পথের পাঁচালী আমাকে সাহিত্যের পাঁচালীতে এনেছে: প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরী

অ+ অ-

 

নতুন গল্পের সন্ধানে শিরোনামে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক জার্নাল প্রতিধ্বনি আয়োজিত প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। বিগত ৩০ অক্টোবর ২০২৫-এ প্রকাশিত ১০টি দীর্ঘ তালিকার গল্প থেকে বিচারকমণ্ডলী সংক্ষিপ্ত তালিকার জন্য ৫টি গল্প বাছাই করেছেন। প্রতিধ্বনি এবার নতুনভাবে সংযোজন করেছেসংক্ষিপ্ত তালিকার পাঁচজন গল্পকারের বিশেষ সাক্ষাৎকার।

 

সাক্ষাৎকার || আমার বাবা দুর্ধর্ষ মাছ শিকারী ছিলেন || প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরী

প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় মনোনীত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন! সংক্ষিপ্ত তালিকায় আপনার নাম দেখার পর প্রথম অনুভূতি কেমন ছিল?

প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরী: কয়েক বছর আগে অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আমি নিয়মিত প্রতিধ্বনির খোঁজখবর রাখি। প্রতিধ্বনির ছাপা সংখ্যাও সংগ্রহ করেছি, পড়েছি। তাতে দেখেছি প্রতিধ্বনি বরাবরই মানসম্মত কাজ করে আসছে। মূলত প্রতিধ্বনির এই মানের দিকটি বিবেচনা করেই আমি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এ গল্প জমা দেই। তো প্রতিধ্বনির মতো এরকম একটি মাধ্যম কর্তৃক আয়োজিত গল্প পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান করে নেয়া তো লেখক হিসেবে এক ধরনের রিকগনিশন পাওয়া। ফলে সংক্ষিপ্ত তালিকায় নিজের নাম দেখার অনুভূতি ছিল বিশেষ আনন্দের। অবশ্য দীর্ঘ তালিকায় স্থান পাওয়ার পর আমার আত্মবিশ্বাস ছিল যে সংক্ষিপ্ত তালিকার জন্য মনোনীত হব। সেটাই ঘটেছে।

গল্পটি কখন লিখেছিলেন? আর এই গল্পটি লেখার পেছনে বিশেষ কোনো ভাবনা বা অনুপ্রেরণা কাজ করেছিল?

প্রাণকৃষ্ণ: গল্পটা ২০২০ সালের দিকে লেখা। এরপর বিভিন্ন সময় এডিট করেছি। এমনকি প্রতিধ্বনিতে পাঠানোর আগ মুহূর্তেও কিছু এডিট করেছি। হাওরপাড়ের এবং সীমান্তঘেষা এক মানুষ যার জীবন মাছ শিকারের মতো প্রায় আদিপেশাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত এবং যার জীবন পালাগান যাত্রাগানের মতো নান্দনিকতার সাথে অবিচ্ছেদ্য, সে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞাপাখি শিকার করা যাবে না, কাছিম শিকার করা যাবে নাকরলে জেল জরিমানা ইত্যাদির মধ্যে পড়ে নিদারুণ সংকটের মুখোমুখি হয়। তার সরল জীবন রাষ্ট্রীয় জটিলতার মুখোমুখি হয়ে বিপন্ন হয় এবং সে বাধ্য হয়ে সীমান্তে চোরাকারবারিতে নাম লেখায়। ভারতীয় সীমান্তে চোরাই মাল খালাসের বিশেষ এক বিপদসংকুল মুহূর্তে তাকে সাঁতরাতে হয়। ওই চূড়ান্ত মুহূর্তে তাকে পিছন থেকে তাড়িয়ে বেড়ায় সীমান্তবাহিনীর বুলেট আর সামনে থেকে দিকনির্দেশনা দেয় এক সাঁতরে যাওয়া সাপএইটুক হলো স্টোরিলাইন। মূলত এটা মিথ-রাজনীতি ও কবিতা অনুপ্রাণিত গল্প এবং সবকিছু মিলেমিশে হতে চেয়েছে এক কবিতা।

তখন আমি চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের ওপর পড়ালেখা করছিলাম। একই সাথে পড়ছিলাম বিমলকৃষ্ণ মতিলালের ওপর গায়ত্রী স্পিভাকের লেখাপত্র। তার উপর মাথার মধ্যে ছিল মঈনুস সুলতানকে লেখা মোস্তাক আহমাদ দীনের চিঠি নামে মোস্তাক আহমাদ দীনের লেখা দুর্দান্ত কবিতার দুর্দান্ত এক পঙ্‌ক্তিদেখি ৪৭ টি ঘাসের ওপর ৭১ টি ঝোঁক। একটি মাত্র পঙ্‌ক্তির মধ্যে এতো বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনার এমন প্রতীকী উপস্থাপনের আশ্চর্য কুশলতা আমাকে বিভিন্ন সময় ভাবিয়েছে। এর সাথে তখন এসে মিশল বিমল মতিলালের মিথ পড়া ও ঋত্বিকের মিথের ব্যবহারের ধরন। নিজের প্রায় সকল চলচ্চিত্রে ঋত্বিক মিথের ব্যবহার করেছেন। কিন্তু যুক্তি তক্কো গপ্পো সিনেমায় তিনি গল্পের পাত্রপাত্রীর নাম ও চলন বলনের মধ্যে এমন অভিনব উপায়ে প্রাচীন মিথকে মিশিয়ে দিয়েছেন তাতে চলচ্চিত্রটার মধ্যে একটা আশ্চর্য সুন্দর ডাইমেনশান তৈরি করল। ব্যাপারটা আমাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করল। এই মুগ্ধতার ওপর ভর করে একটা গদ্য লিখেছিলাম যুক্তি তক্কো গপ্পো সিনেমায় গাওয়া কেন চেয়ে আছো গো মা গানের নান্দনিক ব্যবহারের দিকটি খেয়াল করে। গদ্যটা পরবর্তীকালে মোস্তাক আহমাদ দীন সম্পাদিত ছোটকাগজ মুনাজেরায় প্রকাশিত হয়। কিন্তু গদ্যটা লেখার পরেও আমার মনে হলো, আরো কিছু লেখা বাকি রয়ে গেছে। মনে হল আমার এলাকায় এরকম মিথীয় ক্যারেক্টার তো আমি দেখেছি, এমন মানুষদের আমি চিনি। তো এইসব চেনাজানা মানুষের নির্ভরতা ও সে সময়টায় আমার অপরাপর পড়াশোনার চাপে গল্পটা না লিখে পারি নাই। 

গল্পে কথকের ভাষা সাধারণত প্রমিত রূপে ব্যবহৃত হয়, যা পাঠকের কাছে বর্ণনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। অপরদিকে, চরিত্রগুলোর ভাষা আঞ্চলিক হলে তাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট, সংস্কৃতি ও জীবনের বাস্তবতা আরও প্রাণবন্তভাবে ফুটে ওঠে। বর্ণনা ও সংলাপে এই ভাষাগত ভিন্নতা গল্পে বৈচিত্র্য আনে, তবে প্রশ্ন ওঠেএই বৈচিত্র্যের মধ্যেও কি ভাষার প্রবাহ সাবলীল থাকে? এই প্রসঙ্গে আপনার অভিজ্ঞতা ও অভিমত কী?

প্রাণকৃষ্ণ: কারো গল্প পড়ে যদি মনে হয় যে সেটা মানোত্তীর্ণ হয়েছে, তাহলে ধরে নিতে হবে যে ভাষার প্রবাহ সাবলীল হয়েছে। কারণ ভাষার প্রবাহ সাবলীল না হলে সেটা কোনোভাবেই গল্প হয়ে উঠবে না। এখন কথা হল এই যে দুই ধরনের ভাষাগল্পকথক ও গল্পের চরিত্রেরএরকম করে আর কতোদিন চলবে, এভাবে চলাটা ঠিক আছে নাকি চরিত্র আর কথকের একরকম ভাষা মানে আঞ্চলিক ভাষায় গল্প লেখা উচিতএ ধরনের বহু ভাবনাই ভাবা হচ্ছে। মূলত প্রমিত ও আঞ্চলিক ভাষাপ্রশ্ন নিয়ে আমাদের লেখকেরা যতটুকু মনোযোগী সাহিত্যের অপরাপর বিষয় নিয়ে অত মনোযোগ দেখি না। সেটা যে কেন তা তারাই বলতে পারবেন! এক্ষেত্রে আমার মনে হয় যে একজন গল্পকারের জন্য প্রমিত ও আঞ্চলিক ভাষার মামলা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারই নয়। গল্পকার মাত্রই জানেন প্রমিত বা আঞ্চলিক পুরো ভাষাক্ষেত্রটাই তার জন্য উন্মুক্ত এবং তিনি প্রয়োজনমাফিক যেভাবে খুশি উভয় ভাষাকেই ব্যবহার করতে পারেন। তিনি গল্পের পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী ভাষা নির্মাণ করবেন এবং শিল্পকুশলতা নির্মাণ করতে গিয়ে স্রষ্টার উন্মুক্ত হৃদয় দিয়ে যা করার তা করবেন। এক্ষেত্রে আমি যেটা খেয়াল করি যে আমাদের লোককবিরা তাদের গানে বহু বহু বছর ধরে অবলীলায় প্রমিত ও আঞ্চলিক ভাষার নান্দনিক সমন্বয়সাধন করে এসেছেন। প্রমিত-অপ্রমিত নিয়ে বাহুবলী তর্ক না করে লোককবিরা কিভাবে অনায়াসে এই চর্চা করতে পেরেছেন তা খেয়াল করলে যে কেউ দিশা পেতে পারেন।

গল্পের শেষাংশে আপনি ৭৮৬ এবং ১৯৭১ সংখ্যা দুটি অসংখ্যবার, বিভিন্ন বানান ও ভঙ্গিতে ব্যবহার করেছেন। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই সংখ্যাগুলোর কোন ইঙ্গিত বা প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে কি?

প্রাণকৃষ্ণ: দুইটাই প্রতীকী সংখ্যা। যে কেউ পড়লে বুঝবে ৭৮৬ হল ধর্ম আর ১৯৭১ হল রাজনীতি। কিন্তু খেয়াল করার বিষয় গল্পে দুটো সংখ্যাই চোরাই মালের নাম্বার হিসাবে উপস্থাপিত হয়। এখানেই পরিহাসটা লুকানো যে, রাষ্ট্রীয় ছলাকলায় পড়ে ইতিহাসের মহান ও পবিত্রতর সংখ্যাগুলোও স্রেফ চোরাই মালের পরিচয়বাহী হয়ে ওঠতে পারে। বিভিন্ন বানান ও ভঙ্গি চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। আরব আলী তো আকাট মূর্খ। সে যখন এইসব জটিল নাম্বার মুখস্ত করবে তা তো উল্টাপাল্টা উচ্চারণেই মুখস্থ করবে, যেমন উন্নিশো একোত্তইর, সাত্তশো ছিআশি ইত্যাদি ।

এ গল্পের টাইমফ্রেম কিন্তু বেশ বড়। মানে এটাকে আপনি আজকের বা এই বছরের গল্প যেমন ভাবতে পারেন তেমনি ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগের গল্পও ভাবতে পারেন। তাতে এমন কোনো ক্ষতি হবে না। মানে এতটুকু স্পেস এ গল্পটাতে আছে। ফলে ৭৮৬ এবং ১৯৭১ সংখ্যা দুইটা যেহেতু ধর্ম ও রাজনীতির প্রতীক হিসেবে বহুকাল ধরে চিহ্নিত সেহেতু বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটেও সেই একই তাৎপর্য তৈরি করে। জাফরের (ইতিহাসের মীরজাফরের নামে নাম) প্ররোচনায় চোরাই মাল পারাপারের চূড়ান্ত মুহূর্তে, পেছনের বুলেটের তাড়না আর সম্মুখের অলীক সাপের অনুসরণে এ দুই প্রতীকী সংখ্যা মনে নিয়ে যে সাঁতার দিল সে জটিলতার কোন আবর্তে গিয়ে পৌঁছাবে অথবা আদৌ পৌঁছাবে কিনা কে জানে !

গল্পে হাওর অঞ্চলের লোকগাথার নানা অনুসঙ্গ আপনি কয়েকটি স্বপ্নদৃশ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। আজ, ২০২৫ সালে, হাওর অঞ্চলের জনজীবনে কি এই ধরনের লোককাহিনীর প্রভাব এখনও রয়ে গেছে, নাকি তা শুধু অতীতের স্মৃতিচারণের অংশ হিসেবে সীমাবদ্ধ? আরেকটি সম্পূরক প্রশ্নভাটি অঞ্চলের জনজীবনে পালাগান এক সহজাত ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। অতীতের পালা সংস্কৃতির সঙ্গে সমকালীন পালাগানের চর্চার কোন ধরনের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়?

প্রাণকৃষ্ণ: ২০২৫ সালের কথা যদি বলেন তাহলে বলতে হবে যে হাওর অঞ্চলে মানুষজনের মানসিকতায় লোককাহিনীর প্রভাব অনেকটা কমে এসেছে। পালাগানের চর্চাও ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর। কিন্তু তাদের কালেকটিভ কনশাসনেসে লোকগান, লোককাহিনী কিংবা পালাগানের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। হাওর অঞ্চলের যারা পেশাদার মাছ শিকারী, রাতদিন মাছ শিকারে কাটান তারা এমনসব পরিবেশ পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান যে অদ্ভুত ঘটনা ও ভৌতিক আধাভৌতিক ব্যাপার-স্যাপারে তাদের আস্থা ও বিশ্বাস এখনো অবিচল। ফলে তাদের স্বপ্নে এইসব জিনিসের আসা-যাওয়া এখনকার সময়েও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

পরিযায়ী পাখি বা বিপন্ন কাছিম শিকারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরব আলীকে সীমান্ত চোরাকারবারিতে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করে। এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন জাগে: হাওর অঞ্চলের জীবিকা ও অর্থনীতির প্রবাহে পরিবেশ সংরক্ষণ ও সীমান্ত অপরাধের মধ্যে কি কোনো কার্যকর সম্পর্ক বা প্রভাব বিদ্যমান?

প্রাণকৃষ্ণ: জীবিকা ও অর্থনীতির সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ ও সীমান্ত অপরাধের সম্পর্ক গভীর। বর্তমানে হাওরে বসবাসকারীদের জীবিকার অবস্থা খুবই খারাপ। গত দুই দশকে হাওরের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। ধান, মাছ আর গানএই তিনে মিলে হাওরের মানএই গালগল্পের ভিত্তিমূলে যে বাস্তবতা বিদ্যমান ছিল, সে বাস্তবতা এখন অপসৃয়মান। উপর্যুপরি ফসলডোবা ও ফসল ফলানোর খরচ বৃদ্ধির কারণে অনেকেই জমিজমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। প্রচুর পরিমাণে সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাছের ফলন নেই বললেই চলে। এমনকি ঝিনুক-শামুকও প্রায় বিলুপ্ত।

আমার বাড়ির বুক ছুঁয়ে একটি নদী বয়ে গেছে। সেই নদীতে এখন না আছে মাছ, না আছে ঝিনুক-শামুক। অথচ ঝিনুক-শামুকের কারণে ছোটবেলায় এই নদীর পাড়ে হাঁটতে পারতাম নাপা কেটে যেত। যাক সে কথা, মাছ এখনো কিছু পাওয়া গেলেও সব মাছই চলে আসে শহরে। সবগুলো বিল সরকারের লিজ সিস্টেমের অধীনে চলে আসার কারণে সাধারণ মানুষ মাছ ধরতে পারে না। কিছু লোক বা গোষ্ঠীর হাতে হাওরের সমস্ত মৎস্যসম্পদ কুক্ষিগত। এরা মিলেমিশে প্রতিবছর লিজ নিয়ে যা খুশি তা করে। মাছ আহরণকে ঘিরে কত রাজনীতি আর কত টাকাপয়সার খেলা হয়, তার হিসাব মেলানো কঠিন

একটা সময় ছিল, হাওর এলাকায় যার জমি বেশি ছিল তাকেই অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু এখন টাকাওলা মানেই বিল লিজ অথবা চোরাকারবারের সঙ্গে যুক্ত। এরা রাজনীতির সম্মুখসারির সৈনিক হিসেবে মুখ প্রদর্শন করে, কিন্তু মূল ধান্দা হলো ব্যবসা, বিল দখল আর চোরাই মাল আনা-নেওয়া। টাংগুয়ার হাওর-তীরবর্তী মধ্যনগর ও তাহিরপুরএই দুই উপজেলার টাকাপয়সাওলারা প্রায় সবাই এভাবে হাওরের সম্পদ ও কৃষ্টিকালচার ধ্বংসের কাজে লিপ্ত

আমাদের আমলারা এখানে কখনোই স্থানীয় মানুষকে পরিবেশ সংরক্ষণের কাজে যুক্ত করেননি, তাদের মতামত নেননি, গবেষণা করেননিকিছুই না। তারা পরিবেশ সংরক্ষণের মানে বুঝেছে এই যে, কেউ মাছ ধরছে বা পাখি ধরছেতাকে পাকড়াও করো, ধরো, মারো, শাস্তি দাও। এইটুকুই এদের বুদ্ধি, এইটুকুই এদের চর্চা। এর সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ইত্যাদি গালভরা বুলি আওড়ায়, আর ঘুষ-দুর্নীতি করে সবকিছু তুলে দেয় ওই যে গোষ্ঠীর কথা বললাম, তাদের হাতে। এভাবে তারা সবকিছু লুটেপুটে খাচ্ছে আর পরিবেশ ও কৃষ্টিকে ভাগাড়ে পরিণত করছে

৫ আগস্টের সরকার পরিবর্তনের পরেও অবস্থা একই, বরং আরও খারাপ হয়েছে। যেসব মতলববাজ রাজনৈতিক কারণে এতদিন গোপন কারবার করতে পারেনি, সরকার পরিবর্তনের প্রথম এক-দুই সপ্তাহের মধ্যেই তারা পালিয়ে যাওয়া চোরাকারবারিদের জায়গা দখল করে নিয়েছে। তাদের সেই দৌড়ঝাঁপের খবর শহরে থেকেও আমি শুনেছি। এভাবে হাওরের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী প্রাকৃতিক সম্পদের ভোগ, আহরণ ও সংরক্ষণ থেকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর বিচ্যুত থাকতে থাকতে এখন শহরমুখী। যারা শহরে পালাতে পারে না, তারা আমার গল্পের আরব আলীর মতো ঘটনার জটিলতায় জড়িয়ে পড়ার জন্য ধীরে ধীরে প্রস্তুত হয়ে ওঠে

দিনের পর দিন পূর্ণিমা-অমাবস্যায় মাছ ও মানুষের রক্তের দাগে লিখিত হয়েছে এই হিসাব।’–গল্পের প্লটের বাইরে গিয়ে এই ব্যঞ্জনাময় ও চিত্ররূপময় বাক্যের বাস্তবিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।

প্রাণকৃষ্ণ: আমার বাবা দুর্ধর্ষ মাছ শিকারী ছিলেন। সরকারি চাকরি করতেন, কিন্তু এর বাইরে তাঁর একমাত্র নেশা ছিল মাছ শিকার। এমন অনেকদিন গেছে তিনি সারারাত মাছ শিকার করে সকালবেলা ঘাটে নৌকা নিয়ে এসে আমাদের ভাইবোনদের মাছ দেখানোর জন্য ডেকে তুলতেন। আমরা চোখ কচলাতে কচলাতে ঘাটে গিয়ে দেখতাম নৌকাভর্তি বিশাল বিশাল সব মাছ। সেসব মাছের শরীর জুড়ে থাকতো টাটকা রক্তের ছাপ। মাছের টাটকা রক্তের ছবি সেই থেকে মনে গাঁথা। বাবা আমার অল্প বয়সেই মারা যান। পরে তাঁর মাছ শিকারের অনেক গল্প শুনেছি, শিকারের নেশায় হাত কাটলো কি পা কাটলো সেসবের দিকে বুঝি তাঁর খেয়াল থাকতো না। আমার কাকা কৃষিকাজ করতেন, প্রায়ই উনার হাত-পা কাটা দেখতাম, এইসব কাটাকাটির দিকে উনার বিশেষ মনোযোগ দেখতাম না।  এমনিতেও হাওর অঞ্চলে যারা মাছ মারা বা খেত কৃষির কাজ নিয়ে থাকেন তাদের হাতে পায়ে প্রচুর কাটা দাগ থাকে। হয়তো শামুক-ঝিনুকে লেগে কিংবা বড়শি বা কাঁচিতে লেগে বিভিন্ন সময় তাদের শরীর কেটে যায়, কিন্তু তারা সেদিকে খেয়ালই করেন না। যারা রাতের বেলা হাওরে অবস্থান করেন তাদের কাছে পূর্ণিমা-অমাবস্যা সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এমনকি শরীরের ব্যথাবেদনার সাথেও তারা পূর্ণিমা-অমাবস্যার সম্পর্ক বিবেচনা করে থাকেন। হাওর অঞ্চলে বেড়ে ওঠার কারণে আমার স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার সাথে এইসব খুঁটিনাঁটি ব্যাপার নানাভাবে যুক্ত হয়েছে। এ বাক্যে এই অভিজ্ঞতাগুলোই ব্যক্ত হতে চেয়েছে। 

পাঠক হিসেবে আপনার প্রথম গল্প এবং লেখক হিসেবে আপনার প্রথম গল্পসেই স্মৃতিগুলোর কথা শুনতে চাই।

প্রাণকৃষ্ণ: আমার শুরুটা অন্যরকমভাবে হয়েছে। অনেকে যেভাবে কৈশোরে গোয়েন্দা গল্প পড়ে, তিন গোয়েন্দার গল্প, দস্যু বনহুর রোমেনা আফাজ পড়ে, তারপর শীর্ষেন্দু-সমরেশ-সুনীল-হুমায়ূন, তারপর একটা-দুইটা রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র ইত্যাদি পড়ে পড়ে বেড়ে ওঠে, আমার সেরকম হয়নি। ইন্টারমিডিয়েটে পড়া অবস্থায় পথের পাঁচালী বইটা কিভাবে কিভাবে যেন আমার হাতে এসে পড়ে এবং আমি তা পড়তে শুরু করি। পড়তে পড়তে দুর্গার মৃত্যূর জায়গাটায় গিয়ে আমি কেঁদে ফেলি। পড়া শেষ করে লেখালেখির অদ্ভুত শক্তির ব্যাপারটা নিয়ে ভাবি এবং তখনি সিদ্ধান্ত নেই যে আমি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করব। সেই থেকেই সাহিত্যের দিকে যাত্রা। মূলত বিভূতিবাবুর ওই পথের পাঁচালীই আমাকে সাহিত্যের পাঁচালীতে টেনে নিয়ে আসে। আমার প্রথম ছাপানো গল্পের নাম ‘চোর’। এটা শামীম শাহান সম্পাদিত গ্রন্থী লিটল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। কবি মোস্তাক আহমাদ দীন চেয়ে নিয়েছিলেন গল্পটা। মোস্তাক দীন আমার ক্লাসরুমের শিক্ষক এবং আমার লেখালেখির পেছনে উনার অবদান অবিস্মরণীয়। যে কোনো সুযোগে যতবার পারি উনার অবদান স্বীকার করতে চাই।  

আপনার পাঠ্যতালিকায় কোন কোন দেশি ও বিদেশি গল্পকার বা ঔপন্যাসিক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন? কাদের লেখনী আপনাকে গল্প বলতে বা লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে?

প্রাণকৃষ্ণ: বিশেষ স্থানের অবস্থাও তো পাল্টায়। পাঁচ বছর আগে যাকে বিশেষ মনে হতো এখন হয়তো তা মনে হয় না, ফলে এই মুহূর্তে বলা ভাল। এই মুহূর্তে আমার পাঠ্য তালিকায় দেশি তথা বাংলাভাষী গল্পকার ঔপন্যাসিকদের মধ্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছেনবিভূতি-তারাশংকর-মানিক এই তিন বন্দ্যোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক, দেবেশ রায়, অমিয়ভূষণ মজুমদার, নবারুণ ভট্টাচার্য, শহীদুল জহির ও বিপ্লব দাশ। বিদেশি লেখকদের মধ্যে টানা কয়েক বছর ধরে মুগ্ধ করে রেখেছেন ওরহান পামুক। যাঁদের নাম বললাম এঁরা প্রত্যেকে বিভিন্ন সময় আমাকে গল্প লিখতে অনুপ্রাণিত করেছেন।    

বর্তমানে আপনি কী পড়ছেন? আর আপনার সৃজনশীলতার পাতায় নতুন কোন লেখার কাজ চলছে?

প্রাণকৃষ্ণ: এক জীবনে আর কতটুক পড়া যায় যে পড়া নিয়ে কথা বলব! একটানা ত্রিশ চল্লিশ বছর পড়তে পারলে না হয় পড়াশোনা নিয়ে কথা বলা যেতো। তবু প্রশ্ন যখন করেছেন তখন লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বলি। ইদানীং আমি পড়াশুনা নিয়ে বাজে ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করি। যেমন মাসখানেক আগে একই সাথে পড়া শুরু করেছিলাম, বোর্হেসে প্রবন্ধ সংগ্রহ এবং কমলকুমারের প্রবন্ধ সংগ্রহ। এটা থেকে একটা, ওটা থেকে একটা এরকম করে। পড়তে পড়তে যখন মনে হল আমার মস্তিষ্কের মধ্যে দুনিয়ার দুই প্রান্তের দুই মহান লেখক হাত ধরাধরি করে হাঁটছেন তখন ভাবলাম এদিকে উনারা হাঁটতে থাকুক, আমি তাহলে অন্যপথে একটু ঘুরে আসি। এর মাঝেই পড়ে ফেললাম ওয়াসি আহমেদের রৌদ্র ও ছায়ার নকশা, এরপর নবারুণ ভট্টাচার্যের হারবার্ট, এটা আগে পড়া ছিল কয়েকবার, তবু আবার পড়লাম, তারপর সুমন রহমানের নিরপরাধ ঘুম ও বিপ্লব দাশের পঞ্চুহরির শেষ বিবাহ পড়লাম। এ বই দুটোও আগে পড়া ছিল, আবার পড়লাম। পড়ে এসে যখনি ভাবছি আবার বোর্হেস আর কমলকুমারের সাথে যোগ দেব তখন দেখি আমার দিকে চেয়ে আছে ওরহান পামুকের স্ট্রেইঞ্জনেস ইন মাই মাইন্ড আর মিলোরাদ পাভিচের ডিকশনারি অব খাজাসডিকশনারি অব খাজাসই হাতে তুলে নিলাম। কারণ আমার প্রবাসী বন্ধু অনেক কষ্ট করে এই বই আমায় সংগ্রহ করে দিয়েছেন।   

একটা গল্প বইয়ের খসড়া পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছি সম্প্রতি। এটাতে ভুলটুল আছে কিনা দেখছি। পাশাপাশি গল্প লেখা চলছে। একটা উপন্যাসের পরিকল্পনা সম্পন্ন করেছি। হয়তো সপ্তাহখানেকের মধ্যে লেখা শুরু করব। আমি যথেষ্ট সময় নিয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত। ফলে আগামী এক/দুই বছর উপন্যাসের জন্য বরাদ্দ রাখব ভেবেছি।

প্রতিধ্বনির সঙ্গে থেকে আপনার সাহিত্য ভাবনা বিনিময় করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

প্রাণকৃষ্ণ:  এত সুন্দর সুন্দর প্রশ্ন করার জন্য প্রতিধ্বনিকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

 

লেখক পরিচিতি 

গল্পকার ও লেখক। জন্ম ১২ মে ১৯৮৬ সালে, সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগরে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। নিয়মিত লিখছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। এখনো পর্যন্ত তার কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। কথাসাহিত্য তার প্রিয় বিষয়। বর্তমানে বসবাস করেন সিলেটে।