‘চক্কর’ সিনেমার এক চক্কর পাঠ
শরাফ আহমেদ জীবন পরিচালিত ‘চক্কর’ রূঢ় বাস্তবতার এক আখ্যানমূলক চলচ্চিত্র। সমাজ জীবনের নানা চক্করের ঘটনা আর অঘটনের রহস্যময় কাহিনি এটি। তবে ‘চক্কর ৩০২’-এ দর্শকদের আরেকটু বেশি চক্করে ফেলতে পারলে দর্শকরা খুশি হতো। কেন বলুন তো? কারণ পেনাল কোডের ৩০২ ধারা মানে বুঝতেই পারছেন খুনের শাস্তি, সেখানে ‘চক্কর ৩০২’ নিয়ে দর্শকরা অনেক বেশিই মারপ্যাঁচে পড়বেন এমনটাই ধারণা। খুনের দৃশ্য হলেই যেমন টানটান উত্তেজনা চলে আসে, ‘চক্কর’ ঠিক তেমন নয়। আবার পুলিশ অফিসারদের অতিরিক্ত চাকচিক্য বা রঞ্জন করার ব্যাপারটা এই সিনেমাতে নেই।
শরাফ আহমেদ জীবন ‘চক্কর’ পরিচালনার পাশাপাশি কাহিনিও লিখেছেন। যদিও এটি তার পরিচালিত প্রথম সিনেমা এবং সরকারি অনুদানের সিনেমা। সরকারি অনুদান শুনলেই আমরা ভাবি একপেশে ও নড়বড়ে চিত্রনাট্য। কিন্তু শরাফ আহমেদ জীবন এ ক্ষেত্রে অনেকটা সফলতার সাথে চেষ্টা করেছেন। তবে সিনেমাটোগ্রাফে আরো বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন ছিল। অধিকাংশ জায়গাতেই নাটকের সিনেমাটোগ্রাফের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। কালার মোশন পিকচার নিয়ে বিবেচনা করার কথা বলব। আমাদের দেশের নাটকের লো বাজেটের ক্ষেত্রে আমরা অনেক কিছু কন্সিডার করে যাই। কিন্তু বড় পর্দার সিনেমা হিসেবে আবহ তেমন ফুটে ওঠেনি এবং নাটক বা টেলিফিল্মের মতো কনসিডারেশনের জায়গা নেই। শুরুর দিকের কিছু জায়গায় কেঁপে উঠছিল সেটটা। বোঝা যাচ্ছে, আনকোরা হাতে বুম নিয়ে দৌড়ানো হচ্ছে। কিছু সিনে মেকাপের তারতম্য ও ঘর্মাক্ততা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
মোশাররফ করিমকে নিয়ে বলার কিছু নেই। তিনি অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ একজন অভিনেতা। তিনি তার বর্ণাঢ্য জীবনে নাটক, সিনেমা, টেলিফিল্ম, ওয়েব সিরিজসহ সব কিছুতেই দুর্দান্ত অভিনয় করে গেছেন। মোশাররফ করিম অভিনীত মানেই শিক্ষণীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। নেটিজেনরা অনেক সময়ই বাণিজ্যিক সিনেমায় আস্থা রাখতে পারেন না। সেক্ষেত্রে তারা সামাজিক প্রেক্ষাপটের উপর নির্মিত সিনেমাগুলোর দিকে একটু ঝুঁকে যায়। তবে কি ‘চক্কর’ সিনেপ্লেক্সে না উঠিয়ে ওটিটি কন্টেন্ট হিসেবেই বেশি ভালো হতো? এটাও একটা ব্যাপার যে গ্লোরিফাইং সিনেমার বাইরের কন্টেন্টও সিনেপ্লেক্সে আসছে।
গল্পের শুরুতেই দেখা যায়, কৈশোর পেরোনো তিন বন্ধু সাদমান, লিমা ও রাইয়ানের হ্যাং-আউটের এক পর্যায়ে মাদকদ্রব্য নিয়ে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে। সাদমান তার মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা হারা সন্তানকে মানুষ করার সব দায়িত্ব মায়ের। অপরদিকে সাদমান জনপ্রিয় অভিনেতা হাসান চৌধুরী ও মা ব্যারিস্টার জেবিন চৌধুরীর ছেলে। সাদমান ও লিমা যে বাসায় থাকে তার ভাড়াও টাকাওয়ালা বাবার ছেলে রাইয়ান চৌধুরীরই দেয়া এবং ড্রাগসের অর্থের যোগান তিনিই দেন।
বাকবিতণ্ডা শেষে বাসায় ফিরে খুন হয় সাদমান। স্বভাবতই সন্দেহভাজন হিসেবে রাইয়ান ও লিমাকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব পান ডিবি অফিসার মঈনুল সাহেব। বাবা হারা সাদমানের বন্ধুর হাতে খুন হওয়ার ঘটনা আলোচিত হয় সারাদেশে।
কিন্তু ঘটনা সরলরৈখিক পথে না চলে বাক নিতে থাকে নানাদিকে। চক্করে পড়ে যায় ডিবি অফিসার মঈনুল। প্রতি চক্করে বেরিয়ে আসতে থাকে হাসান চৌধুরী ও ব্যারিস্টার জেবিন চৌধুরীর দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন, সাদমানের মা নীলা ও তার একনিষ্ঠ প্রেমিক মিজানুরের ঘটনাপ্রবাহ, নেশার জগতের গডফাদার ডেইরি আসলাম ও গন্ডার বাবুর ক্রিয়াকলাপ। ডিবি ইন্সপেক্টর বুঝতে পারে রাইয়ান তার বন্ধুকে খুন করেনি। তাহলে কে এই খুনি? এই জটাজাল ছাড়াবার আগেই খুন হয়ে যায় ইন্সপেক্টর মঈনুলের সার্বক্ষণিক সহযোগী সজীব।
গল্পটা থ্রিলার জনরার হলেও চরিত্রগুলোর পারিবারিক সংযোগের উপস্থাপনা ভালো। জনপ্রিয় অভিনেতার পারিবারিক টানাপোড়েন, ডিবি অফিসারের পরিবারের সাংসারিক ঘটনাপ্রবাহ, সিঙ্গেল মাদার হিসেবে বেড়ে ওঠা সন্তান ও ভালোবাসার মানুষকে পাবার জন্য একাধিক খুন, মাদক কারবারির সাংসারিক যুক্ততা সবই যেন উঠে এসেছে এক ফ্রেমে।
ইন্সপেক্টর মঈনুলের চরিত্রে মোশাররফ করিম, হাসান চৌধুরীর ভূমিকায় রওনক হাসান, জেবিন চৌধুরীর চরিত্রে তারিন, মিজানের চরিত্রে ইন্তেখাব দিনার, নীলার চরিত্রে মৌসুমী নাগ, গন্ডার বাবুর চরিত্রে সুমন আনোয়ার ও জুনিয়র অফিসার সজীবের চরিত্রে শাশ্বত দত্ত অভিনয় করেছেন।
গল্পটা থ্রিলার জনরার হলেও চরিত্রগুলোর পারিবারিক সংযোগের উপস্থাপনা ভালো। জনপ্রিয় অভিনেতার পারিবারিক টানাপোড়েন, ডিবি অফিসারের পরিবারের সাংসারিক ঘটনাপ্রবাহ, সিঙ্গেল মাদার হিসেবে বেড়ে ওঠা সন্তান ও ভালোবাসার মানুষকে পাবার জন্য একাধিক খুন, মাদক কারবারির সাংসারিক যুক্ততা সবই যেন উঠে এসেছে এক ফ্রেমে।
এক দৃশ্যে ডিবি অফিসারের জুনিয়র সজীব ড্রাগস তৈরির কারখানার সন্ধানে গেলে খুন হন। এখানে সিনিয়র-জুনিয়র ও দেশের প্রতি কর্তব্য পরায়ণতার মেলবন্ধন পাওয়া যায়। এই যে জুনিয়র হারানোর এক বেদনা তা কেবল এককেন্দ্রিক হয়ে গেছে। পারিবারিক আবহে সজীবের মায়ের সাথে কোনো একটা নারী চরিত্রের উল্লেখ থাকলে দর্শকদের আরেকটু আবেগি করে তোলা যেত।
তবে হ্যাঁ, সাদমানের মৃত্যু দর্শকদের কাছে সহজ স্বাভাবিক থাকলেও দেশের কাজ করতে গিয়ে সজীব ওরফে শাশ্বত দত্তের মৃত্যু দর্শকদের ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। শাশ্বত দত্তের অভিনয়, ডায়ালগ ডেলিভারি, রেসপনসেবলিটি সবটাই পারফেক্ট ছিল। মোশাররফ করিমের পরে পার্শ্বচরিত্রগুলোর মধ্যে শাশ্বত দত্তকেই সবচেয়ে ভালো মানিয়েছে।
আরও একজনের কথা না বললেই নয়। গন্ডার বাবুর চরিত্রে সুমন আনোয়ারের অভিনয় দুর্দান্ত এবং রীতিমতো দর্শক মাতানো। গন্ডার বাবুকে নিয়ে দর্শকদের লা জবাব। এত ভালো অভিনয় করেছেন বরাবরের মতই। একশন ও ডায়ালগে ভরপুর কমিক্স ছিল। ‘প্যাচাল পাইরে মাথাটাই ধরায় দিছে, একটু রিস্ক হয়া গেলো না বিষয়ডা, মানি লোকের মান আল্লায় রাখে’—দুর্দান্ত কমিক্স ডেলিভারি দিয়েছেন গন্ডার বাবু।
মিজানুর রহমান যিনি ভিকটিমের মায়ের বন্ধু। ছোটবেলা থেকেই ভিকটিমের মা নীলাকে ভালোবাসে। কেউ নীলাকে কষ্ট বা অসম্মান করলে তাকেও শায়েস্তা করে। ছোটবেলায় নীলার দিকে তাকানোর অপরাধে এক সহপাঠীকে পানিতে ডুবিয়ে মেরে ফেলে যা প্রথম দৃশ্যকল্পে দেখা যায়। তবে মিজানুর রহমানের চরিত্রে বোঝা যাচ্ছিল তিনিই যে কালপ্রিট। কিছু জায়গায় তার ওভার একটিং না থাকলে হয়তো দর্শকরাও আরো একটু ভালো চক্করে পরতো যে, কে খুন করলো! দর্শক টুইস্ট বুঝে গেলে দৃশ্য থেকে মনোযোগ সরে যায়। ভালো চক্করে পইরে গেলাম খ্যাত ডিবি অফিসার আরেকটু নাকানিচুবানি খাচ্ছে দেখতে দর্শকদের ভালো লাগতো।
সিনেমাতে মোট ৪টি গান ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজ্জাক দেওয়ানের লিরিক ‘কাউয়ায় কমলা খাইতে জানে না’-এর কম্পোজ, কোরিওগ্রাফ ও ডান্স টিমের পরিবেশনা ছিল দারুণ। খুনের সমাধান হইয়াও যেন হইলো না শেষ! ডেইরি আসলাম কে? তাকে নিয়ে দ্বিতীয় পর্বে শরাফ আহমেদ কী নিয়ে হাজির হয় সেটাই দেখার অপেক্ষা দর্শকদের।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন