থেফট: আত্মপরিচয়ের সন্ধান ও বিশ্বাসঘাতকতার অন্বেষণ

অ+ অ-

 

গুরনাহ আমাদের এক চোরের গল্প শোনান। কিন্তু সেই চুরি কি শুধুই অর্থের? নাকি স্মৃতি, পরিচয়, ইতিহাসও চুরি হয়ে যায়? নাকি প্রেম, প্রতিশ্রুতি, বিশ্বাসঘাতকতাও এক ধরনের চুরি?

ডাকপিয়ন দরজায় আস্তে আস্তে টোকা দিচ্ছিলেন, হাতে বাদামি রঙের একটা পার্সেল, যার গায়ে আমার নাম ছাপানো। খোলার পর দেখি, ভেতরে নোবেলজয়ী আব্দুলরাজাক গুরনাহর আসন্ন উপন্যাস Theft-এর এক অপ্রকাশিত খসড়া [১৮ মার্চ প্রকাশিতব্য]। বুকের ভেতরটা ধকধক করতে শুরু করলসেই অনুভূতি, যা বহুদিন পর কোনো পুরনো প্রেমিকার হাতের লেখা দেখে মনে হয়, যেন কাগজের ভাঁজে সময় আটকে আছে।

বইয়ের মলাটের ভাঁজে একটা ছোট্ট পোস্ট-ইট সাঁটা:

‘This is an uncorrected book. Please do not quote for publication until you check your copy against the finished book.’  অবশ্য, এই সাবধানবাণী উপেক্ষা করেই আমি পড়তে শুরু করলাম। হ্যাঁ, কিছু টাইপো ছিলকিন্তু সেসব এমন কিছু নয়, যা বইয়ের যাদুকরী প্রবাহকে ছিন্ন করতে পারে। সামান্য ভুলচুকের মধ্যেও গুরনাহর গদ্য সেই চিরচেনা সুরে আমাকে ঘিরে ফেলছিল, যেন প্রতিটি শব্দ ফিসফিস করে কানে বলে যাচ্ছে, চলো, একটা নতুন দুনিয়ায় যাই!

বইটির শুরুতে আব্দুলরাজাক গুরনাহ, জোসেফ কনরাড-এর Chance থেকে যে বাক্যটি ধার করেছেন; সাধারণভাবে, একজন মানুষের পক্ষে অসাধারণ হয়ে ওঠা ভীষণ কঠিন। এই একটি বাক্য সম্পূর্ণ উপন্যাসটিকে ধারণ করে। 

অসাধারণ হওয়ার প্রয়াস যেন এক ধরনের আত্মপ্রতারণাজীবন তো কোনো রূপকথা নয়। বাস্তবের জগতে অসাধারণতা আসে নিরবচ্ছিন্ন সাধনার মাধ্যমেএক নিঃসঙ্গ যাত্রা, যেখানে ধৈর্য্যের পরীক্ষা চলে প্রতিনিয়ত, ক্লান্তির বোঝা বাড়তে থাকে, সন্দেহ গ্রাস করে, আর চূড়ান্ত সফলতা যদি আসে, তবুও তা হয়তো প্রত্যাশার তুলনায় এক ভিন্ন রূপ নেয়। আর যদি সফলতা না আসে? তবে সেই অনিশ্চিত পরিণতির অপেক্ষায় দীর্ঘ যন্ত্রণার ইতিহাস জমা হয়, আর তার শেষ প্রান্তে এক দুঃস্বপ্নের জীর্ণ অবশেষ ছাড়া আর কিছুই পড়ে থাকে না।

আবদুলরাজাক গুরনাহ, যিনি বর্তমানে ইংল্যান্ডের কেন্টারবেরিতে বসবাস করছেন এবং কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করলেও তাঁর উপন্যাসের অধিকাংশই তানজানিয়াকে কেন্দ্র করে রচিত। তাঁর লেখার মূলে রয়েছে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, বিচ্ছিন্নতার বোধ এবং শৈল্পিক নিরীক্ষার এক অনন্য সংমিশ্রণ, যা তাঁকে আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বর করে তুলেছে।

তাঁর নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হয়ে ওঠার পর প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস Theft সত্যিকার অর্থেই এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। এই উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে তিন তানজানীয় চরিত্রবাদার, করিম ও ফওজিয়াযাঁদের বেড়ে ওঠা ও পরিণতির আখ্যান একীভূত হয়েছে জাঞ্জিবার ও মূল ভূখণ্ড তানজানিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতার মাঝে।

তাঁর লেখনীতে প্রায়শই এক যুবকের পরিবার কর্তৃক বিক্রি হওয়া এবং একপ্রকার গৃহদাসত্বে নিপতিত হওয়ার বিষয়টি ফিরে আসে, যা Theft উপন্যাসেও প্রত্যক্ষ করা যায়। এই থিমটি তাঁর পূর্ববর্তী সফল উপন্যাস Paradise-এও দেখা গিয়েছিল, যেখানে কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র ইউসুফ জন্মগ্রহণ করে কল্পিত শহর কাওয়ায়, তানজানিয়ায়, উনবিংশ শতাব্দীর অন্তিম পর্বে। ইউসুফের পিতা এক হোটেল ব্যবসায়ী, যিনি বিপুল ঋণের ভারে ক্লান্ত হয়ে তাঁর সন্তানকে এক ধনী আরব ব্যবসায়ী, আজিজের কাছে বন্ধক রাখেন। এই বিনিময়ে পিতার ঋণ পরিশোধ হয়, কিন্তু ইউসুফকে নিঃশ্রমিক দাসের মতো কাজ করতে হয়। আজিজের কাফেলায় যোগ দিয়ে সে আফ্রিকার অভ্যন্তরে যাত্রা করে, যেখানে তাঁরা স্থানীয় উপজাতিদের শত্রুতা, বন্য প্রাণী এবং প্রতিকূল ভূখণ্ডের মুখোমুখি হয়। যখন কাফেলা পূর্ব আফ্রিকায় ফিরে আসে, তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং ইউসুফ জার্মান বাহিনীর সম্মুখীন হয়, যারা আফ্রিকার মানুষদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করছিল।

উপন্যাসটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আফ্রিকান সমাজের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে নারীদের সংগ্রামের বিষয়টি উত্থাপন করে। কাহিনির সূচনা হয় উঙ্গুজার এক গ্রাম্য তরুণী রায়ার গল্প দিয়ে, যাকে এক বয়স্ক ব্যক্তি, বকরী আব্বাসের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করা হয়। স্বামীর নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে তার নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের ফলে একসময় সে মিথ্যা অজুহাতে নিজের পিতৃগৃহে ফেরার নাটক সাজায় এবং আর কখনোই বৈবাহিক জীবনে ফিরে যায় না।

তাঁর লেখায় আফ্রিকার ইতিহাস ও পশ্চিমা উপনিবেশবাদের মধ্যেকার জটিল মিথষ্ক্রিয়ার যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা তাঁর সাহিত্যকর্মের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক। তিনি ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে দেখানোর পরিবর্তে এক সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন, যা কেবল সাংস্কৃতিক মিলগুলোকেই উন্মোচিত করে না, বরং ইতিহাসের বহুমাত্রিক প্রভাবকেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরে।

Theft-এ তিনি ঐতিহাসিক উপন্যাসের সীমানা কিছুটা অতিক্রম করে সামাজিক বাস্তবতাবাদে প্রবেশ করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৯০-এর দশকের মধ্যে অবস্থিত এই উপন্যাসে আমরা দেখি যে, বাদার, যে এক পালক পরিবারে লালিত-পালিত হয়েছিল, একসময় বিপথগামী হয়ে পড়লে তাঁকে তাঁর আত্মীয়দের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কৈশোরে যৌবনের দিকে প্রবেশের সময় তাঁর আচরণে পরিবর্তন আসতে শুরু করে, যা পরিবারের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর পালিত বোন, এক নির্দয় চরিত্র, বাদারকে ব্যঙ্গ করে মকোজি নিঃশ্রমিক (বিছানা ভেজানো বালক) বলে ডাকে, কারণ ছোটবেলায় সে ঘুমের মধ্যে বিছানা ভিজিয়ে ফেলত। এই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে উপন্যাসটি তানজানিয়ার ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের জটিলতাকে আলোকিত করে।

বাদারের ভাগ্য এক এতিমের মতোই নিষ্ঠুর। সে কখনোই নিজের প্রকৃত বাবা-মাকে চিনতে পারেনি। ছোটবেলায় কলেরা মহামারিতে তার মা মারা যায়। পরিবারের কেউ জানে না, তার বাবার আসলে কী হয়েছিলএকদিন তিনি নিরুদ্দেশের উদ্দেশে বন্দরে চলে যান এবং আর কখনো ফিরে আসেননি। দার এস সালামের যে বাড়িতে বাদারকে কাজের জন্য পাঠানো হয়, সেখানে তাকে এক ভাড়াটে কর্মচারীর মতোই গণ্য করা হয়; তাদের সাথে রক্তের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তারা সে সত্য গোপন করে। সেই ঘরে সে রান্না করা, বেকিং শেখে এবং ঘরদোর পরিষ্কার রাখতে অভ্যস্ত হয়। তবে তার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী হয়ে ওঠে জমা, পরিবারের মালী, যিনি প্রাচীন জ্ঞানের বাহক এবং বিভিন্ন ইঙ্গিতের মাধ্যমে বাদারকে তার প্রকৃত পরিচয়ের দিকে ধীরে ধীরে ঠেলে দেন।

যদিও শুরুতে বাদারকে ভালোভাবেই রাখা হয়, কিন্তু শিগগিরই তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ আনা হয়। অবশেষে জানা যায়, বাদারের প্রকৃত পিতা বাড়ির মালিক হাজির আত্মীয়, এবং সে একসময় হাজির পিতা, ওসমান চাচার কাছ থেকে টাকা চুরি করেছিল। সেই পুরনো অপরাধের ক্ষোভ থেকেই ওসমান বাদারকে অপছন্দ করেন। তবে ভাগ্যক্রমে, সে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে করিমের সাথে, যে বাড়ির ছেলেটি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য সেখানে বসবাস করতে এসেছে। করিম বাদারকে আশ্রয় দেয় এবং যখন তাকে চুরির অপরাধে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়, তখন করিম তাকে রক্ষা করে।  করিমের গল্প জানার পরই আমরা আবার বাদারের জীবনে ফিরে আসব।

উপন্যাসটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আফ্রিকান সমাজের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে নারীদের সংগ্রামের বিষয়টি উত্থাপন করে। কাহিনির সূচনা হয় উঙ্গুজার এক গ্রাম্য তরুণী রায়ার গল্প দিয়ে, যাকে এক বয়স্ক ব্যক্তি, বকরী আব্বাসের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করা হয়। স্বামীর নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে তার নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের ফলে একসময় সে মিথ্যা অজুহাতে নিজের পিতৃগৃহে ফেরার নাটক সাজায় এবং আর কখনোই বৈবাহিক জীবনে ফিরে যায় না। সমাজের লাঞ্ছনা ও সামাজিক কলঙ্কের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও সে তার তিন বছরের ছেলে করিমকে সঙ্গে নিয়ে নিজের পরিবারে ফিরে আসে। গুরনাহর নারী চরিত্রগুলো সংবেদনশীলভাবে নির্মিত, এবং তিনি পিতৃতান্ত্রিক প্রভাবের বাস্তব প্রতিচ্ছবি চিত্রিত করেন। নারীবাদী তত্ত্বগুলোকে তিনি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে সহজবোধ্য করে তোলেন, বিশেষত আফ্রিকান সমাজে নারীদের অবস্থানের নিরিখে।

আব্দুলরাজাক গুরনাহ || ছবি © Amrei Marie || উইকিপিডিয়ার সৌজন্যে

এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র করিম, তবে শৈশবে মা রায়ার সংগ্রামই তার জীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়। কাহিনির দ্বিতীয় অংশে করিমের জীবনকে অনুসরণ করা হয়প্রথমে সে তার দাদু-দিদার কাছে বেড়ে ওঠে, কারণ রায়া তাকে ফেলে রেখে দার এস সালামে এক ফার্মাসিস্ট হাজিকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করে। দাদু-দিদার মৃত্যু হলে করিম তার সৎ-ভাইয়ের সঙ্গে বসবাস শুরু করে, এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে দার এস সালামে পৌঁছেসেখানেই তার সঙ্গে বাদারের সাক্ষাৎ ঘটে, যা তার জীবনের গতিপথকে নতুন এক দিকে চালিত করে।

বঙ্গো শহরে (দার এস সালাম) করিম তার মায়ের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন করে এবং তার সৎপিতা, ফার্মাসিস্ট হাজির সঙ্গে বেশ ভালো বোঝাপড়া গড়ে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর, সে ফওজিয়াকে বিয়ে করেএক তরুণী, যার জীবনকাহিনি আমরা আগেই তার গ্রাম থেকে শহরে আসার মধ্য দিয়ে অনুসরণ করেছি। Theft উপন্যাসটি এক বিস্তৃত ও সুগঠিত আখ্যান। মাতৃত্বের জটিলতা এবং বিবাহের কঠোর বাস্তবতাকে অতিক্রম করে, ফওজিয়া তার মৃদু মৃগী রোগের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারজনিত ভয় সত্ত্বেও সন্তানধারণ করে এবং অবশেষে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়। কিন্তু তাদের দাম্পত্য জীবন সহজ ছিল নাপরিণতির পরপরই প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা এবং সদ্যোজাতের যত্নের ক্লান্তি তাদের বিবাহে নতুন সংকট সৃষ্টি করে। গুরনাহ এই পারিবারিক সংকটের মধ্য দিয়ে আধুনিক বিবাহের জটিলতাকে বিশ্লেষণ করেন, যা তার আরেকটি প্রিয় আলোচ্য বিষয় এবং তাঁর অন্য উপন্যাস Admiring Silence-এ আরও গভীরভাবে অন্বেষিত হয়েছে।

Admiring Silence গুরনাহর রচনাসম্ভারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস, যেখানে এক নামহীন জাঞ্জিবারি যুবক ষাটের দশকে নিজের দ্বীপ ছেড়ে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমায়, সেখানকার একজন শিক্ষক হয়ে ওঠে এবং এক আন্তঃজাতিগত সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করে। কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্রটি ২০ বছর ধরে তানজানিয়ায় ফিরে যায়নি, এবং অবশেষে সে যখন জাঞ্জিবারে ফিরে নিজের অতীতকে পুনর্মূল্যায়ন করতে চায়, তখন নিজেকে আর সেই ভূমির অংশ বলে মনে করতে পারে না। তার শিকড়ের প্রতি এই দূরত্ব এবং নিজেকে হারিয়ে ফেলার অনুভূতি উপন্যাসটিকে এক গভীর আত্মবিশ্লেষণমূলক উপাখ্যান করে তোলে।

বাদার শেষ পর্যন্ত এক হোটেলে কাজ পায়, কিন্তু তার মনে করিমের স্ত্রী ফওজিয়ার প্রতি এক ধরনের দুর্বলতা গড়ে ওঠে। সে কি এটাকে শুধুই একটা ক্ষণস্থায়ী মোহ বলে উড়িয়ে দিতে চায়, নাকি তার অনুভূতিগুলো আরও গভীর? অন্যদিকে করিম, যে বাবা হওয়ার পর থেকে এক অদম্য অতৃপ্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল, নিজের জীবনের এক জটিল মোড়ে এসে পড়ে। সেই হোটেলেই বসবাসরত এক তরুণ শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় অতিথি, জেরির সাথে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত এক মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করে।

তাঁর লেখায় নস্টালজিয়ার এক শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে, বিশেষত তানজানিয়ার সংস্কৃতি ও খাবারের প্রতি। করিমের মা, রায়ার সংসারে জাঞ্জিবারি খাবারের বর্ণনায় তা বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। উপন্যাসটি সাংস্কৃতিকভাবে গভীরভাবে তাত্পর্যময়একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী এবং আধুনিক। তবে এই পারিবারিক জীবন বাদারের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে, কারণ তার প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ থেকে ওসমান চাচা ও তার ছেলে তাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার জন্য সক্রিয় প্রচেষ্টা চালায়। শেষ পর্যন্ত, করিম তাকে আশ্রয় দেয় এবং নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে, যা বাদারের ভাগ্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।

বাদার শেষ পর্যন্ত এক হোটেলে কাজ পায়, কিন্তু তার মনে করিমের স্ত্রী ফওজিয়ার প্রতি এক ধরনের দুর্বলতা গড়ে ওঠে। সে কি এটাকে শুধুই একটা ক্ষণস্থায়ী মোহ বলে উড়িয়ে দিতে চায়, নাকি তার অনুভূতিগুলো আরও গভীর? অন্যদিকে করিম, যে বাবা হওয়ার পর থেকে এক অদম্য অতৃপ্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল, নিজের জীবনের এক জটিল মোড়ে এসে পড়ে। সেই হোটেলেই বসবাসরত এক তরুণ শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় অতিথি, জেরির সাথে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত এক মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করে।

এবং এখানেই গুরনাহ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আরেকটি চুরি-র ধারণাকে উপস্থাপন করেন। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জীবনের বিশ্বাসভঙ্গ বা প্রতারণার কাহিনি নয়; বরং এক বৃহত্তর উপনিবেশবাদী লুট এবং বর্ণবৈষম্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়। যারা মনোযোগ দিয়ে পড়ে, তারা বুঝতে পারবে যে বিবাহ মানে শুধু একসঙ্গে থাকা নয়এটি একধরনের মানিয়ে নেওয়া, একে অপরকে নতুনভাবে চিনে নেওয়া এবং অজানা বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। গুরনাহ এখানে উপনিবেশবাদ, সম্পর্কের বিশ্বাসঘাতকতা এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার মধ্যে এক জটিল বিন্যাস সৃষ্টি করেছেন, যা তার সাহিত্যের গভীরতাকে আরও প্রসারিত করে।

Theft এক পরিমিত, সুগঠিত উপন্যাস, যেখানে সামাজিক রীতি, চরিত্রের বিকাশ এবং ব্যক্তি তার অবস্থান কীভাবে খুঁজে নেয়এসব বিষয় দক্ষতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি এমন এক পারিবারিক আখ্যান, যা আফ্রিকার ট্র্যাজেডির অতিরিক্ত নাটকীয়তাকে এড়িয়ে গেছে এবং পরিবর্তে মানবিক জটিলতাকে বাস্তবতার আলোকে দেখিয়েছে। গুরনাহর ভাষা সহজবোধ্য, তবে কখনোই সরলীকৃত নয়তিনি এমন এক বর্ণনারীতি ব্যবহার করেন, যা স্বকীয় এবং নতুনতর উপমায় সমৃদ্ধ।

উপন্যাসের অন্যতম স্মরণীয় অংশ হলো ফওজিয়ার বিবাহবিচ্ছিন্নতার উপলব্ধির মুহূর্ত। লেখকের দক্ষতা এই ধরনের সাধারণ ঘটনাকেও গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত করে তোলে:

কিছু কিছু ঘটনা ঘটার পরই পূর্বনির্ধারিত মনে হয়, যদিও আগে তা অসম্ভব বলেই মনে হতো। সে চলে গেছে, এবং মনে হচ্ছে যেন সে চলে যাবে, সেটাই স্বাভাবিক ছিল। সে চলে গেছে, এবং সে যদি ফিরে আসে, যদি আদৌ ফিরে আসে, তবে ফওজিয়া আর সেখানে থাকবে না। সে কারও সঙ্গে কথা বলতে চায় না, অন্তত এখনই নয়। সে সোফায় বসে, জানালার পেছন থেকে আসা সূর্যের আলো তাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। কিভাবে এগোবে, জীবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে কতটুকু উদ্ধার করা সম্ভব, তা ভাবতে থাকে। কিছুদিন ধরেই তার মনে হচ্ছিল, ভালোবাসা ক্রমশ নিঃশেষিত হচ্ছে, তবে এত দ্রুত সবকিছু শেষ হয়ে যাবে, তা সে কল্পনাও করেনি।

গুরনাহর লেখনীতে দাম্পত্যের জটিলতা এবং আত্মপরিচয়ের সংকট মিশে গিয়ে এক পরিপূর্ণ উপন্যাস সৃষ্টি করেছে, যা সমসাময়িক আফ্রিকান সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন।

Theft | Abdulrazak Gurnah | Riverhead Books | 2025 | $30