দাউদ হায়দারের জনপ্রিয় কবিতা

অ+ অ-

 

|| দাউদ হায়দার ||

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাসিত কবি, লেখক ও সাংবাদিক। জন্ম ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, পাবনা জেলায়। তার প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছিল ১৯৬৭ সালে, ঢাকার একটি দৈনিকের রবিবাসরীয় সংখ্যায়। তবে সত্তর দশকে তিনি কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৭৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নার কালো বন্যায় শিরোনামে কবিতা প্রকাশিত হলে তার বিরুদ্ধে মামলা রজু করা হয়। মামলার সূত্রে পুলিশ তাকে ১১ মার্চ গ্রেফতার করে। এরপর ২০ মে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। তৎকালীন সরকার, ১৯৭৪ সালের ২১ মে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে। এসময় তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। ১৯৮৫ সালে পেন আমেরিকান সেন্টারের ২০০০ লেখকের পক্ষ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক চিঠিতে দাউদ হায়দারকে ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি। তারপর নোবেল জয়ী সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাসের সহযোগিতায় ১৯৮৭ সালের ২২ জুলাই তিনি জার্মানির বার্লিন শহরে যান। অমৃত্যু তিনি জার্মানিতেই নির্বাসিত জীবন-যাপন করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থজন্মই আমার আজন্ম পাপ; সম্পন্ন মানুষ নই; নারকীয় ভূবনের কবিতা; যে দেশে সবাই অন্ধ; ধূসর গোধূলি ধূলিময়; আমি ভালো আছি, তুমি?; সংগস অব ডেস্পায়ার; এই শাওনে এই পরবাসে; শ্রেষ্ঠ কবিতা; সমস্ত স্তরে ক্ষতচিহ্ন; আমি পুড়েছি জ্বালা ও আগুনে; এলোন ইন ডার্কনেস অ্যান্ড আদার পোয়েমস; হোল্ডিং অ্যান আফটারনুন অ্যান্ড আ লিথ্যাল ফায়ার আর্ম এবং সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য। শেষ জীবনে তিনি একজন ব্রডকাস্টিং সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল বার্লিনে মৃত্যু বরণ করেন।

 

|| জন্মই আমার আজন্ম পাপ ||

জন্মই আমার আজন্ম পাপ, মাতৃজরায়ু থেকে নেমেই জেনেছি আমি
সন্ত্রাসের ঝাঁঝালো দিনে বিবর্ণ পত্রের মত হঠাৎ ফুৎকারে উড়ে যাই
                                                        পালাই পালাই সুদূরে

চৌদিকে রৌদ্রের ঝলক
বাসের দোতলায় ফুটপাতে রুটির দোকানে দ্রুতগামী নতুন মডেলের
চকচকে বনেটে রাত্রির জমকালো আলো ভাংগাচোরা চেহারার হদিস

ক্লান্ত নিঃশব্দে আমি হেঁটে যাই
পিছনে ঝাঁকড়া চুলওয়ালা যুবক। অষ্টাদশ বর্ষিয়ার নিপুণ ভঙ্গি
দম্পতির অলৌকিক হাসি প্রগাঢ় চুম্বন
কাঁথায় জড়ানো শিশুর অসতর্ক চিৎকার
এবং
আমি দেখে যাই হেঁটে যাই কোথায় সামান্য বাতাসে উড়ে যাওয়া চাল—
                                                      অর্থাৎ আমার নিবাস।

ঘরের স্যাঁতসেতে মেঝেয় চাঁদের আলো এসে খেলা করে
আমি তখন সঙ্গমে ব্যর্থ, স্ত্রীর দুঃখ অভিমান কান্না
                                       সন্তান সন্তুতি পঙ্গু
পেটে জ্বালা, পাজরায় তেল মালিশের বাসন উধাও—

আমি কোথা যাই? পান্তায় নুনের অভাব।

নিঃসঙ্গতাও দেখেছি আমি, উৎকণ্ঠার দিনমান জ্বলজ্বলে বাল্বের মতোন
আমারি চোখের মতো স্বজনের চোখ—
য্যানো আমুণ্ড গ্রাস করবে এই আমাকেই
আমিই সমস্ত আহার নষ্ট করেছি নিমেষে!

শত্রুর দেখা নেই, অথচ আমারি শত্রু আমি—
জ্বলন্ত যৌবনে ছুটি ফ্যামিলি প্ল্যানিং কোথায়
                কোথায় ডাক্তার কম্পাউন্ডার?
                যারা আমাকে অপারেশন করবে?
পুরুষত্ব বিলিয়ে ভাবি, কুড়ি টাকায় একসের চাল ও একদিনের অন্যান্য
                                           সামান্য দ্রব্যাদী মিলবে তো?

আমার চৌদিকে উৎসুক নয়ন আহ্লাদী হাসি ঘৃণা আমি পাপী

এরা কেন জন্ম নেয়? এরাই তো আমাদের সুখের বাধা অভিশাপ
মরণ এসে নিয়ে যাক; নিয়ে যাক
               লোকালয়ের কিসের ঠাঁই এই শত্রুর?—বলে
               প্রাসাদ প্রেমিকেরা

আমিও ভাবি তাই; ভাবি নতুন মডেলের চাকায় পিষ্ট হবো।
আমার জন্যই যখন তোমাদের এত দুঃখ
               আহা দুঃখ
               দুঃখরে!

আমিই পাপী; বুঝি তাই এ জন্মই আমার আজন্ম পাপ।

 

|| তোমার কথা ||

মাঝে মাঝে তোমার কথা ভাবি

আকাশে জমেছে মেঘ, বাতাসে বৃষ্টির গান
রাত্তির বড় দীর্ঘ; কিছুতেই
ঘুম আর আসছে না। একবার এপাশ, একবার ওপাশ, আর
বিশ্বচরাচর জুড়ে… নিথির স্তব্ধতা।

মাঝে মাঝে মনে হয়
অসীম শূন্যের ভেতর উড়ে যাই।
মেঘের মতন ভেসে ভেসে, একবার
বাংলাদেশে ঘুরে আসি।

মনে হয়,মনুমেন্টের চূড়ায় উঠে
চিতকার ক’রে
আকাশ ফাটিয়ে বলি;
দ্যাখো, সীমান্তে ওইপাশে আমার ঘর

এইখানে আমি একা, ভীনদেশী।


|| অভিধান ||

ঘরময় একটি পাতাবাহার।
আজ, জন্মদিন অরুণার
চোখ দুটি যামিনী রায়ের আঁকা,
মুখখানি প্রথম কদমফুল। মন্দাক্রান্ত ছন্দ-মাখা
আষাঢ়স্য প্রথম দিবস। বিরহের গান
আজ  তার জন্মদিন। নদীও আবেগে ছন্দময়।
দু’কূল প্লাবিত। সূর্যাস্তেও সূর্যোদয়
তোমাকেই জানি জীবনের চলন্তিকা, অভিধান

 

|| প্রেম ||

প্রেম দ্যাখো বয়স মানে না কোনদিন
ছোটবড় তালার মতো সব বয়সের কপাটে ঝুলে পড়ে হঠাৎ
প্রেম, সবুজ নিসর্গ থেকে পলাতক কয়েদীর মতোন নিঃশব্দে বেরিয়ে
আসে দ্রুত
ঠাঁই নেয় বিভিন্ন লোকালয়ে; খেলা করে সকাল বিকাল
তোলপাড়ে ভেঙে যায় নীলিমার আজীবন আশীর্বাদ—
গড়ে তোলে
সুখ-দুঃখ
পড়ে থাকে বয়স্কদের দারুণ চোখ
প্রেম, সেতো বয়স মানেনি কোনদিন—
বুঝি তাই
তীক্ষ্ণ চকচকে সোনার ছুরি এনে বসিয়ে দেয় সকল প্রহরে
মেতে ওঠে ভয়াবহ বন্যার জলের মতো বাদশাহী হৃদয়ে—
এবং
ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় পারিবারিক স্নেহ-মমতা
অথচ শুধু বেঁচে থাকে পরস্পর হৃদয়ের সুন্দর দৃশ্যাবলী!

প্রেম, একটা ক্ষুধার্ত হিংস্র বাঘ; নিমেষে গ্রাস করে দীর্ঘকায় শরীর
প্রচণ্ড থাবায় কখনো আবার ছিড়ে নেয় লালিত মাংস—
ছিটিয়ে দেয়
বিষাক্ত লবণ
জ্বলতে থাকে আজীবন!
প্রেম; য্যানো গোলাপ-নীলিমা-নিসর্গ-নক্ষত্রে মোড়া আদুরে পুতুল—
নির্জনে থাকেনা পড়ে; অথচ একবার উপযুক্ত হৃদয়ে ঠাঁই পেলে কেউই
রুখতে পারে না সহজে এবং
সৃষ্টি করে বিশাল বাগান
যা কখনো ফেলে রেখে কোথাও যাওয়া যায় না; শুধু ঈশ্বরের মতো
ক্ষমতা সম্পন্ন হয়ে যায় মুহূর্তে!

 

|| আমার পরিচয় ||

ভুলে যাও ভিটেমাটিদেশ
তুমি উদ্বাস্তু, আশ্রিত।তোমার স্বদেশ বলে কিছু নেই
তুমি পরগাছা, তুমি মৃত

তোমার সামাজিকতা, তোমার পারিপার্শ্বিক
তোমার চেহারা তোমার চালচলন
উদ্বাস্তুর; আমাদের ঘৃণা-করুণায়
তোমার জীবন

এদেশ তোমার নয়
এই ভিটেমাটিজমিন তোমার নয়
তুমি আশ্রিত, উদ্বাস্তু;
এই তোমার মানব পরিচয়

 

|| দেখা হবে ||

চাল নেই চুলো নেই অনাহারে দিনকাল
এদিকে রাজন্য অত্যাচার

প্রতিবাদী মানুষেরা প্রত্যেকে কানু সান্যাল,
দেশের আনাচেকানাচে চারু মজুমদার

জীবিত বা মৃত যেই হোক
বিষবারুদে শরীর গাথা।
দু’হাতে গাণ্ডীব আর দুই চোখ
দেখে নিচ্ছে কে শত্রু কে মিত্র, পরিত্রাতা

আমাদের ভিটেমাটি
কেড়ে নিচ্ছে যারা
দেখা হবে কুরুক্ষেত্রে। যুদ্ধঘাঁটি
প্রস্তুত। মন্ত্রণাদাতা এর্নেস্তো চে গুয়েভারা।