প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় ‘মরাকান্দির বিল’
লেখক পরিচিতি || আনিফ রুবেদ
লেখক ও গল্পকার। তিনি ১৯৮০ সালের ২৫ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার চামাগ্রাম নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এখন পর্যন্ত তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দশটি। উল্লেখযোগ্য গল্পের বই—মন ও শরীরের গন্ধ, দৃশ্যবিদ্ধ নরনারীগান, জীবগণিত; কাব্যগ্রন্থ—পৃথিবীর মৃত্যুদণ্ডপত্র, এসো মহাকালের মাদুরে শুয়ে পড়ি; এবং উপন্যাস—কালকাঠুরে। বর্তমানে থাকেন চাপাইনবাবগঞ্জে।
মরাকান্দি বিল || গল্পের সারাংশ
মরাকান্দি বিলের পথে এক কিশোরী চারজন রিরংসায় নিমজ্জিত দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে চরম নৃশংসতার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে। এই ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই সঙ্গে নিষ্ক্রিয় সাক্ষী হয়ে থাকে একটি ইঁদুর, একটি শিয়াল এবং একজন পিতা। এই ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে বিলের লোককথা, পশুদের রূপক আখ্যান এবং পিতার মানবীয় আবেগের জগৎ মিলে তৈরি হয়েছে এক অনন্য সাহিত্যিক ভূমি।
‘মরাকান্দির বিল’ গল্পের চুম্বক অংশ
কয়েক ধাপ এগুতেই সে দেখতে পায় বিপরীত দিক হতে একটা মানুষ এগিয়ে আসছে কিশোরীর শরীরের দিকে। লোকটা কেন আসছে সে বুঝতে পারে না। লোকটা কী ক্ষুধার্ত? এর মাংস খেতে আসছে? নাকি ওই চারজন যা করল এ লোকটাও মৃত মেয়েটার সাথে তাই করবে? শেয়ালটা ধন্দে পড়ে যায়। মানুষের প্রত্যেকটা আচরণ ধন্দে পড়ার মতো; জানোয়ারের দাঁত আঁত সরল কিন্তু মানুষের দাঁত আঁত দুইই জটিল। মানুষের একটা দাঁত অন্য জন্তুর একশ দাঁতের সমান। জানোয়ারের চোখ সরল ও স্বচ্ছ কিন্তু মানুষের চোখই জটিল আর ঘোলাজলের চেয়ে ঘোরালো। ধন্দে পড়লেও লোকটার সাথে দ্বন্দ্বে জিতবে মনোভাব নিয়ে সেও দৃঢ় পায়ে এগুলো।
আগে নয়, লোকটা এতক্ষণে শেয়ালটাকে খেয়াল করল; শেয়ালটার চোখে জ্বলজ্বল করছে লাল লালসা। সে শেয়ালের চোখে চোখ রাখল, শেয়ালটা তার চোখে চোখ রাখল। ও ও সে পরস্পরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।
একসময় লোকটা একটা ‘হুশ্শ্’ শব্দ করে। শেয়ালটা একটু পিছনে সরে। লোকটা এগোয়। এবার শেয়ালটা সাহস সঞ্চয় করে ‘খ্যাঁক’ শব্দ করে লোকটাকে ভয় দেখায়। লোকটা থমকে একটু পিছু সরে। শেয়াল এগোয়।
একবার ‘হুশ্শ্’ একবার ‘খ্যাঁক’ বেশ কিছুক্ষণ চলে। তারা খুব কম এগুতে পারছে কিন্তু আর পেছোয়নি কেউই। নিজের অংশ গ্রহণ করতে দারুণ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে দুপ্রাণী। মাঝখানে রাজকুমারীর মতো শরীর নিয়ে, নগ্ন শরীর নিয়ে ঘাসে পড়ে আছে কিশোরী; যেন রঙিন প্রজাপতির ছেঁড়া ডানা পড়ে আছে।
লোকটা ভাবছে, শেয়ালটা যদি মেয়েটির যে হাতে আংটি আছে সে হাতটা ছিঁড়ে নিয়ে চলে যায় তবে আর ধরতে পারবে না; আংটিটা হাতছাড়া হয়ে যাবে।
শেয়াল খেয়াল করল, লোকটা একটু থমকে গিয়ে পিছু সরলো; লোকটা রণে ভঙ্গ দিয়েছে; মাংসের মীমাংসা হয়ে গেছে; এ মাংস তারই; শরীর থেকে রণতরঙ্গ ঝেড়ে ফেলে শেয়াল।
কিন্তু শেয়ালটা কিশোরীর শরীরে মুখ ঠেকাতে যাবে এমন সময় লোকটা বাঁশের ফাবড়া নিয়ে দৌড়ে এসে শেয়ালের গায়ে বসায়। শেয়ালটা দ্রুত সরে দূরে গিয়ে দাঁড়ায়; ভাগ্য ভালো আগেই দেখে ফেলেছে নইলে শক্ত তরুদণ্ড তার মেরুদণ্ড ভেঙে দিত; আঘাত একটু লেগেছে কিন্তু তেমন না। শেয়াল কিশোর হাঁপায়।
লোকটা আংটিটা খুলে নিয়ে দাঁড়ায়। তার চোখ চকচক করে। এখনো শরীরে তাপ আছে। সে নাকের কাছে হাত দেয়। না, শ্বাস নেই। সে মেয়েটার দিকে তাকাল আবার; শরীরে কোনো পোশাক নেই শুধুমাত্র একফোটা পোশাক রয়ে গেছে কপালে; কপালের মাঝখানে উজ্জ্বল লাল টিপ।
‘মরে গেছে মেয়েটা’ বলে দীর্ঘশ্বাস মোচন করে চলে যায়। যেতে যেতে পিছন ফিরে দেখে শেয়ালটা মেয়েটার শরীরের দিকে এগুচ্ছে গুটিগুটি পায়ে; ঘাড় ভেঙে, হাড় ভেঙে খাবে; নে খা, মনের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করে খা। মেয়েটির লাশ রক্ষা করার মতো শক্তি নেই শরীরে; উৎসাহ নেই; বহুদূর থেকে সে আসছে।
মাংসের ব্যাপার মীমাংসিত এখন। তবুও শেয়ালটা আর একবার লোকটার চলে যাবার দিকে তাকায়; লোক চলে যাচ্ছে। কিশোরীর দিকে তাকায়; মেয়েটির বচনক্রিয়া শেষ হয়েছে অনেক আগেই কিন্তু মাংস টাটকা; পচনক্রিয়া শুরু হতে আরও সময় লাগবে। ভক্ষ্য লক্ষ্য করে দাঁত, মাড়ি, চোয়াল প্রস্তুত করে নিল কিশোর শেয়াল।
বিচারকের মন্তব্য
কয়েক মুহূর্তের কিছু ঘটমান দৃশ্যকে অ-মানব দৃষ্টিকোণ থেকে বিবৃত মুহূর্তগুলোর বর্ণনা পাঠককে মানুষেরই বিরুদ্ধে দাঁড় করায় এক গভীর বিচারের কাঠগড়ায়। রূপক কাহিনীর সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতার সূক্ষ্ম সন্ধিক্ষণটির বর্ণনায় উতরে গিয়েছেন গল্পকার। শব্দের সাথে শব্দের এক জীবন্ত শতরঞ্জি খেলায় যেন মেতে উঠেছিলেন লেখক। ছন্দময় গদ্য লিখেও পদ্যের বন্ধন থেকে ছিলেন মুক্ত। এই শিল্প-সার্থক রচনা পড়ার পরও মনে দীর্ঘস্থায়ী এক আবেশ রেখে যায়।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন