আমরা কি জীবন থেকে শিখি?

অ+ অ-

 

আমাদের চোখের সামনে জয় নামে একটি ছেলে মারা গেল। এই ছেলেটির মারা যাওয়া আমাকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। তার বাবা-মা বলা যায় একধরনের পাগল হয়ে গিয়েছিল। এই ছেলেটি বাইক চালাতে গিয়ে মারা যায়। বাড়ি থেকে বের হয়েছিল আর ফিরল লাশ হয়ে। এমন মৃত্যু আমার জীবনে খুব একটা দেখি নাই। এই ছেলেটির মৃত্যুতে আমাদের এলাকার সবাই শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিল। তার মতো এত সুন্দর ছেলে আমাদের এলাকায় তেমন দেখি নাই। ১৭/১৮ বছর হবে ছেলেটির বয়স। তাই বলছি জীবনটা আবেগ দিয়ে না দেখে অন্যভাবে দেখার দরকার। এই জীবনটা অনেক দূর এগিয়ে নিতে হবে। সেজন্য দরকার টাকা। এই টাকা হাত বাড়িয়ে দিলে আসবে না। এই টাকা আয় করতে হয় অনেক কষ্টের বিনিময়ে। যার কাছে জ্ঞান বেশি টাকা তার কাছে ধরা দেয়। জ্ঞান ছাড়া টাকা আয় করা যায় না।

জ্ঞান অর্জন করতে হলে পড়তে হবে আর পড়তে হলে বইয়ের কাছে ফিরতে হবে। বইকে বন্ধু বানাতে হবে। বন্ধু তো সেই যে বিপদে এগিয়ে আসে। আমাদের দেশের মানুষ বইকে বন্ধু হিসাবে নিতে পারেনি অনেকেই আর যারা নিয়েছে তারা আজ সফল।

আমি বলতে চাই আবেগ দিয়ে জীবনের বিচার করতে হবে না। বিচার করতে হবে জ্ঞান দিয়ে। আপনি বড় চেয়ারে বসবেন বড় চেয়ারে বসতে গেলে শিক্ষা লাগবে। বড় ব্যবসা করবেন সেখানেও শিক্ষা লাগবে শিক্ষা ছাড়া কিছুই হচ্ছে না। বাবা একটা বাইক কিনে দিলো সেটা নিয়ে সারাদিন ঘুরে ঘুরে দিন পার করে দিলেন আর ভাব নিলেন, এটা কোনো দিন সফলতা হবে না বরং বলা যায় এটা আপনার জীবনকে নষ্ট করে দিলো। আমি আগেই বলেছি, আমাদের এলাকায় একটা ছেলে বাইক নিয়ে ভাব নিতে গিয়ে জীবনটা হারাল। আমি বলতে চাই, বাইক আমাদের জীবনের জন্য প্রয়োজন আছে কিন্তু সেটা জীবনের জন্য কাল না হয়ে দাঁড়াবে এমনটা নয়। তাই বলতে চাই আবেগ দিয়ে জীবনের চিন্তা করা যাবে না। চিন্তা করতে হবে জ্ঞান দিয়ে।

আমাদের ছোট্ট একটা দেশ ১৮ কোটি মানুষ বাস করে। একটা চাকরির জন্য ১০ হাজার মানুষ আবেদন করে। টাকা দিয়েও চাকরি পাওয়া যায় না। তাই বলতে চাই, এখন তো বাবার হোটেল খোলা আছে একদিন তো নিজের হোটেল নিজেই খুলতে হবে সেখানে তোমার বাবা-মা খাবে, তোমার স্ত্রী খাবে, ছেলে খাবে, মেয়ে খাবে, সেজন্য হোটেল ভালো না করলে হবে?

এই হোটেল খোলার জন্য এখন থেকে নিজেকে তৈরি করতে হবে। এই পৃথিবীতে হাত বাড়িয়ে দিলে সবকিছু পাওয়া যায় কিন্তু সেই ধরনের হাত তো আপনাকে বানাতে হবে। আজ পৃথিবীতে সফল মানুষের গান সকলে গায় কিন্তু ব্যর্থ মানুষের কথা কেউ বলে না। আপনি কি ব্যর্থ হতে চান? একটু এইভাবে ভাবলেই সবকিছু পানির মত পরিষ্কার হয়ে যাবে। সেটা হলো কষ্ট ছাড়া কি হয়েছে। এমনকি কী হতে পারে। এমন একটা ধারণা আমাদের মাথায় ভেতর কবে আসবে। এমন ধারণাটা আমরা অনেকই আনতে পারি না। যারা আনতে পেয়েছে তারাই সফল হয়েছে। আমার ধারণা আমাদের সমাজের অনেক ছেলেমেয়েরা ছাত্রজীবনে তা বুঝতে পারে না।

তারা আনন্দে আনন্দে দিন পার করে দিতে চায় এবং তাই করে থাকে। আমার কথা হলো এইভাবে আনন্দ করে জীবন চলে না। এমনকি চলতে পারে না। আমি জীবনে অনেক ভুল করেছি এবং সেই কথাটা আপনাদের সামনে বলতে চাই। আমার মত ভুল যাতে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা না করে এই জন্য তাদের কাছে গল্পটা বলা। জীবনে একটা ভুল হয়ে গেলে আর সেই ভুল সংশোধন করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া খুব কঠিন।

আমি আমার দুই ছেলেকে অনেকবার বলি, বাবা পড়। জ্ঞান অর্জন করো। এখনকার পৃথিবী জ্ঞানী মানুষের দখলে। তুমি শিক্ষা অর্জন না করতে পারলে হবে না।

মধ্যবয়সি একটি মেয়ে কোন এক আইসক্রিম ফ্যাক্টরির ম্যানেজার হিসাবে কাজ করত। তার কাজ ছিল প্রতিদিন আইসক্রিম তৈরি এবং বিক্রির হিসাব রাখা। একদিন কাজ শেষ হওয়ার কিছু সময় আগে সে আইসক্রিম রাখার স্টোরেজ রুমে ঢুকল। যেটা মূলত কোল্ড। তখন হুট করে বাইরে থেকে দরজাটি লক হয়ে যায়। সে অনেক চেষ্টা করলেও দরজা খুলতে পারেনি। অনেক চিৎকার করেও কোন লাভ হয়নি। কারণ ততক্ষণে অন্যান্য সব কর্মী কাজ শেষ করে বেরিয়ে গেছে।

আস্তে আস্তে সে ঠান্ডায় জমে যেতে লাগল। সে কাঁদছিল কারণ সে জানে তার মৃত্যু আসন্ন এবং তার বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। হঠাৎ বেশ অপ্রত্যাশিত ভাবে একজন সিকিউরিটি গার্ড এসে দরজা খুললেন এবং তাকে অর্ধ হিম অবস্থায় সেখান থেকে মুক্ত করলেন। মেয়েটি কাঁপতে কাঁপতে তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার তো এখানে আসার কথা নয়। হঠাৎ কি মনে করে এমন সময় এখানে আসলেন?

গার্ড উত্তর দিলেন, আমি একটা দীর্ঘ সময় ধরে এ কোম্পানিতে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করছি। প্রায় ৩৫ বছর কিন্তু আমি এমন মানুষ খুব কম দেখেছি যারা প্রতি সকালে আমাকে সালাম দিয়ে ঢুকেছে এবং সন্ধ্যায় বের হওয়ার সময় সালাম দিয়ে বেরিয়েছে। বেশির ভাগ মানুষ এমন আচরণ করত যেন তারা আমাকে দেখতেই পায় না কিন্তু আপনি ছিলেন সেই মানুষ যিনি প্রতিদিন আমাকে হাসি মুখে সালাম দিতেন এবং যথারীতি আজ সকালেও দিয়েছেন কিন্তু আজ সন্ধ্যায় আমি আপনার কাছ থেকে সালাম শুনিনি। তার মানে আপনি এখনও বের হননি। সেটা আমি বুঝতে পেরে আপনাকে খুঁজতে শুরু করি।

শিক্ষা: আমাদের জীবন খুবই ছোট। এই পৃথিবীতে কাউকে ছোট মনে করবেন না। সবাইকে যথাসম্ভব সম্মান দিয়ে কথা বলুন। জীবনের প্রয়োজনে কখন কাকে আপনার প্রয়োজন হবে সেটা বলা যায় না। বড় জব বা টাকা-পয়সার মালিক হলেই কেউ বড় হয়ে যায় না। বিনয়, সামাজিকতা, সুশিক্ষা মানুষকে বড় করে তোলে।

আমরা আরাম খুঁজি, আরামে জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। আমার প্রশ্ন হলো, আরাম কি হাত বাড়ালে পাওয়া যায়? এমনকি কোনো দোকানে কিনতে পাওয়া যায়? না এইসব পাওয়া যাবে না হাত বাড়ালে। কষ্টের ভেতর দিয়ে অর্জন করে নিতে হয়। যে মানুষটি জীবনে যত বেশি কষ্ট করছে সেই মানুষটি একসময় এসে সুখ করবে। আমরা কিন্তু কষ্ট করতে চাই না। কিন্তু জীবনে সুখ চাই, শান্তি চাই। এই পৃথিবীতে সুখ আছে, শান্তি আছে, সেই শান্তি খুঁজে নিতে হবে। আমাদের এলাকায় এক ছেলে গার্মেন্টসে চাকরি করে অনেক কিছু করেছে কিন্তু অনেক মানুষ গার্মেন্টসে চাকরি করতে চায় না। তার বেতন এখন একলক্ষ বিশ হাজার টাকা।

লেগে ছিল বলেই সে আজ সফল। মহাজ্ঞানীগণ বলে গেছেন, রাত যত বেশি হয় দিন ততই কাছে আসে। আমরা গভীর রাতকে ভয় পাই। আর এই কারণে দিনকে ধরতে পারি না। ভয় পাই বলে জীবনে সফলতা আনতে পারি না। জীবনের সফলতা আনতে হবে ভয়কে জয় করেই।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এ. পি. জে. আবদুল কালাম সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করেননি। তাহলে তিনি কীভাবে সফল হলেন। তার কাছে কি কোনো আর্শ্চয দৈত্য ছিল, যে তাকে বলেছে আমাকে সফল বানিয়ে দাও আর সে সাথে সাথে বানিয়ে দিলো। মোটেই তা হয়নি। তিনি চেষ্টা করেছেন তাই সফল হয়েছেন। তার চেষ্টার ভেতর কোনো প্রকার অবহেলা ছিল না। আর আমরা চেষ্টা করি আবার অবহেলা করি। এইভাবে আমরা স্বপ্ন দেখি আর তিনি বলেছেন স্বপ্ন হলো সেটাই, যেটা আপনাকে ঘুমাতে দেয় না। যদি ঘুমাতে দেয় তাহলে বুঝে নিতে হবে আমাদের এই স্বপ্ন স্বপ্ন নয়। স্বপ্নের ভান ধরা।

তাই বলতে চাই স্বপ্নের ভান ধরে কোনো লাভ নেই। স্বপ্ন যদি দেখতে হয় স্বপ্ন দেখার মত দেখতে হবে। আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার বংশের কেউ আগে রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, কিন্তু তিনি অর্জন করেছেন চেষ্টার ভেতর দিয়ে। আজ আমাদের ছেলেদের হাতে টাচ মোবাইল সারাদিন এই মোবাইল নিয়ে মেতে থাকে। দিন নাই রাত নাই হাতে মোবাইল। কারও সাথে কথা বলার সময় নেই।

গাড়িতে বসে আছে হাতে মোবাইল কী সব দেখে, জানি না। এমন ভাবে দেখে পৃথিবীর অন্য কোনো দিকে দৃষ্টি নেই। এক মনে দেখে যাচ্ছে। এক বিজ্ঞানী বলেছেন ২০ বছর পর এই পৃথিবীর সকল মানুষ জ্ঞানহীন হয়ে পড়বে। তাই বলতে চাই মোবাইল মানুষের কল্যাণে এসেছে। আমি মনে করি এই মোবাইলে আমার অনেক উপকার হয়েছে। অনেক সহজে অনেক কাজ করতে পারছি। ব্যবসার কাজে অনেক সহযোগিতা করছে। কথা হলো এই মোবাইল যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় তাহলে এটা দিয়ে উপকার হবে কিন্তু তা না করে সারারাত ভরে গেম খেলে ভিডিও দেখে রাত পার করি তাহলে তো ক্ষতি ছাড়া ভালো কিছু বয়ে আনবে না জীবনে। তাই বলতে চাই ভালো কাজে ব্যবহার করি এবং জীবন সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই এমনটা প্রত্যাশা হোক আমাদের সকলের জীবনে।

পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে তার দুইটি দিক আছে, একটি ভালো অন্যটি মন্দ। এই হাত দিয়ে ভালো কাজ করা যায় এবং মন্দ কাজ করা যায়। এই চোখ দিয়ে ভালো কিছু দেখা যায় এবং মন্দও দেখা যায়। এই পা দিয়ে খারাপ দিকে যাওয়া যায় এবং ভালো দিকেও যাওয়া যায়। এইভাবে যদি আমি উদাহরণ দিই তাহলে অনেক দেওয়া যাবে। এই কথাগুলো বলা হলো এই কারণে এই শরীর আপনি কীভাবে চালাবেন সেটাই আপনার বিষয়।

এই পৃথিবীতে আলো এবং অন্ধকার দুইটি দিক। আপনি কোন পথে হাঁটবেন সেটা আপনার বিষয়। তাই আমরা আলোর দিকে ছুটে নিজে আলোকিত হই। জীবনকে পরাজিত না করে আলোকিত করে গড়ে তুলি। আপনি ইচ্ছা করলে পারবেন। আল্লাহ সেই ক্ষমতা আপনার হাতে দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এখন যদি আলোর পথে না হেঁটে অন্ধকারের দিকে হেঁটে চলেন তাহলে কী আপনি কোনো ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারবেন?

আপনি চেষ্টা করুন এবং লক্ষ্য ঠিক করুন জীবনে কি হতে চান। সেই পথে এগিয়ে চলুন একদিন দেখবেন আপনার লক্ষ্যে পৌঁছে গেছেন। আপনি সফল হোন এমনটা প্রত্যাশা নিয়ে আমি লেখি। আপনাকে সফল দেখতে আর দেরি নয় এগিয়ে চলি সফলতার দিকে এমনটা প্রত্যাশা আমাদের সকলের।