অ্যাডলফ লুজের প্রবন্ধ || অলংকার ও অপরাধ

অ+ অ-

|| অ্যাডলফ লুজ ||

অ্যাডলফ লুজ [১৮৭০-১৯৩] ছিলেন বিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী, আধুনিকতাবাদী প্রকৌশলীদের অন্যতম। জীবদ্দশায় বিভিন্ন বিতর্ক ও কেলেঙ্কারির মধ্য দিয়ে গেলেও ইউরোপে আজ তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন মূলত তার বিপ্লবী প্রকৌশল-দর্শন ও শিল্পচিন্তার সুবাদে। উনিশ শতকের শেষ দশকে ও বিশ শতকের প্রারম্ভের কয়েকটি দশকে শিল্প, প্রকৌশলবিদ্যা, ফ্যাশন, ডিজাইন ইত্যাদি বিষয়ে তিনি সাড়া-জাগানিয়া কিছু লেখা উপহার দেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে Ornament and Crime' নামক একটি ম্যানিফেস্টোধর্মী প্রবন্ধ। মূল জার্মান প্রবন্ধটি ১৯১০ সালে একটি বক্তৃতা হিসেবে উপস্থাপিত হয়। ছাপা অক্ষরে প্রথম প্রকাশ পায় ১৯১৩ সালে, ফরাসি ভাষায়, Ornament et crime' শিরোনামে। ১৯২৯ সালে Frankfurter Zeitung পত্রিকায় বের হয় Ornament und Verbrechen' শীর্ষক প্রথম জার্মান সংস্করণ। সেই প্রবন্ধটিরই অনুবাদ এখানে হাজির করা হচ্ছে অলংকার ও অপরাধ শিরোনামে। প্রবন্ধের কিছু কিছু বক্তব্য একুশ শতকের পাঠকের চোখে সমস্যাজনক ঠেকতে পারে। সেরকম ক্ষেত্রে পাঠককে লেখকের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতেই উৎসাহিত করা হচ্ছে।

অ্যাডলফ লুজের প্রবন্ধ || অলংকার ও অপরাধ

অনুবাদ || অরিত্র আহমেদ

মাতৃগর্ভে থাকাকালে একটি মানব-ভ্রূণ প্রাণীজগতের বিবর্তনের সকল ধাপের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। একটি মানবশিশু যখন জন্ম নেয়, তখন তার ইন্দ্রিয়জ অনুভূতি থাকে একটি সদ্যজাত কুকুরছানার মতো। এরপর তার শৈশব তাকে মানবেতিহাসের যাবতীয় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায। দু'বছর বয়সে সে এই পৃথিবীটা দেখে এক পাপুয়ানের চোখে, চার বছর বয়সে দেখে প্রাচীন টিউটনের চোখে, ছয় বছর বয়সে সক্রেটিস এবং আট বছর বয়সে সে ভলতেয়ারের চোখে এই পৃথিবীকে দেখতে থাকে। আট বছর বয়সে সে বেগুনি রঙের অস্তিত্বের ব্যাপারে সচেতন হয়, যে রঙটা আবিষ্কৃত হয়েছে আঠারো শতকে। তার আগ পর্যন্ত ভায়োলেট মানে ছিলো হয় নীল, নয়তো রক্তবর্ণ লাল। আজকের যুগে পদার্থবিজ্ঞানীরা সৌর বর্ণালীর এমন কিছু রঙের কথা আমাদেরকে বলছেন, যাদের নাম আছে, কিন্তু যাদের ব্যাপারে ব্যাপক জ্ঞানলাভ কেবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যই সংরক্ষিত।

শিশুরা নৈতিকতাবোধহীন। আমাদের চোখে পাপুয়ানরাও তাই। একজন পাপুয়ান তার শত্রুকে হত্যা করার পর তার মাংস ভক্ষণ করে। এর জন্য তাকে অপরাধী বলা হয় না। কিন্তু কোনো আধুনিক মানুষ যখন কাউকে হত্যা করে তার মাংস ভক্ষণ করে, তখন সে হয় অপরাধী, নয়তো অবক্ষয়গ্রস্ত হিসেবে পরিগণিত হয়। একজন পাপুয়ান তার শরীরে, তার নৌকায়, নৌকার বৈঠায়, অর্থাৎ যা তার সামনে পড়ে, তাতেই সে ট্যাটু আঁকায়। সে কোনো অপরাধী নয়। কিন্তু কোনো আধুনিক মানুষের শরীরে ট্যাটু দেখলেই ধরে নিতে হবে যে, হয় সে অপরাধী, নয়তো অবক্ষয়গ্রস্ত। এমন অনেক কারাগার আছে, যেখানে বন্দী আসামিদের শতকরা আশি ভাগের শরীরেই ট্যাটু পাওয়া গেছে। আর শরীরে ট্যাটু থাকার পরও যারা কারাগারের বাইরে অবস্থান করছে, তারা হয় সম্ভাব্য অপরাধী, নয়তো অবক্ষয়গ্রস্ত অভিজাত লোকজন। কোনো ট্যাটুওয়ালা লোক কারাগারের বাইরে মৃত্যুবরণ করেছে মানে ধরে নিতে হবে যে একটা অপরাধ সংঘটনের কয়েক বছর আগেই সে মৃত্যুবরণ করেছে।

মুখমণ্ডল-সহ হাতের কাছে যা কিছু পাওয়া যায়, তাকেই অলংকৃত করার তাড়না থেকেই প্লাস্টিক আর্টের জন্ম। একে চিত্রকলার অপরিণত, শিশুসুলভ প্রকাশও বলা যায়। সকল শিল্পই কামমূলক [erotic]।

সর্বপ্রথম যে অলংকারটির জন্ম হয়েছিলো, অথাৎ ক্রুশচিহ্ন, তার উৎসও ছিলো কাম। দেয়ালের গায়ে একটি চিহ্ন অঙ্কনের মাধ্যমে পৃথিবীর প্রথম শিল্পী তার প্রথম শিল্পকর্ম, অর্থাৎ প্রথম শিল্পীসুলভ কর্মটি সম্পন্ন করে তার উদ্বৃত্ত কর্মশক্তি থেকে মুক্তি লাভ করেছিলো: চিহ্নটি ছিলো ক্রুশচিহ্ন। আড়াআড়ি একটা রেখা, অর্থাৎ শায়িত এক নারী। অতঃপর উল্লম্ব একটি রেখা, অর্থাৎ গমনরত এক পুরুষ। যে মানুষ এই ক্রসচিহ্নটি এঁকেছিলো, সে নিজের ভেতরে ঠিক সেই তাড়নাই অনুভব করেছিলো, যে তাড়না অনুভব করেছিলেন বিঠোফেন; নবম সিম্ফনি লেখার সময় বিঠোফেন যে স্বর্গে অবস্থান করছিলেন, সে-ও ঠিক সেই স্বর্গেই অবস্থান করেছিলো।

আজকের দিনে কোনো মানুষ যদি তার ভেতরের তাড়নায় সাড়া দিয়ে দেয়ালের গায়ে এরকম কামোদ্দীপক আঁকিবুঁকি করে বেড়ায়, তো হয় সে অপরাধী, নয়তো অবক্ষয়গ্রস্ত সাব্যস্ত হবে। বলাই বাহুল্য, মানুষ যখন শৌচাগারে থাকে, তখনই তার ভেতরের এই তাড়না অবক্ষয়ের বিবিধ উপসর্গ নিয়ে তার উপর সবচেয়ে বেশি ভর করে। আসলে একটা দেশের শৌচাগারগুলোর দেয়ালের আঁকিবুঁকির পরিমাণ দেখে সেই দেশের সংস্কৃতির মূল্য বিচার করা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যাপারটা প্রাকৃতিক: একটি শিশুর জীবনের প্রথম শৈল্পিক আত্মপ্রকাশ ঘটে দেয়ালের গায়ে কামোদ্দীপক আঁকিবুঁকির মাধ্যমে। কিন্তু একজন পাপুয়ান কিংবা একটি শিশুর ক্ষেত্রে যেটা স্বাভাবিক, প্রাপ্তবয়স্ক আধুনিক মানুষের ক্ষেত্রে সেটিই অবক্ষয়ের লক্ষণ। এই ব্যাপারটাই আমি আবিষ্কার করেছি এবং আমি সেটা ভাষায় প্রকাশ করছি এইভাবে: ব্যবহারোপযোগী বস্তুর শরীর থেকে অলংকার অপসারণের সঙ্গে সংস্কৃতির বিকাশ সমার্থক। আমার ধারণা ছিলো, এই আবিষ্কারের মাধ্যমে আমি পৃথিবীর জন্য আনন্দের বার্তা বয়ে এনেছি: কিন্তু এর জন্য কেউ আমাকে কোনোরকম ধন্যবাদ তো জ্ঞাপন করলোই না, উল্টো দেখা গেলো যে, আমার কথা শুনে মানুষের মন খারাপ হয়ে গেছে, মানুষ হতাশ হয়ে গেছে। হতাশার কারণ ছিলো তাদের এই উপলব্ধি যে, তারা আর নতুন কোনো অলংকার উৎপাদন করতে পারবে না। কেবল আমরাই, অর্থাৎ উনিশ শতকের মানুষ এই আমরাই কি সেটা করতে পারবো না, সকল যুগের সকল জাতির মানুষ যেটা করে এসেছে, এমনকি একটা নিগ্রো পর্যন্ত যেটা করে দেখাতে পারতো? বিগত শতাব্দীগুলিতে মানুষ অলংকার ব্যতিরেকে যা কিছু সৃষ্টি করেছে, কোনো রকম চিন্তার অবকাশ না রেখেই সেসব ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে এবং ঠেলে দেওয়া হয়েছে ধ্বংসের মুখে। ক্যারোলিঙ্গিয়ান যুগের কোনো কাঠের বেঞ্চ আজ আমরা আর দেখতে পাই না, কিন্তু অলংকার-সহযোগে তৈরি সে যুগের তুচ্ছতম বস্তুটিও মানুষ সংগ্রহ করেছে, ধুয়েমুছে পরিষ্কার করেছে, এবং বিরাট বিরাট প্রাসাদোপম ভবন নির্মাণ করেছে সেগুলো সংরক্ষণের জন্য। কাচের আলমিরায় সাজিয়ে রাখা সেসব বস্তু দেখে আজ মানুষ বিষণ্ণ হয়ে ওঠে, আর লজ্জিত হয় আপন তুচ্ছতার কথা ভেবে। মানুষ জানতে চায়, প্রত্যেক যুগেরই তো নিজস্ব একটি শিল্পশৈলী থাকে, আমাদের যুগের সেটা থাকবে না কেনো? এখানে শিল্পশৈলী শব্দটির দ্বারা তারা অবশ্য অলংকারকেই বুঝিয়ে থাকে। তো, আমি তাদেরকে বললাম, দুঃখের কোনো কারণ নেই। দেখুন, আমাদের যুগের মাহাত্ম্য এইখানেই নিহিত যে আমরা নতুন কোনো অলংকার সৃষ্টি করতে অক্ষম। আমরা অলংকারের যুগ পার হয়ে এসেছি, অলংকারের হাত থেকে মুক্তির পথে আমরা এগিয়ে চলেছি। চেয়ে দেখুন, সময় ঘনিয়ে এসেছে, পূর্ণতা রয়েছে আমাদের প্রতীক্ষায়। অচিরেই শহরের রাস্তাগুলো শাদা দেয়ালের মতো চকচক করে উঠবে। স্বর্গের রাজধানী, পবিত্র শহর জায়নের মতো। আর তখনই আসবে পূর্ণতা।

আমার এ কথা কালো আলখাল্লা-পরা যাজকদের পছন্দ হলো না। তাদের সাফ কথা, মানুষকে অলংকারের দাসত্বই সহ্য করে যেতে হবে। অথচ আধুনিক মানুষ এতো দূর এগিয়ে গিয়েছে যে অলংকার এখন তার মধ্যে কোনো আনন্দানুভূতি আর জাগায় না; ট্যাটু-করা মুখ তার নান্দনিক অনুভবকে তীব্রতর তো করেই না (একজন পাপুয়ানের ক্ষেত্রে অবশ্য বিষয়টা আলাদা), বরং তাকে আরো কমিয়ে দেয়। মানুষ এতো দূর এগিয়ে গেছে যে একটা সাদাসিধে সিগারেটের খাপই তার এখন বেশি পছন্দের; একই দামে বহুল-অলংকৃত কোনো সিগারেটের খাপ পেলেও সে সেটা কিনবে বলে মনে হয় না। মানুষ এখন তার পোশাক-আশাক নিয়ে বেশ সুখেই আছে, এবং তাকে যে মেলার মাঠের বানরের মতো সোনালী ঝালর আর লাল মখমলের মোজা পরে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে না, এটা তার কাছে একটা আনন্দের ব্যাপার। আর তাই আমি বললাম: চেয়ে দেখুন, রেনেসাঁ-যুগের সমস্ত জৌলুসের চেয়ে গ্যেটের মৃত্যু-প্রকোষ্ঠ অনেক ভালো, এবং আজকের যুগের একটা শাদামাটা আসবাবপত্রও জাদুঘরের কাচের আড়ালে রক্ষিত নকশা-খচিত খাটপালঙ্কের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। পেগনিৎসের রাখালী ভাষার সমস্ত অলংকারের চেয়ে গ্যেটের ভাষা অনেক বেশি সুন্দর।

কালো আলখাল্লাওয়ালারা এ কথা শুনে অসন্তুষ্ট হলেন; এবং রাষ্ট্র, যার কাজই হচ্ছে জনগণের সাংস্কৃতিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা, অলংকারের পুনরুজ্জীবন ও উন্নতিসাধনের ব্যাপারটি নিজের হাতে তুলে নিলো। সেই রাষ্ট্রগুলো আসলে খুবই হতভাগা, যেখানে আইন-পরামর্শকরা বিপ্লবের দেখভাল করার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন! অচিরেই ভিয়েনা ফলিত কলা জাদুঘরে আমরা বিরাট এক ঝাঁক মাছ' নামক টেবিল এবং বিমোহিত রাজকন্যা নামক আলমারি দেখতে পেলাম। দেখতে পেলাম এরকম আরো অনেক হতভাগ্য আসবাবপত্র, গায়ের ওপরকার অলংকার অনুযায়ী যাদের নামকরণ করা হয়েছে। অস্ট্রিয় রাষ্ট্র কাজটা এতোটাই গুরুত্বের সঙ্গে নিলো যে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যবহৃত পা-বাঁধা ন্যাকড়া যাতে বিলুপ্ত হয়ে না যায়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলো। বিশোর্দ্ধ সকল সুসভ্য নাগরিককে রাষ্ট্র এখন টানা তিন বছর কারখানাজাত মোজার বদলে ওই পা-বাঁধা ন্যাকড়া পরতে বাধ্য করছে। ঠিকই আছে। কারণ, রাষ্ট্রের জন্মই তো হয় এই পূর্বশর্ত মেনে যে, পায়ের দৃঢ়তা যাদের কম, তাদের উপর ছড়ি ঘোরানো অপেক্ষাকৃত বেশি সহজ।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, অলংকার-ব্যাধি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং রাষ্ট্রের অর্থায়নে এখন তার বিকাশ ঘটছে। আমি এই ঘটনাকে আমাদের অধঃপতনের একটা চিহ্ন মনে করি। অলংকার একজন রুচিশীল মানুষের জীবনের আনন্দ বর্ধন করে' এই যুক্তি আমি মানি না। কোনো অলংকার যদি সুন্দর হয়, তবে তো...’— এই জাতীয় নালিশেও আমি কান দিই না। অলংকার আমার জীবনের আনন্দ একটুও বাড়ায়নি, বাড়ায়নি কোনো রুচিশীল মানুষের আনন্দ। আমি যদি কোনো পাউরুটি খেতে চাই, তো একটা শাদামাটা আর মসৃণ পাউরুটিই আমি বেছে নেবো। হৃদয়, মানবশিশু কিংবা অশ্বারোহী আকৃতির এবং সারা গায়ে নকশা-করা কোনো পাউরুটি অবশ্যই নেবো না। ফলে পঞ্চদশ শতকের কোনো মানুষ আমাকে বুঝতে পারবে না। কিন্তু আধুনিক মানুষ মাত্রই আমাকে বুঝবে। অলংকারের পক্ষপাতীরা হয়তো বলবেন যে, সারল্যের প্রতি আমার এই তীব্র অনুরাগ আসলে এক ধরনের আত্মসংযমেরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু না, হে চারুকলা মহাবিদ্যালয়ের নমস্য অধ্যাপকবৃন্দ, আমার আত্মসংযম কিংবা রিপুদমনের ব্যাপার এটি নয়। আগের যুগে বিভিন্ন খাবার-দাবার, যেমন, ময়ূর, মুরগি, চিংড়ি-কে আরো সুস্বাদু হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য তাদেরকে হাজারো অলংকারে অলংকৃত করা হতো। কিন্তু ওসব দেখলে আমার খাওয়ার ইচ্ছাটাই চলে যায়। কোনো রন্ধন-প্রদর্শনীতে গেলে আশেপাশে তাকালেই আমার ভয় হয়, বিবিধ অলংকারে সুশোভিত এইসব মৃত মাংসপিণ্ড খাওয়ার কথা ভাবলেই গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে। এর চেয়ে সাদাসিধে গরুর মাংসের রোস্ট পেলেই আমি খুশি হই।

অলংকারের পুনরুজ্জীবনের ফলে মানুষের নান্দনিক বিকাশের যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে, অচিরেই মানুষ হয়তো তার একটা বিহিত করে ফেলবে, কারণ মানুষের বিকাশকে ঠেকিয়ে রাখার সাধ্য কারো নেই, এমনকি রাষ্ট্রেরও নেই সেটা। কিছু বিলম্ব হতে পারে সর্বোচ্চ। আমরা না হয় তার জন্য অপেক্ষা করবো। কিন্তু অলংকারের পেছনে এই যে বিপুল শ্রম, অর্থ ও সম্পদ অপচয় করা হচ্ছে, আমাদের জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে এ এক বিরাট অন্যায়ই বটে। সময় এর ক্ষতিপূরণ করতে পারবে না।

এই পথভ্রষ্টদের কারণে আমাদের সাংস্কৃতিক বিকাশের গতি কমে যাচ্ছে। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আমি ১৯০৮ সালে বাস করছি, কিন্তু আমার প্রতিবেশী বাস করছেন ১৯০০ সালে, এবং মোড়ের মাথার ওই লোকটা বাস করছেন ১৮৮০ সালে। এই যে, একটা রাষ্ট্রের সংস্কৃতি একই সময়ে এতো দীর্ঘ কালব্যাপী ব্যাপৃত হয়ে আছে, ওই রাষ্ট্রের জন্য এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক একটা ব্যাপার। কালসের কৃষকরা এখনো দ্বাদশ শতকের অধিবাসী। সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফের রাজত্বের পঞ্চাশ বছর পূর্তির কুচকাওয়াজে এমন অনেক লোকজন ছিলো, যাদেরকে এমনকি রোমান যুগেও পশ্চাৎপদ গণ্য করা হতো। কতো সুখে আছে সেই দেশটি, যেখানে এই জাতীয় পথভ্রষ্ট আর ঠগী লোকজনের অস্তিত্ব নেই! কতো সুখী আমেরিকা!

এমনকি আমাদের নগরবাসীদের মধ্যেও অষ্টাদশ শতক থেকে উঠে আসা অনেক অনাধুনিক লোকজন রয়েছে, যারা কোনো বেগুনি রঙের ছবি দেখলে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে, কারণ অষ্টাদশ শতকের মানুষ হিসেবে তারা এখনো বেগুনি রঙের অস্তিত্ব সম্পর্কেই কিছু জানে না। সারাদিন রান্নাঘরে বসে একজন রাধুনী অনেক সাজিয়ে-গুছিয়ে যে মাংসটা রান্না করে, সেইটাই তাদের কাছে অনেক সুস্বাদু মনে হয়; এবং একটা শাদামাটা সিগারেটের কেসের চেয়ে রেনেসাঁ আমলের বহুল-অলংকৃত সিগারেট কেসই তারা বেশি পছন্দ করে। আর গ্রামগঞ্জের অবস্থাটা কী? সেখানে মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ, আসবাবপত্র সবই অত্যন্ত সেকেলে। আমাদের দেশের কৃষকেরা এখনো খ্রিস্টান হয়ে উঠতে পারেনি। তারা এখনো পৌত্তলিকই রয়ে গেছে।

এই সেকেলে পথভ্রষ্ট লোকজনের কারণে বিভিন্ন জাতি ও জনপদের সাংস্কৃতিক বিকাশ মন্থর হয়ে পড়ছে। অপরাধীরা যে শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই অলংকার ব্যবহার করছে, তা নয়; বরং মানবিক স্বাস্থ্য, জাতীয় অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের উপর অলংকার এই যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে, একেও এক বিরাট অপরাধই বলা চলে। ব্যাপারটা পরিষ্কার করা যাক। একই রকম প্রয়োজন, একই রকম দাবি-দাওয়া, একই রকম উপার্জন, কিন্তু একের সংস্কৃতি অন্যের থেকে আলাদাএমন দুটি জনপদ যদি পাশাপাশি বসবাস করে, তো অর্থনৈতিক বিবেচনায় তাদের পরিণতি হবে নিম্নরূপ: বিশ শতকের মানুষগুলো দিনকে দিন ধনী থেকে আরো ধনী হতে থাকবে, অন্য দিকে আঠারো শতকের মানুষগুলো হবে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর। উভয় জনপদই তাদের খেয়ালখুশি মোতাবেক জীবন যাপন করবেএটা ধরে নিয়েই আমি এ কথা বলছি। বিশ শতকের একজন মানুষ অনেক কম অর্থ ব্যয় করে তার প্রয়োজনসমূহ মেটাতে পারে, এবং ফলশ্রুতিতে সে অর্থ সঞ্চয় করতে পারে বেশি। শাকসবজি পানিতে সিদ্ধ করে ওপরে একটু মাখন লাগিয়ে নিলেই বিশ শতকের মানুষ সেটা আয়েশ করে খেতে পারে। আঠারো শতকের মানুষ ওই একই শাক-সবজি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে রান্না না করলে এবং মধু-বাদাম প্রভৃতি সঙ্গে যোগ না করলে আয়েশ করে খেতে পারে না। আগের যুগের বহুল-অলংকৃত থালা-বাসনগুলো দেখা যায় খুবই ব্যয়বহুল, কিন্তু আধুনিক মানুষ যে সাদামাটা প্লেটে করে খাবার খায়, তা তুলনায় খুবই সস্তা। ফলে একজন যেখানে সঞ্চয় করতে পারে, অন্যজনকে সেখানে ধারদেনা করে চলতে হয়৷ এ কথা ব্যক্তিগত পর্যায়ে যেমন সত্য, তেমনই সত্য জাতীয় পর্যায়েও। সাংস্কৃতিক বিকাশে পিছিয়ে থাকা জাতিগুলোর কথা ভাবলে দুঃখ হয়। ব্রিটিশরা দিনকে দিন ধনী হয়ে চলেছে, আর আমরা হচ্ছি দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর...

প্রতিটা জিনিস নান্দনিকভাবে ততদিনই স্থায়ী হত, যতদিন পর্যন্ত তা শারীরিকভাবে টিকে থাকে, তাহলে ভোক্তাও হয়তো জিনিসগুলোর বিনিময়ে এমন মূল্য দিতে পারত, যাতে শ্রমিকের উপার্জন বেশি হয় এবং অপেক্ষাকৃত কম সময় কাজ করা লাগে। আমি যে জিনিসটা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারব বলে নিশ্চিত হতে পারি, তার জন্য আমি স্বেচ্ছায় চার গুণ বেশি দাম দিই। তার চেয়ে কম দামের হলেও নিম্নমানের কোনো জিনিস আমি কিনি না।

আরও বেশি ক্ষতির শিকার হয় সেইসব জাতি, যারা অলংকার উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। যেহেতু অলংকার আর আমাদের সংস্কৃতির স্বাভাবিক উৎপাদন নয়বরং এটি এখন পশ্চাৎপদতা কিংবা অধঃপতনের একটি লক্ষণতাই অলংকার-নির্মাতার কাজ এখন আর যথাযথ পারিশ্রমিক পায় না।

কাঠখোদাইকার ও লেদ-মিস্ত্রির আয়ের পার্থক্য, সূচিশিল্পী ও লেইস-নির্মাতাদের অপরাধজনকভাবে কম মজুরিএসব সবারই জানা আছে। একজন আধুনিক শ্রমিক আট ঘণ্টায় যা উপার্জন করে, একজন অলংকারনির্মাতাকে সেই পরিমাণ আয় করতে বিশ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। অলংকার সাধারণত কোনো বস্তুর মূল্য বাড়িয়ে দেয়; তবুও দেখা যায়, কাঁচামালের খরচ সমান এবং তৈরি করতে তিন গুণ বেশি সময় লাগা সত্ত্বেও একটি অলংকৃত বস্তু প্রায়শই একটি সাধারণ মসৃণ বস্তুর অর্ধেক দামে বিক্রি হয়। ফলে অলংকার বর্জন করলে উৎপাদনের সময় কমে যায় এবং শ্রমিকের মজুরি বাড়ে। চীনা কারিগর ষোলো ঘণ্টা কাজ করে, আমেরিকান শ্রমিক আট ঘণ্টা। যদি আমি একটি মসৃণ সিগারেট কেসের জন্য একটি অলংকার-শোভিত সিগারেট কেইসের সমান মূল্য দিই, তবে উৎপাদনের সময়ের যে পার্থক্য, তা পুরোটা গিয়ে পড়ে শ্রমিকের ঘাড়ে। আর যদি একেবারেই অলংকার না থাকেযা হয়তো হাজার বছর পরে সম্ভব হবেতাহলে মানুষকে আট ঘণ্টার বদলে মাত্র চার ঘণ্টা কাজ করতে হবে, কারণ আজকের যুগে কাজের অর্ধেক সময়ই অলংকরণের পেছনে ব্যয় হয়। অলংকার হলো অপচয়িত শ্রমশক্তি, এবং সেই কারণেই, অপচয়িত স্বাস্থ্য। চিরকালই ব্যাপারটা এমনই ছিল।

যেহেতু অলংকারের সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতির কোনো স্বাভাবিক যোগসূত্র নেই, তাই এটি আর আমাদের সংস্কৃতির প্রকাশও নয়। আজকের জামানায় যে সমস্ত অলংকার তৈরি হচ্ছে, তার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেইকোনো মানবিক সম্পর্ক যেমন নেই, বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গেও এর তেমনি কোনো যোগ নেই। বিকশিত হওয়ার ক্ষমতাও এটা আর রাখে না। অটো একমান-এর অলংকারগুলোর ভাগ্যে কী ঘটেছে? কিংবা ভান দে ভেলদে-র? শিল্পীরা সব সময়ই শক্তি ও স্বাস্থ্যে ভরপুর হয়ে মানবজাতির অগ্রভাগে থাকে। কিন্তু আধুনিক অলংকারপন্থী হলো এক পিছিয়ে পড়া ব্যক্তি, কিংবা এক প্রকার রোগগ্রস্ত সত্তা। তিন বছর পর সে নিজেই নিজের সৃষ্টিকে অস্বীকার করবে। শিক্ষিত মানুষ ওগুলো দেখামাত্রই মুখ ফিরিয়ে নেয়; অন্যরা হয়তো কয়েক বছর সময় নেয়। আজ অটো একমান-এর কাজগুলো আজ কোথায়? আধুনিক অলংকারের কোনো পূর্বসূরি নেই, কোনো উত্তরসূরিও নেইএর না আছে অতীত, না আছে ভবিষ্যৎ। যারা অসংস্কৃত, যাদের কাছে আমাদের যুগের মহিমা এক রহস্যময় বইয়ের মতো। তারা প্রথমে একে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই প্রত্যাখ্যান করে বসে।

অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে মানবজাতি এখন অনেক বেশি সুস্থ; অসুস্থ কেবল অল্প কয়েকজনই। কিন্তু এই অল্প কয়েকজনই সেইসব শ্রমিকের ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে, যারা এতটাই সুস্থ যে কোনো অলংকার তারা উদ্ভাবন করতে পারে না। অসুস্থ লোকগুলি তাদেরকে বাধ্য করে তাদের উদ্ভাবিত অলংকার বিভিন্ন বস্তুর উপর প্রয়োগ করতে।

অলংকারের পরিবর্তন শ্রমের ফসলের অকাল অবমূল্যায়ন ঘটায়। শ্রমিকের সময় এবং ব্যবহৃত উপকরণউভয়ই হচ্ছে মূল্যবান পুঁজি, যা এখানে অপচয় হয়। আমি একটি নীতি এখানে উল্লেখ করছি: কোনো বস্তুর রূপ ততদিনই স্থায়ী থাকেঅর্থাৎ গ্রহণযোগ্য থাকেযতদিন বস্তুটি শারীরিকভাবে টিকে থাকে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি। একটা স্যুটের রূপ একটা দামী পশমের কোটের তুলনায় বেশি ঘন ঘন পরিবর্তিত হয়। একটামাত্র রাতের জন্য তৈরি নৃত্যানুষ্ঠানের গাউনের রূপ একটা টেবিলের চেয়ে দ্রুত বদলায়। কিন্তু বিশাল সর্বনাশ হয়ে যাবে, যদি পুরোনো ডিজাইন অবাঞ্চিত হয়ে ওঠার কারণে একটা টেবিলকেও ওই গাউনের মতোই দ্রুত রূপ বদলাতে হয়সে ক্ষেত্রে টেবিলের পেছনে ব্যয় করা পুরো টাকাটাই জলে যাবে।

এই ব্যাপারটা অলংকারপন্থীদের ভালোভাবেই জানা আছে, এবং অস্ট্রিয়ার অলংকারপন্থীরা এই সীমাবদ্ধতাটাকে যথাসম্ভব কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। তারা বলে: আমরা এমন ভোক্তাকেই পছন্দ করি, যার আসবাবপত্র দশ বছর পর তার কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে, এবং যে কারণে তাকে প্রতি দশ বছর পরপর নতুন করে আসবাব কিনতে হয়। সেই ভোক্তাকে আমরা কম পছন্দ করি, যে পুরোনো জিনিস একেবারে নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত নতুন কিছু কেনে না। শিল্প এই পরিবর্তনই দাবি করে। এর ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয়।

এটাই যেন অস্ট্রিয়ার জাতীয় অর্থনীতির গোপন রহস্য। কোথাও আগুন লাগলে আমরা প্রায়ই কাউকে না কাউকে বলে উঠতে শুনি: ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, এখন আবার মানুষের কাজ করার সুযোগ হবে! এক্ষেত্রে একটি চমৎকার সমাধান আমি বাতলে দিতে পারি। একটা গোটা শহরে আগুন লাগিয়ে দাও, বা আগুন লাগিয়ে দাও গোটা সাম্রাজ্যেই। তাহলেই দেখবে, অর্থ ও সমৃদ্ধির স্রোতে ভেসে যাচ্ছে! এমন আসবাব তৈরি করো, যা তিন বছরের মধ্যে জ্বালানি কাঠ হিসেবে ব্যবহার করা লাগে; এমন ধাতব জিনিসপত্র তৈরি করো, যা চার বছর পরই গলিয়ে ফেলতে হয়, কারণ এমনকি নিলামে তুললেও তখন তার উপকরণ ও শ্রমের মূল্যের এক-দশমাংশও পাওয়া ফেরত যাবে না। তাহলেই আমরা ক্রমাগত ধনী হতে আরো ধনী হতে থাকব।

অবশ্য কেবল ভোক্তাই এই ক্ষতির শিকার হয় না। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় স্বয়ং উৎপাদকই। আজকের যুগে যে সব জিনিস স্বাভাবিকভাবেই অলংকৃত হবার প্রয়োজন থেকে মুক্ত হয়ে উঠেছে, তার উপর যেকোনো অলংকারই আসলে অপচয়িত শ্রম এবং নষ্ট কাঁচামালের নিদর্শন ছাড়া কিছু নয়। যদি প্রতিটা জিনিস নান্দনিকভাবে ততদিনই স্থায়ী হত, যতদিন পর্যন্ত তা শারীরিকভাবে টিকে থাকে, তাহলে ভোক্তাও হয়তো জিনিসগুলোর বিনিময়ে এমন মূল্য দিতে পারত, যাতে শ্রমিকের উপার্জন বেশি হয় এবং অপেক্ষাকৃত কম সময় কাজ করা লাগে। আমি যে জিনিসটা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারব বলে নিশ্চিত হতে পারি, তার জন্য আমি স্বেচ্ছায় চার গুণ বেশি দাম দিই। তার চেয়ে কম দামের হলেও নিম্নমানের কোনো জিনিস আমি কিনি না। আমি আনন্দের সঙ্গেই আমার জুতোর জন্য চল্লিশ ক্রোনেন দিই, যদিও অন্য দোকানে দশ ক্রোনেনেই জুতো পাওয়া যায়। কিন্তু যেসব পেশা ও ব্যবসা অলংকারপন্থীদের স্বেচ্ছাচারে জর্জরিত, সেখানে ভালো ও খারাপ কারিগরির মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয় না। এতে করে কাজের মান নষ্ট হয়ে যায়, কারণ কেউই কাজের প্রকৃত মূল্য দিতে রাজি হয় না।

এটা আবার এক দিকে ভালোও বটেকারণ এই অলংকৃত বস্তুগুলো ততক্ষণ পর্যন্তই সহনীয় থাকে, যতক্ষণ সেগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের হয়। আগুনে ক্ষয়ক্ষতির খবর আমি সহজেই মেনে নিতে পারি, যখন শুনি যে মূল্যহীন আবর্জনা ছাড়া আগুনে কিছু পোড়েনি। Künstlerhaus (আর্ট মিউজিয়াম)-এ অগ্নিকাণ্ডের খবরও আমাকে আনন্দও দেয়, কারণ আমি জানি, ওখানে যা আছে, তা কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন করে তৈরি করা যায় এবং আবার কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে গুঁড়ো করে ফেলা যায়। কিন্তু পাথরের বদলে স্বর্ণমুদ্রা আগুনে নিক্ষেপ করা, ব্যাংকনোট দিয়ে সিগারেট ধরানো, বা মুক্তা গুঁড়ো করে মদের সঙ্গে মিশিয়ে পান করাএসব এক অনান্দনিক আবহ সৃষ্টি করে।

অলংকৃত জিনিস সত্যিকারের অনান্দনিক হয়ে ওঠে তখনই, যখন তা সর্বোত্তম উপকরণ দিয়ে, সর্বোচ্চ যত্নে এবং দীর্ঘ সময় ধরে শ্রম দিয়ে তৈরি করা হয়। মানসম্পন্ন কাজের দাবি আমিও করি, এবং এক্ষেত্রে এক ধরনের দায়বোধ আমার মধ্যেও আছে। তবে অনান্দনিক কাজের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই আমার তেমন কোনো দায়বোধ কাজ করে না।

আধুনিক মানুষ, যে অতীত যুগের শিল্পসমৃদ্ধতার নিদর্শন হিসেবে অলংকারকে পবিত্র জ্ঞান করে, সে খুব সহজেই আধুনিক অলংকারের বিকৃত, কৃত্রিম ও অসুস্থ প্রকৃতি উপলব্ধি করতে পারবে। আমাদের বর্তমান সাংস্কৃতিক স্তরে বসবাসকারী কেউই আর কখনো সত্যিকারের অলংকার সৃষ্টি করতে পারবে না।

তবে যে সমস্ত ব্যক্তি বা জনপদ এখনো এই স্তরে পৌঁছায়নি, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন।

আমি এই কথাগুলো বলছি এক অভিজাত ব্যক্তির উদ্দেশেএমন এক ব্যক্তি, যার অবস্থান মানবজাতির শীর্ষে, অথচ অধস্তন মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও অভাবের ব্যাপারে যার সুগভীর বোঝাপড়া আছে। তিনি ভালোভাবেই বোঝেন সেই কাফিরকে, যে নিজের বস্ত্রে এমন এক নকশায় অলংকৃত করে, যা কেবল তখনই ধরা পড়ে, যখন সেটা উন্মোচিত হয়; তিনি বোঝেন পারস্যের কার্পেট-বয়নকারীকে, স্লোভাক কৃষক নারীকে, যে সুঁই-সুতো দিয়ে লেইস তৈরি করে, কিংবা সেই বৃদ্ধাকে, যিনি কাঁচের দানা ও রেশম দিয়ে অসাধারণ জিনিস তৈরি করেন। অভিজাত মানুষ তাদেরকে তাদের মতো থাকতে দেন, কারণ তিনি জানেন, যে সময়গুলোতে তারা কাজ করে, সেটাই তাদের পবিত্র সময়। কিন্তু বিপ্লবী সেখানে গিয়ে বলবে: এসব একেবারেই ফালতু কাজবাজ, ঠিক যেমন সে পথের ধারের ক্রুশবিদ্ধ যীশুর সামনে দাঁড়ানো বৃদ্ধাকে নামিয়ে এনে বলবে: ঈশ্বর বলে কিছু নেই। অথচ অভিজাতদের মধ্যে যারা নাস্তিক, তারা গির্জার পাশ দিয়ে গেলে সর্বদাই টুপি খুলে সম্মান জানান।

আমার জুতোগুলো খাঁজ, ছিদ্র-সংবলিত বিভিন্ন অলংকারে ভরা। এগুলো সেই মুচির কাজ, যার জন্য তাকে কখনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি। আমি সেই মুচির কাছে গিয়ে বলি: তুমি এক জোড়া জুতোর দাম ত্রিশ ক্রোনেন চাও। আমি তোমাকে চল্লিশ ক্রোনেন দেব। এর ফলে আমি মানুষটিকে এমন এক গভীর আনন্দে আপ্লুত করি, যার প্রতিদান সে আমাকে দেয় তার উচ্চমানের কাজের মাধ্যমে, অতিরিক্ত দাম দিয়ে যা কখনোই কেনা যেতো না। সে আনন্দিত। তার ঘরে তো কদাচিৎ আনন্দের পদপাত ঘটে। একজন মানুষ এসেছে, যে তাকে বোঝে, তার কাজকে মূল্য দেয়, এবং তার সততায় যার কোনো সন্দেহ নেই। সে ইতিমধ্যেই তার মনে জুতোগুলোর চূড়ান্ত রূপ দেখতে পাচ্ছে। কোথায় সবচেয়ে ভালো চামড়া পাওয়া যায়, কোন কারিগরের হাতে কাজটি তুলে দিতে হবে, সব তার নখদর্পণে। এক জোড়া সুন্দর ও সুরুচিসম্মত জুতোয় কী কী সূক্ষ্ম অলংকার থাকা দরকার, তা সে মনে মনে ঠিক করে ফেলে।

ঠিক সেই সময় আমি তাকে বলি: কিন্তু একটা শর্ত আছেজুতোগুলো একেবারে মসৃণ হতে হবে। কথাটা বলে আমি তাকে রীতিমতো আনন্দের শিখর থেকে হতাশার গভীরে ফেলে দিই। তার কাজ কমে গেছে, তবু মনে হয় আমি যেনো তার সমস্ত আনন্দ কেড়ে নিয়েছি।

আমি কথা বলছি অভিজাত ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশে। আমার নিজের শরীরে আমি অলংকার মেনে নিতে পারি, যদি তা আমার চারপাশের মানুষের আনন্দের উৎস হয়। তখন সেটা আমারও আনন্দ হয়ে ওঠে। আমি কাফিরের, পারসিকের, স্লোভাক কৃষাণীর, এমনকি আমার মুচির অলংকারও সহ্য করতে পারিকারণ এগুলোই তাদের জীবনের উচ্চতম মুহূর্তগুলিতে পৌঁছানোর একমাত্র উপায়। আমাদের জন্য আছে শিল্প, যা অলংকারের জায়গা দখল করেছে। সারা দিনের কর্মব্যস্ততা ও ক্লান্তির শেষে আমরা বিথোভেন বা ট্রিস্তান-এর শরণাপন্ন হই। কিন্তু আমার মুচি তো সেটা পারে না। তার আনন্দ আমি কেড়ে নিতে পারি না, কারণ তার বদলে তাকে দেওয়ার মতো কিছু আমার কাছে নেই।

কিন্তু কেউ যদি নবম সিম্ফনি শুনে আসার পর বসে বসে ওয়ালপেপারের নকশা আঁকে, তো সে হয় জোচ্চোর, নয়তো অধঃপতিত। অলংকারের অনুপস্থিতিই অন্যান্য শিল্পকে অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। সিল্ক, সাটিন আর লেইস পরে ঘুরে বেড়ানো কোনো লোক কখনোই বিথোভেনের সিম্ফনিগুলো লিখতে পারত না। আজকের যুগে যদি কেউ মখমলের কোট পরে ঘোরে, তবে সে শিল্পী নয় তাকে হয় এক ভাঁড়, নয়তো রংমিস্ত্রি মনে হয়। আধুনিক যুগে আমরা আরও সূক্ষ্ম, আরও পরিশীলিত হয়েছি। যাযাবর পশুপালকদের নিজেদের আলাদা করে দেখানোর জন্য নানা রঙের প্রয়োজন হতো; কিন্তু আধুনিক মানুষ তার পোশাককে ব্যবহার করে স্রেফ মুখোশ হিসেবে। তার ব্যক্তিসত্তা এতটাই শক্তিশালী যে, পোশাকের খুটিনাটির মাধ্যমে তাকে আর প্রকাশ করা যায় না। বরং অলংকার থেকে মুক্ত হওয়াতেই তার আত্মিক শক্তির পরিচয় নিহিত আছে। আধুনিক মানুষ অতীতের কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে আহরিত অলংকারগুলো নিজের প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে ঠিকই; কিন্তু নিজের সৃজনশীল শক্তিকে সে অন্য জায়গায় প্রয়োগ করে।