কেন শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল বই পড়া উচিত?
|| সৃজনশীল বই কেন পড়ব ||
স্কুলে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; মানুষকে জ্ঞানী, বিবেকবান, সংবেদনশীল ও সৃজনশীল করে গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ দিক। একজন শিক্ষার্থী শুধু পাঠ্যবই পড়ে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে পারে, কিন্তু তার চিন্তার জগৎ, কল্পনাশক্তি, অনুভূতি ও জীবনবোধের বিকাশের জন্য আরও নানা ধরনের বই পড়া প্রয়োজন।
নিবন্ধটি লিখতে গিয়ে মনে পড়ে গেল স্কুল জীবনে ‘গল্পগুচ্ছ’র অনেক গল্প পড়ে ফেলেছিলাম। আরও ছেলেবেলায় রূপকথার বই পড়েছি। বড় হওয়ার পথে পড়েছি দস্যুবনহুর, কুয়াশা, মাসুদ রানা। তখন থেকে লেখালেখির বিষয়ে গোপনে গোপনে মস্তিষ্কে সম্ভবত নতুন একটা বুনিয়াদ বা জমিন তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তার টানে এই বয়সে এসেও সৃজনশীল বই পড়া এবং লেখালেখির জগৎ ছাড়িনি, লিখে ফেলেছি প্রায় ৭১টি বই। প্রফেশনাল জগতেও দায়িত্ববান থাকার চেষ্টা করেছি, করছি।
জীবনের এই দীর্ঘ পথ চলায় মনে হয়েছে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, ভ্রমণকাহিনি, জীবনী ও বিজ্ঞানবিষয়ক আকর্ষণীয় বই আমাদের মানবিক হওয়ার পথ তৈরি করে দেয়, সৃজনশীল জগৎ উন্মোচিত করে এবং দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত করার সুযোগ করে দেয়। এসব বইয়ের মধ্য দিয়ে নিজের পরিচিত জগতের বাইরে আরও বড় জগতের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে, যেকোনো শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেও এই সুযোগ তৈরি হয়ে যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, সৃজনশীল বই পড়া মানে শুধু আনন্দ পাওয়া নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে মানুষ নিজেকে চিনতে শেখে, অন্যকে বুঝতে শেখে, জীবনের নানা প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে শেখে। তাই শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার সময় সৃজনশীল বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
|| কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ||
মানুষের বড় এক শক্তি হলো কল্পনা করার ক্ষমতা। কল্পনা থেকেই নতুন ভাবনার জন্ম হয়, নতুন আবিষ্কারের পথ তৈরি হয়, শিল্প-সাহিত্য ও বিজ্ঞানের অগ্রগতি ঘটে। সৃজনশীল বই পড়ার সময় শিক্ষার্থী গল্পের চরিত্র, পরিবেশ, ঘটনা ও পরিস্থিতি নিজের মনের মধ্যে কল্পনা করে। লেখকের বর্ণনা থেকে সে নিজের মতো করে নতুন জগৎ তৈরি করে।
ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থী সুন্দরবনের ওপর লেখা কোনো গল্প পড়ছে। সে হয়তো কখনো সুন্দরবনে যায়নি। কিন্তু গল্পটা পড়তে পড়তে তার মনে বনের ছবি তৈরি হয়, নদীর শব্দ শোনে, বাঘের উপস্থিতি তাকে রোমাঞ্চিত করে। এভাবে বই তার পরিচিত অভিজ্ঞতার বাইরে নতুন অভিজ্ঞতার দরজা খুলে দেয়। এই কল্পনাশক্তিই একসময় তাকে নতুনভাবে ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং নিজের মতো করে কিছু সৃষ্টি করতে সাহায্য করে।
|| ভাষা ও প্রকাশ ক্ষমতা ||
বই পড়ার বড় উপকার হলো ভাষার দক্ষতা বৃদ্ধি। ভালো গল্প, উপন্যাস ও কবিতা পড়লে শিক্ষার্থীরা নতুন শব্দ শেখে, বাক্য গঠনের কৌশল বোঝে এবং নিজের মনের কথা সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে শেখে। যে শিক্ষার্থী নিয়মিত বই পড়ে, তার কথা বলা, লেখা, ভাব প্রকাশ এবং যুক্তি সাজানোর ক্ষমতা সাধারণত উন্নত হয়। সে একই বিষয়কে বিভিন্নভাবে প্রকাশ করার সুযোগ পায়। ফলে পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখা, প্রবন্ধ রচনা, বক্তৃতা করা কিংবা বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করার সময় তার সুবিধা হয়।
তবে শুধু শব্দের অর্থ মুখস্থ করলেই ভাষার দক্ষতা বাড়ে না। শব্দ কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, বাক্য কীভাবে মনের অনুভূতি প্রকাশ করে, গল্প কীভাবে পাঠককে আকৃষ্ট করে ইত্যাদি বিষয়ও বই পড়ার মাধ্যমে শেখা যায়।
|| অনুভূতিশীল ও মানবিক মানুষ হয়ে ওঠা ||
সৃজনশীল সাহিত্যের অন্যতম শক্তি হলো মানুষের মনের কাছে পৌঁছানো অর্থাৎ তার আবেগ এবং চিন্তার জগতকে স্পর্শ করা, মনের অন্তর্নিহিত শক্তি বা মোটিভেশনাল ফোর্স কিংবা ভেতরের চালিকা শক্তিকে গতিশীল করা। গল্পের চরিত্র কখনো দুঃখ পায়, কখনো আনন্দিত হয়, কখনো অন্যায়ের শিকার হয়, আবার কখনো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে। এসব ঘটনা পড়তে পড়তে শিক্ষার্থী অন্য মানুষের অনুভূতি বুঝতে শেখে। গল্পের চরিত্ররা কখনো হেরে যায়, কখনো জয়ী হয়। হারলে সে হারকে বরণ করতে শেখে, জয়কে ধারণ করতে শেখে। এভাবে যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতি কিংবা আনন্দময় ঘটনায় মানুষের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বেড়ে যায়।
কোনো গল্পে দরিদ্র শিশুর কষ্টের কথা পড়ে সে বুঝতে পারে, সবার জীবন এক রকম নয়। উপন্যাসে অসহায় বৃদ্ধের একাকিত্বের কথা পড়ে সে বয়স্ক মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারে। কোনো গল্পে বন্ধুর বিপদে আরেক বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোর ঘটনা পড়ে সে বন্ধুত্বের মূল্য বুঝতে পারে।
এই অভিজ্ঞতা তাকে নিজের স্বার্থের বাইরে অন্যের কথা ভাবতে শেখায়। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজে অন্যের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
|| মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে ||
বর্তমান সময়ে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষার ভয়, প্রতিযোগিতা, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ এবং অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করার প্রবণতা।
এমন পরিস্থিতিতে পছন্দের বই পড়া হতে পারে আনন্দ ও মানসিক প্রশান্তি পাওয়ার উপায়। ভালো গল্পে ডুবে থাকা, কবিতার সৌন্দর্য উপভোগ করা কিংবা কোনো ভ্রমণকাহিনির সঙ্গে অজানা জগতে ঘুরে বেড়ানো মনকে দৈনন্দিন চাপ থেকে কিছু সময়ের জন্য বিরতি দেয়। রিলাক্স হওয়ার সুযোগ পায় পাঠক। এই অবস্থায় সে নিজের পাঠ্য বইয়ের প্রতিও মনোযোগী হওয়ার পথ পেয়ে যায়।
সাহিত্যের চরিত্রের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী নিজের সমস্যার সঙ্গে মিল খুঁজে পেতে পারে। বুঝতে পারে দুঃখ, ব্যর্থতা, ভয় কিংবা অনিশ্চয়তা মানুষের জীবনেরই অংশ। এসব অনুভূতি নিয়ে কথা বলা যায়, ভাবা যায় এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়া যায়। তবে বই পড়া মানসিক সমস্যার চিকিৎসার বিকল্প নয়। দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত উদ্বেগ বা পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলার মতো লক্ষণ দেখা দিলে অভিভাবক ও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে।
|| চিন্তা করা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ||
জীবনে প্রতিদিনই আমাদের ছোট-বড় নানা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল, কোন কাজের কী পরিণতি হতে পারে, এসব বোঝার জন্য বিচারবুদ্ধি প্রয়োজন। সৃজনশীল বই শিক্ষার্থীকে চিন্তার সুযোগ দেয়। গল্পে কোনো চরিত্রের সিদ্ধান্তের কারণে বিপদ তৈরি হলে পাঠক ভাবতে পারে, চরিত্রটি অন্যভাবে কাজ করলে কী হতো। কোনো উপন্যাসে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে চরিত্রটি সমস্যায় পড়লে পাঠক ন্যায়, সাহস ও দায়িত্ব নিয়ে চিন্তা করতে পারে।
এভাবে বই পড়া শিক্ষার্থীকে শুধু ঘটনা জানায় না; ঘটনার অর্থ খুঁজতে শেখায়। তার মনে প্রশ্ন তৈরি হয়। সে নিজের মতামত গড়ে তুলতে শেখে। তবে সব বইয়ের সব বক্তব্য অন্ধভাবে গ্রহণ করা উচিত নয়। বই পড়ার পাশাপাশি তথ্য যাচাই করা, ভিন্নমত বিবেচনা করা এবং যুক্তির সাহায্যে সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি। ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখাও গুরুত্বপূর্ণ।
|| বাস্তব জীবনকে বোঝা ||
পাঠ্যবই আমাদের জ্ঞান দেয়, কিন্তু জীবনের সব অভিজ্ঞতা পাঠ্যবইয়ের পাতায় পাওয়া যায় না। মানুষের সম্পর্ক, সমাজের বৈষম্য, গ্রাম ও শহরের জীবন, প্রকৃতির সৌন্দর্য, ইতিহাসের নানা ঘটনা এবং মানুষের সংগ্রাম সম্পর্কে সৃজনশীল বই আমাদের ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা দেয়।
কোনো শিক্ষার্থী হয়তো গ্রামের মানুষের জীবন সম্পর্কে খুব কম জানে। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাস তাকে সেই জীবনের কাছে নিয়ে যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প তাকে ইতিহাসের ঘটনাকে মানুষের অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে সাহায্য করতে পারে। বিজ্ঞানভিত্তিক কিশোর বই তাকে মহাকাশ, পরিবেশ কিংবা নতুন আবিষ্কার সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলতে পারে।
|| মোবাইলের আসক্তি থেকে মুক্তি ||
সৃজনশীল বই পড়া মোবাইলের আসক্তি কমাতে সহায়ক হতে পারে। বিকল্প বিনোদন দিয়ে শিশুর মনকে রাঙিয়ে তোলা যায়। মোবাইলের মধ্যে আঁঠার মতো সেঁটে যাওয়া তার মনকে ছোটানো যায়। মোবাইল ফোন আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পড়াশোনা, যোগাযোগ ও তথ্য সংগ্রহে এর উপকারিতা অনেক। কিন্তু একদম শিশুকাল থেকে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও দেখা, গেম খেলা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটালে পড়াশোনা, ঘুম, খেলাধুলা ও পারিবারিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ঝাঁকে ঝাঁকে শিশু এ ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের দরবারে চিকিৎসার জন্য হাজির হচ্ছে।
এজন্য শিক্ষার্থীদের মোবাইল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে আনন্দদায়ক বিকল্প তৈরি করা দরকার। বই পড়া হতে পারে সেই বিকল্পগুলোর একটা উপায়। জোর করে বই পড়তে বসিয়ে দিলে অনেক সময় উলটো অনীহা তৈরি হয়। বরং শিক্ষার্থীর বয়স, আগ্রহ ও পছন্দ অনুযায়ী বই বেছে দিতে হবে।
কেউ রহস্যের গল্প ভালোবাসে, কেউ ভূতের গল্প, কেউ বিজ্ঞান, কেউ খেলাধুলা, আবার কেউ অভিযান বা গোয়েন্দা কাহিনি পছন্দ করে। তার পছন্দকে গুরুত্ব দিলে বই পড়ার আগ্রহ বাড়ে। ধীরে ধীরে এই অভ্যাস মোবাইলের পেছনে ব্যয় করা কিছু সময়কে অর্থবহ কাজে ব্যবহার করতে সাহায্য করতে পারে।
|| আত্মবিশ্বাস ও মূল্যবোধ ||
জীবনে প্রতিটি মানুষ একইভাবে সফল হয় না। কেউ দ্রুত সফল হয়, কেউ বারবার ব্যর্থ হয়েও চেষ্টা চালিয়ে যায়। সৃজনশীল বইয়ে আমরা এমন অনেক চরিত্রের দেখা পাই। যারা বাধা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যায় তাদের জীবন থেকে শিক্ষার্থীরা ধৈর্য, সাহস, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের অনুপ্রেরণা পেতে পারে। মূল্যবোধ এভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
জীবনী ও স্মৃতিকথা পড়লে বিজ্ঞানী, লেখক, সমাজসংস্কারক কিংবা অন্য কৃতী মানুষের জীবনসংগ্রাম সম্পর্কে জানা যায়। বোঝা যায়, বড় কাজের পেছনে শুধু প্রতিভা নয়, নিয়মিত চেষ্টা, ভুল থেকে শেখা এবং পরিশ্রমও গুরুত্বপূর্ণ।
সততা, ন্যায়বোধ, দায়িত্বশীলতা ও মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে সাহিত্য ভাবতে শেখায়। বই সরাসরি কাউকে ভালো মানুষ বানিয়ে দেয় না, কিন্তু ভালো-মন্দ বিচার করার এবং নিজের আচরণ নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করে।
|| শিক্ষার্থীরা কীভাবে বই পড়ার অভ্যাস গড়বে ||
বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে খুব বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় দিয়ে শুরু করা যায়। প্রথমেই কঠিন বই পড়তে হবে, এমন কোনো কথা নেই। বয়স ও আগ্রহ অনুযায়ী ছোটগল্প, ছড়া, কবিতা, কিশোর উপন্যাস, জীবনী কিংবা বিজ্ঞানবিষয়ক বই দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।
বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি পাঠাগারকে আনন্দময় করে তুলতে হবে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বই পড়তে উৎসাহিত করতে পারেন এবং পড়া বই নিয়ে ছোট আলোচনা, গল্প বলা কিংবা নিজের অনুভূতি লেখার সুযোগ দিতে পারেন। পরিবারেও বই পড়ার পরিবেশ থাকা জরুরি। অভিভাবকেরা নিজেরা বই পড়লে শিশুরা অনেক সময় তাঁদের অনুসরণ করে।
বই পড়াকে শাস্তি কিংবা বাড়তি পড়ার চাপ হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রতিটা বই পড়ার পর পরীক্ষা নেওয়া বা নম্বর দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। বই পড়ে কী ভালো লাগল, কোন চরিত্র মনে দাগ কাটল, কোন প্রশ্ন তৈরি হলো, এসব নিয়ে স্বাভাবিক আলোচনা করাই যথেষ্ট।
|| বিলাসিতা নয়, সুস্থ মানসিক বিকাশ ||
শিক্ষার্থীদের জন্য সৃজনশীল বই পড়া কোনো বিলাসিতা নয়; সুস্থ মানসিক বিকাশের একটা ধাপ। ভাষার দক্ষতা, কল্পনাশক্তি ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ উপায়ও। পাঠ্যবই পরীক্ষায় ভালো করার প্রস্তুতি দেয়, আর সৃজনশীল বই জীবনকে নানা দিক থেকে বুঝতে সাহায্য করে। দুটি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক।
আমরা যদি এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা শুধু তথ্য মুখস্থ করবে না, নিজের মতো করে চিন্তা করবে; শুধু নিজের সাফল্যের কথা ভাববে না, অন্যের কষ্টও বুঝবে; শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করবে না, প্রযুক্তিকে বিবেচনা করে কাজে লাগাবে, তাহলে তাদের বই পড়ার সুযোগ করে দিতে হবে।
ভালো বই কখনো নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়, কখনো অজানা জগতের দরজা খুলে দেয়, কখনো নিজের ভুল বুঝতে সাহায্য করে। বইয়ের এই শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে শিক্ষার্থীরা শুধু ভালো শিক্ষার্থী নয়, আরও চিন্তাশীল, সংবেদনশীল ও দায়িত্ববান মানুষ হয়ে উঠতে পারবে।
শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া মানে তাদের হাতে শুধু কিছু পৃষ্ঠা তুলে দেওয়া নয়; তাদের সামনে পৃথিবীর দরজাও খুলে দেওয়া হয় তখন।
|| ঘরে ঘরে লাইব্রেরি গড়ে তোলার আন্দোলন ||
শিশুকাল থেকে সন্তানদের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেড়ে নিচ্ছে মুঠোফোন। দীর্ঘদিন ধরে দেখছি ধ্বংস; ঘরে ঘরে চলছে হাহাকার। আর তাই মনের চিকিৎসক এবং কথাসাহিত্যিক হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে চালাচ্ছি এই আন্দোলন।
আন্দোলনের স্লোগান হলো:
‘ঘরে‘ঘরে ঘরে লাইব্রেরি গড়ে তুলুন’,
‘শিশুর শোবার ঘরে লাইব্রেরি গড়ে তুলুন’,
‘বইমুখী প্রজন্ম গড়ে তুলুন’,
‘বইমুখী পরিবার গড়ে তুলুন’।
প্রতিদিনের ক্ষুদ্র বইমেলায় এসব স্লোগানের ফল পাচ্ছি। প্রতিদিন ক্ষুদ্র বইমেলার আয়োজন করছি প্রফেশনাল ফিল্ডের চত্বরে। অনেক পরিবারের স্বজনরা এসে সেখান থেকে টুকটাক বই কিনছেন। শিশুরাও। তাদের উৎসাহে অটোগ্রাফসহ ছবি তুলে তা ফেসবুকে প্রচার করছি জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য। এই ক্ষুদ্র উদাহরণটি সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার এখনই সময়। আরও বড় বিপর্যয় হানা দেওয়ার আগেই এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।
ইতিমধ্যে খবর পেয়েছি, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি দেশে শিশুদের মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণের ওপর আইন পাশ করা হয়েছে কিংবা হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে। আরও খবর পেয়েছি, বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেখছিও, মোবাইল আসক্তি প্রবল প্রতাপশালী কোকেনের নেশার চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। উঠছে।
|| দেশে দেশে মুঠোফোন ব্যবহারে আরোপিত হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা ||
কেন?
কারণ বিশেষজ্ঞরা দেখছেন শিশুদের ভবিষ্যতের অশনিসংকেত। এজন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এই উদ্যোগে আমাদের দেশেও প্রথমেই সামিল হতে হবে পরিবারকে। সতর্ক হতে হবে বাবা-মাকে। কারণ শুধু আইন পাশ করে বিপর্যয় রোধ করা যাবে না। সন্তানের ভবিষ্যৎ সুগঠিত করতে হলে ঘরের পরিবেশে বই পড়ার সংস্কৃতি চালু করতে হবে সবাইকে।
বই পড়া হোক সন্তানকে উৎসাহিত ও সর্তক করার প্রথম ধাপ।
|| অভিজ্ঞতার পরিধি ||
উপরে আলোচিত প্রতিটি বিষয়কে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বই মানুষের অভিজ্ঞতার পরিধি বাড়ায়। পাঠক বুঝতে শেখে, পৃথিবী শুধু নিজের পরিবার, বিদ্যালয় কিংবা পরিচিত বন্ধুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, পৃথিবীর সবার।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন