প্রায়শ্চিত্ত
বাবা রাতা মোরগের ঝোল-তরকারি পছন্দ করেন। সাথে আমচুর ছেড়ে দেওয়া পাতলা মসুর ডাল।
বাবা, দাওয়ায় শীতলপাটির আসন পেতে ডাল-ঝোলে হাতের কবজি ডুবিয়ে ভাত খান। মা, তালপাতার পাখায় শরীরের সবটুকু জোর নিংড়ে বাবার গায়ে হাওয়া দেন। আমি তাদের নিকটে পিঁড়িতে জোরাসনে বসে মায়ের হাতে মেখে দেওয়া ভাতের-দলা মুখে পুরি আর তাদের আলাপে কান পাতি।
আমার ছোট্ট বুকটা মৃদু হাওয়ায় ঝিরঝিরে বাঁশপাতা কাঁপার মতো কেঁপে কেঁপে উঠে। চোখের কোণে দৃষ্টি ফেলে মায়ের মুখখানা দেখি—ভারী অসিত মলিন।
বাবা অবশ্য কথা সবসময় একাই বলেন, মা বাধ্যগত ভৃত্যের মতো মাথানত করে শুনে যান। “তরকারীতে আলু কম হয়েছে”—বাবার অযথা অভিযোগ। আমার কাঁচা বয়েস, তারপরও বুঝতে পারি—বাবা একটা ছল-চাতুরি খুঁজছেন! বাবা অবান্তর এবং বিনে ছুতোছাতায় মায়ের গায়ে সবসময় হাত তোলেন। পথের ধারের বেনামী কুকুরটাকে মানুষ যেমন অযথা লাত্থিগুঁতা মারে, তেমনই। সেরূপে বাবা, মা-কে বিনা কারণে প্রায়ই মারধর করেন। মা অবশ্য ঢেঁকির মতো ভান ধরেন। যেন তার জন্ম হয়েছে বাবার লাত্থিগুঁতো খেতে। মা শুধু ভান করেন না, সবার কাছে বাবার এমন পৈশাচিক কাজবাজ রাখঢাক করতে সদা তটস্থও থাকেন। কিন্তু মায়ের মুখের নীরব লুকানো ভাষা আমি ঠিকঠাক পড়তে পারি। মায়ের সাথে বাবার অশ্লীল ব্যবহারে আমি সারাক্ষণ ভয়ে-ত্রস্তে ডুবে থাকি।
বাবার আজন্ম মৃগীরোগ। মা, বাবার এই ব্যামো নিয়ে সবসময় অস্থির থাকেন। বাবর প্রতি মায়ের ভালোবাসার সরেস প্রকাশ সবসময় গোপনে হয়। কারণ মায়ের ভালোবাসা বাবার কাছে আদিখ্যেতা মনে হয়। বাবা এই উছিলায়ও পশুর মতো মায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। বাবা যখন আমাদের বাড়ির পাশে বয়ে চলা নদীটাতে নাইতে যান, আমি তার পেছন পেছন মাথা নিচু করে সাবানদানি হাতে হেঁটে যাই। বাবার সাথে আমার কখনও শখ-আহ্লাদের তো নয়ই স্বাভাবিক আলাপও হয় না। তার সাথে আমার প্রাইমারি স্কুলের বেত-স্যারের মতো সম্পর্ক।
বেত-স্যারের ভয়ে আমি স্কুল ঘরের কাছে ঘেঁষতে ভয় পাই। অকারণ বেত নাড়েন তবে এর ব্যবহার খুব একটা যে করেন তা কিন্তু নয়। তারপরও তার হাতে বেতের উপস্থিতি আমাকে সারাক্ষণ আতঙ্কিত করে রাখে। বাবা আমার উপর কখনও হাত তোলেন না, কিন্তু তার মুখের রাশভারী ভাব, আমার মাকে অযথা অসম্মানিত করা আমাদের মধ্যে বিশাল দূরত্বের বলয় তৈরি করেছে।
বাবার গোসলের সময় তার পাঁশে আমার উপস্থিতি—এটা আমার জন্যে মায়ের গোপন আদেশ। আমি মায়ের কথা এমনকি মায়ের মনেরভাব বুঝে যে কোন কাজ করতে সবসময় মুখিয়ে থাকি। বাবা যখন পানিতে ডুবসাঁতার করেন; একটা দাঁড়কাক বাবার সাবানদানি থেকে সাবান নিয়ে নদীপাড়ের শিমুল গাছটার উপর চুপচাপ বসে থাকে—মা, এমন গাঁজাখুরি গল্প বলেন আমাকে।
মায়ের এমন আকাশফোঁড়া দণ্ডকাকের গল্প আমি আমার অবুঝবেলা থেকে শুনে আসছি। সেই থেকে বাবার গোসলের সময় হলে আমি সাবানদানি হাতে নীরবে বাবার পিছু হেঁটেছি।
এখন অবশ্য সময় ক’বছর গড়িয়েছে, এসুযোগে আমি মায়ের-মন পড়তে জেনে গেছি। সাবানের উছিলায় আমাকে বাবার সাথে পাঠিয়ে বাবার ঘরেফেরা মা নিশ্চিত করেন। বাবা জলের তলে পানকৌড়ির মতো ঝুপ করে ডুব দেন, আমি শকুন চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকি। ঠিকঠাক পানির তলা থেকে বাবা উঠল কিনা! মৃগীরোগীর জন্য পানি এবং আগুন হলো মরণ কূপ!
দাদা আর আমি সবসময় মায়ের চুলারপাড়ে বসে সকালবেলার নাস্তা খাই। দাদা মাটির সানকি আর আমি শনিবারের হাঁট থেকে দাদার শখ করে কিনে আনা ফুলতোলা টিনের থালা নিয়ে চুলারপাড়ে পিঁড়ি টেনে বসি। মা ধোঁয়া ওঠা খুদভাতে ভর্তা আর বাসি তরকারির ঝোল আমাদের পাতে তুলে দেন। মা আলাদা করে বাবার জন্যে দাওয়ায় শীতলপাটি বিছিয়ে রাখেন। বাবা ভারিমুখে সেখানে জোড়াসনে বসে থাকেন। আমাদের বাড়িতে বাবার জন্যে সবসময় আলাদা খাবারদাবার এমনকি শোয়া-বসারও পৃথক ব্যবস্থা থাকে। যেমন করে মালিক আর ভৃত্যের তফাৎ করা হয়। মা,সবার আগে তুলে-রাখা খুদভাত আর মায়ের পালিত-মুরগির ডিম ভেজে তড়িঘড়ি করে বাবার খাবার নিয়ে দাওয়ায় যান। শীত-গ্রীষ্ম সবসময় বাবাকে তালপাতার পাখায় বাতাস করেন। মৃগীরোগীর জন্যে আগুন হারাম, এই ঠুনকো অজুহাতে বাবাকে গোপন যত্নআত্তি করতে মায়ের উৎসাহের ভাটা নেই। বাবা, এসব আদিখ্যেতা কটাক্ষ চোখে অবজ্ঞা করলেও দাদা সবসময় মাকে উৎসাহ যোগান। তারপরও যদি বাবাকে বাগে আনা যায়।
শনিবারে, আমাদের তল্লাটে বড় হাট বসে। সারা সপ্তাহ ধরে দাদা এবং বাবা মিলে তাঁতকলে লুঙ্গি বুনেন। দাদা লুঙ্গির গাঁটরি মাথায় নিয়ে শনিবারে হাটে যান, সেসব বেচাবিক্রি করতে।
আমার সমবয়সী অনেকে শখ করে বাপ-দাদার সাথে হাটে যায়। হাটে বহুত সৌখিন জিনিসপাতি পাওয়া যায়। আমার বন্ধুরা উৎসব-বান্নিতে আয়োজন করে হাটে যায় এবং নিজেরা পছন্দ করে তাদের শখের জিনিস কিনেও আনে। আমার বড় সাধ হয় একবার দাদার সাথে হাটে যাই। আমার যাওয়া হয় না। মায়ের বারণ। ছেলেধরা আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। ছেলে ভুলানো বুলির আড়ালে বাবাকে নিয়ে মায়ের অস্থিরতা অবশ্য আমি টের পাই। হাটবারেও বিনা অভিযোগে বাবার পিছু পিছু নদীরঘাটে সাবানদানি হাতে দাঁড়িয়ে থাকি। বাবা, সাদা ধবধবে ধবল বকের গায়ের রঙের বাসনা-সাবান গায়ে মেখে গোসল করেন। আমি দূর থেকে বাবার কালো কুচকুচে ধূর্ত শিয়ালের মতো চোখ জোড়ায়, নষ্ট নেশার চিহ্ন দেখতে পাই!
বাবা বিশেষদিনে শঙ্খশুভ্র জমিনের উপর হালকা নীলপাড়ের লুঙ্গিটা গায়ে জড়ান। ধবধবে শাদা হাওয়াই শার্টটা প্রতি শুক্রবার গাঁয়ের বাজার থেকে ইস্ত্রি করিয়ে আনেন। শনিবার বাবার বিশেষ দিন। বাবার জন্যে ডাঙ্গায় নৌকা চলার সময় বলা যায়। এ-দিনে বাবা সোনালি রঙের সিকো ফাইভ ঘড়িটা খুব যত্ন করে পরিষ্কার করেন। বাবার গাত্রবর্ণের সাথে ঘড়িটা বড্ড সুন্দর মানিয়েও যায়। বাবা আমার মায়ের সাথে ভাব-ভালোবাসা করে বিয়ে করেছেন। আমার নানা এ-সম্পর্ক মেনে নেননি এমনকি বিয়েতেও স্বেচ্ছায় রাজি ছিলেন না। নানা, বিষয়-আশয়ে ও মান্যগণ্যে আমার দাদা থেকে বেশ উঁচুস্তরে আছেন। নানা বিচক্ষণ মানুষ। নানার মতে, বাঙালি বিয়ে হয়—পরিবারে সাথে পরিবারের, বংশে-বংশে এবং সমানে সমানে। এর ব্যত্যয় হলে সম্পর্কের দীর্ঘসূত্রিতা ধরে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে। তারপরেও আমার বাবা বিভিন্ন নাটকের আশ্রয়ে নানাকে এ-বিয়েতে বাধ্য করেন। এবং অসম দু’পরিবারের মিল-মহব্বত না হলেও, বাবা-মায়ের বিয়েটা শেষপর্যন্ত সম্পন্ন হয়। এবং নানা বিয়ের সময় এই সোনালি ঘড়িটা বাবাকে উপহার দেন।
বাবা গুনগুনিয়ে গান ধরেন। নাকে-কানে-বুকপকেটের কাছ ঘেঁষে বেলিফুলের ঘ্রাণযুক্ত সুগন্ধি মাখেন। আমি অপাঙ্গ দৃষ্টিতে বাবাকে দেখি—সুখপ্লাবনে ডুবে আছেন আমার বাবা।
মায়ের চোখে এসময় কষ্ট-অপমানের একপাহাড় জল, টলমল করে। আমি পুব উঠোনে বাঁশের মাচায় চুপচাপ বসে থাকি। বাবা, আমাদের দীর্ঘশ্বাসকে মাড়িয়ে দু’গ্রাম দূরের শেখপাড়ায় চলে যান। শুনেছি, সেখানে এক রাজকন্যা থাকেন। সে আমার বাবার ক্ষণপ্রেয়সী, সুদখা। আমার বাবার সমস্ত সুখ সেই রাজকন্যার কাছে বন্ধক রাখা আছে। বাবা এখন চিরদিনের তরে তাকে আপন পেতে আমাদের অস্তিত্বকে খুব সহজে ধুলোয় মিলিয়ে দিতে একপা বাগিয়ে আছেন। আমি অবশ্য মাকে ওসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করি না। আর,বাবার কাছে জানতে চাওয়ার মতো সম্পর্ক আমাদের মাঝে কখনো ছিল না। দাদার বুকফেটে যাওয়া আক্ষেপ থেকে, মায়ের চোখের জল, দীর্ঘনিঃশ্বাস দেখে আমার অবশ্য জানা হয়ে গেছে।
আমার দাদার আমলের টিনের দু’চালা ঘরটার অবস্থা, অনেকটা বাবার সাথে মায়ের বর্তমান সম্পর্কের মতো পলকা, ঠুনকো। তারপরও ঘরখানা মাজা ভেঙে যেমন করে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তেমন করে টিকে আছে আমার বাবা-মায়ের সংসার। ঘরের মাঝ বরাবর বাঁশের চিরল ফালির চতুর্ভূজ আকৃতির ফাঁকফাঁক করে বানানো বেড়া টানা। আমি আর দাদা একপাশে তক্তপোশ ফেলে থাকি অন্যপাশে বাবা-মা। এবাড়িতে দাদা আমার আশ্রয়-প্রশ্রয়। বাবা বাড়ি থাকলে আমি খুব প্রয়োজন না হলে মায়ের কামরায় যাই না। সেই কবে মায়ের সাথে ঘুমিয়েছি মনে পড়ে না। তবে প্রথম প্রথম দাদার তক্তপোশ থেকে এক ছুটে মায়ের বিছানায় পালাতাম, তখনও দাদার কাছে শোয়া অভ্যাস হয়নি। বাবা গরম চোখে তাকাতেন, আমি ভয়ে মায়ের বুকে লুকাতাম। একসময় দাদা আমাকে জোর করে তার কাছে নিয়ে আসতেন। মা, অপারগ-শীতল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমি দু’হাত বাড়িয়ে মাকে পেতে চাইতাম। তারপর অবশ্য আমি অল্প বয়স হলেও মায়ের অসহায়ত্ব বুঝে গেছি। এরপর থেকে শীত-গ্রীষ্ম সবসময় গুটিশুটি মেরে দাদার কাঁচা-পাকা লোমশ বুকটার ওমে মুখ লুকিয়ে শুয়ে থাকি।
প্রকৃতির ঘরে শীত এসেছে। রাত বাড়ে, নিস্তব্ধতা সমান তালে পাল্লা দিয়ে বাড়ে। রাতের নিজস্ব শব্দগুলো নির্বিঘ্নে স্পষ্ট হয়ে উঠে। আমাদের ঘরের টিনেরচালায় লাগোয়া নারিকেল গাছের চিরলপাতা চুইয়ে টুপটাপ শিউলিফুলের বোটা-খসে ঝরার শব্দে, শিশির ঝরে। ঘরঘেঁষা কদমগাছটাতে দিনেদুপুরে বাঁদুর ঝুলে থাকে। রাতে এদের দৌরাত্ন বাড়ে বহুগুণে। পাখা ঝাঁপকানির শব্দে আমার ছোট্ট বুকটায় ভয়ের সমুদ্রঢেউ খেলে যায়। তাঁতিপাড়ার ল্যাংড়া কুকুরটা বুকভাঙ্গা কষ্টে কুঁকড়ে কেঁদে উঠে। আমি দাদার লোমশবুকে শক্ত করে মুখ গুঁজে থাকি। দাদার ঘুম পাতলা। প্রায় সারারাত জেগে থাকেন। দাদা আমাকে দু’হাতে বুকের কাছে ঝাপটে ধরে নির্ভরতার আশ্বাস দেন। মায়ের সিথানের কাছে পিতলের পিদিমটা নিভু নিভু জ্বলছে। তারমানে বাবা তখনও ফেরেননি। বাবার অপেক্ষায় রাতজেগে বসে থাকা মায়ের প্রতিদিনকার আটপৌরে কাজ।
একসময় মধ্যরাতে বাবা বাড়ি ফিরলেন যেমনটা সমসময় ফেরেন। বাবা ব্যাঙের মতো ধপধপ শব্দ করে হাঁটেন। বাবার পায়ের আওয়াজ সহজেই অন্যদের থেকে পৃথক করা যায়। মা,যদ্দুর পারা যায় নিঃশব্দে দরজার খিল খুলে দিলেন যাতে আমি কিংবা দাদা জেগে না উঠি।
বাবার সাথে মাকে কখনো গলা উঁচিয়ে কথা বলতে শুনিনি। কিন্তু সেদিন মায়ের গলার আওয়াজটা একটু বেশিই বাড়তি ছিল। মায়ের ভেতরের সমস্ত কষ্ট বোধকরি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভার মত এক ঝটকায় বেরিয়ে আসে। আমি কান পেতে মায়ের বুকের কষ্টের শব্দ শুনতে পাই। বাবার গলায় সবসময় বাড়ন্ত গর্জন থাকে। বাবার সে রাতেও গলায় কঠিন আওয়াজ ছিল কিন্তু মাকে কেন জানি তাতে দমানো গেল না। বাবা মায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন যেমন করে হিংস্র হায়েনা হরিণ শাবকের ওপর পড়ে। হঠাৎ মায়ের কামরায় নিশুতি রাতের নীরবতা ভর করল। এর পরপরই মায়ের গোঙানির শব্দটা আমাদের কানে ভেসে আসে। দাদাও বোধকরি আমার মতো জেগে ছিলেন এবং কান বিছিয়ে ছিলেন তাদের আলাপে। আমি ঘটনাটা ঠিক বুঝে উঠার আগে, দাদা আমাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বাবার ঘরে ঢুকে পড়েন। দাদা সাধারণত ও-ঘরে ঢোকেন না, আর এতরাতে তো নাই-ই। আমার অচেতন মন কেমন করে উঠে। বুঝতে পারি হয়তো ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আমি থরথরিয়ে কাঁপতে থাকি। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে কোনো মতে বেড়ার এপাশে ধরে রাখি। মায়ের ঘরে কেরসিনের কুপি জ্বলছে। কুপিবাতির জলন্ত শিখা বাঁশপাতার মতো দুরুদুরু দুলছে। সবকিছু কেমন ভয়াবহ রহস্যময় মনে হচ্ছে। আমি সাহস করে বাঁশের বেড়ার চতুর্ভূজি ফাঁকে মায়ের কামরায় চোখ পাতি।
বাবা দু’হাতে মায়ের গলা শক্তকরে চেপে ধরে আছেন। অসুরের মতো শক্তিশালী মানুষটা, সমানে থরথরিয়ে কাঁপছেন। দাদা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে বাবার হাত ধরে সমানতালে টানছেন, কিন্তু ছাড়াতে পারছেন না। মা, হাত-পা ছুঁড়াছুঁড়ি করছেন—বাবার হাত থেকে রেহাই পেতে। কিন্তু জোঁকের মতো খামচে ধরা গলা কোনোভাবেই ছাড়ানো যায় না। এভাবে ধস্তাধস্তি চলে তাও বেশ কতক্ষণ! একসময় মা ক্লান্ত হয়ে পড়েন, খুব ক্লান্ত। মায়ের হাত পায়ের সমস্তজোর নিঃশেষ হয়ে যায় এবং অসার হয়ে বিছানার উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাঁথা-বালিশের মতো দলাপাকিয়ে পড়ে থাকেন। মায়ের রুহটা বোধ হয় আর মায়ের শরীরে নেই। তার নিপাট দেহ নিংড়ে বেরিয়ে আসা শেষ নিঃশ্বাসটা গলার কাছে গড়গড় একটা শব্দে আওয়াজ তুললেও একসময় তাও আর শোনা যায় না। একসময় শেষ নিঃশ্বাসটা দেহ থেকে খসে যায়, ঝরে-পড়া নক্ষত্রের মতো। মায়ের অদৃশ্য নিঃশ্বাসটা এক লহমায় ছুটি নিয়ে চলে গেল অন্যকোনো জগতে।
আমার দাদা, বাবাকে ছাড়িয়ে নিতে অনবরত চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেন। দাদার শ্বাসের রোগ, বয়সও ঢের হয়েছে। বাবার সাথে অসম যুদ্ধটা করতে দাদার শরীরটাও আঁকুশি গাছের মতো নেতিয়ে পড়ল। অসহায় দাদা এরপরের ঘটনা সামাল দেওয়ার চিন্তা কুলিয়ে উঠতে না পেড়ে মাথায় হাত দিয়ে মেঝেতে ধপাস করে বসে পড়লেন। বাবা উদভ্রান্ত হয়ে বাইরে ছুটে গেলেন। উঠোনে অনেকক্ষণ পায়চারি করে এসে দাদার পাশে বসলেন। দু’জনের পরামর্শ আমি শুনতে পেলাম না, কিন্তু তাদের ইশারা ইঙ্গিত বুঝতে দেরি হল না।
শেষরাতে কৃষ্ণপক্ষের খণ্ডচাঁদটা আকাশে শেষ-জ্যোতি ঢেলে প্রস্থানের আয়োজন করছিল। সেসময় দাদা এবং বাবা মিলে মায়ের গলায় একটা শাড়ি পেঁচিয়ে ঘরের আড়ার সাথে লটকে দিলেন। এসব কিছুই আমার খুব নিকটে বলতে গেলে আমার উপস্থিতিতে ঘটে গেল। আমি নির্বাক সাক্ষী হয়ে রইলাম। যদিও আমি নির্বোধের মতো ঘুমের ভান করে তক্তপোশে পড়ে থাকার অভিনয় করলাম।
সূর্য জাগল। বেলা গড়াল। মায়ের ঝুলন্ত লাশ মাটিতে নামাতে আমাদের বাড়িতে থানার পুলিশ আসল। অবধারিতভাবে গাঁয়ের লোকের ঢল নামে আমাদের বাড়ির উঠোনে। মাকে এরা খুব ভালোবাসতো। মায়ের এমন কাজে তারা অবাক হয়ে যায়। আমি আর দাদা, ঘরের দাওয়ায় সারাদিন অথর্বের মতো বসে রইলাম। বাবা অনবরত প্রলাপ করে কাঁদছেন। সবাই বাবাকে সান্ত্বনা দেয়। একজন আত্নহত্যাকারীকে সমাজ কখনো ভাল চোখে দেখে না। মাও শেষ পর্যন্ত সকলের কাছে সেরূপ দোষে দোষী হয়ে নিথর দেহটা নিয়ে কবরে শুয়ে পড়লেন।
নানা মাকে শেষ দেখা দেখতে এলেন না। নানাকে অবশ্য আমি আগেও কোনদিন আমাদের বাড়িতে দেখিনি। এদিনও এলেন না। বড় কষ্ট পেয়েছেন। নানার ভবিষ্যৎ বাণী মিলে গিয়েছিল। মাও জীবিতকালে পারতপক্ষে নানার মুখোমুখি হতেন না। একটা অপরাধবোধ সবসময় মাকে তাড়িয়ে বেড়াত। ভেতরের তীব্র কষ্টের ছায়াটা মায়ের মুখে সবসময় লেপটে থাকত। তিনি অভিনয় করেও তা গোপন করতে পারতেন না। নানাবাড়ি হাঁটার পথ। নানা সপ্তাহে দু’দিন গঞ্জে যেতেন। মা ঠিক বেছে বেছে সে-দুদিন নানীকে দেখতে যেতেন। আমিও মায়ের সাথে যেতাম। নানা, বাড়ি পৌঁছার পূর্বে মা, হুড়োহুড়ি করে আমাদের বাড়ি ফিরে আসতেন।
মা চলে যাওয়ার মাসখানেক পর, বাবা রাজকন্যাকে হুট করেই ঘরে তুলে আনলেন।
একদিন দাদা আর আমি আমাদের নামার চকে খেড়ের নাড়া পোড়াতে যাই। ধান ঘরে তোলার পর দাদা সবসময় নাড়া জমিতে পুড়িয়ে দিতেন। নাড়া পুড়ে ছাইভস্ম হয়ে জমির উর্বরতা বাড়ায়।
নাড়াতে কেরোসিন পড়লে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠে। আমি ভয়ে দাদার লুঙ্গির খুঁট ধরে দূরে দাঁড়িয়ে দেখি। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেসময়ে কেউ একজনের কাছে বাবার দোজবর হওয়ার খবরটা আমরা পাই। দাদার মুখটা আমার মায়ের বিদায়ের দিনের মতো ছাইবর্ণ হয়ে উঠল। দাদা, আমাকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে প্রথমবারের মতো চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। দাদাকে আমি কাঁদতে সেই প্রথম দেখলাম। সেদিনও আমার চোখে পানি এল না। আমাদের ধানি জমিটায় আগুন আকাশ সমান উচ্চতা নিয়ে দাউদাউ করে জ্বলছিল তার সাথে দাদার চিৎকারের শব্দে আমার মনে হচ্ছিল পৃথিবীটার বোধহয় আজ কিয়ামত লেগে গেছে। বুকের ভেতর খুব বেশি মাত্রার কষ্টবোধের যন্ত্রণা ভোগ করছিলাম।
এরপর থেকে অবশ্য বাবার ঘরে প্রতিদিন শনিবার হয়। উৎসবের দিন। বাসনা-সাবান সর্বশরীরে ঘষে-মেজে, ঘনঘন গোসল করেন। সুগন্ধিও মাখেন আরও বেশি মাত্রায়। রাজকন্যাকে নিয়ে ঘটা করে বেড়াতে যান, সিনেমা দেখতে যান। মায়ের সেই ঘরটাতে রাতভর হাসি ভালোবাসার গল্পের আওয়াজ ভেসে বেড়ায়। মা চলে যাওয়ার পর আমার সে কামরায় আর যাওয়া হয় না। যতবার আমাদের কামরার সাথে লাগোয়া বাঁশের বেড়ার কাছে যাই আমার শরীর হিমশীতল হয়ে আসে। ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা চোখের সম্মুখে ভেসে উঠে। খুব বেকায়দায় না পড়লে আমি আমাদের কামরায়ও একা ঢুকি না।
রাত হলে শুধু দাদার বুকে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকি। দাদা আর আমার দিন কেটে যায় কোনো মতে। আমি দাদার বুকে মুখ গুঁজে মধ্যরাতে নিঃশব্দে কাঁদি। দাদাও চোখের পানিতে বুক ভেজান। নিজহাতে মায়ের লাশ ফাঁসিতে ঝুলানোর অনুতাপে সর্বক্ষণ চাপা কান্না কাঁদেন। বাবার অবহেলার খেসারত দিতে দাদা আমার মাকে অত্যধিক স্নেহ ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখতেন। দাদার কোন মেয়ে ছিল না। মাকে মেয়ের আসনে বসান দাদা। তাতে অবশ্য শেষ রক্ষা করতে পারেননি। সেই আপসোসে সারাক্ষণ জলন্ত-নাড়ার মতো জ্বলেপুড়ে ছাই হতে দেখি তাকে।
আজ আমার মায়ের পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পুরোপুরি একবছর পূর্ণ হল। সারারাত জেগে ছিলাম। বোধকরি দাদাও জেগে ছিলেন। ক্ষণেক্ষণে আমি তার দীর্ঘ নিঃশ্বাসের আওয়াজ পেয়েছি।
গতবারের চেয়ে এবছর শীতের প্রকোপটা একটু বেশিমাত্রায় পড়েছে। রাতের পরিচিত শব্দগুলোরও খানিক পরিবর্তন খুঁজে পাই। তাঁতিপাড়ার ল্যাংড়া সেই কুকুরটা আর নেই। মা চলে যাওয়ার পরপর সেটাও কোথায় জানি হাওয়া হয়ে গেল। বাবা আর রাতের বেলা ঘরের বাইরে যান না, বাবার এখন দিনরাত সারাক্ষণ ডাঙ্গায় নাও চলার মতো সময়। নতুন মায়ের সংসারে বাবা সুখের সাগর খুঁজে পেয়েছেন তবে আমি আর দাদা প্রতি মুহূর্তে নরক যন্ত্রণায় ভুগছি। এরকম অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও মায়ের শিখিয়ে দেওয়া সেই পুরনো অভ্যাসটা আমার মাঝে কেমন করে যেন রয়েই গেছে। কিংবা অদৃশ্য কোন শক্তির জোরে হয়তোবা! আমি নিজেও তার সঠিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাই না। বাবা নদীরঘাটে গোসলে গেলে অভ্যাস মতো আমি সাবানদানি হাতে বাবার পিছুপিছু হেঁটে যাই। বাবাও এসময়ে আগের মতো নীরবে হেঁটে চলেন।
আজও তার ব্যত্যয় ঘটে না। পৌষের আকাশে কুয়াশার পোড় একটু বেশি মাত্রায় লক্ষ করা যায়। সূর্যের আলো কুয়াশার সর ফুঁড়ে এখনো মাটিতে ঠিকঠাক পৌঁছতে পারেনি।
শিমুলগাছের ডালে বসে শিশিরভেজা দাঁড়কাকটা একটানা ডেকে যায়। বাবা সাবানের ফেনায়-ভরা শরীর ধুতে, ধোঁয়া-উঠা উষ্ণ-গাঙে গলা জলে নামেন। ঠিক তখন দাঁড়কাকটা ভেজা ডানায় ভর করে আলগোছে আমার নিকটে চলে আসে। বাবা সহসা জলের নিচে মাথা গোঁজেন। আমি অপলক সেদিকে তাকিয়ে থাকি। দাঁড়কাকটা আমার হাতের সন্নিকটে চলে আসে। আমি হাত বাড়িয়ে সাবানদানিটা এগিয়ে ধরি। বাবার শেষ নিঃশ্বাসের বুঁদবুঁদটা পানি ফোঁড়ে জলের ছাদে ভেসে উঠে। দাঁড়কাক নির্ভয়ে সাবান মুখে পুরে শিমুলগাছের ডালে ফিরে যেয়ে বসে।
বাবার নিথর-দেহটা ধীরে ধীরে জলের তলে তলিয়ে যায়। আমার বুকের ভেতর সেই কবে জেঁকে বসা কষ্ট-পাহাড়টা অবলীলায় গলতে শুরু করে। আমি বহুদিন পরে কষ্ট-শূন্য বুকে বাড়ির পথে পা বাড়াই।



আহা। বাবার নিথর-দেহটা ধীরে ধীরে জলের তলে তলিয়ে যায়। আমার বুকের ভেতর সেই কবে জেঁকে বসা কষ্ট-পাহাড়টা অবলীলায় গলতে শুরু করে। আমি বহুদিন পরে কষ্ট-শূন্য বুকে বাড়ির পথে পা বাড়াই।
নূরুল হক
জুলাই ০৭, ২০২৫ ০৫:৩৯