প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় ‘মহারাজের গ্রাম’
লেখক পরিচিতি || সালেহা ফেরদৌস
গল্পকার ও লেখক। জন্ম ২৮ মার্চ, ১৯৮২ সালে টাংগাইল জেলার নাগরপুর উপজেলায়। পড়াশোনা প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক ও ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ—আলো এনে দেবো। উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে—কাব্য ভাসে অন্য আকাশে, চাঁদ উঠেছে ওই, চান্দ্রজল ও এভিস। শখ ঘুরে বেড়ানো আর বই পড়া। বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করেন।
মহারাজের গ্রাম || গল্পের সারাংশ
ইছাপুর গ্রামে একের পর এক নবজাতকের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটতে থাকে। শারীরিক শোষণের শিকার হতে থাকে একের পর এক নববধূ। গ্রামের মেম্বার থেকে শুরু করে মসজিদের মোয়াজ্জিন—কেউই এই রহস্যের সমাধান করতে পারে না। এখানেই গ্রথিত রয়েছে লোক কাহিনীর এক বিস্ময়: মানুষের গর্ভে জন্ম নেয়া এক অশরীরী সত্তা শতাব্দীকাল ধরে পাহারা দিচ্ছে এই গ্রাম। বাংলার লোকগাথার শিকড়ে প্রোথিত এই আখ্যান পাঠকদের জন্য নিয়ে আসবে এক শ্বাসরুদ্ধকর, রোমাঞ্চকর সাহিত্যিক অনুভূতি।
‘মহারাজের গ্রাম’ গল্পের চুম্বক অংশ
স্বামীর বাড়ি আসার কিছুদিন পরে একরাতে প্রসব বেদনায় ছটফট করে উঠলো ময়না। তুমুল ব্যথায় তলপেট যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। মেম্বার শহরে গেছে কোনো একটা কাজে তাই বড় বউয়ের সাথেই ঘুমিয়েছে ময়না। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে রাহেলাকে ডাক দিয়ে বললো, “বড় বু ওঠো! আমি মনে হয় মইরা যাইতেছি।”
রাহেলার ঘুম পাতলা। জেগে ওঠে ঘরে আলো জ্বালিয়ে দেখে ঘামে ভিজে গেছে ময়নার শরীর। দুই পা বেয়ে নিচের দিকে নামছে রক্ত আর পানি।
রাহেলা উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,“কী হইছে ময়না? তুই তো পোয়াতি না। তাইলে পানি আর রক্ত ভাঙতেছে ক্যান?”
আমি জানি না কী হইতেছে আমার সাথে? আমারে বাঁচাও বড় বু!
রাহেলা ভেবে পেলো না কী করবে এতো রাতে? উপস্থিত বুদ্ধি অনুযায়ী হালকা গরম পানি এনে ময়নার কোমরের নীচ থেকে পা পর্যন্ত ধুয়ে দিলেন। ময়না কিছুটা আরাম পেলো তবে তা অল্প কিছুক্ষণের জন্য। একটু পরে আবার ব্যথায় চিৎকার করে দুই পা দুই দিকে মেলে দিলো ময়না। রাহেলা দেখলো, ময়নার জরায়ু মুখ খুলে গিয়ে সেখান থেকে একতাল সাদা মাংসপিণ্ড তড়িৎ গতিতে নিচে গড়িয়ে পড়লো। আতঙ্কে অজান্তেই চোখ বন্ধ হয়ে গেল রাহেলার। ভয় পেলেও জিনিসটা কী, সেটা দেখার জন্য আবার যখন চোখ খুললো তখন আর কিছু দেখতে পেলো না। ঠাস করে সদর দরজা খুলে আবার বন্ধ হবার আওয়াজ এলো। ভয়ে ভয়ে ময়নার দিকে তাকালে দেখা গেল ময়না হাট করে খোলা ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। রাহেলা আবার দৌড়ে গিয়ে বালতিতে পানি এনে পরিষ্কার করে দিল ময়নাকে। পরিষ্কার করা শেষে ময়নার মাথায় হাত রেখে বললো, “কিছু হয় নাই তোর। ভয় পাইস না। কেউ জানবো না এই ঘটনা। ঘুমা তুই।” ফজরের আজান শুনে ঘুমে ঢলে পড়লো ময়না। পরদিন বেলা করে ঘুম ভাঙার পর ময়না বললো, “আমার পেট খালি খালি লাগতেছে বড় বু। মনে হইতেছে আমার পেট থেকে বাচ্চা বের হইছে।”
নাউজুবিল্লাহ! ওইসব আজগুবি কথা আর বলিস না। পেট খালি খালি লাগলে ওইঠা ভাত খা।
ময়না উঠে বসে নিজের পেটের উপর হাত বুলিয়ে আনমনা হয়ে ভাবলো, “জিন আর মানুষের সঙ্গমে যদি বাচ্চা হইতো সে কেমন হইতো দেখতে? মানুষের কোনো গুণ পাইতো নাকি পুরাই জিনদের মতো হইতো?”
বিচারকের মন্তব্য
প্রথমপাঠে মনে হবে মহারাজের গ্রাম এক নিছক ভৌতিক গল্প। কিন্তু চিন্তার অতলে যেতে থাকলে বোঝা যাবে এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতীকী গল্প। একান্তই আটপৌরে গদ্যের মাধ্যমে স্বল্প পরিসরে সৃষ্টি করেছেন বহু উপাখ্যানের এক আখ্যানবিশ্ব। জীবনযাপনের স্বাভাবিক প্রবাহে যে ভাষা ব্যবহার করি, তাকেই তিনি নির্মম নগ্নতায় উপস্থাপনের দুঃসাহস দেখিয়েছেন।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন