প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় ‘ভাল চা বানানোর সঠিক রেসিপি’

অ+ অ-

 

লেখক পরিচিতি || আদনান হাবিব

গল্পকার ও চিত্রনাট্যকার। জন্ম ১৪ আগস্ট ১৯৭৬ সালে, চট্টগ্রামে। পড়াশোনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে। লেখালেখি করেন নিজের তাগিদে, নিজের মতো করে; কাছের বন্ধুরাই মূলত সেই লেখার পাঠক। চিত্রনাট্য, প্রযোজনা, সৃজনশীল নির্দেশনা তার কাজের ক্ষেত্র। অনুবাদ করেছেন আলেকজান্দ্রা কোলনতাইয়ের দ্য রেড লাভ

 

ভাল চা বানানোর সঠিক রেসিপি || গল্পের সারাংশ

একদিনের কালচক্রে আটকে থাকা আপাতত ছাপোষা এক চাকরিজীবি নিজ ফ্ল্যাটে মুখোমুখি হয় দুজন গোয়েন্দার। নিজের মৃত্যুকালকে পিছিয়ে নিতে তার স্ত্রী অস্ত্র হিসাবে সামনে নিয়ে আসে সুস্বাদু চা। এই চায়ের আবর্তনে হাত ধরাধরি করে ভেসে উঠে দাম্পত্য অবিশ্বাস আর রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের নানান খুঁটিনাটি। স্বামী-স্ত্রীর এই অসামান্য যৌথ-লড়াইয়ের পটভূমিতে রচিত এক নান্দনিক ও চমকপ্রদ গল্প, যা পাঠককে নিয়ে যায় সময়, বিশ্বাস ও ক্ষমতার এক জটিল জালে।

 

‘ভাল চা বানানোর সঠিক রেসিপি’ গল্পের চুম্বক অংশ

রান্নাঘরের দেয়ালে আমি ঠেশ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব। আর দেখব, হয়তো জীবনে প্রথমবারের মত, রিমি কী করে সেই জাদুকরী চা বানায়।

রিমি আমার মুখের দিকে তাকাবে না।

‘তুমি কি সত্যি সত্যি আমার নাম নমিনি থেকে বাদ দিয়েছ?’

‘হ্যাঁ।’

‘কেন?’

আমি চুপ করে থাকব।

‘কাকে নমিনি করেছ? কাউকে না কাউকে তো করতেই হয়, নিয়ম।’

এখনো চুপ করে থাকব আমি।

‘একটা জিনিস বুঝে দেখ, আমি কিন্তু তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারি। ওরা আমার হাতের চা পছন্দ করেছে। আমি যতবার চা খাওয়াতে চাইব, আপত্তি করবে না, এমনকি দেখা যাবে ওরা রাতের খাবারও খেয়ে যেতে চাইতে পারে। একদম বেঁচে যদি নাও যাও, কয়েক ঘণ্টা সময় তোমাকে আমি বেশি দিতেই পারি।’

আমি বলব, ‘আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছ রিমি?’

‘ওসব ভারি ভারি শব্দের মানে আমি বুঝি না। তুমি বলবে? না কি আমি এই কাপ চা বানিয়েই ওদের বলব বিদায়?’

‘আমি ভাইয়াকে নমিনি করেছি।’

‘ভাইয়ার তো জায়গা-সম্পত্তির কোনো অভাব নাই। তাকে নমিনি করলা কেন?’

‘আর কাউকে খুঁজে পাইনি বলে।’

‘তুমি যদি বেঁচে যাও আর তোমার একটা গার্লফ্রেন্ড হয়, তখন আবার ভাইয়াকে পাল্টে ওকে করবে নমিনি?’

‘করব হয়ত।’

‘তোমার বাড়িতে জমি বিক্রির মোটা টাকা অ্যাকাউন্টে আছে। এত টাকা কি যার তার কাছে নিরাপদ?’

‘তোমার কাছে নিরাপদ?’

‘কথা বল আমার সাথে, সময় কিন্তু বেশি নেই।’

‘কি বলব?’

‘তুমি সত্যি ভাইয়াকে নমিনি করেছ?’ বেপরোয়া রিমি তার ফোনটা হাতে নিয়ে আমার নাকের কাছে ঝাঁকাবে শাসানোর ভঙ্গিতে। ‘জিজ্ঞেস করব ভাইয়াকে?’

আমি হাসব। ‘কাউকে নমিনি করতে হলে তাকে জানানোটা বাধ্যতামুলক না রিমি। ভাইয়া জানে না।’

‘আমার সাথে দুই নম্বরি করছ! এখনো!... আমি বললে এক্ষুণি তোমাকে ওরা নিয়ে যাবে।’

‘ওরা তোমাকে কী দেখিয়েছে রিমি, আমার মোবাইলে?’

রিমি এইবার থমকাবে।

‘তুমি কথা ঘোরাচ্ছ কেন?’

‘কারণ তুমি আমার জীবনের ব্যাপারে কোন কেয়ার দেখাচ্ছ না!’

‘আমি আরেকবার চা বানাচ্ছি আরও কিছুক্ষণ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য!’

‘হা হা হা হা। ধন্যবাদ তোমাকে। অসংখ্য ধন্যবাদ।’

রিমি ছাকনি দিয়ে চা ছাঁকতে শুরু করবে।

আমি আবার প্রসঙ্গ তুলব। ‘বল রিমি, কী দেখেছিলে মোবাইলে? অমন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিলে কেন? তোমার মুখ থেকেই শুনি!’

এরপরের ঘটনার জন্য আমি প্রস্তুত থাকব না।

রিমি এক ঝটকায় কেটলির গরম চা ছুঁড়ে দেবে আমার গায়ে। নিমেষেই আমার বুকের ওপরের চামড়াটা যেন ভয়ানকভাবে চেপে বসে বন্ধ করে দিতে চাইবে আমার হৃৎপিণ্ড। অসহ্য যন্ত্রণায় আমি কুঁকড়ে বসে পড়ব। না চাইলেও পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে ভয়ানক চিৎকার। ছুটে আসবে শুধু আলাদা রঙের গেঞ্জি পরা, কিন্তু যমজ লোকগুলো।

রিমি বলবে, ‘এই কুত্তার বাচ্চাকে এক্ষুনি নিয়ে যান আপনারা। যে বৌয়ের সাথে ঠিকমত শুইতে পর্যন্ত পারে না, তার এত দেমাগ সাজে না।’

 

বিচারকের মন্তব্য

ভবিষ্যত কালের প্রথম পুরুষের বয়ানে রচিত এমন পরিমিত গদ্যের অপরিমেয় জটিল কাহিনী কাঠামোর সমন্বয় এক কথায় অসাধারণ। গল্পের মূল চরিত্র যেমন ক্ষমতা আর সময়ের চক্রে আটকে একই দিনে একই দৃশ্যকল্পে বারবার জেগে উঠে, পাঠক তেমনি এই গল্পের প্রতি শব্দ, প্রতি বাক্য দিয়ে অদম্যভাবে আকর্ষিত হবে। জীবনের অন্তর্নিহিত ভাবনাকে উপলব্ধি করার জন্য গল্পের পাতায় দ্বিতীয়বার ফিরেই হবে।