চিরবিরহের মধ্যেও ঘ্রাণের সেতু
‘যতটুকু তোমার অজানা/ ততটুকুই কবিতা’
এই বইটা কোমল অনুভূতির জগত নিয়ে একটা ধারালো কবিতার বই, তার ধার দুই দিকে।
বকুলের প্রতি প্রেমিকের তীব্র অধিকারবোধ কখনো কখনো ঈর্ষায় পরিণত হয়, বিশেষ করে যদি অধিকার ছেড়ে দিতে হয় নিরঙ্কুশভাবে। এক পবিত্র রাতে মহাত্মা ভ্যান গঘের সানফ্লাওয়ার অরণ্যে বকুল কি ছাতিমের মুখোমুখি হবে আবার? চিরবিচ্ছেদের মধ্যেও একটা ঘ্রাণের সেতু বয়ে যাচ্ছে বকুল আর ছাতিমের মাঝে, ঘ্রাণের স্মৃতি যে অমোচনীয়! অলৌকিক সেই সেতুর নিচে বয়ে যায় ঈর্ষার জল। ঈর্ষা এক সবুজ চোখের দানব। কিন্তু এখানে আছে সবুজ পটে দুই অজাতপুষ্পের প্রেমের গাথা, বিরহের এক অনন্য অনুবাদ। লিখেছেন কবি তৃণলতা কুরচি।
নিজের নামের (ছদ্মনাম? হবেও বা) ভেতরেই পর্ণমোচী উদ্ভিদজগতকে ধারণ করেছেন। কবিতার বইয়ের নামের ভেতর ধারণ করেছেন এপারে মুখর কেকা আর ওপারে নিরব কুহুর মতো বকুল আর ছাতিমের আখ্যান। এই বইটার আলোচনা করা কঠিন, মনে হয় এই কবিতার বইটি কেবল অনুভবের জন্যে। তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে এক জটিল সম্পর্কের অনুভূতি—যেখানে প্রেম, বিচ্ছেদ, স্মৃতি আর ঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার। এই যে আমি লিখতে বসেছি, তাতে ওই টাটকা মেদুর অনুভূতিটা হারিয়ে যাচ্ছে বুঝি।
তৃণলতা কুরচির কবিতার বইটা পড়তে পড়তে এইসব লিখতে বসলাম। এটি তাঁর প্রথম বই। বইয়ের নাম ‘বকুলের পাপড়িতে ছাতিমের ঘ্রাণ’–এক কথায় এ যেন ভ্যান গঘের সূর্যমুখী বনে বকুল আর ছাতিমের পাঁজরফাটা আর্তনাদের গল্প। মনে পড়াচ্ছে জয় গোস্বামীর সেই লাইন, ‘মুকুল এই হাত আমি কেটেই ফেলতাম যদি তুমি এসে না ধরতে।’ কিন্তু, মুকুলের সাথে বিচ্ছেদ হয়ে গেলে সেই হাত নিয়ে কী করবেন কবি! আমি জানি না। সেই কবি বলেছেন, আমার জীবন কেবল ধারাবাহিক বিচ্ছেদের মালায় গাঁথা। এই মালাতেই মধু, যে ‘মধুর তোমার শেষ যে না পাই প্রহর হল শেষ–’। জয়ের এই বিরহবিধুর হাতের সমাধান হয়তো রবিনাথের এই গানেই আছে—সায়ন্তনের ক্লান্ত ফুলের গন্ধ হাওয়ার ’পরে/ অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে সকল অঙ্গ ভরে।
বকুল ও ছাতিম এখানে দুটি পৃথক অস্তিত্ব, দুটি প্রেমিক হৃদয়ের রূপক। কবি নিজেই এখানে নারী ও পুরুষের দুটি সত্ত্বাকেই ধারণ করেছেন। বকুলের প্রেমিকের বুকেও গুছিয়ে সংসার করার স্বপ্ন হয়তো ছিল। ‘নিদ্রাভঙ্গ চোখ’ মেলে ঘোর বর্ষাদিনের স্মৃতিচারণ করে বেঁচে থাকে শীতের গন্ধরহিত ছাতিমগাছ। প্রখর স্মরণশক্তি রোগ অভিশাপ হয়ে আসে। ছাতিম তাকিয়ে থাকে পথের ধূলায়। আর ঝরা বকুল তার শরীরে বয়সের দাগে ফিরে পায় যৌবনের সৌগন্ধ্য। স্মৃতিদগ্ধ বকুলের এখন বাঁচতে সাধ জাগে কেবল সুর সাধনায় স্নাতক হবার ইচ্ছা নিয়ে। অমরত্বের লোভ আছে? কে জানে। তবে কুরচির কবিতায় আমরা জেনেছি, যেদিন পৃথিবীর বাইরে চলে যাবে আত্মা, সেদিন কবির একমাত্র ইচ্ছা থাকবে বেহালার খোলে যেন তার কফিন থাকে, যেমন শঙ্খের খোলসে আটকে থাকে সাগরের সমস্ত আর্তনাদ।
টুকরো টুকরো কবিতার দিনপঞ্জির মধ্য দিয়ে আসলে এই বইতে একটাই দীর্ঘ কবিতার আখ্যান লতিয়ে উঠেছে। কবি এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন এক ঘ্রাণের ভূগোল—বকুলের, ছাতিমের। আর এই দুই সত্তাকেই কবি নিজের পাঁজরে আলিঙ্গন করেছেন। এইভাবে এক নিঃশব্দ ভাষায় বকুল আর ছাতিম আবার লীন হয়ে যায়।
‘কত দশা বিরহিণীর—এক দুই তিন/ দশটি/ এখানে ত্রস্ত আকুলতায় চিরকাল/ ঘর আর বিদেশ আঙিনা/ আকুলতায় একাকার/ অভিসার’
বকুল আর ছাতিমের চিরবিরহের মধ্যেও একটা ঘ্রাণের সেতু বয়ে যায়। আর সেই ঘ্রাণই এই কবিতার বইয়ের আত্মা।
বকুলের পাপড়িতে ছাতিমের ঘ্রাণ
তৃণলতা কুরচি
প্রকাশক: বৈভব
প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০২৫
প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত
মূল্য: ২৪১ টাকা



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন