকদের মধ্যে লেখক কাজী রাফির হিস্টরিক্যাল ফিকশন ‘ত্রিমোহিনী’ নামক একটি বই পড়ছি যেটি আমাদের দেশের আড়াই হাজার বছরের সমৃদ্ধ ও গৌরবময় ইতিহাসকে ধারণ করে লেখা হয়েছে। এই বইটি পড়তে গিয়ে নিজেকে এক বাংলাদেশী হিসেবে গর্বিত মনে হচ্ছে।
হ্যাঁ, এর মধ্যে লেখালেখিও চলছে। ‘এভিস’ নামে গত বইমেলায় আমার লেখা একটি সায়েন্সফিকশন গল্পের বই এসেছিল। মিল্কি ওয়ের বাইরে অন্য কোনো এক ছায়াপথের এক উন্নত গ্রহ থেকে এভিস নামের এক এলিয়েন পৃথিবীতে এসে এখানেই থেকে গিয়েছিল। গল্পটির সেকেন্ড পার্ট লেখা প্রায় শেষের দিকে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৬-এর বইমেলায় বইটি আসতে পারে বলে আশা করছি।
প্রতিধ্বনির সঙ্গে থেকে আপনার সাহিত্য ভাবনা বিনিময় করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
সালেহা: আমি নই, আমাকে মতামত দেবার সুযোগ করে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ আসলে আপনাদের প্রাপ্য। আমার মতো অপরিচিত লেখকের লেখা পড়ে ভালো লাগায় এই যে মত বিনিময়ের সুযোগ করে দিলেন এই বিষয়টি আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে। অনেক অনেক ধন্যবাদ ও শুভ কামনা প্রতিধ্বনির সঙ্গে জড়িত সকলের জন্য। অশেষ শুভেচ্ছা সবাইকে!
লেখক পরিচিতি
গল্পকার ও লেখক। জন্ম ২৮ মার্চ, ১৯৮২ সালে টাংগাইল জেলার নাগরপুর উপজেলায়। পড়াশোনা প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক ও ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ—আলো এনে দেবো। উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে—কাব্য ভাসে অন্য আকাশে, চাঁদ উঠেছে ওই, চান্দ্রজল ও এভিস। শখ ঘুরে বেড়ানো আর বই পড়া। বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করেন।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন