বালকেরা অনর্গল...
ওরহান পামুক স্যুটকেসে রাখা বাবার পাণ্ডুলিপি কেমন হবে তা নিয়ে তাঁর কাল্পনিক উৎকণ্ঠা পৃথিবীকে জানিয়েছিলেন। ২০১৬’র একুশে বইমেলায় বাবা মিজানুর রহিম অনূদিত দক্ষিণ আফ্রিকার ছোটোগল্প ‘ফিরে এসো আফ্রিকা’ আমার হাতে দিয়ে, উৎকণ্ঠিত নয়, অঞ্জন উচ্ছ্বসিত ছিলো।
প্রায় চল্লিশ বছর ও শুধু আমার বন্ধুই ছিলো না; আমরা একে অপরের অংশ হয়ে যে চলেছি সেটা ওর মৃত্যুর পরেই বুঝলাম। এটা তো একদিনে হয়নি, শত শত দিন ও রাতের চলা; অসংখ্য নৈমিত্তিক মুহূর্তে আবেগের ঊর্মিমালা, বাধাহীনভাবে কোথায় গিয়ে পলির যে ভিত তৈরি করে আগে থেকে কেউ কি তা জানে!
সেই কুড়ি বছর বয়সে যখন দেখা হলো, চতুষ্কোণে’র রাজকুমারকে নিয়ে ওর ভালো লাগাটা বারবারই বলতো; যা কিছুই ভালো লাগতো খুব নির্মলতায় বিস্মিত হতো; ওর কবিতা, ছবি আঁকা, গল্প লেখা, সুস্থ চলচ্চিত্রের জন্যে ওর সংগ্রামী মন, ‘মগ্ন’ হয়েও ‘তীব্রতা’র সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া—এগুলো আমার অনুভূতির সঙ্গে মিলতো। কোনো কোনো দিন ওরা সিনেমা হলের ব্যানার-পোস্টার ছিঁড়ে-নামিয়ে দিয়ে এসে রাস্তার ধারে চা-বিস্কুট খেতে খেতে বলতো: ‘শালা, সিনেমারে “বই” বলে, চুতিয়া লোকজন...।’ আমি হাসতাম, হাসলে ও খুশি হতো; খুব চাইতাম লেখালেখির আন্দোলনে অঞ্জন যুক্ত থাকুক।
আশ্চর্য, পরে গাণ্ডীবে’র লেটারিং ওর হাত দিয়েই হলো; খুশি হয়েছিলো সবাই; তারপর সংবেদে ও একটা গল্প লিখলো; অন্তত বিশবার ওর বর্গক্ষেত্রে আব্দুল হক আমাকে শুনতে হয়েছিলো, এক-একটা প্যারা দশ-বারো দিন পর পর কাটাকুটি করে আমাকে শোনাতো; বিরক্ত হলেও হাসতো; হাসিটা ছিলো মিষ্টি ও যখন সরল হতো। দাড়ির তলায় ওর শিশুসুলভ ভঙ্গিটা কখনো-বা বেরিয়ে গেলে আমরা হাসতাম, অঞ্জন খুব রেগে যেতো।
‘ও আর তারেক শাহরিয়ার দুইজনে অ্যাডফার্ম করতে চায়... বললো টাকা নেই, আমি এক নায়িকার ভাইকে ঠিক করে দিলাম... টাকাও দিচ্ছিলো... বলেন, কাজ না করে সারাদিন ঋত্বিক ঘটক, আকিরা কুরোসাওয়া, পিটার জেভিস এইসব বড়ো বড়ো কথা... বেচারা পালিয়ে গেলো..., মাথা ঘোরালো স্টালিন... ‘অমানবিক...’

জাহিদুর রহিম অঞ্জন || ছবি ইন্টারনেট
একদিন স্টালিন এসে বললো, ‘মামু, অঞ্জন যেখানে যাবে সেখানে কিন্তু সব শেষ।’—স্টালিনের একটা বৈশিষ্ট্য, কোনো বিষয়ে বিব্রতকর হলেও মন্তব্য করবে বিষণ্ণ মুখে আন্তরিক স্বরে।
—‘কী হয়েছে স্টালিন, বলেন তো?’
—‘নাহ্— বলার মতো না।’
—‘আচ্ছা শুনিই না।’
—‘ও আর তারেক শাহরিয়ার দুইজনে অ্যাডফার্ম করতে চায়... বললো টাকা নেই, আমি এক নায়িকার ভাইকে ঠিক করে দিলাম... টাকাও দিচ্ছিলো... বলেন, কাজ না করে সারাদিন ঋত্বিক ঘটক, আকিরা কুরোসাওয়া, পিটার জেভিস এইসব বড়ো বড়ো কথা... বেচারা পালিয়ে গেলো..., মাথা ঘোরালো স্টালিন... ‘অমানবিক...’
অঞ্জন, পরে, এগুলো শুনে বললো, আ-রে-রাখ্, ভালো করে নেরুদা’র কবিতা না পড়ে এলে কারও কবিতা হবে না... হালায়, এ দেশে সিরিয়াসলি কেউ কিছু করে না বলে যে কেউ লিখলে তার নাম হয়।
এর কয়েক বছর বাদে পুনে থেকে ডিপ্লোমা নিয়ে ও ফিরে এলো; ওর কোর্স ফিল্ম আমরা সবাই মিলে দেখলাম। চেকোভের গল্প—মর্নিং; খানিকটা অবাক হয়েছিলাম ওর গল্পের সিলেকশন আর মেকিং সেন্স দেখে। আমরা ওকে সমীহ করতে শুরু করলাম; তর্ক না করে চুপচাপ কথা শুনতাম। আজ মনে পড়ে ‘মর্নিং শোজ দি ডে’ প্রবাদটি অঞ্জনের ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে সত্য।
বন্ধুদের ভেতর আযাদ নোমান আর আমি শুধু চাকরি করতাম, মোটা বেতনও পেতাম। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর আমি তারেক মাসুদের ফার্মগেটের দখল করা ভাঙা বাড়িতে থাকি। সারাদিন দুটো মিনিপ্যাকের ফুজি নুডুলস খাই। তারেক মাসুদ তখন সুব্রত সেনগুপ্ত গল্পের স্ক্রিপ্ট করছে। সাজ্জাদ শরিফ ভাষার উৎকর্ষের দিকগুলো দেখছে। গাণ্ডীবে ছাপা হবে। ঢালী আল মামুন প্রচ্ছদ করছে।
তারেক শাহরিয়ার বললো, ‘ভালো ছবি যেগুলো নিয়ে হয় বুঝলি, খারাপ গল্প দিয়ে, দিব্যেন্দু পালিতের মাছ কী এমন গল্প—ছবি হয়ে গেলো।’
বললাম, আমি তোমাদের মতো ছবি বুঝি না।
এভাবেই দিনের পর দিন চলছিলো।
বেশ কিছুদিন পরে অঞ্জন বললো, ‘আমি ভাবছি, তোর ‘শিলা, অনন্তে’ নিয়ে ছবি করবো।... একটা রেললাইন... ফাস্ট শর্ট... শিলা হাঁটতে হাঁটতে আসছে... হাতে গোলাপের দুটো ডাল...।’
— ‘হুম। আচ্ছা অঞ্জন, তারেক মাসুদ আমেরিকা থেকে বোর্হেসের যে বইটা পাঠালো... নিছিস তো কবে... ফেরত দিবি না... আমার পড়তে হবে তো।’
—‘ধুর! আবার শুরু করলি... কই রাখছি না-রাখছি খেয়াল নেই।’
—‘মানে!’
—‘গল্প লিখতে গেলে তোর বোর্হেস লাগে নাকি?’
—‘বাজে বকিস না... তারেক মাসুদ জিজ্ঞেস করলে কী বলবো?’—আমার গলার স্বর আর চোখদুটো বোধহয় উগ্র হয়ে জ্বলে উঠেছিলো।
—‘আরে ও একটা চাপাবাজ... যা হয় একটা বলে দিস।’—অঞ্জন ঘুরে দাঁড়ালো।
থতমত খেয়ে হঠাৎ ও বললো, ‘কী কী বলে জানিস?’
—‘কী।’ আরো জোরে বললাম।
— ‘আরে হালায় বলে—আগে আন্ডারওয়্যার বাদ দিয়ে প্যান্ট পরতো।’—বলতে বলতে ওর মুখটা কাঁপছিলো। আমার এমন অভিব্যক্তিতে আসলে ও অভ্যস্ত না। হতবুদ্ধি হয়ে অঞ্জন এসব বলে একটা সিগারেট ধরালো। আমি ওর দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম।
পরে, তারেক মাসুদ শুনে হো হো করে হেসে উঠেছিলো।
আমি সাত-আটজন বন্ধুকে ভালোবাসি। অঞ্জন সেখানে ছিলো অনেক উঁচুতে। গ্লানিতে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। অঞ্জন যদি আমার থেকে সরে যায়। আবার এ-ও মনে হলো, দুটো ইন্দ্রনাথ একইভাবে কি চলতে পারে!
তিন মাস হবে, অঞ্জন আমাকে ফোন করলো, বললাম, ‘অঞ্জন, তোমার অনেক কিছুই কিন্তু ঠিক না; আমি নিতে পারছি না।’
—‘আরে দোস্ত তোরে আমি খুব ভালোবাসি; তুই ভালোবাসা বুঝিসই না... ক’টা ছেলে-পেলে নিয়ে থাকিস... নিজেরে... একটা কিছু... শোন্ আজ বিকেলে চলে আয়।’
একটু থেমে প্রশ্ন করি, ‘কোথায় আসবো।’
—‘শর্টফিল্ম ফোরামে আয়।’
—‘আচ্ছা দেখি।’
—‘আ-রে আয়।’—থামলো ও; ‘দেখি মানে কী।’
— ‘আচ্ছা কখন, সেটা বল্।’
— ‘সন্ধ্যায় আয়, মাল খাচ্ছিস তো?’
—‘ও রকম না— ছেড়ে দেবো ভাবছি...’ দ্রুত বললাম।
— ‘চাপাবাজি করো না সেলিম, তোমারে আমি চিনি... সব খবর রাখি।’
ওই সন্ধ্যায় অঞ্জনের সঙ্গে দেখা হলেই বললো, ‘চল পিককে গিয়ে বসি।’
আজিজ মার্কেটের তিনতলা থেকে পিককে পৌঁছতে ২০-২৫ মিনিট লাগে। আমরা নিচ তলায় বসলাম একটা সিঙ্গেল টেবিলে। নানা কথার এক ফাঁকে হঠাৎ করে অঞ্জন বললো, ‘বিশ্বসাহিত্যের ওই দিন... যেদিন ফজলে লোহানী আসলো, সেদিন কিন্তু তুই আমাকে অপমান করালি।’
—‘এই... আমি কখন করালাম।’
—‘তুমিই করেছো সেলিম, ডনিকে তুমিই পাঠিয়েছিলে; ছিঃ একজন আর্টিস্ট এরকম হয় না।’—ঠোঁট-মুখ নাড়িয়ে বললো অঞ্জন।
আমি বললাম, ‘অঞ্জন আমার জীবনে কোনো বড়ো বিপ্লব নেই, কিন্তু অসংখ্য ছোটো ছোটো প্রতিবাদ আছে।’
অঞ্জন বললো, ‘ওগুলো আমাদেরও আছে। শিল্পীর কাজ অত শত বিপ্লব না।’
—‘আমি ইন্দ্রনাথ দোস্ত, তোমাদের মতো শিল্পী না।’
—‘নতুন এক তাল তুলেছিস? বাড়ার ইন্দ্রনাথ; বোকাচোদা, তুমি একজন মেজর আর্টিস্ট—এটা বোঝো—সেইভাবে চলো দো...স্ত।’
এসব হয়তো অঞ্জনের ওই মুহূর্তের ব্যথিত মনের কিছুটা আলাপ। মনে পড়ছিলো বাংলা ভাষার শুরুর লেখকদের কাছে আমি কতোটা ঋণী; অনেকের কাছ থেকে রীতিমতো সাহস নিয়েছি। আবার লেখাও শিখেছি বহু লেখকের থেকে; কিন্তু যাঁকে ছাড়া যায় না, টেবিলে সবসময় তাঁর কোনো-না-কোনো খণ্ড থাকে, আর তাঁর ট্রিটমেন্টগুলোকে আত্মস্থ করে কিছু একটা লিখতে চাই—সেই অমীয়ভূষণ মজুমদার যখন বলেন... ‘বাংলাদেশ... তার আবার বাছাইকৃত গল্প...।’ সেখানে আমাকে নিয়ে অঞ্জনের এই জনবিচ্ছিন্ন রায় ওই মুহূর্তে খণ্ডন করার ইচ্ছে জাগে না।
—নরম হয়ে বলি, ‘অঞ্জন, আর্টিস্ট কাকে বলে?’
অঞ্জন বলে, ‘আর্টিস্ট কী’, হাতের গ্লাস ওর ঠোঁটের কাছে ছিলো, সেটা টেবিলে রেখে বলে ওঠে... ‘আর্টিস্ট হলো তাই... চুদনা... সে যখন ম্যাচ বক্সটাও ধরে, সেটাও আর্ট। তারেক শাহরিয়ার কিছু না লিখলেও আর্টিস্ট।’
সেদিনের পুরো বিলটা ও-ই দেয়। তবে টেবিলে আমি সুযোগ পাইনি কথাটা বলার... যে কোনো কারণেই হোক, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে, ওই দিনে, আমরা দুটো ভাগে ছিলাম। অবশ্য এ কথা বললে অঞ্জন হয়তো বলতো, ‘রাখ্, বা...ড়া...র... দুই ভাগ।’
তারেক মাসুদ ওর পক্ষে থেকেও সেদিন ভারসাম্য রেখেছিলো। এরপর থেকে একটা কথা প্রায়ই বলতো সে, ‘এই যে সেলিম মোরশেদ, মফস্বলাইট, আপনারা তো শুনবেন না, নিরীক্ষার উন্মাদনায় যে চলছেন... তারপর দাঁত দিয়ে ঠোঁটের বাম কোনায় চাপ দিয়ে বলতো... কা...লো...স্রোতে...ভে...সে... যাবে... পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
বন্ধুদের ভেতর আজও যা আনন্দের খোরাক।
দ্বন্দ্বটা শেষের দিকে কেনো জানি বাড়ছিলো। শুধু অঞ্জনকে নিয়ে নয়, সব বন্ধুর সঙ্গে আমার সমস্যা যেন। ঘরে ফিরেও স্বস্তি ছিলো না। এই যে নাগরিক হওয়ার দ্রুত চেষ্টা, সামাজিক হওয়ার উদোম উদ্দামতা, বিদঘুটে লাগতো; অন্যতম কারণ হয়তো অনেকদিন কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত না থাকা। কুড়ি বছর বয়সে পরিবার থেকে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত হয়ে, সমাজের কাছে কথিত গুরুত্বপূর্ণ চার-চারটা চাকরি ছেড়ে ভেতরটা বেশ ক্লান্ত আর বিষাদগ্রস্ত; অস্থিরতা থেকেই যায়, সাজানো কোনো বিষয় চাইতেই শুধু বারবার ভেঙে যায়, ভেতরটা সবসময় ঝাঁকি খায় বলেই ঝাঁকি উগরে দেয়, লেখায়, কথায়, ঘরে এমনকি বাইরেও...
শর্টফিল্ম ফোরামে অঞ্জনের মেঘমল্লারের স্ক্রিপ্ট পড়ে একটা ছোটো মন্তব্য করেছিলাম। অঞ্জন মনোযোগ দিয়ে পড়তে বলেছিলো। মন্তব্য করতে গিয়ে বড়ো একটা ভুল হলো। লেখা-স্ক্রিপ্ট আর তৈরি হওয়া ফিল্ম যে এক না তখন মনে পড়েনি। তীক্ষ্ণপ্রবণতা মাত্রা যে এতটা হিংস্র হবে ভাবিনি; অঞ্জন বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে বললো, ‘তোর উদ্ভট সব গল্প নিয়ে কখনো কি বলি... কী কুক্ষণে যে তোরে স্ক্রিপ্ট পড়তে দিছি...।’

বই মেলায় সেলিম মোরশেদ ও জাহিদুর রহিম অঞ্জন
শর্টফিল্ম ফোরামে অঞ্জনের মেঘমল্লারের স্ক্রিপ্ট পড়ে একটা ছোটো মন্তব্য করেছিলাম। অঞ্জন মনোযোগ দিয়ে পড়তে বলেছিলো। মন্তব্য করতে গিয়ে বড়ো একটা ভুল হলো। লেখা-স্ক্রিপ্ট আর তৈরি হওয়া ফিল্ম যে এক না তখন মনে পড়েনি। তীক্ষ্মপ্রবণতা মাত্রা যে এতটা হিংস্র হবে ভাবিনি; অঞ্জন বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে বললো, ‘তোর উদ্ভট সব গল্প নিয়ে কখনো কি বলি... কী কুক্ষণে যে তোরে স্ক্রিপ্ট পড়তে দিছি...।’ জুনায়েদ হালিম বলেছিলো, ‘সেলিম, স্ক্রিপ্ট এইভাবে সাজাতে হয়।’ আমি বিব্রত হয়েছিলাম, কারণ ওরা তো প্রশিক্ষিত। সাগর নীল দীপের সঙ্গে সিঁড়িতে নামতে নামতে বলেছিলাম মোহাম্মদ খসরু, তারেক মাসুদ, তারেক শাহরিয়ার কম স্ক্রিপ্ট আমাকে পড়ায়নি। স্ক্রিপ্ট লিটারেচার বলে একটা কথাও আছে; অঞ্জন নিজেও তো আমাকে দিনের পর দিন চলচ্চিত্র নিয়ে ওর চিন্তা-ভাবনা বুঝিয়েছে। আমি কখনও কখনও সশ্রদ্ধ হতে চাইলে তারেক মাসুদ বলতো, ‘না... এগুলো পারস্পরিক...।’ অঞ্জন নিজে তো আরও...
দীপ বললো, ‘অঞ্জন ভাই, কেন জানি... কেমন হয়ে যাচ্ছে...’
শুধু অঞ্জন না, বন্ধুদের ওপর পরিপার্শ্বের অসুস্থ চাপ ছিলো আশির শুরু থেকেই; আশির মধ্য থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তারা, বোধহয়, চাপ নিতে পেরেছিলো। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস চারপাশ দেখে-শুনে প্রায়ই বলতেন, এত প্রতিভাবান লেখক-শিল্পী আগের কোনো দশকে আসেনি। তারই একটা অংশ নিয়ে, অবশ্য জায়গাটা মুক্ত ছিলো, তারেক মাসুদের অডিও-ভিশনের কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো।
অঞ্জন মুখ্য ভূমিকা রাখলো; আসাদ গেটের পাশেই এক বিল্ডিং-এ একটা ফ্লোর ভাড়া করেছিলো তারেক। হয়তো পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে কিছু টাকা নিয়ে এসেছে। অঞ্জনসহ আরো কয়েকজনের সক্রিয় সাহচর্যে শুরু হয়েছিলো এই অডিও ভিশন; আন্ডার কাভারদের কার্যক্রম শুরু হলো। নাম দেওয়া হলো অ্যাপ্রিসিয়েশন ক্লাস। ঢালী আল মামুনরা তখন ভয়ানক জ্বলন্ত; তারা নতুনধারার ছবি আঁকছে, ভাবছে, শিশির ভট্টাচার্যের দক্ষ হাতের কাজ মুগ্ধ করার মতো; তরুণ নাট্যকার সাজেদুল আওয়াল শামীম ‘ফণীমনসা’ লিখেছে তখন; নাটকের দার্শনিক দিক নিয়ে তার আলাপ ছিলো। পুলক গুপ্ত ছিলো ইন্টারেস্টিং; অঞ্জন আর তার সম্পর্ক ছিলো সংগীতানুরাগী দু’জন মানুষের নিরন্তর সুর তোলা। রাগ, ঠাট, মীড় কী এবং কীভাবে এর প্রয়োগ হয়—আর সংগীতের সূক্ষ্ম দিকগুলো আত্মস্থ মন থেকে কোনভাবে প্রকাশ পায় সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলতো। Spell bound-কারী’র যদি কোনো সমার্থক সত্তা থাকে তা ছিলো সাজ্জাদ শরিফ। এত গুণী এই কম বয়সে! প্রশ্নটা আজও আমাকে ভাবায়। বিশ্বাসটা অনেকদিন সাজ্জাদ শরিফ ধরে রেখেছিলো। অঞ্জনের উস্কানিতে তারেক মাসুদ একদিন সাজ্জাদকে বললো, ‘আপনারা যে কবিতা লেখেন... দুটো ইট নিয়ে ঘষাঘষি করলে যে শব্দ হয়...’। সাজ্জাদ আকস্মিক বিব্রত হয়ে কৃত্রিম হাসি দিলে অঞ্জনের সে কী আনন্দ!
পুঁজিবাদ সমস্ত শক্তি নিয়ে লিট্ল ম্যাগাজিন, শর্ট ফিল্ম, রিকশা পেইন্টিং, রোড পেইন্টিং—এইসব নিয়ে যারা ভাবে, ঐতিহ্যকে যারা ভিন্নভাবে দেখে, প্রগতির অগ্রগতি নিয়েও যারা প্রশ্ন করে—তাদের গলার দিকে হাত এগিয়ে দিয়েছিলো। ব্যক্তির হয়ে ওঠাকে একান্ত অপরিহার্য করেছিলো; বিশ্বাস করিয়ে ছাড়লো ‘এগুলো বালকদের বিষয় : পরিণত মনন ছাড়া সুষ্ঠু পরিণতি হয় না।’—ঢালী আল মামুন বলেছিলো, ‘শেষমেশ যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা টেকে না, মানুষ এই ইনার কেমেস্ট্রি বুঝতে চায় না।’
তবুও, তারপরে যে কয়েকজন পুঁজির আধিপত্য জীবনের কোনো ক্ষেত্রে মেনে নেয়নি, অঞ্জন তাদের একজন। একজন বিপ্লবীর প্রধান যে শর্ত—বায়োলজিক্যাল রিস্কে থাকা, সব ক্ষেত্রে, সব সময়। অঞ্জন শেষমেশ নিজেকে সেভাবেই রেখেছিলো।
তারেক মাসুদের বালকদের বিদ্যালয় অনেক আগেই ভেঙে গেছে; ভাবা যেতে পারে আদৌ কি ভেঙেছে? কোনভাবে কে বা কারা কখন যে সে সিগনাল ক্যারি করে, কোন অজানায় সংকেত বহনে প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেয়, তা তো বোঝা দুষ্কর।
ওই সময়ের এক দুপুরবেলায় অঞ্জনের সঙ্গে দেখা এলিফ্যান্ট রোডে। বললো, ‘চল কুন্দনের দিকে যাই। তারেককে আজ ধরবো।’
আমি বললাম, ‘চল।’
ওই পথে একসময় শর্ট ফিল্ম ফোরামের অফিস ছিলো।
কুন্দনে’র রেস্তোরাঁয় তারেক মাসুদকে অঞ্জন হাসতে হাসতে বললো, ‘সুব্রত সেনগুপ্ত নিয়ে তুমি কী ভাবছো?’
ওটা গল্পের ক্রিটিসিজম, ছবি করার বিষয়টা ভাবিনি, এরপর তারেক মাসুদ আমার দিকে তাকিয়ে থেমে থেমে বললো, ‘যদি আতিক করে, ভালো হয়, সেটা বলে দেখা যেতে পারে।’
আমি তারেকের কথাগুলো নিয়ে ভাবছিলাম; আরবে উকাজের মেলা থেকে কবিদের নানা ধরনের লড়াই এখনও চলে; এদেশে কবিদের মুখোমুখি লড়াই থেকে লিখিত লড়াইও চলে; ব্রাত্য রাইসু নিজের কবিতা সমসাময়িক দু’জন কবিকে উৎসর্গ করে লিখেছিলো—‘দুলছে এখন মাসুদ রানা...;’ আবার গল্পেও হয়েছে; সুবোধ ঘোষ নতুন শালিক নামে একটা গল্প লিখেছিলেন; সুবোধ ঘোষের ভাষ্য ছিলো, ‘এই গল্প শ্রেণিস্বার্থের একতাযুক্ত সংহতির সমর্থন এবং সংগ্রামের পুরোভাগে কপট বিপ্লবী বুর্জোয়ার চতুর অনুপ্রবেশ; এটা পড়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভালোলাগার কথা ছিলো, কিন্তু লাগেনি, তিনি অভিনব পদ্ধতিতে একটা গল্প লিখে প্রতিবাদ করলেন—গল্পটার নাম হ্যাঁলা।’—কিন্তু একজন লেখকের গল্প নিয়ে চলচিত্রের স্ক্রিপ্ট করে ক্রিটিসিজম হিসেবে আখ্যায়িত করা এটা কেন জানি অদ্ভুত লেগেছিলো।
অঞ্জন, পরে, বলেছিলো, ‘হালায় সব চাপাবাজদের ভেতরে পড়ছি।’ আমি সতর্ক হয়ে নিশ্চুপ ছিলাম—অঞ্জন কি আমাকে মিন করলো।
আমি জানি এ লেখা অঞ্জনের মৃত্যুবঞ্জলি নয়, মূল্যায়নী না, এমনকি কথাগুলো কোনো স্মরণের লেখাও না, যারা ওই সময়ে একে অপরের বিকল্প অহম-ই হতে চেয়েছিল, যারা সময়কে অদম্য মোকাবেলায় এগিয়ে নিতে রাজি ছিলো, এ-তাদের বেড়ে ওঠার গদ্য।
বন্ধু ঢালী আল মামুন কখনও কখনও সলজ্জ, অন্তর্মুখী খানিকটা, চলতে চলতে একসময় বোধহয় হাঁপিয়ে উঠে সেই একই কথা বলেছিলো, ‘এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা আর কতোদিন?’—শুনে মুহাম্মদ খসরু আমার পিঠে চাপড় দিয়েছিলো—‘ওইসব লিটলেমি-বিটলেমি অন্য জায়গায় ক’রো... কামিটমেন্ট ধরে না রাখতে পারলে... আত্মহত্যা করবে... ওই সব খচ্চরদের সাথে মেশো কেন?’
—‘ওরা তো লেখালেখি করে।’
দিনের পর দিন এই কথা শুনে তারেক শাহরিয়ার বিরক্ত হয়ে বললো, ‘দেখ, এক অজ্ঞাত কারণে খসরু ভাই কমিটমেন্টকে কামিটমেন্ট বলে।
Spell bound-কারী’র যদি কোনো সমার্থক সত্তা থাকে তা ছিলো সাজ্জাদ শরিফ। এত গুণী এই কম বয়সে! প্রশ্নটা আজও আমাকে ভাবায়। বিশ্বাসটা অনেকদিন সাজ্জাদ শরিফ ধরে রেখেছিলো। অঞ্জনের উস্কানিতে তারেক মাসুদ একদিন সাজ্জাদকে বললো, ‘আপনারা যে কবিতা লেখেন... দুটো ইট নিয়ে ঘষাঘষি করলে যে শব্দ হয়...’। সাজ্জাদ আকস্মিক বিব্রত হয়ে কৃত্রিম হাসি দিলে অঞ্জনের সে কী আনন্দ!

পুনেতে অঞ্জনের স্কলারশিপ হওয়ায় তারেকের ওপর হালকা চাপ পড়েছিলো, ওই সময় ওরও প্রস্তুতি ছিলো। ভেবেছিলো বৃত্তিটা ওই পাবে।
অঞ্জন পুনে যাবার পর, তারেক শাহরিয়ার আজিজ মার্কেটে আমার পত্রিকা অফিসে ঢুকে, না পেয়ে, উত্তেজনায় পেস্টিংটেবিলের উপরে থাপ্পর দিয়ে গ্লাস ভেঙে দিয়ে গেলো; গাজী মাহতাব হাসান শর্টফিল্ম ফোরামের বাৎসরিক আয়-ব্যয় নিয়ে একটা প্রতিবেদন লিখেছিলো; ভালো করে না পড়ে আমি সহকারী সম্পাদককে বলেছিলাম ঠিকমতো ছেপে দিতে; লেখায় পদাধিকারীদের প্রতি কিছুটা কটাক্ষ ছিলো। এ কারণেই তারেকের এই ধরনের প্রতিক্রিয়া—পরে সেটা বুঝলাম। অবাক করা বিষয়, তারেক মাসুদ হঠাৎ আমার রুমে এসে ভাঁজ করা একটা কাগজের পাতায় আঙ্গুল দিয়ে নাড়িয়ে সম্মোহনী স্বরে বললো, ‘এই যে... কাগজের রং তো দেখছি হলুদ না... পরে ওরা বিশ্বাস করেছিলো আমার কোনো ইন্টেনশন ছিলো না। এর কিছুদিন পর কাগজটা বন্ধ হয়ে যায়। পাশে আহমদ ছফার রুম। কোনো ফার্নিচার ছিলো না। আমার টেবিল-চেয়ার, তারেক শাহরিয়ারের হাতে কাচভাঙা পেস্টিংটেবিল ছফা ভাইকে দিয়ে রুম ছেড়ে দিলাম। ছফা ভাই বললেন, ‘স্বপ্ন কি শেষ?’ আমি বললাম, ‘না।’
অঞ্জন পুনে থেকে ফিরে এই ঘটনা শুনে পরিচিত প্রায় সকলকেই বললো, ‘সেলিম না পড়ে ওর কাগজে লেখা ছাপে, বইয়ের ফ্ল্যাপ লেখে ওই বই না পড়ে।’ এরমধ্যে তারেক শাহরিয়ার মারা গেলে অঞ্জন আর আমি শর্টফিল্ম ফোরাম থেকে তারেকের পাপ কিম্বা সম্ভাবনা গল্পের বইটা বের করি। অঞ্জন প্রাক্কথনে লিখলো এক পাতা, আমি গ্রন্থের উত্তরকথনে লিখলাম নয়-দশ পাতা। অঞ্জন চারিদিকে ছড়িয়ে দিলো ওর এক পাতা থেকে ভাবনা নিয়ে আমি পুরো উত্তরকথন লিখেছি। তারেকের গল্প নাকি আমি পড়িনি। অঞ্জন একই কথাই পারভেজ হোসেনের সুবর্ণপুরাণ নিয়ে বলতে লাগলো। বিষয়বস্তুর কারণে উপন্যাসটা ভালো লেগেছিলো। সেজন্যে বইটির ফ্ল্যাপ লিখেছিলাম। অঞ্জন খুনসুটি করে টেলিফোনে বলতো, ‘আ...রে—তুই না পড়েই লিখেছিস, আমি সবাইকে তাই বলছি।’
আমি বললাম, ‘অঞ্জন এগুলো তোমার পুরনো অভ্যাস... এখন আর চলে না... লোক বোঝে...।’
—‘আরে তুমি আমারে চেনো না দোস্ত, তোমার কেল্লা ফতে! দাদাগিরি শেষ।’
বললাম, ‘দোস্ত বইটা আগে পড়...’।
—‘আরে তুই যদি পড়িস তাহলে আমার পড়া হয়েছে।’ অঞ্জন হাসতে হাসতে বললো—‘পারভেজ মাল খাওয়াইছে না?’
আশ্চর্য, অঞ্জন তখনও বলেনি, চিকিৎসার জন্যে ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এক সন্ধ্যায়, বারে, পারভেজকে বলতেই ওর ত্রিশ বছরের ক্ষুব্ধতা প্রকাশ পেলো:—‘ওই মিয়া, বালের কথা কও... মনে আছে... সংবেদ কী করে ভাঙলো... তোমরা... আর অঞ্জন মাফলার এ-ঘাড় থেকে ও-ঘাড়ে দিয়ে সে-সব ভাব... লিটলম্যাগের চ্যাটের কথা শুনতে শুনতে... বলি না বলে— কয়জন আছে তোমাগো সঙ্গে... এমনই ভাঙা ভাঙলে... ভেঙে ওখানেই থেকে গেলে।’
‘এই তুই-তুমি—খোঁচাখুঁচি—হার্ড-এনকাউন্টার—কথায় কথায় স্ল্যাং তারপরেও সম্পর্কের আন্ত-সূত্রগুলো কতোটা লাভিং আর রেসপেক্টফুল। এই চল্লিশ বছরে আমাদের ধারাবাহিকতায় অঞ্জন আর এইসব ঘটনাপ্রবাহ শুধু স্মৃতিই নয়, সংযোগী নয়, অঞ্জন ছিলো আমাদের সক্রিয় অংশ।
এখন টেনে নেওয়া জানলার পর্দা বাতাসের স্পর্শে দূরান্বয়ী কোনো রেখায় কিছুটা আলো চায়, স্বকীয় জীর্ণতা পরোক্ষে বোধহয় স্বস্তি চায়।
সাপলুডু খেলা’র মুকাদ্দিমায় লিখেছিলাম: লেখক-শিল্পীদের সঙ্গটা ছিলো এমন এক সময়ের যারা সুস্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। যাদের সময়সীমা নিয়ে আকাঙ্ক্ষা ছিলো রাত্রি ও সকাল দুটোরই।
সেটা বেশ অদ্ভুত, কয়েকটা বৃত্তে গোত্র তৈরি করে দীর্ঘদিন পথ ধরে হাঁটা। চারপাশের অসহনীয় ভাঁড়ামিতে ক্লান্ত হতে হতে কখনো-বা কোনো গাছের তলে, কখনো ফুটপাথের নির্জন কোনো ঠেকে, কখনো ভাঙাচোরা কোনো দালানের ভেতর খানিকটা জিরিয়ে নেয়াই ছিলো স্থিতি।
স্বাতন্ত্র্যবোধ কী ঠিক জানা ছিলো না অনেকের। আড়াই হাজার বছর আগের প্রাচীন জর্ডানে, পরস্পরের অচেনা, অজ্ঞাতনামা-অন্তর্বাহীদের শুরুটা যেমন হয়েছিলো। একে অপরকে চিনে ওঠেনি, তবুও এক ‘অনাস্থা’র প্রশ্নে তারা মুখোমুখি হতো : সামনে দাঁড়ানো নিপুণ-মূর্তিগুলো কী করে কল্যাণ ও অকল্যাণের ক্ষমতা রাখে। সেই প্রশ্নটাই উঠে এসেছিলো আবার; উত্তরের পথটাই সবাই খুঁজছিলো: প্রীতির বন্ধনে আর স্বরের সততায়।
সঙ্গীদের সাহচর্যই অর্জনের শক্তি—এমনতর ভাবনাটাই বোধহয় বেশি কাজ করছিলো। এক সময় এই অন্বেষণের আস্থাকে উপেক্ষা করে বিষয়াদিমুক্ত ভারহীন চলাই শ্রেয় মনে হলো; ব্যথাটা থাকলো। বাঁধন আলগা হলেও পাথরের নুড়িগুলো দেয়ালের গোড়ায়; ওই তো! ভীষণ জোরে ধাক্কা দিচ্ছে। ঢেউগুলো এসে পড়েছে প্রতিকূলে; জলের ছাপ বেশ দেখা গেলো। দূরে একটা পথ উৎফুল্ল তারার মতো ভেসে উঠছে। দেখাটা ওই পথ ধরেই এগোলো।
এখন ‘আসহাবে-কাহাফ’রা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেলেও সংখ্যায় বেড়েছে; নিত্য-নতুন ঠেক, আবাসস্থল চেনা-জানা, নৈমিত্তিক আলো পড়ছে হৈ-হুল্লোড়ে। উত্তেজনায় রেস্টুরেন্টে কাপ ছোঁড়াছুড়ি; ভালোবাসার দুঃসহ প্রকাশ! আঘাতে আঘাতে আলো দেখে নেয়া। অবিরত আলোটুকু ভেঙে ভেঙে কী বিস্ময়! উপস্থিতির দাগটুকু হারিয়ে গেলে বিগ্রহে গুম হওয়া।
এইভাবে আমাদের সময়, আমরাই অঞ্জনকে নিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে উল্টো করে ধরেছিলাম। আঙ্গুলের টুস্কিতে সময়কে বেলুনের মতো উড়িয়েছি, দায় কী কী ছিলো ভাবিনি, দায়িত্বে রাশ রাশ বিরক্তি!
ঘন মেঘ শুধু! অঝোর বৃষ্টি! সৃষ্টি! বৃষ্টি! সৃষ্টি অবাধ! জল আয়, রুচির ছাঁচগুলো ভেঙে যাক! শুচির রূঢ়তায় ভাঙুক দেশ কাল আর সীমানা; চর্বিত যা যা নন্দিত তার নিপীত স্বাদ ভুলে যাক। এ এক বসুধরা ব্রত ছিলো।
অঞ্জনের মৃতদেহ যখন জাদুঘরের সামনে এসে থামলো, রোদটা অসহ ছিলো। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পরিচিত জনদের দেখে মনে হচ্ছিলো—যেন হাত-পা, মাথা-বুক, চোখ-মুখ হারিয়েছে সবাই। এনায়েত করিম বাবুলের সঙ্গে, শেষবারের মতো, কাফন সরিয়ে যখন ওর মরদেহ দেখলাম, মনে পড়লো, কয়েকদিন আগের দেখা মুঠো হাতের আঙুলের গিঁটের নিচের শিরাগুলো ছিলো ফোলা। এইমুহূর্তে, নিস্পন্দ ঠোঁটদুটোর ভেতর সরু ফাঁক, যেন এক আশ্বাসহীন নিঃসঙ্গতা; মুখটা বাম দিকে ঘোরানো।
ওখান থেকে কেউ যেন সরতে চাইছিলো না; কিন্তু অঞ্জনের গাড়িটা খুব দ্রুতই চলে গেলো।
এখন, যে যার মতো একান্তে, হৃদস্পন্দনে ওকে স্মরণ করছে; হাবিব ওয়াহিদ অঞ্জনের স্মরণে অনিন্দ্য অঞ্জন বের করছে; শহিদুল আলম দু’দুটো লেখা লিখেছে; শর্টফিল্ম ফোরাম থেকে আতিক, আশিক, রাশেদ, আকরাম-রা ওর নির্মিত ছবি নিয়ে প্রদর্শনী, আলোচনা, ওর লেখালেখি নিয়ে মূল্যায়নের স্মরণিকা প্রকাশ করতে যাচ্ছে। চর্যাপদের সম্পাদক আযাদ নোমান ওর আঁকা ছবি, ওর হারিয়ে যাওয়া একটা গল্প নিয়ে ক্রোড়পত্রের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রকাশনা সংস্থা জলধি’র নাহিদা আশরাফী অঞ্জনের দুটো গল্প ও একটা নিবন্ধ নিয়ে প্রকাশ করেছে ওর বই।
এই কাজগুলো চলতে থাকলে দায় নেওয়া কিছু লেখক-শিল্পীর মুখোমুখি হবে—পাঠক-দর্শক আর নতুন প্রজন্মের শানিত তরুণরা। অঞ্জন কে, ওর সতীর্থ কারা, আন্দোলনটা কী ছিলো? চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে অঞ্জনের প্রতিভা কতোটা ব্যাপ্তি রাখে সেগুলো বোঝার অবকাশ থাকবে।
আমরা জানি, এক আর এক যুক্ত হলে দুইটি সত্তা হয়—এক আর এক পাশাপাশি থাকলে এগারো জন হয়—যা সংগঠন; কিন্তু এক আর এক যুক্ত হয়ে যখন এক হয় সেটা তো বন্ধুত্ব; না-হলে কেন লোকে বলে, যতো যা-ই বলুক-না কেন, ওরা কখনও এক ছিলো না।
অপেক্ষা কর অঞ্জন, আসছি।



সেলিম মোরশেদের “বালকেরা অনর্গল...” আবুজর --- ‘বালকেরা অনর্গল...’ — বন্ধুত্ব, শিল্পসংগ্রাম ও এক প্রজন্মের অন্তর্গাথা সেলিম মোরশেদের “বালকেরা অনর্গল...” কেবল জাহিদুর রহিম অঞ্জনকে স্মরণ করে লেখা একটি শোকগাথা নয়; এটি একইসঙ্গে এক প্রজন্মের শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র-মননের ভেতরকার উন্মত্ততা, দ্বন্দ্ব, ভালোবাসা, অহং, ভাঙন, আনুগত্য ও ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। লেখাটি পড়তে পড়তে স্পষ্ট হয়—এটি কোনো সরল স্মৃতিকথা নয়, কোনো ঠান্ডা মূল্যায়নও নয়; বরং এটি এক গভীর, আহত, প্রেমময়, সংঘর্ষে-দীর্ণ বন্ধুত্বের দীর্ঘ গদ্য, যেখানে একজন মানুষকে স্মরণ করতে গিয়ে লেখক অনিবার্যভাবে স্মরণ করেছেন একটি সময়কে, একটি সাংস্কৃতিক পরিসরকে, এবং সেই পরিসরের জটিল মানবিক ভূগোলকে। ১. স্মৃতিচিত্র নয়, এক প্রজন্মের ‘ইনার হিস্ট্রি’ লেখাটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটি অঞ্জনের ব্যক্তিগত জীবনের সাদামাটা স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং অঞ্জনকে কেন্দ্র করে আশির দশক থেকে পরবর্তী কয়েক দশকের বাংলা ছোটকাগজ, চলচ্চিত্রচর্চা, শিল্প-রাজনীতি, বন্ধুত্বের ভাষা, বোহেমিয়ান বেঁচে থাকা, সাংস্কৃতিক স্বপ্নভঙ্গ—সব মিলিয়ে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক ইতিহাস নির্মিত হয়েছে এখানে। এই লেখায় অঞ্জন একক নায়ক নন; তিনি এক নক্ষত্রমণ্ডলের অংশ। তার চারপাশে তারেক মাসুদ, তারেক শাহরিয়ার, সাজ্জাদ শরিফ, ঢালী আল মামুন, পারভেজ হোসেন, মুহাম্মদ খসরু, আযাদ নোমান—এরা সবাই মিলে যেন একটি সৃষ্টিশীল যুগের বহুস্বরী চরিত্র হয়ে ওঠেন। ফলে পাঠক বুঝতে পারে, এখানে একজন শিল্পীর মৃত্যু নয়, বরং এক বৃত্তের ভাঙন, এক সময়ের ক্ষয়, এক ধরনের স্বপ্ন-সমাজের ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার কাহিনি লেখা হয়েছে। ২. বন্ধুত্বের নির্মম অন্তরঙ্গতা লেখাটির হৃদয় আসলে বন্ধুত্ব। তবে এই বন্ধুত্ব মসৃণ, কোমল, শিষ্ট, নির্ভেজাল আবেগের নয়। এটি কটুক্তি, রাগ, বিদ্রুপ, অপমান, খুনসুটি, তীব্র তর্ক, ভুলবোঝাবুঝি, এমনকি পরস্পরের প্রতি ক্ষোভে গড়া—কিন্তু সেই সবকিছুর ভিতর দিয়েই নির্মিত এক গভীর আস্থার সম্পর্ক। সেলিম মোরশেদ অঞ্জনের সঙ্গে সম্পর্ককে যে সততায় এঁকেছেন, সেটাই লেখাটিকে বিশেষ মর্যাদা দেয়। এই লেখায় বারবার দেখা যায়—অঞ্জন লেখককে আঘাত করছে, খোঁচা দিচ্ছে, তাঁর লেখা বা কাজকে বিদ্রুপ করছে, আবার একইসঙ্গে তাঁকে ভালোবাসছে, ডেকে নিচ্ছে, স্বীকারও করছে। লেখকও অঞ্জনের প্রতি একইরকম দ্বৈত অনুভূতি বহন করছেন—ক্ষুব্ধ, আহত, তবু বিচ্ছিন্ন হতে পারছেন না। এই দ্বন্দ্বময় ঘনিষ্ঠতাই লেখাটিকে জীবন্ত করেছে। কারণ বাস্তব বন্ধুত্ব অনেক সময় এমনই—সেখানে ভালোবাসা ও বিরক্তি পাশাপাশি থাকে, আনুগত্য ও অসন্তোষ একে অপরকে বাতিল না করে বরং আরও ঘন করে তোলে। ৩. অঞ্জনের প্রতিকৃতি: শিল্পী, বিদ্রোহী, বোহেমিয়ান এই রচনায় জাহিদুর রহিম অঞ্জনকে কোনো পূতপবিত্র মহিমামণ্ডিত প্রতিমা হিসেবে দাঁড় করানো হয়নি—এটাই লেখাটির সততা। অঞ্জন এখানে যেমন মেধাবী, তেমনি খামখেয়ালি; যেমন তীব্র শিল্পবোধসম্পন্ন, তেমনি ব্যক্তিগত সম্পর্কে নির্মম; যেমন সাংস্কৃতিক সংগ্রামে নিবেদিত, তেমনি বিশৃঙ্খল ও আত্মধ্বংসী। অর্থাৎ তিনি এক জটিল মানুষ। এই জটিলতাই তাঁকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। লেখক দেখিয়েছেন—অঞ্জনের শিল্পবোধ ছিলো নির্মমভাবে সিরিয়াস; চলচ্চিত্র, সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা—সবকিছু নিয়েই তাঁর ছিলো গভীর মগ্নতা। কিন্তু সেই মগ্নতা ছিলো একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ, সংঘর্ষময়, প্রায় আত্মবিধ্বংসী। তাই অঞ্জনকে বোঝার জন্য তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তাঁর আড্ডা, তর্ক, ক্রোধ, কৌতুক, বিদ্রূপ—সবকিছুকেই বিবেচনায় আনতে হয়। এই লেখাটি সে কাজটিই করেছে। ৪. ভাষা: স্মৃতি, কথ্যতা ও দার্শনিক ঘনত্বের মিশ্রণ লেখাটির ভাষা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সেলিম মোরশেদ একইসঙ্গে আড্ডার ভাষা, অন্তরঙ্গ কথোপকথন, সাহিত্যিক রূপক, সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ, এবং দার্শনিক আবহ—সব একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন। ফলে ভাষা কখনো খুব সহজ ও মুখের কাছাকাছি, কখনো ঘন, রূপকসমৃদ্ধ ও বিমূর্ত। এই ওঠানামা লেখাটির প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই—কারণ স্মৃতি কখনো সরলরৈখিক হয় না; কখনো ঘটনা, কখনো অনুভূতি, কখনো তত্ত্ব, কখনো রাগ, কখনো হাসি—সব মিলে তবেই স্মরণ পূর্ণতা পায়। বিশেষত লেখার শেষাংশে, যেখানে অঞ্জনের মৃত্যুর পর তাকে ঘিরে স্মরণ, প্রজন্ম, সংগঠন, বন্ধুত্ব, “এক আর এক পাশাপাশি থাকলে এগারো”—এইসব ভাবনা আসে, সেখানে গদ্যটি একধরনের শোকাতুর কাব্যিক উচ্চতা লাভ করে। তবে এই উচ্চতা কখনো কখনো এতটাই ব্যক্তিগত ও ঘন হয়ে ওঠে যে, বাইরের পাঠকের জন্য তা খানিক দুর্বোধ্যও হতে পারে। ৫. গঠনগত বৈশিষ্ট্য: সরল রৈখিক নয়, স্মৃতির ঢেউ লেখাটির কাঠামো প্রচলিত প্রবন্ধের মতো নয়। এখানে কোনো ধারাবাহিক জীবনী নেই, সময়ানুক্রমিক ঘটনাবিন্যাসও নেই। বরং স্মৃতি, ব্যক্তি, সময়, ঘটনা, তর্ক, মন্তব্য, চরিত্র, সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিত—সব এক ঢেউ থেকে আরেক ঢেউয়ে গিয়েছে। এই বিচ্ছুরিত গঠনই লেখাটির সৌন্দর্য, কারণ এটি স্মৃতির স্বভাবকে ধারণ করে। একজন প্রিয় বন্ধুকে মনে করলে মানুষ তো এভাবেই মনে করে—একটি ঘটনা থেকে আরেকটি, একটি মুখ থেকে আরেকটি, একটি সংলাপ থেকে আরেকটি সময়ের দিকে। তবে এটিই লেখাটির একটি সীমাবদ্ধতাও। যিনি অঞ্জন, তারেক মাসুদ, শর্টফিল্ম ফোরাম, কিংবা আশি-নব্বই দশকের ঢাকার সাহিত্য-চলচ্চিত্রবৃত্ত সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না, তাঁর জন্য অনেক নাম, ইঙ্গিত ও প্রসঙ্গ হঠাৎ এসে পড়তে পারে। ফলে পাঠে খানিক বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি জন্মাতে পারে। অর্থাৎ লেখাটি এক অর্থে ইনসাইডার-টেক্সট—যার আবেগ ও সংকেতের বড় অংশ একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে। ৬. ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে সাংস্কৃতিক সমালোচনা লেখাটির আরেকটি তাৎপর্য হলো—এটি কেবল অঞ্জনকে নিয়ে লেখা নয়; বরং এর ভিতরে একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক হতাশাও কাজ করে। পুঁজিবাদ, শিল্পচর্চার বাজারীকরণ, লিটল ম্যাগ আন্দোলনের ভাঙন, শিল্পীদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, সাংগঠনিক স্বপ্নের অবক্ষয়—এইসব বিষয় লেখাটির ভেতরে বারবার উঠে এসেছে। ফলে এটি ব্যক্তিগত স্মৃতিকথার আড়ালে এক ধরনের সাংস্কৃতিক সমালোচনাও। এখানে “বালকদের বিদ্যালয়” বা “যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা” জাতীয় রূপকগুলো কেবল রোমান্টিক নয়; এগুলো দিয়ে বোঝানো হয়েছে একদল তরুণ শিল্পীর সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, যা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেনি আগের রূপে। কিন্তু তবুও সেই ব্যর্থতা অর্থহীন নয়—কারণ তার মধ্যেই ছিলো একধরনের সততা, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস, এবং শিল্পকে জীবন-মরণ প্রশ্নে পরিণত করার দুর্লভ মানসিকতা। ৭. সীমাবদ্ধতা: সম্পাদনার সংযমের অভাব লেখাটি শক্তিশালী, আবেগময়, তথ্যসমৃদ্ধ এবং দারুণ প্রাণবন্ত হলেও একটি জায়গায় এসে কিছুটা ঢিলেঢালা লাগে—তা হলো সম্পাদনার সংযম। কয়েকটি অংশে পুনরাবৃত্তি আছে; কিছু সংলাপ বা ঘটনার পুনরাগমন লেখার গতি খানিক মন্থর করেছে। বিশেষত সাজ্জাদ শরিফকে ঘিরে একই ধরনের অনুচ্ছেদ বা কোনো ঘটনার দীর্ঘ বর্ণনা কিছুটা সংক্ষেপিত হলে লেখাটি আরও তীক্ষ্ণ হতে পারতো। একইভাবে কিছু নাম ও প্রসঙ্গের পটভূমি সামান্য ব্যাখ্যা করা থাকলে নতুন পাঠকের পক্ষে রচনাটি আরও গ্রহণযোগ্য হতো। ৮. সমাপ্তি: শোকের ভিতরেও সংগঠনের স্বপ্ন লেখাটির শেষের দিকে এসে যে বোধটি সবচেয়ে গভীর হয়ে ওঠে তা হলো—বন্ধুত্ব কেবল আবেগ নয়, এটি একধরনের ঐতিহাসিক ও সাংগঠনিক শক্তি। “এক আর এক পাশাপাশি থাকলে এগারো”—এই উপলব্ধি আসলে পুরো লেখাটির সারাংশ। অঞ্জনকে স্মরণ করতে গিয়ে সেলিম মোরশেদ বুঝিয়ে দেন, কোনো শিল্পী একা তৈরি হন না; তাকে তৈরি করে সময়, বন্ধু, বিতর্ক, আন্দোলন, প্রেম, অপমান, আড্ডা, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা, স্বপ্ন, এবং যৌথতার দীর্ঘ অনুশীলন। এই কারণেই “বালকেরা অনর্গল...” কেবল একজন মৃত বন্ধুর জন্য লেখা আবেগী গদ্য নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বন্ধুত্ব ও শিল্পসংগ্রামের নন্দনতাত্ত্বিক দলিল হিসেবে পড়া যেতে পারে। সার-রায় “বালকেরা অনর্গল...” একটি স্মরণ-নিবন্ধের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি এক শিল্পীবন্ধুর অন্তরঙ্গ প্রতিকৃতি, এক প্রজন্মের সাংস্কৃতিক উন্মাদনার নথি, বন্ধুত্বের নির্মম অথচ প্রেমময় গদ্য, এবং একই সঙ্গে এক ক্ষয়িষ্ণু শিল্প-আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ ইতিহাস। এর ভাষা জীবন্ত, আবেগঘন, তীক্ষ্ণ; এর স্মৃতি ঘন, বহুস্তরীয়, মানবিক। যদিও সম্পাদনার দিক থেকে কিছু সংযম থাকলে লেখাটি আরও শাণিত হতে পারতো, তবু সামগ্রিকভাবে এটি এমন এক রচনা, যা পাঠকের কাছে অঞ্জনকে যেমন উপস্থিত করে, তেমনি উপস্থিত করে একটি সময়ের শিল্পী-যৌবনের আলো-অন্ধকারকেও। এই লেখার মূল শক্তি তার সততা—এখানে অঞ্জনকে পূজা করা হয়নি, ভালোবাসা হয়েছে; আর সেই ভালোবাসা ছিলো স্মৃতি, ক্ষোভ, মুগ্ধতা, আঘাত ও গভীর ঋণের এক জটিল সমবায়। ---
বেনজীন খান
জুন ২২, ২০২৬ ১৩:৪০