কবি দিলওয়ার: পৃথিবী স্বদেশ যার
গার্সিয়া মার্কেজের ‘দেল আ মোর ই অত্রস দেমোনিয়স’ তথা ‘অফ লাভ অ্যান্ড আদার ডেমনস’ উপন্যাস নিয়ে ‘প্রেম-দানোর গল্প’ নামের নাতিদীর্ঘ অথচ চমৎকার লেখাটি দেবেশ রায় শেষ করেছেন এই এক বাক্যে যে—মার্কেস আমাদের বাংলা ভাষার লেখক। মধ্যযুগের খ্রিস্টধর্মের গভীর অধ্যয়ন এই উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন মার্কেজ। দেবেশ রায় অবশ্য এই ব্যবহার করাকে বলতে চান গোপন করা। তাঁর মতে, ঔপন্যাসিকের ব্যাপক অধ্যয়নের বিস্মরণই প্রাচীন ব্যাপারগুলোকে উপন্যাসের অবিচ্ছেদ্য উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করে। মার্কেজের এই উপন্যাসে প্রাচীনতার ব্যবহারের নান্দনিক ধরন দেবেশ রায়কে তিনটি বাংলা উপন্যাসের কাছে নিয়ে যায়—বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা, বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী এবং কমলকুমার মজুমদারের অন্তর্জলী যাত্রা। এই তিন বাংলা উপন্যাস এবং মার্কেজের উপন্যাসে চরিত্র গড়ন ও পরিবেশ পরিস্থিতি নির্মাণে প্রাচীনতার ব্যবহারের যে সাযুজ্য তিনি লক্ষ্য করেন তাতে দেবেশ বাবুর মনে হয়—‘অফ লাভ অ্যান্ড আদার ডেমনস’ আমাদের বাংলা ভাষাতে লেখা একটি গল্প, ‘পথের পাঁচালী’ ‘কপালকুণ্ডলা’ ‘অন্তর্জলী যাত্রা’-র মতো। আর এ কারণেই দুই মহাদেশের ভৌগলিক কালিক ও ভাষিক দূরত্ব মুছে গিয়ে তাঁর মনে হয় মার্কেজ ‘আমাদের বাংলা ভাষার লেখক’।
কবি দিলওয়ারকে নিয়ে ভাবতে গিয়ে দেবেশ রায়ের এই বুঝাপড়ার কথা মনে পড়ার সংযোগসূত্র এই যে বহু বছর আগে এভাবে দেবেশ বাবুর মতো করেই মার্কিন দেশের বিখ্যাত কবি নর্মান রস্টান (১৯১৩-১৯৯৫) আমাদের দিলওয়ারকে আপন করে নিয়েছিলেন। কৈশোর পেরিয়ে যুবক হয়েছেন কি হন নাই এমন বয়সে লেখা দিলওয়ারের ইংরেজি কবিতা পড়ে হয়তো দেবেশ রায়েরই মতো রস্টানের মনে হয়েছিল. ‘আরে এ তো বাংলাদেশ নয় মার্কিন দেশের কবি’। ওই কবিতার কোনো কোনো পঙক্তিকে ‘Most Striking’ বলেছিলেন রস্টান এবং ওই কবিতায় দিলওয়ার যে বিষাদ আবিষ্কার করেছিলেন রস্টানের মনে হয়েছিল এই বিষাদ মার্কিন জনগণের তখনো পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত অন্তর্বস্তু।
সে বিখ্যাত ঘটনা দিলওয়ারের সচেতন পাঠক মাত্রই জানা। মেরিলিন মনরোরকে নিয়ে মার্কিন ম্যাগাজিন লাইফ ইন্টারন্যাশনাল-এ যে ফটোস্টোরি ছাপা হয় তার রচয়িতা ছিলেন নরম্যান রস্টান, মনরোর সাথে যাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের এবং যিনি পরবর্তীকালে মেরিলিন মনরোকে নিয়ে এযাবৎকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘মেরিলিন: আনটোল্ড স্টোরি’ লিখেন। ওই ফটোস্টোরি পড়ে দিলওয়ার সেই কবিতাটি লিখেন যা রস্টানের হাতে গিয়ে পৌঁছালে রস্টান পড়ে এতোটাই চমকে উঠেন যে তাকে সারা জীবনের মতো দিলওয়ারের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে হয়। কবিতাটি বহুল পঠিত, তবু এখানে বিশেষ কারণে আবার পড়ে নেয়া যাক—
You may call her
A bad girl
A mad girl,
A morbid human fright.
But I know, O listen to me
She is a
Sad girl,
A red girl
Of Zodiacal love and light.
When the night is dead
When the sleep is rare,
I find her heart so sad,
I find her in a prayer.
So I know, O listen to me
She is a
Sad girl,
A red girl
Of Zodiacal love and light.
—A Glance at Marllyn Monroe
(To poet-friend Norman Rosten)

দিলওয়ার || ছবি সংগৃহীত
অসংখ্য বাংলা কবিতার বদলে ইংরেজি কবিতাটা এখানে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য এটা বুঝানো নয় যে এই কবিতা দিলওয়ারের কবি জীবনের সবচে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, বরং আজকের কবি কবিতাকর্মী কিংবা পাঠক দিলওয়ারের দিকে কিভাবে ফিরে তাকাবে বা তাকে পর্যালোচনা করবে সে প্রসঙ্গেও এ কবিতার একটা দিকনির্দেশক গুরুত্ব আছে। এই কবিতার মাধ্যমে বুঝা যায় যৌবনের প্রারম্ভেই দিলওয়ার অর্জন করেছিলেন সুক্ষ্ণ অনুভব, স্বচ্ছ দৃষ্টি ও শিল্পীর সাহস। আমরা আজকে যখন তাঁর বিপুল সংখ্যক কবিতা পাঠ করতে যাব তাঁর অধিকাংশ কবিতাকেই হয়তো আমাদের নান্দনিক রুচি ও অভিজ্ঞতা থেকে দূরবর্তী মনে হবে। হয়তো পুঁজির সর্বনাশী সর্বগ্রাসী ওয়ার্ল্ড অর্ডার এবং উত্তর-আধুনিক ও উত্তরসত্য খচিত ভাষা-বাস্তবতার বিপরীতে দিলওয়ারের কাব্যমনস্তত্ত্ব আমাদের মনে গভীর শূন্যস্থান তৈরি করতে পারে। কিন্তু এই পৃথিবীতে যেহেতু এখনো যুদ্ধ আছে, ধর্মোন্মাদনা আছে, শোষণ-বঞ্চনা আছে, তার বিপরীতে আছে যুদ্ধবিরোধী তৎপরতা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-সংগ্রাম, আছে প্রেমে ব্যাকুল সহৃদয়মননসংবাদ আর যেহেতু বাংলা কবিতায় এইসব বাস্তবের বিপরীত এবং বিপরীতের বাস্তব লেখার জন্য লাগবে সূক্ষ্ম সংবেদন ও সাহসের সমাচার, দিলওয়ারের মতো কবি সেহেতু প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণা হিসাবে বারবার সামনে হাজির হবেন। এ প্রসঙ্গে ভীষ্মদেব চৌধুরীকে দেয়া সাক্ষাৎকারের একটি অংশ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যেখানে খেয়াল করা যায় যে জটিল সামাজিক পরিস্থিতিগুলি মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে দিলওয়ারের পর্যবেক্ষণ কতোটা সাহসী সুদূরস্পর্শী ও মর্মভেদী—
প্রশ্ন—১৯৭৩ সনে সিলেটের কোর্ট চত্বর সংলগ্ন অস্থায়ী শহীদ মিনারটি ধর্মান্ধ জনতা জ্বালিয়ে দিলে—‘ভাষা: জাতির ঈমান’ শিরোনামায় আপনি একটি দীর্ঘ বিবৃতি স্থানীয় পত্রিকায় ছাপিয়েছিলেন। ঈমানের সঙ্গে ভাষার সম্পর্কসূত্রটি একটু ব্যাখ্যা করে বলবেন কি? বাংলা ভাষার ভবিষ্যত সম্পর্কে আপনি আশাবাদী নাকি আশঙ্কাবাদী ?
দিলওয়ার: প্রথমে আসা যাক ঈমান শব্দটির আত্মিক ও প্রায়োগিক ব্যাখ্যায়। আমার কাছে বিশ্বজনীন একটি সত্য হচ্ছে এই যে, বাস্তবে ভাষাসহ যা কিছু মানুষের একান্ত প্রয়োজনীয়,তার একমাত্র কারিগর মানুষ। কৈশোরে একটি বইয়ের বহুল প্রচারের খবর পড়েছিলাম। সেই বইটির নাম—‘দুঃখীর ঈমান’। গ্রন্থকার তুলসী লাহিড়ী। ঈমান বলতে সেই সত্যকে বুঝায়, যা বংশ পরম্পরায় বৃহত্তর মানুষের কল্যাণের জন্য দ্বীধাহীন প্রেরণা যুগিয়ে যায়। চীনের প্রাচীর এরূপ ঈমানের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। প্রসঙ্গত এটাও বলা যায়, একবার একজন লোক হযরত মোহাম্মদের কাছে প্রশ্ন করেছিলো—‘সর্বোত্তম ঈমান কী?’ তিনি জবাবে বলেছিলেন—‘নম্র আচরণ’।
দিলওয়ারের কবিতার শৈলী নিয়ে সামগ্রিক মূল্যায়ন এখনও হয়নি। বেশিরভাগ আলোচক ঘুরেফিরে বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করেই আলাপের বিস্তার ঘটিয়েছেন এবং তার কবিতার ওপর দ্রোহ প্রেম ও প্রগতিশীলতার ধারকবাহকের গুরুতর ভার চাপিয়ে আলোচনাকে করে তুলেছেন একপেশে ও চর্বিতচর্বণ। তাঁর ‘গণমানুষের কবি’ অভিধা সাধারণের কাছে তাঁর কবিতার বিষয়বস্তুকে অত্যুজ্জ্বল করলেও তার কবিকুশলতা কিংবা শৈলীর দিকটিকে করেছে অনুল্লেখ্য। তার ওপর শৈলী বা আঙ্গিক নির্মাণ নিয়ে যে অল্পস্বল্প কথা হয়েছে তাতে বিচার বিশ্লেষণের বদলে আলগাপটকা মন্তব্য করার ঝোঁকটাই প্রধান হয়ে উঠেছে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে—দেশের কথিত বিদগ্ধ সমালোচকের কাছে দিলওয়ার হয়ে উঠেছেন এমন এক কবি যার কবিতায় ‘শৈলীর কারুকাজ ছিল কম ,আবেগ ছিল বেশি।’ বলাবাহুল্য সেসব সমালোচকের মুখে চপেটাঘাত করার মতো কবিতা দিলওয়ার অনেক লিখেছেন যার দু একটা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে পড়ে নেয়া যায়—
পদ্মা তোমার যৌবন চাই
যমুনা তোমার প্রেম
সুরমা তোমার কাজল বুকের
পলিতে গলিত হেম।
সাগরদুহিতা এই বাংলার
নিশিগন্ধার রাতে
ঊর্মিদোদুল জনক আমার
মিলেছে মায়ের সাথে
সূর্যমুখীর সহোদরা এই
নারীর গর্ভকোষে,
বাংলার আমি জন্ম নিয়েছি
জারিত স্বর্ণরসে !
পদ্মা যমুনা মেঘনা
গঙ্গা কর্ণফুলী,
তোমাদের বুকে আমি নিরবধি
গণমানুষের তুলি !
কতো বিচিত্র জীবনের রং
চারদিকে করে খেলা,
মুগ্ধ মরণ বাকে বাকে ঘুরে
কাটায় মারণ বেলা !
রেখেছি আমার প্রাণ স্বপ্নকে
বঙ্গোপসাগরেই,
ভয়াল ঘূর্ণি সে আমার ক্রোধ
উপমা যে তার নেই !
এই ক্রোধ জ্বলে আমার স্বজন
গণমানবের বুকে—
যখন বোঝাই প্রাণের জাহাজ
নরদানবের মুখে !
পদ্মা সুরমা মেঘনা যমুনা—
অশেষ নদী ও ঢেউ
রক্তে আমার অনাদি অস্থি,
বিদেশে জানে না কেউ !
—রক্তে আমার অনাদি অস্থি
আমি তো হোমার নই অথবা মহর্ষি দ্বৈপায়ন
স্বর্লোক লালিত নয় আমার প্রজ্ঞার পলিমাটি
ইন্দ্র কি জীয়ুস গড়ি, নেই তো তেমন কোনো কাঠি
রসিক সোনায় তৈরী। জানিনে বিদ্যায় সম্মোহন!
হেলেন, গরুড় দেখি স্বচ্ছন্দে জন্মায় ডিম্ব থেকে
বিস্ময়ে ব্যথিত বোধ! দেয়ালে ধ্যানস্থ টিকটিকি
অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে, ভয়াল অতীত আনে ডেকে
যাত্রারম্ভে সরীসৃ্প, দৃষ্টিতে নরক ধিকিধিকি!
আমি ব্যর্থকাম তাই তোমাকে স্বর্গীয় সুখ দিতে
লোকালয়ে করি বাস, নশ্বরতা আমার শিকারী।
এক মুঠো শস্য শুধু এ জীবনে অভ্রান্ত বিলাস,
শস্যের সুগন্ধ নিয়ে যারা তাই আসে পৃথিবীতে
তোমাকে কবচ করে তাদেরি শ্রীকণ্ঠে দিতে পারি,
ট্রয়ে-কুরুক্ষেত্রে নয়, জনারণ্যে প্রেমের বিকাশ।
—প্রেম, জনারণ্যে
এমন অনেক কবিতায় দিলওয়ার তাঁর সমালোচকদের আরও সচেতন প্রয়াসী হবার পথ খোলা রেখেছেন; এবং শুধু তাই নয়, কবি হিসেবে যে জীবন তিনি যাপন করেছেন তার পদ্ধতি নবীন সাহিত্যকর্মীদের জন্য হয়ে উঠেছে এক পথনির্দেশিকা। আমাদের সাহিত্য-রাজনীতির মোড়লিপনা দীর্ঘদিন তার গলায় মফস্বলি কবি তকমা পড়িয়ে রেখেছে, তবু তিনি রাজধানীমুখী হননি, নিজের শ্রম ও সাধনায় মফস্বলে থেকেই অর্জন করেছেন বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি—‘পৃথিবী স্বদেশ যার/আমি তার সঙ্গী চিরদিন।’ আজও যখন আমাদের সাহিত্য-রাজনীতির সেই একই করুণ দশা দেখি, রাজধানীর কুতুবেরা এখনো এই মনোভাব নিয়ে ছড়ি ঘুরাচ্ছেন যে ঢাকা বাংলা সাহিত্যের রাজধানী এবং ঢাকায় বসে সাহিত্য করা মানে অটো এস্টাব্লিশমেন্ট পাওয়া, তখন দিলওয়ারের দোহাই দিয়ে তাদের বলতে ইচ্ছা করে—সাধু সাবধান!
আমরা যারা রাজধানী থেকে দূরে কথিত মফস্বলে বসে সাহিত্য করি তারা মনে করি, সাহিত্যের কোনো স্থায়ী রাজধানী হয় না, সাহিত্যের রাজধানী প্রতিদিনই স্থান পাল্টায়, যখন যেখানে উৎকৃষ্ট সাহিত্য লিখিত হয় সাহিত্যের রাজধানী গোপনে সেখানে স্থাপিত হয়ে যায়, সেটা ঢাকা হোক কি ময়মনসিংহ কি খুলনা কি রংপুর কি রাজশাহী। যেমন—দিলওয়ারের কোনো কোনো কবিতা পড়লে মনে হয় বাংলা সাহিত্যের রাজধানী হল সিলেট। আর এই যে মনে হওয়া এটাই কবি হিসেবে দিলওয়ারের অনন্যতা।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন