যখন আমি গল্পটা চোখে দেখি তখনই বসে যাই: রোমেল রহমান

অ+ অ-

 

নতুন গল্পের সন্ধানে শিরোনামে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক জার্নাল প্রতিধ্বনি আয়োজিত প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। বিগত ৩০ অক্টোবর ২০২৫-এ প্রকাশিত ১০টি দীর্ঘ তালিকার গল্প থেকে বিচারকমণ্ডলী সংক্ষিপ্ত তালিকার জন্য ৫টি গল্প বাছাই করেছেন। প্রতিধ্বনি এবার নতুনভাবে সংযোজন করেছেসংক্ষিপ্ত তালিকার পাঁচজন গল্পকারের বিশেষ সাক্ষাৎকার।

 

সাক্ষাৎকার || মানুষের গল্প ছাড়া কাল তো অসহায় || রোমেল রহমান

প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় মনোনীত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন! সংক্ষিপ্ত তালিকায় আপনার নাম দেখার পর প্রথম অনুভূতি কেমন ছিল?

রোমেল রহমান: ধন্যবাদ। অনুভূতি ভালো ছিল।

গল্পটি কখন লিখেছিলেন? আর এই গল্পটি লেখার পেছনে বিশেষ কোন ভাবনা বা অনুপ্রেরণা কী কাজ করেছিল?

রোমেল: গল্পটা সম্ভবত ২০১৬ সালে লেখা। বিশেষ কোন ভাবনাচিন্তার কথা মনে নাই! তবে একটা জিনিসের কথা স্মরণ হয়, গল্পটা লিখতে লিখতে অনুভব হচ্ছিলএকটা উপন্যাসের সম্ভাবনাকে হত্যা করছি!

কুরছিয়ানা গল্পের কথকের কণ্ঠস্বরটি লোকজ এবং ক্লাসিক লোককাহিনীর ঢঙ্গে বলা। গল্পের পাঠককে যেন শ্রোতায় রূপান্তরিত করে। প্রশ্ন জাগে, এই গল্পের জন্য স্মৃতি ও শ্রুতি-ভিত্তিক বয়ানের এমন এক ক্লাসিক রীতি বেছে নেওয়ার পিছনে কারণ কী?

রোমেল: এর উত্তরটা সম্ভবত আমার বেড়ে ওঠার সঙ্গে জড়াজড়ি হয়ে আছে! শহর খুলনায় যখন আমি বেড়ে উঠছি তখনো এই শহর বিখ্যাত ছিলো তার নরম আলস্য ঘেরা। মানে মহল্লা,গলি বা পাড়া কালচারের ঘেরাটোপে! চাকরিবাকরি না করে বংশানুক্রমে পাওয়া শত শত বিঘা জমি বিক্রি করে তাস-পাশা খেলে মজমা মেরে কাটানো স্থানীয় বাসিন্দা, তুমুল আড্ডা আর অপরিবর্তনীয় লাইফস্টাইলে মধ্যে বসে থাকা কয়েক প্রজন্মের সেইসব মানুষ, যারা ঘষে ঘষে গল্প বলে যায়; আড্ডা দেয়, নিন্দামন্দ করে; কুরছিয়ানা চালায়! এর বাইরে আমার সেই সময়ের শহরের চারদিকে গ্রাম, সেইসব গ্রামে আছে আশ্চর্য সব মানুষ! যারা গল্প বলে, সেই গল্পের ধারা কোথা থেকে কোথায় যে যায় তা কল্পনা করতে গিয়ে আমার মাথা নষ্ট করে দেয়! মুখে মুখে বলে যাওয়া সেইসব গল্পওয়ালারা আমাকে খেয়ে দিয়েছে! আমি নিজে তেমন ভালো কথা বলতে পারি না। মানে আগামাথা বাগে থাকে না। ফলে এদের এই প্রতিভার দিকে বিমুগ্ধতা আমার দীর্ঘ দিনের;এর বাইরে আরেকজনের কথা স্মরণ হয়, লোকটার নাম বাহার ভাই, এই লোকটাকে আমার বালকবেলায় কাজের লোক হিসেবে রাখেন আমার মা। তার দায়িত্ব ছিল ভাত খাবার সময় আমাকে গল্প শোনানো! গল্প যে শোনার জিনিস বা শোনাবার শিল্প এই ব্যাপারটা আমাকে এইসব লোকেরা জানিয়েছে, ফলে স্মৃতি-শ্রুতির মিশ্রণের একটা ম্যাজিক দুনিয়াদারি আমি যাপন করে ফেলায় আমার অবচেতন এটাকে সান্টিং দিয়ে ফেলেছে! মানে এই ভাবে লোক বা লোকাল ফর্মে গোপনে গোপন বুনে রেখেছে, আমি জাস্ট একদিন কিবোর্ডে বসে ঝেড়ে দিয়েছি। না-কি আমিও মনে মনে সেইসব লোক কিচ্ছাদারদের একজন হয়ে গেছি সেভাবেও ব্যাপারটা উল্টেপাল্টে দেখা যেতে পারে! 

কুরছিয়ানা গল্পের কাঠামো ও ব্যাপ্তি এক মহা-আখ্যানের আদলে সাজিয়েছেন। একটি ছোট গল্পের আঙ্গিকে এমন বৃহৎ বিন্যাস বেছে নেওয়ার পিছনে কোন শিল্পগত ভাবনা কাজ করছে?

রোমেল: আলাদা করে পরিকল্পনা করিনি। এরকম আরও অনেক গল্প আমার কাছে জমা আছে। আমার বসবাস আর সময় আমাকে এইগুলো দিয়েছে বলে মনে হয় এবং আমিও এদেরকে ছেড়ে যাইনি। ফলে অনেক অনেক বছর পর যখন আমাদের মধ্যে আস্থা জমাট নিয়েছে, তখন এরা হেঁটে এসে পাশে বসেছে এবং এখনো আছে। আর লেখা নিয়ে আমি খুব প্লানফ্লান করি না। লিখতে বসি, বসে যাই। মানে যখন আমি গল্পটা চোখে দেখি তখনই বসে যাই।

কাহিনীর পরতে পরতে মৃত্যু একটা মেটাফর হিসেবে এসেছে। এই মৃত্যুগুলোর চরিত্র ও পাঠকউভয়ের জন্য আকস্মিক? কিন্তু লেখকের কলম বা কথকের স্বরে সেগুলো ছিল সুস্পষ্ট পরিকল্পনার ফসল। প্রধান চরিত্রদের মৃত্যুর এমন আধিক্য কি গল্পের নিজস্ব গতির অংশ; নাকি নাটকীয়তার একটি চক্র নির্মাণ করতেই আপনি তা প্রয়োগ করেছেন?

রোমেল: আমি নাটক লিখি, তবে এই গল্পে নাটকীয়তার দারস্থ হওয়ার দরকার পড়ে নাই, কারণ এই গল্পগুলো বা এই কুরছিয়ানা নামের গল্পে আপনি যে গল্পটা পড়লেন এটা এরকমই! মানে এইসবই ঘটে নিয়মিত! আমার কাছে ব্যাপারগুলো জ্যান্ত। এই চরিত্ররা আমার চারপাশে আছে, এরা মরে মরে জায়গা করে দেয়, আবার সম্পর্কে জড়িয়ে পেঁচিয়ে গিয়ে বিষ গিঁট লেগে যায়, চাবির গোছা হাত পাল্টায়! আমি তাদের ডেকে এনে ছেড়ে দিয়েছি কাগজের পাতায়। মৃত্যু এখানে স্বাভাবিক ঘটনা, আসলে মৃত্যু তো জীবনকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়ার জন্য জরুরী!

গল্পের একটি চরিত্রের মৃত্যু যেন অন্য চরিত্রগুলোকে জীবনের দিকে আরও দৃঢ়ভাবে আকর্ষণ করে। বেঁচে থাকার সংগ্রামে তাদের নতুন করে উদ্দীপ্ত করে। মধু ও শেফালীর ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। জীবন ও মৃত্যুর এই জটিল সমীকরণ সম্পর্কে আপনার ব্যক্তিগত উপলব্ধি কী?

রোমেল: মানুষ তো মৃত্যু পাড়ি দিয়ে বাঁচে, আবার বেঁচে থাকাকেও ফুরিয়ে ফেলে হাতে ধরে, কিংবা মৃত্যুর উপরও দাঁড়িয়ে বাঁচে, অথবা কেউ কেউ মরার মতো বাঁচে। জীবন আসলে তার সুর নিজে বাঁধে। জন্ম মৃত্যু এই দুটো শব্দকে বাদ দিয়ে দেখেনজীবন একটা গল্প রেখে যায়, যাবেই!

কালের আছে স্বরচিত সংবিধান।’—এই ব্যঞ্জনাময় বাক্যটির পেছনে আপনার কোন দার্শনিক ভাবনা কাজ করেছে?

রোমেল: প্রতিটা মানুষই একটা গল্পখানা, সে তার দুর্দান্ত গল্পটা একটা জীবন ঢেলে বানায়, সেটাকে কাল সংগ্রহ করতে পারে নিজের অস্তিত্বের জন্য। মানুষ ছাড়া, মানুষের গল্প ছাড়া কাল তো অসহায়! সে নাই হয়ে যায়।

পাঠক হিসেবে আপনার প্রথম গল্প এবং লেখক হিসেবে আপনার প্রথম গল্পসেই স্মৃতিগুলোর কথা শুনতে চাই।

রোমেল: পাঠক হিসেবে প্রথম গল্পের কথা মনে নাই। তবে আমার মেজো কাকা শেখ মিজানুর রহমান, উনি আমার হাতে সাহিত্যের বই তুলে দেন এবং দিনে দিনে উনার বইয়ের লাইব্রেরি উজাড় করে দেন! টিনটিন, চাচা চৌধুরী, সুকুমার রায় বা ঠাকুরমার ঝুলি থেকে হুমায়ুন ,জাফর ইকবাল, শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজ, সুনীল, জুলভার্ন আর প্রচুর ভূতের গল্প দিয়ে ক্রমে বইয়ের দুনিয়ার চালানে তিনি আমাকে ফেলে দেন এখন টের পাই!

আপনার পাঠ্যতালিকায় কোন কোন দেশি ও বিদেশি গল্পকার বা ঔপন্যাসিক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন? কাদের লেখনী আপনাকে গল্প বলতে বা লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে?

রোমেল: লিখতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে হুমায়ুন আহমেদ। তবে তার কাঠামোয় কখনো লিখতে চাইনি। আর দেশি বিদেশি গল্পকার বা ঔপন্যাসিক যাদের পড়ে আমি শান্তি পেয়েছি, তব্দা খেয়েছি তাদের যে কয়জনের নাম এখন মুখে আসছে সেটা এরকমতলস্তয়, জিব্রান, শেখভ, বোর্হেস, মার্কেস, কামু, রুলফ, কাফকা, ফকনার, মান্টোসহ দেশ ভাগের ওই জামানার হিন্দি-উর্দু লেখকেরা, রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়, জসিমউদদীন, বন্দে আলী মিয়া, আবু ইসহাক, বনফুল, মুজতবা আলী, ল্যু স্যুন, জেন সাহিত্য, ওয়ালীউল্লাহ, রশীদ করীম, সৈয়দ হক, ইলিয়াস, শহিদুল জহির, হুমায়ুন আহমেদ, সুবিমল মিশ্র, মাহমুদুল হক, পার্সাই, বিভিন্ন দেশের রূপকথা। আপাতত এনাদের নাম মুখে আসছে, যদিও ব্যাপারটা এলোপাথাড়ি হয়ে গেলো!

বর্তমানে আপনি কী পড়ছেন? আর আপনার সৃজনশীলতার পাতায় নতুন কোন লেখার কাজ চলছে?

রোমেল: পড়ছি কিছু বিদেশি নাটক, পাশাপাশি এডগার কেরেটের একটা গল্পের বই। আর লেখার ব্যাপারে আমি এক সময়ে নানান জিনিস লিখি তো! এই মুহূর্তের তালিকাটা এরকমএকটা নাটক লিখলাম, চিত্রনাট্যের কিছু কাজ চলছে আর প্যারাবল বা ফেবল জাতীয় গল্প আমি নিয়মিত লিখি, যার একটা খন্ড দাস্তান নামে ভারত থেকে বেরিয়েছে কমাস আগে; সেই শ্রেণীর গল্প নিয়মিত লিখছি। আর একটা উপন্যাস, যেটা সম্ভবত শেষ করা হবে না, কিন্তু নিজেকে উস্কানি দিচ্ছি নিয়মিত! আর কবিতা লেখা তো আছেই, মাস ছয়েক আগে বর্ষামঙ্গল নামে আমার তৃতীয় কবিতার বইটা বেরিয়েছে কলকাতা থেকে। এর বাইরে বাঘ নামে একটা নকশা আমি লিখি আমার ফেসবুক পাতায়, সেটাও আছে। এইসব আরকি!

প্রতিধ্বনির সঙ্গে থেকে আপনার সাহিত্য ভাবনা বিনিময় করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

রোমেল: প্রতিধ্বনিকেও ধন্যবাদ।

 

লেখক পরিচিতি

গল্পকার ও লেখক। জন্ম ১১ নভেম্বর ১৯৮৯ সালে, খুলনায়। পড়াশোনা হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত গ্রন্থ—কবিতা: বিনিদ্র ক্যারাভান, আরোগ্যবিতান, বর্ষামঙ্গল; গল্প/গদ্য: মহামারী দিনের প্যারাবল, প্রোপাগান্ডা, বাঘ, দাস্তান; নাটক: চম্পাকলি লেন ও অন্যান্য নাটক। নিয়মিত লেখেন বাংলাভাষার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং ওয়েবজিনে। গল্পে পেয়েছেন পেন ‘বাংলাদেশ সাহিত্য পুরস্কার ২০২০’। বর্তমানে তিনি বসবাস করেন খুলনায়।