কাজী কাদের নেওয়াজের আলোচিত কবিতা

অ+ অ-

 

|| কাজী কাদের নেওয়াজ ||

 

বিশিষ্ট কবি কাজী কাদের নেওয়াজের জন্ম ১৫ জানুয়ারি ১৯০৯ সালে, মুর্শিদাবাদ জেলার মাতুলালয়ে। মানব বন্দনা, সামাজিক নৈতিকতা, প্রেম ও পল্লীর শ্যামল প্রকৃতি তার কবিতায় মনোজ্ঞভাবে প্রকাশিত। তিনি শিশুতোষ সাহিত্যেও খ্যাতিমান। মরালনীল কুমুদী তার বহুল সমাদৃত কাব্যগ্রন্থ এবং দাদুর বৈঠকও সুপরিচিত শিশুরঞ্জক রচনা। চাকরি জীবনের শুরুতে কবি কিছুদিন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। ১৯৩৩ সালে স্কুল সাব-ইন্সপেক্টর পদে যোগদান করেন। ১৯৪৬ সালে সহকারি প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঢাকায় চলে আসেন তিনি। প্রথমে নবকুমার ইন্সটিটিউশনে ও পরে নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুল, দিনাজপুর জেলা স্কুলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং প্রেসিডেন্ট পুরস্কার লাভ করেন। অনন্য কবি ও শিক্ষাবিদ কবি কাজী কাদের নেওয়াজ ৩ জানুয়ারি ১৯৮৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

 

হারানো টুপি

১ 
টুপি আমার হারিয়ে গেছে হারিয়ে গেছে ভাই রে, 
বিহনে তার এই জীবনে কতই ব্যথা পাই রে।
হাসবে লোকে শুনলে পরে হারালো সে কেমন ক’রে,— 
কেমন করে বৈশাখী ঝড় উড়িয়ে দিল মোর সে টুপি, 
বুঝেছি হায় টুপির লোভে দেবতাদেরই এ কারচুপি। 

 
থাকত টুপি দুপুর রোদে ছায়ার মতোই মাথায় মম,
কখনো বা বাতাস পেতাম ঘুরিয়ে তারে পাখার সম। 
বক্ষে তাহার নিতুই প্রাতে ফুল রেখেছি আপন হাতে, —
সে ছিল মোর ফুলদানি আর ফুলের সাজি একসাথে হায়,
জানিনে আজ কোথায় গেছে কোন্ দেশে সে কোন্ অলকায়।


হয়তো এখন পবনদেবের মাথায় আছে সেই টুপি মোর, 
এদিকে তার বিচ্ছেদে হায় আমার চোখে ঝরতেছে লোর!
ভুলতে নারি টুপির প্রীতি, জাগছে হৃদে শুধুই স্মৃতি — 
বিদেশ গেলে বালিশ হত হায় সে টুপি মোর শিয়রে, 
চলতে পথে সেলাম পেতাম থাকলে টুপি মাথার পরে। 


তিনটি টাকায় কিনেছিলাম ‘চাদনি’ হতে সেই টুপিরে, 
তিন শ টাকা দিবই আজি পাই যদি ফের তারেই ফিরে। 
চার মিনিটে ‘চসার’ প’ড়ে শেষ করেছি টুপির জোরে, — 
পরীক্ষাতে প্রথম হতাম থাকলে টুপি মাথার পরে; 
দুখের দিনের বন্ধু টুপি কোথায় গেলি আজকে, ওরে! 

 
আজিও হায় নিমন্ত্রণে গেলে সভার মধ্যখানে, 
সব ভুলে যে প্রথম আমি তাকাই লোকের মাথার পানে। 
দেখি কেবল চুপি চুপি কার শিয়রে রয় আমার টুপি,— 
মিলে না খোঁজ, সভার থেকে ফিরে আসি শুষ্ক মুখে;
নতুন টুপি কিনব না, ভাই, পণ করেছি মনের দুখে।।

 

মা

মা কথাটি ছোট্ট অতি
কিন্তু জেনো ভাই,
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর
তিন ভুবনে নাই।
সত্য ন্যায়ের ধর্ম থাকুক
মাথার ‘পরে আজি,
অন্তরে মা থাকুন মম
ঝরুক স্নেহরাজি।
রোগ বিছানায় শুয়ে শুয়ে
যন্ত্রণাতে মরি,
সান্ত্বনা পাই মায়ের মধু
নামটি হৃদে স্মরি।
বিদেশ গেলে ঐ মধু নাম
জপ করি অন্তরে,
মন যে কেমন করে
আমার প্রাণ যে কেমন করে।
মা যে আমার ঘুম পাড়াত
দোলনা ঠেলে ঠেলে
শীতল হতো প্রাণটা, মায়ের
হাতটা বুকে পেলে।

 

ওস্তাদের কদর

বাদশাহ আলমগীর
কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লীর।
একদা প্রভাতে গিয়া
দেখেন বাদশাহ, শাহজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া
ঢালিতেছে বারি গুরুর চরণে
পুলকিত হৃদে আনত-নয়নে,
শিক্ষক শুধু নিজ হাত দিয়া নিজেরি পায়ের ধুলি
ধুয়ে মুছে সব করিছেন সাফ্ সঞ্চারি অঙ্গুলি।
শিক্ষক মৌলভী
ভাবিলেন আজি নিস্তার নাহি, যায় বুঝি তার সবি।
দিল্লীপতির পুত্রের করে
লইয়াছে পানি চরণের পরে,
স্পর্ধার কাজ হেন অপরাধ কে করেছে কোন্ কালে!
ভাবিতে ভাবিতে চিন্তার রেখা দেখা দিল তার ভালে।
হঠাৎ কি ভাবি উঠি
কহিলেন, আমি ভয় করি না’ক, যায় যাবে শির টুটি,
শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার
দিল্লীর পতি সে তো কোন্ ছার,
ভয় করি না’ক, ধারি না’ক ধার, মনে আছে মোর বল,
বাদশাহ্ শুধালে শাস্ত্রের কথা শুনাব অনর্গল।
যায় যাবে প্রাণ তাহে,
প্রাণের চেয়েও মান বড়, আমি বোঝাব শাহানশাহে।

তার পরদিন প্রাতে
বাদশাহর দূত শিক্ষকে ডেকে নিয়ে গেল কেল্লাতে।
খাস কামরাতে যবে
শিক্ষকে ডাকি বাদশা কহেন, ‘শুনুন জনাব তবে,
পুত্র আমার আপনার কাছে সৌজন্য কি কিছু শিখিয়াছে?
বরং শিখেছে বেয়াদবি আর গুরুজনে অবহেলা,
নহিলে সেদিন দেখিলাম যাহা স্বয়ং সকাল বেলা’
শিক্ষক কন, ‘জাহপানা, আমি বুঝিতে পারিনি হায়,
কি কথা বলিতে আজিকে আমায় ডেকেছেন নিরালায়?’
বাদশাহ্ কহেন, ‘সেদিন প্রভাতে দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে
নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন,
পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ও চরণ।
নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে
ধুয়ে দিল না’ক কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা পাই মনে।’

উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষকে আজি দাঁড়ায়ে সগৌরবে
কুর্ণিশ করি বাদশাহে তবে কহেন উচ্চরবে,
‘আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির,
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।’