সুকুমার বড়ুয়ার জনপ্রিয় একগুচ্ছ ছড়া
|| সুকুমার বড়ুয়া ||
প্রখ্যাত ছড়াকার ও লেখক। জন্ম ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান থানার মধ্যম বিনাজুরি গ্রামে। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষা বেশি হয়নি। ফলে জীবনের শুরুতে বিচিত্র ধরনের পেশার কাজ করতে হয় তাকে। মেসের কাজ থেকে ফলমূল বিক্রির কাজও করেছেন। শেষ নাগাদ ১৯৬২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীর চাকরি পান তিনি। অনন্য প্রতিভার অধিকারী ও জনপ্রিয় ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া প্রাঞ্জল ভাষায় আটপৌরে বিষয়কেও ছড়ায় ভিন্নমাত্রা দেন। বিষয়-বৈচিত্র্য, সরস উপস্থাপনা, ছন্দ ও অন্তমিলের অপূর্ব সমন্বয় তাকে ছড়া সাহিত্যে কিংবদন্তী করে তোলে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ—পাগলা ঘোড়া (১৯৭০), ভিজে বেড়াল (১৯৭৬), চন্দনা রঞ্জনার ছড়া (১৯৭৯), এলোপাতাড়ি (১৯৮০), নানা রঙের দিন (১৯৮১), সুকুমার বড়ুয়ার ১০১টি ছড়া (১৯৯১), চিচিং ফাঁক (১৯৯২), কিছু না কিছু (১৯৯৫), বুদ্ধ চর্চা বিষয়ক ছড়া (১৯৯৭), নদীর খেলা (১৯৯৯), ছড়া সমগ্র (২০০৩), ঠিক আছে ঠিক আছে (২০০৬), কোয়াল খাইয়ে (২০০৬), ছোটদের হাট (২০০৯) ও লেজ আবিষ্কার (২০১০)। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, বৌদ্ধ একাডেমি পুরস্কার, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল শিশু সাহিত্য পুরস্কার, কবীর চৌধুরী শিশু সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেছেন। কিংবদন্তি এই ছড়াকার ২ জানুয়ারি ২০২৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার কিছু আলোচিত ছড়া প্রতিধ্বনির পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।

ছবি: অনলাইন হতে সংগৃহীত
|| চিন্তা নিয়ে ভাবনা ||
চোখেও দেখা, হাতেও ধরা যায় না কোনো দিন তা,
কেমন করে মাথায় ঢোকে এত রকম চিন্তা?
কোথায় তাদের চাষ হল বা কোথায় যে উৎপত্তি
খবরটুকু কেউ কোনো দিন পায় নিকো এক রত্তি।
মাথার ভেতর ঢুকেই সে যে জড়িয়ে ধরে মনকে
মিথ্যা এবং ভুলের পথে নেয় সে কত জনকে।
চিন্তা কারুর মাথায় ঢুকে দেয় ফিরিয়ে ভাগ্য,
ঘর ছেড়ে কেউ বাইরে এসে লাভ করে বৈরাগ্য।
চিন্তা কারুর ভালোই করে—কারুর করে মন্দ,
কেউ হয়ে যায় পাগল—কারুর চোখ থেকেও অন্ধ।
মাথায় কারুর টাক পড়ে আর কেশ যে ‘অকালপক্ক’
হাটবাজারে পথে-ঘাটে দেখবে কত লক্ষ।
এসব দেখে চিন্তাবিদে ভাবেন হয়ে মত্ত
চিন্তা করে লেখেন পুঁথি—শেখেন মনস্তত্ত্ব।
নানান যুগে চলতে থাকে নানান রকম চিন্তা,
জোড়াতালি পড়ে পড়ে বাড়ছে প্রতিদিন তা।
চিন্তার যে কেরামতি দেখাই কত যুক্তি
চিন্তা থেকে কেউ কখনো পায় না তো আর মুক্তি।
অসীম আকাশ, অকূল সাগর, আজ মানুষের বাধ্য,
চিন্তাসাগর পাড়ি দেবার নেই যে কারুর সাধ্য।
|| এমন যদি হতো ||
এমন যদি হতো
ইচ্ছে হলে আমি হতাম প্রজাপতির মতো।
নানান রঙের ফুলের পরে
বসে যেতাম চুপটি করে
খেয়াল মতো নানান ফুলের সুবাস নিতাম কতো।
এমন হতো যদি
পাখি হয়ে পেরিয়ে যেতাম কত পাহাড় নদী।
দেশ বিদেশের অবাক ছবি
এক পলকের দেখে সবই
সাতটি সাগর পাড়ি দিতাম উড়ে নিরবধি।
এমন যদি হয়
আমায় দেখে এই পৃথিবীর সবাই পেত ভয়।
মন্দটাকে ধ্বংস করে
ভালোয় দিতাম জগৎ ভরে
খুশির জোয়ার বইয়ে দিতাম এই দুনিয়াময়।
এমন হবে কি?
একটি লাফে হঠাৎ আমি চাঁদে পৌঁছেছি!
গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে
দেখেশুনে ভালো করে
লক্ষ যুগের অন্ত আদি জানতে ছুটেছি।
|| ঠিক আছে ||
অসময়ে মেহমান
ঘরে ঢুকে বসে যান
বোঝালাম ঝামেলার
যতগুলো দিক আছে
তিনি হেসে বললেন,
ঠিক আছে ঠিক আছে।
রেশনের পচা চাল
টলটলে বাসি ডাল
থালাটাও ভাঙাচোরা
বাটিটাও লিক আছে
খেতে বসে জানালেন,
ঠিক আছে ঠিক আছে।
মেঘ দেখে মেহমান
চাইলেন ছাতাখান
দেখালাম ছাতাটার
শুধু কটা শিক আছে
তবু তিনি বললেন,
ঠিক আছে ঠিক আছে।
|| ভেজাল ||
খাদ্যে ভেজাল পথ্যে ভেজাল
ভেজাল শখের জিনিসে,
চলছে ভেজাল দিল্লি-ঢাকা
বিলেত-জাপান-ভিনিসে।
ভেজাল কত রইল মিশে
মানুষজনের চরিত্রে,
অমনি শাদা, অমনি কালো,
অমনি কেন হরিৎ-রে?
হিংসাতেও ভেজাল থাকে
নইলে আবার মিলে যে,
স্নেহের ভেজাল ধরতে পারি
কানমলা-চড় কিলে যে।
লিখতে দেখি ভেজাল কালি!
কলম হল ঠাণ্ডারে,
হায় রে কত ভাষার ভেজাল
বঙ্গভাষার ভাণ্ডারে।
ভেজাল সারের ফসল খেয়ে
ঢুকছে ভেজাল মস্তকে,
নইলে সারা জীবন ধরে
ভুলের হিসাব কষত কে?
জীবন শুধু ভেজাল নহে
ভেজাল থাকে মরণে,
নইলে কেন অর্ঘ্য দেব
স্বর্গবাসীর স্মরণে?
ভেজাল হবে এই পৃথিবী
অন্য গ্রহের বন্ধনে,
খাঁটির শোকে মরছি আমি
বুক ভাসিয়ে ক্রন্দনে।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন