শূন্যরেখায় ২০ মিনিট
মিনিট—১
লাশের খাটিয়া বিএসএফ-এর জিপ থেকে ধীরে ধীরে নামানো হয়। সাদা কাপড়ে মোড়ানো শরীরটা নিঃশব্দ, নিথর। বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যদের চোখে-মুখে শোকের ভার। চারপাশে স্বজনদের কান্না বিজড়িত নিঃশ্বাস, কারো চোখে জল, কারো ঠোঁট কাঁপে। সীমান্ত পিলার ৯৬/৮-এস-এর ঠিক মাঝ বরাবর যে জায়গাটুকু দুই দেশের নয়, সেই শূন্যরেখায় আজ মায়ের দেহ রাখা—রাষ্ট্রের বাইরে, কিন্তু মেয়েদের হৃদয়ের একেবারে মাঝখানে।
মিনিট—২
দুই বোন, রোকেয়া আর শারমিন, মাথা নিচু, হাত একে অপরের আঙুলে গাঁথা। অজানা পরিবেশ, ধকল! শোক শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চায়? চুয়াডাঙ্গা থেকে ভোরে রওনা দিয়েছিল। জিপে বসে প্রথম কয়েক মাইল তারা কাঁদে নিঃশব্দে, বুক চাপা কান্না, যা গলা ছাপিয়ে উঠে এসেছিল চোখ দিয়ে। তবে সীমান্তের কাঁটা তার দেখা দেওয়ার পর থেকে কান্নাটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। অশ্রু নেই, মুখে শব্দ নেই। ভেতর থেকে চাপা ভার, ভাষারহিত। পিলার ৯৬/৮-এস-এর সামনে বিজিবি ও বিএসএফ জওয়ানরা অর্ধবৃত্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে বন্দুক নেই, পাহারা কর্তব্যের তৎপরতা নেই, চোখে নেই সেই চিরাচরিত সতর্কতা। নিঃশব্দ সম্মান, যেন তারা আজ প্রহরী নয়, বরং সাক্ষী। যেখানে রাষ্ট্রের দেয়াল একবারের জন্য একটু নত হয়েছে।
রোকেয়া এক কদম এগিয়ে থেমে যায়। শারমিন তার হাত শক্ত করে ধরে। মাটি নরম, বাতাস ভারী, চারপাশ চুপচাপ,তবু শোকার্ত চিৎকার যেন গুমরে উঠছে নিঃশব্দে। বিজিবি জওয়ানদের একজন সামান্য নড়েচড়ে দাঁড়ায়। তার দৃষ্টি এখন আর সোজা নয়, একটু নিচের দিকে। আগত স্বজনদের মধ্যে কোনো কোনো নারী কাঁদে, আর তাদের দেখে পুরুষেরা চোখ নামিয়ে ফেলছে, অসহায়ের মতো। শারমিন চোখ বন্ধ করে। ভেতরে যেন একবার ‘আম্মা’ ডাক আসে অনুভূতি হয়ে। তাদের দুই বোনের আজকের দিনটা, এই দাঁড়িয়ে থাকা, এই নিরবতা, এই ফাঁকা দৃষ্টি, সবটাই মায়ের জন্য শেষ পাওয়া সময়।
মিনিট—৩
আকাশ নীল, কিন্তু মেঘ শান্ত নয়। রোদ উঠেছে বটে, তবু মাটিতে তার কোনো উচ্ছ্বাস নেই। সীমান্তের পিলার ৯৬/৮-এস-এর পাশে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবাই—বিজিবি, বিএসএফ, স্বজন আর শোক। একজন বিএসএফ জওয়ান, বয়সে সম্ভবত মায়েরই ছোট সন্তান হতো, মোলায়েম দৃষ্টি নিয়ে সামান্য সিগন্যাল দেয়। কোনো শব্দ নেই, কেবল হাতের হালকা নাড়াচাড়া, একজন অভ্যন্ত প্রহরীর গাম্ভীর্য ভেঙে বলে,‘পাশে যান’। বিজিবির একজন অফিসার মৃদু মাথা নাড়ে। কোনো নির্দেশ দেয় না। ভাষা নিষ্প্রয়োজন। রোকেয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। পায়ের শব্দ হয় না, কেবল মাটিই বুঝে নেয় পা সন্তানের। শারমিন কিছুটা পেছনে, কিন্তু হাত ছাড়ে না। যেন তারা জানে, বোনদের জীবন একসময় যার যারই হয়, কিন্তু এই মুহূর্তে তারা সহোদর। হাওয়ার হালকা গতি খাটিয়ার চারপাশ ঘিরে আসে। সাদা কাপড়ের এক কোনা একটু উড়ে যায়। তখনই প্রথম এক ঝলক দেখা যায় লোজিনা বেগমের মুখ। মৃত্যুর অতল থেকে ভেসে ওঠা সেই মুখে কোনো কষ্ট নেই। চোয়াল কিছুটা ঢিলে, চোখ বন্ধ, ঠোঁটের কোণায় আশি বছরের জীবন শেষের তৃপ্তি। রোকেয়া থেমে যায় খাটিয়ার পাশে। হাত বাড়াতে গিয়েও থামে। কোনো কিছু ছোঁয়া মানে অনেক কিছু ফুরিয়ে যাওয়া, এই মুহূর্ত আরেকটু পর। শুধু তাকায়, করুণ, নিঃশব্দ, দীর্ঘ এক চাহনি। শারমিন দাঁড়িয়ে থাকে রোকেয়ার অল্প পেছনে। তার চোখে একধরনের অপরাধবোধ, বহুবার কথা দিয়েছিল, মাকে বেড়াতে নিয়ে আসবে। হয়নি। কিন্তু কারো কোনো ধরনের এন্তেজাম মৃত্যুকে দেরি করিয়ে দিতে পারে না। এখন মায়ের মুখ উন্মুক্ত, কিন্তু ছুঁতে পারছে না সে! দেখার মধ্যে এক জীবনের ঝাঁঝ, মায়া, অভিমান—সব ঢেউ আছড়ে পড়ে বুকের গহীনে। এক নির্বাক শ্রেষ্ঠত্ব, রাষ্ট্রের উপরে সম্পর্কের, নিয়মের ওপরে প্রাণের। ‘তোমাদের আমি দেখেছি, এবার যেতে পারি।’ যেন বাতাস বলছে দুই বোনের কানে কানে!
মিনিট—৪
‘আম্মা’ শব্দটা শারমিনের ঠোঁট পেরিয়ে আসে, বড় আস্তে। বুকের মধ্যে পাথর চাপা, আর সেই চাপের নিচে রুদ্ধ বাতাস কেঁপে উঠে এতটুকু শব্দে রূপ নিয়ে মুক্তি লাভ করে শূন্যরেখায়। শব্দটা বেরোয়, কিন্তু শেষ হয় না। মুখটা চোখের সামনে। তবু যেন কেমন অচেনা লাগছে। মায়ের কপাল, চোখ বন্ধ, ঠোঁট নিস্তরঙ্গ, সাড়া নেই। শারমিন চেয়ে থাকে, তারপর হঠাৎ যেন কোনো ঘুমন্ত স্মৃতি এক নিমেষে জেগে ওঠে তার ভেতর। এই মুখটা, যে মুখ সে শেষবার দেখেছিল প্রায় এক যুগ আগে, সেটা কি তাকে চিনবে না? ভিতরের এক যন্ত্রণাদগ্ধ মেয়ে হঠাৎ বিশ্বাস করতে চায়, মা যদি এখনই চোখ মেলে, যদি বলে ‘তুই এলি শারমিন?’ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। পায়ের পেশি কেঁপে ওঠে, হাঁটু ভেঙে পড়ে যায় খাটিয়ার সামনে। হাত দুটো অসহায়ের মতো খাটিয়ার পাশে পড়ে থাকে, যেন আশ্রয় খুঁজছে কিন্তু পাচ্ছে না।
চারপাশের নীরবতা ভেঙে না যাওয়া এক অলিখিত নিয়মে আটকে আছে সবার মুখ। বিজিবি, বিএসএফ, বোন, মৃতা—দাঁড়িয়ে থাকে, বসে থাকে, তাকিয়ে থাকে, শুয়ে থাকে, কিন্তু কিছু বলে না। শারমিনের কাঁধ কেঁপে কেঁপে উঠছে। রোকেয়া নড়েনি তখনও। সে দাঁড়িয়ে, কাঠ হয়ে। শারমিন কেঁদে ভেঙে পড়লেও রোকেয়ার ভেতরে কান্না জমাট বরফের মতো জমে আছে। গলতে সময় লাগবে, হয়তো সারাজীবনও!
মিনিট—৫
রোকেয়া একটু ঝুঁকে পড়ে। মায়ের কপালের দিকে চেয়ে থাকে অনেকক্ষণ। সাদা কাপড়ের ফাঁকে বের হওয়া কপালের ত্বকটা না ছুঁয়েও বলতে পারে, শীতল। কিন্তু রোকেয়ার মনে হয়, এই তো কিছুদিন আগেও, তার কপালে মা হাত বুলিয়েছিল... না, সেটা অনেক বছর আগের কথা। এখন আর মনে পড়ে না ঠিক কোন দিন, কত বছর আগে। চোখের সামনে থাকা মৃত শরীরটা তার চেনা, কিন্তু আবার অপরিচিতও লাগে। সম্ভবত দীর্ঘ বিচ্ছেদ এমনই; আপন মুখকে এক সময় দূরের করে তোলে। রোকেয়া ফিসফিসে উচ্চারণে প্রশ্ন করে, ‘আম্মা, আমি এসেছি?’ উত্তর আশা করে না।
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এক বিএসএফ সদস্য, ধূসর গোঁফ, মোটা ফ্রেম চশমা, মাথা নিচু করে রাখে। চোখের কোণে হাত দেয় সে। বুঝতে দেয় না, কিন্তু মুছে নেয়। তারও বোন আছে এপারে। চিঠি আসে না অনেকদিন, ফোন আসে শুধু উৎসবে। শূন্যরেখার মাঝ বরাবর, মেয়েদের চাওয়া আর মায়ের নীরবতা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। অভিসারহীন পুনর্মিলন!
মিনিট—৬
লাশের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো চুপ। একেকজন একেকভাবে চুপ। কারো অশ্রু পড়ছে না, শুধু পাতা কাঁপছে; কেউ নিঃশব্দে চোখ মুছছে বারবার, আবার কেউ কেবল তাকিয়ে আছে সাদা কাপড়ে মোড়া দেহটার দিকে, যেন চেনা কোনো মুখ চিনতে ভুল করছে। কেউ মাথা নিচু করে রেখেছে, হয়তো নত হয়ে নয়, লজ্জায়ও নয়, শুধু এই বাস্তবতা থেকে চোখ সরাতে পারছে না বলেই নিচু হয়ে আছে। মাঝখানে খাটিয়ায় শুয়ে আছেন লোজিনা বেগম। তাঁর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আত্মীয়দের মুখে শোকের চেয়ে বেশি যেন বিস্ময়, এ সত্যি ঘটছে? এমন দৃশ্য কি কেউ কল্পনা করতে পারেনি। দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে, খোলা আকাশের নিচে, মাটির এমন এক ফালি জায়গায় দাঁড়িয়ে সবাই, যেটা কারো নয়, চারপাশে শুধু হেলেঞ্চা শাক।
সবার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ আত্মীয় চোখ মুছতে গিয়ে হঠাৎ থেমে যান। হয়তো স্মৃতিতে ফিরে গেছেন সেই দিনের দিকে, যেদিন রোকেয়া কাঁটা তারের এপাশে এসেছিল সংসার করতে তার পরিবার পরিজন ছেড়ে।
মিনিট—৭
হঠাৎ যেন নিজের গলার চারপাশে একটা টান অনুভব করে। শারমিন নিজের অজান্তেই আঙুল তুলে আনে সেই হারে, সোনার পাতলা চেইন, যার মাথায় একটা ক্ষীণ লকেট, ঘাম ও স্মৃতির ভারে এখন যেন কিছুটা ভারী। হাতটা চেইনের গায়ে পড়তেই সময়টা পেছনে ধাক্কা দেয়। সেই স্মৃতি যেন আজ এতটা স্পষ্ট হয়ে ফিরে আসে, শারমিন মনে করতে পারে মায়ের আঙুলের কাঁপুনি পর্যন্ত। শারমিনের আঙুল একটু থেমে থাকে হারটার ওপর। বিজিবির এক সদস্য, হয়তো বয়সে তার ভাইয়ের সমান, চোখ তুলে চেয়ে ছিল সেই মুহূর্তে। তার দৃষ্টি গিয়ে ঠেকে শারমিনের হারের গায়ে, হয়তো বুঝে ফেলে কিছু। তারপর হঠাৎ সে চোখ সরিয়ে নেয়, মুখ ঘুরিয়ে ফেলে সামান্য পাশের দিকে। জওয়ান জানে, প্রতিদিন তার ডিউটিতে বহু লাশ আসে, বহু মানুষ আসে, কিন্তু সবাই তো এমন করে গলার হার ছুঁয়ে দেখে না। এপারে আসার আগে মা নিজ হাতে হারটা পরিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘এইটা গলায় রাখিস। আম্মাকে মনে পড়লে দেখবি।’
মিনিট—৮
শারমিন একটু পেছনে সরে দাঁড়ায়। হঠাৎই তার চোখ যায় এক নারীর দিকে। শাড়ি পরা, মাথায় আঁচল টানা, হাতে একটা পুরোনো থলে। চেহারাটা যেন কেমন চেনা লাগে। ভালো করে তাকায়। তখনই বুকের ভেতর ধক করে ওঠে, ‘এ তো নাসিমা খালা!’ তাদের বাড়ির পাশেই থাকতেন এই নারী। ছোটবেলায় মাকে দেখতে এলে মায়ের সঙ্গে তার হাসি, গল্প, আর মুখে পান রাখার ঢং, সব মনে পড়ে যায় শারমিনের। একবার এই খালাই মাথা ঠেলে বলেছিলেন,‘এপার ওপার কোনো বিষয় না। সম্বন্ধটা খুব ভালো। রাজি হয়ে যা।’ সেই সম্বন্ধ আজ তাকে এপারে এনেছে, আরেক আকাশের নিচে। খালার মুখে একটিও কথা নেই, শুধু অপলক চেয়ে আছেন শারমিনদের দিকে। শারমিন চোখ নামিয়ে নেয়। মৃত মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে সে আজ বুঝতে পারে, কেউ শুধু মরে না,তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটা সময়, একটা পাড়া, একটা ঘর, এক চিলতে উঠোন , আর একটা ছায়া।
মিনিট—৯
একজন বিএসএফ জওয়ান সামান্য এগিয়ে আসে। মুখে নির্দেশের ছায়া। ‘আর দশ মিনিট।’ শারমিন তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নাড়ে। ঘড়ির কাঁটা আর লাশের মুখ, কখনও এতটা বিরোধী হয় না। আজ হলো। শারমিন দম নেয় ধীরে। মনে হয় বাতাসও যেন গণনা করছে।
মিনিট—১০
রোকেয়া খাটিয়ার একপাশে বসে। মায়ের পায়ের কাছে। সে আলতো করে হাত রাখে পায়ের পাশে। ছুঁয়ে দেখে। তারপর ফিসফিস করে। ‘আম্মা, তোমার পা অনেকদিন ছুঁয়ে দেখিনি’। খাটিয়ার চারপাশে এখন রোদের রেখা। তার মাঝে কল্পনার মতো কিছু ছড়িয়ে আছে। রোকেয়ার ছোটবেলার স্বপ্ন। সব এখানে এসে জমেছে। নিথর পায়ের পাশে।
মিনিট—১১
পিলারের ঠিক পাশে, একটায় সবুজ-লাল, অন্যটায় গেরুয়া-সাদা-সবুজ—দেশের পতাকা একসঙ্গে নড়ে। বাতাস খুব বেশি নেই, তবু কাপড়ে হালকা ঢেউ ওঠে, যেন মায়ের শাড়ির আঁচল বাতাসে কেঁপে উঠছে। এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব আছে, কিন্তু তার অহং নেই। কাঁটাতারের ভাষা থেমে আছে, নিয়মপত্রের পাতাগুলো নুয়ে আছে শোকগ্রস্ত মাতৃত্বের সামনে। কোনো পক্ষ এখন আর বড় নয়। সীমান্তে আজ কোনো তর্জনী নেই। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে, মাথা নিচু মানুষের। কারণ খাটিয়ায় শুয়ে আছেন এক নারী, যিনি দুই রাষ্ট্রেই সন্তান রেখে গেছেন। তার মৃত্যু—সম্মতির ভাষায় রাষ্ট্রদ্বয়কে একই রেখায় দাঁড় করিয়েছে। পিলারের পাশে দুই দেশের পতাকা হালকা দুলছে। কোনো রাষ্ট্র এখন বড় নয়, কেবল এক নারী, যিনি দুই দেশেই সন্তান রেখে গেছেন, তার জন্য রাষ্ট্রেরা নত হয়েছে।
মিনিট—১২
‘তোমার কোনো ছবি নেই আমার কাছে, আম্মা’, শারমিন কাঁপা গলায় বলে। ‘এই মুখটাই মনে রাখব, এই মুখটাই।’ শারমিন একটু ঝুঁকে আসে। মায়ের মুখের ওপর রোদের হালকা রেখা পড়েছে। ব্যাগ থেকে ফোন বের করে। আঙুল যায় ক্যামেরার দিকে। তবে থেমে যায় মাঝপথে। সে নিজের ফোন তুলেও ছবি তোলে না। বাস্তব এত ভারী যে স্মৃতি ধারণ করার কোনো প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়। পাশে থাকা রোকেয়া কিছু বলে না। তাকায় না ফোনের দিকে, না মায়ের মুখ থেকে চোখ সরায়।
মিনিট—১৩
শিশুটির ছোট হাতগুলো নিঃশব্দে রোকেয়ার গলার সঙ্গে জড়িয়ে গেল। ভেসে এলো তার কম্পমান কণ্ঠস্বর,‘নানি?’ কথাটি যেন বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। রোকেয়া কিছু বলতে চাইল, কিন্তু কণ্ঠ আটকানো, চোখ মেলে দেখল ছোট্ট মুখটিকে, যে একমাত্র তার কাছে সান্ত্বনা চাচ্ছিল।
মিনিট—১৪
মায়ের মাথার পাশে রাখা হয় একখণ্ড কোরআন শরীফ। পুরনো, পৃষ্ঠাগুলো ভীষণ কোমল, সময় ও যত্নের ছোঁয়ায় হালকা মিহি হলদেটে। এক আত্মীয় ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলে, ‘তোমার মা প্রতিদিন এই কোরআনটা পড়তেন। এটা বড় মেয়ের জন্য রেখেছিলেন স্মৃতিস্বরূপ।’ রোকেয়ার চোখে আকাশ থেকে নামে অশ্রুজল। সীমান্তের দু’পাশের বুকে বাঁধা আছে এই এক টুকরো কোরআন। মা এখনও যেন দুই মেয়ের মাঝে বার্তা পাঠাচ্ছেন, একটি ভরা বিশ্বাসের ভাষায়।
মিনিট—১৫
পাসপোর্ট, ভিসা, কিছুই লাগেনি আজ। মা সব ছাড়িয়ে এনেছেন ওদের। শূন্যরেখায় আসতে ভিসার দরকার হয়নি, দরকার হয়েছে মৃত্যুর। সীমান্ত পেরোনোর নিয়ম-কানুন ভুলে গিয়েছিলো সবাই। শূন্যরেখার ওই পিলারের কাছে শুয়ে থাকা নিথর শরীর একমাত্র আসল পাসপোর্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মৃত্যুই আজ তাদের ভিসা। এখানে শুধু রোকেয়া আর শারমিন, আর তাদের মায়ের মুখ। আর একজন জওয়ান, যিনি বুঝেছেন, মানবিকতা কখনো সীমানা চিনে না।
মিনিট—১৬
একজন দূর থেকে বলে, ‘বুড়ির মেয়ে দুইটার লাগি মায়া লাগে। বাকি চার সাওয়াল ওপারে।’ জবাবে কেউ বলে না কিছু। আইন আছে, সীমান্ত আছে, কিন্তু আবেগের তো কোনো সীমানা নেই। কথাটা বাতাসে ভেসে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে মিশে যায় শূন্যরেখার স্তব্ধতায়। বলে না রোকেয়া, বলে না শারমিন। কিন্তু আবেগ? শুধু একরাশ অদৃশ্য ঢেউ, বুকের ভেতর আছড়ে পড়ে। খাটিয়ার চারপাশে বিজিবি আর বিএসএফ সদস্যরা নীরব। কেউ কিছু ব্যাখ্যা করে না। কারণ তারাও জানে, এই মুহূর্তে ভাষা অপ্রয়োজনীয়। মেয়েরা তাকিয়ে থাকে মায়ের মুখের দিকে, আর অজানাভাবে বুঝতে পারে, এই মৃত্যুই যেন একমাত্র সত্য, যা কোনো রাষ্ট্রের অনুমতির অপেক্ষা করে না।
মিনিট—১৭
রোকেয়া একটু ঝুঁকে পড়ে। মায়ের নিথর মুখের কাছে ঠোঁট নিয়ে যায়। খুব নরম, নিঃশব্দে, যেন শব্দগুলো বাতাসও বুঝতে না পারে। সে বলে, ‘আম্মা, তুমি ঘুমাও। আমরা ঠিক আছি, ভালো আছি এপারে। আমার শাশুড়ি মায়ের লাহান আদর করে।’ শব্দগুলো শেষ হওয়ার আগেই চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে মায়ের সাদা কাপড়ে। রোকেয়া জানে, মা শুনছেন না, তবু মায়ের কানের কাছে বললে মনে হয়, পৌঁছে যাবে কোথাও, যেখানে শব্দের থেকে বেশি কাজ করে বিশ্বাস। পাশে থাকা শারমিন মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে কিছু বলছে, কিন্তু কোনো বাক্য পুরো হয় না, বাতাসে মিলিয়ে যায়। সে আসলে বলছে মায়ের সঙ্গে শেষবার ফোনে যেসব কথা হয়েছিল। যেসব শব্দ ঠিকঠাক উচ্চারণ করা হয়নি, যা কণ্ঠে আটকে গিয়েছিল অভিমান আর দূরত্বে। ‘আম্মা, তোমার হাঁটুর ব্যথা কি এখনো আছে?’
‘আম্মা, পুলি পিঠা কেমন বানাও, তুমি তো বলোনি!’
‘আম্মা, আমিও তো কোনোদিন বলিনি, তোমারে না দেখে থাকতে কেমন লাগছিল এপারে।’
এইসব ভাঙা বাক্যের ভেতর শারমিন, না বলা কথার পাহাড়ে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
মিনিট—১৮
বিএসএফ সিগন্যাল দেয়, ‘দুই মিনিট।’ দুই বোন একে একে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। চার ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই এসে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয় বোনদের। কেউ আর কিছু বলতে পারে না। চোখে পানি, মুখে শব্দ নেই। কেবল বুকের ভেতর হাহাকার। শব্দটা যেন কাঁটার মতো বুকের ভেতর বিঁধে যায়। রোকেয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, শারমিন তার কিছু পেছনে। মাকে ধরে মাটিতে বসে থাকার মুহূর্তটা শেষ হয়ে গেছে। মায়ের নিথর মুখটা দেখে মনে হয়, এই নীরবতাই হয়তো সবচেয়ে গভীর বিদায়। বিজিবি বা বিএসএফ কেউ এগিয়ে আসে না, কারণ সবাই জানে, এই দুই মিনিট কারো নয়, এটা শুধু মেয়ে আর মায়ের। এ দুই মিনিটে সময় স্থির হয়ে থাকে, শুধু বুকের ভেতর বাজে এক দীর্ঘ, অস্ফুট সুর।
মিনিট—১৯
মৃতদেহের পাশ থেকে তারা উঠেও পুরোপুরি সরে আসতে পারছে না। রোকেয়ার হাতটা এখনও রাখা মায়ের কপালের পাশে, আঙুলগুলো কাঁপছে। শারমিন দাঁড়িয়ে, কিন্তু পা চলে না। দৃষ্টি স্থির, ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরা। বিজিবির এক সদস্য, যিনি সারা সময়টা কিছু না বলে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, এগিয়ে এসে নম্র কণ্ঠে বলেন, ‘আপনাদের সময় শেষ হয়ে আসছে।’ শব্দগুলো নরম, কিন্তু অনিবার্য। তা যেন একটি রাষ্ট্রের তরফ থেকে বলা নয়, বরং একজন মানুষের। শারমিন হঠাৎই কাঁপা গলায় আহাজারি করে বলে ফেলে,‘আম্মা, আমরা ফিরে যাচ্ছি।’ এমনভাবে সেই আর্তি কোনো কবিতায়ও ধরা যাবে না। রোকেয়া কিছু বলে না। সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে। বাতাস একটু বেড়েছে। পিলারের উপরে দুটি পতাকা দুলছে। রাষ্ট্র, আইন, কাঁটাতার—সবই রয়ে গেছে নিজের জায়গায়। শুধু দুটি মেয়ে একটু একটু করে পেছাতে থাকে। মৃতদেহের পাশ থেকে সরে আসতে চায় না তারা। বিজিবির এক সদস্য নম্রভাবে বলে, ‘সময় শেষ হয়ে আসছে।’ শারমিন কান্না চেপে বলে, ‘আমরা ফিরে যাচ্ছি, আম্মা।’
মিনিট—২০
দুই বোন ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসে। খাটিয়ার চারপাশে যারা ছিল, তারাও নড়তে শুরু করে। সময় থেমে ছিল যে শূন্যরেখায়, এখন আবার চলতে শুরু করে। মা থেকে মেয়ে দূরে সরে যায়। সময় নিঃশব্দে সেকেন্ডে এখন। বিজিবির একজন সদস্য মৃদু গলায় বলে, ‘সময় শেষ। ৯ টা ৩০।’ বিদায়ের আগে রোকেয়া মায়ের কপালে চুমু দিয়ে ফিসফিস করে উঠেছিল, ‘আম্মা, আমরা চেয়েছিলাম... কেবল তোমার মুখটা একবার দেখতে। ওইটুকুই তো চেয়েছিলাম।’ শারমিন কাঁপা গলায় বলে,‘আম্মা, তোমাকে দেখলাম।’ শূন্যরেখায় তাদের আবেদনের জবাব দিয়েছে দুই দেশ। সীমান্তের বিজিবি আর বিএসএফ—তারা জানে, এ শুধু একটি লাশ দেখার মুহূর্ত নয়, না আবেদন, মানবতা সায় দিয়েছে। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে বৈবাহিকসূত্রে বাংলাদেশে থাকা দুই মেয়ে চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কাছে আবেদন করেন, যেন তারা সীমান্তে শেষবারের মতো মায়ের মুখ দেখতে পারেন। বিষয়টি জানার পর ৬ বিজিবির জগন্নাথপুর বিওপি ও ভারতের ১৬১ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের গোংরা ক্যাম্প সহমর্মিতা দেখায়।
এখনই নদীয়ায় ফিরবেন মা লোজিনা বেগম। দুই মেয়েও হাঁটতে শুরু করে মেহেরপুরের দিকে।
শূন্যরেখায় তখন সকাল ৯ টা ৩১ মিনিট!



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন