সুমনা আক্তারের বিষণ্ণ কাঁথা ও পূর্বনারীগণ

অ+ অ-

 

কাঁথা রাকবাইন নি, কাঁথা
নকশী কাঁথা।

এই হাঁক দিয়ে যখন প্রথম কাঁথা বিক্রি করতে দেখি, তখন আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মাথায় ছিল শীলা বসাকের নকশী কাঁথার নারীরা। আমার মাথায় ছিল সেই নকশী কাঁথারা, যারা বহুদিন ধরে জমানো মনের কথা নিয়ে ঘরের বিছানায় পড়ে থাকে।

এমনকি নকশী কাঁথা না হলেও একটা সাধারণ কাঁথায়ও কত গল্প জমে থাকে, তা আমি দেখেছি আমার মায়ের কাঁথা সেলাইয়ে। ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির উঠানে মা যখন কাঁথা সেলাইয়ে বসত, তখন হয়তো ছাগল বিছরার ধান বা ক্ষেতের ধান খেয়ে ফেলছে, কেউ এসেছে বিচার নিয়ে; তারপর সেই হইচই চিল্লানি। মা অনেকক্ষণ উঠানে নাই। আমি কাঁথার ওপর বসে আছি। কত পরে মা এসেছে মনে নাই। তবে তার ক্লান্তি ছিলএমন একটা ছায়া মনে রয়ে গেছে। এসে হয়তো অনেকক্ষণ আধা সেলাই কাঁথার উপর বসে থাকত। তারপর আবার সেলাই করত। মায়ের এই কাঁথা আমরাই তিন ভাইবোনেরাই গায়ে দিতাম। কিছুদিন আগ পর্যন্ত মায়ের সেলাই করা কাঁথাই গায়ে দিয়েছি। এ এক রকম কাঁথা।

আরও রকম দেখেছি নিউমার্কেটে, আড়ং বা সোনারগাঁয়ে।

গুলিস্তানের বাজারের যে তাড়া, পাইকারি বাজারের যে হরেদরে মালের গণনাএই অনুভূতি এই সকল কাঁথার বাজার প্রক্রিয়ায় মাথায় আসে। কতদিনে শেষ হবে, কত করে দিবেন, কয়টা করলে কত পাবএইসব হিসাবের গল্প; দেখলেই মনে খেলে যায়। এই গল্পটা হিসাবের ভালো বা মন্দের গল্প না, মায়ের কাঁথায় এই হিসাবগুলো তখন শুনতে পাইনি। তবে বর্ষা আসার আগে উঠানে পেতে ফেলা কাঁথাটা শেষ করতে হবে এমনটা মাথায় আছে।

সুমনার কাঁথায় কতকগুলো শব্দ নারীর শরীরজুড়ে স্থান পেয়েছে। যতদূর মনে করতে পারি, ছবির হাটে করা একটি পারফরম্যান্সে সুমনা প্রথম শরীরকে ব্যবহার করেছিলেন, শরীরকে বিমানবিক শিল্পের প্রণোদনায় একটি ফ‍‍র্ম হিসেবে নয়, বরং শরীর নিয়ে এই শহর-গ্রামের রাস্তায়, বাসে, আনাচে-কানাচে পুরুষের যে অচেনা আচরণ ও দূরত্ব, তা ঘুচিয়ে দিলে কী হয়, সে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন তিনি।

পারফরম্যান্স, আইডেনটিটি ক্রাইসিস (২০১৫)

শিল্পী সুমনা আক্তার সম্প্রতি সুজনী কাঁথার মতো একটি কাঁথা সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। বিষণ্ণ কাঁথা নামে এক কাঁথা প্রকল্পে তিনি এ ধরনের কাঁথা বুনে যাচ্ছেন বা বুনে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। তার এই প্রকল্প ধারণা নিয়েও কথা বলার আছে। তবে আজকে নয়। আজকে প্রথম দেখার ভালোলাগাটুকু নিয়েই কথা লিখতে চাইছি।

সুমনার কাঁথায় কতকগুলো শব্দ নারীর শরীরজুড়ে স্থান পেয়েছে। যতদূর মনে করতে পারি, ছবির হাটে করা একটি পারফরম্যান্সে সুমনা প্রথম শরীরকে ব্যবহার করেছিলেন, শরীরকে বিমানবিক শিল্পের প্রণোদনায় একটি ফ‍‍র্ম হিসেবে নয়, বরং শরীর নিয়ে এই শহর-গ্রামের রাস্তায়, বাসে, আনাচে-কানাচে পুরুষের যে অচেনা আচরণ ও দূরত্ব, তা ঘুচিয়ে দিলে কী হয়, সে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন তিনি। দিনের আলো চলে যাওয়ার পর পারফরম্যান্সটি করেছিলেন, এবং দশ‍‍র্ক সারিতে পুরুষই ছিল যথারীতি চোখে পড়ার মতো। সুমনা তাদেরকে আহবান করেন তার সাথে কুলাকুলি করতে। যারা অলিতে-গলিতে মেয়েদের শরীরে হাত দিয়ে ভদ্রলোক সেজে বসে থাকেন, তারা সুমনার আহ্বানে জড় হয়ে যান। অস্বস্তিবোধ করেন। সুমনার এই কাজগুলো শিল্পের তাত্ত্বিক বোঝাপড়া থেকে জন্ম নেয়নি। তবে এই প্রকাশমাধ্যমের সাথে পরিচয়, চিন্তা প্রকাশের পথ করে দিয়েছে। সুমনা তার নিজের জন্য যথাযথ মাধ্যমগুলোকে ভাবনার সাথে মিলিয়ে আবিষ্কার করতে সক্ষম। তার যাপিত জীবনের অসহনীয় অবস্থা ও তা না মানার মনোভঙ্গি থেকে যেমন তার ভাবনা আকার পায়, তেমনি তার শিল্পের মাধ্যম মেয়েলি যাপনকে একইসঙ্গে স্বীকার ও প্রশ্ন করেই বিকশিত।

সুমনা যে সকল সংকটকে প্রকাশ করেন, তা সকল নারীর যাপিত জীবনের ইতিহাস ও বর্তমান। কিন্তু সুমনা ভিন্ন হয়ে ওঠেন, কারণ তিনি তা প্রকাশ না করে থাকতে পারেন না বলে। দ্বিতীয়ত, তার প্রকাশভঙ্গিটি পিতৃতান্ত্রিক শিল্পব্যবস্থার মুখাপেক্ষিতাকে সহজাতচর্চায় প্রশ্নের মুখে ফেলে তো বটেই; তার চেয়ে বেশি তিনি সমসাময়িক শিল্পচর্চায় নিজেকে তার পূর্বনারীদের উত্তরাধিকার হিসেবে সামনে আনার একটি প্রবণতার দিকে হাঁটেন।

সম্ভবত, ২০১৫ সালে সুমনা একটি পারফরম্যান্স করেছিলেন। শরীরজুড়ে লিখেছিলেন তার কাঁথায় ব্যবহৃত শব্দগুলোই। কাঁথা নিয়ে তিনি কাজ শুরু করেন ২০২০ সালে। বলে রাখা ভালো, সেলাইয়ের সাথে সুমনার সম্পর্কও যাপনের মধ্যেই তৈরি হয়েছে। তিনি নিজের পোশাক নিজে সেলাই করেন।

২০২৪-এর নভেম্বরে কলাকেন্দ্রের একটি প্রদ‍‍র্শনীতে প্রদর্শিত চিত্রকর্মে রঙ ও রেখায় বন্ধ্যা, মাল, বেপর্দা, ডাইনী, কালী-এই রকম কিছু শব্দের দেখা মেলে। তারই ধারাবাহিকতায় বলা যায়, এই কাঁথাটির জন্ম।

শীলা বসাক দেখিয়েছেন কীভাবে নারীর আল্পনার মোটিফ ও কাঁথার মোটিফ এক হয়ে আছে। এরা একটি নির্দিষ্ট সামষ্টিক সত্তার ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব করে। মাধ্যম ভিন্ন হলেও নারী তার সমসাময়িক যে শিল্পভাষ্য তৈরি করেছেন, তার মধ্যে একটা যোগসূত্র চিহ্নিত করা যায়।

চলমান প্রকল্প বিষন্নকাঁথা, শিল্পী সুমনা আক্তার (২০২৪) || সূচিশিল্পী: Sananda Saha Bhabna

নারায়ণগঞ্জ চারুকলার ছাত্রী ও শিক্ষক (বর্তমানে কর্মরত নন) সুমনার পারফরম্যান্স আমাকে মুগ্ধ করেছিল জীবনের সংকটকে প্রকাশ করার তাগিদ থেকে পারফরম্যান্স করার চেষ্টা করছিলেন বলে। ভাবনা বা শিল্পের বিষয় জীবনের বাইরে খুঁজতে যাননি। ধার করা বুদ্ধি দিয়ে শিল্পকে দেখার বদলে সাহস করে নিজেকে প্রকাশ করতে শুরু করেছিলেন।

শীলা বসাক দেখিয়েছেন কীভাবে নারীর আল্পনার মোটিফ ও কাঁথার মোটিফ এক হয়ে আছে। এরা একটি নির্দিষ্ট সামষ্টিক সত্তার ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব করে। মাধ্যম ভিন্ন হলেও নারী তার সমসাময়িক যে শিল্পভাষ্য তৈরি করেছেন, তার মধ্যে একটা যোগসূত্র চিহ্নিত করা যায়।

সুমনাও নারী। তিনি ছবি আঁকা থেকে পারফরম্যান্সের দিকে হেঁটেছেন। পারফরম্যান্স শিল্পী হিসেবেই সুমনা আমাদের সামনে আসতে শুরু করেন। প্রথাগতভাবে নারীদের ব্রতের মতো অসংখ্য পারফরম্যান্স করতে দেখা যায়। ব্রতী নারী সকলের মঙ্গল কামনায় ব্রতের পারফরম্যান্স করতে করতে সংসার জাল বুনতে থাকেন। যারা এখন ব্রতে বিশ্বাস করেন না, তারাও একই উদ্দেশ্য সাধনে সংসারে অন্যভাবে ক্রিয়া করেন। দৃশ্যরূপে এই দুই দলের পার্থক্য থাকলেও উদ্দেশ্যে মৌলিক পার্থক্য নেই।

সুমনা পিতৃগণ ও পুত্রগণের মঙ্গলসাধনের জন্য ব্রতী নারীর মতো কোনো পারফরময়ান্স করেন না।

সুমনা ওই সকল ব্রতী নারীর অমঙ্গলের চিহ্নগুলোকে প্রশ্ন করতে করতে তার যাপনের লড়াইটা এগিয়ে নিয়ে যান। এইখানে সুমনা আত্মভোলা, পিতৃকর্তৃত্বের সেবক নারী থেকে বিচ্ছিন্ন হন, কিন্তু তিনি সামষ্টিক চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন হন না। তিনি যে প্রশ্নগুলো দ্বারা, নারী শরীর নিয়ে এই সমাজে বড় হতে হতে বিদ্ধ হয়েছেন, সেই প্রশ্নগুলোকেই পারফরম করেন এবং সমাজের সমষ্টিকে আহ্বান করেন। সেই আহ্বানে আত্মবলিদান না, বরং পুত্রের সাথে সাথে অকন্যা ও অপুত্রর এক বৃহত্তর জগতের দিকে সবাইকে আকর্ষণ করতে থাকেন।

‘এক দেশের গালি আরেক দেশের বুলি’সিরিজের দুইটি কাজ, মিশ্র মাধ্যম (২০২৪)

সুমনা তার নিজের শরীরকে প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে নিজের শরীরকে সমাজের দাসত্ব থেকে মুক্ত করার লড়াই করেন এবং এই লড়াই সকল নারীর হয়ে ওঠে। সুমনা পূর্বনারীর মতো ব্রতের উদ্দেশ্যের দিকে হাঁটেন না, বরং তিনি তাদের পারফরম্যান্সকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন নারীর নিজের দিকে। কাঁথা ও আল্পনায় নারীর আকাঙ্ক্ষা, কী চাই! সুমনা একই কথা ও সুর, এবং রেখা ব্যবহার করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন করেছেন কে তুমি ব্রতিনী? কে তুমি কাঁথায় বুনে যাচ্ছ চাহিদার কথার জাল? এই চাহিদার শিল্পীতোমার পরিচয় কী? তুমি কি এই চাহিদার উৎপাদক? সুমনা তার পূর্বনারীদের উত্তরাধিকার, তিনি ঋণ নিয়েছেন এবং পূর্বজনদের বাস্তবতা বর্তমানের সামনে মেলে ধরেছেন। পূর্বনারীদের মাধ্যম ও মেয়েলি পরিচয়কে অস্বীকার করেননি সুমনা। বরং সেই সকল মাধ্যমের মধ্যে নারীর যে ইতিহাস যেভাবে নারী বলেছে, সেই একই ধারাবাহিকতায় সুমনা তার নিজের তথা সকল নারীর কথা বলছেন।

সুমনা বলতে বলতে যখন যেতে থাকেন, তখন সমসাময়িক নারীর তিনি যে ইতিহাস বুনে যান, তা পূর্বনারীদের সৃষ্টিকে উদ্দীপ্ত করে এবং ভবিষ্যৎ নারীর জন্য সাহস সঞ্চয় করে।

সুমনা পূর্বনারী ও ভাবীনারীর মধ্যে কোনো বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেন না, বরং ধারাবাহিকতা তৈরির এক সাহসী নির্মাতা হয়ে ওঠেন। তিনি নারীর পরিচয় উন্মোচন করেন, কিন্তু অতীত নারীকে তার সৃষ্টিতে বলবৎ রাখেন।

তার কাঁথা প্রকল্প সেই সাহস ও যাপনের ভাষা ও ভাষ্য।