অমূল্য রতন

অ+ অ-

 

অফিসে ঢুকেই আবুল কাশেমের মনটা খারাপ হয়ে গেলো। অফিসে ঢুকতে না ঢুকতেই অ্যাকাউন্টেন্ট গোপালবাবু বললেন, খুব খারাপ খবর আছে কাশেম সাহেব!

কী খারাপ খবর?

আমাদের গফুর মিয়ার ছেলেকে আজ পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।

গফুর মিয়া মানে আমাদের

আবুল কাশেম কথা শেষ করতে পারেন না। তার আগেই গোপালবাবু বলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ আমাদের অফিসের পুরোনো ড্রাইভার গফুর।

কিন্তু গফুর মিয়ার ছেলে পড়াশুনা করতো শুনেছি। গতবার স্কুল ফাইন্যাল পরীক্ষায় ভালোভাবে পাস করায় গফুর অফিসের সবাইকে মিষ্টিও খাওয়ালো।

হ্যাঁ, কিন্তু ছেলেটা যে ভিতরে-ভিতরে এতোটা খারাপ হয়ে যাবে গফুর নিজেও বোধহয় বুঝতে পারেনি।

ভিতরে-ভিতরে খারাপ মানে, কী করেছে ছেলেটা?

ছেলেটা নাকি নেশা টেশা করতো, মানে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিল। 

বিষয়টা কিছুতেই মেলানো যায় না। গফুর তার এই ছেলেকে নিয়ে কতো আশা করতো। ছেলের পাসের মিষ্টি দিতে এসে প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলো গফুর, স্যার দোয়া করবেন ছেলেটারে যেন মানুষ করতে পারি।

অফিসের টেবিলে বসে আজ বেশ কিছুক্ষণ ধরে সে কথাই ভাবছিলেন আবুল কাশেম।         

স্যার!

কে?

কখন যে মহসীন দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে, আবুল কাশেম টের পাননি।

কিছু বলবে মহসীন?

ফাইলগুলো এই বেলা ছাড়তে হবে স্যার।

ঠিক আছে, আমি দেখছি।

 

সত্যিই তো। টেবিলে বেশ কিছু ফাইল জমে আছে। রোজ সকালে অফিসে এসেই টেবিলে জমে থাকা ফাইলগুলো নিয়ে বসতে হয়। আজও টেবিলে এসে বসেছেন। কিন্তু কোনো কাজেই যেন মন দিতে পারছেন না। এবার মহসীন এসে তাগিদ দেওয়ায় মনে হলো, কাজ ফেলে রাখলে চলবে না। তাই সবকিছু ভুলে ফাইলগুলো সামনে টেনে নিলেন। আর ঠিক তখনই শব্দ করে বেজে উঠলো টেবিলে রাখা অফিসের ল্যান্ড ফোন। এক হাতে ফাইল ওল্টাতে-ওল্টাতে আর এক হাতে ফোনের রিসিভারটা তুলে নিলেন, হ্যালো। আবুল কাশেম বলছি।

কী করছো?

ওপাশ থেকে মেয়েলি কণ্ঠে এমন আচমকা প্রশ্ন শুনে অবাক হন আবুল কাশেম। নিশ্চয়ই কেউ ভুল নম্বরে ফোন করেছে। তাই বললেন, কী করছি মানে আপনি কে?

আমি গো আমি। আমায় চিনতে পারছো না?

এবার আর স্ত্রী শিরিনের কণ্ঠ চিনতে ভুল হয় না আবুল কাশেমের। কিন্তু শিরিন তো কখনও এই সময়ে অফিসে টেলিফোন করে না। মাঝে-মাঝে অফিস থেকে বের হবার আগে আবুল কাশেমই স্ত্রীকে ফোন করে জানতে চান, বাসার জন্য কিছু আনতে হবে কিনা! স্ত্রী বলেন, সারাদিন অফিসে পরিশ্রম করে তোমাকে আর কষ্ট করে কিছু বয়ে আনতে হবে না। কোনো কিছুর দরকার হলে বাসার আশেপাশে থেকেই কেনা যাবে।

আজ হঠাৎ এই অসময়ে স্ত্রীর ফোন পেয়ে চমকে উঠলেন আবুল কাশেম। নিশ্চয়ই কোনো জরুরি প্রয়োজন নাকি কোনো অঘটন? জিজ্ঞেস করতেও সাহস পাচ্ছেন না। তারপরও বললেন, কী হয়েছে?

দেখো ক-দিন থেকেই কথাটা তোমাকে বলবো বলে ভাবছিলাম। কিন্তু বলা হয়ে ওঠেনি।

অধৈর্য হয়ে উঠলেন আবুল কাশেম, শিরিন কী বলবে তাড়াতাড়ি বলো। আমার হাতে এখন অনেক কাজ।

তুমি কি আমার ওপর রাগ করছো?

অযথা রাগ করবো কেন। কিন্তু কী কথা বলার জন্য এই অসময়ে ফোন করেছো, সেই কথাটা এবার দয়া করে আমায় বলো। আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না।

বোধহয় ধমকের সুরেই কথাটা বললেন। ওপাশে ঢোক গিলে শিরিন বললেন, আজকাল আমাদের বাবলুর মধ্যে কোনো পরিবর্তন খেয়াল করেছো?

বাবলুর মধ্যে পরিবর্তন মানে, কী বলছো তুমি শিরিন?

হঠাৎ বাবলুর পরিবর্তনের কথা শুনে চমকে উঠলেন আবুল কাশেম। গফুরের ছেলের কথাটা মনে হলো। আসলে ছেলেমেয়েদের জন্য এই বয়সটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসময় ছেলেমেয়েদের সাথে মা-বাবার বন্ধু হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু কী হয়েছে বাবলুর? আজ সকালেও খাবার টেবিলে ছেলের সাথে অনেক কথা হয়েছে। কী একটা বইয়ের নাম বললো বাবলু। বইটা নাকি ওর খুব দরকার। বই কেনার জন্য দুশো টাকাও দিয়ে এসেছেন ওকে। ছেলেটা সারাদিন পড়াশুনার মধ্যে ডুবে থাকে। ও যে বাসায় আছে সেটা বাসায় থেকেও বোঝা যায় না। বড়ো চুপচাপ স্বভাবের। কার স্বভাব পেয়েছে ছেলেটা মায়ের নাকি বাপের?

আবুল কাশেম আবারও অধৈর্য হয়ে পড়েন। বাবলুর ভিতর কোন্ অসঙ্গতিটা শিরিনের নজরে পড়লো, যা আবুল কাশেমের নজরে পড়েনি। শিরিন বললেন, আমার মনেহয় পড়াশুনার বাইরেও বাবলু আজকাল কিছু একটা করছে।

কিন্তু কী করছে। সারদিন ও নিজের ঘরে পড়াশুনা নিয়ে থাকে। বাইরে কোথাও খেলতে পর্যন্ত যায় না।

আজকাল যাচ্ছে।

তারমানে, কোথায় যাচ্ছে?

সেটা জানলে কী আর আমি তোমাকে বলতাম। তবে যাচ্ছে। রোজ বিকেলে একটা নির্দিষ্ট সময় ও বাসা থেকে বেরিয়ে যায়।

নির্দিষ্ট সময় মানে, কখন?

বিকেল চারটের পর।

স্কুল থাকলে চারটের পর বাসায় ফেরে বাবলু। পরীক্ষার পর এখন স্কুল বন্ধ। তারমানে স্কুল বন্ধের এই সময়টাতে ও কোথাও যাচ্ছে। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে বাবলু? কাদের সাথে মিশছে? গফুরের ছেলের মতো বিরাট কোনো ভুল করছে না তো? একসাথে মাথার ভিতর অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে। কাজে আর মন বসে না।

পাশের রুম থেকে হঠাৎ বয়স্ক সহকর্মী গোলাম রসুল এলেন। রসুল সাহেব যেখানেই যান, তার চারপাশে সুগন্ধি পান-মশলা আর জর্দার ম ম করা ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে। রসুল সাহেব মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে বসলেন। আয়েশ করে পানের রসটুকু গিলে বললেন, কাশেম সাহেব অসুস্থ নাকি?

না, সে রকম কিছু না।

তাহলে নিশ্চয়ই মানসিক অশান্তি। অবশ্য আজকাল বাজারে গেলেও মানসিক অশান্তি বেড়ে যায়। দ্রব্যমূল্য যেমন লাফিয়ে-লাফিয়ে চলে, আমরা তার সাথে ঠিক তাল মেলাতে পারি না। ফলে সবকিছু চলে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর আমরা ছা-পোষা মানুষ হা-হুতাশ করে মরি।

নিজেই নিজের কথায় পুলকিত হয়ে গোলাম রসুল হাসতে শুরু করলেন। কিন্তু একটু পরই তার মনে হলো, যার উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলে তিনি পুলকিত হয়েছেন তার এই দিকে ভ্রƒক্ষেপই নেই। গলায় একটু কাশি দিয়ে গোলাম রসুল প্রসঙ্গ পাল্টালেন। বললেন, জানেন কাশেম সাহেব আমি নিজেই ক-দিন থেকে বড়ো দুঃশ্চিন্তার মধ্যে আছি।

দুঃশ্চিন্তা কথাটা শুনে আবুল কাশেম নড়েচড়ে বসলেন। এদিকে আবুল কাশেমের নড়েচড়ে বসাকে শ্রোতার মনোযোগ ভেবে গোলাম রসুল আবারও কথা শুরু করলেন, আমার ছোট ছেলে সুমন। ওকে তো আপনি দেখেছেন। অবশ্য ও তখন অনেক ছোট ছিল। এখন বড়ো হয়েছে। হঠাৎ কী যে এক ভূত ঢুকেছে ওর মাথায়

কেন, কী হয়েছে ওর?

আবুল কাশেমের কাছ থেকে বোধহয় এ রকমই একটা প্রশ্ন আশা করছিলেন গোলাম রসুল। বেশ শব্দ করে খানিকক্ষণ হাসলেন। তারপর ঠোঁটের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানের রসটুকু রুমালে মুছতে-মুছতে বললেন, এটাকে আপনি ঘোড়ারোগ বলতে পারেন।

ঘোড়ারোগ!

নয় তো কী। আমি বা আপনি পড়াশুনার জন্য কখনও আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া যাবার কথা ভাবতে পেরেছি?

ও, এই কথা! আমি ভাবলাম

ভাবনা কী দেখেছেন কাশেম সাহেব। আসল কথা তো এখনও শোনেননি। শুনলে বুঝবেন আমি কী রকম অশান্তিতে আছি।

অশান্তি!

হ্যাঁ। ছেলে আমাকে রীতিমতো হুমকি দিয়েছে, বিদেশে না পাঠালে সে বাসা ছেড়ে চলে যাবে।

চলে যাবে?

এখানেই যতো সমস্যা। আজকালকার ছেলেমেয়ের মতিগতি বোঝা দায়। কখন যে কী করে ফেলে কিছুই বলা যায় না। এদিকে ছেলের মা আমাকে শাসিয়েছে। বলেছে, ছেলের কিছু হয়ে গেলে সে আমাকে ছেড়ে দেবে না।

ছেলের কিছু হবে মানে?

আবুল কাশেমের কাছ থেকে এ রকম একটা প্রশ্ন শুনে গোলাম রসুল বোধহয় অবাক হলেন। ভ্রু কুঁচকে বললেন, অনেক কিছুই হতে পারে। ড্রাগ্সে অ্যাডিক্ট হতে পারে। এই যেমন আমাদের ড্রাইভার গফুর মিয়ার ছেলেটা হয়েছে।

গফুর মিয়ার ছেলের কথাটা আবার মনে পড়ায় রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলেন আবুল কাশেম। হাত-পা কাঁপতে শুরু করলো হঠাৎ। তার চোখমুখ দেখে কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পেরে গোলাম রসুল এবার মুচকি হেসে বললেন, কথায় আছে তুমি যেমন বুনো ওল আমি তেমনি বাঘা তেঁতুল। ছেলে কখন কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কাদের সাথে মিশছেসব কিছুর ওপর আমি নজরদারির ব্যবস্থা রেখেছি।

নজরদারি?

হ্যাঁ। বাড়ির কাজের ছেলে রতনকে বলে দিয়েছি, এখন থেকে এটাই তোর ডিউটি। এখন রতন রোজ আমাকে রিপোর্ট দেয়। অবশ্য গোপনে। ছেলের মা পর্যন্ত জানে না। আসলে ছেলেমেয়েদের এই বয়সটা খুব মারাত্মক। ওদের চোখে-চোখে রাখতে হয়।

আবুল কাশেম গোলাম রসুলের কোনো কথারই উত্তর দেননি। গোলাম রসুল নিজে থেকেই বলে যান, অবশ্য আপনার ছেলের কথা আলাদা। পড়াশুনায় কতো ভালো।

আসলে বাবলুর পড়াশুনা নিয়ে আবুল কাশেমকে কখনও ভাবতেই হয় না। ছেলেটা সারাদিন পড়াশুনার মধ্যেই থাকে। ওকে নিয়ে কখনও কোনো দুঃশ্চিন্তায় পড়তে হবে সেটা কল্পনা করাও অসম্ভব। কিন্তু সেই ছেলেকে নিয়েই এখন রাজ্যের দুঃশ্চিন্তা মাথার ওপর পাহাড়ের মতো চেপে বসেছে।

দুপুরে অফিসের ক্যান্টিনে সবাই একসাথে বসে খাবার রেওয়াজটা দীর্ঘদিনের। খাবার পর কিছুটা সময় খবরের কাগজ আর রাজনীতি চর্চাএটাও রোজকার রুটিন। প্রায় আধ ঘন্টা ধরে এসব চলবে। তারপর নির্দিষ্ট সময়ের পর সবাই যে যার টেবিলে। আবুল কাশেম কোনো দিনই ভালো বক্তা নন। আবার তেমন মনোযোগী শ্রোতাও নন। তাই ক্যান্টিনের টেবিলে যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতার আসনে বসানো কিংবা টেনে নামানোর তুমুল তর্কযুদ্ধ চলে, আবুল কাশেম তখন টেবিলের কোণে পড়ে থাকা পুরনো সংবাদপত্র ঘেঁটে সাহিত্য সাময়িকীর পাতাগুলো খুঁজে বের করেন। নতুন-পুরোনো যে কোনো লেখকের গল্প-নিবন্ধ মনোযোগ সহকারে পড়েন। আজ দুপুরেও পড়ার মতো একটা কাগজ ছিল টেবিলে। কিন্তু আজ আর কাগজটা ছুঁয়েও দেখলেন না।

ক্যান্টিন থেকে নিজের অফিস রুমে এসে বাসার ল্যান্ড ফোনের নম্বরে কল করলেন। রোজকার মতো আজও কি শিরিন হাতের কাজ শেষ করে টেলিভিশনের সিরিয়াল দেখতে বসেছে! কিন্তু সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরলে টেলিভিশনের রিমোট আবুল কাশেমের দখলে। বিভিন্ন চ্যানেলের খবর দেখা তার নিয়মিত অভ্যেস। অথচ এই সময়টাতেও শিরিন বিদেশি চ্যানেলের কোনো সিরিয়াল মিস করতে রাজি নয়। বাবা মায়ের এই রিমোট কাড়াকাড়ি দেখে মৃদুভাষী বাবলু হাসে। বলে, বড়ো হয়ে আমি যখন চাকরি করবো, তখন তোমাদের দু-জনের জন্য দু-টো আলাদা টিভি সেট কিনে দেবো।

বাসার ল্যান্ড ফোনটা অনেকক্ষণ ধরে বেজে চলেছে। বিরক্ত হন আবুল কাশেম। শিরিন কি আজও টেলিভিশন সিরিয়াল নিয়ে ব্যস্ত? শেষপর্যন্ত ফোন ধরলো শিরিন, হ্যালো।

কী করছিলে এতোক্ষণ?

আবুল কাশেম তার নিজের কণ্ঠ শুনে নিজেই অবাক হন। ওপাশ থেকে শিরিনেরও একই প্রশ্ন, কী হয়েছে তোমার?

এবার গলার স্বর স্বাভাবিক করে আবুল কাশেম প্রশ্ন করেন, বাবলু কলেজ থেকে ফিরেছে?

হ্যাঁ, ও এখন ঘরেই আছে।

কী করছে?

কম্পিউটার নিয়ে বসেছে। ও এ সময় ঘরেই থাকে।

তবে যে তুমি বললে, ও আজকাল কোথাও যায়!

হ্যাঁ, চারটার পর বেরিয়ে যায়। আজকাল রোজই যাচ্ছে। 

যেতেই পারে। সারাক্ষণ ঘরে বসে ও নিশ্চয়ই টিভি সিরিয়াল দেখা পছন্দ করে না।

আমাকে খোঁচা দিচ্ছো দাও। কিন্তু আমি রাত-দিন তোমার মতো বই মুখে নিয়ে পড়ে থাকি না। টিভি দেখলেও চারদিকে আমার চোখ-কান খোলা থাকে। আমি বাবলুর ব্যাপারে যা দেখেছি, তা তোমাকে বললাম। এখন ওকে শাসন করার দায়িত্ব তোমার।

শাসন করবো?

অবশ্যই করবে। ছেলেমেয়ে খারাপ কিছু করলে বাবা তাকে শাসন করতেই পারে।

কিন্তু বাবলু খারাপ কী করেছে সেটাই তো জানি না।

 

শুধু অনুমানের ওপর নির্ভর করে ছেলেকে কী শাসন করবেন আবুল কাশেম। বিষয়টা বার বার মাথার ভিতর ঘুরপাক খেতে থাকে। কিন্তু শিরিন যেভাবে জোর দিয়ে বলছে, তাতে মনে হচ্ছে বাবলু বড় ধরনের অন্যায় কোনো কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তবে শিরিনের এবারের কথায় ভাবনা আরও বেড়ে যায়। শিরিন বলে, দোতলার রোজী ভাবি নাকি বাবলুকে দু-দিন পুলপাড়ের গলিতে যেতে দেখেছেন। রোজী ভাবির নাম শুনে আবুল কাশেম প্রথমে মনে-মনে বেশ চটেই গিয়েছিলেন। ভদ্রমহিলা তার মেয়ে বুবলিকে প্রাইভেট পড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন বাবলুকে। কিন্তু বাবলু রাজি হয়নি। বাবলু বলেছিল, বুবলিকে পাঠিয়ে দেবেন ওর কোনো বিষয় বুঝতে অসুবিধে হলে আমি বুঝিয়ে দেবো। কিন্তু প্রাইভেট পড়াতে পারবো না।

সেই থেকে ভদ্রমহিলা বাবলুর ওপর বেশ অসন্তুষ্ট। বাবলুর নামে উনি ইচ্ছে করে উল্টোপাল্টা কিছু বলছেন না তো! কিন্তু পুলপাড় বস্তির গলিটা ভালো জায়গা নয়। কিছুদিন আগেও শহরে মাদকের আখড়া হিসেবে জায়গাটা পরিচিত ছিল। কিন্তু বাবলু কেন ওদিকে যাবে। রোজী ভাবি যদি সত্যিই ওই গলিতে বাবলুকে যেতে দেখেন তাহলে তো চিন্তার বিষয়।

ঠিক চারটে পাঁচ মিনিটে আবার শিরিনের ফোন এলো, বাবলু একটু আগে বেরিয়ে গেলো।

আচ্ছা, আমি দেখছি।

ফোন রেখে আবুল কাশেম কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলেন। তারপর একটু তাড়াতাড়িই বের হলেন অফিস থেকে। ঘড়িতে তখন সাড়ে চারটে বাজে। রিকশা নিলে দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যেই পুলপাড় বস্তির কাছে পৌঁছানো যাবে। দেরি না করে রিকশায় উঠে পড়লেন আবুল কাশেম। রাজ্যের সব দুর্ভাবনা এখন মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে।

পুলপাড় বস্তির সামনে এসে রিকশা থেকে নেমে মনে হলো জায়গাটা খুব চেনা। অনেক দিন এদিকে আসা হয়নি। আগে পুরো এলাকাটা ফাঁকা ছিল। ডানপাশে ছিল বড়ো খেলার মাঠ আর বামদিকে পদ্মপুকুর। অবশ্য নামে পদ্মপুকুর হলেও আবুল কাশেম সেই পুকুরে কখনও পদ্মফুল দেখেননি। এখন পুরো এলাকা জুড়ে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আর লোহা-লক্কড়ের ছোট-ছোট দোকান। সেই খেলার মাঠ নেই, পদ্মপুকুরও নেই। মাঝখান দিয়ে সরু একটা গলি ঢুকে গেছে। আবুল কাশেম গলিটার দিকে এগিয়ে যান। দোতলার রোজী ভাবি কি সত্যিই এই রাস্তায় বাবলুকে ঢুকতে দেখেছেন? বাবলুর মতো চেহারার অন্য কেউও তো হতে পারে।

হাঁটতে-হাঁটতে গলির প্রায় শেষ সীমানায় পুরনো একটা দালানের সামনে এসে দাঁড়ালেন আবুল কাশেম। পলেস্তারা খসা দালানটা শহরের পুরোনো একটা লাইব্রেরি। অনেক পুরোনো বই আছে এখানে। সেসব বই পড়ার লোভে আবুল কাশেম রোজ এই লাইব্রেরিতে আসতেন। হঠাৎ মনে হলো, বাবলু এই লাইব্রেরিতে আসেনি তো! ভাঙাচোরা সিঁড়ি পেরিয়ে লাইব্রেরির নড়বড়ে কাঠের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন আবুল কাশেম। ওই তো, পুরোনো কাঠের লম্বা টেবিলটার ওপাশে একটা বইয়ের মধ্যে ডুবে আছে বাবলু।

কাউকে খুঁজছেন মনে হয়?

পুরু লেন্সের চশমা পরা লাইব্রেরিয়ান মধুসূদন বাবু কখন যে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন, আবুল কাশেম বুঝতে পারেননি। বয়সের ভারে মধুসূদন বাবু হয়তো সেই কিশোর পাঠক আবুল কাশেমের কথা ভুলেই গেছেন। লাইব্রেরিতে কথা বলা নিষেধ। মধুসূদন বাবু ফিসফিস কণ্ঠে বললেন, এখানে কাউকে পাবেন না। আজকাল লাইব্রেরিতে কেউ আসেই না।

আবুল কাশেম হাতের ইশারায় অদূরে বাবলুকে দেখালেন। মধুসূদন বাবু বললেন, ক-দিন থেকে এই ছেলেটাই নিয়মিত এখানে আসছে দেখছি।

এরপর ফিসফিস কণ্ঠে মধুসূদন বাবু কী বললেন আবুল কাশেম কিছুই শুনতে পেলেন না। তার দৃষ্টি এখন বইয়ের মধ্যে মগ্ন হয়ে থাকা বাবলুর দিকে। আবুল কাশেম ওখানে কাকে দেখছেন? ও কি বাবলু নাকি হারিয়ে যাওয়া কিশোরবেলার সেই আবুল কাশেম! দূর থেকে ছেলের দিকে চুপচাপ চেয়ে থাকেন কিন্তু কিছুই বলতে পারেন না। এই ভাঙাচোরা পরিবেশ আর অন্ধকার ভূতুড়ে ঘরে বাবলু কোন্ অমূল্য রতনের সন্ধান পেয়েছে, আবুল কাশেমের তা বুঝতে বাকি থাকে না।