অলক্ষ্মী

অ+ অ-

 

সেদিন ছিল বাড়িতে বিয়ে। আকিব ভাইয়ার সঙ্গে রমলা ভাবির বিয়ে। বলা যায় বাড়ির প্রথম বিয়ে। বড় ভাইয়া স্টেটসে ইয়াংকি লেডিকে বিয়ে করে বছর চারেক হয় আর বাড়ি মুখো হননি। মেজো ভাইয়া জানিয়েছে সে লিগ্যাল না হওয়া পর্যন্ত স্পেন থেকে ফিরছে না। মা মেজো ভাইয়াকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, ‘আমি আর পারি না রে। তুই দেশো আয়। বয়স তো আর কম অইছে না! মরার আগে অন্তত তোর বউ দেকি যাই।’ মায়ের জবানিতে আমার হাতের লেখা চিঠি পেয়ে মেজো ভাইয়া ফোনে আকিব ভাইয়াকে বিয়ে করানোর উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘আমি বাইসাবোর লগে আলাপ করছি মা। তুমি আকিবরে বিয়া করাইলাও। টেকা-পয়সা যা লাগে আমরা দিমু। আর হে তো কারবার করে। আমি আইতে পারতাম নায়। আর আইলে যাইতে পারতাম নায়।’

‘ইতা কিতা কস বেটা!’

‘ঠিকউ কইয়ার মা।’

অবশেষে, অনেক গাইগুই করে মা রাজি হলেন। কনেও পছন্দ হয়ে গেল।

বিয়ের সানাই বাজল।

দুদিন থেকে বাড়ি অপরূপ সাজে সেজেছে। আবিদ আর চাচাতো-খালাতো ভাইয়েরা মিলে দিনরাত পরিশ্রম করে ডেকোরেটার্স থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এনে বাড়ি সাজিয়েছে। বাড়ির রাস্তার মুখে গেইট বানাতে আকিব ভাইয়া নিজে উপস্থিত থেকে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিয়েছে।

জৈষ্ঠ্য মাসের শেষ বিকেলে আকিব ভাইয়া যখন বিয়ের পর সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ভাবিকে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন, সেই সময়ে তপ্ত গরমে উত্তপ্ত ধরণী অকস্মাৎ দক্ষিণ দিক থেকে ধেয়ে আসা কালবৈশাখি ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে ঠাণ্ডার আবেশ সৃষ্টি করেছে।

আকিব ভাইয়া বিধ্বস্ত গেইট পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকলেন। হৈ-হুল্লোড়, আনন্দধ্বনির মধ্যে বড় চাচির গলা শোনা গেল। ‘মাইগো, ঝড়-তুফান লইয়া আইলায়।’

ভাবিকে বাসরঘর সংলগ্ন মাঝখানে যে বড়ঘর সেখানটায় বসানো হলো। মেয়ে মহলে সাড়া পড়ে গেল। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সকলে মিলে নববধূকে দেখার জন্যে বিছানায় উঠতে বহু বছরের পুরনো পালঙ্ক মড়মড় করে ভেঙ্গে পড়ল। আর তখনই গুঞ্জন শুরু হলো। কেউ কেউ প্রকাশ্যে কটু মন্তব্য করল। রহিমা বুয়া তো তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতরে গিয়ে মাকে নিয়ে এসে হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে পালঙ্ক দেখিয়ে বলল, ‘আম্মা! লক্কন তো বালা না। আকিব বাই এইডা কারে আনলো!’

মা কোনো কথা বললেন না। গম্ভীর হয়ে গেলেন। তাঁর এই গম্ভীর-গুমট হওয়ার মাঝে আমি বিপর্যয়ের আলামত দেখতে পেলাম। ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে যাওয়ার আগে ধরণী যেরকম গুমট ভাব ধরে রাখে সেরকম আরকি।

দুদিন পর ভাবি আকিব ভাইয়াকে নিয়ে বাপের বাড়ি গিয়ে দু-রাত থেকে যেদিন বিকেলে ফিরে এলেন, তার পরদিন দুপুরে খাওয়ার টেবিলে মা সকলের সম্মুখে ভাবিকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘বিয়ানে উঠবায় বউ। ইগু তুমার বাফোর বাড়ি না।’

ভাবির আর খাওয়া হলো না। দু-নলা ভাত মুখে পুরে টেবিল ছেড়ে ঘরে গিয়ে অঝোরধারায় কাঁদতে লাগলেন।

 

|| ২ ||

মাস দুয়েক কাটল মোটামুটি ভালোভাবে। মা আর তেমন কটুক্তি করলেন না্। আর করলেও ভাবি মিইয়ে থাকলেন। কোনো উত্তর করলেন না। কাজেই, সবকিছু ঠিকঠাক, সুন্দর মতো চলছিল। কিন্তু একদিন সকালবেলা হঠাৎ কী একটা কারণে মায়ের তীব্র বকুনির জবাবে ভাবি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমি ইনো জাসিয়া হেঙা বইছি না গো মাই। আফনে আর আফনার পুয়ায় সখ করি আনচইন।’

মা বললেন, ‘হেতু কিতা জানতামনি তুইন ইলা অলক্কী!’

‘বাজে মাত মাতবা না।’

‘কিতা কইলে! বাজে মাত! তুইন অলক্কী নাতে কিতা! অলক্কীর গরোর অলক্কী।’

কান্না থামিয়ে এবার ভাবি তীব্রভাবে জ্বরে ওঠলেন।

বললেন, ‘আমার মা-বাফ তুলি কতা কইবা না। আমি নায় দুষ করছি! আমার মা-বাফে কিতা করছে!’

বাদানুবাদের মাঝে আকিব ভাইয়া ঘর থেকে বের হয়ে এসে ভাবিকে চড়-থাপ্পড় মেরে চুলমুঠি ধরে টেনে নিয়ে যেতে থাকলে মা ‘দে, দে। বালামতে সুব দে।’ বলে উৎসাহ যোগাতে লাগলেন। আকিব ভাইয়া ঘরে গিয়ে তীব্র শব্দ করে দরজা বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু মায়ের বকুনি বন্ধ হলো না। তিনি বকতে লাগলেন। একসময় ভাবির আর্তচিৎকার আর কান্নার আওয়াজে মা চুপসে গেলেন।

                             

|| ৩ ||

এখন বিকেল। একটু আগে আজান হয়েছে। মা নামাজ শেষ করে জায়নামাজে বসে তসবি জপছেন।ভাবি নিজ ঘর থেকে বের হয়ে এসে মায়ের পায়ে পড়ে কেঁদে ওঠলেন।

বললেন, ‘মা, আমারে মাফ করি দেউক্কা। আমি বুইচচি না।’

মা বললেন, ‘যাও। নমাজ পড়ি চা বওয়াও।’

ভাবি মায়ের ঘর সংলগ্ন বাথরুমে ঢুকে ওজু করে চোখ মুচতে মুচতে নিজ ঘরের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন।

সকলকে চা দেয়া হয়েছে। রহিমা বুয়া সবাইকে চা দিয়ে অতি আনন্দের সঙ্গে বিস্কিট চায়ে ডুবিয়ে চা-বিস্কিট খেতে শুরু করেছে। মাযের আর চা খাওয়া হলো না। এক চুমুক দিয়ে নোনতা অনুভব করায় আর খেলেন না। ‘এই রহিমা, তোর খাওয়া অইচেনি, অইলে উঠ’ বলে রহিমা বুয়াকে নিয়ে উঠান পেরিয়ে ছোটো জায়ের বাড়ি চলে গেলেন।

ভাবি তার ঘরে বসে আপনমনে কুটকুট করতে লাগলেন।মন্তব্যগুলো স্পষ্ট না বোঝা না গেলেও মাকে উদ্দেশ করে যে কুটকুট করছেন তা বোঝা গেল।

আকাশের অবস্থা ভালো নয়। মাঝেমধ্যেই বিদ্যুৎ চমকানির সঙ্গে তীব্র আওয়াজ ধেয়ে আসছে। মনে হয় ভাদ্রের এই শেষ সময়ে বৃষ্টি হবে।

মাকে উঠোন ডিঙিয়ে অতি দ্রুত আসতে দেখা গেল। মা ঝড়ের বেগে ফিরে এসে তীব্র শক্তি নিয়ে জ্বলে ওঠলেন। ভাবিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘খবিসোর পুরি ক, আমি কিতা কইছি!’

ভাবি প্রথমে ভ্যাবাচেকা খেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কুনআনো কিতা কইছি মা।’

‘মা কইস না। আবুলোর মারে কিতা কইসত? ক, খবিসোর পুরি।’

ভাবি এবার আর দম নিলেন না। ঢিলের বদলে পাটকেল নিক্ষেপ করলেন। ঝড়ের পূর্বভাস পেলাম। বাইরেও তীব্র বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে হারিকেনের তীব্রতা নিয়ে প্রচণ্ড ঝড় আমাদের তল্লাটে নেমে এসে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে শান্ত হলো।

 

|| ৪ ||

ভাবির বাবা-মাকে খবর দেয়া হয়েছে।

ভাবির মা আসেননি। বাবা-বড়ভাই এসেছেন। এসে বিস্তারিত শুনেছেন। ভাবি যে কীভাবে তার শাশুড়িকে খবিসোর পুরি খবিস বললেন এই কথাটির উপর জোর দেয়া হয়েছে। আবিদ ভাইয়াও মায়ের পক্ষালম্বন করে বউয়ের নানা ভুলত্রুটি তুলে ধরলেন। অভিযোগের ফিরিস্তি শুনে ভাবি কিছু একটা বলতে চাইলে বড়ভাই তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তুমার দুষ। আমরা কোনো মাত হুনতে আইছি না। যাও, মাওইর পা দরি মাফ চাও। মারে মার লাকাইন দেখবায়। বেয়াদবির একটা সীমা থাকা দরকার।’

ভাবির বাবাও বড়ছেলেকে সমর্থন করে বললেন, ‘অয় যাও। মাফ চাও গি।’

ভাবি কাঁদতে কাঁদতে মায়ের পায়ের নিচে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। দাঁতে দাঁত লেগে গেল। মিনিট পনেরো সেবা-শশ্রুষা করে জ্ঞান ফিরিয়ে আনা হলো।

এবার ভাবির বাবা চোখ মুচতে মুচতে বললেন, ‘বেয়াইন, আফনে যদি কইন, তাইলে পুরিরে দুই-চাইর দিনোর লাগি লইয়া যাই।’

মা না করলেন না। খুশি মনে বেয়াই-পুতরার প্রশংসা করে বললেন, ‘নউক্কা বেয়াই নউক্কা। আফনার পুরিরে আফনে নিতা না তে কে নিত! দুই-চাইর দিন কেনে, সপ্তাহ-দশদিন থাকি আউক।’

ভাবির বাবা-বড়ভাই মায়ের পীড়াপীড়িতে খাওয়াদাওয়া সেরে ভাবিকে নিয়ে বিকেল বেলা বাড়ি ফিরে গেলেন। সপ্তাহ খানেক বাদে খবর এলো, ভাবির বাবা একুইট মাইয়ো-কার্ডিয়েল ইনফ্রাকশনে হঠাৎ মরে গেছেন।

মা আহাজারি করতে করতে আবিদ ভাইয়াকে সঙ্গে নিয়ে ভাবিদের বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন।

ভাবি মাস দেড়েকেরও বেশিদিন থেকে ফিরে এলো।

দেখতে দেখতে আশ্বিন-কার্তিক শেষে অগ্রহায়ণ এসে গেল। এবার ঠাণ্ডা পড়বে বেশি। এই অগ্রহায়ণে দুপুরবেলা খেয়ে বিছানায় একটু গা এলিয়ে দিলেই কাঁথা গায়ে জড়িয়ে নিতে হয়। সন্ধ্যারাতে দিগন্ত জুড়ে কুয়াশা নেমে আসে। রাতে সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে এলে জানালার পাশে বাঁশঝাড়ে পাতার ঝরঝর শব্দ শুনতে শুনতে নিদ এসে যায়। শেষরাতের দিকে দোয়েলের কণ্ঠে দুধরনের সুরে ঘুমও শেষ হয়ে যায়।

শীতের এই শুরুতেই আকিব ভাইয়া তার স্টেশনারি ব্যবসায় লস খেয়ে পুরনো কন্ট্রাকটরি ফিরে পেতে লাইসেন্স নবায়র করার জন্যে উঠে-পড়ে লাগল। আর পরীক্ষা-টরিক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ায় বড়বু তার ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি হাজির হলো। নীরব, নিস্তব্ধ বাড়ি হঠাৎ যেন প্রাণ ফিরে নেচে ওঠল।

সপ্তাহ-দশদিন যেতে না যেতেই নাতি-নাতনির হৈ-হুল্লোড়ে মা অতিষ্ঠ হয়ে বলেই ফেললেন, ‘আনিসা, তোর পুয়া-পুরিনতোর যন্ত্রণায় আর টিকতে পাররাম নারে।’

বড়বু মায়ের কথায় রাগ করলেন না। মায়ের স্বভাব তার জানা। তবুও অনুযোগের সুরে বললেন, ‘মায় যে কিতা মাতো, নাতি-নাতনিনতে ছাতাইতো না তো কে ছাতাইতো!’

একদিন বড়বুর সেজো ছেলে ইমরান সোকেসের উপর সযত্নে রাখা আকিব ভাইয়া আর ভাবির পোট্রেট করা ছবি পাশে রাখা টেবিলের উপর দিয়ে উঠে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে নিচে ফেলে ভেঙ্গে ফেলল। আকিব ভাইয়া কিছু বলল না। ভাবি ধমক দিয়ে ওঠলেন। ব্যাপারটি ছেলের কাছে শুনে বড়বুর আতে ঘা লাগল। তিনি ওইদিন বিকেলেই টু শব্দটি না করে ঘটনাটি আমাকে বলে তার বাড়ি চলে গেলেন।

মা বড়বুকে বললেন, ‘আনিসা, আরও দুইদিন থাকি যা।’

বড়বু অজুহাত দাঁড় করিয়ে থাকলেন না। চলে গেলেন। কাউকে কোনো  কিছু বুঝতেও দিলেন না।

বড়বু চলে যাওয়ার ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে মা ঘটনাটি কীভাবে যেন জেনে গেলেন। ভাবিকে ডেকে আনা হলো।

‘গটনা কিতা? হাছা হাছা কইবায় বউ।’

মায়ের কথা শুনে ভাবি প্রথমে আশ্চর্য হলেও পরক্ষণেই মায়ের তীব্র ভর্ৎসনা শুনে ‘আস্তে মাতইন’ বলে ঘটনা বর্ণনা করতে লাগলেন। মা গেলেন বিগড়ে। শুরু হলো দরবার।

‘তুমার অতো বড় বুকোর পাটা আমার নাতিরে ধমক দেও!’

‘কানো আমি ধমক দিলাম!’

‘আমার পুরি অতারলাগি কতবিল (কতক্ষণ) আগে গেছেগি। তুমার লাগি আমার পুরিয়ে শান্তিতে থাকতে পারছে না!’

‘অয় আমি তো তানে খুচাইছি!’

‘কিতা কও?’

‘কইয়ার তো আমি তানে খুচাইছি।’

‘আইজ আকিব আউক। এমন উ্ফতা, বেততমিজ, অলক্কী বেটি একগু...!’

মা কথা শেষ করতে পারলেন না। ভাবি বলে ওঠলেন,‘আফনে মাই ফেরেশতা।’

পাশে থাকা রহিমা বুয়া মুখ খুলে মায়ের পক্ষালম্বন করে বলল, ‘বাবি, আমরাও তো বউ আছিলাম। আফনে ইতা কিতা কইন! সোন্দর কইরা মাতেন। আর চুপ থাকেন।’

ভাবি আর কখা বাড়ালেন না। চুপচাপ ঘরে ঢুকে সজোরে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

মা স্বগতোক্তি করলেন, ‘সময় বুঝি তাই মাতের। বেটিনতোর তো জুর হয় বাইচচা পেটো আইলে। তাইতো  চাঙ্গো।’

আর শোনা সঙ্গত মনে হলো না। হুইল চেয়ার চালিয়ে তাড়াতাড়ি নিজ ঘরে চলে এলাম।

রাতে খাবার টেবিলে ভাবিকে দেখলাম না। মা আকিব ভাইয়াকে ঘটনা বিস্তারিত বললেন। আকিব ভাইয়ার মুখাবয়ব দেখে বোঝা গেল, সে বিষয়টি জানে। এই প্রথম সে কোনো মন্তব্য করল না। অন্যপ্রসঙ্গে চলে গেল।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ফিরে যাওয়ার সময় আকিব ভাইয়া ‘মা তুমারে কওয়া অইছে না, আমি এক কামো ঢাকাত যেইয়ার।’ বলে ঘরে ঢুকে রেডি হয়ে চলে গেল।

দেরি না করে হুইলচেয়ার চালিয়ে ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়লাম।

 

|| ৫ ||

সকালে ঘুম ভাঙ্গল মায়ের তীব্র আওয়াজে। ঠাণ্ডায় আরামবোধের কারণে এক ঘুমে কখন যে রাত কাবার হয়ে গেছে টের পাইনি।

আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে শুনলাম, মা বলছেন, ‘দেখ আটটা বাজি যার, আবো উটে না। আমরা আর পুয়াতি আছলাম নায়। পাঁচ পুয়া আর দুই পুরির মা অইছি, তাও তো ফজরোর অক্তোত উটি গেছি। হরিয়ে (শাশুড়ি) যেতা কইছইন অতা হুনচি। মুখ তুলিয়া কোনোদিন চাইচি না। পুয়ারে তো মেড়া (ভেড়া ) মানাইলেইছে। সংসারো কোনো আয় উ্ন্নতি নাই। যেবায় আত দেই অবায়দি ঠাটা পড়ে। অলক্কী লাগছে আমার। মাইজলা পুয়াও ফিরিয়া আর !’

বুঝলাম, গতরাতে কোনো এক সময় মেজো ভাইয়া ফোন করেছিলেন।

মুখহাত ধুঁয়ে নাস্তা-টাস্তা সেরে টেলিভিশনে ৯টার সংবাদ শুনতে রিমোট অন করতেই শুনলাম, ‘গতকাল গভীররাতে নরসিংদির কাছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহত ১০ জনের মধ্যে ৯ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন সিলেট শহরের মেজরটিলা নিবাসী আকিব হোসেন বড়ভূইয়া...।’

মা বলে তীব্র চিৎকার দিয়ে ওঠলাম।

সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ডেডবডি আসতে আসতে রাত হয়ে গেল। মা আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে বিলাপ করে বারবার মুর্ছা যেতে লাগলেন।

পরদিন দুপুরবেলার ভেতর পারিবারিক গোরস্তানে দাফনকাফন সম্পন্ন করে যখন হুইলচেয়ারে করে বাড়ি ফিরছি, মায়ের বিলাপধ্বনি কানে ভেসে এলো। মা বলছেন, ‘অলক্কী আমার সব শেষ করি দিছে। সব শেষ করি দিছে।

দু’হাত দিয়ে কান চেপে ধরলাম। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

যাই, ভাবির ঘরে যাই। মা-ভাবির দ্বন্দ্বে কোনোদিন একটা কথাও বলিনি, পক্ষাবলম্বনও করিনি। আজ সময় এসেছে। কথা বলার, পক্ষ নেয়ার। আজ যে ভাবির পক্ষালম্বন করা বড় বেশি জরুরি। বড় বেশি নৈতিক।