ফ্রিদা কাহলোর জাদুঘরে একদিন

অ+ অ-

 

মেক্সিকো শহরে ১৫০ টির মতন জাদুঘর রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে মেক্সিকো আসার আগে যে সমস্ত জায়গা বা জাদুঘর দেখার পরিকল্পনা ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল ফ্রিদা কাহলোর জাদুঘর। ফ্রিদার প্রভাব বা অস্তিত্ব সারা মেক্সিকো জুড়ে। বিশেষ করে মেক্সিকোর যে কোন স্যুভেনির দোকানে গেলে আপনি ফ্রিদা কাহলোর ইমেজ দিয়ে তৈরি শাল, ফ্রিজ ম্যাগনেট, কানের দুল, পেইন্টিংসসহ নানা কিছু দেখতে পাবেন।

মেক্সিকো সিটিতে আমি বাংলাদেশী ব্যবসায়ী আতিক ভাইয়ের আতিথেয়তায় থেকেছি। যথেষ্ট আন্তরিক ও অমায়িক মানুষ। ওনার বাসার কাছেই, তিনি আমার থাকার ব্যবস্থা করেছেন। আজ রবিবার, ছুটির দিন। এই দিনে মেক্সিকো সিটি নতুন রূপে আর্বিভূত হয়। বিশেষ করেসোকালো এলাকা, ডাউনটাউন চাতুলপেক পার্ক, হিদালগোসহ পুরো শহরে একটি উৎসব মুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বেশ ভালো লাগে দেখতে। একটি প্রাণবন্ত, আনন্দমুখর শহর মেক্সিকো সিটি। আতিক ভাইয়ের বাসার কাছাকাছি মেট্রো স্টেশনের নাম ভিয়া দে করতেস। আমি আজ ফ্রিদা কাহলোর জাদুঘরে যাবো, এর কাছাকাছি মেট্রো স্টেশনের নাম হচ্ছে ফেনেরাল আনায়া। মেক্সিকো সিটিতে চলাচলের জন্য আমি মেট্রো কার্ড কিনে নিয়েছিলাম। সিটির ভিতর আপনি যেখানেই যান ভাড়া পড়বে আট পেসো। এক পেসোতে বাংলাদেশী ছয় টাকা পাওয়া যায়। সেই হিসাবে ভাড়া বেশ সস্তা। ভিয়া দে করতেস  থেকে চারটি স্টেশনের পরেই ফেনেরাল আনায়া। এটা ব্লু লাইন বা লাইন নং দুই। মেট্রো স্টেশন থেকে নেমে পায়ে হেঁটে কায়োকান যেতে হবে, সময় লাগবে আনুমানিক ২০/২৫ মিনিট। যে কোন শহর ঘুরে দেখতে হলে হাঁটার বিকল্প নেই। মেক্সিকো সিটি বেশ বড়। এখানে হাঁটতে হয়ও বেশি। তবে এত সুন্দর হাঁটার পরিবেশ, নানা রঙ্গে রঙিন বাড়িঘর, সবুজের সমারোহ আপনাকে কখনো ক্লান্ত করবে না। আজ কেন জানি শুধু বাড়ি ঘরের রং-বেরং চোখে পড়ছে! ঠিক করলাম, ফ্রিদার জাদুঘরে যাবার পথে শুধু বাড়িঘরের ছবি তুলবো। বাড়ির নাম্বার লেখার কায়দাগুলোও বেশ শৈল্পিক। মেট্রো স্টেশন থেকে বরাবর এক রাস্তা ধরেই গেলাম কায়োকানের দিকে। পথে লিও ট্রটস্কি জাদুঘরের সাইনবোর্ড দেখতে পেলাম। তার একটু পরেই আমার এক মেক্সিকান বন্ধুর বইয়ের দোকান। কদিন আগেই মেক্সিকো থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার সংকলন স্প্যানিশে অনুবাদ প্রকাশ করেছেন তিনি। আমি বন্ধুকে বললাম, বাংলাদেশে ও লাতিন সাহিত্য অনূদিত হচ্ছে। আমার জানা মতে, বাংলা ভাষায় ৩০ টিরও বেশি বই লাতিন থেকে বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এদের মধ্যে রাজু আলাউদ্দীন, আনিসুজ জামান, রফিক-উম-মুনীর, আলম খোরশেদ, জি এইচ হাবীবের নাম উল্লেখযোগ্য।

ফ্রিদা কাহলোর জাদুঘরে লেখক

রবিবার বলে রাস্তায় সব জায়গায় লোকজনের উপস্থিতি সমান নয়। একমাত্র পর্যটক প্রধান জায়গাটিতেই বেশি লোক সমাগম। বেশ আরামেই হাঁটছিলাম। মাঝে মধ্যে রাস্তার দুপাশের বাড়ির নাম্বারসহ রাস্তার ছবি তুলতে তুলতে যাচ্ছি। লক্ষ্য করলাম, মেক্সিকোতে বিভিন্ন দেশের শহরের নামে রাস্তা রয়েছে। বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ, এমন কি বিভিন্ন দেশের নামেও রাস্তা রয়েছে। মনে হলো, মেক্সিকোতে বাংলাদেশ বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান নামে একটি রাস্তার নামকরন হলে মন্দ হয় না! পরবর্তী সময়ে আমি আমাদের দেশের রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলামকে বলেছি, এ বিষয়ে একটা উদ্যোগ নিলে ভাল হয়। রাষ্ট্রদূত অসম্ভব সজ্জন এবং বিনয়ী মানুষ। নিজে ভাল গান এবং পেইন্টিং করেন। আবিদা আপা জানালেন, ইতিমধ্যে তিনি চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশ ও মেক্সিকোর কূটনীতিক, বানিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক উন্নয়নের। তারই ফলে মেক্সিকান সরকার সম্প্রতি শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য একটি জায়গা দিয়েছে। খুব শীঘ্রই বাংলাদেশ দূতাবাস শহীদ মিনার নির্মাণের কাজে হাত দেবেন এবং এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশীদেরও অবদান রয়েছে।

ভ্রমণে এই হচ্ছে সুবিধা বা অসুবিধা। প্রসঙ্গ-অপ্রসঙ্গে নানা কথা চলে আসে। যাই হোক, ফ্রিদা প্রসঙ্গে আসি, ফ্রিদা কাহলোর জাদুঘরটি রয়েছে ২৪৭ লনদ্রেস রোডে। হাতে যথেষ্ট সময় নিয়ে এসেছি। ফ্রিদা মিউজিয়ামে যাবার টিকিট বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত অক্টাভিও আগেই অনলাইনে কেটে রেখেছিলেন। এই জাদুঘরে যাবার জন্য অগ্রিম টিকিট অনলাইনে কেটে রাখতে হয় এবং সেখানে সময় ও নির্ধারণ করা থাকে। দুপুর ১ টা ৪৫ মিনিটে আমার প্রবেশ সময়। হাতে প্রচুর সময় থাকায় আশেপাশের জায়গাগুলো ঘুরতে বের হলাম। এখানে এই এলাকায় হাঁটলে মনে হবে আপনি ইউরোপে হাঁটছেন। রাস্তার নাম যেমন প্যারিস, লন্ডন, বার্লিন, ভিয়েনা ইত্যাদি রয়েছে। ফ্রিদা কাহলোর জাদুঘরের পাশেই রয়েছে একটি সুন্দর স্যুভেনিরের দোকান। নাম OJO Amulets, খুবই চমৎকার সাজানো ও গোছানো। স্যুভেনিরের দোকান এমনই ছবির মতন সাজানো গোছানো হওয়া উচিত। সিঁড়ি বেয়ে ২য় তলায় উঠলাম। দোকানদার খুব আন্তরিক ও ভালো ইংরেজি বলেন। অনুমতি নিয়ে দোকানের ভিতর ছবি তুললাম এবং জানতে চাইলাম, মেক্সিকান টুপি [সমবেরো] সম্পর্কে, উনি জানালেন চিয়াপাস শহরে  খুব ভাল মেক্সিকান টুপি প্রস্তুত হয়। চিয়াপাস, মেক্সিকো সিটি থেকে ৮৩৯ কিলোমিটার দূরে, গুয়েতেমালা বর্ডারের কাছে। হাঁটার দূরত্বেই লিও ট্রটস্কির জাদুঘর। প্রবেশমূল্য ৭০ পেসো। বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্সের কার্ড দেখিয়ে অর্ধেক ডিসকাউন্ট পেয়ে ৩৫ পেসো দিয়ে টিকেট কেটে ঢুকলাম। লিও ট্রটস্কি ১৯০৫ এবং ১৯১৭ সালের রাশিয়ান বিপ্লবে নেতৃস্থানীয় বড় ভূমিকা পালন করেছেন। রাশিয়ান গৃহযুদ্ধের সময় রেড আর্মিকে সংগঠিত করার জন্যও বিখ্যাত তিনি। ১৯২৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে নির্বাসিত হওয়ার পরে লিও ট্রটস্কি ফ্রান্স, নরওয়ে এবং তুরস্কের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোতে আশ্রয়ের সন্ধান করেছিলেন। পরে ১৯৩৬ সালে মেক্সিকোতে আশ্রয় নেন। এই বাড়িতেই লিও ট্রটস্কি মেক্সিকো সিটিতে তার স্ত্রী নাতালিয়া সেদোভাকে নিয়ে বসবাস করতেন। সেখানেই তাকে ১৯৪০ সালে হত্যা করা হয়েছিল।

দর্শনার্থীরা ফ্রিদা কাহলোর ছবি দেখছেন

খুবই ছোট জাদুঘরটি দেখতে তাই বেশি সময় লাগেনি। খুব বেশি লোকজনও নেই। ট্রটস্কিকে বিদায় জানিয়ে ফিরে এলাম ফ্রিদার মিউজিয়ামের সামনে। মিউজিয়ামের সামনে খুব সুন্দর করে টাইম চার্ট দেয়া আছে। যাতে সময় অনুযায়ী লোকজন নিদিষ্ট লাইনে দাঁড়াতে পারে। মিউজিয়ামের প্রবেশপথের উল্টোদিকে রাস্তায় অল্পকিছু ভ্রাম্যমান স্যুভেনিরের দোকান ও কয়েকজন ডাব বিক্রেতা আছে। গরম বিধায় ডাব কিনলাম ৫০ পেসো দিয়ে। কয়েকজন মহিলা ফ্রিদার শাল হাতে নিয়ে বিক্রি করছে। ৩০০ পেসো দাম চাইল। তবে দামদামি করে কিনতে হয়। একটু হেঁটে পাশেই রাস্তার ওপর মেক্সিকান রঙিন অসাধারণ চাদর বিক্রি করছে এক দম্পত্তি। ৬০০ পেসো দাম চাইল এবং পরে ৩৫০ পেসোতে কিনতে সক্ষম হই। মিউজিয়ামের সামনে ছাদখোলা ট্যুরিস্ট বাস এসে দাঁড়ালো। এই বাসগুলোতে করে পর্যটকরা শহরের বিখ্যাত বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। যদিও সিংহভাগ লোক বাস থেকে নামেন না। বাসে বসেই ভ্রমণ স্থান ঘুরে বেড়ান এবং ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

হাতের ব্যাগ জমা দিয়ে ফ্রিদার জগতে প্রবেশ করি। সবাই মন্ত্র মুগ্ধের মতন ছবি দেখছে। ফ্রিদা কাহলো ২০০ টি পেইন্টিং এঁকেছিলেন। ফ্রিদা কাহলো ছিলেন একজন মেক্সিকান আধুনিক চিত্রশিল্পী। তার পুরো নাম ম্যাগডালেনা কারমেন ফ্রিদা কাহলোই ক্যান্ডেরন। তিনি ১৯০৭ সালের ৬ জুলাই মেক্সিকো সিটির কয়োকানে জন্মগ্রহন করেন। ফ্রিদা তার বাবা-মা এবং বোনদের সাথে লা কাসা আজুল নামে একটি উজ্জ্বল নীল বাড়িতে বেড়ে ওঠেন। ছয় বৎসর বয়সে তিনি পোলিওতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার পা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফ্রিদা তার জীবনের অনেকটা সময় হাসপাতালে এবং বাইরে কাটিয়েছেন। তার অনেক স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল এবং তিনি অনেক যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন। তার বয়স যখন আঠারো তখন এক বাস দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন তিনি। তাতে ফিদার হাড় ভেঙে যায়। সুস্থ হতে অনেক সময় লেগেছিল তার। এই সময়েই ফ্রিদা ছবি আঁকা শুরু করেন। এই সময়ের থেকে তার আঁকা অনেক আত্মপ্রতিকৃতি, যা তার বেদনা এবং কষ্টকে প্রস্ফূটিত করে।

১৯২৯ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে, তারচেয়ে ২১ বছরের বড় মেক্সিকান শিল্পী দিয়োগা রিভরাকে বিয়ে করেন। রিভেরা দেয়ালে বিশাল বিশাল ম্যুরাল আঁকার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। নানা প্রতিকুলতার মধ্যে উভয় শিল্পীই তাদের কাজ চালিয়ে যান। দুজনেই দেশে ও বিদেশে বিপুলভাবে সমাদৃত হন। বিয়ের পর, ফ্রিদা ঐতিহ্যবাহী মেক্সিকান পোশাক পরতে শুরু করেন। মেক্সিকান লোকশিল্প তার পেইন্টিংগুলোকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। নিজের পরিবার এবং বন্ধুদের জন্য তিনি বেশিরভাগ ছোট ক্যানভাসের তীব্র অনুভূতিজারিত ব্যক্তিগত কাজগুলো এঁকেছিলেন। মৃত্যুর এত বছর পরও তার শিল্পকর্ম আরো উজ্জ্বল ও সংবেদনশীলতায় মায়া জড়িয়ে আছে। গ্যালারিতে মেক্সিকান এই শিল্পীর আইকনিক চিত্রগুলো দিয়ে ক্যালেন্ডার, শুভেচ্ছা কার্ড, পোস্টার পিন, এমনকি কাগজের পুতুলগুলোকে সাজানো রয়েছে। ১৯৩৩ সালে আঁকা তার আত্মপ্রতিকৃতি একটি ৩৪ সেন্ট ইউএস ডাকটিকেটে প্রদর্শিত হয়েছিল। বছর কয় আগে, ২০০২ সালে সালমা হায়েক অভিনীত ফ্রিদা মুভি মুক্তি পায়। যা মূলত শিল্পী ফ্রিদা কাহলোর সাহসী এবং বিতর্কিত জীবনের বায়োপিক। কাহলোর সৃজনশীলতা এবং রিভেরার সাথে উত্তাল প্রেমের সম্পর্কে ফোকাস করে চলচ্চিত্রটি মানুষের কাছে আইকনের বাইরে দেখায়।

ফ্রিদা কাহলোর শিল্পকর্ম

ভিতরে প্রবেশ করার পর নিরাপত্তা কর্মীরা ছবি তোলার জন্য যে টিকিট কিনেছিলাম সেটি থেকে একটি স্টিকার জামার গায়ে সেটে দিলেন যাতে সবাই বুঝতে পারে যে, ছবি তোলার অনুমতি নেওয়া হয়েছে। প্রথম রুমের চারপাশে ফ্রিদার আঁকা ছোট ছোট পেইন্টিং। প্রথম দিকের তার বেশিরভাগ চিত্রকর্ম নিজের পরিবার, বন্ধুদের জীবন এবং আত্মপ্রতিকৃতির। ফ্রিদা একটি চিত্রিত জার্নালও রেখে গিয়েছিলেন, সেখানে কয়েক ডজন চিত্রকর্ম ছিল। শুরুর দিকে চিত্রকলার প্রেরণার জায়গাটি ছিল বাবার বন্ধু শিল্পী ফার্নান্দো ফার্মান্দেস। পরে স্বামী রিভেরা এবং তার বাবা উভয়ের কাছ থেকে শেখা কৌশলগুলোকে সাথে শিল্পে তিনি নিজের পথ সৃষ্টি করেন। ফ্রিদা নিজের এমন এক চিত্রভাষা সৃষ্টি করেছেনযা পরাবাস্তবতা, কল্পনা এবং লোক কাহিনীর উপাদানগুলোকে শক্তিশালী আখ্যানে যুক্ত করেছে। যদিও ফ্রিদা বলেছিলেন—‘তারা ভেবেছিল আমি পরাবাস্তব ছবি আঁকি, আমি তা আঁকিনি, আমি কখনো আমার স্বপ্ন আঁকিনি। আমি এঁকেছি আমার নিজের বাস্তবতাকে। বিমূর্ত শিল্পের প্রতি ২০ শতকের প্রবণতার বিপরীতে তিনি ছিলেন শিল্পে আপোসহীন এক রূপক। তিনি তার জীবদশায় তুলনামুলকভাবে কম পেইন্টিং বিক্রি করেছিলেন। অথচ ২০০০ সালে একটি আত্মপ্রতিকৃতিযা ১৯২৯ সালে আঁকাপ্রায় পাঁচ মিলিয়ন ডলারের বেশি দামে বিক্রি হয়েছিল।

ফ্রিদা কাহলোর ছবির সাথে নির্বাসিত রাশিয়ান বিপ্লবী লিও ট্রটস্কির ছবি দেখলাম। ফ্রিদার সঙ্গে ট্রটস্কির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল অনেক গভীর। দুজনের সংক্ষিপ্ত প্রেমেরও সম্পর্ক ছিল। ফ্রিদা ও তার স্বামী রিভারার উদ্যোগে মেক্সিকান সরকার লিও ট্রটস্কিকে রাজনীতিক আশ্রয় প্রদান করে। সে সময়, তিনি ফ্রিদার পরিবারের সাথে ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত একত্রে ছিলেন।

ছবিতে লিও ট্রটস্কি, ফ্রিদা কাহলো, দিয়াগো রিভেরাসহ অন্যরা 

ফ্রিদা কাহলোর জীবনী অনেক ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ফ্রিদা মুভির পরিচালক টেমর বলেছেন, তিনি কাহলোর জীবনীভিত্তিক ফিল্মটিকে একটি দারুণ, দুর্দান্ত প্রেমের গল্প হিসাবে দেখিয়েছেন। দুবার বিবাহিত, একবার তালাকপ্রাপ্ত এবং অসংখ্যবার আলাদা হয়েছিলেন কাহলো। কাহলো এবং রিভেরার অনেক আলাদা আলাদা সম্পর্ক ছিল। সিনেমায় লেখক আন্দ্রে বেটন, ভাস্কর ইসামু নোগুছি, নাট্যকার ক্লেয়ার বুথে লুস এবং নির্বাসিত রাশিয়ান বিপ্লবী লিও ট্রটস্কির মতো আলোকিত ব্যক্তিদের দ্বারা পরিপূর্ণ কাহলোর জীবন একটি কল্পনাপ্রসূত ক্যানভাস ফুটে উঠেছে।

জাদুঘরের গ্যালারির পেইন্টিংয়ের পাশাপাশি তার শোবার ঘর, রান্নাঘর ইত্যাদি ও দেখা হল। যা খুবই সুন্দর ও শৈল্পিক। মুগ্ধ হয়ে আমরা দেখছি আর ছবি তুলছি। মনে হল, একটি ঘোরের মধ্যে আছি। কিন্তু এক জায়গায় এসে চোখ আটকে গেলফ্রিদার প্রতিকৃতি, যা জীবন্ত হয়ে আছে। খুবই রঙিন বুনন, চোখ আটকানো চিত্রকর্ম। ফ্রিদা তার অসামান্য আত্মপ্রতিকৃতির জন্য পরিচিত কেন, তা বুঝতে পারলাম।

ফ্রিদা একবার ডাক্তার হবার পরিকল্পনা করেছিলেন। জীববিজ্ঞান, প্রানীবিদ্যা এবং শরীরবিদ্যা নিয়েও পড়াশোনা করেছিলেন। ফ্রিদাকে মেক্সিকান সালভাদর দালি বলা যেতে পারে। তিনি লাতিন শিল্পকর্মে পরাবাস্তব উপাদানগুলো গোচরে নিয়ে আসেন। ফ্রিদা কাহলোর কঠিন ভাগ্য তার শিল্পে একটি ছাপ রেখে গেছে। বাস্তবতাকে আমাদের কাছে তার ক্যানভাসে বেদনাদায়ক প্রতিসৃত এক পরাবাস্তব রূপে দেখায়। যদিও কাহলো তার নিজস্ব বাস্তবতা তৈরি করেছেন। বাস্তব জীবনের কষাঘাত আর অভিজ্ঞতা থেকে পালিয়ে নয়, নানা প্রতিকুলতায় পেইন্টিং তার জন্য ছিল একটি গভীর নিরাময়।

ফ্রিদা কাহলোর আত্মপ্রতিকৃতি

জাদুঘরের ভিতর মোটামুটিভাবে ৬০/৭০ জন বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন ভাষার মানুষ। তবে সবার চোখে আনন্দ এবং বিষ্ময়। তৃপ্ত আমাদের চোখ ফ্রিদার অসামান্য চিত্রকর্ম দেখে। ফ্রিদা নিঃসন্দেহে তার সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তার আত্মপ্রতিকৃতিগুলো নারীর যন্ত্রণা, অক্ষমতা, নারীর প্রতি সামাজিক বৈষম্য, লৈঙ্গিক পরিচয়কে প্রধান করে তুলেছিল। তিনি ছিলেন কট্টর বামপন্থি। তার রাজনৈতিক পরিচয় গোপন ছিল না। মেক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টির সভ্যও ছিলেন তিনি। এখানে উল্লেখ্য যে, ভারতের মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন একজন ভারতীয় বিপ্লবী উগ্রবাদী কর্মী ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক। বিংশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত দার্শনিকও তিনি। রায় মেক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টি এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন।

ফ্রিদা কাহলো স্প্যানিশ, ইংলিশ ও জার্মান ভাষায় দক্ষ ছিলেন। ফ্রিদার ২০০ টি পেইন্টিংয়ের মধ্যে সর্বশেষ পেইন্টিং ছিল viva la vida। আমি ফ্রিদা মিউজিয়াম ঘুরে নিচে নামলাম। দেখি, এক জায়গায় ওয়াশরুম, একপাশে পার্কের মতন ছোট খালি জায়গা, বসার সুন্দর স্থান! চারদিকে ব্লু বা নীলরঙের সাথে ছবি তোলার জন্য অনেকেই ব্যস্ত। আমার ছবি তুলে দেবার জন্য একজন পর্যটককে অনুরোধ করি। তিনি তার বান্ধবী নিয়ে আমেরিকা থেকে এসেছেন। পাশে ছোট স্যুভেনিরের দোকান। ফ্রিদার ওপর অনেক বই রয়েছে। দোকানে শোভা পাচ্ছে গয়না, পেইন্টিং, মগ, টি-শার্ট ইত্যাদি রয়েছে ফ্রিদাকেই কেন্দ্র করে। স্যুভেনির দোকান থেকে বের হয়ে দেখি, পাশে একটি ছোট্ট আর্ট ক্যাম্প চলছে। সেখানে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ছবি আঁকছে। অনেক মানুষ, কিন্তু কোথাও কোন কোলাহল নেই। উচ্চস্বরে কথাবার্তা নেই। যে যার মতন স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হয়তো সবাই ঘরে ফিরবে একরাশ প্রশান্তি নিয়ে।

ফ্রিদার আনুষ্ঠানিক মৃত্যুর কারণ ছিল নিউমোনিয়াপালামানির এমাবালিজম। তবে কারো কারো অনুমান, ব্যথানাশক ঔষধের অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে তিনি ১৩ জুলাই ১৯৫৪ সালে মারা যান, মাত্র ৪৭ বছর বয়সে। ফ্রিদার একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়েই লেখা শেষ করছি—‘কিছুই পরম নয়। সবকিছু বদলে যায় এবং চলে যায়।