খাবারের এক প্রাচীন পদ্ধতির নাম ‘মোচা’

অ+ অ-

 

মোচাচট্টগ্রামের একটি পরিচিত আঞ্চলিক শব্দ। মোচা আবহমান গ্রামবাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম স্মারক। ভাত-মাংস-তরকারি একসাথে কলার বরকে বিশেষ শৈল্পিক পদ্ধতিতে মোড়ানো অতি লোভাতুর খাবারের এক প্রাচীন পদ্ধতির নামই মোচা। উন্নত ভোজের বিচারেও মোচার সামাজিক অবস্থান ছিল সমুজ্জ্বল। বিশেষ সৌখিন মনোলোভা ও দরবারি খাবার ছিল মোচাভোজ। দূর যাত্রাপথে বুভুক্ষু পথিকের খাবারের অবলম্বন হিসেবে তৎসময়ে এই মোচার কদর ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সেই সময় নিরাপদ খাবার এবং সহজ বহনযোগ্যতার কারণে মোচার কদরে জুড়ি ছিল না। সময়ের আবর্তে উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বর্তমানে মোচার ব্যবহার প্রায় বিলুপ্তির পথে। যেটুকুন প্রচলন আছে, তা কেবল ঐতিহ্য ধরে রাখার কৌশল মাত্র। তবে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী যারা জুম চাষ করে তাদের মাঝে এখনও মোচা বহনের রেওয়াজ বিদ্যমান আছে। তখনকার সময়ে গৃহস্থালির ব্যবহার্য মাটির তৈজসপত্র, বেনোবেতের ডুলা, ছাম্মায়৩  ভরে কিংবা কাপড় মুড়িয়ে খাবার বহন করলে অল্প সময়ের ব্যবধানে নষ্ট হয়ে যেত বলে তারা বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে মোচার প্রচলন করেন। কলার পাতা আগুনে হালকা সেঁকে ভাত-তরকারি একীভূত করে নিশ্ছিদ্র তরিকায় মোচা বাঁধলে ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাস ও ইস্ট প্রকৃতির অনুজীব সহজে খাবার আক্রমণ করতে পারে না বিধায় দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মোচার খাবারগুলো নষ্ট হয় নাঅনেকটা বর্তমান প্রচলিত হট পট বা ফুড ক্যারিয়ারের কাজ দেয়। তাই তখনকার মানুষ খাদ্য সংরক্ষণের উন্নত প্রযুক্তি হিসেবে মোচার ব্যবহার করতেন। তৎসময়ে মোচার এতই প্রচলন এবং জনপ্রিয়তা ছিল যে এটি সর্ম্পকের অন্যতম নিদর্শনে পরিণত হয়। যেমন, ভাই-বোনের সম্পর্কের একটি বহুল প্রচলিত দাস্তান ছিল এ রকম:

বইনে বাঁধে মোচা,
ভাইয়ে চাঁছে
ওঁচা

 

মোচা বাঁধার পদ্ধতি

মোচা বাঁধার পদ্ধতি যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা চমৎকার এক শিল্পর্কম। মোচা তৈরি করতে পারা তখনকার মহিলাদের বড়সড় যোগ্যতা হিসাবে বিবেচিত হতো। নানি-দাদিরা পরিবারের বউ-ঝিদের, হাতে-কলমে মোচা বাঁধার নিয়ম শেখাতেন। এই কাজে ছেঁড়াফাটা পড়েনি এমন ৩-৪টি আস্ত কলাবরক গোড়া থেকে কেটে নিয়ে চুলার আগুনে হালকা সেঁকে নিতে হয়।

এতে কলাপাতা নরম হয় এবং টান পড়লে সহজে ছিঁড়ে না। মোচা মোড়ানোর জন্য পরিমাণমতো কলার চাট্টা  অথবা নারিশের পাট্টা রশির মতো করে তৈরি করে নিতে হয়। সেঁকা কলার বরকগুলো পুকুরে অথবা পরিষ্কার পাত্রে ভালো করে ধুয়ে নিতে হয়। চাটাই, পাটি অথবা চ্যাপ্টা কুলা বা চালুনির ওপর নিখুঁতভাবে কলার বরকগুলো এমনভাবে বিছিয়ে রাখা চায়, যাতে কোনো ছিদ্র না থাকে। বিছানো কলারবরকে সরিষার তেল মেখে হালকা চিকন লবণ ছিটিয়ে মোচার জন্য রান্না করা ভাতগুলো গোলাকৃতি করে রাখা হয়। এবার মোচাভাতের মাঝখানে গর্ত করে এতে ঝোল ছাড়া রান্না করা পরিমাণমতো তরকারি হাতে সাজিয়ে দিয়ে ভাতগুলো তরকারির চারপাশে ভালোভাবে এঁটে দিতে হবে। নতুন মরিচ চুরা ও ভাজি-র্ভতাগুলো ভাতের ওপর অথবা পাশে রেখে বিছানো কলারবরক নিখুঁতভাবে মুড়িয়ে নিয়ে কলার চাট্টা অথবা নারিশ পাট্টার রশি দিয়ে অনেকটা বাবুই পাখির বাসা বোনার তরিকায় শৈল্পিকভাবে প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে মোচা তৈরি করতে হয়।

 

মোচার রেসিপি

অধিকাংশ মোচায় বিন্নি চাউলের ভাত ব্যবহৃত হয়। বিন্নি ভাতে প্রাকৃতিক তেল, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ভিন্ন ধরনের স্টার্চ, অম্লীয় প্রকৃতি ও আঠালো গঠন আছে বিধায় জীবাণুর বৃদ্ধি দমন করে, ফলে বিন্নি ভাত তাড়াতাড়ি নষ্ট হয় না। এ কারণে আগেকার চাষিরা তাদের চাষের জমির কিছু অংশে অবশ্যই বিন্নি ধানের চাষ করতেন, যাতে মোচায় ব্যবহারে সুবিধা হয়। কালাবিন্নি, সাদাবিন্নি, মুইশাবিন্নি, লুম্ব্রোবিন্নি, ভোড়াবিন্নিসহ বিভিন্ন জাতের স্থানীয় নামের বিন্নি চাউলের ভাত মোচায় ব্যবহার হয়। বিন্নি ভাত না থাকলে কখনো কখনো ভোড়াভাতও মোচায় ব্যবহার করা যায়। মোচায় বেশিরভাগ ঝোল ছাড়া রান্না মাংসের ব্যবহার হয়। বউ নাইয়র এবং ফিরানিতে অথবা পোয়াতিকে হাঁদি খাওয়ানোসহ সকল লুইত-সম্পাতে১০ মুরগির দুরুস১১, চিংড়িমাছ, ভাজা ডিম এবং আস্ত মাছ ফ্রাই করেও মোচায় দেওয়া হয়। সরিষা তেলে মাখা মরিচ চুরা বা অন্য যেকোনো ভাজি-ভর্তাও বিশেষ মোচায় রেসিপি হিসেবে থাকে। ক্ষেত্রবিশেষে এক পোয়া পরিমাণ চাল থেকে চার-পাঁচ কেজি পর্যন্ত চাউলের বিভিন্ন সাইজের মোচা তৈরি করা যায় এবং সাথে চার-পাঁচটি দুরুস, দশ-বিশটি ডিম, চিংড়ি এবং ঝোল ছাড়া রান্না গোস্ত দিয়েও বড় মোচা তৈরি করা যায়। তখনকার সময় দাদি-নানি ও মায়ের হাতের মোচার কদর ছিল সর্বাধিক।

 

মোচার ব্যবহার

গ্রাম বাংলার স্বাতন্ত্র্য লোকসংস্কৃতির আঁতুড়ঘর হিসাবে ধরা যায় কক্সবাজার জেলার দক্ষিণাঞ্চলকে। এই জেলার অন্তর্গত উখিয়া-টেকনাফ উপজেলা দুটি নাফ নদী সীমান্তঘেঁষা বার্মা১২ মুল্লুক১৩ আরকান রাজ্যের এ পারে অবস্থিত। স্বাধীন আরকান রাজ্যের (১৪৩০-১৭৮৪ খ্রি.) আমলের অনেক আগে থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের আরকানে বসবাস। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম বণিকেরা সপ্তম মতান্তরে নবম শতক থেকে বণিজ্য ও দাওয়াতি মিশনে বঙ্গোপসাগরের উপকূল ধরে নাফ নদীর চ্যানেল হয়ে মিয়ানমার যাতায়াত করতেন। নাফ নদীর এপার-ওপার বসবাসরত স্থানীয়রা আরব বণিকদের সাহচর্যে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে এবং একই সংস্কৃতি লালন করে। তাই এ অঞ্চলের মানুষ বাঙালি সংস্কৃতির চেয়ে রোহিঙ্গা মুসলিম সংস্কৃতির সাথে বেশি পরিচিত ছিল। সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তি-পূর্ব যুগে সংস্কৃতির বিকাশ তেমন গতি পেত না। এক অঞ্চলের আচার-অনুষ্ঠান অন্য অঞ্চলে অনেকটা অপরিচিতই থেকে যেত। তাই প্রয়োজনই আবিষ্কারের প্রসূতিএ হিসাবে তখনকার সময় নিরেট গ্রামীণ এই জনপদ থেকেই বহু স্বতন্ত্র গ্রামীণ সংস্কৃতির উদ্ভব ঘঠে। এর মধ্যে অন্যতম মোচার প্রচলন। মোচা প্রচলনের সময়কাল নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব না হলেও এ কথা সত্য যে মোচার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল বর্তমান মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যসহ পুরো অঞ্চলে মোচার প্রচলন ছিল খুবই জনপ্রিয়। যদিও তখনকার পশ্চাদপদ প্রান্তিক এই জনপদের সংস্কৃতি ও সমাজ চিত্রের ওপর লিখিত তেমন কোনো দালিলিক বই-পুস্তক নেই, তবে গ্রামের বয়স্ক মহিলাদের মুখে মুখে সংরক্ষিত বেশ কিছু হঁলা পাওয়া যায়। এমনই  গ্রামের এক বয়স্ক মহিলা জুহুরা খাতুনের কণ্ঠে তখকার সময়ের মছন১৪ আলী দোলার হঁলাতে মোচার বিষয়টি এভাবে এসেছে:

দাদি দাদি বুলম রে, অ হলিজার দাদি/ দিতা রে ভাতর মোচা বাঁধি রে, মর হাঁয় হাঁয় রে। নারিশর পাট্টা তুলি অ আদরের দাদি/ বাঁধি ল বিনি ভাতর মোচা রে, মর হাঁয় হাঁয় রে। ভাতর মোচা পেঁজত লই১৫  মছন দোলা ভাই রে/ যারগই-দে লুওদাইং পাড়া রে১৬ মর হাঁয় হাঁয় রে।

 

মামলা-মোকদ্দমা ও বাণিজ্যিক যাত্রার ক্ষেত্রে মোচার ব্যবহার

পাকিস্তান আমলেও [১৯৪৭-১৯৭১ খ্রি.] চট্টগ্রামের দক্ষিণ অঞ্চলে তেমন গাড়ি-ঘোড়ার প্রচলন ছিল না। কক্সবাজার পর্যন্ত অল্প সংখ্যক গাড়ি চলাচল করলেও কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সুবিধামতো পায়ে হাঁটার রাস্তাও ছিল না। সমুদ্র চর ধরে পায়ে হেঁটে মামলা-মোকদ্দমা ও বাণিজ্যিক কাজে মানুষ টেকনাফ-কক্সবাজার সফর করতেন। পাকিস্তান আমলের শেষদিকে কক্সবাজার থেকে বালুখালী পর্যন্ত স্বল্প পরিসরে রাস্তা চালু হলেও বালুখালী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাম্পানে করে যাতায়াত করতে হতো। এ সময় মামলা-মোকদ্দমার বাদী-বিবাদীরা সর্ম্পূণ পায়ে হেঁটে অথবা নাফ নদী দিয়ে বালুখালী পর্যন্ত সাম্পানে এবং বাকি অংশ পায়ে হেঁটে কক্সবাজার যাতায়াত করতেন। ব্যবসায়ীরা নিত্য প্রয়োজনীয় মালামালগুলো এক হাট থেকে অন্য হাটে বাজারজাত করতেন সম্পূর্ণ কাঁধে বহন করে। এমন যাত্রায় তারা ৩-৪টি পর্যন্ত মোচা সাথে নিতেন। খাবারের ওয়াক্ত হলে এক বেলার জন্য একটি করে মোচা খেয়ে নিতেন। এমন সফরের দ্বিতীয় দিনের মোচাগুলো গুড় দিয়ে তৈরি করা হতো, যাতে তরকারির কারণে মোচা নষ্ট না হয়।

 

বউ জুরার১৭ ক্ষেত্রে মোচার ব্যবহার

নিকট অতীতেও কক্সবাজারের দক্ষিণাঞ্চলে জনাকীর্ণ বসতি ছিল না। এক গ্রামে অনধিক ২০-২৫টি পরিবার বসবাস করত। মাত্র ৭ ঘর নিয়ে পাড়া ছিল বলে সাতঘইজ্যা১৮ পাড়া এবং ৩ ঘর নিয়ে পাড়া ছিল বলে এখনো তিনঘইজ্যা পাড়া নামে পাড়া আছে। এই নামের পাড়াগুলোতে বর্তমানে ৫০০ থেকে ১০০০-এর অধিক বাড়িঘর রয়েছে। তখনকার সমাজব্যবস্থা ছিল খুবই রক্ষণশীল। সেই সময়ে মেয়েরা ঘরের বাহির হতো না। বউ জুরার ক্ষেত্রে তার মেয়েকে চাঁদ-সুরুজও দেখেনি এ কথা বলতে পারাটা মেয়ের বাবার জন্য গর্বের বিষয় ছিল। কোনো পরিবারে বিয়ে উপযুক্ত মেয়ে আছে কি না তা জানা খুবই দুরূহ ব্যাপার ছিল। তাই আগেকার সময় মেয়ে বালেগ১৯ হলে যেদিন ধোয়াই২০ তুলত সেদিন আত্মীয়স্বজন ডেকে অনুষ্ঠান করে খাওয়ানো হতো মূলত এই ঘরে বিয়ে উপযুক্ত মেয়ে আছে এ কথা জানান দেবার উদ্দেশ্যে এমন আয়োজন করা হতো, কেউ বউ খুঁজছে এমন সংবাদ পেলে যাতে তারা দেখিয়ে দিতে পারে যে এই ঘরে একটা বিয়ে উপযুক্ত মেয়ে আছে।

অপরদিকে বিয়ে উপযুক্ত ছেলের জন্য তার পরিবারের পক্ষ থেকে উপযুক্ত মেয়ে খোঁজাখুঁজি ও ঠিকফর্দ করাকে বউ জুরা বলে। বউ জুরা পর্ব ছিল ছেলের পরিবারের জন্য আনন্দের মহোৎসব। আত্মীয়রা বউ দেখতে বের হতো বগলে ছাতা এবং গামছায় ভরে ভাতের মোচা কোমরে বেঁধে। এভাবে দিনের পর দিন, পাড়া থেকে পাড়া, গ্রাম থেকে গ্রামান্তর, ঘুরে ঘুরে বিয়ে উপযুক্ত মেয়ের খোঁজখবর নিতেন। এ ক্ষেত্রে ছেলের মা-দাদিরা হঁলামুখে সযত্নে স্পেশাল রেসিপির মোচা তৈরি করে দিতেন, কেননা যাত্রাপথে তখন খাবারদাবারের অন্যতম অবলম্বন ছিল মোচা। জুহুরা খাতুনের কণ্ঠে তখকার সময়ের এই বিষয়টি মছন দোলার হঁলায় এভাবে ফুটে উঠেছে:

কলাগাছের ছাট্টা তুলি মছন দোলার মায়ে / বাঁধিল বিনি ভাতর মোচা রে, মর হাঁয় হাঁয় রে। ভাতর মোচা পেঁজত লই মছন দোলার বাবা / যারগই-দে সোনাই বানুর পারা রে, মর হাঁয় হাঁয় রে। দাদি দাদি বুলম রে, অ হলিজার দাদি / দি-তারে ভাতর মোচা বাঁধি রে, মর হাঁয় হাঁয় রে। গরুর হইদ্দার২১  হয়-লে রে মছন আলীর বাবা / আইয়ো রে গরুর ওরাত রে, মর হাঁয় হাঁয় রে। ম্ইুষের হইদ্দার হয়-লে রে মছন আলীর বাবা / আইয়ো রে ম্ইুষর মাইজ্যাত রে, মর হাঁয় হাঁয় রে। গরু-ম্ইুষর হইদ্দার ন রে, অ সোনাইর বাবা/ মুই আইস্সম-দে তোঁয়ার সোনাইর ওকিল রে, মর হাঁয় হাঁয় রে।

 

হাঁদি খাওয়ানো ও নাইয়র যাত্রার ক্ষেত্রে মোচার ব্যবহার

সাত অথবা নয় মাসের গর্ভাবস্থায় বাপের বাড়ি থেকে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে উন্নতমানের খাবারদাবারসহ স্পেশাল মোচা নিয়ে মেয়ে এবং শ্বশুরপক্ষকে তৃপ্তি সহকারে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাওয়ানোকে হাঁদি খাওয়ানো বলে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের এতদঞ্চলে পোয়াতি মেয়েদেরকে বাপের বাড়ির পক্ষ থেকে হাঁদি খাওয়ানো অনেকটা বাধ্যতামূলক সামাজিক রেওয়াজ ছিল। কমবেশি এখনো এই রেওয়াজ চলমান আছে। ভোজনবিলাসীদের নিকট এই খাবারের এখনো কদর কমেনি।

এ কথা সত্য যে তখনকার সময় ঘরের বউ ছিল একটি আজ্ঞাবহ প্রাণী মাত্র। সারা দিন রান্নাবান্না করে শাশুড়িরা যা খেতে দিতেন তা-ই বউকে খেতে হতো। বেশিরভাগ পরিবারে শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী, ননদ-ননদি ও দেবর-ভাশুর খাওয়ার পরে অল্প যা অবশিষ্ট থাকত তা-ই ছেলের বউকে খেতে হতো। নিজে ভাত নিয়ে খাবে অথবা অন্যজনকে খাওয়াবে এরকম সুযোগ শাশুড়িশাসিত বউরা কখনো পেত না। এ বিষয়ে জুহুরা খাতুনের কণ্ঠে সোনাবানের হঁলা:

মরে চাইরগ২২  ভাত রে দাও রে, ওরে সোনাই লাইগ্যে-দে২৩  পেটের ভুক্কান২৪
মা মরা ছিঁয়জ্যা২৫  জাদু রে২৬, ওরে বাপ মরা সোনাবান কন্যা রে।
তোরে চাইর গ ভাত রে নদিম
২৭, ওরে কাওয়া মারিব শাশুড়ি মা
মা মরা সোনাবান কন্যা রে, ওরে বাপ মরা ছিঁয়জ্যা জাদু রে।

এমন পরিবেশে যখন কোনো মেয়ে গর্ভধারণ করত তখন তার ইচ্ছে মাফিক খাওয়ার কোনো সুযোগ থাকত না। একে তো পোয়াতি মনহরেকরকম খাবার অন্বেষা তাকে পেয়ে বসত, তার ওপর অপর্যাপ্ত খাবারদাবার, একজন গর্ভধারিণীকে ব্যাকুল করে তুলত। এ সময় অনেক পোয়াতি চাঁর২৮,  কাঁচা চাউল, ব্যবহার্য সুগন্ধি কাপুর, ভাতের সঁইজ্জা২৯, এমনকি চুলার ঝুঁটি পর্যন্ত খেয়ে তাদের খাদ্য অন্বেষার তৃপ্তি মেটাত এবং বাপের বাড়ির খাবারের আশায় তীর্থের কাকের মতো পথ চেয়ে থাকত। মেয়ের মা-বাবারাও তাদের মেয়ের এমতাবস্থার কথা অবগত থাকতেন। বিশেষ করে মায়েরা এ সময় তাদের মেয়ের চিন্তায় ছটফট করতেন। মায়েরা মেয়ের বাবাকে মেয়ের জন্য দ্রুত মোচা পাঠানোর বাজারসদাই করে দিতে বারবার তাগাদা দিতেন।

এদিকে শুধু মেয়েকে খাওয়ানোর মতো খাবার পাঠালেও শ্বশুরবাড়ির কথার অন্ত থাকে না। অগত্যা বাধ্য হয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির সকলকে খাওয়ানোর মতো ভালোভাবে রান্না করে উন্নত খাবারদাবার কাঁধে বহন করে জামাইয়ের বাড়িতে নিয়ে খাওয়াতে হতো। আর এ সুযোগে মেয়ের মা-বাবা মেয়ের পরানে চায় এমন খাবার-দাবার একত্র করে বড়সড় একটি মোচা বেঁধে মেয়ের জন্য নিয়ে যেতেন। এ দিন মা-বাবার সামনে তাদের মেয়ে তৃপ্তি সহকারে খাবার খেত। এতে বুক ভরা শান্তি নিয়ে মা-বাবা বাড়ি ফিরতেন।

 

শ্রমজীবীদের ক্ষেত্রে মোচার ব্যবহার

তখনকার সময় এতদঞ্চলের শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষই শ্রমজীবী ছিলেন। চাষাবাদ, মাটি কাটা, পাহাড়ে গাছ-বাঁশ কাটা, ঘরবাড়ি তৈরি করা এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মালামাল বহন করার ক্ষেত্রে কায়িক শ্রমের বিকল্প ছিল না। এসব কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের ওয়াক্তমতো বাড়ি ফেরার সুযোগ না থাকলে এক বেলা খাবারের মোচা সাথে নিয়ে যেতেন এবং সময় হলে মোচা খুলে খেয়ে নিতেন। এই বিষয়ে জুহুরা খাতুনের কণ্ঠে তখকার সময়ের সোনাবানের হঁলাতে এভাবে ফুটে উঠেছে:

ভাতর মোচা বাঁধি লই রে সোনাবানের চাচা, লই ল দে গদু দগান  হাঁদত রে, মর হাঁয় হাঁয় রে। গদু৩০গান৩১ হাঁদত৩২ লই রে ও আদরের চাচা, গেল-দে পশ্চিমর মুরাত৩৩  রে, মর হাঁয় হাঁয় রে। বট গাছতলা বসিঅরে সোনাবানের চাচা, মেলিল ভাতর মোচা রে, মর হাঁয় হাঁয় রে। ভাতর মোচা খুলিঅরে অ আদরের চাচা খাইল-দে ভুক্ষের খানা রে, মর হাঁয় হাঁয় রে।

***

কলাপাতা। স্থানীয় মাওলানাদের নিকট জানা যায় আরবি ওরক্বুন শব্দ থেকে বরক শব্দটি এসেছে। ওরক্বুন শব্দের অর্থ পাতা।
২ বাঁশের বেত দিয়ে তৈরি খাদ্যসামগ্রী বহনের পাত্র
৩ বাঁশের বেত দিয়ে তৈরি খাদ্যসামগ্রী রাখার পাত্র
৪ বোনে
৫ দা দিয়ে কেটে কেটে তৈরি করা
৬ হাতে তৈরি বড় লাঠি
৭ কলাগাছের বাকলা থেকে তৈরি করা রশি
৮ নারিশ শাকের কাণ্ড শুকিয়ে সংগ্রহ করা পাট
৯ মরিচ র্ভতা
১০ আদর-আপ্যায়ন করা
১১ আস্ত মুরগির রোস্ট
১২ বর্তমান মিয়ানমারের র্পূব নাম
১৩ দেশ বা রাজ্য, আরবি মুল্ক শব্দ থেকে মুল্লুক শব্দটি এসেছে
১৪ হঁলার নায়কের নাম
১৫ পরনের লুঙ্গিও কোমরের ভাঁজে গুঁজিয়ে নেওয়া
১৬ মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের অর্ন্তগত একটি গ্রামের নাম
১৭ বিয়ের পাত্রী ঠিক করার র্কাযক্রম
১৮ ঘর বিশিষ্ট
১৯ ঋতুমতী বা ঋতুবতী
২০ গোসলের মাধ্যমে পবিত্র করা
২১ খরিদ্দার বা ক্রেতা
২২ চারটি বা অল্প পরিমাণ
২৩ লেগেছে যে
২৪ পেটের ক্ষিধে
২৫ মারা গেছে এমন
২৬ আদরের সন্তান
২৭ দেবো না
২৮ মাটির হাঁড়ি-পাতিলের ভাঙা অংশ 
২৯ পোড়া ভাত
৩০ গোঁজু দা বা গাছ কাটার বড় দা
৩১ দাটি
৩২ কাঁধে
৩৩ পাহাড়