চিত্র প্রদর্শনী || ‘আমার ইচ্ছা আমি এখানেই থাকি’

অ+ অ-

 

মাটি-শব্দ-স্থাপনার সমন্বয়ে ৪ জুলাই গ্যালারি কলাকেন্দ্রে শুরু হয়েছে শিল্পী মোর্শেদ জাহাঙ্গীরের একক প্রদর্শনীআমার ইচ্ছা আমি এখানেই থাকি। এটি মোর্শেদের চতুর্থ একক প্রদর্শনী। গ্যালারিতে ঢুকেই স্বভাবসুলভ ভাবে চোখ গিয়ে ঠেকে দেয়ালে। শূন্য দেয়াল থেকে উলম্ব হয়ে চোখ নেমে আসে মাটিতে, যেখানে অনেক স্থাপনার খণ্ডিত অংশ বিছানো। যেন এক আস্ত স্থাপনার টুকরো টুকরো অংশ বা ধ্বংসস্তুপ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গ্যালারির প্রতিটা অংশে। আবার মনযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলে, প্রতিটি টুকরোই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে এক-একটা স্থাপনা। বেশ আয়েশি ঢঙে শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন আকার নিয়ে, আলাদা আলাদা রিদমিক ভঙ্গিতে অবস্থিত। স্থাপনার সাথে সংযুক্ত শব্দ যেন সেই ভঙ্গিটুকুই প্রকাশ করছে সুদৃঢ়ভাবে। আর মাটি প্রাণ নিয়ে হাজির হয়েছে প্রতিটি স্থাপনায়।

আমার ইচ্ছা আমি এখানেই থাকি’—প্রতিটি মানুষের এমন নিজস্ব কিছু ভাবনা থাকে। থাকে নিজের একান্ত ভাবনাগুলো প্রকাশ করার এক ধরনের সুপ্ত তাড়না। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ বুঝে উঠতে পারে না, কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে হয়। এভাবেই ভাবনাগুলো জমাতে জমাতে মানুষ নিজেকে প্রকাশের স্বাভাবিক অভিব্যক্তিটুকু হারিয়ে ফেলে। নিজেকে সমর্পণ করে জীবন-জীবিকার তাগিদে কঠিনতম বাস্তবতায়। হয়ে ওঠে যান্ত্রিক। শিল্পী এদিক থেকে অনেকটাই সফল বলা চলে। ব্যক্তি জীবন এবং শিল্পী জীবনের টানাপোড়েনের মধ্যেই শিল্পী নিজেকে আবিস্কার করে নেন। শিল্পের মাধ্যমে নিজের ভাবনাগুলো প্রকাশ করার উপায় খুঁজে ফেরেন সর্বদা। এই প্রকাশ করার ক্ষমতা শিল্পীকে নিস্তার দেয় সামগ্রিক অস্থিরতা থেকে। এক একটা প্রকাশের মধ্য দিয়েই শুরু হয় নতুন ভাবনার ফলন অথবা একই ভাবনার বিভিন্ন বহিঃপ্রকাশ। সেটা মূলত নির্ভর করে একান্তই শিল্পীর নিজের বোঝাপড়ার ওপর। কখনও তিনি একটি ভাবনার আস্তরণ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নতুন ভাবনায় ডুব দিতে চান। আবার কখনও সময় গড়িয়ে চলে। বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রকাশ করে চলেছেন একই ভাবনা। হয়তো নানাবিধ প্রকাশের মধ্য দিয়েও ভাবনার জগৎ থেকে ক্ষান্ত হতে পারছেন না।

প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম উপস্থাপনার একাংশ

সময়ের অস্থিরতা আর জীবনের স্থবিরতার মাঝে আমরা আবদ্ধ। সামগ্রিক বাস্তবতা আমাদের ঘিরে রেখেছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। এরমধ্যেই শিল্পীর এই এখানেই থাকতে চাওয়া, এটি কোনোভাবেই শারীরিক উপস্থিতি নয়। বরং এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ভাবনা। অভ্যন্তরীণ ভাবনার মধ্যেই থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। যে ভাবনায় শিল্পী তার নিজস্ব জগৎ গড়ে তোলেন। যেখানে আত্মিক সংযোজন ঘটে শিল্প ভাবনার সাথে শিল্প নির্মাণের। যেখানে শিল্পী আত্মমগ্ন হন, ধ্যানস্থ হন। দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় শিল্পী নিজেকে খুঁজে ফেরেন, অভ্যস্ত হন নিজের সাথে।  

প্রতিটি অঞ্চলের আলাদা চরিত্র থাকে। মানুষের বেড়ে ওঠার পরিবেশ, তার মধ্যে ‌একধরনের প্রভাব ফেলে। গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা যেমন তার বৈশিষ্ট্য গঠনে একরকম ভূমিকা রাখে, তেমনই শহরভিত্তিক বড় হওয়া কিছুটা ভিন্ন ধরনের প্রভাব বিস্তার করে। ঢাকার মতো অগ্রসরমান একটি শহরে বেড়ে ওঠেন শিল্পী মোর্শেদ জাহাঙ্গীর। পাশ্চাত্যের আধুনিক শিল্প-সংস্কৃতি-সঙ্গীতকে বোঝার বা কখনো সখনো চর্চার মধ্য দিয়ে নিজের অজান্তেই যেন একটু একটু করে প্রশিক্ষিত হতে থাকেন তিনি। একদম গোঁড়ার দিকে শিল্পের সাথে তার পথচলার শুরু হয় এভাবেই।

আমরা একজন শিল্পীকে চিনে উঠি তার সৃষ্টিশীলতার বিচারে অথবা বলা যায়, শিল্পের গতি-প্রকৃতি শিল্পীকে আলাদা করে চেনায়। মোর্শেদ জাহাঙ্গীর মূলত গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে, নিরীক্ষাধর্মী কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। অল্টারনেটিভ স্পেস বা ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ, স্থান তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে কাজের উপস্থাপনে। নানা প্রকার উপকরণ নেড়েচেড়ে দেখা, তাদের ভাষা বোঝা, মোর্শেদের স্বভাবের অংশ। প্রতিনিয়ত চর্চার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার পথ খোঁজেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতায়ই তার এবারের প্রদর্শনী।

প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম উপস্থাপনার একাংশ

এখানে তিনি ভাবনা প্রকাশের মূল উপাদান হিসেবে বেছে নিয়েছেন মাটি। মাটির ঘরের নস্টালজিয়া থেকেই মোর্শেদ মাটির দ্বারস্থ হোন। মাটির ভাষা বুঝে নিতেই মাটি নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেন। মাটিকে ছেনে, ছেঁটে, ঘেটে বিভিন্ন আকার দিতে থাকেন। এভাবেই তৈরি হয়ে ওঠে একটা একটা করে মাটির বিভিন্ন আকৃতিগত রূপ।

মাটির নিজস্ব ভাষা আছে। আছে ঐতিহ্যগত অবস্থান। আছে মাটি নির্ভর করে বেঁচে থাকা অনেক জীবন্ত অস্তিত্বও। জীবন্ত সত্তার প্রতি মমতা, প্রাণ প্রকৃতির ক্ষয়িষ্ণুতা, ভঙ্গুরতা ও অসম্পূর্ণতার সৌন্দর্য উদযাপন নিয়েই যেন শিল্পী তার কাজের মধ্য দিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করতে চেয়েছেন। চেয়েছেন দর্শকের সাথে নিজের অব্যক্ত কথন ভাগ করে নিতে। তার শিল্পভাবনা যেন নিজে থেকেই আহ্বান জানায় দর্শককে সংলাপে অংশ নিতে। মাটির এই বৈচিত্র্য আকার আকৃতি যেমন দর্শককে একটা ধ্বংসস্তুপের অভিজ্ঞতার সামনে এনে দাঁড় করায় তেমনই মোর্শেদের মাটি আমাদের টেনে নিয়ে যায় নানাবিধ প্রশ্নের মুখোমুখি।

শিল্প প্রকাশের ক্ষেত্রে শিল্পী যেমন বিশেষ ভূমিকা রাখে, তেমনি ভাবে শিল্প নিজেও অনেক সময় নিজের অবস্থান নিয়ে সরব হয়ে ওঠে। মোর্শেদের এই খণ্ড খণ্ড স্থাপনাগুলো যেন নিজেরাই বলতে চায়, তারা আরও বিস্তীর্ণ পরিসর ডিমান্ড করে। একজন দর্শক হিসেবে, জায়গা সংকুলান দেয়ালে গিয়ে চোখ আটকে দেয়। শিল্পী নিজেও এই জায়গা সংকুলান মাথায় রেখে গ্যালারিতে কাজগুলো প্রদর্শনের চ্যালেঞ্জটা নিয়েছেন। 

প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম উপস্থাপনার একাংশ

নোট: শিল্পী মোর্শেদ জাহাঙ্গীরের আমার ইচ্ছা আমি এখানেই থাকিশিরোনামের একক প্রদর্শনীটি চলবে ২০ জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত।