ধারাবাহিক গদ্য: ৩ || আহমদ ছফার স্মৃতি: অথ মহিউদ্দিন সমাচার

অ+ অ-


ধারাবাহিক গদ্য: ৩ || আহমদ ছফার স্মৃতি: অথ মহিউদ্দিন সমাচার

[ বাংলার মনীষী আহমদ ছফাকে নিয়ে নানাজন নানা স্মৃতিকথা লিখেছেন। নানাজন নানাভাবে গবেষণা করছেন। স্মরণ করছেন। ভবিষ্যতেও করবেন। তবে তাঁকে নিয়ে সত্য-মিথ্যায় মোড়ানো স্মৃতিকথাগুলো নানা বিতর্ক, নানা কথা আর নানা মিথের জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি ঢাকার প্রথমা থেকে প্রকাশিত হয়েছে লেখক মহিউদ্দিন আহমদের বই ‘আহমদ ছফা: আমার কথা কইবে পাখি’। বইটি প্রকাশের পর আহমদ ছফাকে নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। খোদ ছফার পরিবার থেকে বইটি নিয়ে নানা ‘মিথ্যা-চাতুরী’র অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রথমার বইটির প্রতিবাদ স্বরূপ একটি বই লিখেছেন আহমদ ছফার ভ্রাতুষ্পুত্র, প্রথিতযশা লেখক ও ঔপন্যাসিক নূরুল আনোয়ার। তিনি দীর্ঘদিন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনীষী ছফার সাহচার্যে ছিলেন। ক’দিন আগে নূরুল আনোয়ারের লেখা পাণ্ডুলিপিটি প্রতিধ্বনির হাতে এসেছে। লেখার গুরুত্ব বিবেচনা করে নূরুল আনোয়ার প্রণীত প্রকাশিতব্য বইয়ের চুম্বক অংশ ধারাবাহিকভাবে প্রতিধ্বনি প্রকাশ করছে। বি.স. ]

 

তৃতীয় কাণ্ড || মওলানা ভাসানী কাহিনী এবং স্বদেশ প্রীতি
 
মওলানা ভাসানী কাহিনী

সংক্ষেপে মহিউদ্দিন আহমদের ভাষ্য, ১৯৭১ সালে মাওলানা ভাসানী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে লেখা চিঠিতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কনফেডারেশন চেয়েছিলেন। তিনি ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন আসামের ধুবরিতে থেকে যাওয়ার। কেননা সেখানে তিনি অনেক বছর ছিলেন। সেখানে তাঁর অনেক মুরিদ রয়েছেন, তাঁর এক সন্তানের কবরও সেখানে। এ জন্য তিনি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পাঁচ একর জমি চান। সেটি মাওলানা সাহেব পাননি। সেই মনোবেদনা থেকে তিনি হক-কথা পত্রিকায় শেখ মুজিবের বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে থাকেন। সেটি সরকারের সহ্য হয়নি এবং পত্রিকাটি ছয় মাসের মাথায় বন্ধ করে দেন। তারও পরে আনন্দবাজার পত্রিকা ভাসানীকে বিষোদ্গার করে একটি লেখা লিখেছিল। তার জন্য ভারতের হাই কমিশনার সুবিমল দত্ত ক্ষমা চেয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করেন। সেটি আনন্দবাজারের পছন্দ হয়নি বলে ‘ধিক হে নতজানু কূটনীতিক’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় ছাপে। মহিউদ্দিন সাহেব লিখেছেন:

তখন আনন্দবাজার পত্রিকা, যুগান্তর, হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড, অমৃতবাজার পত্রিকা—এই চারটি দৈনিক নিয়মিত ঢাকায় আসত। দুপুরের আগেই পত্রিকা বিলি হয়ে যেত। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের চাপে হকার্স ইউনিয়ন সিদ্ধান্ত নেয়, কলকাতার এসব পত্রিকা যেদিনের, সেদিন বিলি করা যাবে না। বিলি করতে হবে পরদিন। এ ছাড়া সাপ্তাহিক দেশ আসত নিয়মিত। ঢাকায় এ রকম মানসম্মত সাহিত্য পত্রিকা ছিল না।

এ সব পত্রিকা মহিউদ্দিন সাহেবের খুব পছন্দের ছিল নানা কারণে। কিন্তু তাঁর ভাষ্যমতে, আহমদ ছফা চাইছেন সাম্প্রদায়িকতার অজুহাতে ভারতের সেই সব পত্রিকা এ দেশে আসা বন্ধ করে দিতে। সেটি মহিউদ্দিন সাহেবের আঁতে লাগে। তাঁদের দুজনের কথোপকথন:

—ছফা ভাই, এটা কিন্তু ডাবল স্ট্যান্ডার্ড হয়ে যায়।
—আনন্দবাজার ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের হাতিয়ার। ওরা জেনে-বুঝে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ায়। এটা ব্যান করতে হবে।
—হক-কথার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর অভিযোগ ছিল। কিন্তু আপনি তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।
—দুটোকে মেলাতে যেয়ো না। সাবধান না হলে ইন্ডিয়া আমাদের গিলে খাবে। আমি এ নিয়ে লিখব।

তখন আহমদ ছফা ‘মাওলানা ভাসানীর অপমান গোটা জাতির অপমান’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ নিবন্ধ লিখে গণকণ্ঠে ছাপতে দেন। কিন্তু এ লেখাটিতে আহমদ ছফা কোন কথাটি অযৌক্তিক বলেছেন সেটি উদ্ধৃত না করে মহিউদ্দিন আহমদ পুরো লেখাটি তাঁর লেখায় তুলে ধরেন। মওলানা ভাসানী শীর্ষক লেখাটিতে মহিউদ্দিন আহমদের লেখা আছে এক পৃষ্ঠার খানিকটা বেশি। আহমদ ছফার লেখাটি সংযুক্ত করার কারণে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় পৃষ্ঠায়। লেখার কলেবর বৃদ্ধি করার জন্য হয়তো আহমদ ছফার পুরো লেখাটি তুলে ধরা হয়েছে, সেটা একটা কারণ হতে পারে।

 

মহিউদ্দিন আহমদ ছফাকে কেন খেপাতেন বোঝা গেল না। পাহাড়ে তো তাঁদের বড়সড়ো একটা বাগান ছিল। সেখানে লেবু, পেয়ারা, কলা, পেঁপে, আনারস ইত্যাদির চাষ ছিল। মহিউদ্দিনকে কেন আহমদ ছফা গুণ্ডা বলতেন? আসলে কি তিনি গুণ্ডা প্রকৃতির ছিলেন? আমরা তো তাঁকে অতি ভদ্র মানুষ হিসেবে জানি।


আহমদ ছফা || ছবি সংগৃহিত

স্বদেশ প্রীতি

প্রেসক্লাবে ফারাক্কা বিষয়ে একটা আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভার বক্তা ছিলেন অধ্যাপক আফতাব আহমাদ, সিনিয়র সাংবাদিক সাদেক খান, আর আহমদ ছফা। কিন্তু সেখানে আনোয়ার জাহিদ আর শফিউল আলম প্রধান বক্তৃতা করবেন সেটা মহিউদ্দিন সাহেবের জানা ছিল না। জানলে তিনি ওখানে যেতেন না। তিনি লিখেছেন:

যদি জানতাম এখানে আনোয়ার জাহিদ আর শফিউল আলম প্রধানরা বক্তৃতা দেবে, তাহলে আসতাম না। কেবল সাদেক খানের কথায় কিছু সারবস্তু আছে।
ওই সময় যাঁরা কথায় কথায় ভারতকে গালাগাল করতেন, তাঁদের সামনের কাতারে ছিলেন আনোয়ার জাহিদ আর শফিউল আলম প্রধান। আমরা আড়ালে আবডালে বলতাম, এঁরা নিশ্চয়ই র-এর এজেন্ট।
বক্তারা হতভম্ভ। আমি তাঁদের বক্তৃতার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি। ছফা আর আফতাব রাগে গরগর করতে থাকলেন। ছফা সভাপতির দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আমি কিছু বলতে চাই। আমাকে বলতে দিতে হবে।
সভাপতি তাঁকে নিরস্ত করলেন। আফতাবকে থামানো গেল না। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে সাফাই দিতে থাকলেন। এ সময় আমি উঠে একটু প্রতিবাদ করে বললাম,
—জামায়াতে ইসলামী যে ভাষায় কথা বলেন, আপনি সে ভাষায় বলছেন। এটা আপনার কাছে আশা করিনি।
—নীতির প্রশ্নে দরকার হলে জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য হবে। আফতাবের সাফ জবাব।
আমি স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। এ নিয়ে সভায় একটু উত্তেজনা তৈরি হয়। সভাপতি সেটা সামাল দেন। পরে আমি তাঁকে বলেছিলাম,
—আমার কথায় আপনি বিব্রত হননি তো?
—মোটেই না। এসব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার।

মহিউদ্দিন সাহেব আরও একটি ঘটনা এ রচনায় তুলে এনেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠান হয় ধানমন্ডির জার্মান কালচারাল ইনস্টিটিউটে। সেটি নিয়ে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন:

সভা শুরু হলো সকাল ১০টার দিকে। অডিটোরিয়ামে লোকে ভরা। অনেকেই এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে। একজন একজন করে মঞ্চে আসছেন, বক্তব্য দিচ্ছেন, তারপর আসনে ফিরে যাচ্ছেন। আমি উঠলাম। সমবেত পাহাড়িদের উদ্দেশে বললাম,
—বাঙালি একাত্তরে বুঝেছে পাঞ্জাবি কি জিনিস। এখন আপনারা বুঝতে পারছেন, বাঙালি কি জিনিস। 
আর কি কি বলেছিলাম মনে নেই। এরপর এলেন আহমদ ছফা। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে পাহাড়িদের উদ্দেশে বললেন,
—আপনাদের বলতে হবে, আপনারা কি স্বাধীনতা চান?
আমি তড়াক করে উঠে দাঁড়ালাম।
—এ কথা তারা আপনাকে বলবে কেন? আর আপনিই-বা কোন অধিকারে এ প্রশ্ন করছেন?
    আমার প্রশ্নে ছফা খুশি হননি। পরে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 
—পার্বত্য চট্টগ্রামে কি আপনাদের পরিবারের জমিজমা আছে?
—না তো! হ্যাঁ হ্যাঁ আছে। লেবুবাগান আছে।
সুযোগ পেলেই ছফার সঙ্গে খুনসুটি করতাম। তাঁকে খেপিয়ে মজা পেতাম। তিনি কাউকে কাউকে আমার সম্পর্কে বলতেন—বুলবুল একটা গুন্ডা।

আহমদ ছফা যখন বললেন, ‘আপনাদের বলতে হবে, আপনারা কি স্বাধীনতা চান?’ আর সঙ্গে সঙ্গে মহিউদ্দিন ‘তড়াক’ করে দাঁড়িয়ে গেলেন। এরপরে আহমদ ছফা কি ধরনের কথা বলবেন সেটি কি মহিউদ্দিনের শোনা উচিত ছিল না? প্রশ্নটি তিনি তাঁদের মানসিক অবস্থা বোঝার জন্যও তো করতে পারেন। একজন মানুষ কথা বলছেন, তার মধ্যে অন্যজনে বাঁ-হাত ঢুকিয়ে দিবেন সেটা কোন ধরনের ভব্যতা?
মহিউদ্দিন আহমদ ছফাকে কেন খেপাতেন বোঝা গেল না। পাহাড়ে তো তাঁদের বড়সড়ো একটা বাগান ছিল। সেখানে লেবু, পেয়ারা, কলা, পেঁপে, আনারস ইত্যাদির চাষ ছিল।
মহিউদ্দিনকে কেন আহমদ ছফা গুণ্ডা বলতেন? আসলে কি তিনি গুণ্ডা প্রকৃতির ছিলেন? আমরা তো তাঁকে অতি ভদ্র মানুষ হিসেবে জানি।

তথ্যসূত্র

১.  আহমদ ছফা: আমার কথা কইবে পাখি: মহিউদ্দিন আহমদ; প্রথমা (ঢাকা:২০২৫) পৃষ্ঠা: ৩৫
২.  প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩৫
৩.  প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৫১
৪.  প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৫২

পড়ুন  ► প্রথম কাণ্ড  ► দ্বিতীয় কাণ্ড || আসছেচতুর্থ কাণ্ড