খান মোহাম্মদ আবদুল হাকিমের জীবন ও কবিতা
কবি খান মোহাম্মদ আবদুল হাকিম [১৯১৯-১৯৭৮] কেন্দুয়া উপজেলার আশুজিয়া ইউনিয়নের সিংহেরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বরেণ্য বাউল কবি জালাল উদ্দীন খাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র। নিজেও ছিলেন একজন বিশিষ্ট কবি, অভিনেতা ও সংস্কৃতি-সংগঠক। দেশভাগোত্তর একটা পিছিয়ে-পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা-সংস্কৃতি-আর্থসামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে সারাজীবন কাজ করে গেছেন।
খান মোহাম্মদ আবদুল হাকিম স্থানীয় আশুজিয়া জেএনসি স্কুল এবং পরে ময়মনসিংহের মৃত্যুঞ্জয় উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। একই বছরে তিনি আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন। পরিবারের প্রিয়জনদের মৃত্যু, নিজের অসুস্থা, অগ্রসর মুসলিম সমাজের উন্নয়নে শিক্ষা-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-সাংগঠনিক তৎপরতা তাঁর উচ্চশিক্ষা অর্জনের আগ্রহকে দমিত করে। বিশেষ করে ১৯৩৩ সালে কবির মা ইয়াকুতুন্নেছার মৃত্যু পিতাসহ পরিবারের সবাইকে বিপর্যস্ত করে।
স্থানীয় রাজিবপুর প্রাইমারিস্কুলে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে ১৯৪২ সালে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৪৪ সালে তিনি সিংহেরগাঁওয়ে নিজ বাড়িতে ‘আবেহায়াৎ সাহিত্য মঞ্জিল’ নামে একটি পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে নাট্যাভিনয় ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। তিনি ‘মোহাম্মদী,’ ‘সওগাত,’ ‘নওবাহার,’ ‘সৈনিক,’ ‘মাহে নও’ ইত্যাদি পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন। ১৯৪৫ সালে কবির একমাত্র বোন বকুলের মৃত্যু হয়। ১৯৪৮ সালে ‘নীল কপোত’ নামে তাঁর একটি গীতি-সংকলন প্রকাশিত হয়। মূলত তিনি ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের একজন তুখোড়কর্মী। নতুন দেশ, নতুন রাষ্ট্রের প্রতি কবির স্বপ্ন ও আকাঙ্খার সমর্পিত গীতিকা এই ‘নীল কপোত’।
১৯৪৮ সালে গুরু ট্রেনিং পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এবছর-ই কবির প্রথম সন্তান দিলরুবার জন্ম। ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি আশুজিয়া ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন। এরপর থেকে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আমৃত্যু চেয়ারম্যান পদে বহাল ছিলেন। চেয়ারম্যান হিসেবে অনেক জনহিতকর কাজ করেন।
১৯৫১ সালে সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’—এর বার্ষিক তৃতীয় সংখ্যায় কবির ছবিসহ লেখা প্রকাশিত হয়। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় খান মোহাম্মদ আবদুল হাকিম তমদ্দুন মজলিশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তমদ্দুন মজলিশের মুখপত্র ‘সৈনিকে’র নিয়মিত লেখক ছিলেন তিনি। তমদ্দুন মজলিশ ছিল ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় সমর্থক। খান মোহাম্মদ আবদুল হাকিম বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবির পক্ষে নিজ এলাকায় জনমত সংগঠনে আত্মনিয়োগ করেন।
বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার উপর গুলিবর্ষণের পর তিনি স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাটবাজারে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ-সমাবেশে নেতৃত্ব দেন। এলাকার ছাত্র-তরুণদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ছোট ছোট বৈঠকে একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য তুলে ধরেন। উর্দুর সমর্থক একটি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে প্রচারণা শুরু করলে খান মোহাম্মদ আবদুল হাকিম তাঁর কর্মীবাহিনী নিয়ে তাদের প্রতিহত করেন। এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভে তাঁর প্রধান সহযোগী ছিলেন আশুজিয়া জেএনসি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন শিক্ষার্থী এবং আজকের বরেণ্য লেখক-বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক যতীন সরকার। যতীন সরকারের ‘পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু-দর্শন’ নামের পাঠক-নন্দিত বইয়ে খান মোহাম্মদ আবদুল হাকিমের এই সংগ্রামী ভূমিকা সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে।
১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি [ন্যাপ] গঠিত হলে খান মোহাম্মদ আবদুল হাকিম তাতে যোগ দেন। আমৃত্যু তিনি কেন্দুয়া থানা ন্যাপের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালে তিনি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অনেককে আর্থিক সহায়তা দিয়ে ভারতে যেতে সাহায্য করেন। দেশে আটকে-পড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সাধ্যমতো নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। নিজের একটি আগ্নেয়াস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দেন।
তদানীন্তন নেত্রকোনা মহকুমার সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে খান মোহাম্মদ আবদুল হাকিম ছিলেন একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। মহকুমা পরিষদ থেকে প্রকাশিত ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। ১৯৬৮ সালে নেত্রকোনায় যে সপ্তাহব্যাপী সাহিত্য-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তিনি ছিলেন তার আয়োজকদের একজন। স্বাধীনতা-উত্তরকালে খালেকদাদ চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সৃজনী’ পত্রিকায়ও তিনি লেখালেখি করেছেন।
১৯৫৪ সালে কবির প্রথম পুত্র গোলাম মুর্শেদ খান, ১৯৫৭ সালে কবির দ্বিতীয় পুত্র গোলাম ফারুক খান, ১৯৬০ সালে কবির তৃতীয় পুত্র মাহবুব খান, ১৯৬৩ সালে কবির চতুর্থ পুত্র শফিক আহমদ খান এবং ১৯৬৬ সালে কবির পঞ্চম পুত্র তৌফিক আহমদ খান জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে কবির মাতামহী মেহের নিগারের মৃত্যু হয়। মূলত মাতা ইয়াকুতুন্নেছার মৃত্যুর পরে তিনিই কবিকে লালন-পালন করেন। প্রকৃত অর্থে মাতামহী মেহেরনিগার-ই ছিলেন এই পরিবার অভিভাবক এবং কর্তী। ১৯৭২ সালে কবির পিতা বিখ্যাত বাউলসাধক জালাল উদ্দিন খানের মৃত্যু হয়।
১৯৭৮ সালের ৪ঠা এপ্রিল স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করেন।
খান মোহাম্মদ আবদুল হাকিমের কবিতা
|| মানুষ ||
এই দুনিয়ার সব মানুষই এক ছাঁচেতে চালা
একইভাবে জ্ঞানী পাগল উঠছে পড়ে লুটে
সুখের লাগি কেউবা খোঁজে দুঃখব্যথার জ্বালা
কাঁদতে গিয়ে কারো আবার বেজায় হাসি-ই ওঠে।
|| সীমানা ||
কাল যারা এসেছিল এ মাটির অধিকার নিয়ে
এ মাটিকে বলেছিল ‘আমার আমার।’
ফিরে গেছে তারা পুনঃ মাটির গভীরে
আজ যারা রসমগ্ন এ মাটিকে নিয়ে
আগামীকল্য তারা ফিরে যাবে ঘরে
দুদিনের আয়ুর সম্বল
মাটিকে কি পারে কেউ পরাতে শৃঙ্খল?
তবুও আকাশে ওঠে কলকোলাহল
এই ঘর এই দেশ এই মাটি ‘আমার আমার।’
|| চাঁদ ও পৃথিবী ||
এখানে হ্রদের ধারে
আমাদের পৃথিবীতে
তুমি আমি শুধু দুইজন
নরম মাটির ঘ্রাণে
ঘুমের ঐশ্বর্যভরা
চাঁদ-ছাওয়া নিরালা গগণ।
মৃত্যুর বন্ধনী পার হয়ে
আমি হেথা পেয়েছি তোমারে
তুমিও তো পেয়েছো আমারে;
প্রাণ নিয়ে প্রাণের পরশ।
এখানে দুঃস্বপ্ন নেই
জ্বালাময় স্বার্থের খামারে।
|| নাম ||
যে মেয়ে আমারে ভালবেসেছিল শিরিন তাহার নাম
অনেক চাঁদের বুক জুড়ে লিখা সেই নাম পড়িলাম,
অনেক রাতের দীপাধারে দেখি সে নামের শিখা জ্বলে
যে নাম ক্ষণিকে তারা হয়ে ফোটে কৃষ্ণ আকাশতলে,
অনেক প্রাতের ফুল ফোটা দেখি সে নামের ঘোষণায়
যে নামের মধু টলোমলো করে পাপড়ির সীমানায়
সে নামে সে নামে বুলবুলি যেন পেয়েছে গানের মিশা
তৃণদলে দেখি শিশির-মুকুতা সে নামের কিছু নিশা,
আকাঙ্ক্ষা মোর দল মেলে দেয় সে নামের শতদলে
সে নামে আমার কাতুকুতু লাগে সোহাগের কুতূহলে,
বাদল নিশীথে সে নাম আমার অশ্রু হইয়া ঝুরে
অমৃত সে নাম যেন ছলোছলো কামনার মায়া-পুরে,
চৈতালি বায়ে সে নাম আমার ফিরোজা সন্ধ্যা সনে
পরীর নরম পাখার চামর বুলায় তপ্ত মনে।
সে নাম কতক হেসে হেসে আসা ভেসে-যাওয়া কিছু ফুল
সে নাম আমার কত যে মধুর খুঁজে নাহি মেলে কূল,
সে নাম যেমন সাঁঝের আকাশে বলাকার এক সারি
আমার মনের সাত সমুদ্রে দিয়ে দিয়ে যায় পাড়ি।
সে নামের লাগি, কবির অনেক কবিতা হয়েছে লিখা
মোর হৃদিমোম নিয়ত পোড়ায় সে নামের দীপশিখা
তারকার মতো, পান্নার মতো, গোলাবের মতো নাম
কত নিশি ভরি প্রাণের মায়ায় সেই নাম জপিলাম ।
|| ঈদের চাঁদকে ||
নতুন ঈদের চাঁদ,
বাঁকা ইশারার কোলে তারকার স্বপ্নজ্বালা—
অজস্র আশার এক অঙ্কুরিত বীজের বলাকা।
মাধবী ঐশ্বর্য-ভরা সুরের উত্তাপে
কী রঙিন লগ্ন ভেসে যাওয়া
এই শুভ্র বাঁকা তরণীতে ?
আলোক ঝলকি ওঠে কোমল কম্পনে
জড়ত্বের অণুতে অণুতে।
কামনালালার ঢেউয়ে অশেষ প্লাবনে
কঙ্কালের ভাঁজে ভাঁজে গড়ায় দুঃসহ প্রাণ,
উচ্ছ্বাস-চাবুকে ঘুমের মদিরাসিক্ত সুরভি-সম্ভার
মৃতকল্প স্নায়ুকেন্দ্রে সৃজে তোলে অশ্রান্ত গুঞ্জন।
শুনি তবু কান পেতে
ক্ষুব্ধ এক জনতার জলন্ত জিজ্ঞাসা।
রাঙাতে ঈদের পাত্র যাদের বিশ্লথ দেহে
অনুদিন ক্ষরিতেছে ঘাম
হে চাঁদ, তোমার বুকে তাদেরও কি রহিয়াছে নাম ?
এ আগ্নেয় রিক্ত দিনে এই স্বপ্ন কার ?
কৃষক শ্রমিক আর মেথর চামার
সে স্বপ্নের অধিকারী কোনো?
যাদের খামারে ফলে আঁটি আঁটি ধান
অথচ ক্ষুধায় যারা নাহি পায়
খুদের দু-মুঠো অন্ন,
লাঙলের মুঠি চেপে
ঝড়-জলে পচিতেছে যারা
পিঙ্গল ঊষর পথে যাদের শোণিত ঝরে পড়ে,
যাদের চালের ফুটো দিয়ে
অবিরত ভেঙে নামে ঢল
আর যারা ছেঁড়া কাঁথা গায়ে
শীতার্ত কম্পনে দেখে চোখে সর্ষেফুল,
যাদের কাহিনি নিয়ে কেঁদে ফিরে বাদল আকাশ
যাদের হতাশা নিয়ে হু হু করে বসন্ত বাতাস
তাদের অগ্নিজ্বালা রিক্ত বুকে
তুমি কি দিবে না কোনো আশা?
জানাবে না স্বাগত ভাষণ?
তাদের দিনের প্রান্তে তাম্রাভ দিগন্তকোণে
তোমার আঁখিতে কোনো জাগ্রত কামনা
হায় কোনো স্বপ্নের শিশির
তুমি কি নাওনি ভরে?
বুঝিবা তোমার স্বপ্ন সেই স্বপ্ন,
ফেনিয়ে ফেনিয়ে ওঠা প্রশান্তির পানপাত্রে
বিলাসের মধুক্রমে ?
বুঝি দুশো বছরের বিলাতি মদের
শেষ বিন্দু নিয়ে
বিষাক্ত কামনা-রাঙা
তুলির আঁচড়ে
হে চাঁদ, তোমার এই ইশারা উজ্জ্বল ?
যাদের রথের চাকা ফলন্ত খামারে
নির্বিচার দলনের প্রেতাত্ম প্রলেপে
ঝরায় দিনের অশ্রু
যাদের পিচের পথপাশে
পুঞ্জীভূত শ্রমিকের হাড়ে প্রেতাত্মার বীভৎস রোদন
ক্ষুধার বিকৃত রোলে;
এ ঈদ তাদের বুঝি ?
কিসের উৎসব তবে আর!
তোমার বার্ষিকী ভাণ্ডে
ক্ষণ-মত্ততার সুরা নিয়ে
অন্য কোনো নভে সরে যাও,
এ দিনের আবির্ভাব অভিপ্রেত নয়
জানাব না তাই আজ কোনোই সালাম।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন