দুমুখো পাথর
মহাটক
একবার এক মহাটক আম গাছের আম খেয়ে এক কাঠবিড়ালি মাথা ঘুরে পড়ে গেলো! সেই যে সে পড়লো তারপর তার তিনদিন লাগ্লো জ্ঞান ফিরতে! জ্ঞান ফেরার পর বোঝা গেল তার স্মৃতিলোপ পেয়েছে। কাঠবিড়ালির পরিবার লাফিয়ে এসে অভিযোগ করলো গাছের মালিকের কাছে, তিনি কেন নিষেধ করেননি তাদের বাচ্চাকে এই মহাটক ফল খেতে! গাছের মালিক হতভম্ব হয়ে বললেন, এখানে আমার দোষ কোথায়? আপনাদের বাচ্চা কাঠবিড়ালি তো উলটো আমার গাছের ফল জিজ্ঞেস না করে খেয়েছে। এটা তো একরকম চুরি করে খাওয়া! জিজ্ঞেস করলে না-হয় বলতাম ওটা টক আম! কাঠবিড়ালি পরিবার ক্রুদ্ধ হয়ে বল্ল, একে তো আমাদের বাচ্চাকে টক আম খায়িয়ে গাছ থেকে ফেলে দিয়ে স্মৃতিহারা করেছ তার উপর তাকে চোর তকমা দিচ্ছ? বলতে বলতে তারা কোর্টে গিয়ে হত্যা চেষ্টা এবং মানহানি দুটো মামলা ঠুকে দিলো আম গাছের মালিকের নামে! গাছ মালিকের ডাক পড়লো একদিন কোর্টে! বিচারপতির সামনে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি এদের বাচ্চাকে গাছ থেকে ফেলে দিয়েছেন? গাছওয়ালা বল্ল, মহামান্য আদালত আমার ধারণা আপনারা উন্মাদদের পাল্লায় পড়েছেন! এই যে কাঠবিড়ালিরা এরা কয়েকবছর আগে আমার অনুমতি ছাড়া নিজের আনন্দে চুরি করে মহাটক আম খেয়ে অচেতন হয়ে পড়ে, তারপর এতোগুলা কাঠবিড়ালির অচেতনতাকে নিয়ে একজন পশুপ্রেমি মামলা করে আমার নামে। এই কোর্ট রায় দেয় আমি যেন গাছটা কেটে ফেলি, নয়তো ১ বছরের জেল! আমি সেই গাছ সেই সপ্তাহেই কেটে তার কাঠ দিয়ে একটা সোফা বানাই! আজ ৩/৪ বছর পর সেই কাঠবিড়ালিরা তাদের হারানো স্মৃতি ফিরে পেয়েছে বলে আমার ধারণা হচ্ছে, এবং তারা সত্যমিথ্যা মিলিয়ে মামলা করে দিয়েছে আমার নামে। যে বাচ্চা বিড়ালিটার জন্য মামলার কথা বলছে ওরা সে-ও ওদের দলে আছে দেখুন! আজ অনেক বড় হয়ে গেছে সে! উলটো আমার তো এদের নামে মামলা করা উচিৎ। কারণ এরা চুরি করে খায়, আবার মামলাও করে। মামলা শেষ হলে আবার মামলা করে! কোর্ট এই কাঠবিড়ালি পরিবারকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে পুনঃচিকিৎসার নির্দেশ দেয়! কাঠবিড়ালি পরিবার তখন লাফিয়ে উঠে বলে, আমরা আন্তজার্তিক আদালতে যাবো! গাছ মালিক বলে, যে গাছ কেটে ফার্নিচার বানানো হয়ে গেছে তার কল্পিত টক ফল নিয়ে মামলা করলে সেটার বিচার যদি হয়,তবে আমিও চুরির মামলা করবো! এরকম বাকবিতণ্ডার মধ্যে পুলিশ কাঠবিড়ালিদের ধরে পাবনা মানসিক হাসপাতালে চালান করে দেয়। সেখানে দরবেশের মতো এক রোগীর সঙ্গে তাদের দেখা হয়, তিনি তার বালিশের নিচ থেকে এক্টার পর একটা আম বের করে কাঠবিড়ালিদের দিতে থাকেন! এক কাঠবিড়ালি জিজ্ঞেস করে, এতো আম পাচ্ছেন কই? দরবেশ বল্ল, একটা আম সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম, সেই আম ডিম পেড়ে এতোগুলা বানিয়েছে! সবাই অবাক হলো। আর আম খেতে গিয়ে গাল ধরে গেলো মিষ্টিতে! দরবেশ টাইপ লোকটা বল্ল, বাড়ি থেকে টক আম এনেছিলাম। বালিশের নিচে থাকতে থাকতে মিঠে হয়ে গেছে! কাঠবিড়ালিরা বল্ল, আপনি কি মানুষ না উন্মাদ? লোকটা বল্ল, সেটা জান্তেই তো এখানে এসেছি! কাঠবিড়ালিরা টের পেলো এই আম খাওয়ার পর তাদের স্মৃতি একটু একটু করে গলে যাচ্ছে! ঘুম পাচ্ছে ভীষণ। এবং ঘুমের মধ্যে একজন বিচারপতি আমগাছে চড়ে বলছেন, চুরি বলে কিছু নেই দুনিয়ায়, পরেরটা নিজের মনে করে খাও; বরং যে গাছ লাগায় সে অন্যায় করে প্রকৃতিকে আহার যোগান দিয়ে!! কেননা তার জন্যেই যত গেঞ্জামের উৎপত্তি, ওদেরকে জেলে পুরে দাও!
ছাগল পাহাড়
এক রাখাল পাথর জমা করতো। যেখানেই সে যেতো সেখানে কোন পাথর পাওয়া গেলে তা নিয়ে আসতো। তার ছিলো কয়েক ডজন ছাগল। এদের নিয়ে সে ঘুরে বেড়াতো মাঠেঘাটে, কখনো সখনো দূরে যেতো। কয়েক মাস কাটিয়ে অনেক পাথর নিয়ে ফিরে আসতো। তারপর স্তুপ করে রাখা পাথরের উপর আরও পাথর ফেলত! একবার ভ্রমণে যাবার পথে একজন বণিক ঝড়ের কবলে রাস্তায় আটকা পড়ে আশ্রয় নিলেন রাখালের কুটিরে। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি দেখলেন বাইরে বৃষ্টির মধ্যে এক স্তুপ পাথর! বণিক জিজ্ঞেস করলেন, এই পাথর এখানে কেন? আশপাশে তো কোন পাহাড় নেই! রাখাল বল্ল, পাথর আমিই জমিয়েছি, আমি একটা পাহাড় বানাবো পাথর জমিয়ে! বণিক শুনে অবাক হলেন। রাখাল বল্ল, ছাগলেরা পাহাড়ে চড়তে ভালোবাসে। এখানে তো পাহাড় নেই, আর আমি আমার ছাগল গুলোকে ভালোবাসি, তাই আমার ইচ্ছে পাথর জমিয়ে একটা পাহাড় বানিয়ে ওদেরকে ছেড়ে দেবো। ওরা আনন্দ নিয়ে পাহাড়ের পাথুরে খাঁজ বেয়ে ঘুরবে খাবে আর পাথর থেকে পাথরে লাফিয়ে যাবে। বণিক সব শুনে বল্ল, একটা জীবন দিয়ে কি একটা পাহাড় বানানো সম্ভব? রাখাল বল্ল, সম্ভব! কল্পনায় পাহাড়টা বানিয়েছি বলেই তো আপনি বিস্মিত হচ্ছেন! হয়তো চোখে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু আমাকে তো দেখা যাচ্ছে কতোটা দুর্বল আমি! অথচ আমার স্বপ্ন একটা পাহাড়ের সমান! বণিক মুচকি হেসে বললেন, এইজন্যই আজ আমাকে এখানে আটকে ফেলা হয়েছে সম্ভবত! আপনি যদি রাজি থাকেন আমার কয়েকটা পাহাড় আছে! বংশপরম্পরায় পাওয়া। সবগুলোয় জঙ্গল হয়ে আছে। আপনি রাজি হলে আপনাকে একটা পাহাড় দিতে চাই৷ আপনি আপনার ছাগলদের নিয়ে সেখানে থাকবেন! রাখাল আনন্দিত হলো। সে বল্ল, ঝড় আসলে আপনাকে আমার কাছে পৌঁছে দেওয়ার উছিলা! আমি রাজি! তারপর সেই পাহাড়ে রাখাল তার ছাগলদের নিয়ে উঠে পড়লো। দেখা গেলো মহা আমোদে ছাগলেরা পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খাবার নিয়ে চিন্তা নেই। ঘুম এলে ঘুমিয়ে পড়ছে। নতুন এক জীবন শুরু হয়েছে তাদের। রাখাল পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চারদিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেল্লো। জীবন তাকে নতুন ভাবে আনন্দ দিলো। সে ঠিক করলো এখান থেকে আর নাম্বে না। নিজেকে সে ধ্যানস্থ করলো। এদিকে মাসে মাসে ছাগলের সংখ্যা বেড়ে যেতে লাগ্লো! বেশ কয়েকবছর পর এক পর্বতারোহী সেই পাহাড় দেখে হতভম্ব হয়ে গেলো। একটা পাহাড় উপচে পড়া ছাগল। পর্বতারোহী পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দেখলো ধ্যান করতে করতে নিজেকে শুকিয়ে মমি বানিয়ে ফেলা এক প্রবীণ দূরে তাকিয়ে স্থির বসে আছেন। লোকটা নিজের ক্যামেরায় এই অপূর্ব পাহাড়ের গল্প ধারণ করে ছেড়ে দিলো ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। কয়েকদিনের মধ্যে পর্যটকের ভীড় ঘিরে ধরলো পাহাড়! মাসখানেকের মধ্যে পাহাড়ের আশপাশে পাহাড়ি ছাগলের বার্বিকিউ আয়োজন হতে লাগ্লো। এবং বছর ঘুরতে না ঘুরতে সেই পাহাড় ছাগল শূন্য হয়ে গেলো। তারপর এক ঝড়ের রাতে একদল চোর মমি হয়ে যাওয়া সেই রাখালের মমিটা চুরি করে নিয়ে গেলো। এরকম মমি বিরল,এর বাজারদর আছে। ফলে সব কিছু শেষ হয়ে যাবার পর একটা প্রবাদের জন্ম হলো—ছাগল পাহাড়ে ছাগল নেই কেন? কারণ, ওখানে মানুষ ঘুরতে গিয়েছিলো!
সত্যের দুইহাত
এক তরুণ সন্ত ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে ভান্তের কাছে এসে বল্ল, আমি ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম বুদ্ধ জলের উপর বসে আছেন, আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন! ভান্তে বল্ল, খুবই ভালো স্বপ্ন। এখন কি বুদ্ধকে জলের উপর দেখতে পাচ্ছ? সন্ত বল্ল, নাহ! ভান্তে বল্ল, এবার যাও বাকি ঘুমটা ঘুমিয়ে এসো। সেদিন সন্ধ্যায় তরুণ সন্ত ভান্তের কাছে এসে বল্ল, বাকি ঘুম ঘুমাতে গিয়ে আমি বুদ্ধকে দেখিনি। ভান্তে বললেন, তিনি ঘুমের মধ্যে আছেন এবং নেই; দুটোই সত্য!
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন