কন্নড় ভাষার গল্প || কাফন || বানু মুশতাক
|| বানু মুশতাক ||
কন্নড় ভাষার আলোচিত ঔপন্যাসিক, আইনজীবী ও সমাজকর্মি। ১৯৪৮ সালের ৩ এপ্রিল কর্ণাটকের হাসানে একটি মুসলিম পরিবারে বানু মুশতাক জন্মগ্রহণ করেন। ৮ বছর বয়সে তাকে একটি কন্নড় ভাষার মিশনারি স্কুলে ভর্তি করা হয়, এই শর্তে যে তিনি ‘ছয় মাসের মধ্যে কন্নড় পড়তে এবং লিখতে’ শিখবেন। কিছুদিন পর পড়াশোনা করে তিনি প্রত্যাশা ছাড়িয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। কন্নড়, হিন্দি, দক্ষিণী উর্দু এবং ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে পারেন। ১৯৮০ সাল থেকে তিনি কর্ণাটকে ‘মৌলবাদ এবং সামাজিক অবিচার’ দূর করার জন্য আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ২০০০ সাল নাগাদ তাকে এবং তার পরিবারকে মুসলিম মহিলাদের মসজিদে যাবার অধিকারের জন্য সোচ্চার হওয়ায় তিনমাস সামাজিক বয়কটের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। অবশ্য এতে তিনি দমে যাননি। তিনি নিজের কাজ নিজের মতো করে গেছেন। ভারতের কর্নাটক রাজ্যের এই প্রখ্যাত সাহিত্যিক পেশায় আইনজীবী, এছাড়া সমাজকর্মী হিসেবেও খ্যাতি আছে। কন্নড় ভাষায় লেখেন। ২০২৫ সালে তার ছোটগল্প সংকলন হার্ট ল্যাম্প-এর জন্য বুকার পুরস্কার লাভ করেন। সংকলনের গল্পগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করেন দীপা ভাস্তি। বুকার পাওয়ার পর বানুর উপলব্ধি, ‘মনে হচ্ছে যেন আকাশে একসঙ্গে হাজারটা জোনাকি জ্বলে উঠল’।
বানু মুশতাক মূলত ভারতীয় সমাজের একেবারে সাধারণ নারীদের জীবনের নির্মম বাস্তবতা গল্প লেখেন। খুবই সাধারণ, সাদামাটা নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু বস্তুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় তার গল্প—যেমন: পেপসির বোতল, এক জোড়া হাই হিল স্যান্ডেল, বা গোবি মানচুরিয়ান (ভারতের জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড)। সাধারণত ভারতের দক্ষিণ অঞ্চলের অপরিচিত ছোট ছোট শহরগুলোকে পটভূমি করে লেখা হয় এসব গল্প, যেখানে নারীরা শ্রেণী, পিতৃতন্ত্র ও ধর্মীয় আদর্শের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কীভাবে জীবন যাপন করে, তা উঠে আসে। যদিও চরিত্রদের ইসলামি নাম থাকে, গল্পগুলো শুধুমাত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের নয়; বরং এগুলো নারীর ধর্ম বা শ্রেণি নির্বিশেষে সার্বজনীন অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে। ‘দ্য শ্রাউড’ বানু মুশতাকের বিরল গল্পগুলোর একটি। গল্পটি ইসলাম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মৃত মানুষেকে সমাহিত করার আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে লেখা। এই গল্পে মূল চরিত্র কোনো নারী নয়, বরং কাফন। ইসলামি রীতিতে দাফনের আগে গোসল করানোর পর মৃতদেহে যে সাদা কাপড় মোড়ানো হয়, সেই কাফন। কন্নড় ভাষা থেকে গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন দীপা ভাস্তি।
কন্নড় ভাষার গল্প || কাফন || বানু মুশতাক
বাংলা অনুবাদ || আলতাফ শেহাব
যেদিন ফজরের নামাজের সময়ে ঘুম থেকে উঠতে পারতো না সাজিয়া, নিজের উচ্চ রক্তচাপকে দোষারোপ করতো। বলতো, “এই অভিশপ্ত ট্যাবলেটগুলোর জন্যই আমার শান্তি নেই।”
তার মা বলতেন, “এসব সব শয়তানের খেলা। শয়তান ভোরবেলায় এসে তোমার পা টিপে দেয়, তোমার গায়ে আরামের কম্বল জড়িয়ে দেয়, তোমাকে আদর করে আবার ঘুম পাড়িয়ে দেয়, যাতে তুমি নামাজ পড়তে না পার। তাকে লাথি মেরে সরিয়ে দাও, এবং সময়মতো উঠে নামাজ পড়ার অভ্যাস করো।” এই ভাবনাটা সাজিয়ার কাছে বেশ রোমাঞ্চকর মনে হতো—শয়তান তার ব্যক্তিগত চাকর হয়ে পা টিপে দিচ্ছে। তাই সে মজা করে কয়েকবার শয়তানকে লাথি মারার ভান করত, এরকম কল্পনা করে সে মজা পেত। দেরিতে জাগা এবং সব দোষ শয়তানের ঘাড়ে চাপানো তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।
সেদিনও সে গভীর ঘুমে ছিল, অনেক বেলা হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে চমকে উঠল, নিজের দিকে তাকিয়ে দেখল কোথায় আছে, বুঝে উঠতে পারছিল না। পাশে হাত বাড়িয়ে যখন সে তার স্বামীকে ছুঁলো, তখন বুঝল নিজের বিছানাতেই আছে। যখন দেখলো মাথার নিচে তার নিজের বালিশ, গায়ে বিদেশি কম্বল; তখন বুঝতে পারল সে তার নিজের ঘরেই আছে। পরিচিত পরিবেশে ঘুম ভাঙায় মনে মনে শান্তি পেল, আশ্বস্ত হলো।
কিন্তু সেই শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। বাইরে থেকে কান্নার আওয়াজ আসতে লাগল। ধীরে ধীরে উঠে দরজার দিকে গেলে সে, ছেলে ফারমানের গলা শুনতে পেল। সে তাড়াতাড়ি বারান্দায় এসে দেখল, খুবই বিমর্ষ চেহারা নিয়ে আলতাফ দাঁড়িয়ে আছে। ফারমান তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে,“যা হবার হয়েছে, এসবে কারও হাতে নেই। চিন্তা করো না, বাড়ি যাও। আম্মি জেগে উঠলে আমি সব কিছু নিয়ে চলে আসব। উনি এখন ঘুমোচ্ছেন, আমি তাকে জাগাতে চাই না, তার শরীরটা ভালো নেই। ডাক্তার বলেছেন তাঁর অনেক বিশ্রাম দরকার।”
“কিন্তু ভাইয়া, মুসল্লিরা ঠিক করেছে দাফন আজ সন্ধ্যা পাঁচটায় হবে। আর আমরা কারও জন্য অপেক্ষাও করব না। তাই গোসল আর অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা দ্রুত সারতে হবে।”—আলতাফ পুনরায় বলল। ফারমান এবার ধৈর্য্য হারিয়ে বলল, “দেখো, তুমি তো আমার কাছে কোনো কাফন রেখে যাওনি। আম্মি হজ থেকে ফিরেছেন আজ ছয়-সাত বছর হয়ে গেল। এত বছর ধরে ইয়াসিন বুয়া কেন কাফনটা আম্মির কাছ থেকে নিয়ে নেননি? অথবা এমনও হতে পারে, হয়তো নিয়েছিলেন, কোথাও রেখে দিয়েছেন। বাড়ি গিয়ে আর একবার খুঁজে দেখো।”
এবার সাজিয়া যেন একটু ধাক্কা খেল, ছেলের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। “এখানে কী হচ্ছে?” বলে ডাক দিল। “ফারমান, কার সঙ্গে কথা বলছো, বেটা?” ফারমান মায়ের দিকে ফিরে তাকাল; স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ তার চোখেমুখে। মনে মনে ভাবল, “এসব মহিলারা কেন চুপচাপ থাকতে পারে না, ঠিকঠাক খেতে পারে না, সাজতে পারে না, নিজেদের কাজ নিয়ে থাকতে পারে না। কিছু না কিছুতে জড়িয়ে না পড়লে যেন এদের পেটের ভাত হজম হয় না।” কিন্তু সে মুখে কিছু বলল না, বরং বলল, “গিয়ে ঘুমাও, আম্মি। উঠে এলে কেন? আলতাফ এসেছে, বলছে সে ইয়াসিন বুয়ার ছেলে। কিসব কাফনের কথা জিজ্ঞেস করছে।”
মুহূর্তেই যেন হাজার বোল্টের বজ্র পড়ল তার ওপর। সে ব্যাকুল হয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে তরুণটির দিকে প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে কঠোর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “এই সকাল সকাল কী হৈচৈ করছো? কাফন কোথায় পালাবে? মাথায় কি কিছু নেই, বোঝ না কখন কার বাড়িতে যেতে হয়?” ততক্ষণে এটা তার কাছে স্পষ্ট যে, ফারমান বিষয়টা ভলোভাবে নিচ্ছে না। আলতাফ খুব নিচু স্বরে কান্না জড়িত কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলল, “চিক্কাম্মা, আম্মি আজ সকালে, ফজরের নামাজের কাছাকাছি সময়ে মারা গেছেন। তাই কাফনের কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছিলাম।” এই কথা শোনার পর সাজিয়া ভেতরে ভেতরে একেবারে ভেঙে পড়লেন। নিজেকে আর সামলাতে না পেরে পাশের একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। যা ঘটেছে এটা অসম্ভব, অকল্পনীয়। এখন কীভাবে সামলাবেন? কীভাবে সমাধান করবেন? কোন কিছুই আর তার নিয়ন্ত্রণে রইল না। তিনি বিধ্বস্ত হয়ে পড়লেন। “হে আল্লাহ, কী যে হয়ে গেল,” তিনি বিলাপ শুরু করলেন।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও অতীতের কিছু স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে সাজিয়ার। সেদিন তাদের বাড়িতে একটি অনুষ্ঠান ছিল। তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই জড়ো হয়েছিল। সাজিয়া ও তার স্বামী সুবহান হজে যাচ্ছিলেন। তারা ইতোমধ্যে তাদের বেশিরভাগ নিকটাত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবের সাথেই দেখা করে নিয়েছিলেন। সবাইকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছিলেন, বলেছিলেন—যদি কখনো কোনো কথা কাটাকাটি, কোনো বিষয়ে কষ্ট দেওয়া, কোনো অভিযোগ থাকে, বা তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো বিরুদ্ধে কোনো অপবাদ ছড়িয়ে থাকে—তাহলে সবাই যেন তাদের ক্ষমা করে দেয়। এই আত্মীয়রাও তাদের দাওয়াত দিয়েছিলেন, সাধ্য অনুযায়ী পোশাক ও অন্যান্য উপহার দিয়েছিলেন। সাজিয়া ও সুবহানকে ক্ষমা করে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন এবং নিজেরাও অনুরোধ করেছিলেন যেন তারাও সকল ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করে দেন। ভুলভ্রান্তিগুলো পারস্পরিকভাবে ক্ষমা হয়েছে এবং সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা পালন হয়েছে—প্রশান্ত মনে আত্মীয়পরিজনরা তাদের বিদায় জানিয়েছিল।
এতকিছুর পরও, হজে যাওয়ার এক সপ্তাহ বাকি থাকতেও অনেক আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করা বাকি ছিল। তাই স্বামী-স্ত্রী দূরের আত্মীয়দের ফোন করে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন। সুবহান ছিলেন অনেক ডালপালা ছড়ানো এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যস্ততম মালিক, আর সাজিয়া বিশাল বাংলো বাড়ির মালকিন—তাদের পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে সবার সঙ্গে দেখা করা সম্ভব ছিল না। তাই তারা এই দাওয়াতের আয়োজন করেছিলো, যাতে সবাই একত্রিত হতে পারে। সেখানেও বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা চলছিল, সবাই পরস্পরের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছিলেন।
এই অনুষ্ঠানে এমন একজন এসেছিলেন, যিনি আমন্ত্রিত ছিলেন না, কিন্তু কোনো অহংকার বা কুণ্ঠাবোধও তার মধ্যে ছিল না—তিনি ছিলেন ইয়াসিন বুয়া। তার স্বামী বিয়ের তিন বছরের মধ্যে দু’টি সন্তান জন্ম দিয়ে চিরতরে চলে গিয়েছিল, একবারে নিঃস্ব করে। লোকটি এপিএমসি ইয়ার্ডে লোডার হিসেবে কাজ করত, একদিন একটি বড় বোঝা তুলতে গিয়ে হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর ইয়াসিন বুয়া ইদ্দত পালন করেনি। তখন সে বয়সে একেবারে তরুণী, মাথায় ওড়না বেঁধে বাড়িতে বাড়িতে বাসন মাজা, ঘর ঝাড়ু দেওয়া ও মোছার কাজ শুরু করে। বিয়ে বাড়ির উৎসবে, জন্মদিনে, বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানের ভিড়ে এক নিঃসঙ্গ নারী —এইসব উৎসবমুখর বাড়িগুলো হইচই ও আনন্দ হজম করে নিজের ছোট ছোট সন্তানদের খালি পেট ভরানোর চেষ্টা করতো। ইদ্দতের বাধ্যতামূলক এই সময়টাতে সে মৃত স্বামীর শোকে স্তব্ধ হয়ে চুপচাপ মাথা ঢেকে ঘরে বসে থাকেনি। ফলে এ নিয়ে নানাজন নানা কথা বলেছিল। কিন্তু এই কুৎসার মাঝেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ আর পেটের ক্ষুধা ছিল তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিশ্রম স্বর্থক হয়েছে, সে তার সন্তানদের মানুষ করেতে পেরেছে। তারা কিছুটা পড়ালেখাও শিখেছে, তার মেয়েটা অন্য মেয়েদের কোরান পড়িয়ে কিছু টাকাও আয় করতো। ইয়াসিন বুয়া সেই টাকা নিজের সঞ্চয়ের সঙ্গে মিলিয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিল এবং অটো চালক ছেলের সঙ্গে থাকতে শুরু করেছিল। বয়সের সাথে সাথে যখন শরীরের হাড়ের ক্ষয় বাড়তে থাকে, শিরাগুলো ফুলে উঠতে থাকে, তখন সে অন্যের বাড়িতে কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
তার খুব ইচ্ছে ছিল ছেলের বিয়ে দেওয়ার। কিন্তু তার থেকেও বড় একটি আকাঙ্ক্ষা তার দেহ, মন আর হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে তুলেছিল। সে যেন সেই আকাঙ্ক্ষার উত্তাপের চারপাশে সারাদিন ঘুরে বেড়ানো এক ঘুড়ির মতো। প্রতিটা বাড়তি পয়সা জমিয়ে রাখার অভ্যাস ছিল তার, এটা কৃপণ স্বভাবের জন্য নয় বরং ছিল অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য দুশ্চিন্তার প্রতিফলন। সে যখন ছেলের বিয়ের জন্য জমানো টাকা থেকে কিছু টাকা নিজের কাফন কিনার জন্য আলাদা করে নিচ্ছিল, তখন তার মনে হচ্ছিল সে যেন অন্য কারো টাকা চুরি করে ফেলছে। তার এই ভীষণ অপরাধবোধ কিছুতেই কাটছিল না, সে অস্থির হয়ে উঠেছিল, টানা তিন দিন ধরে টাকাটা সে তার শাড়ির আঁচলে বেঁধে রেখেছিল। কিন্তু প্রবল মাতৃত্ববোধও তার অন্তরের গভীরে পুষে রাখা সেই আকাঙ্ক্ষার তীব্রতাকে হারাতে পারেনি। এক অদ্ভুত জেদ যেন ইয়াসিন বুয়ার ইচ্ছাপূরণের উৎসাহকে দ্বিগুণ করে দিল। শাড়ির খুঁটে বাঁধা পুঁটলিটা মুঠোয় শক্ত করে ধরে সাজিয়াদের বাড়ির দিকে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল। সেখানে তখন অনেক ভিড়, আনন্দ, উৎসব চলছিল...
তার কোনও নিমন্ত্রণ ছিল না। কেউ এসে তাকে বলেনি, “আরে, আপনি এসেছেন!” কেউ বলেনি, “আসুন, খেতে বসুন” কিংবা সামান্য আতিথেয়তাও দেখায়নি কেউ। জীবনে কোনোদিন সম্মান বা মর্যাদা পাওয়ার সৌভাগ্য তার হয়নি। অসম্মান কি জিনিস তাও জানতো না। যতটা পারতো, কাজ করে যেতো। সেদিন চিনামাটির খাওয়ার প্লেট ধুতে ধুতে তার হাত প্রায় খুলে পড়ার জোগাড় হয়েছিল। বিরিয়ানির চিটচিটে তেল কি এত সহজে ধোয়া যায়, বল? সবার খাওয়া শেষ হলে, সে বাড়ির উঠানে সিমেন্টের সিঁড়িতে বসে কয়েক লোকমা মুখে তুলেছিল। কিন্তু তার সমস্ত মনোযোগ ছিল সাজিয়ার দিকে। “ভাগ্যবতী নারী, সৌভাগ্যবতী নারী” বলে মনে মনে বারবার আওড়াচ্ছিল সে। সাজিয়া কখন ফাঁকা হবে, কীভাবে নিজের ইচ্ছেটা প্রকাশ করবে—এই ভাবনাতেই ডুবে ছিল সে, আর ধৈর্য ধরে সাজিয়ার সব কাজকর্ম খেয়াল করছিল।
সাজিয়া কখন একটু ফাঁকা হবেন? অসংখ্য আত্মীয়-বন্ধুর শুভেচ্ছা ও উপহার গ্রহণ করতে করতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অনেকে তাকে জড়িয়ে ধরে শুধু শুভ কামনাই জানায়নি, নিজেদের জীবনের নানারকম সমস্যার কথা শোনাতে শুরু করেছিল এবং অনুরোধ করছিল, যেন হজের সময় তাঁদের জন্য দোয়া করেন। “সাজিয়া আপা, আমার ছোট মেয়েটার জন্য একটা ভালো পাত্র পাচ্ছি না, দয়া করে ওর জন্য একটু দোয়া করবেন,” কেউ একজন বলল। আরেকজন বলল, “আমার ননদ ক্যানসারে ভুগছে, দয়া করে তার সুস্থতার জন্য একটু দোয়া করবেন।” “আমার ছেলেটা কিছুতেই একটা চাকরি জোগাড় করতে পারছে না, বেচারা অনেক সমস্যায় আছে। দয়া করে ওর জন্যও দোয়া করবেন।” ধীরে ধীরে দোয়ার অনুরোধের তালিকাটা লম্বা হতে থাকল। সাজিয়া শুধু হাসিমুখে বলতে থাকলেন, “ইনশাআল্লাহ, ওদের জন্য দোয়া করব।” যদিও তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, কাউকে কিছুতেই বুঝতে দেননি এবং সবাইকে হাসিমুখেই বিদায় জানিয়েছেন। দুপুরে দাওয়াতের আয়োজন করা হয়েছিল, লোকজন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত অবধি আসতেই থাকল। ইয়াসিন বুয়া ক্রমাগত হাড়ি-পাতিল মাজছিলেন, প্লেট ধুচ্ছিলেন, ঝাড়ু দিচ্ছিলেন এবং অপেক্ষায় করছিলেন কখন তার নিজের পালা আসবে।
রাত তখন প্রায় এগারোটা, ক্লান্ত সাজিয়া নরম কার্পেটের উপর পা ছড়িয়ে সোফায় একটু আরাম করে বসলেন, বসার ঘরের দরজার পাশে ইয়াসিন বুয়ার ছায়া দেখতে পেলেন। সাজিয়ার জন্য খুব মায়া হচ্ছিল বুয়ার, মনে মনে ভাবছিলেন, “আহারে বেচারি মেয়েটা কতটা ক্লান্ত হয়ে গেছে।” তিনি তার দুই হাত শাড়ির আঁচলে মুছে ধীরে ধীরে সাজিয়ার দিকে এগিয়ে গেলেন, খেয়াল রাখলেন যাতে তার ময়লা আর ফাটা গোড়ালির ছাপ দামি কার্পেটটিতে না পড়ে। “কখন এলে, বুয়া?” অনিচ্ছাসত্ত্বেও জিজ্ঞেস করল সাজিয়া।
সাজিয়ার সঙ্গে অবশেষে দেখা হওয়ায় ভীষণ খুশি হয়ে বুয়া বললেন, “অনেক আগেই এসে গেছি, মা।”
“ও, তাই নাকি? তোমাকে তো সারা সন্ধ্যায় দেখিইনি” সাজিয়া বললেন। তারপর একটু কোমল সুরে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি খেয়েছ তো?” “হ্যাঁ, আম্মা। তোমাদের বাড়ির ভাতেই তো এখনও জীবনটা কোনমতে টিকে আছে। আল্লাহ যেন তোমার ছোঁয়ায় সব কিছু সোনা করে দেন। তোমার ঘর যেন সুখে ভরে যায়।” সাজিয়া কৃতজ্ঞতা বোধ করলেন। “অনেক রাত হয়ে গেছে, এত রাতে তুমি বাড়ি কীভাবে যাবে, বুয়া?” সহজাত নারীসুলভ চিন্তার প্রতিধ্বনি শুনে বুয়া জবাব দিলেন, “আলতাফ বলেছে ওর অটোতে করে আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবে। ও এলেই আমি চলে যাব।” সাজিয়া লক্ষ্য করেছিলেন, ইয়াসিন বুয়া সারাদিনই কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাই তিনি ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজের ঘরে গেলেন এবং কিছু টাকা বের করে আনলেন। “নাও, বুয়া, এই টাকা কয়টা রাখো, তুমি খরচ করো। আমরা তিন দিনের মধ্যে হজে রওনা দেব, এবং ৪৫ দিন পরে ফিরে আসব। আল্লাহ যেন আমাদের হজ কবুল করেন। আমাদের জন্য দোয়া করো।”
তিনি বুয়ার দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে টাকাগুলো গুঁজে দিলেন। ইয়াসিন বুয়া আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন। তার মতো একজন ফকির-ফাকড়ার প্রতি সাজিয়ার এত আন্তরিকতা ও মায়া দেখে তার চোখ ভিজে উঠলো। তিনি সাজিয়ার দেয়া টাকাটা নিলেন না। বরং নিজের শাড়ির খুঁটে বেঁধে রাখা দু-তিনটা গিঁট খুলে কিছু কুঁচকানো নোট বের করলেন। হাত বাড়িয়ে সাজিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে মিনতি ভরে বললেন,
“আম্মা, এখানে ছয় হাজার টাকা আছে। তুমি তো হজে যাচ্ছই। সেখানে গিয়ে পবিত্র জমজমের জলে ভিজিয়ে একটা কাফন নিয়ে এসো আমার জন্য। কে জানে হয়তো ওই পবিত্র কাফনের বরকতেই আমি জান্নাতে যেতে পারব।”
এক মুহূর্তের জন্য সাজিয়া কি বলবেন বুঝতে উঠতে পারলেন না। ব্যাপারটা তেমন কঠিন কিছু মনে হল না তাঁর। “আহারে, একটা কাফনই তো! একটু বেশি টাকা খরচ হলেও কিনে দিতে পারব,” মনে মনে ভাবলেন। সে মুহূর্তের আবেগেই তিনি দ্বিতীয়বার না ভেবে রাজি হয়ে গেলেন।
বুয়ার হাত থেকে টাকাগুলো নিতে নিতে সাজিয়া অনুধাবন করলেন—গরিব মানুষের পকেট থেকে বেরোনো টাকা ঠিক তাদের মতোই ভাঙাচোরা, দুমড়ানো-মুচড়ানো, কুঁচকে যাওয়া, শুকনো আর প্রাণহীন। কখনো কখনো তার মনে হতো, গরিব মানুষ যদি চকচকে নতুন নোট দেয়, সেটা বরং অদ্ভুদ বেমানান মনে হবে, এখন এ ব্যাপরটা নিশ্চিত হলেন। “ঠিক আছে, বুয়া, তুমি যাও,” এই বলে তাঁকে বিদায় জানালেন সাজিয়া। এরপর সঙ্গে সঙ্গে নিজের অ্যাটাচড বাথরুমে গিয়ে সেই টাকাগুলো বেসিনের ওপরে রেখে ভালোভাবে জীবাণুনাশক সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে তবেই বিছানায় শুতে গেলেন।
সাজিয়ার ঠিক মনে পড়ল না, ইয়াসিন বুয়া যে টাকাগুলো তাকে দিয়েছিলেন, সেগুলো তিনি বেসিন থেকে তুলে রেখেছিলেন কি না। সবাই সকালে হজ কমিটির নির্ধারিত বিমানে মদিনায় পৌঁছেছিলেন। নতুন পরিবেশ, ধর্মীয় স্থানসমূহে ভ্রমণ, আর আটদিনের মধ্যে ফরজ চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজ—এই সবের মধ্য দিয়ে সময় কীভাবে কেটে গেল, তিনি বুঝতেই পারলেন না। সুবহান তাকে কেনাকাটা করতে মানা করেছিলেন। কিন্তু সাজিয়া তার বাধাকে তেমন একটা পাত্তা দিলেন না। তিনি বিশ্বাস করেন—নিয়ম তৈরিই হয় ভাঙার জন্য। সবসময় তিনি যা চাইতেন, নির্দ্বিধায় তাই করতেন। এ ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি।
সুবহান একদিন ‘নিয়ত’-এর প্রসঙ্গ তুললেন। হজে যাওয়ার আগে তারা হজের নিয়্ত ও দোয়ার উদ্দেশ্য ঠিক করেছিলেন। তিনি সাজিয়াকে বলেছিলেন, হজ শেষ হওয়ার পর যেন কেনাকাটা করেন, কারণ হজের সময় কেনাকাটা করলে তাদের নিয়্ত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মদিনা ছেড়ে মক্কায় যাওয়ার সময়, সাজিয়ার কাছে সবকিছুই যেন নতুন অভিজ্ঞতা মনে হলো। এসবের মাঝে নিজের গ্রাম, নিজের বাড়ির কথা তিনি পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিলেন। মক্কায় থাকার স্মৃতি তিনি কখনো ভুলবেন না। ভারতের হজ কমিটি বেশ কয়েকটি ভবন ভাড়া নিয়েছিল। যারা কিস্তিতে যত বেশি টাকা দিয়েছিলেন, তাদের জন্য তত ভালো রুম বরাদ্দ হয়েছিল। প্রতি দুইটি রুমের জন্য একটি বাথরুম, একটি ছোট রান্নাঘর, গ্যাস সিলিন্ডার, চুলা, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন ও বাসার অন্যন্য সকল সুযোগ-সুবিধা ছিল। সাজিয়ার মায়ের দিকের চারজন একসাথে আসায় তাদের একটি বড় রুম দেয়া হয়েছিল। অন্য সব সময়ের মতো, মহিলারাই রান্নার দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। অধিকাংশ সময় নামাজ, কাবা শরীফ তাওয়াফ, দোয়া, আর অন্যান্য ধর্মীয় কাজেই কেটেছে। হেরা গুহা, যেখানে রাসুল (সা.) প্রথম ওহি পেয়েছিলেন, ওই ঐতিহাসিক মসজিদগুলোতে নামাজ আদায় করায় ব্যস্ত ছিলেন সবাই। সৌদি সরকার, বড় ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য দানশীল ব্যক্তিরা প্রতিদিন নামাজের পর বিশাল ট্রাক থেকে খাবারের প্যাকেট, জুস, আর পানির বোতল বিতরণ করত। হজযাত্রীদের আল্লাহর মেহমান বলে ধরা হতো, আর তাদের ভালোভাবে আপ্যায়ন করলে আল্লাহ খুশি হবেন—এই বিশ্বাস থেকে সবার আচরণে মনে হচ্ছিল, সেবাই যেন জীবন একমাত্র উদ্দেশ্য।
সাজিয়া ও তার দল হজের বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। একদিন দুপুরে, নামাজ শেষে কাবা থেকে ফিরে এসে তিনি একটু চোখ বন্ধ করলেন—হয়তো গরমে, কিংবা খাওয়া-দাওয়ার পরের ক্লান্তিতে ঘুম এসে গিয়েছিল। ঘুম ভেঙে উঠে কিছুটা সতেজ অনুভব করলেন। কিছুক্ষণ পর সকলের সাথে আসরের নামাজ পড়তে মসজিদুল হারামে যেতে হবে। অজু করার জন্য বাথরুমে গিয়ে তিনি একটা দৃশ্য দেখে থমকে গেলেন—পাশের রুমের জয়নব তাদের পানির ফিল্টার থেকে দশ লিটারের একটা বালতিতে পানি ঢালছেন। “জয়নব, কী করছো তুমি?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন সাজিয়া।
জয়নব চারপাশ তাকিয়ে বললেন, “কাফন ধুতে হবে।”
“তুমি কী বললে?” সাজিয়া চিৎকার করে উঠলেন। “তুমি খাওয়ার পানি চুরি করছো! এটা কি ঠিক? হজে এসেও তোমার এ বাজে স্বভাব যায়নি।” তিনি চিৎকার শুরু করলেন, আর জয়নব তাড়াতাড়ি বালতি নিয়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। সাজিয়া তখন পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। হাজিদের জন্য খাবার পানি ব্যবস্থা করার দায়িত্ব ছিল সৌদি সরকারের। পানি কোম্পানিগুলো বড় বড় প্লাস্টিকের ট্যাংকে করে পানি নিয়ে আসত না। বরং কাবা প্রাঙ্গণের ভেতরের জামজাম কূপ থেকে পানি ট্যাংকারে ভরে এনে, সেটি দুটি ঘরের জন্য নির্ধারিত ডিসপেনসারে ভরে দিত। ডিসপেনসারটিতে ১০ থেকে ১৫ লিটার পানি ধরত এবং প্রতিদিন বিকেল তিনটার দিকে তা আবার ভর্তি করে দেওয়া হতো। সাজিয়া প্রায়ই সেই ডিসপেনসার থেকে পানি পেতেন না। অধিকাংশ রাতেই, সুবহান নামাজ পড়ে ফেরার পথে তাদের ব্যবহারের জন্য একটি করে ৫ লিটারের বোতল কিনে আনতেন।
সাজিয়া প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলেন। জয়নবের দায়সারা জবাবে তার শরীর রাগে জ্বলছে। তার সাহস দেখে সাজিয়া হতবাক হয়ে গেলেন, তিনি ভাবতে লাগলেন, চুরি করা পানীয় জলে জয়নাব কতগুলো কাফন ভিজিয়েছে। ইয়া আল্লাহ! সে কি পুরো পরিবারকেই জমজম জলে ভেজানো কাফনে ঢেকে কবরে শোয়াতে চায়? সুবাহান স্ত্রীর চিৎকার শুনে দৌড়ে বেরিয়ে এসে দেখে, সাজিয়া হাসতে হাসেতে লুটিয়ে পড়ছে। ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, একটু আগেইতো চিৎকার করছিল। সুবহান স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে সাজিয়া? এত হাসছো কেন?” হেসে হেসেই তিনি পুরো ঘটনাটা সুবহানকে বললেন, তারপর বললেন, “দেখো না রি, এই লোকগুলো হজের গুরুত্বই বোঝে না। এসব ছোটখাটো জিনিস নিয়েই প্রতারণা করে।” সুবহান স্মিত হেসে বললেন, “তুমি কি এটা আজই প্রথম বুঝলে? আমি তো প্রথমদিনেই দেখেছি। কিন্তু তোমার মতো রেগে গিয়ে ঝগড়া করিনি। এ কারণেই তো আমি আলাদা করে পানি কিনে আনছি। ছেড়ে দাও, এটা নিয়ে ঝগড়া করার কিছু নেই।”
হঠাৎ সাজিয়ার বুয়ার কাফনের কথা মনে পড়ে গেল। “আর শুনো রি, দেখো তো, আমাদের ইয়াসিন বুয়ার জন্য কাফন কিনতে হবে। আজ সন্ধ্যার নামাজ থেকে ফেরার সময়েই সেটা কিনে ফেলি,”—নিজের প্রতিশ্রুতি মনে পড়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গেই তা পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। সুবহান মাথা নাড়লেন এবং তাড়াতাড়ি প্রস্তুতি নিতে লাগলেন, কারণ নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছিল। তারা যেমনটা ভেবেছিলেন, মসজিদুল হারাম পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেখানে ভিড় লেগে গিয়েছিল। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, পুরুষ ও নারী আলাদা স্থানে জড়ো হয়েছিলেন। মসজিদের খুঁটির ফাঁকে ফাঁকে দাঁড়িয়ে ছিলেন সবাই—হাত দু’টি গুটিয়ে, মাথা নিচু করে নতজানু। দেরি হওয়ায় সাজিয়া ও সুবহান মসজিদের বিশাল প্রাঙ্গণে একসাথে দাঁড়ালেন, অন্যান্য দেরিতে আসা মানুষের ভিড়ে দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল চারিদিক। প্রচণ্ড রোদ, বিশাল ছাতাগুলি ছায়া দিচ্ছিল। সূর্য উঠার সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডানা মেলে খুলে যায় ছাতাগুলি, সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলেই সেই ডানাগুলো আবার ভাঁজ হয়ে স্তম্ভের মতো রূপ নেয়। সাজিয়ার কাছে দৃশ্যটি সবসময়ই মুগ্ধ করার মতো ছিল।
এশার নামাজ শেষ কাবা শরীফ থেকে হেঁটে ফিরছিল তারা। লক্ষ লক্ষ মানুষ মেইন রোড আর গলিতে চলাফেরা করছিল, সুবহান ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না কোন দোকানে কাফন পাওয়া যাবে, যেখানে সাজিয়া ইয়াসিন বুয়ার জন্য একটি কাফন কিনতে পারবেন। সাজিয়া যেন হারিয়ে না যায়— সুবহান শক্ত করে তার হাত ধরে রেখেছিল, বিনা সংকোচ কখনো বা কোমরে হাত রেখে হাঁটছিল। ওই ভিড়ের মধ্যেও স্ত্রী যেন আরাম করে হাঁটতে পারে, তাই তাকে সামলে নিয়ে ধীরে হাঁটছিল সুবহান। প্রতিটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আগে নিশ্চিত হয়ে নিচ্ছিলেন যে সেখানে কাফন বিক্রি হয় কি না, তারপরই এগিয়ে যাচ্ছিল। কাফন খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ এক কার্পেটের দোকানে সাজিয়ার চোখ আটকে গেল। সেই দোকানের জিনিসপত্র দেখে সে এতটাই মুগ্ধ হয়ে গেল যে, আর বেরুতে মন চাচ্ছিল না। কার্পেটের সৌন্দর্য, ডিজাইন, রঙ, আর মাঝখানের কারুকাজ—সবই যেন তাকে মাতোয়ারা করে দিয়েছিল। স্বামীকে কিছু না বলেই সে একটা কার্পেটের দামাদামি শুরু করে দিল। তাকে থামানো সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হলো সুবহানের। সাজিয়ার নিয়্ত নষ্ট হবে, হজের উদ্দেশ্য ভঙ্গ হবে—এইসব আবেগপূর্ণ যুক্তিগুলো শূন্যে উড়ে গেল। হজ শেষ হলে যত ইচ্ছা কেনাকাটা করা যাবে, এই আশ্বাসেও সাজিয়াকে নড়ানো গেল না। শত চেষ্টা করেও স্ত্রীকে সেই দোকান থেকে টেনে বের করতে পারল না সুবাহান।
সাজিয়া নিজের পছন্দ করা টার্কিশ কার্পেটে এতটাই নিমজ্জিত ছিল যে চারপাশে কোন কিছুর বা করো প্রতি তার কোন খেয়াল ছিল না। হতাশ হয়ে সুবহান দোকানের বিক্রয় কর্মীর কাছে ফিসফিস করে বলল, “এখানে কি কাফন পাওয়া যায়?” সহকারি সঙ্গে সঙ্গেই একটি প্লাস্টিকে মোড়ানো, লাশের মতো ভারী কাফনের বান্ডিল বের করল। সুবহান সাধ্যমতো সাজিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। সে কার্পেটটা শক্তভাবে ধরে রেখেই, এবং বাঁ হাত দিয়ে কাফনটা তুলতে চেয়েছিল। “আরে বাবা, এটা কত ভারি! কিভাবে নিয়ে যাব?” বলেই মুহূর্তের মধ্যে আবার কার্পেটে মনযোগ দিল।
অবশেষে তার কেনাকাটা শেষ হলো। সুবহান তার পকেটের টাকাগুলো গুণে, দোকানদার প্যাক করা কার্পেট কাঁধে তুলে নিয়ে বের হয়ে এলো। এখানে অটোরিকশা বা কুলি পাওয়া আশা নেই, তাই নিজেই কার্পেটটা বয়ে নিয়ে হাটা শুরু করলো, মনে মনে দোয়া করছিল তাদের সাথে আসা পরিচিত কেউ যেন না দেখে। মাঝপথে সাজিয়ারও খারাপ লাগলো, জিজ্ঞেস করলো, “ওটা তো খুব ভারি নয়, তাই না রি?” সুবহান কিছুই বলল না। সে এতটাই রেগে গিয়েছিল যে মন চাচ্ছিল তাকে পিটিয়ে অজ্ঞান করে দেয়, কিন্তু খুব ধৈর্যের সাথে হতচ্ছড়া কার্পেটকে ঘরের এক কোণে ফেলে লম্বা করে শ্বাস নিল। অন্য যেকোনো পরিস্থিতিতে, সে অন্তত রেগে তাকাত, হয়তো তাকে বকাঝকাও করত। কিন্তু যেহেতু এটা হজ, আর ঘরের সবাই সাজিয়ার আত্মীয়-স্বজন, তাই নিজেকে শান্ত রাখল।
তাদের হজযাত্রা শেষ হলো। যদিও যত্রতত্র কিছু ভুল নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন ছিল, তবুও দু’জনেই সন্তুষ্ট ছিল। মিনা থেকে ফিরে সাজিয়া বিছানায় পড়ে গেল, যা কিছুটা দুশ্চিন্তার কারণ ছিল। রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল, এবং তাকে দু’দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে একদিন বিশ্রাম নেওয়ার পর তার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে। অন্যকিছু যাই হোক সে তার কেনাকাটার সময় নষ্ট হওয়ায় খুবই বিরক্ত ছিল। সুবহানকে সে জোর দিয়ে বলল, “আমার শরীর ঠিক আছে, একদম ঠিক আছে”, এবং অল্পদিনের মধ্যেই তার শারীরিক অবস্থাও ভালো হয়ে উঠল। সুবহান নানা কৌশলে কেনাকাটা বন্ধ করানোর জন্য চেষ্টা করলো। টাকার ব্যাপারে সে চিন্তিত ছিল না, তবে বেশি লাগেজের কারণে বিমানবন্দরে সমস্যা হতে পারে বলে সে ঝামেলা এড়াতে চাচ্ছিল। কিন্তু সাজিয়াকে সে দুঃখ দিতে চায়নি, তার রক্তচাপ আবার বেড়ে না যায়—এই ভয়ে কেনাকাটা কমানো সব পরিকল্পনা বাদ দিতে হলো। সাজিয়াকে কেউ থামাতে পারছিল না।
কেনাকাটার দৌড়ঝাঁপের মাঝেও ইয়াসিন বুয়া এবং তার কাফনের কথা মাঝে মাঝে হঠাৎ করে ঝলকের মতো মাথায় আসছিল, তারপর ধীরে ধীরে আড়াল হতে শুরু করল এবং একসময় সে বিষয়টা সম্পূর্ণভাবে ভুলেই গেল। এই জাদুর শহরে, কাফনের মতো এমন মন ভারি করা একটা বিষয় নিয়ে এতটা ভাবতে হবে... ও খোদা!....ভারতে কি কাফন পাওয়া যায় না? আমাদের গ্রামে কি পাব না? আমি কি বলে দেব, মক্কায় খুঁজে পাইনি? আহ! আমি কি হজ থেকে ফিরে এমন মিথ্যা বলতে পারব? “তাওবা, তাওবা” হালকাভাবে নিজের গালে চড় মেরে বলল। মিথ্যা বলবেন না ঠিক করলেন। তিনি কল্পনাও করতে পারেননি ইয়াসিন বুয়ার ইচ্ছেটা এমন ঝামেলার কারণ হয়ে উঠবে।
এখন, ইয়াসিন বুয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে সাজিয়া ভেঙ্গে পড়ল, ভাবতে লাগল অপূর্ণ ইচ্ছার পরিণতি কি কি হতে পারে। “আহারে, যদি জানতাম, আমি অবশ্যই প্রতিশ্রুতি রাখতাম, যত কষ্টই হোক,” মনে মনে খুব কষ্ট পাচ্ছে সে।
সাজিয়া এত কেনাকাটা করেছিল যে ফেরার সময় তার বেশির ভাগ মাল সাথে থাকা অন্যদের ব্যাগে ভরতে হয়েছিল। এতসব ঝামেলা সামলাতে সামলাতে সুবহান ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তারপর আবার ৫ লিটার জমজমের পানি, কেজিতে কেজিতে খেজুর সবাইকে বণ্টন করতে হয়েছিল আর এসব জিনিস কি হালকা ছিল নাকি? সাজিয়া শুধুমাত্র নিজের বোরখা পরে হ্যান্ডব্যাগ হাতে নিয়েছিল। আর ছোটোখাটো বিষয় নিয়ে স্বামীর কাছে বারবার ছুটে আসছিল, যা সুবহানকে আরও বিরক্ত করে তুলেছিল। শেষমেষ নানা রকম ঝামেলার পর তারা সবাই যার যার সব ব্যাগ নিয়ে বিমানে উঠতে পেরেছিল।
ফেরার এক মাস পরও, সাজিয়া সবাইকে সব উপহার বিতরণ শেষ করতে পারেনি। প্রথম তিন দিন সে শারিরিক দুর্বলতা ও জেটল্যাগের কারণে বিছানা থেকে উঠতেই পারেনি। তারপর ছিল প্যাকেট খোলার ঝামেলা। এরপর সে তার প্রিয়জনদের জন্য আনা সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান উপহার পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করল। দামি কার্পেটের রোলটা মেলে দিয়ে সবচে আনন্দ পেল। সুবহানের নিরবতা তার নজরেই পড়লো না; একরাশ বিরক্তি নিয়ে সে চুপচাপ চলে গেল। তারপর সাজিয়া জামাকাপড়, খেলনা যার জন্য যা এনেছিল সবাইকে বুঝিয়ে দিল। তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আত্মীয়া নির্দিষ্ট ডিজাইনের, নির্দিষ্ট রঙের, নির্দিষ্ট কাট ও এমব্রয়ডারির কাজ করা বোরখা চেয়েছিল। কেউ কেউ টাকা দিয়েছিল, অন্যদের জন্য, সে বোরখাগুলো উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিল, এক ধরনের কর্তব্যবোধ থেকে। বাকি সবার জন্য পাঠাল একটি জায়নামাজ, তাসবিহ, এক মুঠো খেজুর আর এক বোতল জমজমের পানি। যদিও সব কিছু সে নিজে করেনি, তবুও নজর রাখতে হয়েছে তাকে, এসব করতে করতে সে ক্লান্ত হয়ে গেল। এক মাসেরও বেশি সময় লেগে গেল পুরো কাজটা শেষ করতে।
ভারতের মুসলিম সমাজে একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে, হজ থেকে ফিরে আসা মানুষদের মাঝে এক ধরনের ইতিবাচক ও আধ্যাত্মিক শক্তি থাকে। এই শক্তি যেন ব্যর্থ না হয়, যেন তা আল্লাহর ইবাদতে ব্যবহার হয়—এই উদ্দেশ্যে মুসলমানরা প্রায় ৪০ দিন ঘরে থাকেন, এটা কঠিনভাবে মানতের মতো পালন করেন, সাজিয়াও তা পালন করলেন। এ সময় ইয়াসিন বুয়া তার নিয়মিত অভ্যাসমতো কয়েকবার বাড়িতে এলেও, চুপচাপ অশ্রু সজল চোখে ফিরে যেতে হলো। প্রতিবারই তাকে জানানো হতো সাজিয়া হয় ঘুমাচ্ছে, নয়তো বিশ্রামে আছে, নয়তো নামাজ পড়ছে, কিংবা খুব জরুরি কাজে ব্যস্ত। একদিকে, সে কাফন দেখার জন্য অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। অপর দিকে, হজ থেকে ফেরা সাজিয়ার কাছাকাছি যেতে চাইছিল, তার হাত দুটো নিজের মোটা-খসখসে হাতে নিয়ে জড়িয়ে ধরতে চাইছিল। সে দিনের পর দিন অপেক্ষা করছিল, ভাবছিল হয়তো সাজিয়া তার জন্য কিছু এনেছে।
অবশেষে ইয়াসিন বুয়ার যন্ত্রণাময় অপেক্ষা অবসান করে একদিন সাজিয়া দেখা দিল। সদ্য স্নান সেরেছে, মাথার চুল তখনও আধভেজা। আকাশি রঙের জমকালো চুড়িদার পরা, একই রঙের কারচুপি এমব্রয়ডারির কাজ করা ওড়না মাথায় ফ্যাশনেবলভাবে জড়িয়ে বেরোল সাজিয়া—আনন্দে ইয়াসিন বুয়ার বুক ভরে উঠলো। সে দৌড়ে এসে বাঁধনহারা আনন্দে সাজিয়ার হাত চোখে ছুঁইয়ে নিল। একজন হাজির স্পর্শে মনে হচ্ছিল যেন তার আত্মাও পবিত্র হয়ে গেছে, তার হাতে কাঁটা দিয়ে উঠল। সাজিয়া তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে হালকা আলাপ শুরু করল: “কেমন আছো বুয়া?” সে সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে গিয়ে একটি জায়নামাজ ও তাসবিহ এনে বলল, “নাও, এগুলো তোমার জন্য।” কিন্তু ইয়াসিন বুয়া যা দেখতে চেয়েছিল, সেটা সেখানে ছিল না। এই মুহূর্তটাতেই তার সেই কাঙ্ক্ষিত আশা পূরণ হবার কথা ছিল—জমজম পানিতে ভেজানো কাফনে জড়িয়ে আল্লাহর পথে যাত্রা করার স্বপ্ন। সে তার হাত বাড়াল না উপহার নিতে, শুধু হতবাক হয়ে সাজিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল, এক মুহূর্তের জন্য যেন হতাশায় চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে পরিষ্কার ও দৃঢ় স্বরে বলল, “আমি এগুলো চাই না। আমাকে আমার কাফনের কাপড় দাও।” কথাটা শুনে সাজিয়া বিস্মিত হয়ে গেল। রেগে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “ছি! কেউ কি কখনো জায়নামাজ ফিরিয়ে দেয়?” কিন্তু বুয়া এক ইঞ্চিও নড়ল না। নিজের অবস্থানে অটল রইল, “তোমার শাশুড়ি হজ থেকে ফিরে এসে আমায় যে জায়নামাজটা দিয়েছিলেন, সেটাই এখনও আছে। সময় পেলে তাতে নামাজ পড়ি। এত সুন্দর নতুন জায়নামাজ আমি কোথায় রাখব? আর ক’দিনই বা বাঁচব? ক’ওয়াক্ত নামাজই বা পড়ব? আমার লোক সমাজ থেকে বিদায় নেয়ার সময় হয়েছে, শান্ত বন জঙ্গল আমায় ডাকছে বিশ্রাম নিতে। আমি শুধু কাফন চাই।”
সাজিয়া ইয়াসিন বুয়াকে এরকম আগে কখনও দেখেনি। যিনি সবসময় কোমর বাঁকিয়ে হাঁটতেন, প্রতি মুহূর্তে সাজিয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতেন, চোখ তুলে তাকাতেও ভয় পেতেন, যেন নজর না লেগে যায়, কড়ে আঙ্গুল দিয়ে ছুঁয়ে দিতেন। দোয়া করতেন, “আল্লাহ তোমার হায়াত বাড়াক, তোমাকে ধন-সম্পদ দিক, তোমার সংসার ভালো থাকুক। আল্লাহ জান্নাতে তোমার জন্য মণিমুক্তার ঘর বানাক।” আজ সেই বুয়া এমন দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে, কে এই বুয়া?
সাজিয়ার রাগে ফেটে পড়ল। ভুলে গেল সে সদ্য হজ করে ফিরেছে। “কাফনের কাপড়? কিসের কাফনের কাপড়, মরার পরে তো কেউ না কেউ তোমার গায়ে কাফন একটা পরিয়েই দেবে। এত নাটক করছ কেন? কী হয়েছে তোমার, বুয়া? পাগল হয়ে গেছ নাকি? তুমি আমাকে কত টাকা দিয়েছিলে? তার দশগুণ আমি তোমার মুখের ওপর ছুড়ে ফেলতে পারি! দাঁড়াও, এরপর আর কখনও আমাকে তোমার এই মুখ দেখিয়ো না” এই বলে সে চিৎকার করতে করতে রাগে ঘরে ঢুকে গেল। যখন হাতে করে দুটো পাঁচশো টাকার নোট নিয়ে বেরিয়ে আসলো, ইয়াসিন বুয়াকে কোথাও দেখতে পেল না। কিন্তু তার যে মেজাজ, সে বুয়াকে এত সহজে ছাড়বে না। সে দৌড়ে রান্নাঘরে গেল। বাড়ির পেছনের উঠোনেও খুঁজল। পাশের গলিতে উঁকি দিল, কিন্তু যেদিকেই তাকাল, বুয়াকে কোথাও খুঁজে পেল না। “জাহান্নামে যাক” ভাবতে ভাবতে সে টাকাগুলো টি-টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। যেমনটা সাজিয়া চেয়েছিল, এরপর ইয়াসিন বুয়া আর কখনও তার সামনে আসেনি। ভাবল, বেঁচে গেলাম, ঝামেলা গেল। এই ভেবে সে এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করল, শান্তি পেল। কিন্তু বুয়া এটা কীভাবে করতে পারল? এই প্রশ্ন মাঝে মাঝে তার মনে উঁকি দিত এবং তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা রাগটা আবার জেগে উঠতো। “কিন্তু কী বা তার করার আছে? বুয়া তো আর তার সামনেই আসে না। যাক গে, রমজান বা বকরি ঈদে নিশ্চয় ভিক্ষা চাইতে আসবে আবার। আশা কিরেছিল নিজের পিঠ বাঁকিয়ে ছোটখাটো শরীরের বুয়া নিশ্চয়ই রমজান মাসে অন্তত একবার আসবে।” কিন্তু বুয়ার আত্মসম্মান বোধকে এত খাটো করে দেখা ভুল ছিল। সে খুব ব্যাকুল ভাবে তার কাফন একবার ছুঁয়ে দেখতে, এক ঝলক চোখের দেখা দেখতে চেয়েছিল, যেমন করে কনে তার বিয়ের শাড়ি ও প্রসাধনীর অপেক্ষায় থাকে। অথচ যেভাবে সাজিয়া ঝলমলে জামাকাপড় ও সোনার গয়না পরে, তার সাথে একেবারে ভিখারির মতো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্ল করেছিল, বুয়ার মনে বিষটা চিরস্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছিল।
স্বপ্নেও ভাবেনি সাজিয়া, বুয়া তাকে মৃত্যুর পরেও এভাবে তাড়া করে বেড়াবে। হঠাৎ করে এক তীব্র ব্যথার ভারে সে ভেঙে পড়ল। সে কী করব? কী করব না? বুয়া যদি এক লাখ টাকার কাফন চাইত, সাজিয়া দিয়ে দিতো। কিন্তু মক্কা থেকে আনা, জমজম পানিতে ভেজানো কাফন? “হে আল্লাহ, এখন কী করব?”
এই ভুল সংশোধনের উপায় কী, বারবার নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে লাগল সে, এখন সে কী করবে? কী করবে? হাতের মোবাইলটা চেপে ধরে, সে দৌড়ে ওপরে উঠে গেল, একটা ফাঁকা ঘরের কোণে আশ্রয় নিল। শরীরে কি জ্বর এসে গেছে? নাকি সে কাঁপছে? ঘামছে কেন? কিছুই বুঝতে পারছিল না। কী দুর্ভাগ্য! যদি এই গরিব মহিলা কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে নিজের শাড়ির আঁচল তুলে ন্যায়বিচার চায়, তাহলে আমি আমার সমস্ত নেকি ঢেলে দিলেও রেহাই পাব না, এই ভেবে আঁতকে উঠল সাজিয়া। বিষয়টা তার কছে পরিস্কার, বুয়ার চেয়ে সে-ই বেশি গরিব, বেশি দুর্ভাগাও।
এই কাফনটাই ছিল মৃত নারীর শেষ ইচ্ছা। না হলে তার ছেলে কেন এসে খুঁজবে এটা? কেন সে তার মৃত মায়ের হয়ে হাত পেতে চাইবে সেটা? সে আস্তে কথা বলছিল, কিন্তু স্পষ্ট দৃঢ়তা ছিল, সে মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করেই ছাড়বে। এখন সাজিয়া কীভাবে নিজেকে এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচাবে? একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল তার মেরুদণ্ড দিয়ে। যদি ছেলেটা অন্য কাফন ব্যবহার করতে রাজি না হয়, তাহলে সেদিন বুয়ার দাফনই হবে না। মুসল্লিরা মসজিদে তার স্বামী ও ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করবে। মাথা নিচু করে, হাত জোড় করে দাঁড়ানো তাদের কল্পনা করতেই সাজিয়ার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ফারমানতো তাকে ছাড়বে না। সে যেমন ভালোবাসতে পারে, তেমনি কঠিনও হতে পারে তার সাথে। তার চিন্তাগুলো ঘুড়ির মতো এদিক সেদিক ছুটে বেড়াতে লাগল। সে বসে দম আটকে-আটকে কাঁদতে লাগল, যেন কান্নায় বুক ফেটে যাবে। এত কাঁদার পরও কি তার হালকা লাগল? না। বুকে জমে থাকা কষ্টটা যেন গলায় এসে আটকে ছিল। দোয়া করল, আল্লাহ এমন যন্ত্রণা যেন তাঁর শত্রুকেও না দেন। সে হাঁপাতে লাগল, শ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগল।
দু-এক ঘণ্টা একা বসে কাঁদার পর, একটুখানি আশার আলো দেখা দিল। সে নিচে থেকে সুবহানের গলা শুনতে পেল, “সাজিয়া! সাজিয়া! আমার কাপড় কোথায়? আমার কলম কই? নাস্তা রেডি হয়েছে?” সাজিয়া শুনছিল, কিন্তু তার মুখ থেকে কোন শব্দ বেরোচ্ছিল না। কিন্তু সাবা সঙ্গে সঙ্গেই তাকে জবাব দিল। তার রুম থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “আব্বাজি, আম্মি বাসায় নেই। সকাল সকাল খবর এসেছিল, কেউ মারা গেছে। মনে হয় সেখানেই গেছেন।”
“কি?! কে মারা গেছে? কে বলেছে তোমায়?” সুবহান জিজ্ঞাসা করল।
“ফারমান বলেছিল, তারপর চা-নাস্তা না খেয়ে বাইরে চলে গেল। আম্মিও হয়তো তার সঙ্গে গেছেন,” সাবা অনুমান করে বলল। সাজিয়া গভীর একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ছেলের বউ হিসাবে যে স্বাভাবিক ধূর্ততা থাকার কথা, সবই আছে—তবুও সাবা যতই খারাপ হোক না কেন, সেই ঘটনার পর সাজিয়ার তার প্রতি সামান্য মায়া হলো। সে এখন সুবহানের জন্য ডাইনিং টেবিলে চীনামাটির বাটিতে রুটি আর তরকারি সাজিয়ে দিচ্ছিল, বাবুর্চির রান্না করা খাবার পরিবেশন করছিল। কিছুক্ষণ পর সে সুবহানের গাড়ির শব্দ শুনল, যা গেট পেরিয়ে বাড়ির চৌহদ্দি হতে বেরিয়ে গেল। আর কেঁদেও কোনো লাভ নেই। এখন মনে হল, তার কিছু একটা করা দরকার।
সাজিয়া এত কান্না আগে কখনও করেনি, অন্য কারো মৃত্যুতেও না, এমন কি নিজের বাবার মৃত্যুতেও না। আর তাছাড়া তখন চারপাশে অসংখ্য মানুষ ছিল, কেউ তাকে পানি খাইয়ে দিচ্ছিল, কেউ গোলাপজলে ভেজানো তুলা দিয়ে চোখের পানি মুছিয়ে দিচ্ছিল, কেউ পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, কেউ বুকে জড়িয়ে ধরছিল, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজনরা একে অপরকে ঠেলে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছিল। এসবের মাঝে নিজের দুঃখটাও সামাল দেওয়া সহজ ছিল। কিন্তু এখন? বাড়ির এক কোণে নিঃসঙ্গ অনাথের মতো লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে—এ ঝামেলাটা সে নিজেই নিজের উপর টেনে এনেছে। তাকে এটা থেকে এখনি বের হতে হবে। সিদ্ধান্ত নিয়ে সে তাড়াতাড়ি আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের ফোন করা শুরু করল।
“আমি একটা জমজমের পানিতে ভেজানো কাফন খুঁজছি—” তার কথা শেষ হবার আগেই উত্তর আসতে থাকলো “হুঁম... সাজিয়া না? না, আমাদের বাড়িতে কাফন নেই। মা হজে গিয়ে একটা এনেছিলেন, কিন্তু যাকে দিতে বলেছিলেন দিয়ে দিয়েছি এবং কাজও শেষ।” আরেকজন বলল, “কি বললে? কাফন চাও? হা হা হা... আমাদের বাড়িতে তো এসব রাখা হয় না। আমরা কাউকে কাফন দিব বলে প্রতিশ্রুতি দেই না। এটা খুব ঝামেলার ব্যাপার।” অন্য আরেক জনের প্রতিক্রিয়া ছিল, “মক্কা থেকে আনা কাফনই কেন হতে হবে? এখানকার কাফন দিলেই বা কী সমস্যা? আখিরাতে তো আমাদের আমলের উপরই সবকিছু নির্ভর করে, তাই না?”
সব জায়গা থেকে ‘না’ শুনে শেষমেশ সাজিয়া ফোন করল সাবার মাকে। যদিও তার ইচ্ছা ছিল না, মন থেকে মোটেও চায়নি এ কাজ করতে। হ্যালো... হ্যালো... কুশল বিনিময়ের পর, সে নিজের আত্মসম্মান ও অহঙ্কার পাশে রেখে সোজা প্রশ্নে চলে এল—“আপনার কাছে কি মক্কা থেকে আনা কোনো কাফন আছে?” সাবার মা সাজিয়াকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। সাবা প্রায়ই নিজের মায়ের কাছে যেভাবে শাশুড়ির বিবরণ দিত— সারাক্ষণ গজগজ করতে থাকা রাক্ষসী একটা। নিষ্ঠুর এক মহিলা, ছেলের বউকে কঠোর নজরদারিতে রাখে, অত্যাচারী ডাইনি তার শান্তির পথ পেঁচিয়ে থাকা বিষধর অজগর। এই সব কিছু বিবেচনায় রেখে, সাবার মা যেকোনো মূল্যে একটি কাফনের ব্যবস্থা করতে রাজি ছিলেন—যদি তা সাজিয়ার নিজের জন্যই হয়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কাফন চাও?” কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন যেন কথাটার গুরুত্ব যেন ঠিকমতো বোঝা যায়। তারপর বললেন, “কিন্তু তুমি এটা কেন চাও? তার কণ্ঠে তীব্র বিদ্রুপ ছিল, সাজিয়া চুপচাপ ফোন কেটে দিল। তার নিজের বাবার বাড়ি থেকে শুরু করে এই কাফনের অনুরোধ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল সব আত্মীয় ও বন্ধুদের কাছে। সে কখনো ভাবেনি, সে এতটা অসহায়ও হতে পারে সে। আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল—স্রোতের মতো চোখের জল ঝরতে লাগল।
কেঁদে কোনো লাভ নেই বুঝে সাজিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে এল, কিছু খেয়ে ওষুধ খেয়ে নেবে ঠিক করল। কিন্তু এসব কিছুই তার অবস্থা ভালো লাগছিল না। একেবারে ভেঙে পড়ল। ভাবল, স্থানীয়ভাবে একটা কাফন কিনে, বাড়িতে রাখা জমজমের পানিতে ভিজিয়ে পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু তাতে তো আর মক্কা থেকে আনা কাফনের মর্যাদা থাকে না। নিজের এই অবস্থার প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মে গেল তার, এবং অসহায়ের মতো নিজেকেই অভিশাপ দিতে লাগল, “থু, সাজিয়া, তোর জীবন ধ্বংস হোক।” সেই মুহূর্তের কষ্ট, যন্ত্রণা, অপমান, অসহায়তা ও বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো ছিল না।
বিকেল তিনটার দিকে ফারমান বাড়ি ফিরল। ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে সাবাকে জিজ্ঞেস করল, “আম্মি কোথায়?” ততক্ষণে সাবা বুঝে গিয়েছিল যে তার শাশুড়ির মন খুব খারাপ, তাই কিছু না বলে চোখের ইশারায় সাজিয়ার ঘরের দিকে ইঙ্গিত করল। ফারমান তাড়াতাড়ি সেই ঘরে গেল, আর মুখ দেখেই মায়ের অবস্থা সব বুঝে ফেলল। সে পাশে বসে তার হাত ধরে বলল, “আম্মি।” সাজিয়া যেন একটুখানি ভরসা পেল, কান্নায় ভেঙে পড়ল। ফারমান যতই সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করুক, সাজিয়ার কান্না থামছিল না—সে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছিল। সাবা অবাক হয়ে ভাবছিল, তার শাশুড়ি কি এতই সংবেদনশীল যে, একজন কাজের মহিলার মৃত্যুতে এতটা ভেঙে পড়েছে। সে দরজা ধারে দাঁড়িয়ে ছিল, ফারমান চোখের ইশারায় তাকে চলে যেতে বলল।
সকালে ফারমান রেগে গিয়েছিল সাজিয়ার ওপর। “উনি রাজি না হওয়াই উচিত ছিল, কিন্তু রাজি হয়ে কথা না রাখা ঠিক হয়নি—একটা কাফন আনতে কত টাকাই বা লাগে? তাও আবার একজন গরিব মহিলার জন্য।” তার খুব খারাপ লেগেছিল। “আম্মি, অন্তত গত বছর যখন সাবা আর আমি উমরাহ করতে গিয়েছিলাম, তখন যদি বলতেন, আমি নিশ্চয়ই এনে দিতাম।” সে বুঝে উঠতে পারছিল না, একটা কাফন আনাটাই এমন কঠিন কীভাবে হয়ে গেল। সে তাকে দোষারোপ করে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল। মায়ের এই কষ্ট দেখে দুঃখে সে বলল, “আম্মি, থাক, এমনটা হতেই পারে। কখনও ভুলে, কখনও দুর্ভাগ্যবশত—এই জিনিসগুলো হয়ে যায়। আপনি মনে কষ্ট পাবেন না। আর, আম্মি, আমি সকালে আলতাফের সঙ্গে গিয়ে বুয়ার দাফনের সব কাজ শেষ করেছি। কাফন, আগরবাতি, আতর আর দরকারি বাকি সব জিনিস কিনে এনেছি। কবরে দেওয়ার জায়গাটা ঠিক করে লাশ গোসলেরও সব ব্যবস্থাও করেছি। ভেবেছিলাম, দুপুরে খেয়ে আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যাব। আমি জানি, না গেলে আপনার মন শান্ত হবে না। চলুন, আমার সঙ্গে খেয়ে নিন। তারপর আমরা একবার যাই, শেষবারের মতো ইয়াসিন বুয়াকে দেখে আসি।”
সাজিয়ার বুকের ভেতর আবার কষ্টের ঢেউ উঠল। ফারমান তার সামনে খাবারের থালা এগিয়ে দিল। অল্প কিছু ভাত মুখে দিয়ে সে সাবাকে বলল, “তোমার যাওয়ার দরকার নেই, শুধু আম্মি গেলেই হবে।” তারপর মাকে নিয়ে রওনা হল ইয়াসিন বুয়ার বাড়ির দিকে। সেখানে কী কী হতে যাচ্ছে, সে কল্পনা করছিল। ইয়াসিন বুয়ার মুখ দেখেই সাজিয়া আবার কান্নায় ভেঙে পড়বে। হয়তো সাজিয়া ততটাই অশ্রুপাত করেছে, যতটা ইয়াসিন বুয়ার মেয়ে আর ছেলে করেছে। কিন্তু তবুও সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না। ফারমান বুঝতে পারল, সাজিয়া দীর্ঘদিন এই শোক পুষে রাখবে।
ইয়াসিন বুয়ার বাড়িতে যাওয়ার পর যেমনটি ভেবেছিল, ঠিক তাই ঘটল। সাজিয়ার কান্নার কোনো শেষ ছিল না, তার চোখের পানি যেন শুকোতেই চাইছিল না। যারা তার মুখ, তার লাল হয়ে যাওয়া চোখ, ফুলে যাওয়া ঠোঁট দেখছিল, অবাক হয়ে যাচ্ছিল। অনেকে সহানুভূতি প্রকাশ করছিল, ভাবছিল, এত বড় ঘরের, এত বিত্তশালী পরিবারের কোনো মহিলা কোনো কাজের মানুষের মৃত্যুকে ঘিরে এমনভাবে কেঁদে ভেঙে পড়েছে—এমনটা আগে কখনও দেখেনি। কে জানে, ওদের মধ্যে কী সম্পর্ক ছিল?—বলে অনেকেই সেই দায় সৃষ্টিকর্তার ওপর ছেড়ে দিল। সব আল্লাহর ইচ্ছে। শুধু সাজিয়াই জানত আসল সত্যটা—এটা ইয়াসিন বুয়ার দাফন ছিল না, ছিল তার নিজের আত্মার দাফন।
সুন্দর লেখা ,,অভিন্দন ।
সেলিম আহমেদ
জুন ১৪, ২০২৫ ০৯:২৪



অসম্ভব সুন্দর একটা ঘটনা। মানুষের মনে ওয়াদা রক্ষা করার জন্য শক্তি সঞ্চয় করে এই ঘটনার মাধ্যমে।
সাকিবুল ইসলাম
জুন ০৪, ২০২৫ ১০:৩৭