নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিক আব্দুলরাজাক গুরনাহর সাক্ষাৎকার
|| আব্দুলরাজাক গুরনাহ ||
আব্দুলরাজাক গুরনাহ ১৯৪৮ সালে ভারতীয় মহাসাগরের কোল ঘেঁষে থাকা তানজানিয়ার জানজিবার দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে প্রেসিডেন্ট আবিদ কারুমের শাসনামলে আরব বংশোদ্ভূত নাগরিকদের নিষ্পেষণের মুখে তিনি ইংল্যান্ডে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তারপর থেকে তিনি ক্যান্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও উত্তর-উপনিবেশবাদী সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করছেন।
আব্দুলরাজাক গুরনাহর সাহিত্যে শরণার্থী জীবনের কথকতা বারবার উচ্চারিত হয়। তাঁর উপন্যাসে পূর্ব আফ্রিকার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি নিপুণতার সঙ্গে বিবৃত হয়ে আসছে। সত্য আবিষ্কারের প্রতি আত্মনিবেদন ও অতি সরলীকরণের প্রতি বিতৃষ্ণা গুরনাহর সাহিত্যরীতিকে করে তুলেছে অনন্য। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোর প্রতি তিনি অপরিসীম মমত্ববোধ প্রকাশ করেন এবং অনমনীয়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকেন।
নির্বাসনে থাকা অবস্থায় মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি শুরু করেন। গুরনাহর মাতৃভাষা সোহালি হলেও ইংরেজি তাঁর সাহিত্যের রচনার মাধ্যম হয়ে উঠে। আরবি ও ফার্সি সাহিত্য এবং কোরআন শরিফের সুরাগুলো তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির প্রথম দিকের প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যেও শেক্সপিয়ার থেকে শুরু করে নাইপল পর্যন্ত তাঁকে প্রভাবিত করেছে।
ফেলে আসা আবেগ ও স্মৃতি তাঁর সকল উপন্যাসের বিষয়বস্তু হিসেবে ঘুরে ফিরে আসে। মেমোরি অব ডিপারচার (১৯৮৭), পিলগ্রিমস ওয়ে (১৯৮৮) উপন্যাস দুটিতে নির্বাসিত জীবন ও স্মৃতিকাতরতার ভার কীভাবে মানুষের পরিচয় সংকটকে সংগ্রামমুখর করে তোলে তা বিবৃত করেছেন। ১৯৯০ সালে রচিত প্যারাডাইস গ্রন্থে তিনি পূর্ব-আফ্রিকার ইউসুফের কাহানি একদিকে যেমন করনাডের হার্ট অব ডার্কনেসের কথা মনে করিয়ে দেয়, অন্যদিকে কোরআনের ইউসুফ চরিত্রের সঙ্গে একটা সমান্তরাল যোগসাজশ তৈরি করে। অভিবাসী জীবনের আত্মপরিচয় ও আত্মবিকাশের কৌশল হিসেবে নীরবতা ও দূরত্বকে অবলম্বন করার সফল প্রয়োগ দেখানো হয়েছে তাঁর অ্যাডমায়ারিং সাইল্যান্স (১৯৯৬) এবং বাই দ্য সি (২০০১) উপন্যাসে।
আব্দুলরাজাক গুরনাহ তাঁর উপন্যাসে বহু-সংস্কৃতি ও মহাদেশীয় শরণার্থী মানুষের ভাগ্য এবং উপনিবেশবাদের ঘটনা প্রবাহকে একটা অনমনীয় ও সহানুভূতিশীল অনুসন্ধানের কৃতিত্বস্বরূপ ২০২১ সালে সাহিত্যে নোবেল সম্মাননায় অধিষ্ঠিত হন।
সাক্ষাৎকার || লেখার সমগ্র প্রক্রিয়াটাই আনন্দের || আব্দুলরাজাক গুরনাহ
বাংলা অনুবাদ || পলাশ মাহমুদ
আপনার শৈশব সম্পর্কে কিছু বলবেন? আপনার সাহিত্য পাঠ ও লেখালেখির প্রতি ঝোঁক কীভাবে তৈরি হলো?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: খুব সরলভাবে বললে, আমি গল্প ভালোবাসি। গল্পের প্রতি এই অনুরাগ থেকেই পড়ার প্রতি একটা আনন্দের অনুভূতি কাজ করত। আমাদের ছোটবেলা থেকেই গল্প শোনানো হতো। হয়তো সেখান থেকেই গল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বাচ্চারা যেহেতু নারীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেহেতু নারীরাই প্রথম গল্প শুনিয়ে থাকে। আমরা প্রথাগতভাবেই একান্নবর্তী পরিবারে বেড়ে উঠেছি। তাই বহু নারীর সঙ্গে আমাদের সময় কাটত। বেশিরভাগই চাচি বা ফুফু কিংবা ওই রকম সম্পর্কের কেউ। তারা যখন নিজেদের মধ্যে খোশগল্পে মেতে থাকত, আমরা হয়তো তাদের আশপাশে বসে খেলছি, আর তাদের বলা গল্পগুলো শুনে শুনে বড় হচ্ছি। এভাবেই আমাদের গল্পের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়। তারপর যখন বড় হয়ে পড়তে শিখি, তখন গল্পের বই আমাদের পড়তে দেওয়া হয়। সংখ্যায় ততো বেশি না হলেও যতো দূর মনে পড়ে, সোহিলি ভাষায় অনুবাদে প্রথম ঈশপের উপকথাগুলো পড়েছিলাম। এই বইটাই মনে হয় স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু স্কুলে পড়া আর সাহিত্যের রস আস্বাদন করার জন্য পড়া এক রকম পড়া নয়। স্কুলে পড়াটা সীমিত এবং একই গল্প বারবার পড়তে হয়। বাচ্চারা যেমন পড়ে; মানে, আমার নিজের বাচ্চাদের দেখেছি, একই গল্প প্রায় ২০ বার পড়েছে, তা-ও কোনো রকম একঘেয়েমি ছাড়া। তাই আমার মনে হয়, পাঠের আনন্দে পরিচিতি একটা বড় ফ্যাক্ট। জানাশোনার পর যখন কৌতূহল জায়গা করে নেয়, তখন পাঠের চর্চা পূর্ণতা লাভ করে। কারণ, তখন পঠন আপনাকে আনন্দও দেয়।
ছোটবেলা থেকেই কি ঈশপের গল্প আপনার প্রিয়?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: ঈশপের গল্প সত্যিই আমার অনেক প্রিয়। প্রথম দিকে এটা প্রিয় হওয়ার আরেকটা কারণ হলো, ছোটদের গল্পের বইয়ে প্রচুর চিত্র দিয়ে সাজানো থাকত। একটা ছবির কথা এখনো চোখে ভাসে, যেখানে একটা শিয়াল আঙুরের দিকে ঝাঁপ দিয়ে আছে। এই ছবি আমার মনে চিরতরে অঙ্কিত হয়ে রয়েছে।
আপনি কি মনে করেন, ছেলেবেলায় যে বইগুলো পড়া হয়, সেগুলোর একটা বিরাট ছাপ মনের ওপর থেকে যায়?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: হ্যাঁ, ছোটবেলায় শোনা কিছু গল্পও স্মরণীয় হয়ে থাকে। পড়ার অভিজ্ঞতা ও তার স্মৃতি সব সময় মনে না-ও থাকতে পারে। তবে কিছু গল্প দীর্ঘদিন মনে দাগ কাটে। কোনো কোনো লেখকের জন্য ওই গল্পগুলো তার লেখার প্রেরণা হয়ে থাকে। কিছু গল্প আবার পড়ার জন্য ফিরে যেতে হয়; যেমন কামারালজামান ও রাজকন্যা দৌরার গল্প। এই গল্প এখনো আমি মনে করতে পারি এবং পছন্দ করি। যখন এগুলোর বড়দের সংস্করণ পড়বেন, আপনি আরও উপভোগ করবেন। এই গল্পগুলো ছোটবেলায় যেভাবে বুঝেছেন, তার চেয়ে জটিল প্রকৃতির। তার মানে, ছোটবেলায় পড়া গল্পগুলোর বহুধা স্তর আছে, যেগুলো আপনার বড়বেলায় পাঠের রোমাঞ্চ এনে দেয়।
ছেলেবেলায় আপনি কী হতে চেয়েছিলেন। আপনি কি লেখকই হতে চেয়েছিলেন, নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: আমাদের সময়ে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেওয়া সম্ভব ছিল না। আমি এমন কাউকে জানতাম না, যে কিনা শুধু লিখে জীবিকা অর্জন করেছে। তাই লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেওয়া চিন্তার মধ্যে ছিল না। আমার মনে হয়, মহাকাশচারী বা তেমন কিছু একটা হতে চেয়েছিলাম। এই পেশা কেমন বা এই পেশার কাউকে তখন জানতাম না। মাঝে মাঝে আপনি শুনে থাকবেন, কোনো শিশু হয়তো বলছে, বড় হয়ে সে ট্রেন ড্রাইভার হতে চায় অথবা কেউ কম্পিউটার প্রোগ্রামার হতে চায়। কিন্তু আমি তেমন করে কিছু হতে চেয়েছিলাম বলে মনে পড়ে না। আমার মনে হয়, যেকোনো কিছু হওয়ার জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করে রেখেছিলাম। আমি শুধু বিদ্যালয়ে যাওয়া পছন্দ করতাম, শিখতে ভালো লাগত আর এ রকম সব কাজ করতে খুব উপভোগ করতাম। আমার মনে হতো, এমন করেই যেন দিন চলে যায়। জীবন কেটে যায়। সম্ভবত আমি এটাই হতে চেয়েছিলাম—শুধুই একজন ছাত্র।
আপনার বেড়ে ওঠা আপনাকে কীভাবে গড়ে তুলেছে এবং লেখক হিসেবে তৈরি করেছে?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: আমার বেড়ে ওঠা আমাকে কতটা গড়ে দিয়েছে, তা ঠিক মেপে বলা যাবে না। মনে হয়, বেশির ভাগ মানুষই তা পারে না; যদি না সে আদ্যোপান্ত একজন অসুখী মানুষ হয় বা তেমন কিছু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। এটাও মনে করি, আমার বেড়ে ওঠার জায়গা থেকে দূরে না থাকলে, এই ভাবনা আমার মনে এতটা সুতীব্রভাবে কাজ করত না। কিন্তু মনে হয়, বোঝাপড়ার এই প্রক্রিয়ায়, অথবা ব্রিটেনে এসে ভিনদেশি হয়ে যাওয়ার মাঝে থেকে আমাকে একটা কাজ করতে হয়েছে, তা হলো আমার বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে দেখতে হয়েছে। আমি কোথায় বড় হয়েছি। আমাদের বিশ্বাসগুলো কেমন ছিল—সবকিছু ফিরে দেখতে হয়েছে। এই কারণে বলি যে, আমি যদি আসলেই গভীর করে কোনো কিছু ভেবে থাকি, সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারি না। মনে হয়, বিচ্ছিন্নতা কিংবা দূরত্ব ফেলে আসা জিনিস নিয়ে আরও তীব্রভাবে, আরও বিস্তৃত আকারে ভাবতে বাধ্য করে। সম্ভবত শুধু কোনো ঘটনাকে আরও সূক্ষ্ম চোখে দেখাতে বাধ্য করে না; বরং আপনার যাপিত জীবনের পুরো পরিক্রমায় আপনার অংশগ্রহণ ও অবস্থানকে যাচাই করতে বাধ্য করে। তাই বলব, আমার বেড়ে ওঠার পরিক্রমা আমাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। ব্যাপারটা মন্দ নয়, আবার ধ্বংসাত্মকও নয়। তবে একটা আরোপিত প্রতিফলন কাজ করে বৈকি।
আপনি কি মনে করেন, লেখালেখির মাধ্যমে জীবনের নানা সংকট মোকাবিলা করা যায়। অথবা আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার পরিক্রমাকে অবিকল প্রকাশ করতে পারে?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: আমি লেখালেখিকে বিশুদ্ধ হাসিখেলার বিষয় বলে মনে করি না। জীবনে সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। এই বিষয়ে নোবেল বক্তৃতায় কিছু কথা বলেছি। আমি যখন জগৎ নিয়ে ভাবতে বসি, তখন কিছু নিশ্চিত অনুজ্ঞা মেনে চলতে হয়। এই অনুজ্ঞার বশবর্তী হয়ে লিখতে শুরু করেছিলাম। লেখা চালিয়ে গেছি; কারণ, প্রাত্যহিক জীবনে অনেক ব্যাপার আছে, যেটা নিয়ে আমাদের কথা বলতে হয়, নিরপেক্ষ নিরীক্ষা করতে হয়। লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার জন্য এই দিকটাই আমার জন্য যথার্থ অনুপ্রেরণা। যা দেখি, তা নিয়ে কিছু বলতে চাই বলেই লিখি। এমনভাবে লিখতে থাকি, যেন লিখতে লিখতে অস্পষ্ট বিষয়গুলোকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। আমি যা বুঝেছি, তাকে অন্যদেরকে জানাতে পারি; যদি তারা জানতে আগ্রহী হয়। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সবার কাছে আরও বিস্তৃত করে, আরও বোধগম্য করে প্রকাশ করতে লেখালেখি একটি অনন্য মাধ্যম। কিন্তু এই প্রকাশ তথ্যবহুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে হবে এমন নয়। আমরা যা জানি, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও হবে। মাঝে মাঝে আমরা একটা লেখা পড়ি এবং অন্যদের সঙ্গে বিনিময় করি। মাঝে মাঝে এখানে আলোর এমন ছটা থাকে, যা জগৎকে নতুন করে দেখতে বা বুঝতে সাহায্য করে। মাঝে মাঝে লেখালেখি এমন বিষয়কে উপস্থাপন করে, যা আমাদের নিজেদের বুঝতে সাহায্য করে। হয়তো শতভাগ বুঝতে পারি না। লেখালেখির প্রক্রিয়া এবং ওই লেখা পাঠের প্রক্রিয়ার সঙ্গে অনেক জটিল কঠিন বিষয় জড়িয়ে থাকে। আমি যখন কথা বলি, তখন শুধু লেখক হিসেবে নয়, পাঠক হিসেবেও বলি। এটাই লেখালেখি প্রক্রিয়ার একটা উপভোগ্য ও মজার দিক। তার মানে, আপনি শুধু নিজের জন্য লেখেন না, নিজের সঙ্গে কথা বলেন না; বরং এক কাল্পনিক পাঠকের সঙ্গেও কথা বলেন। যদিও আমার কাল্পনিক পাঠক ঠিক কারা, তা নির্দিষ্ট নয়। আপনি শুধু আপনার দিনলিপিতে নিভৃতে লিখে যাবেন। আমি জানি, এই বিষয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলব। তাই জগতে কী ঘটে চলেছে, তা নিয়েও কথা বলি। হতে পারে, এটা গল্পের আঙ্গিকে বলি। কিন্তু গল্প যেমন জগতের সংকট ও অন্যায্যতাকে প্রকাশ করে, তেমনি জীবনের প্রেম ও বেদনাকেও প্রকাশ করে।
সাহিত্যের বৈচিত্র্য কতটুকু দরকারি বলে মনে করেন?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: আপনার থেকে ভিন্ন মানুষ কীভাবে জীবন যাপন করে, তা বুঝতে; তাদের কী প্রেরণা দেয়? কী তাদের আত্মশক্তি দেয়? তা জানতে; কী তাদের সুখী করে ? কী তাদের দুঃখ দেয়? তা বুঝতে অন্য মানুষের জীবনকে জানতে হবে। আমার কাছে এই বিষয়টা খুব সহজ ও সরল। অন্য মানুষের জীবনকে জানার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, তাদের শুনতে হবে, তারা কী বলতে চায়। অন্যদের জীবনকে দৃষ্টির বাইরে রাখা যাবে না কিংবা দূর থেকে মায়ার স্বরে বলে গেলে চলবে না। তাই দূরদেশ থেকে লেখা, অন্ততপক্ষে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লিখতে হবে। এটা হতে পারে সাংস্কৃতিক, সামাজিক কিংবা লৈঙ্গিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। এই বৈচিত্র্যময় লেখালেখি অন্য মানুষ কী বলতে চাইছে, তা জানার সর্বোত্তম উপায়।
অন্য মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা কিংবা অন্য মানুষের জগৎ ও সংস্কৃতিকে জানার জন্য সাহিত্য কি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: বলতে দ্বিধা নেই, সাহিত্য বিভিন্ন রকম কাজ করে। সাহিত্য আমাদের নানাভাবে আটকে রাখে। কারণ, আমরা সাহিত্য থেকে একধরনের আনন্দ আস্বাদন করি। বলা যায়, একপ্রকার জটিল পরিতুষ্টি লাভ করি। আপনি কী পড়ছেন, তার ওপরও কিছুটা নির্ভর করে। সাহিত্য সবচেয়ে ভালো যে কাজটা করে, তা হলো এটা আমাদের জন্য সংবাদ তৈরি করে। আমাদের সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলে। অতি সাধারণ মতবাদকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। যে মতবাদের সঙ্গে আমরা সানন্দে বসবাস করে আসছি। এই বিচারে অনেক বিষয়ে আবার জটিলও করে তোলে। আমি সাহিত্যকে অনেক জটিল জটিল বিষয়কে মোকাবিলা করতে দেখেছি। সাহিত্য থেকে অনেক কিছু শিখেছি। আনন্দরস আস্বাদন করেছি। অনেক কিছুকে চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছি। তবে এটা নির্ভর করে আপনি কোন কোন বিষয় চ্যালেঞ্জ করতে নিজের মনকে খোলা রেখেছেন, মনকে তৈরি করেছেন। চ্যালেঞ্জ প্রতিরোধ করতে গিয়ে মানুষ কিন্তু খুবই কঠিন রূপ ধারণ করতে পারে।
আপনার লেখার আইডিয়া কোথা থেকে পান?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: কখন কী লিখতে হবে, তা নিজেই আপনার কাছে এসে ধরা দেবে। কষ্ট করে খুঁজতে হয় না। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, পৃথিবীতে কিছু লেখক আছে, তারা কী লিখবে, তার সংখ্যা খুব সীমিত। এই লেখকেরা খুব চিন্তা করে করে লিখে থাকেন। আমার এটাও মনে হয়, কিছু বিষয় আছে, যেটা বারবার লেখকের কাছে ঘুরেফিরে আসে। কিছু লেখা আছে, যা লিখতে গেলে বিশেষ রকম অভিজ্ঞতার দরকার হয়। এমন বিষয় আছে, যা আপনাকে এমন অস্থির করে রাখবে যে আপনি আপনার লেখা দিয়ে তাদের প্রকাশ করতে বাধ্য হবেন। এমনভাবে কথা বলবেন, যাতে অন্যরা বুঝতে পারে।
আমি খেয়াল করে দেখেছি, যখন কোনো উপন্যাস লিখে শেষ করি, তখন নিজে নিজে চিন্তা করি আর মনে মনে বলি, আরে, আমি তো এই বিষয় কিংবা ওই বিষয় নিয়ে কিছু লিখিনি। যদিও সঙ্গে সঙ্গে আবার নতুন করে লেখা অসম্ভব কিন্তু মনের মধ্যে এই চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে যে যখন সময় পাব, যখন পারব তখন আমি আবার লিখব। কারণ, আমার তো এই দিকটা নিয়ে লেখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু পারিনি লিখতে। হয়তো আমি এমনটি করতে পারতাম, হয়তো করতাম না। এই প্রক্রিয়ায় কোনো কোনো লেখার ভাবনা হারিয়ে যায় বা ঝরে যায়। কখনো কখনো লেখার আশায় ঝুলে থাকে। তারপর আপনি হয়তো কোথাও কিছু দেখলেন, কিছু পড়লেন, যা আপনাকে লেখার একটা স্পৃহা এনে দেয়।
তাই লেখার কোনো ভাবনা যখন মনের মাঝে এভাবে উঁকি দেয়, তখন আপনি ওই ভাবনা নিয়ে আরও বেশি পড়া শুরু করেন। নোট লিখে রেখে লেখার রসদ সংগ্রহ করেন। তাই লেখার আইডিয়া বিষয়টা এমন নয় যে ভাবনাটা আপনার মাথায় এলো আর আপনি ভাবলেন, আরে, আমি তো এটা নিয়ে লিখতে পারি। কেননা কী লিখবেন, তার একটা বিশেষ রূপ ধারণ করার আগ-পর্যন্ত অনেকটা সময়ের দাবি করে। হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো কিছু লিখে ফেলা যায় না।
উদীয়মান লেখকদের জন্য আপনার বিশেষ কোনো পরামর্শ বা উপদেশ কি আছে?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: একজন লেখককে সর্বোত্তম উপদেশ যেটা দেব, তা হলো শুধু লিখে যাওয়া। আর কোনো সহজ পথ নেই। এমন কোনো তরিকা নেই, যেটার ভিত্তিতে আপনি বলতে পারবেন, প্রতিদিন মাথায় ভর দিয়ে দুবার করে দাঁড়ালে আপনি লিখতে সক্ষম হবেন। আপনাকে আগে পিছে না ভেবে লিখে যেতে হবে। হতাশ হলে চলবে না। শুধু লেখাটা চালিয়ে যেতে হবে। আপনি যদি ভুল কিছু লিখতে থাকেন, তাহলে আজকে না হয় কালকে আপনি নিজেই তা বুঝতে পারবেন। নিজেকে প্রশ্ন করে আপনি কখনোই সঠিক উত্তর পাবেন না। একমাত্র লিখতে লিখতেই আপনি আবিষ্কার করবেন যে আসলেই আপনার লেখা সঠিক পথে এগোচ্ছে কি না। আপনার লেখা যদি যথার্থ না হয়, তাহলে শত চেষ্টা বা জোরাজুরি করে কাউকে আপনার লেখার প্রতি আকৃষ্ট করতে পারবেন না। এমন অবস্থা হলেও আমি লেখালেখি পরিত্যাগ করতাম না। আমার লেখা চালিয়ে যেতাম।
লেখালেখির কোন দিকটা আপনার সবচেয়ে প্রিয়?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: ও, ঠিক জানি না। হয়তো যখন লেখাটা শেষ হয়, সেই সময়টা। একটা লেখা যখন সমাপ্ত হয়, তখনই খুব ভালো লাগে। লেখার সমগ্র প্রক্রিয়াটাই আনন্দের। মাঝে মাঝে দিনের শেষ বেলায় যখন লেখাটা আবার কাল শুরু করব বলে গুটিয়ে রাখি। যখন লেখাটা ছেড়ে উঠে মনে হয়, যাক বাবা, লিখে আজকের দিনটা ভালোই কাটল। অথবা ভাবেন, কী চাপই না গেল। আগামীকালও এমন একটা দিন কাটাতে হবে। তবে সবচেয়ে ভালো লাগে যখন নিজেকে বলতে পারি। যাক, শেষ করলাম তবে।
আপনি সাধারণত কী ধরনের বই পড়েন এবং আপনার প্রিয় লেখক কারা?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: আমার পছন্দের লেখক একজন নয়; অনেকে আছেন। আমি তাঁদের নাম বলতে পারি, তবে সময়ের ভেদে ভিন্ন ভিন্ন লেখকের নাম আসতে পারে। যদি ১০ বছর আগে ফিরে যাই, আমি জানি কাদের নাম আসবে। তাঁদের মধ্যে হয়তো দু-একজন এখনো আমার প্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকান লেখকদের পড়তে ভালো লাগছে; যেমন: মাজা মেনজেস্টি, ইভন আদিয়াম্বো ওউর। এঁরা চমৎকার লিখে যাচ্ছেন। যদিও দুজনেই তাঁদের দ্বিতীয় উপন্যাস প্রকাশ করেছেন মাত্র। দুজনেই তাঁদের পেশার প্রথম স্তরে আছেন। এ ছাড়া আমি জে. এম. কোয়েৎজি, নাসিরুদ্দিন ফারাহ, মাইকেল ওনদাৎজে মতো আরও কিছু লেখকের লেখার ভক্ত। শুধু পছন্দের লেখক বলে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চাই না। যাঁরা চমৎকার লেখেন, আমি তাঁদের লেখাই পড়ি। সময় ও সুযোগ পেলেই আমি তাঁদের লেখা পড়ি। আপনি হয়তো তাঁদের লেখা সম্পর্কে শুনছেন, জেনেছেন; কিন্তু সময় করে উঠতে পারছেন না বলে পড়ছেন না। তাই আমার প্রিয় লেখকের সংখ্যা অনেক।
লেখা ছাড়া আর কী করে আপনি আনন্দ পান?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: ক্রিকেট খেলা দেখে। এই খেলাটা দেখতে ভালো লাগে। আমি বাগান করতেও পছন্দ করি। রান্না করতে ভালোবাসি। সংগীত পড়ে ও শুনে সময় কাটাতে আনন্দ পাই। অন্য সব মানুষ যা করতে পছন্দ করে, আমিও তেমন সাধারণ কাজ করতেই পছন্দ করি।
নোবেল প্রাপ্তির পর আপনার জীবনে কেমন পরিবর্তন এসেছে?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: ভালো। এই পুরস্কার অর্জন একটা বড় সম্মানের বিষয়। এই সম্মান পেয়ে আমি খুবই গর্বিত। এটা এমন একটা বৈশ্বিক ঘটনা, যেটার ফলে অসংখ্য মানুষ আমার সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এই পুরস্কার প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের প্রকাশকেরা নানা ভাষায় আমার বই ছাপার জন্য উৎসুক হয়ে ওঠে, যারা কখনো আমার বই ছাপেনি। তারা সাংবাদিকদের আমার বই সম্পর্কে লিখতে বলে। এই পুরস্কার পাওয়ার পর অনেক লোকের সঙ্গে কথা বলেছি। এই কারণে প্রচুর সময় ব্যয় করতে হয়েছে। পুরস্কার প্রাপ্তির পর কেমন পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গেলাম, তা ব্যাখ্যা করা মুশকিল। কারণ, তখন থেকে আমি শুধু নিজের সম্পর্কে বলে বলে সময় কাটাচ্ছি। একটা কথা শুধু বলতে পারব, তা হলো পুরস্কার ঘোষণার পর থেকে আমি কিছু লেখার সময় পাইনি। আমি জানি, এই ব্যস্ততা অল্প সময়ের জন্য। তারপর আবার লেখায় ফিরে যাব।
আমরা দেখেছি, নোবেল পুরস্কার মানুষকে ভীষণ উদ্দীপ্ত করে। আপনাকে কী বা কে বেশি অনুপ্রাণিত করে?
আব্দুলরাজাক গুরনাহ: যে বিষয় আমাকে তাড়িত করে এবং যা আমি দেখি, তাকে যদি সততার সঙ্গে লেখায় বলতে সক্ষম হই, তাই আমাকে বেশি অনুপ্রেরণা দেয়। শুধু চোখ খোলা রেখে দেখা জিনিস নয়, বরং চোখের সামনে ঘটে যাওয়া যে বিষয় আমাকে নাড়া দেয়, সেই বিষয়ে লেখার আগ্রহ জন্মে। আরও কিছু উদ্বেগের দিক আছে, যা নিয়ে লিখতে চাই—যেমন কেউ কোনো মানসিক আঘাত থেকে সুস্থ হয়ে ফিরলে তা নিয়ে প্রাণিত হই। তার মানে, আমি যে শুধু আশ্রয়প্রার্থী বা শরণার্থী নিয়ে উদ্বেগ দেখাই, ব্যাপারটা তা নয়। যে মানুষ জীবনের দুর্ভোগ ও দুর্দশামূলক ঘটনা থেকে স্বাভাবিক হয়ে জীবনের ডাক শুনে ফিরে আসে, আমি তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হই।
একটা পরিবার কীভাবে কাজ করে, এই প্রক্রিয়াও আমাকে আকর্ষণ করে। মানে, পরিবারে ক্ষমতা ও দরদ কীভাবে পাশাপাশি চলে, তাকে অবলোকন করি। অবশ্যই পরিবারগুলো একে অন্যকে ভালোবাসে। কিন্তু একই সঙ্গে পরিবারের মধ্যে ক্ষমতার কাঠামো কীভাবে কাজ করে, জানতে আগ্রহী হই। আমি এই বিষয়ে লিখতে আগ্রহী। এর জটিলতার জালকে কাছ থেকে দেখে লিখতে চাই। দেখতে চাই দয়ামায়ার কোটর থেকে নির্দয়তা কী করে জন্ম নেয়। এটা ঠেকানোর জন্য একধরনের আনুগত্য দরকার; যাতে নির্দয়মূলক কোনো কাজ করে আমাদের লজ্জার মুখোমুখি করে না দেয়। বিশেষ করে আমাদের বা অন্য সব সংস্কৃতিতে নারীদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়, তার কথা বলছি। এই ধরনের বিষয় নিয়ে লিখতে আমি তাড়না বোধ করি। যে বিষয় নিয়ে আমার কথা বলার তাড়না বোধ করি, তা নিয়ে লিখি। আরেকটা বিষয়, ওই সকল মূর্ত বিষয় যা ভীষণ রকম সুন্দর ও উপভোগ্য, তা নিয়ে লিখতে ভালো লাগে।
উৎস লিংক: https://www.nobelprize.org/prizes/literature/2021/gurnah/interview/
বাংলা কপিরাইট © pratidhwanibd.com
নোট: ২০২১ সালের সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী আব্দুলরাজাক গুরনাহর সঙ্গে নোবেল পুরস্কার জাদুঘরের পাবলিক প্রোগ্রামস বিভাগের কনটেন্ট ম্যানেজার ক্যারিন ক্লাসন। ২০২২ সালের ২৮ এপ্রিল সুইডিশ অ্যাকাডেমিতে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন