কয়েকটি ছোট কাহিনি
|| পাগল ||
একদা এক রাজ্যে সব পাগলা গারদ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ফলে রাস্তাঘাটে এখানে-সেখানে প্রায়ই পাগলদের দেখা পাওয়া যেত।
ওই রাজ্যে রাজার অধীনে একটা গোপন কূপ ছিল। সেখানে কোনো সূর্যের আলো পৌঁছাতো না। কূপটি সবসময় কালো কাপড়ে ঢাকা থাকত।
রাজ্যের শহর ও গ্রামে যত নতুন ও পুরাতন পাগল ছিল রাজা তাদের সেই রহস্যময় কূপের পানিতে গোসলের ব্যবস্থা করতেন। বহু বছর ধরে এভাবেই কূপটির আশীর্বাদে পুরো রাজ্য পাগলমুক্ত হয়ে ওঠে।
অবস্থা দৃষ্টে রাজা ভাবলেন, কূপটি এবার বুজিয়ে ফেলা উচিত। রাজ্যে আর এক-দুজন পাগলও বাকি আছে বলে তো মনে হয় না।
শহরগুলো যখন একে একে পাগলশূন্য হয়ে গেল, তখন সেইসব শহরে আর কেউ আগের মতো আনন্দ খুঁজে পায় না। যারা একসময় পাগল ছিল—তাদের কেউ গান গাইত, কেউ নাচত, কেউ ছবি আঁকত, আবার কেউ বেহুদা তর্কে মেতে থাকত... এখন সেইসব শহরে ও গ্রামে শুধু নিস্তব্ধতা।
কিছুদিনের মধ্যেই খবর হলো—বিশেষ করে শহরগুলোতে পাগলের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। যে দেশ এক সময় পাগলের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে পর্যটকদের আকর্ষণ করত, সেখানে এখন কেউ আর বেড়াতে আসে না। রাজ্যের বৈচিত্র্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
রাজা বুঝলেন, এই অভাব শুধু একটি সমস্যা নয়, বরং এক গভীর সংকেত। পাগলের অভাব ঘোচাতে রাজ্যের সামনে এখন নতুন করে অনেক কিছু ভাবার দরকার হয়ে পড়েছে।
পাগলের এ সাময়িক অভাব কীভাবে পূরণ করা যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য রাজা উজিরদের নিয়ে এক সভায় বসলেন।
রাজ্যের প্রধান উজির বললেন, তার নিজের এক মেয়ে একটু পাগল। পুরাটা পাগল হলে তাকে ওই কূপের পানিতে গোসল করানো হবে। রাজা হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। অন্তত অর্ধেক পাগল হলেও তো রাজ্যে পাগল আছে! পাগল সংকট উত্তরণের উপায় নিয়ে ভাবতে সবাইকে বললেন। কূপের পানিতে গোসল করিয়ে পাগল ভালো করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি সে সুয়োগ না নেয়ার জন্য প্রধান উজিরের বহুল প্রশংসা করলেন। হুটহাট সিদ্বান্ত নেয়ায় ওস্তাদ অন্যসব উজিরকে তিনি তিরস্কার করলেন। কারণ তাদের ঘরে ও তাদের আত্মীয়দের সকল পাগল আধা-পাগলকেও হরেদরে গোপনে-সদরে বৈধ-অবৈধভাবে রাজার এ কূপের পানিতে গোসল করিয়ে ভালো করে নিয়েছে।
ভবিষ্যতে রাজ্যের যদি কেউ পাগল হয়ও তাদেরকে তো ভালো করার দরকার হবে। তাই রাজা কূপটি না বুজিয়ে কূপটির নিরাপত্তা বৃদ্ধির নির্দেশ দিলেন। হুমুক মোতাবেক কাজ হলো।
খবরটি রাজ্যে ছড়িয়ে পড়তেই দর্শনার্থীদের মধ্যে পাগল দেখার আগ্রহ বেড়ে গেল। কেবল এক ঝলক পাগলটিকে দেখার আশায় প্রতিদিন প্রধান উজিরের বাড়ির সামনে অনেক লোকের ভিড় জমতে শুরু করল—যেন এক পাগলের চিড়িয়াখানা খোলা হয়েছে। তখন নিয়ম করা হলো, প্রত্যেক দর্শককে ২ দিনারের বদলে আপাতত ১ দিনার করে দিতে হবে। এইভাবেই প্রধান উজির পাগল দর্শনীর বিনিময়ে রাজকোষে বিপুল পরিমাণ অর্থ যোগাতে থাকলেন।
অন্য সকল উজির তখন প্রধান উজিরকে হিংসা করতে থাকে। কিন্তু ওদিকে নিজেদের ঘরে কোনো পাগল না থাকায় তারা হতাশায় দিন কাটাতে থাকেন। আজ কমপক্ষে হাতে একটা পাগল থাকলে অনেক পয়সা কামানোর সুযোগ হাতছাড়া হতো না!
আবার এদিকে চালাকি করে পাগল সাজিয়ে এনে এনাম দাবি করতেও তো পারে কেউ! সেক্ষেত্রে ধরা পড়লে গর্দান চলে যেতে পারে মর্মে ফরমান জারি করা হয়। অবশ্য সেই রিস্কে কেউ গেল না।
একদিন সকালে উঠে রাজ দরবারে শোরগোল শোনা গেল। কি হলো! কি হলো!
সকল নিরাপত্তা বেষ্টনি ভেদ করেও পাগল সুস্থ করার বিখ্যাত কূপটি কারা যেন মাটি ফেলে বুজিয়ে ফেলেছে! রাজার আর বুঝতে বাকি থাকলো না কাদের এই কাজ!
অবাক করার মতো তথ্য হলেও সত্য। রাজা তার দেশের অনাগত পাগলদের ভাগ্যের পরিণতির জন্য শুধু কাঁদলেন। তাঁর অশ্রু মোচনের জন্য সাহস করে অন্য উজিরদের কাউকে নিকেটে ভিড়তে দেখা গেল না!
|| লাল চা ||
‘সারা দেশে ১৬৭টি চা-বাগানে শ্রমিকদের আন্দোলনের অষ্টম দিনে শনিবার বিকেলে দৈনিক মজুরি ২৫ টাকা বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর পরই নিপেন পাল আন্দোলন স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু মজুরি বৃদ্ধিকে অপর্যাপ্ত দাবি করে রাতেই হাজারো চা-শ্রমিক বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। ’
পত্রিকাগুলো চলমান চা আন্দোলনকে নিয়ে ভাল রকম কভারেজ দিচ্ছে। পত্রিকার এইটুকু পড়ে থেমে গেলেন পল্টু ভাই। চলমান চা আন্দোলনের সাথে সম্প্রীতি জানাতে সমাবেশ ডেকেছে বাম ঐক্যের লোকজন। মাইকে একের পর এক নেতাগণ বক্তৃতা করে চলেছেন।
আমি আর পল্টু ভাই বহুদিন হলো একই এলাকায় বাসা নিয়েছি। অফিস থেকে বাসার দিকে ফিরছি বিকালে। দেখি শাহবাগে চা শ্রমিকদের দাবি সম্বলিত পোস্টার ব্যানার উঁচু করে ধরে আছে অনেকে। টিভি চ্যানেলের লোকদের আনাগোনা দেখতে পাচ্ছি।
চা শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির জন্য এই আন্দোলন দিন দিন জোরালো হচ্ছে। আমি বাস থেকে নেমে যাদুঘরের সামনে ফুটপাথে চা দোকানের একটা চেয়ারে গিয়ে বসলাম। দেখি নেতারা কী বলেন। কান খাড়া রাখলাম। একটু পরেই বইয়ের দোকানে ঢু দেব। বাসায় ফেরার পথে এ সমাবেশটাকে ছুঁয়ে যাওয়ার তাগিদ ফিল করলাম। এসেই পল্টু ভাইকে পেয়ে গেলাম।
পল্টু ভাইকে আমি কমরেড বলে ডাকি। একটু রোমান্টিক ধাচের পুরনো দিনের মার্ক্সিস্ট যেন উনি! পুরানা মার্ক্সিস্টদের জীবন কেমন ছিল, তা বোঝার জন্য পল্টু ভাই যেন এক জীবন্ত মডেল। তাকে পুরানা জমানার মার্ক্সিস্টদের একটা চলমান জীবন্ত যাদুঘর বলায় উনি একবার মন খারাপ করছিলেন। আবার একবার তাকে বলছিলাম এতদিন যে বামপন্থী রাজনীতি করেন মিয়া কোনোদিনও তো একটু পুলিশের দাবড়ানি খাইতেও তো শুনি নাই, জেলখাটা তো দূরে থাক!
আমি পল্টু ভাইকে নিয়ে তলে তলে মজাটা নিই। বললাম, পত্রিকার নিউজগুলো সরকারকে চাপে রাখছে। গোড়া থেকে যে চা শ্রমিকদের এই আন্দোলনকে আমি সমর্থন করি পল্টু ভাই তা জানেন। পত্রিকাটা হাত থেকে চেয়ারে রেখে উনি বললেন—
প্রতিবারই দেখা যায়, নেতারাই শ্রমিকের পিঠে ছুরি চালায়। সরকার আর বাগান মালিকদের সাথে গোপন বৈঠক করে। নেতারা পয়সা খেয়ে আন্দোলন নাশ করে দেয়। আর সরকারকে মালিকরা বুঝায় মুনাফা কোথায়? শ্রমিকদের বেতন ১০ বছরে একবার বাড়ালেই তো চলে!
ফুটপাথে করিম মামার চা স্টলে আমিই চায়ের অর্ডার দিলাম। বললাম, মামা, আমার আদা চা। অবাক হয়ে দেখলাম। পল্টু ভাই নিজের জন্য দুধ চা দিতে মামাকে বলছেন। আমি কিঞ্চিৎ বিস্মিত হয়ে বললাম, আপনি না সবসময় লাল চা খেতেন।
—না রে, চা শ্রমিকদের এ আন্দোলনের শুরু থেকে কোনো লাল চা খাই না।
—কেন?
—লাল চা এখন রক্ত মনে হয়... চা শ্রমিকের রক্ত। এখন গলায় নামে না রে... চুমুকে চুমুকে শুধু ওদের অসহায় চেহারাগুলিন ভাইসা ওঠে!
পল্টু ভায়ের কথায় একটু দমে গেলাম। এরপর আসলে আর কিছু বলা ঠিক হবে না। চা খাওয়া শেষ হলে আমি বলি, আসি, ভাই। আমি বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
পল্টু ভাই সমাবেশে আসা লোকদের ভিড়ে গিয়ে আবার মিশে গেলেন।
|| বাঁশি ||
পরিস্থিতি যাই হোক আহম্মদ ভায়ের পকেটে টাকাটা গুজে দেয়াই উচিত ছিল আমার। উনি কেটে পড়ার পর ভাবতেছি বসে বসে।
হয়ত কারও কাছে আহম্মদ ভাই একটা চরিত্র বটে! করোনার পর লম্বা সময় চলে গেল। করোনার পর তার সাথে সাক্ষাৎ হলো এই প্রথম। মনে মনে বললাম, যাক লোকটা করোনায় মরে যায় নাই তাইলে।
ধানমন্ডি লেকে এতদিন পর দেখা হওয়ায় অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইলেন আহম্মদ ভাই। ইশারায় কাছে ডাকি। উনি আস্তে করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘কত পরিচিত লোকরে যে করোনা নিয়া গেল।’
ওনার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, ‘আমারও করোনা হয়েছিল। হাসপাতালে আইসিইউতে ছিলাম। কী যে একটা অবস্থা! আপনার কি মনে পড়ে নিউজ হয়েছিল, করোনা সন্দেহে মাকে সখীপুরের বনে ফেলে গেছিল তার ছেলেরা। চার-পাঁচবছর আপনারে দেখি না এইদিকে।
‘উনি আমতা আমতা করে বললেন, ‘ভাবছি আপনেও মইরা গেছিলেন’
আমি তার কথায় চুপ থাকি। কোকড়া চুল। লুঙ্গি পরা। হাতে বড় একটা বাঁশি। পরিস্কার একটা ফুলহাতা শার্ট পরা। গলায় পাথরের মালা। একটু বিষণ্ণতা মাখানো মুখাবয়বের সহজ বেশভুষার লোকটাকে এই লেকে নিয়মিত আসে যারা সবারই মুখস্থ হয়ে গেছে। দেখলে মনে হবে কতদিন হাসি-তামাশা তারে ছেড়ে চলে গেছে বহু দূর দেশে।
‘মনডা ভালো তো, আহমদ ভাই?’
‘না, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাইধ্যা গেল! যুদ্ধে মানুষ মরতেছে। দুনিয়াতে ক্যাল যুদ্ধ জম্মো নিতেছে।’
তার কথায় মাতি না আমি। আজ বোধ হয় তেমন ইনকাম হয় নাই তার। আহম্মদ ভায়ের সাথে পরিচয় থাকা ভালো। কারও যদি সকাল বেলায় বাঁশি শুনতে মন চায়, তার কাছে পয়সার বিনিময়ে শুনতে পারবেন। ধানমন্ডি লেক এলাকায় প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ বছর ধরে সাপ নাচান। বাঁশি বাজান। আর কর্কট মাছের হাড় বেচেন। এই করেই সংসার চলত তার। আজকাল অবশ্য মানুষের আগ্রহে ভাটা পড়ছে। কেউ আর সাপের নাচনকুদন দেখার টাইম নাই।
ইতিমধ্যে উনি উনার সাপ দুইটাকে বনে ছেড়ে দিয়েছেন। কথার ফাঁকে জানাইলেন উনি। ছোট কাঠের বাক্সটা নাই। এখন আর তার গলায় কর্কট মাছের হাড়ের পেঁচানো মালা নাই। সঙ্গে সাপের কাঠের বাক্সটা নাই। পদ্মা তীরে চৌদ্দ পুরুষের ঘর বাড়ি ছিল। বন্যা আর নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। এখন থাকেন সাভারে এক বস্তিতে।
এখানে লেকের মাঝখানে সার্কুলার শেপের একটা দ্বীপ আছে। দ্বীপে আছে নায়রি নামের একটা রেস্তোরাঁ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মেলা মানুষের ভিড়। চা, নাস্তা খায়। গল্প গুজব আড্ডা চলে। কোনো কোনো গানের দল মনের সুখে হারমোনিয়াম বাজায়ে গান করে।
লেকের গোল কিনার দিয়ে প্লাস্টিকের চেয়ার টেবিল পাড়া। মাথার উপর কোকাকোলা কোম্পানি দেয়া বড় ছাতা পাতা আছে। সকাল আর বিকাল বেলাটা লোকের সমাগম হয় বেশি। কুকুর বিড়াল দৌড়ে বেড়ায়। মানুষজন সকাল বেলা মর্নিংওয়াক করে। ছেলে-বুড়ো-মেয়েদের আনাগোনায় গমগম করে। ইদানীং ভিক্ষুক বেড়ে গেছে।
আমিও প্রায় সকালে ভিড়ের ভিতর একটা চেয়ার দখল করে বসি। এইখানে বড় যে অশত্থ গাছটা আছে তার নিচে বসতে ভালো লাগে।
আহম্মদ ভাইকে বলি, ‘বসেন এই চেয়ারে।’ আমি আমার পাশের চেয়ার আগায়ে দিলে উনি বসতে রাজি হন না। দাঁড়ায়েই থাকেন। চোখের ভুরু কুঞ্চিত চেহারা করে বলেন, ‘এইহানে বসবো কী, হেরা দাঁড়াইয়াও বাঁশিই বাজাইতে দেয় না! কুত্তার মতো খেদায় দেয়।’
এটা শোনার পর আমিও তারে আর বসতে বলি না। রেস্তোরাঁঅলারা পাছে আমাকেই উঠে যেতে বলে যদি! আসলে তারা তাকে এক পদের ভাসমান ভিক্ষুকই মনে করে।
লেকে বাঁশি বাজাইয়ে যদি আহম্মদ কারো মন গলাইতে পারেন, তাইলে কিছু দিলে নেন। কখনও কখনও আবদার করে একটু বেশি চাইয়েই নেয়। আগে বহুদিন তারে বলেছি অন্য একটা পেশা ধরেন। বাঁশি বাজায়ে পেট চালানোয় ভরসা রাখেন কেন! তার কাছে কোনো উত্তর পাই নাই।
উনার কথার জের ধরে বল্লাম, ‘মন ভালো না থাকলে তো বাঁশিতে দুঃখের গান তুলতে সুবিধা। দুঃখই তো বাঁশির সব চাইতে ভালো খোরাকি।’
উনি বাঁশিতে সাহস করে সুর উঠালেন, ‘সর্বনাশা পদ্মা নদীরে…’
তার বাঁশি শুনে আমার মনটা গলতে শুরু করল। ভাবলাম আজ উনারে একটু বেশিই বকশিস দিব। ওমা কোত্থেকে রেস্তোরাঁর ম্যানেজার দৌড়ে আসলো। এসেই বাঁশিটা কেড়ে নিয়ে চলে গেল। শেষে লেকের পানিতেই ফেলে দিল। আর উনাকে গালাগাল দিয়ে বলল, ‘তোরে না কইছি, এইদিকে লেকের চতুর সীমানার মধ্যে আসবি না।’
ডরে আহম্মদ ভায়ের আর মুখে কোনো কথা নাই। ভয় হইল আমারেও যদিও একটু শাসায়ে দেয়। তেড়ে এসে যদি বলে, ‘আপনাদের মতো লোকদের লাই পেয়েই এইসব ফকির ফাকড়ারা ভদ্দরলোকদের পরিবেশ নষ্ট করে।’ আমি আর বকশিসটা না দিয়ে আস্তে করে আবার পকেটেই রেখে দিলাম।
অশত্থ গাছে পাখি ডাকছে। আমি সেদিকে মন দিলাম। কারা যেন ইউটিউবে সাউন্ডবক্সে রবীন্দ্রসংগীত বাজায়ে দিয়েছে এইখানে।
অনেকেরই গানের সাথে সাথে মাথা নাড়ানো দেখে বুঝা গেল। ওই দখিনা সমীরণে অশত্থ পাতার কাঁপন আর উতলা আমাদের মনটাই পুরা রবীন্দ্রসংগীত হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। এ সংগীত উপস্থিত ভদ্র মহোদয়দের বড়ই ভালো লাগতেছে—জোর দিয়ে বলাই যায়।
|| সবচেয়ে সুন্দর গোল রুটি ||
আটার ডিব্বায় যে আটা আছে তা দিয়ে হয়ত টেনেটুনে একটা রুটিই হবে। আমেনা ভাবল আগে বানাই তো!দুপুর তো ঘনিয়ে এলো। বাটিতে আটাগুলো নিয়ে পরিমাণ মতো পানি দিল। একটা বড় জগডুমুরের মতো খাম্বা হলো। একটু লবণ দিল, আগে দিতে হবে ভুলে গিয়েছিল। হা, একটাই রুটি হবে। কাল রাতের ছোলার ডালটুকু ছাড়া ঘরে আর কিছুই নাই। একটা রুটি আর এক বাটি ছোলার ডাল। এতক্ষণে হয়ত মাঠ থেকে মজিদ দুবিঘা জমিতে চাষ দিয়ে রওনা দিয়েছে।
আমেনা মাটির চুলাটায় আগুন জ্বালালো। তাওয়া গরম হলো। রুটিটা এত গোল হইল কী করে আজ !এত গোল রুটি জীবনে সে বানাইনি। তার বাম চোখের ভুরুটা কেঁপে উঠল। সে ভাবল হয়ত নতুন বেলুনটার কারণেই এত সুন্দর গোল রুটি হল। কাল রাতে সে স্বপ্নেই এই গোল রুটিটাই বানাতে দেখেছে। এতদিন সুন্দর গোল রুটিটি সে বানাইনি কেন? কাউকে ডেকে এনে দেখাতে পারলে তার মনে সুখ লাগত। রুটিটার কোণা ছিড়ে একটু খেতে মন চাইল। কিন্তু এ সুন্দর রুটি শুধু মজিদের জন্য সে বানিয়েছে।
মজিদ কোনো রকমে গরু দুটাকে গোয়ালে বাধল। বুকে হাত চেপে ঘরের বারান্দায় কোনো রকমে হামুড় হেঁটে এসে শুয়ে পড়ল। আমেনা দৌড়ে এসে স্বামীর মাথার নিচে একটা বালিশ ডুকিয়ে দিয়ে পাখায় বাতাস করতে থাকল। মজিদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। মজিদের মুখের ঘাম শুকানোর আগেই মজিদের চোখদুটো বুজে এলো। আমেনা চিৎকার করে কাউকে ডাকার আগেই। গা ঠান্ডা হয়ে গেল।
মনে মনে আমেনা নিজেকে বারবার ধিক্কার দিতে লাগল। কেন যে সে সবচেয়ে সুন্দর গোলরুটিটা বানাতে গেল! সবচেয়ে সুন্দর গোল রুটিটি না বানালে হয়ত তার জীবনে এ ঘটনা নাও ঘটতে পারত!
|| আতঙ্ক ||
বিয়ে বাড়িতে গেলে খাদেম সাহেব সবসময়ই না খেয়েই চোরের মতো পালিয়ে আসে। কোনো বিয়েতে দাওয়াত না পেলেই সে খুশি হয়। তার মানে লোকটা কৃপণ তা নয়। বিয়েতে গিফট দিতে সে খুব রাজি। ভাবছেন তার বুঝি হাই ডায়াবেটিস আর প্রেসার। তাই রিস ফুড এড়িয়ে চলেন। না, তাকে এসব রোগ এখনো ধরেনি। চাপে ও দায়ে পড়েই সে সব দাওয়াতে এটেন্ড করে। সববারের মতো এবারও বউয়ের এক ফুপাত ভাই মেহেদির বিয়েতে গিয়ে না খেয়েই পালিয়ে আসছে। বউ আর মেয়েরা অবশ্য আগেই আচ করতে পেরেছে। লোকটা আস্তে করে আজও পালিয়ে যাবে। কখনও বাথরুমের উছিলা, কখনও অফিসের জরুরি ফোনকল আসছে—এই অজুহাত দেখিয়ে আস্তে করে সটকে পড়ে। কিন্তু কেন বিয়ে বাড়িতে খাদেম সাহেব খায় না তা কাউকেই কখনও বলে না!
লিফটে নামতে নামতে মেয়েদুটোকে বাসায় গিয়ে আজ কী বলবে প্লান করতে থাকে। অবশ্য তার মেয়ে দুটিও অপেক্ষায় থাকে বাবার এবারের বিয়ে বাড়ি পালানোর বানোয়াড গল্পটা না-জানি কেমন হবে!এ জন্য প্রত্যেকবারই খাদেম সাহেব তাজা একটা মিথ্যা কিচ্ছা ফাদার সুখ নেয়।
কনভেনশন সেন্টারের লিফটটা নতুন। বর-বউয়ের বিয়ের ফ্লোর থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে এক টানেই নিয়ে এল তাকে। কোনো ফ্লোরে আর ধরেনি। কনভেনশন সেন্টারের সামনে বড় রাস্তা। রাস্তাটা পার হলেই সামনে বড় ফুটপাথ। একটা সিগারেট ধরায় খাদেম সাহেব। ফুটপাথে একা একা হাঁটতে তার খুব ভালো লাগে। এই গাছ রাতের তারাভরা আকাশ বাতাস চাঁদের আলোতে এলে ডানা মেলে যেন খাদেম সাহেব ছায়ার ভিতর মিশে যায়। কখনও তারা মানুষদের মতো কোনো জবাবদিহিতার মধ্যে ফেলে না। প্রকৃতি পরিবারের একজন কোর মেম্বার মনে করে সে নিজেকে। কখনও সে রাস্তার কুকুর বেড়াল পাখির সাথে একা একা কথা বলে। কখনও কখনও গাছের নিচে পার্কের বেঞ্চে বসে সবুজ গাছ আকাশ পাখি বাতাসের উপর বাতাসের বেহুদা উড়াউড়ি দেখেই ঘন্টা দুই কাটিয়ে দেয়। এটাও তার কাছের একটা সংসার। এই সংসারেও সে নিয়মিত সময় দিতে ভুলে যায় না।
খাদেম সাহেব স্বভাবে গাছেদের মতোই নীরব। তাই যেন এই রাতের রাস্তার চারপাশ এরাও তাকে আপন করে নিয়েছে। সেই ছোটবেলা থেকে সে সংসারে কোনো গণ্ডগোল বাধলে পালিয়ে যেত। কোথায় আর যাবে? গ্রামের মাঠে। সেই মাঠ তো একা না। গ্রামের আকাশ মাঠ বাতাস নানা রকমের সবজি ফল আর ধানখেতে বিলভরা পানি চিলওড়া দূর দিগন্তের ওপারে আরেকটা গ্রাম। সেইগ্রাম যেন হাতছানি দিয়ে তাকে সারাক্ষণ ডাকে। কী যেন কী কথা আছে তার সাথে। সেই গ্রামে মনটা পড়ে থাকত কবে যাবে। খাদেম সাহেব তার ছোট বেলায় কাউকে না বলেই কয়েকদিনের জন্য অচেনা অজানা পথে অন্য গ্রামে চলে যেত। অচেনার সাথেই কেমন যেন তার চেনাজানা মিলমিশ বেশি বেশি। কিছু দিনের মধ্যেই তার চারপাশের চেনা লোকগুলো নতুন কাপড়ের মতো আস্তে আস্তে পুরানো হয়ে যেত। কিন্তু প্রকৃতিকে অমন বুড়িয়ে যেতে দেখেনি।
মরিয়ম যে একজন গৃহিনী। যাকে আমরা খাদেম সাহেবের স্ত্রী হিসেবে জানি। তারও কিছু গুণ আছে। সেও জীবনের অনেক কিছু গুম করেই বেঁচে আছে। তার দুই মেয়ে। মরিয়ম মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই বলে দিয়েছে কখনও যেন বাবাকে তারা কোনো বিষয়ে প্রয়োজনের বেশি কিছু জিগাস না করে।
তোমাদের বাবা উদাসীন মানুষ। আমাদের ছেড়ে চলে যায় যদি তখন তাকে ফেরানো সম্ভব হবে না।
মেয়েরাও বাবাকে একজন পরিযায়ী পাখি হিসেবে জানে। তারা যে সেই ভাবেই মানুষ হয়েছে। খাদেম সাহেবের কাছে তারা পারতে ভিড়ে না। তবে খাদেম সাহেব মেয়েদের সব আবদারই পূরণ করে থাকে। কিন্তু নিজের কোনো কিছুই মেয়েদের সাথে তেমন শেয়ার করে না। ফলে মেয়েদের কাছে তাকে তাদের কখনও কখনও গহিন অরণ্য মনে হয়—যে অরণ্যে তাদের ঢোকা বারণ।
আজ থেকে ১৫ বছর আগে খাদেম সাহেবের ছোট ভাই ক্যানসারে মারা যায়। তারপর ছোট ভাইয়ের এই দুই মেয়েকে চাচা খাদেম সাহেবকে পিতা হিসেবে মরিয়মের পরিবারের হাল ধরতে হয়। স্বামীর বড়ভাইকে স্বামীর আসনে বসিয়ে সেই থেকেই সে এ সংসারের দায়িত্ব পালন করে আসছে। খাদেম সাহেবও ভাইয়ের মৃত্যুতে ভাস্তিদেরকে আপন মেয়ের মতো আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছে। তারা চাচা না বলে বাবা বলেই ডাকে। মহল্লার সবাই জানে খাদেম সাহেবেরই মেয়ে এরা। মেয়েরা কখনই নিজ বাবার অনুপস্থিতিটা বুঝতেই পারে নাই।
খাদেম সাহেব রাত ১২টার দিকে বাসায় ফিরে। কলিংবেল বাজালে মরিয়ম এসে খুলে দেয়। মরিয়ম মিটমিট হাসে যথারীতি আর বলে, পালিয়ে যখন গিয়েছই তো বাসায় এসেই রেস্ট নিতে পারতা। খেয়ে নাও আগে।
খাদেম সাহেবও হাসে মৃদু কিন্তু মরিয়মের কথার কোনো উত্তর দেয় না।
খাদেম সাহেব জামাকাপড় চেঞ্জ করে। খাবার টেবিলে গিয়ে দ্রুত খেয়ে নেয়। কাল অফিস আছে। মেয়েরা নিশ্চয় অপেক্ষায় আছে, বাবার এবারের তাজা বানোয়াড গল্পটা না কেমন হবে! প্রত্যেকবারই খাদেম সাহেবের তাজা একটা মিথ্যা কিচ্ছা ফাঁদতে গিয়ে চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়। তবে তাৎক্ষণিক একটা গল্প বানানো তো তার জন্য এখন আর কোনো ব্যাপারই না!
মরিয়ম বলে, কলি ও পলি তো ঘুমাই পড়ছে। ওরা অপেক্ষা করছিল।
এই শুনে হাফ ছেড়ে বাঁচল সে। কারণ খাদেম সাহেবকে বিয়ে বাড়িতে না খেয়ে পালিয়ে আসার আজকের গল্পটা মেয়েদের কাছে আপাতত বলতে হলো না! কিন্তু মেয়েদুটো যদি স্বপ্নে এসে জিজ্ঞেস করে ফেলে! তখন কী না কী বলে ফেলে! আর সেই গল্প যদি শেষে ব্শ্বিাসযোগ্য না হয়ে ওঠে। স্বপ্নের ভিতর গল্প বলা সত্যি কত না রিস্কি! এর আগেও স্বপ্নে খাদেম সাহেবের নিজের দেহের, জবানের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সে অনেকবারই নিজের মৃত্যু ঘুমের ভিতর দেখেছে। নিজের মৃত্যুদৃশ্য দেখার সময় সে নিজে তার দেহের ভিতর ছিল না! এই অভিজ্ঞতা তাকে ভীত করে রাখে। জাগ্রত আর সুষুপ্তির মাঝামাঝি স্বপ্নদশার নোম্যান্সল্যান্ড বড় ভয়ের। সেইখানে নিজের উপর কন্ট্রোল না থাকারই কথা। তাই স্বপ্নের ভিতর মেয়েদেরকে সে বানোয়াড যে গল্পটা বলতে পারেন সেই নিশচয়তা যেন আর তার নিজের হাতে থাকে না!
সত্য গল্পটা স্বপ্নেও সে কাউকে শেয়ার করতে চায় না। পাছে স্বপ্নে সে যদি সত্য গল্পটা মেয়েদের বলে ফেলে!
—এই আতংক নিয়েই আলো নিভিয়ে বিছানায় দেহ রেখে খাদেম সাহেব মাথার ভিতর ঘুমিয়ে পড়ল।
|| কসাই ||
অনেক অনেক দিন আগের কথা। এক পাহাড়ে একজন দরবেশ বাস করতেন। এক কসাই ওই পাহাড়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। দরবেশকে দেখে কসাই তার নিকটে গেল। কসাই দরবেশকে সালাম দিয়ে বলল, আমি যদি আপনাকে প্রতিদিন এক টুকরা করে হালাল পশুর গোস্ত রান্না করে দিয়ে যাই। দয়া করে আপনার তরফ থেকে গ্রহণ করবেন কি না?
দরবেশ বললেন, খোদার হুকুম হলে খাবার তাঁর তরফ থেকেই আসবে। কসাই ভাবল আসলে খাবার জিনিসটা কেউ না চাইলে দিতে নাই। কসাই মাফ চাইল। দরবেশ বললেন, তুমি কবে পাঠাতে চেয়েছিলে। কসাই বলল, আপনি চাইলে আজ রাত থেকেই দিতে পারি।
দরবেশ বললেন, আজ সন্ধ্যায় আমি এ ইহলোক ত্যাগ করে চলে যাবো। আজ সকাল থেকেই খোদা তালা আমার রিজিক বন্ধ করে দিয়েছেন।
কসাই ভাবল, জীবনে এত পশু জবেহ করল, তে এত এত গোস্ত কাটল কিন্তু তার একটুকরাও তো কাউকে দান করতে পারল না। এমন কি কোনো কাককে দিলেও তার দেয়া গোস্ত খায় না!
পাশের আরকেটা পাহাড়ে গিয়ে কসাই একটা গাছের নিচে জিরিয়ে নিচ্ছে। আর ভাবছে, এই যে দরবেশরা এরা কোনো সংসার করে না সমাজ করে না কিন্তু সমাজ জীবন নিয়া এত বড় বড় কথা বলে কীভাবে! সব কিছুই যদি জীবনের অভিজ্ঞতা হইতে আসত তাইলে তো আমি দরবেশ হইয়া যাইতাম! এই প্রথম কসাই নিজের জীবন ও পেশা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলো। হয়ত চলার পথে খামখেয়ালির বসে এই পাহাড়ে জিরাইতে যদি না থামত তাইলে এই চিন্তা করার সুযোগ হইত না! সে ভাবল পাহাড়ে নিশ্চয় কিছু একটা আছে। তা না হইলে কেন এতদিন এই কথা তার মনে আসে নাই।
যে গাছের নিচে সে জিরায়ে নিচ্ছিল হঠাৎ দেখে সেই গাছের ডালে একটা ময়না পাখি। পাখিটা বলছে, কসাই, আমাকে ঐ পাহাড়ের দরবেশ পাঠাইছেন। বলছেন, তুমি যে চিন্তা করছো তা ঠিক আছে।
কসাই ময়না পাখির কথা শুনে অবাক হলো। সে ভাবল সারা জীবনই তো কত পশুর গলায় ছুরি দিলাম। আর আমি এই পেশায় যাবো না। এই বলে সে পাহাড়ের গাছের নিচে লম্বা একটা ঘুমের নিচে তলিয়ে গেল।
ঘুম থেকে উঠে কসাই ছুটে গেল দরবেশের পাহাড়ে—দরবেশ বেঁচে আছেন কিনা দেখতে। সেইখানে গিয়ে আর সে তাঁকে দেখতে পায় না। ময়না পাখির অপেক্ষায় সে দিন গুনতে থাকল। দরবেশ তার ব্যাপারে আর কোনো ভাল কিছু বলে গেল কিনা নিশ্চয় ময়না পাখি বলতে পারবে!
ময়না পাখির অপেক্ষায় সে বহুদিন গুজার করল। কিন্তু ময়না পাখি আর আসে না।
সে এইবার ভাবল, ময়না পাখি নিশ্চিত মারা গেছে। পাখি ও দরবেশের মৃত্যুর বিষয়টা তার ভাবনায় কাঁটার মতো গেঁথে থাকল। শুধু তার বারবার মনে হচ্ছে সেই কথা, দরবেশদের রিজিক খোদাতালার তরফ থেকেই আসে। তাতে তাদের প্রতিটি দিনই অলৌকিক হয়ে যায়! দেখি আমার রিজিক যদি খোদা তালার তরফ থেকে আসা শুরু করে একজন কসাইও যে দরবেশ হইতে পারে সেই সান্ত্বনা অন্তত তখন পাইবো!
কসাই সেই অপেক্ষোয় পাহাড়ে দিন গুজার করতে থাকে।



জহির ভাই, অনুগল্পগুলো ভালো লাগলো।
শাখাওয়াত বকুল
জুন ২৪, ২০২৫ ১৪:৩৯