বাঁধন-ছেড়া প্রাণ

অ+ অ-

 

আপনি আমার আসল বাবা নন!

না, স্টেপ ফাদার।

কী বলছেন এসব?

সত্যি বলছি। তোমার বাবা ছিলেন মদ্যপ। রাতে মদ খেয়ে এসে প্রায়ই তোমার মাকে পেটাতো। বছরখানেক সে মুখ বুজে সহ্য করেছে ওই নৃশংসতা। তারপর তোমাকে নিয়ে ওঠে তোমার নানার বাড়িতে। ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেয়। তখন তোমার বয়স দেড় বছর। তোমার দুবছর বয়সে আমি বিয়ে করি তোমার মাকে। তোমাকে কন্যা হিসেবে গ্রহণ করি।

আকাশ থেকে সূর্যটা দুম করে আছড়ে পড়ল নিচে। লোকটা তার আসল বাবা নয়, উনিশ বছর বয়সেও টের পায়নি মেঘা। মা কথাটা তাকে বলে যাননি। মায়ের মৃত্যুর ছয় মাস পর লোকটি বিপজ্জনক কথাটা বলে স্তব্ধ করে দিল মেঘাকে।

এ সময় দুই জমজ পিচ্চিরোদ ও বৃষ্টি; মেঘার এক ভাই ও এক বোন দুদিক থেকে দুহাতের আঙুল ধরে টানতে লাগল মেঘাকে। হতবিহ্বল বড় বোনের সাড়া না পেয়ে তারা আবার ছুটে গেল তাদের ঘরে। এদের তিনজনকে রেখে আচমকা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন মা। দুই ভাই বোনকে মায়ের আদর দিয়েই আগলে রেখেছে মেঘা। এ সময় আকাশ ফাটানো কথাটা বললেন বাবা! বিশ্বাস করতে পারছে না। আবার বিশ্বাস তো করতেই হবে। আসল বাবা মজা করেও কখনও এমন কথা বলবেন না।

এ লোকটাও মাকে কষ্ট দিয়েছে। নিজের চোখে দেখেছে মার ওপর তার নির্দয় আচরণ। স্বামী-স্ত্রীর বোঝাপড়ার ঘাটতি আছে ভেবে দুজনকেই সামলাতো মেঘা। তখনও মনে হয়নি, মনে হতো না লোকটার মধ্যে বড় ধরনের খারাপ বৈশিষ্ট্য আছে। কন্যার চোখে বাবাকে দেখত বলে কখনও তার অশুভ আচরণকে ভয়াবহ মনে হয়নি। এ মুহূর্তে লোকটির কথা শোনার পর আকাশ ঝেঁপে মেঘ নেমে এল বাড়ির ওপর। জানালা গলে ঢুকছে মেঘ, কেবলই ঘরে নয়, অন্তর্লোকেও।

ছোট ভাই রোদ হঠাৎ পাশের ঘর থেকে ছুটে এসে মেঘার হাত টান দিয়ে বলল, আফ্ফু আসো। আমার পুতুলটা দেখো। বৃষ্টি পুতুলের নাক ভেঙে ফেলেছে।

সঙ্গে সঙ্গে ছোট বোন বৃষ্টিও এসে জবাব দিল, না আমি ভাঙিনি, আফ্ফু। ভেঙে গেছে, এমনি এমনি।

ভাই-বোনের দিকে ফিরে তাকাল মেঘা।

ওদের মুখের দিকে দেখার মতো করে দেখল। ওদের অর্ধেক সত্তার বোন আমি; বাকি অর্ধেকটা অন্যজনের। মা একই, বাবা আলাদাভাবতে গিয়ে জমে যেতে লাগল নিজেই।

রোদ জড়িয়ে ধরল মেঘাকে। তার শরীর বেয়ে উপরে উঠতে চাইল। দাবি করল, বৃষ্টিকে বকে দাও।

রোদের আবদারে মায়ার ঢেউ এল মনে। তখনই মেঘের আড়াল থেকে জোছনা-ঢাকা চাঁদ জেগে উঠল। মায়াময় এ চাঁদের আলোয় ধুয়ে যেতে লাগল হঠাৎ ঝলসে ওঠা বিস্ময়ের মেঘ। তবু তাকাল লোকটির দিকে। কঠিন কণ্ঠে হঠাৎ মেঘা প্রশ্ন করল, এতদিন পর হঠাৎ এরকম ভয়াবহ খবরটা কেন দিলেন আমাকে?

লোকটি জবাব দিল না। মাথা নিচু করে মেঘার সামনে থেকে সরে যেতে চাইল।

চিৎকার করে মেঘা আচমকা লোকটির শার্টের কলার খামচে ধরে আবার প্রশ্ন করল, কেন লুকিয়ে রেখেছিলেন কথাটা? এখনইবা আমাকে জানানোর প্রয়োজন হলো কেন?

লোকটি বাধা দিল না। কলার ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য জোর করল না। অপরাধীর মতোই দাঁড়িয়ে রইল।

মেঘা আরও কয়েকবার জোরে কলারে টান দিয়ে ধাক্কা মেরে একই প্রশ্ন করল, কেন এমন সত্য ঘটনা তুলে ধরলেন? লুকিয়ে রাখলে কী হতো?

লোকটি এবার মুখ খুলল, কিছু সত্য লুকিয়ে রাখা যায় না। কোনো না কোনো সময় তা বেরিয়ে আসবেই। যদিও তোমার মায়ের সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম কখনও তোমার কাছে এ সত্য ফাঁস করব না। প্রতিজ্ঞা রাখতে পারলাম না। আমি দুঃখিত। কারণ আমি না জানালেও তোমার নানাবাড়ি থেকে জানিয়ে দেয়া হতো। যদিও তোমার দাদা-বাড়ির কেউ তোমার খোঁজ রাখেনি।

আরেকবার মাথার ওপরে আকাশটা ভেঙে পড়ল। গরম দমকা বাতাসের ঝড় ছুটে এসে আটকে দিতে চাইল শ্বাস। আপন নাড়িতে টান খেলো মেঘা। অন্তস্থল থেকে দাপিয়ে বেরোল সমুদ্রের গর্জন, আমার আসল বাবাকে আমি দেখতে চাই। তার কাছে আমাকে নিয়ে চলুন।

বড় বোনের গর্জন শুনে হাত ছেড়ে দিল রোদ, বৃষ্টিও। দুজনই একছুটে পালিয়ে ঢুকে গেল পাশের ঘরে; খাটের ওপরে উঠে ভয়ার্ত চোখে মুখ লুকালো বালিশে। তারপর একসঙ্গে কেঁদে উঠল দুই জন।

ওদের কান্না থামিয়ে দিল মেঘার ভেতর গুমরে ওঠা মেঘ-গর্জন। ছুটে গেল পাশের ঘরে। খাটে উঠে ওদের জড়িয়ে ধরল। তারপর হু হু করে কাঁদতে লাগল নিজেও।

মেঘার কান্নার শব্দে থেমে গেছে রোদ আর বৃষ্টির কান্না। যমজ ভাইবোন এবার ঝাঁপিয়ে পড়ল মেঘার বুকে। বুকের আকাশে জমে ওঠা ভারি মেঘের ভেতর থেকে মায়ার বৃষ্টি ঝরতে শুরু করল। নিজেকে আর বোন বলে মনে হলো না মেঘার, মনে হলো ওদের মা-ই ও। স্নেহ-মমতায় ওদের বড় করে তুলতে হবেএই প্রতিজ্ঞায় কান্না থামিয়ে দুটোকে দুই কোলে নিয়ে ঢুকলো বাথরুমে। ওদের গোসলের সময় হয়ে গেছে। গোসল করিয়ে খাওয়াতে হবেএ-দায়িত্ব এখন ওর। আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাবা-সত্তার টান মোটেই ভুলতে পারল না। তবু ভাই-বোনের মমতার ছলে, শুদ্ধতার জলে নিজেকে ধুয়ে নিয়ে দুজনকে একসঙ্গে গোসল করিয়ে, শুকনো তোয়ালে জড়িয়ে দুজনকেই বসিয়ে দিল খাটে। নতুন কাপড় পরিয়ে বলল, এবার খেতে হবে, এসো।

রোদ বলল, নিজে খাব না। তুমি খাওয়াও।

বৃষ্টি বলল, আমি নিজে খাব।

সঙ্গে সঙ্গে রোদ একটা ঘুষি চালিয়ে দিল বৃষ্টির দিকে।

ক্ষিপ্র হাতে মেঘা ধরে ফেলল রোদের হাত। তারপর কঠিন স্বরে বলল, এখন থেকে নিজে নিজে খাওয়ার অভ্যেস করতে হবে দুজনকেই।

 

দুই                                       

ঘরের কাজের অছিলায় নিজেকে ভুলে থাকার চেষ্টা করতে লাগল মেঘা। ঘরের লোকটাকে বাবা ডাকতো। এখন ওই শব্দটা আচমকা বুকে আটকে আছে। কেউ যেন সিন্দুকের ভারি ঢাকনা লাগিয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে।

লোকটা গেল কোথায় এমনি চিন্তা এখন মাথায় উদয় হলেও বাবা গেল কোথায় এটা মনে হলো না। বাবা-আসন থেকে আকস্মিক ছিটকে পড়েছে লোকটা। তবু বুঝল মনের টান কমেনি। ঘৃণাও জাগেনি। শ্রদ্ধার আসনটাও টলেনি। শুদ্ধতম সত্যের শেকড়ে বাবা-সন্ধানী অনুসন্ধিৎসা জেগে বসলেও কয়েক দিন ধরে লোকটার রহস্যময় ভূমিকার জন্য বিভ্রান্ত হতে লাগল মেঘা। একবারের জন্যও তিনি মুখোমুখি হননি মেঘার। অথচ ঘরের কোনো কিছুর অভাব রাখছেন না। বাজারের প্রতিও রয়েছে সতর্কতা। মরা কোনো মাছ বাজার থেকে আসুক পছন্দ নয় মেঘার। তাজা মাছ, লাফানো বা মুখ নড়ায় এমন মাছই আসছে বাজার থেকে। দুই ভাই-বোনের প্রয়োজনীয় খাবার-দাবারেরও ঘাটতি হচ্ছে না।

লোকটা কি তবে বদলে গেছেন?

মা বেঁচে থাকতে তো এমন ছিলেন না তিনি, এখন বেশ ঘরমুখো হয়েছেন, বোঝার বাকি রইল না। সত্য ফাঁস করে দেয়ার পরও তাই লোকটাকে আর দোষ দিতে পারছে না মেঘা। মায়ের সঙ্গে ওনার সম্পর্ক যতই জটিল থাকুক না কেন লোকটাকে বাবা হিসেবে বন্ধুর মতোই ভাবতো। বন্ধু ভেবে নিজের নানা কথা শেয়ারও করত। মনোযোগ দিয়ে কথা শুনতেন, ভালো পরামর্শ দিতেন। তার এ গুণটি বেশ মনে পড়ছে এখন। তবু মনের নীরব কোণ থেকে দেখা করার ডাক আসছে না। কী এক অবোধ্য তৃষ্ণায় ক্রমাগত কাতর হয়ে যাচ্ছে মন, বুঝতেও পারছে না মেঘা। ঘরের নানা আয়োজনের আড়ালে কী সত্য আর কী মিথ্যে থাকতে পারে এমন জিজ্ঞাসা ভেতর থেকে একবার তেড়ে এসেছিল। এখন আর তাড়া নেই।

বয়স্কা বুয়া মেঘার ঘরে ঢুকে প্রশ্ন করল, সাহেব বাইরে যাওন লাগছে, আফনার কি কিছু লাগব? জিগাইছেন।

প্রশ্ন শুনে ধূপের ধোঁয়ার মতো আকস্মিক ধোঁয়াসা হয়ে গেল চারপাশ। মশা-মাছি না থাকলেও অসংখ্য কীটপতঙ্গ উড়তে শুরু করল যেন মাথায়। ঘরের জানালা খুলে দিয়ে বড় করে শ্বাস নিল। তারপর ঠান্ডা মাথায় জবাব দিল, কিছু লাগবে না।

বুয়া চলে যাওয়ার পরে মেঘা ভাবতে বসল লোকটার সঙ্গে এমন আচরণ করা কি ঠিক হচ্ছে?

উত্তর খুঁজে পেল না। রোদ আর বৃষ্টির কাছে ফিরে এসে ভুলে যেতে চাইল ভেতর থেকে ফুঁসে ওঠা প্রশ্নটা। ভুলতে পারল না। বরং নিউরনের অরণ্যে ঝড় বইতে শুরু করল। মনে জাগল আরও আরও সব প্রশ্ন, লোকটার উদ্দেশ্য কী? গোপনীয় কথা ফাঁসের পর এমন বদলে গেলেন কেন? বদলানোর আড়ালে কি লুকিয়ে আছে নতুন কোনো মতলব? দুই ভাই-বোন নিয়ে কী করবে এখন? তাকে কি ঘর ছেড়ে যেতে বলছেন আকার-ইঙ্গিতে? আবার বিয়ে করে নতুন বউ আনবেন না তো ঘরে?

 

তিন                                      

মধ্যরাতের পর ঘুম ভেঙে গেল মেঘার। ভাই-বোন জুটি তাকে দু পাশ থেকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। তাই উঠতে চাইলেও উঠতে পারল না। ঘুমের ঘোরে কেবল দুঃস্বপ্ন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলএকটা কালো ভাল্লুক ছুটে আসছিল তার দিকে। ছুটে পালাতে চাচ্ছিল মেঘা। পা নড়ছিল না। পায়ের শক্তি যেন চুম্বক দিয়ে টেনে কেউ বের করে নিয়েছে। ভাল্লুক লাফিয়ে পড়েছিল ওর দেহের ওপরে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম উধাও হয়ে গেছে। আশ্চর্যজনকভাবে দপদপ শব্দ তুলে বুক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এখনও। গলা শুকিয়ে গেছে। শুষ্ক ঠোঁট ভেজাতে চাইল জিব বের করে। পারল না। উপরের তালুর সঙ্গে সেঁটে আছে শুকনো জিহ্বা। ওঠা দরকার। ওয়াশরুমে যাওয়া দরকার। তার দেহের সঙ্গে জড়ানো রোদ আর বৃষ্টির ঘুম না ভাঙ্গিয়ে কীভাবে ওঠা যায় ভাবছিল সে।

আচমকা তার দেহ থেকে সরে গেল বৃষ্টির তুলে দেওয়া পা, হাতও সরে গেল। শরীরটা মোচড় দিয়ে বৃষ্টি শুলো বাঁ-কাত হয়ে। সুবিধা হলো মেঘার। আলতো করে সে নামিয়ে দিল রোদের পা। হাতটাও সরিয়ে নিজের দেহটা আলগা করে ধীরে ধীরে উঠে বসল এবার। বাইরের বারান্দার আলো ঘরে ঢুকছে। ভাই-বোন দুজনকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

গায়ে জড়ানো অদৃশ্য মায়াজালটা দেখতে পেলো মেঘা। মমতার সুতোয় জড়িয়ে গেছে ওর বড় বোন-সত্তা। মমতাময়ী মায়ের মতো মায়ার চোখে সে এখন দেখছে ছোট্ট ভাই-বোন দুজনকে। ওয়াশরুম থেকে এসে এক গ্লাস পানি পান করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক অপরূপ দৃশ্য দেখে বিমূঢ় হয়ে রইল মেঘানিঃসীম আকাশে রাতের পর্দা ক্রমশ নীলাভ হয়ে যাচ্ছে। আকাশের গাঢ় চাঁদও নীল চাদরে জড়িয়ে নিয়েছে গা। চাঁদের শরীর ছুঁয়ে নেমে আসছে নীলাভ চাঁদনি; অন্ধকার ফুঁড়ে ধেয়ে আসছে ওর দিকে।

হঠাৎ কাঁধে হাতের হালকা স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠে মেঘা ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল লোকটাকে। চমকে উঠলেও শীতল হয়ে গেল তার দেহ। ঘুরে আবারও তাকাল সে আকাশের দিকে। দেখল ভাসমান মেঘের স্রোত। ওই মেঘ কি কেবলই বৃষ্টি ঝরাবে? নাকি মেঘের ওপরে ভর করেও উড়ে বেড়াচ্ছে লক্ষকোটি দূষিত জীবাণু? চারপাশ কি ভরে যাবে ছিটানো জীবাণুতে?

ছোটবেলা থেকে যাকে বাবা হিসেবে জেনেছে, আচমকা বাবা-সত্তা খোয়ানো লোকটার হাতেও কি রয়েছে জীবাণু? দূষিত হয়ে যাবে সামনের দিনগুলি? দুটো প্রশ্ন একসঙ্গে উড়ে এল মাথায়। প্রশ্ন দুটো ভেতরে ঠেসে দিয়ে মুখ ফুটে প্রশ্ন করল, আর কী বলবেন? আরও কোনো  গোপন কথা কি লুকিয়ে রেখেছেন? বলতে চান এখনি?

ঠান্ডা স্বরের প্রশ্নের ওজনে দমে গেলেন তিনি। কী উত্তর দেবেন, না বুঝে গুটিয়ে গেলেন কেঁচোর মতো। ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মেঘা আবার প্রশ্ন করল, যা বলতে এসেছেন বলে যান।

কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়ালেন তিনি। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না। বারান্দা থেকে সরে যাচ্ছিলেন।

মেঘা আবার প্রশ্ন করল, বিয়ে করতে চান আরেকবার? পথের কাঁটা হিসেবে সরিয়ে দিতে চান আমাকে? এজন্যই কি আঠারো বছরের গোপন সিন্দুকের তালা খুলে দিয়েছেন?

প্রতিটি শব্দ তিরের মতো এগিয়ে গেল লোকটির দিকে। তিনি সহজেই মাথা সরিয়ে শব্দ-তির থেকে নিজেকে রক্ষা করলেন। মেঘার মনে হলো লোকটা আক্রান্ত হয়নি। চকচকে চোখ মেলে এবার বলল, হ্যাঁ বিয়ে করা উচিত আমার। বিয়াল্লিশ বছরে বউ ছেড়ে গেছে। বিয়ে না করলে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যেতে পারে এ বয়সের যেকোনো পুরুষ। এটাই বাস্তবতা। এটাই জৈবিক চাহিদার সত্য দিক।

উত্তর শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল মেঘা। মনে হলো জীবাণু-বোমা নয়, অন্য কোনো মহাশক্তিশালী শব্দতরঙ্গ কেড়ে নিয়েছে তার মুখের ভাষা। ইথারে ভাসমান শব্দরা চৌচির হয়ে ভেঙ্গে গিয়ে সশব্দে আক্রমণ করছে কানের পর্দা। কানের ভেতর থেকে ভেসে আসছে হাজার মণ বারুদের বিস্ফোরণের আওয়াজ। লক্ষ-কোটি চিকন গর্জন একত্রে মিলেমিশে ভিন্নধরনের আওয়াজ ঠেসে ঢুকিয়ে দিচ্ছে কর্ণকুহরে। তবে মস্তিষ্ক তাল হারায়নি। একবার মাত্র ভাবনার উদয় ঘটলকেবল বিয়ে করার জন্য, জৈবিক চাহিদা মেটানোর নৈতিক পথ তৈরি করে নেয়ার জন্য মিথ্যা বলে সন্তানকে কি কেউ তাড়িয়ে দিতে পারেন?

না! নিশ্চয়ই আরও কোনো বড় সত্য লুকিয়ে আছে। কী সে সত্য? আসলে কি ওর বাবাই তিনি? সৎকন্যার ধোঁয়াশা তুলে কি আপন কন্যাকে বিতাড়িত করে জৈবিক-পথের দিকেই হাঁটছেন?

না! হঠাৎ ওর মনে উদয় হলো, সৎকন্যা/আসল কন্যার মীমাংসা করে দিতে পারেন নানা-নানি। তারা তো এখনও বেঁচে আছেন। এমন একটা অকাট্য প্রমাণ সামনে রেখে লোকটা মিথ্যা বলার সাহস পেত না। মেঘা নিজের শেকড়ে টান খেলো নতুন ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে। নিজের শিরায় শিরায় ছুটন্ত রক্তকণিকাগুলো শোরগোল তুলে পিতৃত্বের টানকে মহিমান্বিত করতে চাইছে।

মুক্তির ঢেউ শব্দতরঙ্গরূপে বেরিয়ে এল ঠোঁট বেয়ে, কখনও তো মনে হয়নি আপনি বাবা নন, স্নেহ-মমতার তো কোনো ঘাটতি দেখিনি, আসল বাবার অভাব তো মোটেই বুঝতে দেননি। জৈবিক টানের কাছে কি পরাজিত হয়ে গেল সেই পিতৃত্বের টান? আপনি আসল বাবা হয়তো নন, তবু তো বাবা রূপেই বড় করে তুলেছেন আমাকে। খাদ তো দেখিনি।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো। মমতার কোনো কমতি দেখোনি তুমি। তবে তুমি আমার ক্রোমোজমের এক্সটেনশন নও, তোমার মধ্যে আমার সত্তা নেই, আমার রক্ত তোমার রক্তে বহমান নয়। জেনেটিক বাঁধন আর সামাজিক বাঁধন এক নয়। সামাজিক বাঁধনেও মায়া তৈরি হয়। সে-মায়ায় কমতি রাখিনি আমি। এখন বাস্তবতার কাছে পরাজিত আমি। বিয়ে করা দরকার আমার। তোমার অনুমতির প্রয়োজন।

বিষাদে শ্বাস আটকে গেল মেঘার। লোকটাকেও আর দোষ দিতে পারছে না। যা বলার স্পষ্টই বলে ফেলেছেন তিনি। এমন পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দিতে হবে ওর জানা নেই। নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল কেবল শূন্য চোখ মেলে।

লোকটি চলে যেতে উদ্যত হলে স্তব্ধতার আঁধারে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। ঠান্ডা স্বরে মেঘা বলল, আমি তো আপনার রক্ত নই। আমার অনুমতির প্রয়োজন কি? বিয়ে করবেন কি করবেন না সেটা আপনারই ইচ্ছে। তবে আপনার বিয়ের পর আমার যমজ ভাই-বোন রোদ আর বৃষ্টিকে নিয়ে আমি আমাদের নানার বাড়িতে গিয়ে উঠব, বলে রাখলাম।

তা কেন হতে দেব আমি? রোদ-বৃষ্টির বাবা আমিবৈধ অভিভাবক। তোমার বৈধ অভিভাবক নই আমি। ওরা আমার কাছে থাকবে। তুমিও ইচ্ছে করলে থাকতে পারো। আমি খুশি হবো।

কী বলে লোকটা! বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। আমি কি ওদের কেউ নই? আমার মায়ের রক্ত রয়েছে ওদের দেহে, মমতার টান তো নয় শুধু! ওদের সঙ্গে ক্রোমোজমের আধেক বন্ধনও রয়েছে আমার। ওদেরকে কি আমি নিয়ে যেতে পারব না?

নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ওদের নিয়েই থাকো তুমি। চাই আমি।

আরেক মহিলাকে ঘরে তুলে আনলে আমার মতন পরগাছাকে কি সইতে পারবেন তিনি? সৎকন্যাদেরই সইতে পারেন না সৎমারা। আমার স্থান কোথায়? আমার মায়ের আসনেও অন্য কাউকেই সইতে পারব না আমি।

অন্য কাউকে সইবার প্রয়োজন নেই। তোমাকে তুমি সইতে পারলেই সব কূল রক্ষা হবে। রোদ-বৃষ্টির বড় হওয়ার পথ ঝামেলামুক্ত থাকবে, মায়াময় থাকবে।

কথাটার অর্থ-ইশারা কিছুই বুঝতে পারল না মেঘা। মাথার ভেতরে কেবলই ঘুরপাক খেতে লাগল লোকটার ওইকথাটাতুমি আমার ক্রোমোজমের এক্সটেনশন নও, তোমার মধ্যে আমার সত্তা নেই, আমার রক্ত তোমার রক্তে বহমান নয়, জেনেটিক বাঁধন আর সামাজিক বাঁধন এক নয়। ভাবতে ভাবতে আচমকা ঘূর্ণি উঠল মেঘার মস্তিষ্কে, বৈশাখের ঝড়ো বাতাসে উড়ে যাওয়া ধূলিকণা, ছেঁড়া কাগজ আর ঝরাপাতার মতো উড়তে লাগল স্মৃতিকণা। লোকটির দৈহিক উপস্থিতি থেকে পিতৃত্বের মায়াজাল উড়ে গিয়ে নিঃশেষ করে দিচ্ছে তাকে। লোকটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, কথাটার অর্থ কি?

অর্থ খুব সোজা। লোকটি খুব সাহসী হয়ে মেঘার হাত ধরে আরও বলল, সমস্যার সমাধানও সোজা। তুমি রাজি হলে তোমাকেই রোদ আর বৃষ্টির মা বানানোর প্রস্তাব দিতে পারি। নতুন কোনো নারী এ ঘরে আসার প্রয়োজন নেই।

পিতারূপী লোকটা তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছে! নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারছে না মেঘা। আপন মস্তিষ্কের চিত্রে ও দেখল, মধ্যসাগরে জলের বেপরোয়া উল্লাসের মধ্যে খাবি খাচ্ছে একটা ডিঙি নৌকো। সেই নৌকায় মেঘা আবিষ্কার করল নিজেকে, আবিষ্কার করল রোদ আর বৃষ্টিকেও। চেনা লোকটাকে আর মানুষ মনে হচ্ছে না। সত্যিকারের ক্ষুধার্ত হাঙ্গর যেন নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে তার দিকে। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে... নৌকোটা ডুবে যাচ্ছে সাগরে। মেঘার মনে হলো তার চেনাজানা পৃথিবীটাও ঢুকে যাচ্ছে দাঁতাল হাঙ্গরের হা-করা বিশাল পেটের ভেতরে...