সন্ত কবীর ও লালন সাঁইজীর দর্শনের অভিন্ন দিশা

অ+ অ-

 

ভারতীয় উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক ও মানবতাবাদী চিন্তার ইতিহাসে কবীর এবং লালন সাঁই দুইজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। ভিন্ন সময় ও প্রেক্ষাপটে জন্ম নিয়েও তাঁদের দর্শনে একটি গভীর অভিন্নতা লক্ষ করা যায়তা হলো অসাম্প্রদায়িক মানবতার বাণী। ধর্ম, জাতি, বর্ণ বা আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁরা মানুষকেই সর্বোচ্চ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। এই দুই মহামানবের কালিক দূরত্ব পাঁচশত বছর হলেও তাদের জন্ম, বংশ পরিচয় এবং ভক্তি, প্রেম ও মানবতার দর্শন প্রচারে অনন্য সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। এই প্রবন্ধে কবীর ও লালনের তুলনামূলক সাদৃশ্য বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়েছে।

কবীরের আবির্ভাব কাল সঠিক জানা যায় না। কিংবদন্তী অনুসারে ১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দের জ্যৈষ্ঠ মাসে শুক্লপক্ষে তাঁর জন্ম হয়। কবীর কসৌটী গ্রন্থে আছে, কবীরের মৃত্যু হয় ১৫১৮ খ্রিষ্টাব্দে এবং তিনি ১২০ বছর বেঁচে ছিলেন। সেই হিসাবে ১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দেই তাঁর জন্ম হয়। কিন্তু অনেকে বিশেষ করে ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা এটা সত্য বলে মানেন না। তাঁদের মতে, কবীরের ইতিহাস-সম্মত জন্মকাল ১৪৪০ খ্রিষ্টাব্দ। তবে ভারতীয় পণ্ডিতেরা প্রায়ই ইউরোপীয় পণ্ডিতদের এই মত স্বীকার করেন না। ১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কবীরের জন্ম হয় এই মতটিই তাঁরা সত্য মনে করেন। ভারত ব্রাহ্মণে আছে, কবীরের জন্ম হয় ১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দে ও তিনি দেহরক্ষা করেন ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে।

কবীরের জন্ম সম্বন্ধে একাধিক মত প্রচলিত রয়েছে। কারো কারো মতে কবীরের জন্ম একটি গরীব মুসলিম জোলা-পরিবারে, তাঁর পিতার নাম নীরু, মায়ের নাম নীমা। কিন্তু কবীরের হিন্দু শিষ্যরা তাঁর মতো এত বড় মহাপুরুষ নিম্নশ্রেণীর মুসলমান জোলার ঘরে জন্মাবেন এ কথা বিশ্বাসই করেন না। তাঁদের মতে কবীরের জন্ম হয় অলৌকিক উপায়ে। তিনি গুরু রামানন্দের জনৈক ব্রাহ্মণ শিষ্যের বিধবা কন্যার হাতের তালু দিয়ে ভূমিষ্ট হন। কবীর নীরু আর নীমার কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে এবং জোলা-পরিবারে লালিত পালিত হয়েছিলেন। তাই কবীর হিন্দু না মুসলিম এ প্রশ্নের কখনো মীমাংসা হয়নি।

কবীর দাস, সন্ত কবীর, কবীর সাহেব, ভগত কবীর নানা নামে পরিচিত এই সাধক মধ্যযুগীয় ভক্তিকাব্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর রচনায় হিন্দু ও ইসলামী ভাবধারার এক অনন্য সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায়, যা তাঁকে একাধারে মরমী কবি, দার্শনিক ও সমাজসংস্কারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অন্যদিকে আঠার-উনিশ শতকে অবিভক্ত বাংলার লোক-ঐতিহ্যের জগতে সাধক লালন ফকির ছিলেন অন্যতম প্রধান কবি। তাঁর গানের ভাষা মনন-চেতনায় সহজে নাড়া দেয়। লালনের জীবন-বৃত্তান্ত বিশেষত তাঁর জাত, ধর্ম ও জন্মস্থান প্রসঙ্গে একটা রহস্যের বাতাবরণ রয়েছে। তবে লালন জীবনীকার বসন্ত কুমার পাল প্রদত্ত বহুশ্রুত লালন জীবনীতে লিখেছেন, লালনের জন্ম সাবেক নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার অর্ন্তগত কুমারখালী থানার চাপড়া-ভাঁড়ারা গ্রামে হিন্দু কায়স্থকুলে। বাল্যনাম, লালন কর। পিতার নাম মাধবচন্দ্র কর, মাতার নাম পদ্মাবতী। শৈশবে লালন পিতৃহীন হন। লালন যৌবনের প্রথমে বিবাহকার্য সম্পাদনের কিছুদিন পর প্রতিবেশী বাউল দাসের সাথে নৌকায় মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে গঙ্গাস্নানে যান। ফেরার পথে বসন্তরোগে আক্রান্ত হন। রোগের প্রকোপে এক সময় তাঁর বাহ্যচেতনা লুপ্ত হলে সঙ্গীরা তাঁকে মৃত ভেবে যথাবিহিত অন্তেষ্টিক্রিয়া সমাপনান্তে মুখাগ্নি করিয়া গঙ্গায় নিক্ষেপ করে। গ্রামে ফিরে এসে তারা লালনের পরিবারকে জানায় বসন্তরোগে লালনের মৃত্যু হয়েছে। হিতকরী পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ নিবন্ধে বলা হয়েছে, গঙ্গায় ফেলে দেওয়া জ্ঞানহীন লালনের দেহ ভাসতে ভাসতে কালিগঙ্গা নদীতে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়া নিকট আসে। মুমূর্ষু লালনকে উদ্ধার করেন ছেউড়িয়া গ্রামের এক মুসলিম জোলা মলম শাহ। মলম শাহ ও তার স্ত্রী মতিজান তাকে বাড়িতে নিয়ে সেবা-শুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। সুস্থ হয়ে লালন গ্রামে ফিরে গেলে লালনের মা ও তাঁর স্ত্রী তাঁকে দেখতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হলেও সগোত্র থেকে হিন্দু সমাজে স্থান দেওয়া নিয়ে ঘোরতর আপত্তি ওঠে। যেহেতু লালনের অন্তেষ্টি-শ্রাদ্ধাদি ইত্যাদি আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে, কাজেই প্রায়শ্চিত্ত ছাড়া তাকে থাকতে হবে, আপন মায়ের ঘরে পরের ছেলে হয়ে। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে লালন-জননীর পক্ষে তখন প্রায়শ্চিত্তের বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা পালন করা সম্ভব ছিল না। অপরদিকে আত্মীয়স্বজন ও সগোত্র-সমাজের চাপে লালনের মা একদিন তাঁকে কলাপাতায় ভাত খেতে দিলে তিনি বিক্ষুব্ধ হয়ে বাড়ি ছেড়ে আবার ছেউড়িয়া মলম শাহের বাড়িতে ফিরে আসেন। গুটিবসন্ত রোগে লালন তাঁর একটি চোখ হারান। ছেউড়িয়াতে তিনি দার্শনিক গায়ক সিরাজ সাঁইয়ের সাক্ষাত পান এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হন।

অন্যদিকে বাংলা ১৩৪৮ সালের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত মাসিক মোহম্মদী পত্রিকায় এক প্রবন্ধে লালনের জন্ম যশোর জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে বলে উল্লেখ করা হয়। একসূত্র থেকে জানা যায়, তার পিতার নাম কাজী দরীবুল্লাহ্ দেওয়ান ও মাতার নাম আমিনা খাতুন। গবেষকদের ধারণা, লালন শাহের আরো দুই ভাই ছিলেন। আলম শাহ্ ও কলম শাহ্। আরেক তথ্য থেকে জানা যায়, তারা চার ভাই: আলম শাহ্, কলম শাহ্, চলম শাহ্ ও লালন শাহ। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে আলম ও মলম মৃত্যুমুখে পতিত হন। লালন ফকির জীবিকার জন্য হরিশপুরের দক্ষিণ পাড়ার ইনু কাজীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। উপরোক্ত ভিন্ন ভিন্ন তথ্যের কারণে লালন হিন্দু না মুসলমান এ রহস্যের উন্মোচন সন্দেহাতীতভাবে অমীমাংশিত রয়ে গেছে।

এই সাধক কবির জন্মকাল সম্পর্কেও সঠিকভাবে জানা যায় না; তবে পারিপার্শ্বিকতায় অনুমান করা যায় যে, তিনি দীর্ঘ জীবনের অধিকারী ছিলেন। সম্ভবত অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে আনুমানিক ১৭৭৪ তাঁর জন্ম। প্রামাণ্যসূত্রে মৃত্যু-সময় পাওয়া গেছে, ১৮৯০ খ্রীষ্টাব্দের ১৭ অক্টোবর (১ কার্তিক ১২৯৭ বঙ্গাব্দ) শুক্রবার। সে হিসেবে লালন ১১৬ বছর জীবিত ছিলেন।

কবীরের মতোই লালন সাঁইকেও মানুষ নানা নামে স্মরণ করে। তিনি নিজেকে লালন, ফকীর লালন, দরবেশ লালন, সাঁই লালন ইত্যাদি নামে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মুসলমান শিষ্যরা তাঁকে সাঁই, ফকীর, ওলী, কামেল পীর প্রভৃতি নামে এবং হিন্দু শিষ্যরা গোঁসাই, বাউল, বৈষ্ণব ইত্যাদি নামে অভিহিত করেন। লালন শাহ ছিলেন তত্ত্বজ্ঞ ও মরমী সাধক। তাঁর জীবন ও দর্শন নিয়ে গবেষকদের মধ্যে নানা মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, তাঁর দর্শন মূলত ইসলামী সুফিবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত, যার মধ্যে বৈষ্ণব সহজিয়া প্রভাবও বিদ্যমান।

দোহা, পদ বা শ্লোক রচনার ক্ষেত্রে কবীর ব্যবহার করেছেন সে সময়ের কাশী অঞ্চলের জনসাধারণের ভাষা প্রাচীন পূর্বী হিন্দী। ফলে অনেক স্থানীয় শব্দ, স্থানীয় উপমা, বিশেষ রকম বাগবিধি এবং বহু আরবী ফার্সি শব্দ তাঁর রচনায় স্থান পেয়েছে। এর জন্য অহিন্দীভাষীদের কাছে এ ভাষা সহজবোধ্য নয়। এ ছাড়া, কবীরদাস অনেক ক্ষেত্রে সন্ধা ভাষা ও যৌগিক রূপক ব্যবহার করেছেন। এইসব ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ভিন্ন অন্যের কাছে ভাষা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে উঠেছে। কিন্তু হিন্দী-সাহিত্যরসিকদের কাছে কবীরের রচনা অনুপম। হিন্দী সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ডাঃ হাজারীপ্রসাদ দ্বিবেদী বলেন, হিন্দী সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাসের মধ্যে কবীরের মত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কোনো লেখকের আবির্ভাব হয়নি। ব্যক্তিত্বের মহিমায় কবীরের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী তুলসীদাস।

অন্যদিকে লালন তার গানে আরবি ফারসি শব্দের যথার্থ ব্যবহার, কোরআনের জ্ঞান, হিন্দু পুরানের যথেষ্ট প্রয়োগ ক্ষমতা দেখে তাকে নিরক্ষর ভাবতে মন চায় না। তার গানের ভাষা, উপমা প্রয়োগ এবং গানের মধ্যে নানা বিষয়ের ছন্দায়িত উল্লেখ দেখে তিনি নিরক্ষর ছিলেন এই বিশ্বাস কঠিন হয়ে পড়ে।

এই দুই মহামানবের দর্শনের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল হলো তাঁদের অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। কবীর যেমন বলেছেন ধর্মীয় পরিচয় মানুষকে বিভক্ত করে, তেমনি লালনও বলেছেন-মানুষের আসল পরিচয় তার মানবত্বে। উভয়েই বাহ্যিক আচার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অন্তর্গত সত্য ও ভালোবাসাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

কবীর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু তাঁর জ্ঞান ছিল অভিজ্ঞতা ও আত্মবোধ থেকে। তিনি বলতেন মসী কাগদ ছোআ নহী অর্থাৎ কাগজ আর কালি ছোঁননি। তাঁর কথাগুলো তাঁর ভক্তরা মুখস্ত করতেন এবং লিখে রাখতেন। কবীরের দোহা (দ্বিপদী) ঠিক কতটিএ বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। কারণ, তাঁর রচনাগুলো মূলত মৌখিকভাবে প্রচারিত হয়েছিল, পরে বিভিন্ন শিষ্য ও অনুসারীরা সংগ্রহ করেন। ফলে ভিন্ন ভিন্ন সংকলনে দোহার সংখ্যাও ভিন্ন পাওয়া যায়। অনেক গবেষকের মতে প্রায় ২০০০-২৫০০টির মতো দোহা পাওয়া যায়। আবার কিছু সংকলনে এর চেয়েও কম বা বেশি থাকতে পারে। সবচেয়ে পরিচিত গ্রন্থগুলোর একটি হলো বীজক, যেখানে তাঁর বহু দোহা, পদ ও শ্লোক সংকলিত হয়েছে।

অন্যদিকে লালনেরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তাঁর ভক্তরাও তাঁর গানের কথা স্মৃতিতে ধরে রাখতেন। লালন শাহ-এর গানের সঠিক সংখ্যা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। কারণ তিনি নিজে তাঁর গান লিখে সংরক্ষণ করেননি; শিষ্যদের মুখে মুখে ও পরে লিখিত আকারে সেগুলো সংরক্ষিত হয়েছে। লালনের গানের সংখ্যাও নির্দিষ্ট নয়, তবে হাজারের কাছাকাছি গান রচনা করেছেন বলে মনে করা হয়।

কবীর ছিলেন এক নির্ভীক সমাজসংস্কারক, যিনি হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর দোহাগুলোতে দেখা যায় ধর্মীয় ভণ্ডামির প্রতি তীব্র সমালোচনা এবং অন্তরের বিশুদ্ধতার উপর জোর। তাই তিনি বলেন—‘মো কো কঁহা টুড়ো বন্দে/মৈ তো তেরে পাস মেঁ।/ না মৈ দেবল না মৈ মসজিদ না কাবে কৈলাস মেঁ॥অর্থাৎ আমায় কোথায় খুঁজিস রে মানুষ, আমি তো তোর কাছেই আছি/ না আমি মন্দিরে, না মসজিদে, না কাবা বা কৈলাসে।‘ অর্থাৎ ঈশ্বর কোনো মন্দির বা মসজিদে আবদ্ধ নন; বরং মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই তাঁর অবস্থান। তাই বাহ্যিক আচার নয়, আন্তরিকতা ও মানবপ্রেমই তাঁর দর্শনের মূল। যেখানে লালন বলেছেনমানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি/মানুষ ছাড়া খুঁজিস কোথায় রে? অর্থাৎ মানবতার চর্চাই প্রকৃত সাধনা।

কবীর নিজেই তাঁর পরিচয় নিয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন, এবং তিনি হিন্দু বা মুসলিমএই বিভাজনকে অস্বীকার করেছেন। তাঁর কয়েকটি দোহায় এই বিষয়টা খুব পরিষ্কারভাবে বলেছেন—‘হিন্দু মুহে রাম কহি মুসলমান খুদাই/কহে কবীর সো জীবতো দুহ মৈঁ কদে না জাই॥ অর্থাৎ না আমি হিন্দু, না আমি মুসলমান। হিন্দুরা বলে রাম, মুসলমান বলে রহমান; এই নিয়ে তারা ঝগড়া করতে করতে মরে, কিন্তু সত্যটা কেউ বুঝতে পারে না। এখানে কবীর বোঝাতে চেয়েছেনঈশ্বর এক, কিন্তু মানুষ নাম নিয়ে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে।

যেখানে লালন তার পরিচয় দিতে ইতস্তত বোধ করেছেন—‘ওরে কারে কি বা বলি ওরে দিশে না মিলে/লোকে বলে লালন ফকির কোন জাতের ছেলে।, সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে/ সবে বলে লালন ফকির হিন্দু কি যবন/লালন বলে আমার আমি না জানি সন্ধান। উভয়েই বলছেনবাহ্যিক পরিচয় নয়, মানবতার প্রেমই আসল।

কবীর বিশ্বাস করতেন মানুষ জন্মগতভাবে কেউ উচ্চ বা নিম্ন নয়, জাতিভেদ মানুষের তৈরি, ঈশ্বরের নয়, সত্যিকারের মূল্য হচ্ছে আচরণ, জ্ঞান ও ভক্তি। কবীর তার দোহায় আরো বলেন, সাধুর জাত জিজ্ঞেস করো না, তার জ্ঞান জিজ্ঞেস করো। তলোয়ারের দাম দাও, খাপের নয়। সবাই একই মাটি (সৃষ্টির উপাদান) থেকে তৈরিতাহলে ভেদাভেদ কেন? জন্মভিত্তিক শ্রেণিবিভাগকে তিনি সরাসরি অস্বীকার করেছেন। ধর্মীয় পরিচয়ের অহংকারকেও ভুল বলেছেন। তাঁর দর্শনে মানুষই প্রধান, জাত বা ধর্ম নয় । তিনি এক ধরনের সামাজিক বিদ্রোহী চিন্তাবিদ, যিনি প্রচলিত ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বলেন, যদি তুমি ব্রাহ্মণ হয়ে জন্মাও, তাহলে অন্য কোনো পথ দিয়ে (বিশেষভাবে) কেন জন্মাওনি? কবীর এখানে বলছেনসব মানুষ একইভাবে জন্মায়, তাহলে ব্রাহ্মণের বিশেষত্ব কোথায়?’  একই বীজ (রক্ত/জীবনের উৎস) থেকে সবাই সৃষ্টি, তাহলে কে ব্রাহ্মণ, কে শূদ্র? অর্থাৎ জৈবিকভাবে সবাই সমানজাতিভেদ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। পাথর জোড়া দিয়ে মসজিদ বানিয়ে, তার উপর উঠে আজান দাও, ঈশ্বর কি বধির? এখানে তিনি শুধু মুসলিমদের নয়, হিন্দুদের মন্দির-পূজাকেও সমানভাবে প্রশ্ন করেছেন অর্থাৎ বাহ্যিক আচার নয়, অন্তরের ভক্তিই আসল।

অন্যদিকে লালন সাঁই জাত বিভাজন বা বর্ণভেদ সম্পর্কে খুব স্পষ্ট ও প্রতিবাদী অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর দর্শনের মূল কথা ছিল, মানুষই আসল পরিচয়, জাত-পাত মানুষের তৈরি কৃত্রিম বিভাজন। লালনের গানে বারবার উঠে আসে যে, মানুষের ভেতরের সত্য (আত্মা/মানবতা) এক, কিন্তু সমাজ তাকে নানা নামে ভাগ করেছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন জন্মের সময় তো কেউ নিজের জাত নিয়ে আসে না, তাহলে পরে এই বিভাজন কেন? লালনের মতে, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে একরকম বানিয়েছেন, কিন্তু মানুষ নিজেই বিভাজন তৈরি করেছে। তিনি দেখিয়েছেন, যারা জাত নিয়ে গর্ব করে, তারাই অনেক সময় মানবিকতায় পিছিয়ে। লালন তার গানে বলেছেন জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা।, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি/ মানুষ রূপেই রবে সে ধন।,সব লোকে সমান নয় কেন রে ভাই/ মানুষের মাঝে মানুষ খুঁজে পাই।, গুরু বিনা গতি নাই সংসারে মানুষে মানুষে ভেদ কোথায় রে? জাত গেল জাত গেল বলে/একি আজব কারখানা…’, জাতে নাই রে ভেদাভেদ/ সবাই এক মানবজাত…’ অর্থাৎ মানব জাতিকে এক ও অভিন্ন হিসেবে দেখা। আপনাকে চিনলে পরে/জাত-পাত সব ভেসে যায় রে…’ অর্থাৎ আত্মজ্ঞান অর্জনের পর সামাজিক বিভাজন অর্থহীন হয়ে যায়।

লালন সাঁই প্রশ্ন তুলেছেন-মানুষের পরিচয় কী? ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ-এসব কি মানুষের প্রকৃত পরিচয়? লালনের মতে, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি কিংবা সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার/ ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার অর্থাৎ মানবতার চর্চাই প্রকৃত সাধনা। কবীর ও লালন দুইজনেই সকল প্রকার সামাজিক বিভাজনকে অস্বীকার করে এক সার্বজনীন মানবতার কথা বলেছেন। তবে তাঁদের প্রকাশভঙ্গিতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কবীরের ভাষা ছিল সরাসরি ও তীক্ষ্ণ, যেখানে লালনের ভাষা ছিল গীতিময় ও রূপকধর্মী। তবুও লক্ষ্য এক-মানুষকে তার আসল পরিচয়ে ফিরিয়ে আনা, যেখানে কোনো বিভাজন নেই, আছে শুধু ভালোবাসা ও সহমর্মিতা।

বর্তমান বিশ্বে যখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও বিভাজন বাড়ছে, তখন কবীর ও লালনের দর্শন আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁদের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়মানুষই সবচেয়ে বড় পরিচয়, আর মানবতাই সবচেয়ে বড় ধর্ম। কবীর ও লালন সাঁইয়ের দর্শনে অসাম্প্রদায়িক মানবতার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। তারা ধর্ম, জাত ও বর্ণভেদকে অস্বীকার করেছেন। কবীর তাঁর দোহায় এবং লালন তাঁর গানে দেখিয়েছেন যে, ঈশ্বর মানুষের মধ্যেই অবস্থান করেন। বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে অন্তরের পবিত্রতা ও প্রেমকে তারা বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কবীর ও লালনের দর্শনের মূল কথা একটাই মানুষই সবচেয়ে বড় পরিচয়, ঈশ্বর এক, বিভেদ মানুষের সৃষ্টি, ধর্ম নয়, মানবতাই সত্য পথ। তাই আধুনিক যুগে কবীর ও লালনকে আন্তঃধর্মীয় ঐক্য ও মানবতাবাদের এক চিরস্থায়ী প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়।

পরিশেষে বলা যায়, কবীর ও লালন সাঁই তাঁদের জীবন ও দর্শনের মাধ্যমে এমন এক মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, যেখানে ভেদাভেদ নেই, সংকীর্ণতা নেই, আছে শুধু ভালোবাসা, সহনশীলতা ও সাম্যের বোধ। তাঁদের অসাম্প্রদায়িক মানবতার বাণী আজও আমাদের পথ দেখায় এবং এক শান্তিপূর্ণ ও সহাবস্থানের সমাজ নির্মাণে অনুপ্রেরণা জোগায়।