ভদ্রলোক
সেদিন ছুটির দিনে কী একটা কারণে আম্বরখানা হয়ে জিন্দাবাজারে গেছি আমার আর তেমন স্মরণে নেই। বাড়ি থেকে বের হয়ে সিএনজিতে চড়ে বন্দরবাজার হয়ে তারপর হেঁটে অগ্রগামী গার্লস স্কুলের সম্মুখ দিয়ে জিন্দাবাজার যাই। সাধারণত আমরা এদিককার লোকেরা অগ্রগামী গার্লস স্কুল পাড়ি দিয়ে তারপর জিন্দাবাজার যাই।
ফুটপাত দিয়ে তো হাঁটাই যায় না। সব ফুটপাত দখল হয়ে গেছে। সেদিন হয়ত ভিআইপি ধরণের কেউ একজন এসেছিলেন, তাই ফুটপাত হকারমুক্ত ছিল। গাড়িঘোড়াও কম ছিল। কিন্তু আমার জানা মতে কোনো ট্রাফিক সপ্তাহ চলছিল না। তারপরও আজব এই দেশের অদ্ভুত সব নিয়ম-অনিয়মের জন্যে রাস্তাঘাট বলা যায় যানজট মুক্তই ছিল।
আমার আবার সিগারেট টানার নেশা আছে। বন্ধুবান্ধব সকলেই সেই কবে সিগারেট-বিড়ি ছেড়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আমি তো ছাড়তেই পারিনি, বরং এই তো গতরাতে রাতের খাবার গলাধঃকরণ করার পর নেশার কারণে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গিয়ে বেনসনের প্যাকেট নিয়ে এসেছি। যেতে চাচ্ছিলাম না, বরঞ্চ বিছানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু ওই যে নেশা। তা্ই আর দেরি করিনি। নিয়ে এসেছি।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা আমার ঢের মনে আছে। হল থেকে রাত দুটোর পর বের হয়ে স্টার সংগ্রহ করে রুমে ফিরেছি। তখন তো স্টারই আমার জীবন।
তো রাজা ম্যানশনের নিচ থেকে বেনসন একটা ধরিয়ে সুখটান দিয়ে সম্মুখপাণে অগ্রসর হওয়ার সময় মোবাইলে ক্রিং ক্রিং ধ্বনি ধেয়ে এলো।
আমি তরুণ নই যে সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল চেক করব। এমনিতে বয়স ৪০ পেরিয়ে ৪১,৪২ হয়ে ৪৩ এর দিকে ধেয়ে আসছে। তরুণ থাকার জন্যে, ভাব নেয়ার জন্যে বলি ৩৮ প্লাস। বললে কী হলো, চাচার তো মনে মনে জানা।
আসলে আমার সঙ্গে একজনের অ্যাফেয়ার চলছে। ওর বয়স এখন ৩৩ প্লাস। আর আমি যদি বলি ৪৩ প্লাস তাহলে কি যায়? না, যায় না। আর বয়সের ব্যাপারে ও এমনিতে খুতখুতে। বলে,‘অ্যাফেয়ার করি বা পরকীয়া, বয়সের ব্যবধান পাঁচের বেশি হবে না।’ তুমি লক্ষ্মী সই। এনআইডিতে অবশ্য ৪২ প্লাস দেয়া আছে। এনআ্ইডি তো কারুকে দেখাতে হবে না।
আর ওকে তো আমি বিয়ে করব না। ও-ও আমার সঙ্গে একমত। ফায়-ফুর্তি চলুক। কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমরা বিয়েতে নেই। আমাদের সমাজ-ধর্ম- সংসার আছে। তবে এখনও ফায়-ফুর্তির স্টেজে যাইনি। রিহার্সেল চলছে। দেখি কী হয়? আমি আবার এ ব্যাপারে মহাপুরুষ টাইপের মহাজন। কখনও নিজ থেকে জোর করে কিছুই আদায় করিনি। আর করবও না। জানেন তো জো আপসে আতা হ্যায় ও হালাল হ্যায়। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে বিলকিসকে নিয়ে। বিলকিস আবার আমার প্রাইম মিনিস্টার। জানেমান। বড় চাকরি করি বিধায় স্পিড মানি আছে। কাজেই, একটুআধটু স্বভাব খারাপ তো স্বাভাবিক ঘটনা। কোন বেটার স্বভাব খারাপ ছিল না! ইংরেজ জমানায় আমরা যখন সত্যযুগে বসবাস করতাম, নেহেরু তখন এডউইনা মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে শোয়াশুয়ি করেছে! আর গান্ধিজি নাকি তরুণী ছাড়া বুঝতেনই না! এদের তুলনায় আমি বেটা হলাম গিয়ে গঙ্গারাম তেলি।
একটু একটু করে হেঁটে যেই-না জিন্দাবাজারে এসেছি, দেখি মিছিল। এ আবার কিসের মিছিল। আজকাল তো সকলেই মানববন্ধন আর হাঙ্গার স্ট্রাইক নিয়ে জেরবার। যাই হোক অহিংস প্রতিবাদের এগুলো অবিচ্ছেদ্য অংশ। অহিংসা টিকে থাক, হিংসা নিপাত যাক।
কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা হলাম গিয়ে বাঙালি। বাঙালি আর অহিংসা একসঙ্গে যায় না। ইংরেজ আমলের একটি প্রবাদবাক্য শুনুন,‘যেখানে দুই বাঙালি সেখানে তিন কালীমন্দির।’ এটা আমাদের ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্যে প্রযোজ্য।
ভাবছি এই মুহূর্তে কী করব? কিন্তু ভাবার আর সময় পেলাম না। হঠাৎ ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেল। যে যেদিক পারছে দিগ্বিদিক দৌড়াচ্ছে। আমি পেছনের দিকে হেঁটে জামতলার ওই রাস্তার দিকে গেলাম। যাক আর ভয় নেই।
তখন দেখি আবার মোবাইলে ম্যাসেজ। সাধারণত আমার প্রাইম মিনিস্টার এসব পাঠিয়ে থাকে। আজ আবার কী পাঠাল। গতকাল পাঠিয়েছিল,‘ত্বকের সৌন্দর্য রক্ষায় পাঁচ তরিকা।’ আজ আাবার কোন তরিকা পাঠাল কী জানি?
না, বিলকিস না। শিপা চৌধুরী। অসময়ে কি আবার লাড়েলাপ্পা? চশমা লাগিয়ে হোয়াটসআপের চিরকুটটি পড়লাম। ‘এই এসো। অপেক্ষায় আছি।’ গতমাসে মিস হয়ে গেছে। বেশ দূর থেকে কার রিজার্ভ করে যখন ওর দোরগোড়ায় তখন ফের ম্যাসেজ। ‘বাসায় মেহমান। নো অ্যান্ট্রি।’
শিপার সঙ্গে আমার পরিচয়ের কথা না বললে কী রকম দেখায়। একটু বলে নিই।
তখন আমি আমার মেয়েকে নিয়ে সানরাইজ কিন্ডারগার্টেনে লেফটরাইট করি সপ্তাহে দুদিন। একদিন কথায় কথায় ওর সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল। ওর মেয়ে আমার মেয়ের সঙ্গে পড়ে একই সেকশনে। তখন মেয়ের পড়াশোনা নিয়েই আলাপ হতো। ম্যাডাম ডাকতাম। ঢংঢাং মাঝেমধ্যে করতাম।
একদিন বললাম,‘দাওয়াত খাওয়ালেন না?’
বললেন,‘কটা দিন সবুর করেন ভাই। দিব। ভাবিকে নিয়ে আসবেন।’
‘অবশ্যই আসব।’
তারপর একদিন বিলকিসকে সঙ্গে নিয়ে নিমন্ত্রণ খেতে গেলাম। জানলাম ওর সাহেব বছর দুয়েক হয় কানাডায় আছেন। প্রথম প্রথম আমি যেরকম ভদ্রজন সেরকম আচরণ করেছি। ভাবনাতে তখন কোনোরূপ কুচিন্তা ছিল না। মেয়ের বান্ধবীর মা—এটাই আমার কাছে মুখ্য ছিল। কিন্তু কী থেকে যেন কী হয়ে গেল। একহাতে তো তালি বাজে না। বাজে দুহাতে।
কী করব? যাব? যাই না। মিললেও মিলতে পারে সোনা।
সিটি সার্ভিস দেখি চৌহাট্টার দিকে যাচ্ছে। যাক, মনে হয় গণ্ডগোল শেষ হয়েছে। জিন্দাবাজার- বন্দরবাজারে গণ্ডগোল হওয়া মানে পুরো নগরী স্থবির হয়ে যাওয়া।
ইশারা দিয়ে আস্তে হতেই উঠে পড়লাম। সিটও একটা মাঝামাঝি খালি পেলাম। দেখি ভাবি। উইন্ডোর কাছে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছেন। বসলাম কর্নারে।
চোখাচোখি হতেই বললেন,‘আরে তুমি বুবুন না?’
বললাম,‘জি, ভাবি।’
‘কতদিন পর দেখা! কোথায় থাকো? এ শহরে থাকো না? আমি তো শুনেছি তুমি বাড়িতে থাক। আর এই গাড়িতে দেখা!’
বললাম,‘সময় আর হয়ে ওঠে না ভাবি।’
তিনি ছেলেমেয়েদের কথা জিজ্ঞেস করলেন। কে, কোথায় পড়ে? সবকিছু জেনে নিলেন।
বললেন,‘পয়সা তো ভালোই কামাচ্ছ।’
‘আপনাদের দোয়া ভাবি। আর ওই ওপরওয়ালার ইচ্ছা।’
ভাবি আম্বরখানা পেরিয়ে লেচুবাগানে নামতে আমিও ওঁর সঙ্গে নেমে পড়লাম। ‘কোথায় যাবে?’ জিজ্ঞেস করতেই মিছেমিছি বললাম বন্ধুর বাড়িতে। তিনি বললেন,‘আমার বাড়িতে আসো। আরেকদিন যেও বন্ধুর বাড়ি। আসো।’ না করতে পারলাম না। তাঁর সঙ্গে গেলাম।
এই ভাবির ছিলাম আমি জানপ্রাণ। যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে কেবল উচ্চ মাধ্যমিক একাদশ শ্রেণিতে পড়ি মুরারিচাঁদে। মাঝেমধ্যে কলেজের গাড়িতে যাই কলেজে, আর না হয় ফিনিক্স বাইসাইকেলে পৌঁছি। সেই বাইসাইকেলটি মা কি কষ্ট করে কিনে দিয়েছিলেন ভাবলে এখনও মন খারাপ হয়ে যায়।
তো ভাবির সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গতা তৈরি হয়ে গেল। আর অ্যাডোলেন্সেস পিরিয়ডে কেউ আদর-সোহাগ করলে তা ভাব-ভালোবাসায় রূপ নিতে সময় লাগে না। আমিও এর ব্যতিক্রম ছিলাম না। অচিরেই একটি অসম সম্পর্ক পাপলুর ভাবির সঙ্গে হয়ে গেল। আজ এতদিন পর সত্যি কথা বলতে আমার দ্বিধা নেই, বেশ কয়েকবার পাপলুর ভাবির মধু আমিই পান করেছি।
দোষটা ছিল পাপলুর। আমি যেতাম বন্ধুর বাড়িতে। আর কোনো উদ্দেশ্যে ছিল না এতে। ওখান থেকে আবার কানু সান্যাল স্যারের বাসায় যেতাম ম্যাথ পড়তে। ভাবি মাঝেমধ্যে দুপুরের খাবারও খাওয়াতেন। ওইটুকুই ঢের বেশি ছিল।
একদিন তখন বেশ শীত পড়েছে। আমি সবসময় সেইসময় জিন্স পড়ি। তো খাবার খেতে আমার খুব অসুবিধা হচ্ছিল, তখন পাপলু তার লুঙ্গি নিয়ে এসে আমাকে দিল। আমি লুঙ্গি পরে খেতে শুরু করলাম। আমি তো জানি না, পরের দিন শুনলাম, ভাবি বলছেন, ‘কী সুন্দর মোটা বাঁশ দেখলাম আর সঙ্গে মাখন কালকে খাওয়ার সময়!’
ওই তো শুরু। তারপর মাস ছয়েকের মধ্যে ভাবি আত্মসমর্পণ করলেন।
‘ভাবি আপনার দুইছেলে আর এক মেয়ে না?’
‘না, পরে অর্ঘ হলো। তুমি ওকে দেখোনি। ও এখন বুয়েটে পড়ছে।’
এ পাড়ার রাস্তাগুলো এখন বেশ বড়। তখন তো কী ছোটো আর কী কাঁচা রাস্তা ছিল! বর্ষায় হাটু জল জমে যেত। বাড়িঘরও তেমন ছিল না। কী ছিল আর কী হলো! সময় সবকিছু বদলে দেয়।
‘ভাবি...।’
বিলকিসের রিং ধেয়ে এলো।
‘কিতা ব্যাপার বিলকিস?’
‘এরে তুমি কই? তাড়াতাড়ি আও। বাইসাবে মারামারি লাগাই দিসইন। আও তাড়াতাড়ি।’
জায়গা নিয়ে বড়ভাইয়ের সঙ্গে বিবাদ চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে। ভাই জিতলে আমি আপিল করি, আর আমি জিতলে ভাই আপিল করেন। এইভাবেই চলছে।
ভাবিকে সরি বলে বিদায় নিলাম।
‘কই তুমার বাইসাব? আমারে লইয়া আইলায়। বন্ধুর বাড়ি গেসলাম। তুমার লাগি আড্ডা মারা গেল না।’
‘বাইসাব গেসইন তান উকিলোর বাড়ি।’
‘আর অনন্যা?’
‘নানু আইয়া লইয়া গেসইন। কাইল আইব।’
‘কাইল তো অর্ঘ আইতো নানি?’
‘অয়, কাইল আইবো। মাছ-তরকারি বিয়ানে আনাত যেইবায়।’
আজ যে আমার কী হয়েছে? মাথা এমনিতে ভন ভন করছে। শিপা চৌধুরী মিস হয়ে গেল। ভাবির তো সেইসময় নেই। সময় অনেক কিছুর নীতিনির্ধারক।
কী আর করি। বিলকিসকে ডাক দিলাম। বুদ্ধি করে আসার সময় ওর জন্যে একটি সোনার আংটি কিনে নিয়ে এলাম। মেয়েদের থেকে কোনকিছু আদায় করতে হলে এমনি এমনি হয় না। খরচ লাগে; গিফট লাগে।
‘বিলকিস, এই বিলকিস। লক্ষ্মী সোনা আমার।’
বিলকিসের না বলার আর সাধ্য নেই।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন