কল মি লাইকা—অভিশপ্ত জীবনের গল্প
মোজাফ্ফর হোসেনের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘কল মি লাইকা’ পড়ার পর মনে হলো, লেখক এই উপন্যাসে একটা স্পিরিচুয়াল জার্নি সম্পন্ন করেছেন। এও মনে হলো যে, মোজাফ্ফর তার আগের সব কাজকেই ছাড়িয়ে গেছেন এই জার্নির ভেতর দিয়ে। শুধু তাই নয়, আমি অনুভব করে উঠলাম—এই উপন্যাস সময়কে অতিক্রম করবে। সব উপন্যাস সেটা করে না, ভালো উপন্যাস হলেও করে না। কেন এসব মনে হলো, আমি তা ব্যাখ্যা করবো।
লক্ষ্য করে দেখুন, বিশ্বসাহিত্যের যে উপন্যাসগুলোকে সময়োত্তীর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়, তার সবগুলোতেই কোনো না কোনোভাবে স্পিরিচুয়াল জার্নির ব্যাপারটা আছে। উদাহরণ দিচ্ছি। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘শত বছরের নিঃসঙ্গতা’-কে কেউ সাধারণ উপন্যাস হিসেবেই পাঠ করতে পারেন, কিন্তু পড়ার পর মনে হবে মার্কেস এই উপন্যাসে এক স্পিরিচুয়াল জার্নি সম্পন্ন করেছেন। কারণ? উপন্যাসে কর্নেলের যে পরিবারটা দেখানো হচ্ছে, সেটা এক বিশাল পরিবার; এবং সেই পরিবার একসময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই ঐতিহ্যবাহী পরিবার শেষ হয়ে যাওয়ার প্রধানতম কারণ হলো প্রেমহীনতা। এই পরিবারে সবই ছিল, কিন্তু ভালোবাসা ছিল না। ভালোবাসা না থাকলে, প্রেম না থাকলে, মায়ার বন্ধন না থাকলে একসময় পারম্পর্য শেষ হয়ে যায়, তা সে যতই ঐতিহ্যবাহী-প্রাচীন-সমৃদ্ধ পরিবার হোক না কেন? ক্রিটিকরা পরে বলেছেন যে কর্নেলের এই পরিবারে মাধ্যমে মার্কেস আসলে লাতিন আমেরিকার ইতিহাস তুলে ধরেছেন। যদি তাই হয়, তাহলে বলতে পারি, লাতিন আমেরিকার যে পরিণতি ও সমৃদ্ধ অতীত থেকে পতন সেটার জন্য দায়ী এই প্রেমহীনতা। একটা জাতির দুর্ভোগ-দুর্ভাগ্য, দুর্নীতি-দুর্যোগ, পাপ-পতন ইত্যাদির কারণ নিয়ে সমাজতাত্ত্বিকরা একভাবে আলোচনা করেন, ইতিহাসবিদরা অন্যভাবে করেন, রাজনীতিবিদ-অর্থনীতিবিদদের আলাপ হতে পারে ভিন্নরকম, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত সত্যটা উপলব্ধি করতে পারেন লেখকরা, যেমনটি মার্কেস করেছিলেন। এই প্রেম হলো পারস্পরিক মমত্ত্ববোধ, দায়িত্ববোধ, সৌহার্দ্যবোধ, যেটা বন্ধন হিসেবে কাজ করে। স্পিরিচুয়াল জার্নি না হলে জাতিগত পতনের এই কারণটা তাঁর চোখে ধরা পড়ত না। এইভাবে আমি দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, কামু, কাফকাকে দিয়ে উদাহরণ দিতে পারি, তারা কোনো না কোনো উপন্যাসে গিয়ে এই স্পিরিচুয়াল জার্নিটা করেছেন। গোটা মানবজাতিকেই তারা একটা মেসেজ দিতে চেয়েছেন। দস্তভয়েস্কির ইডিয়টের কথা বলি, ওই যে নায়কটা, তাকে দিয়ে দেখানো হচ্ছে এই ধরনের ‘ইনোসেন্স’ নিয়ে একজন মানুষ পৃথিবীতে ‘মিসফিট’ হয়ে যাবে। এখন আমরা কোনটাকে বেছে নেব, ইনোসেন্সকে নাকি জটিল জগতকে? দস্তয়েভস্কির পক্ষপাত কিন্তু ইনোসেন্সের প্রতি। তিনি এই চরিত্রটা এমন করে তৈরি করেছেন যে তার জন্য আমাদের মমতা জাগে, পক্ষপাত তৈরি হয়। জটিল জগতটা যে ভুলের ওপর দাঁড়ানো তা বুঝে নিতে আমাদের আর অসুবিধা হয় না। তখন আর উপন্যাসটি স্রেফ উপন্যাস হিসেবে থাকে না, সেটি লেখকের জন্য তো বটেই, এমনকি পাঠকের জন্যও স্পিরিচুয়াল জার্নি হয়ে ওঠে। এটা সব উপন্যাসে হয় না। সেই অর্থে কল মি লাইকা স্পিরিচুয়াল জার্নি। এই উপন্যাসে কোন সত্যটা লেখকের কাছে ধরা দিয়েছে সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।
বলেছিলাম, মোজাফ্ফর এই উপন্যাসে নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন। তাঁর খ্যাতি ও পরিচিতি এসেছে ছোটগল্পের মাধ্যমে। আয়তনে বেশ ছোট ছোট গল্প লেখেন তিনি। নানা রকম টার্ম এখন ব্যবহৃত হয়, যেমন ফ্লাশ ফিকশন, তার নামের আগে অনেকে সেটা ব্যবহার করেন। মোটামুটি এমন একটা ইমেজ তৈরি হয়েছে যে, মোজাফ্ফর ছোটগল্প লিখবেন, সেই গল্প আবার এক পৃষ্ঠা দু পৃষ্ঠার মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তার গল্পের বিষয় হবে ডার্ক। অন্ধকার একটা জগত যেখানে কল্লাবিহীন মানুষেরা হেঁটে বেড়াচ্ছে, এমন একটা ভয়াবহ বিপর্যস্ত পরিস্থিতি যেখানে অনায়াসে মানুষ মানুষের মাংস খাচ্ছে ইত্যাদি। কোথাও কোনো আশাবাদ থাকে না, ভালোবাসাও থাকে না, থাকে এক ধরনের মরবিডনেস। মোজাফ্ফরের প্রথম উপন্যাস—তিমিরযাত্রা—সেখানেও প্রধান চরিত্রের মা-বাবাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তার মধ্যে বিবমিষা আছে। এই যে একটা প্যাটার্ন ছিল, সব অর্থেই সেই প্যাটার্ন থেকে বের হয়ে এসেছেন মোজাফ্ফর এই উপন্যাসের মাধ্যমে। এখানে বর্ণনার যে ধরন সেটা গল্পের তো নয়ই, এমনকি সাধারণ ফিকশন যে লেখা হয়, তেমনও না। এটার গদ্য মহাকাব্যিক।
এই ধরনের গদ্য, এরকম বাক্য বা অনুচ্ছেদ, সাধারণ মানসিক অবস্থায় লেখা যায় না। ওটার জন্য বিশেষ মানসিক অবস্থা লাগে। এই উপন্যাসে যে চরিত্রগুলো আছে, প্রতিটি চরিত্রই, সে যত ছোটো ভূমিকাতেই থাকুক না কেন, প্রটাগনিস্ট হয়ে ওঠে। প্রধান চরিত্র ছাড়াও, তার আশেপাশে যারা আছে, যেমন তার মা বা বোনেরা, এমনকি তার বাবা শেষে গিয়ে যখন তার কন্যার কবরে ঘুমাতে চায়, তাদের জন্য মমতা জাগে, মন খারাপ হয়। কী একটা অভিশপ্ত জীবন তাদের! প্রতেক্যের জীবনই এখানে অভিশপ্ত। কোনো চরিত্রের প্রতিই বিবমিষা ছিল না যেটা সাধারণভাবে তার লেখায় দেখা যায়। ভাষা, বর্ণনাভঙ্গি, চরিত্র সৃষ্টি সব জায়গাতে নিজের আগের বৈশিষ্ট্য থেকে বের হয়ে এসেছেন মোজাফ্ফর। এই উপন্যাস ভালোবাসার কথা বলে, মমতা জাগায়। আর বর্ণনার মধ্যে যে মুনসিয়ানা এবং ভাষার যে আভিজাত্য সেটা একটা মহাকাব্যিক অনুভূতি দেয়। তবে ভবিষ্যতে একটা সমালোচনা তাকে শুনতে হবে, যেহেতু এই উপন্যাসটা কালোত্তীর্ণ হবে, তাই এই সমালোচনা আসবে ভবিষ্যতে, সেটা হলো, এই উপন্যাসে লেখকের উপস্থিতি ঘটেছে। লেখক আসলেই উপস্থিত। মজার ব্যাপার হলো, এই ব্যাপারটাকেই আমি পছন্দ করেছি। এর পেছনে একটা যুক্তি আছে। আমাদের প্রচলিত সাহিত্যবিচারে বলা হয়, উপন্যাসে বা গল্পে যদি লেখক নিজেই উপস্থিত থাকেন তাহলে সেটার মান ক্ষুন্ন হয়। এই কথিত ধারণাটি মোজাফ্ফর ভেঙে ফেলেছেন, এবং সেটা খুব মুন্সিয়ানার সঙ্গে। লেখক উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও নৈর্ব্যক্তিকতার কোনো অভাব ঘটেনি। লেখক উপস্থিত থাকতে হয়, কে বলছে থাকা যাবে না? সাহিত্যতত্ত্বের এই কথাগুলো মেনে কি মহৎ সাহিত্য লেখা হয়েছে? প্রশ্ন উঠবে যে, উপন্যাসের ওই কিশোর চরিত্র কি এগুলো ভাবতে পারে কিংবা দাদি সে রকম চিন্তা করতে পারে? এরকম প্রশ্ন অবান্তর। কিন্তু প্রশ্নগুলো আসবে। বলা হবে, চরিত্রগুলোর ওপর লেখক ভর করে আছেন। আমি তাতে আদৌ কোনো সমস্যা দেখতে পাইনি।
এই উপন্যাসের বর্ণনা মহাকাব্যিক দ্যোতনা দেয়। এমন কিছু বাক্য কিংবা অনুচ্ছেদ আছে যা প্রচলিত গদ্যসাহিত্যে সচরাচর দেখা যায় না। এর অনেকগুলোই ভবিষ্যতে উদ্ধৃতিযোগ্য হয়ে উঠবে বলে ধারণা করি। যেমন,
গ্রামে ধনী বলতে লোকে বোঝে কার কতটুকু জমি আছে, আমি বুঝি কার ভান্ডারে কত শব্দ আছে। প্রায় ভূমিহীন নিরক্ষর দাদির চেয়ে ধনী মানুষ আমি এখন পর্যন্ত দেখিনি। অঢেল শব্দ তার, রংবেরঙের অর্থ সেসবের।
কিংবা
কোনো কোনো শব্দ আবার সকাল-বিকাল অর্থ বদল করে—শীতে এক অর্থ, গরমে আরেক অর্থ হয়; জলে এক অর্থে সাঁতার কাটে, আরেক অর্থে বাউরি বাতাসে দুরন্ত ছোটে; এক অর্থে নিশ্চুপ, নির্জন রাখালের মন, আরেক অর্থে হুহু বাউলা কীর্তন।
এই যে বাক্যটা এটা স্বাভাবিক অবস্থায় লেখা সম্ভব না, বিশেষ মানসিক অবস্থায় এগুলো ধরা দেয়।
আবার ধান নেড়ে দেওয়ার দৃশ্য বর্ণনার সময় বলা হচ্ছে: রোদ পাওয়া ধানগুলোর সঙ্গে রোদ না পাওয়া ধানগুলো জায়গা বদল করে। ধান নেড়ে দেওয়া যারা দেখেছে তারা কেউ এভাবে কখনো ভেবে দেখেনি। এর পরেই মোজাফ্ফর লিখেছেন: প্রকৃতির নিয়মই এমন—চাঁদের সঙ্গে সূর্যের, অন্ধকারের সঙ্গে আলোর, ঝড়ের সঙ্গে সৃষ্টির, শব্দের সঙ্গে মৌনতার জায়গা বদল করা।
এরকম বাক্য সচেতন চিন্তা থেকে লেখা যায় না। এগুলো হলো একটি জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত বিমূর্ত চিন্তা ও সৃজনশীল কল্পনার বিকশিত রূপ।
কতগুলো অসাধারণ চিত্রকল্পও তৈরি করেছেন মোজাফ্ফর, যেমন—বটগাছ থেকে একপ্রস্থ ঘোলা মেঘ ধোঁয়ার মতো প্রসারিত হয়ে হেঁটে যাচ্ছিল জঙ্গলের সরুপথ ধরে। একবার পড়লেই চিত্রকল্পটা চোখে ভেসে ওঠে। আবার মিথকে কীভাবে ব্যবহার করেন তিনি, দেখুন:
পুরো পৃথিবীটারই জন্ম হয়েছে বড়ো কোনো কারণ ছাড়াই। এটা আমাকে টিপু সুলতান বলেছে। এই কারণে পৃথিবীটা আজও টিকে আছে। গুরুতর কোনো কারণ থাকলে পৃথিবী এত দীর্ঘজীবী হতো না। মানুষ যেমন একটা কারণ নিয়ে জন্মায়, যেমন: আদম--হাওয়ার পৃথিবীতে আসার পেছনে কারণ ছিল। এই কারণে মানুষ বেশিদিন বাঁচে না। প্রাণিকুলে কচ্ছপের বেঁচে থাকার কারণ সবচেয়ে কম, এই কারণে বাঁচেও সবচেয়ে বেশি।
যদিও ‘কচ্ছপের বেঁচে থাকার কারণ সবচেয়ে কম’ কি না তা আমরা আদৌ জানি না, তবু মানুষ যে কেন বেশিদিন বাঁচে না তার একটা ব্যাখ্যা পেয়ে পাঠক হয়তো ভাবতে বসবেন, তার স্বল্পায়ু হবার রহস্য তাহলে এই! লেখক যে নিজেই উপস্থিত আছেন এখানে এবং তাঁর দর্শনকে প্রকাশ করছেন, তা বোঝা যায়। এ প্রসঙ্গে কম বাঁচা বেশি বাঁচা নিয়ে আমার একটা লেখার কথা মনে পড়ে গেল। প্রকৃতিতে যে প্রাণীগুলোর গতি শ্লথ, ধীরে চলে, সেগুলো দীর্ঘজীবী হয়; আর যারা দ্রুত গতির তারা স্বল্পজীবী হয়। উদাহরণ হিসেবে আমি দেখিয়েছিলাম কচ্ছপ, হাতি এগুলো ধীরগতির, বাঁচেও বেশি। কিন্তু খরগোস, হরিণ, চিতা এগুলো বেশিদিন বাঁচে না। তাই প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আমরা বুঝতে পারি আমাদের কোন গতিতে চলা বাঞ্চনীয়। আসলেই প্রকৃতি আমাদের জন্য অনেক ইশারা বহন করে। আরেকটা জায়গা আমার খুব ভালো লেগেছে: ‘আমাদের বাড়ির হাঁস এখনো ডিম দেওয়া শুরু করেনি।’ খুব স্বাভাবিক একটা বাক্য। এরপরেই লিখেছেন, ‘এ বাড়ির কোনো ব্যাপারেই কারো মধ্যে কোনো গরজ নেই।’ হাস ডিম পাড়েনি, এর সঙ্গে মিলিয়ে তিনি বাড়ির মানুষ, গাছপালা, পশুপাখি সবার চরিত্র তুলে ধরলেন।
আরেকটা জায়গা তুলে ধরছি: কোনো কোনো জ্ঞান ভাবনার পথ সীমিত করে দেয়। এই কারণে যে কম জানে তাকে আমার ভাবুক মনে হয়। যেমন—দাদি কিছু জানে না, সারাক্ষণ ভাবনাচিন্তা করে সবকিছু সম্পর্কে জানার চেষ্টা করে। সারাক্ষণ ভাবনার মধ্যে থাকে। স্কুলের মাস্টারমশাইদের কিন্তু কোনোকিছু ভাবতে হয় না। সব জানেন তারা। যদি জিজ্ঞেস করি, বৃষ্টি কেন হয়? আমার বিজ্ঞানের স্যার বলবেন, খাল-বিল-নদীর পানি রোদে জ্বলে বাষ্প হয়ে আকাশে গিয়ে মেঘ জমিয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। এটা বলার জন্য তাকে এক সেকেন্ডও ভাবতে হবে না। দাদিকে যেদিন প্রশ্নটা করি, দাদি ভেবে ভেবে বলল, ‘কাল বাদ-আসর আসিস। এরপর দাদি একটা গল্প তৈরি করে। দাদার মৃত্যু নিয়ে বলা হচ্ছে, ‘দাদার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে অনেক শব্দেরও মৃত্যু ঘটেছে। মানুষ যেমন নতুন শব্দ আনে, তেমন কিছু পুরাতন শব্দ নিয়েও যায় সঙ্গে করে।’ ভেবে দেখলে ঠিকই, মানুষের সঙ্গে কিছু শব্দ আসে, চলেও যায়। এইরকম অনেক জায়গা আছে নতুন চিন্তা দেয়।
আরেকটা জায়গা পড়ি, মহাকাব্যিক কেন বলছি এখানে বোঝা যাবে। বলা হচ্ছে, ‘কিছু কিছু গন্ধ এখন জীবনের সুবাস দেয়।’ এরপর আলু পঁচার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখছে: আলু পচার গন্ধটা খুব তীব্র, এটা মানাতে একটু সময় লাগে। গন্ধটা এখন এমনভাবে মর্মে লেগেছে যে আলুর তরকারি দেখলেও নাকে লাগে, খেতে পারি না। খুবই স্বাভাবিক। এটুকু আসলে ভূমিকা, এরপরই লেখা হচ্ছে আসল কথাটা: জীবনে কিছু কিছু ঘটনা থাকে এমন গন্ধের মতো, স্মৃতির সেস্নটে এমনভাবে মেখে যায় যে শত ডাস্টার ঘষেও মোছা যায় না। অনেক বছর আগে একদিন রাতে ঘুম ভেঙে দেখেছিলাম আব্বার হাতে হুড়কো, এক পাশ ধরে কাকুতিমিনতি করছে মা। দৃশ্য এটুকুই, তা-ও আবছা অন্ধকারে দেখা। তিনটা জোনাকি পোকা পথ ভেবে জানালার ছিদ্র দিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল, আলোটা ওদেরই। কিছু কিছু আলো থাকে অন্যের, আমরা সেই আলোতে ভুল করে চোখ মেলে দিই। সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত কি না জানি না, এরপর থেকে যখনই মা আর বাবাকে একা হতে দেখেছি, স্মৃতির সেই হুড়কোটা চলে এসেছে। ভয়ে কেঁপে উঠেছে শরীর। এখানে পচা আলুর গন্ধ ধরে এই দৃশ্যের কথা বলা হচ্ছে; অন্যের আলোতে ভুল করে কিছু দেখে ফেলা। এই জায়গাগুলো লক্ষ্য করতে হবে। এই কারণে বলি উপন্যাসের কাহিনি মুখে বলার বিষয় না। উপন্যাসের বিষয়বস্তু বলে কিছু হয় না। অনেক অনেক ছোট ছোট বিষয় নিয়ে একটা বয়ান তৈরি হয়।
এবার একটা অংশ তুলে ধরছি যেখানে দাদির পাশে প্রটাগনিস্ট আলেক ওরফে আলী শুয়ে পড়ে। দাদি ওকে স্বামী ভেবে ভুল করে। তখন কিশোরটা ভয় পেয়ে যায়, ভবিষ্যতে যদি সে সত্যি সত্যি মারা গিয়ে বর্তমানে না ফিরতে পারে! এরপর সে দাদির বিছানা থেকে উঠে ভাবতে বসে, একটা দীর্ঘ অংশ তুলে দিচ্ছি, কারণ এই অংশটা মহাকাব্যিক:
এভাবে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে জীবনকে খুব আদর করতে ইচ্ছা করে। উঠানে গোলাঘরের চালার নিচে বসে থাকা ছাগলটার পাশে বসে ওর পিঠে হাত বোলাতে থাকি। পায়ের কাছে একটা কুলের চারা ফুটেছে, অন্যসময় হলে তুলে দিতাম, কচিপাতাগুলো তালুতে ডলে ডলে সবুজ রক্ত বের করতাম। আজ বসে থেকে চারাটার মাথায় হাত বোলাই। পাশে বসে থাকা ছাগল কিংবা চারাগাছটি কেউই হয়তো জানে না জীবনের অর্থ কী, জীবনের সার্থকতা কোথায়; ওরা জানে না যে দেশে বাস করে সেই দেশের নাম, বোঝে না ওদের ধর্ম কী, ওরা ধনী না গরিব! ওরা কখনই জানবে না, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে চলেছে অনন্ত, লাটিমের মতো অনবরত, যখন ওরা ঘুমিয়ে থাকে তখনো। ওরা জানে না ফলগুলো সব গাছ থেকে পাখির মতো আকাশে না উড়ে, মাটিতেই কেন পড়ে। ওরা জানে না, পৃথিবী যেমন সৃষ্টি হয়েছে, তেমন ধ্বংসও হতে পারে।…চারাগাছটি যে অনাথ, পৃথিবীর সব গাছ যে জন্ম থেকে অনাথ, সেটি কি গাছগুলো বোঝে? কত অল্প বুঝেই কত চমৎকার জীবন ওদের! আমার হিংসা হয়।
অসাধারণ, অতুলনীয়। জীবনকে এইভাবে আদর করা, প্রকৃতির প্রাণকে এইভাবে ভালোবাসা, ভাবা যায়? এই উপন্যাসে অনেক জায়গা আছে উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। আমি একবার একটা গদ্যে লিখেছিলাম, মহৎ সাহিত্য মানেই উদ্ধৃতিযোগ্য সাহিত্য। অল্প বয়সে লিখেছিলাম। আমরা যারা সাহিত্য পাঠ করি নিজের অজান্তেই অনেক টেক্সটের কিছু কিছু অংশ মনে রাখি। যেমন উপন্যাসের একটা বাক্য এরকম : ‘নারী রক্ষা করা নদী রক্ষা করার মতোই কঠিন কাজ।’ বাংলাদেশে কে না বুঝবে নদী রক্ষা করা কত দুঃসাধ্য একটি কাজ। নারীদের রক্ষা করাও তেমনই কঠিন। আরেকটা জায়গায় বলা হচ্ছে, ‘পাপ ছাড়া সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় না।’ বোনের ব্রা নিয়ে ফ্যান্টাসি করার পর তার মধ্যে পাপবোধ তৈরি হয়েছে। এবার তার নামাজ পড়তে গিয়ে মনোযোগটা পাল্টে গেছে। তারপর সে বলে, মনে হয়, এতদিনে নামাজ পড়ার মধ্যে একটা অর্থ খুঁজে পেয়েছি। পাপ ছাড়া সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় না। যে যত পাপী তার সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার সম্পর্ক তত বেশি ক্রিয়াশীল। এটার সঙ্গে বাইবেলের একটা ভার্সের মিল খুঁজে পেয়েছি, যেখানে বলা হচ্ছে যে, যত ইচ্ছে পাপ করো, কিন্তু অত পাপ তুমি করতেই পারবে না যে ঈশ্বর তোমাকে ক্ষমা করতে পারবে না। তলস্তয়ের ‘আনা কারেনিনা’ উপন্যাসের এক চরিত্র বলেছিল, তার মনে কোনো শান্তি নেই, কারণ এত পাপ সে করেছে ক্ষমা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তখন তার বন্ধু তাকে বলছে, ওইভাবে ক্ষমা চাও, বলো, ‘আমার প্রাপ্যতার মাপে নয়, তোমার করুণার মাপে আমাকে ক্ষমা করো।’
মানে তার তো প্রাপ্যতা নাই, কিন্তু ঈশ্বরের করুণাও তো অন্তহীন। প্রাপ্যতার মাপে না-হয় না-ই পাওয়া গেল, অন্তত তাঁর করুণার মাপে কি ক্ষমা সম্ভব নয়? আনা কারেনিনার অন্তর্গত বিষয়ও কিন্তু পাপ। খ্রিস্টধর্মানুযায়ী আনা কারেনিনাও পাপী। তবে এতটা পাপী নিশ্চয়ই নয় যে ক্ষমাই পাওয়া যাবে না!
আরেকটা জায়গায় লেখা হয়েছে, বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড়ো আনন্দ হলো হাঁটা, পাখির জন্য ওড়া, মাছের জন্য সাঁতার, গাছের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা, অনড়। একই জীবন অনেক পথে আনন্দ খুঁজে হয়রান— যে জীবন মাছের, যে জীবন গাছের, সেই জীবন মানুষেরও। নিজেরা মানুষ বলে আমরা মানুষের জীবনকে অনেক মূল্য দিই। জীবনের প্রতি এই পক্ষপাত আমাদের কাছে অন্যের জীবনকে তুচ্ছ করে তোলে। আমার যেমন লাইকার কথা মনে হয়।
এই অংশটা তো কবিতা। আমি চাঁদে অভিযান নিয়ে লিখতে গিয়ে লাইকার প্রসঙ্গ এনেছিলাম। আমরা লাইকার কথা জানি, কিন্তু জানা আর লেখার মধ্যে পার্থক্য হলো, আমরা তখন সেটার মধ্যে জড়িয়ে যাই। আমি লাইকার প্রসঙ্গ লিখতে গিয়ে বারবার থেমে গিয়েছিলাম, লিখতেই পারছিলাম না। আগে থেকে জানতাম কিন্তু লিখতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছি। কত বড়ো অপরাধ মানুষের! মানুষের মহাকাশ অভিযানে কিংবা মহাবিশ্ব জয়ে লাইকা হলো প্রথম শহিদ। এই উপন্যাসে লাইকার প্রসঙ্গটা এনে ভালো হয়েছে।
সমষ্টি বা জাতিগত স্মৃতির কথা এসেছে। বাঁশিওয়ালা মজ্জেল বলেছে, মানুষ যেটা বলে সেটা সমাজের কথা, সমষ্টির ধারণা; তার মধ্যে ব্যক্তির সত্য থাকে না। আরেক জায়গায় বলেছে, সমষ্টির স্মৃতি প্রকৃতির মতোই। তার নিজস্ব একটা ক্ষমতা আছে। এই কথাগুলোও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি একটা লেখায় বলেছিলাম যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কখনো হারাবে না, কারণ এটা সমষ্টির স্মৃতির অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেছে। কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং যেটাকে কালেক্টিভ চেতনা বলেছেন।
প্রটাগনিস্টের যে সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টশন সম্বন্ধে পাঠক হিসেবে আমরা তখনো জানি না। কিন্তু ওর ফুলবোনের মেয়েটা মারা যাওয়া পর বলে,
তারপরও আমি জানি, বাড়ির সবচেয়ে বড়ো ঘটনা এটা নয়, কোনোটাই না। আমি জানি, সবাই ভালো করেই জানে, এ বাড়ির সবচেয়ে বড়ো ঘটনা কোনটা, কিন্তু কেউ আমাকে সেটা বলে না, বলবে না। সবচেয়ে বড়ো ঘটনাটা আড়াল করতে তারা আরও অনেক ঘটনার কথা বলবে যা হয়তো তারা নিজেরাই ভুলে গেছে। কিন্তু যে ঘটনা তারা কখনো ভোলেনি, কখনো ভুলতে পারে না আর কখনো ভুলতে পারবে না ভেবে আতঙ্কিত থাকে সবসময়, সেই ঘটনার কথা কেউ মুখে তোলে না; না বললেও আমি বুঝি, বাড়ির সবচেয়ে বড়ো ঘটনাটি আমার অন্তত অজানা থাকার কোনো কারণ নেই, সুযোগই নেই;...
এর পরের অংশটা—
আমার নিশ্বাসে নিশ্বাসে ঘটনাটির উত্তাপ অপ্রকাশ্য আর্তনাদ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বাড়ির প্রতিটা কক্ষে-কলপাড়ে-হেঁশেলে-গোরুর গোয়ালে; মেখে থাকে বিছানায়-বালিশে-গোবর লেপে দেওয়া দেওয়ালে, উঠানে শুকাতে দেওয়া কাপড়ে কাপড়ে। মিশে থাকে বকুলের ঘ্রাণে, কামিনির শুভ্র বুকে, কাঁঠাল গাছের শক্ত আস্তরণে, কলা গাছের পিচ্ছিল ত্বকে, জবাফুলের টকটকে বিষাদে।
এই যে এই বর্ণনাটা, এটা তো উপন্যাস, কিন্তু আমি চাইলে কবিতার মতো করেও পড়তে পারি। এইটা মহাকাব্যিক গদ্যের লক্ষণ। মহাকাব্যিক বর্ণনার মধ্যে এই ধরনের ছন্দ থাকে।
রাতের বেলা বাবা রেডিও শোনে, মা নামাজ শেষে কোরানশরিফ পড়তে বসে। একারকার বর্ণনাটাও মহাকাব্যিক—
নাটক হচ্ছে বেতারে। আব্বা কানের কাছে নিয়ে শোনে। মা তখন নামাজ শেষ করে কুরানশরিফ নিয়ে বসে। মজ্জেলের বাঁশির সুর তখনো শোনা যায়। দেওয়ালে হারিকেনের আলোয় মায়ের ছায়া দোলে। ঘরের মধ্যে আর্তনাদের স্বরে মায়ের কুরান তেলাওয়াত, বাইরে মজ্জেলের বাঁশির সুর, ঝিঁঝি পোকার ডাক, থেকে থেকে ব্যাং ডাকার শব্দ, মেঘ গুড়গুড়—সব শব্দ একসঙ্গে মিশে এমন একটা অদ্ভুত ঘোর তৈরি করে, মনে হয়, আমরা কেউ আর বেঁচে নেই, আমরা বেঁচে আছি গণস্মৃতিতে, অনেক দূর থেকে পৃথিবীর মানুষেরা আমাদের কথা স্মরণ করছে, কোনো মসজিদে বসে দোয়া ধরেছে অনাত্মীয় কেউ—নামগুলো ঠিকঠাক মিলছে না, একা কেউ কাঁদছে কষ্টে-বিচ্ছেদে। আমার মনটা হাহাকার করে ওঠে। ভেতরটা জ্বলেপুড়ে যায়। রাতের অন্ধকার ভেদ করে এক দৌড়ে পৃথিবীতে পৌঁছে দিই খবরটা—আমরা মরিনি, আমরা এখনো বেঁচে আছি। কিন্তু বেঁচে থাকার খবরটা যাদের দিই তারা সবাই মৃত, মৃতরা প্রার্থনা করছে জীবিতদের জন্য।
এই যে বর্ণনাটা, পরিবারটা বেঁচে আছে, কাউকে বলতে পারছে না, এই বর্ণনাটা অসাধারণ। একটা জায়গা লেখা হচ্ছে, মানুষ কি শ্রদ্ধায় কোনো পিঁপড়াকে পথ ছেড়ে দাঁড়িয়েছে কখনো? একটা বাক্যই একটা প্যারাগ্রাফ। এই বাক্যটা পড়ার পর স্বাভাবিকভাবেই চোখটা বন্ধ করে ভাবতে হবে। এরকম অনেক জায়গা আছে এই উপন্যাসে। আমি বিচ্ছিন্নভাবে কিছু উল্লেখ করে যাচ্ছি। যেমন এই অংশটা: হাঁসের বাচ্চাগুলোকে মা ছেড়ে দিতেই কলপাড়ের দিকে ছুটে যায়। বাবলাফুলের মতো হলুদ ছানাগুলোর শরীরে দুদিন পর রং ধরতে শুরু করবে। এর নাম জীবন। একবার জীবন ছুটে গেলে, সেই জীবনের আর কোনো মূল্য থাকে না। যে মৃত তার জন্য হাহাকার থাকে, আকাক্সক্ষা থাকে না। আমি মরে গেলে কি মা-ও বড়ো বোনের মতো মুক্তি পাবে? মৃত্যু সম্পর্কে এই ধারণাটা আমাকে মৃত্যুর সিদ্ধান্ত গ্রহণে যেমন আশ্বস্ত করে, তেমন ব্যথিতও করে। এরপর স্বেচ্ছামৃত্যুর প্রসঙ্গ আসে। একজনের কথা বলা হয় যে বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসে। এই ফিরে আসার অপমানটা তার জন্য আরো অসহনীয় হয়ে ওঠে। সেই লোকটা তখন বলে, মানুষজন যখন তোমার জন্য মরা কান্না কেঁদে ফেলে, তখন যত আপন মানুষই হোক, আর চায় না তুমি বেঁচে ওঠো। তখন বেঁচে উঠলে দুনিয়া আরও বিস্বাদ হয়ে ওঠে, ততোধিক বিষাদময় হয়ে ওঠে সম্পর্ক। কী ভয়াবহ! কত সূক্ষ্ম সাংঘাতিক অনুভূতিকে ছুয়ে গেছে।
আত্মহত্যার প্রসঙ্গে এসে বলা হচ্ছে, হুজুর বলেছেন যে যেভাবে আত্মহত্যা করবে জাহান্নামে তার সাজাটা সেভাবেই রিপিটেশন আকারে হবে। এটা শোনার পর সে চিন্তা করছে সে যদি ছাদ থেকে লাফ দেয় তাহলে মৃত্যুর পর তাকে অনন্তকাল ছাদ থেকে লাফ দিতে হবে। মোজাফ্ফর লিখেছে এভাবে:
এটা একবার বা দুবার ঘটলে গুরুতর কোনো শাস্তি হতো না। কিন্তু একজন মানুষ অনন্তকাল ছাদ থেকে পড়েই যাচ্ছে, পড়েই যাচ্ছে—পড়ছে, থেঁতলে যাচ্ছে শরীর। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার থেঁতলে যাচ্ছে। আবার পড়ছে... ভাবতেই আমার গা-টা গুলিয়ে ওঠে, মাথাটা চক্কর কাটে। অসম্ভব!
অর্থাৎ পড়াটা শাস্তি না, কিন্তু একই ঘটনার এই রিপিটেশনটা অসহনীয়, এটাই মূলত শাস্তি। এই অংশটা পড়তে পড়তেই তো বিরক্তিতে পাঠকও টায়ার্ড হয়ে যাবে। এই মনোটোনাস ব্যাপারটাই নরক।
এই যে দাদির মৃত্যু, দাদি মরেনি কিন্তু বলা হচ্ছে দাদির শরীরের মধ্যে জিন ঢুকে সে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। এরপর নিঃশ্বাস নেওয়া অবস্থাতেই শতবষীর্ দাদিকে কবর দেওয়া হচ্ছে। পরিবারের লোকজন কি পরিমাণ বিরক্ত তাঁর বেঁচে থাকার ওপর যে জীবিত অবস্থাতেই জানাজা পড়িয়ে কবর দিয়ে দিচ্ছে। কী ভয়ঙ্কর! জিনের এই ঘটনা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। কারণ এখানে অন্য প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “এই বিশ্বাস পূর্বকাল থেকে প্রবাহিত হলে নতুনভাবে পরখ করার দায় বা তাড়না কোনোটাই আর থাকে না।” এরপর ‘কখনো কখনো চলে যাওয়ার চেয়ে ফিরে আসা বেদনার।’ এই কথাটি বলার পর আরেকটি ভয়াবহ প্রত্যাবর্তনের গল্প শোনানো হয়। জীবিত দাদির কবর দেওয়ার চেয়ে সেটা কম বেদনার না। এই বেদনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে মায়ের ওই ঘটনাটির কথা বলা হচ্ছে। রান্নাঘরে ইঁদুরের কল পেতেছে, ইঁদুর ধরাও পড়েছে কিন্তু সেই ইঁদুর আর মারতে পারে না। জ্বালানি ঘরের নিচে কলের মধ্যেই নিয়মিত খাবার দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। আরেকটা জায়গায় লিখেছে,
স্কুল নেই, বাড়িতেও মন টেকে না, সকাল-সন্ধ্যা মাঠে গিয়ে পড়ে থাকি। পৃথিবীর এদিকটাতে জীবন অনেক বেশি সবুজ, অকৃত্রিম, আনন্দময়। এদিককার পৃথিবী মানুষের পৃথিবী নয়। জীবন এখানে খেলা করে দূর্বাঘাসের ডগায়, বাবলাফুলের হলুদে, ঘাসফড়িঙের আলোছায়ায়। এদের অতিথি হয়ে বেড়াতে আসে হেমন্ত, বসন্ত। এখন যেমন শরত এসেছে।’ কি অপূর্ব বর্ণনা! জীবন এখানে মানুষের মাঝে না, দূর্বাঘাসের ডগায় খেলা করে। আর এদের অতিথি হয়ে আসে শীত হেমন্ত।
এরপর বলা হচ্ছে:
একা থাকার অভ্যাস তৈরি হলে আর একা থাকার সুযোগ থাকে না। প্রকৃতি তখন একা থাকতে দেয় না, কথা বলতে শুরু করে। আমার মনে হয়, পৃথিবীতে গাছ একমাত্র সবার কথা বোঝে, মানুষের কথাও বোঝে, কারণ প্রকৃতিতে গাছই সবচেয়ে একা।…প্রতিটা জীবনই এক, কিন্তু একেক জীবনের একেক গল্প। প্রতিটা জীবনই আসলে কতগুলো গল্পের সমষ্টি। গল্পের কোনো ভালোমন্দ নেই, ভিন্নতা থাকতে পারে। ...আলাদা আলাদা গল্পের প্রয়োজনেই আলাদা আলাদা জীবন, এটাই পৃথিবীর নিয়ম, এই নিয়মের কারণেই পৃথিবীতে নতুন নতুন প্রাণ আসে। আগে মনে করতাম, প্রাণ আছে বলে গল্প; এখন বুঝি, গল্প আছে বলেই প্রাণ। জলের গল্প তখনই থাকে যখন সে জলে মাছ ভেসে ওঠে। জীবন আর জড় তখন আর আলাদা থাকে না।
সত্যিই তো, এভাবেও তো ভাবা যায়! জীবনকে যে কতরকমভাবে দেখা যায়, কতরকমভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করলো এই উপন্যাস। আখ্যান এখানে প্রধান নয়, চিন্তা এবং দর্শনই প্রধান। আখ্যানের অভিনবত্ব দিয়ে লেখক তাঁর পাঠককে চমৎকৃত করতে চাননি এ উপন্যাসে, চেয়েছেন তাঁর চিন্তা আর দর্শনের সঙ্গী করতে। এবং এমন এক গতিশীল-প্রাঞ্জল-ঋজু-স্মার্ট-অনিন্দ্যসুন্দর গদ্যে সেসব বর্ণনা করেছেন যে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। এই কারণে বলছি যে, এটা একটা স্পিরিচুয়াল জার্নি।
জার্নিটা পরিপূর্ণ হয় যখন বেদেরা গ্রামে আসে। এই অধ্যায়টা হলো উপন্যাসের ক্যাথারসিস। এটাই টার্নিং পয়েন্ট। বেদেদের নিয়ে বলতে গিয়ে বলা হয়েছে, স্থায়ী ঘরসংসার বলে কিছু নেই। জলে-স্থলে ভেসে ভেসে সংসার করা জীবন ওদের। যখন যেখানে যায়, সেখানেই জীবনের কিছু ক্ষয়, কিছু স্মৃতি রেখে চলে যায়। মানুষ তো পাখি, পা দুটো ডানা, মাটির পৃথিবী এক উন্মুক্ত আকাশ, মানুষ এই আকাশে পা রেখে ওড়ে।
বেদে আসার পরে এই প্রটাগনিস্টের জীবনবোধ বদলে যায়। বেদে-সর্দার মালদাদা বলেন, অবশ্যই দুঃখের মাঝে সুখ আছে। অবশ্যই দুঃখবোধই জীবনের নিয়তি। এরপর সে বুঝতে পারে বেদেদের জীবনও নিয়তিবাদের বাইরে নয়। অথচ সে ভেবেছিল বেদেদের সঙ্গে গিয়ে এই দুর্বিষহ জীবন থেকে সে মুক্তি পাবে। কিন্তু বেদে-সর্দারের মতে এই ভাসমান গোষ্ঠীও অভিশপ্ত, সেই আদমপুত্র হাবেল-কাবেলের সময় থেকে। এক ভাই আরেক ভাইকে হত্যা করেছিল, পৃথিবীর প্রথম খুন। বেদেরা হলো সেই খুনির উত্তরসুরী। তারা এইভাবে অভিশপ্ত হয়েছিল যে, যে ভূমিতে তারা রক্ত ঝরিয়েছে সেই ভূমি কোনোদিনই তাদের ঘর হবে না। শুধু বেদে না, ঢোড়া সাপের মতো প্রাণীও অভিশপ্ত জীবন বয়ে বেড়াচ্ছে। এক সময় তাদের প্রচণ্ড বিষ ছিল, কিন্তু অভিশপ্ত হয়ে বিষ হারিয়েছে। এই কারণে একটা জায়গায় এসে বলা হচ্ছে, প্রত্যেকটা জীবন একটা অভিশাপের পরম্পরা। তাহলে সমাজ পরিবার থেকে বহিষ্কৃত এই প্রটাগনিস্ট মুক্তি খুঁজবে কোথায়? মালদাদা বলে, নিজেক জানোক। নিজেক শরীরকে জানোক। দুনিয়াত একমাত্র শরীলডাই তোমার, আর কিছুক না। সব মায়া। বাঁশিওয়ালা মজ্জেলও বলে, কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর নিজেকেই অন্বেষণ করতে হয়।
প্রটাগনিস্ট আলেক চাইলেও কিন্তু যাযাবর জীবনে যেতে পারছে না। বেদেদের সমাজে বাইরে থেকে কাউকে গ্রহণ করার রীতি নেই। তাতে বোঝা যায় আলেক ততটা অভিশপ্ত না। আবার যেতে যে পারছে না, এই কারণেই সে আরো বেশি অভিশপ্ত। কারণ যেখানে আছে সেখানে তার মুক্তি নেই। ফুলবোন ওকে আগেই বলেছিল, যে পৃথিবী থেকি অমোন তেজি সূর্যও চিরদিনের জন্যি পালাতি পারে না, সেই পৃথিবী থেকি আমাদের কারু মুক্তি নেই। ‘আমাদের’ মানে সে শুধু তার ভাইবোনদের কথা বুঝিয়েছিল সে, কিন্তু শেষে দেখা গেল কারোরই মুক্তি নেই, এমনকি সাপেরও। যে ছাগলটার কথা বলা হয়েছে, সেই ছাগলটাও অভিশপ্ত, তাকে যত্ন করে লালনপালন করে জবাই করা হবে। কুলের চারাটাও অভিশপ্ত জীবন নিয়ে জন্মেছে। এই ধরনের অনুভূতি, পর্যবেক্ষণ ও উদঘাটনকে আমি স্পিরিচুয়াল জার্নি বলি, এই জার্নিটা না হলে এটা সম্ভব না। এই উপন্যাস তো শুধু একজন মানুষের সেক্সুয়াল আইডেন্টিটির বিষয় না, আইডেন্টিটি এজ এ হোল। প্রতিটা চরিত্র এখানে অনুঘটকের কাজ করেছে।
এই কারণে বইটা শেষ করে শেষ পাতায় আমি লিখে রেখেছি: The writer has completed a wonderful spiritual journey through this novel and discovered that every life is a continuation of an unavoidable curse.



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন