স্যাপিওসেক্সুয়াল

অ+ অ-

 

একরাতের বৃষ্টিতে ঢাকা শহর ডুবে গেল, আর আমার ক্রমাগত মনে পড়তে থাকলো বন্ধু কায়সারের কথা। এখন অবশ্য সেই অর্থে তাকে বন্ধুও বলা যায় না। অনেকদিন পরপর অকেশনালি যোগাযোগ হয়। টুকটাক খোঁজখবর দেওয়া-নেওয়ার পর আবার অনেকদিন কোনো যোগাযোগ থাকে না।

অথচ একসময় কায়সারের সঙ্গে নিত্যদিনের যোগাযোগ ছিল। আমরা একসঙ্গে আর্ট-কালচার করতাম। সম্ভবত আমরা সমবয়সী বা এক দুই বছরের ছোট-বড় হতে পারি। কিন্তু আমি কায়সারকে আপনি বলে নাম ধরে সম্বোধন করি। কায়সারও তাই করে। কোথাও পেইন্টিং একজিবিশন, ইনস্টলেশন কি ক্ল্যাসিকাল মিউজিকের আয়োজন হলে আমরা দুজন একসঙ্গে যেতাম। আর্ট ফিল্মের শোগুলোতেও আমাদের একসঙ্গে দেখা যেত। প্রায় সন্ধ্যায় আজিজ সুপার মার্কেটে একসঙ্গে আড্ডাও দিতাম। ভালই চলছিল এভাবে। কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন একসময় আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। অনেক বছর পর খেয়াল করলাম, কায়সারের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগটা আর নেই। উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ছাড়া দুইদিক থেকেই বিচ্ছিন্নতার ঘটনাটা ঘটেছিল বলেই মনে হয়।

কায়সারের কথা মনে পড়তে শুরু করেছে বৃষ্টির দিন সকাল থেকে। ধীরে ধীরে পুরনো দিনের এত স্মৃতি এসে জমা হলো যে, আমার মন ডুবে গেল হাঁটু সমান স্মৃতিতে আর ঢাকা শহর ডুবে গেল কোমর সমান পানিতে।

পয়লা জুলাই ভোররাতে বৃষ্টি শুরু হলো, আর থামাথামির নাম নেই। ঘুমের মধ্যেই বুঝতে পারছিলাম, বাইরে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালার কাঁচে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ এসে বাড়ি খাচ্ছে। বিছানা না ছেড়ে পাশ ফিরে শুলে ঠান্ডা বাতাসে ঘুমটা আরও গভীর হয়ে নামলো দ্বিতীয় দফা।

নয়টায় উঠে দেখি আশপাশের সব গলি কোমর পানিতে ডুবে গেছে। ফেসবুকের ওয়াল পানির ছবিতে সয়লাব। জলাবদ্ধ ঢাকার নানার জায়গার ছবি পোস্ট করছে নানাজন। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারছে না ছাত্র-ছাত্রীরা। অফিসগামী লোকজন হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উপচে পড়া ফুটপাথে। বাস-সিএনিজ-রিকশা সবকিছু তলিয়ে যাওয়ার জোগাড়। মিরপুর, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তাগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে একেকটা নদী বয়ে চলেছে। রাস্তার ছবিতে নৌকা, স্টিমার, সাবমেরিন বসিয়ে লোকজন মিম তৈরি করে ট্রল করছে। কেউ কেউ বলেছে, প্লাস্টিকই দুনিয়াটাকে শেষ করে দেবে।

ঢাকা শহরের কিছু বাসিন্দার মতে, যেখানে সেখানে চিপসের প্যাকেট জলাবদ্ধতার মূল কারণ। আরেক দল মনে করে, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক, পলিথিন নয়আসলে নদী, খাল-বিল, জলাধার ভরাট করে ইমারত গড়ার ফলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। সরকার নানা পরিকল্পনা করে, বলে যে সামনের বছর থেকে আর জলাবদ্ধতা হবে না। কিন্তু পরের বর্ষায় ভারি বৃষ্টি হলে আবার পানি জমে পুরো শহর তলিয়ে যায়। তখন সরকারি লোকজন এবং সরকার সমর্থকরা বলে লোকজন যেহেতু যত্রতত্র চিপসের প্যাকেট ফেলা বন্ধ করছে না সেহেতু জলাবদ্ধতাও কমছে না। প্ল্যাস্টিক-পলিথিনই এর জন্য দায়ী। কিন্তু সরকার প্ল্যাস্টিক-পলিথিন পরিষ্কার করার জন্য কিছু করে না। প্ল্যাস্টিক-পলিথিনের ব্যবহার কমানোর জন্যও কিছু করে না। বিরোধীরা তো বটেই, সরকার সমর্থকরাও চিপস খেয়ে যত্রতত্র প্যাকেট ফেলে রাখার অভ্যাস বদলায় না। ফলে, বেশি বৃষ্টি হলেই শহরের লোকজন বুঝতে পারে এবার সবকিছু ডুবে যাবে। আর ডুবে গেলেই পুরো শহর এক-দুই দিনের জন্য অচল হয়ে থাকবে প্রায়।

অনেক বছর আগে এরকমই এক বৃষ্টির দিনে আমি আর কায়সার কাক ভেজা হয়ে ধানমণ্ডি গিয়েছিলাম।

শুধু যে বৃষ্টির কারণে সেই দিনের কথা বা কায়সারের কথা আমার মনে পড়ে, তা নয়। মনে পড়ার আসল কারণ ময়মুনা। দিন তিনেক আগে ময়মুনা আমাকে একটা অদ্ভুত গল্প বলেছে। ঠিক গল্প নয়, একটা বাস্তব ঘটনা শেয়ার করেছে। ময়মুনার গল্পটা এক রহস্যময় ছবি নিয়ে। তার কথা শুনতে শুনতে আমি বুঝতে পারি, ময়মুনা যে কাহিনীটা বলছে সে কাহিনীরই আরেক অংশ আমি জানি। আর দুটো জোড়া লাগালে অদ্ভুত একটা গল্প তৈরি হবে। কিন্তু আমি শুধু শুনতেই থাকি, আমার জানা গল্পটা বলি না। আমার মনে হয়, এই গল্পটা ময়মুনাকে বলা ঠিক হবে না। কিন্তু গল্পটা শোনার পর থেকে আমার পুরনো অনেক কিছু মনে পড়ে যায়, আরও মনে হয়, শুধু মনে হওয়াটাই জরুরি নয়, কায়সারের সঙ্গে দ্রুত দেখা হওয়া দরকার।

কুড়ি বছর আগে চাকরি জীবনের শুরুতে আখতারুল ইসলামকে নিয়ে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল সেগুলোই মূলত আমার মনে পড়ে। আমি মনে মনে বলি, কী একটা সময় ছিল!

 

কায়সার আমার অফিসে আসার কথা বিকাল ৫টায়। কিউবিকলে বসে আমি বড় কাঁচের জানালা দিয়ে দেখছি। আকাশে ঘন মেঘ জমা হয়েছে। মেঘের রং ঘন কালো, কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে ঘন হয়ে আসা শাদা দুধ যেন আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই অদ্ভুত উপমা কেন আমার মনে বারবার আসে তা আমি বুঝতে পারি না। কিন্তু সমাগত বৃষ্টির কালো মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে যতবার ভাবি আমার মনে ততোবারই ঘন শাদা দুধ আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যত সময় যাচ্ছে মেঘ ততোই জলীয় আর ভেজা হয়ে উঠছে। ভেতরে ভেতরে হয়তো জলীয় কণার ঘর্ষণে উষ্ণ হয়ে উঠছে মেঘগুলো। হয়তো থৈ থৈ জলীয় বাষ্প নিচের দিকের মেঘগুলোকে অস্থির করে তুলেছে।

কে যেন বললো, আজকে নামবে। একেবারে নামার মতো নামবে।

আমি মনে মনে কামনা করছিলাম, কায়সার যেন না আসে। কোথাও যেন আটকা পড়ে। কোনো অজুহাতে ধানমণ্ডি যাওয়াটা বাতিল হয়ে যায়। বৃষ্টি নামবেই। ঠেকানোর আর কোনো উপায় নেই। যতদূর চোখ যায়, ততদূর শুধু মেঘ আর মেঘ। মহাজাগতিক জলীয় বাষ্পের একটা খণ্ড পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ওপর সুসজ্জিত সৈন্যবাহিনীর মতো সমবেত হয়েছে। যুদ্ধ ঘোষণা হলেই ছররা গুলির মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে চরাচরে।

এত বড় মেঘের বৃষ্টি কি সহজে থামবে?

মনে মনে ভাবছিলাম, কায়সার আসবে না। ধানমণ্ডি যাওয়া বাতিল হয়ে গেল। বড় একটা সুযোগ মিস হয়ে গেল বলে মনটা খচখচও করছিল। কিন্তু কী উপায়! এসব ভাবতে ভাবতেই আমাকে অবাক করে দিয়ে কায়সার ঠিকঠাক চলে এলো। কাঁটায় কাঁটায় বিকাল ৫টায়। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কায়সার আধভেজা হয়ে অফিসে ঢুকেছে।

ঢুকেই বললো, টিস্যু দেন।

আমি টিস্যু বক্স এগিয়ে দিলে কায়সার টিস্যু পেপার দিয়ে মাথা মুছে ফেললো।

বললো, একদম দেরি করা উচিত হবে না। চলেন।

তখনই বৃষ্টির ঝমঝম শব্দটা পেলাম। মনে হলো, ১১টা বিমান অফিসের জানালাগুলোর ধারে এসে ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছে।

আমি কায়সারকে নিরুৎসাহিত করার জন্য বললাম, যে বৃষ্টি নামলো। এর মধ্যে যাবেন কেমনে? ছাতাও তো আনি নাই। আপনার সঙ্গেও মনে হয় ছাতা নাই।

কায়সার বললো, এটা কোনো কথা বললেন, মঈন? একবার মিস দিলে আখতার ভাইয়ের দেখা কি আর আপনি পাবেন? নতুন করে এপয়েন্টমেন্ট কি আমরা আর পাবো? গ্রেটেস্ট লিভিং আর্টিস্টদের মধ্যে উনি অগ্রগণ্য। ওনার এপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার জন্য কত বড় বড় কুতুবরা লাইন ধরে আছে। মিঠু ভাই কি আমাদের আর সুযোগ দেবে?

এটা অবশ্য আমি নিজেও জানি। আজ যদি আমরা মিস করি তাহলে আখতারুল ইসলামের দেখা সারাজীবনে আর নাও পেতে পারি আমরা। মিঠু ভাই আর সুযোগ দেবে না। চাইলেও পারবে না।

আখতারুল ইসলামকে ওয়েস্টার্ন আর্ট ক্রিটিকরা খুব মূল্যায়ন করে। নিউ ইয়র্ক, প্যারিস, লন্ডনে ওনার শো হয়। আর্ট ওয়ার্ল্ড কয়েক বছর আগে ওনাকে গ্রেটেস্ট লিভিং আর্টিস্টের তালিকায় স্থান দিয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশে তাকে নিয়ে খুব বেশি কথাবার্তা শোনা যায় না। আর্ট কলেজে থাকার সময় ষাটের দশকে একটা গ্রুপ এক্সিবিশন হয়েছিল তার। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে সেটাই তার শেষ একজিবিশন। আর্টের লোকজন তাকে চেনে না তা নয়, যারা খোঁজখবর রাখার তারা জানেবৈশ্বিক ল্যান্ডস্কেপে আখতারুল ইসলামের অবস্থান কোথায়। কিন্তু তাকে নিয়ে বাংলাদেশী মিডিয়াতে কোনো আলাপ-আলোচনা হয় না। এখানকার বড় বড় শিল্পীরা পারতপক্ষে তার নাম মুখে আনে না। কেউ কেউ বলেন, এখানকার শিল্পীরা তাকে হিংসা করে। এমনকি তাকে নিয়ে ঢাকার কেউ কথা বলুক সেটাও তারা চায় না। ফলে আখতারুল ইসলাম বাংলাদেশী আর্টিস্ট হলেও তাকে প্রায় অচেনা বিদেশি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে বহুদিন যাবত। ইদানিং হঠাৎ করে কিছু কথাবার্তা শুরু হয়েছে। গত বছর গ্রেটেস্ট লিভিং আর্টিস্টদের আঁকা যুদ্ধ বিষয়ক একটা গ্রুপ প্রদর্শনী হচ্ছিল অ্যামেস্টারডামে। সেখানে আখতারুল ইসলামের একটা ছবি খুব আলোচিত হয়। নিউ ইয়র্কারসহ বিভিন্ন পত্রিকায় ছবিটা নিয়ে আলাদা করে লেখালেখি হয়।

আখতারুল ইসলাম বিমূর্ত ধারার ছবি আঁকেন। তিনি বলেন, তার কাছে ছবি হলোমিউজিকের কাছাকাছি একটি মাধ্যম। ছবির মাধ্যমে তিনি সঙ্গীত সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। যুদ্ধের ছবিটাও ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু ওই ছবিটায় অনেকেই বাংলাদেশ খুঁজে পান। সেখানে যেন গীতার মতো করে বলা হয়েছিল, যুদ্ধ-হত্যা-মৃত্যুই আমাদের ভবিতব্য। এর থেকে মুক্তি নেই। যুদ্ধ আসলে ধ্বংসের মারফত নতুন কিছু সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও তাই। যুদ্ধ না হলে নতুন দেশ তৈরি হতো না। ফলে, এই নতুন বাংলাদেশ গ্রহণ করলে যুদ্ধটাকে তার থেকে আলাদা করতে পারি না আমরা।

ছবিটা নিয়ে কথাবার্তা এতই ছড়িয়ে যায় যে, বাংলাদেশের শিল্পবোদ্ধারাও আর চুপ থাকতে পারেনি। সংবাদ সাময়িকী ও ভোরের কাগজ সাহিত্য সাময়িকীতে আখতারুল ইসলাম ও তার ছবি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পত্রিকাগুলো প্রতিবেদনটা এমনভাবে প্রকাশ করে যেন, আখতারুল ইসলামকে তারা সদ্যই আবিষ্কার করেছে। বাংলাদেশের একজন শিল্পী হয়েও, ওয়েস্টে খ্যাতিমান হয়েও তিনি যে দেশে অপরিচিত সেটিই ছিল তাদের প্রতিবেদনের মুখ্য বিষয়। তারা যেন প্রথমবারের মতো এখানকার অডিয়েন্সের সঙ্গে শিল্পী আখতারুল ইসলামকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। একদিক থেকে অবশ্য এই প্রতিবেদনগুলো আবিষ্কারেরই শামিল। কেননা এগুলো প্রকাশের আগে আখতারুল ইসলামকে দেশের সাধারণ মানুষ তো বটেই, শিল্প-সাহিত্যের অধিকাংশ মানুষই চিনতো না। প্রতিবেদনের পর আখতারুল ইসলামকে নিয়ে ঢাকার শিল্পমহলে বেশ আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে যায়। ট্রাইঅ্যাঙ্গেল আর্ট গ্যালারিও মওকা বুঝে তাকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানায়।

৩১ বছর পর বাংলাদেশে এসেছেন আখতারুল ইসলাম। ট্রাইঅ্যাঙ্গেল আর্ট গ্যালারি তাকে একমাসের আর্ট রেসিডেন্সি দিয়েছে। গ্যালারির পক্ষ থেকে এটা সর্বোচ্চ সম্মান। এই এক মাস তিনি ঢাকায় থাকবেন। ধানমণ্ডির একটা বড় ফ্ল্যাটে। সেখানে বসে তিনি আঁকবেন। কক্সবাজারে আহসান ইকবাল মিঠুর ইকো রিসোর্টেও সময় কাটাবেন ইচ্ছা হলে। দেশে থাকার সময় তিনি যে ছবি আঁকবেন সেগুলোর প্রদর্শনী হবে ট্রাইঅ্যাঙ্গেল আর্ট গ্যালারিতে। এক মাসের বেশি সময় দিতে পারেননি আখতারুল ইসলাম। জুনের ২৬ তারিখে প্যারিস থেকে এসেছেন ঢাকায়। জুলাইয়ের ২৬-এ চলে যাবেন। ঢাকার শিল্পীরা যতই তাকে না চেনার ভান করে বালুতে মুখ গুঁজে থাকুক,  তিনি আসার পর থেকে শিল্প অঙ্গনে শোরগোল পড়ে গেছে। শিল্পীরা তো বটেই, বড় বড় আর্ট কালেক্টররাও ছুটে যাচ্ছে ট্রাইঅ্যাঙ্গেল আর্ট গ্যালারির স্বত্বাধিকারী আহসান ইকবাল মিঠুর কাছে। ভোরের কাগজ-ডেইলি স্টারসহ বড় পত্রিকাগুলো এরই মধ্যে তার সাক্ষাৎকার ছেপে ফেলেছে। তার সঙ্গে দেখা করার জন্য রাঘব-বোয়ালদের লাইন পড়লেও মিঠু ভাই খুব বেশি মানুষকে এলাউ করছেন না। উনি পাকা ব্যবসায়ী। এরই মধ্যে ট্রাইঅ্যাঙ্গেল বড় অংকের খরচ করে ফেলেছে। এই খরচ ওঠাতে হবে আখতারুল ইসলামের ছবি বিক্রি করে। আখতারুল ইসলাম ছবি না এঁকে লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে থাকলে মিঠু ভাইয়ের লোকসান। অবশ্য এক মাস ব্যয় করে তিনি একটা ছবি আঁকলেই আর কিছু লাগবে না। একটা ছবি দিয়েই মিঠু ভাই পুরো বছরের ব্যবসা করে ফেলতে পারবে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কারো কালেকশনে আখতারুল ইসলামের ছবি আছে বলে আমরা শুনি নাই। বাংলাদেশের বড় কালেক্টরদের জন্যও তার ছবি এক্সপেন্সিভ।

আখতারুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাবটা আমিই কায়সারকে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, এটা আমাদের জন্য একটা সুযোগ। বড় শিল্পীদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটা ইন্টারভিউ তো আমরা করবোই। কিন্তু এই সময়ের উল্লেখযোগ্য লেখক ও আর্ট ক্রিটিক হিসেবে তার সান্নিধ্যে আমাদের কিছুটা সময়ও কাটাতে হবে। এই বিরল অভিজ্ঞতা আমাদের ঝুলিতে যুক্ত করা জরুরি। অনেককে না করলেও মিঠু ভাই কায়সারকে না করতে পারেনি। কারণ তরুণদের মধ্যে কায়সার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পবোদ্ধা। তার একটা নিজস্ব গ্যাং আছে। মিঠু ভাই তাকে একরকম ভয়ই পায়। নিজে প্রভাবশালী সমঝদার, আর্ট গ্যালারির মালিক, কালেক্টর ও শিল্পপতি হলেও তাকে সমঝে চলে। কায়সার আর তার লোকজন মিলে যে কোনো সময় আর্ট-কালচার অঙ্গনে হাউকাউ লাগিয়ে দিতে পারে।

আখতারুল ইসলামের সঙ্গে কোনোভাবে দেখা করা যায় কি নাএ প্রস্তাব দিতেই কায়সার বলেছিল, দেখা তো হলো পরশু। ঢাকায় ওনার রিসেপশন উপলক্ষে শেরাটনের বল রুমে একটা পার্টি দিয়েছিল মিঠু ভাই। সেখানেই দেখা হলো।

কেমন লোক উনি?

কে? আখতার ভাই? অমায়িক লোক। তবে মিতভাষী। তেমন একটা কথা বললো না। আর্ট-কালচারের কুতুব মিনাররা ঘিরে ধরে তার ছবি নিয়ে কথা বলছিলপ্যারিসে, নিউইয়র্কে কোথায় কোন প্রদর্শনীতে কোন ছবি দেখেছে। উনি মন দিয়ে শুনছিল।

আমি গিয়ে নিজের নাম বলে পরিচয় দিলাম। একটু হাসলো। আমার নাম-পরিচয় দিয়ে ওনার কী কাজ বলেন তো? উনি তো বাংলাদেশের পার্সপেক্টিভে বাস করেন না।

দেখেন না ওনার একটা ওপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায় কি না।

না পাওয়ার কিছু নাই। মিঠু ভাইরে বললেই হবে। মিঠু ভাই না করতে পারবে না। আপনি তো জানেন, উনি গারো পাহাড়ে একটা রিসোর্ট করছে মান্দিদের জায়গা দখল করে। এখন আমরা যদি কথা তুলি যে, আদিবাসীদের জমি দখলকারী ঋণ খেলাপী আহসান ইকবাল মিঠুর রেসিডেন্সি নিয়ে ঢাকা আসছেন আখতারুল ইসলাম, তাহলে ইন্টারন্যাশনাল প্রেসের কাছে কী বার্তাটা যাবে? ওনার মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না। থাকবে? মিঠু ভাই এটা জানে। কক্সবাজারের ইকো-রিসোর্টও তো দখল করা জমিতে। আপনি চিন্তা করবেন না, মঈন। হয়ে যাবে। 

অফিস থেকে রাস্তায় নেমে দেখলাম, কাওরান বাজারেই হাঁটু সমান পানি জমে গেছে। কাওরান বাজার থেকে ফার্মগেট পুরো রাস্তা থৈ থৈ পানিতে ডুবে আছে। পানি পেয়ে মাটির নিজে চাপা পড়া সুপ্ত নদী যেন মাটির ওপর দিয়ে উঁকি দিয়েছে।

আমি বললাম, বৃষ্টি কি আগে থেকে হচ্ছে নাকি মাত্র শুরু হওয়া বৃষ্টিতেই এত পানি হলো?

কায়সার আমার দিকে তাকালো অসহায়ের মতো। সে এখনও ভয় পাচ্ছে, আমি না যাওয়ার জন্য গোঁ ধরে বসতে পারি।

পানি কি আকাশ থেকে পড়লো নাকি বুড়িগঙ্গা থেকে ঢল হয়ে উঠে এলো? আমি আবার বললাম।

অফিসের নিচে সিএনজি-রিকশা কিছু নাই। কায়সার একটা মুদি দোকান থেকে দুইটা পলিথিন চেয়ে আনলো।

বললো, মানিব্যাগ-রেকর্ডার-কাগজপত্র এটার মধ্যে ঢোকান। চলেন হাঁটা দেই।

পানি ভেঙে কাওরান বাজার থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত গিয়ে মোহাম্মদপুরের একটা বাসে উঠতে পারলাম কোনোরকমে। বাসের পাদানি পর্যন্ত পানি। ভেতর অনেক মানুষ ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে। সবাই কাক ভেজা। আসাদ গেটে নেমে একটা রিকশা পেলাম। রিকশা অর্ধেক ডুবে ডুবে আন্দাজ করে করে চলতে থাকলো। ধানমণ্ডি ২৭ হয়ে আমরা যখন আখতারুল ইসলামের স্টুডিও-কাম বাসায় পৌঁছালাম তখন আমাদের আন্ডারওয়্যার পর্যন্ত ভিজে গেছে।

আখতারুল ইসলাম আমাদের দেখে বললো, তোমরা দুইটা করছো কী? আমি কি বাইরের লোক নাকি? শহর ডুইবা গেছে এইটা কি আমি বুঝবো না? আমারে একটা ফোন দিতা। ফোন দিয়া কালকে একটা টাইম নিয়া নিতা।

কায়সার বললো, আপনার প্রতি মিনিটের দাম লাখ টাকা, ভাই। তাছাড়া মঈন মিস দিতে চাচ্ছিল না। ও বললো, ঝড়-বৃষ্টি-ভূমিকম্প যাই হোক আখতার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতেই হবে।

উনি কায়সারের কথার উত্তর না দিয়ে ঘরে গিয়ে দুইটা তোয়ালে এনে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিলেন।

বললো, গা মুইছা ওই তোয়ালাই পইরা নাও। শার্ট-প্যান্ট খুইলা ফ্যানের নিচে শুকাতে দিয়া আসো। শোনো আগে মাথাটা ভাল কইরা মুইছা নিও।

আমরা তোয়ালে পরে খালি গায়ে আখতার ভাইয়ের সামনে আসতেই দুটো মগ এগিয়ে দিয়ে তিনি ফ্ল্যাক্স থেকে পানি নিয়ে কফি বানাতে বললোচিনি কফি গরমপানি সবই আছে। বানায়ে নাও।

তোমরা করছো কী, মিয়ারা। পানিতে ডুইবা গেছে না সব? আইলা কেমনে?

কায়সার তাকে পথের বর্ণনা দিল। শহর কেমনে ডুবে গেছে দৃশ্যগুলোর বর্ণনা শুনে আখতার ভাইয়ের চোখ চকচক করতে থাকলো।

বললো, সত্যি কথা বলতে তোমরা আসায় আমি খুশি হইছি। জানালা দিয়া একা একা বৃষ্টি দেইখা বিক্রমপুরের কথা মনে হইতেছিল খালি। বিক্রমপুরে কতদিন যাই না। বিক্রমপুরের বর্ষা দেখছো তোমরা? দেখো নাই। ওইরকম বৃষ্টি দুনিয়ার কোথাও পাইবা না। ঝরতেছে তো ঝরতেছেই। নদী পুকুর খাল বিল ভইরা উঠতেছে। ঘাসের ওপর পানি উপচাইতেছে। ঘন গাছপালার ভেতর অবিরাম বৃষ্টি আর বাতাস বইতেছে। এই দেইখা তোমার মন হু হু কইরা উঠবে। হাহাকার জাগানিয়া বৃষ্টি। তোমরা না দেখলে মিস করছো।

তোমাদের একটা মজার জিনিশ দেখাই, আসো।

আমি আর কায়সার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকলাম কফির কাপ হাতে তার পেছনে যেতে যেতে। এত সহজ-সরল মানুষ হয়?

আখতার ভাই আমাদের পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটা বেডসাইড টেবিলের পাশে একটা পুরনো দিনের অ্যালবাম।

আমাদের হাতে দিয়ে বললো, দেখো। ভাল কইরা দেখবা।

বেশ কয়েকটা শাদাকালো ছবি।

আকাশে হালকা মেঘ।

আস্তে আস্তে মেঘ বাড়ছে।

মেঘ ঘন হচ্ছে।

ঘন কালো হয়ে আসছে আকাশ।

বৃষ্টি নামবে নামবে।

বৃষ্টি নামলো।

মেঘ স্থান বদল করছে।

বৃষ্টির ঘনধারার মধ্যে মেঘ আর দেখা যাচ্ছে না।

পরপর সাজানো ২১টা ছবি।

কায়সার বললো, আখতার ভাই এই ছবি আপনি কোথা থেকে তুলেছেন?

এইগুলা বিক্রমপুরের। আব্বা আমাকে একটা ইয়াসিকা ক্যামেরা কিনে দিছিল। সেটা দিয়ে তোলা। আমি তখন আর্ট কলেজে। একবার বাড়ি গিয়া বৃষ্টির দিনে পুরো রিল শেষ করছিলাম। এক রিলে কয়টা ছবি হইতো জানো? ২৯টা। এইখানে আছে ২১টা। বাকী ছবিগুলা আউট অব ফোকাস হয়ে গেছিল।

আমি যেখানেই যাই এই ছবিগুলা সঙ্গে রাখি। ৩১ বছর হয় বিক্রমপুর দেখি না। ছবিগুলা দেখলে আমার মনে হয়, বিক্রমপুরে ওই দিনটায় ফিরা গেছি। এইবারও দেশে আসার ইচ্ছা ছিল না, বুঝলা। তোমাদের মিঠু মিয়া কাঁঠালের আঠা। সে বহু বছর ধইরা আমার পেছনে লাইগা আছে। প্যারিস গেলেই দেখা করে। অনেকদিন ধরে বলতেছে, বাংলাদেশে আসেন। প্রায়ই ফোন দিয়া ঘ্যানঘ্যান করে। এবার ওরে কইলাম, গেলে বর্ষাকালে বাংলাদেশ যাবো। তুমি ব্যবস্থা করো।

কায়সার বললো, বিক্রমপুর যাবেন নাকি?

ওইখানে আর কেউ থাকে না। আমি দেশে থাকতেই চাচাদের লগে ঝগড়া কইরা আব্বা জমিজমা বিক্রি কইরা ঢাকা চইলা আসলো। এখন মনে হয় সেই বাড়িও নাই। আগের সেই গ্রাম নাই। মাথার মধ্যে যে বিক্রমপুর নিয়া আমি ঘুরতেছি সেইটা কি দেখতে পাবো। ওইখানে যাওয়ার কথা চিন্তা করলে ভয় লাগে। আমি আর্টিস্ট মানুষ। বুঝলা, ওই সময় মাথার মধ্যে বিক্রমপুরে একটা ছবি আঁইকা নিছি। সেই ছবি নিয়া আমি ঘুরতেছি। আর আছে এই কয়টা ছবি।

অ্যালবামটার দিকে তাকিয়ে থাকলো আখতার ভাই।

আমরা আপনারে নিয়া যাবো। কায়সার বললো।

রাখো। বিক্রমপুর গিয়া মনের মধ্যে আঁকা পুরানা ছবিটা হারানোর দরকার আছে?

আমাকে চুপচাপ দেখে আখতার ভাই বললো, মঈন, তুমি কথা কও না কেন?

এত বড় আর্টিস্টের সামনে খালি গায়ে বসে আছি ভাবতেই পারছি না। আপনার পেইন্টিং দেখার সুযোগ হয়নি সরাসরি। ওয়েবসাইটে দেখছি। আপনি শুধু বিখ্যাত না, মহান শিল্পী।

দূরো মিয়া, কি কও। কায়সার কইলো, তুমি লেখক মানুষ। শোনো, লেখক হিসাবে এইগুলা গুনবা না। আমি আখতার হই আর পিকাসো হই। তুমি-আমি-আমরা দিন শেষে শিল্পী। দুনিয়ার সব শিল্পী একদিক দিয়া সমান। দুনিয়ার এমন কিছু রহস্য আমরা জানি যা অন্য কেউ জানে না। তুমি কী কও কায়সার?

আমার মতো কায়সারও একটু হতভম্ব হয়ে আছে। এত বড় শিল্পী কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের ভাই-ব্রাদার হয়ে গেছে কেমনে সেটা সেও বুঝে উঠতে পারছে না।

আখতার ভাই বললো, কুকিস খাইবা নাকি? মিঠু অনেক কুকিস দিয়া গেছে। গুলশানের কোন বেকারিতে নাকি ফ্রান্সের কোনো শেফ বিস্কুট বানায়। আমি তো হাইসা শেষ। আমি মিঠুরে কইলাম, তুমি আমারে কী ভাবছো মিঠু মিয়া? আমি বাংলাদেশের লোক। আমারে দেশি জিনিশ খাওয়াও।

কুকিজের সুন্দর একটা কাঁচের বৈয়াম টেবিলে রেখে আখতার ভাই বললো, এইখানে আইসাও যদি প্যারিসের শেফের বানানো জিনিশ খাইতে হয় তাইলে হবে? দেশে আসছি, দেশি জিনিশ খাবো।

কায়সার বললো, দেশে আইসা কি আঁকতে পারলেন কিছু?

আখতার ভাই বললো, আমি কি আঁকার জন্য আসছি নাকি? আসার আগে মিঠুরে বলছি, আঁকার জন্য আমারে চাপ দিবা না। আমি আসছি বর্ষা দেখতে। বাংলাদেশের বর্ষা কতদিন দেখি না। নীরোদ বাবু কী কইছিল জানো, জল দেখিলে প্রবাসীর দেশের কথা মনে হয়।

আমি বললাম, কিশোরগঞ্জের বর্ষার যে বর্ণনা উনি দিছে।

আখতার ভাই খুব খুশী হয়ে বললো, পড়ছো তুমি? তোমাদের লগে আমার মিলবে, বুঝলা? শোনো আজকে তোমরা ইন্টারভিউ নেওয়ার চেষ্টা করবা না। ইন্টারভিউ আমি আরেকদিন দেবো। একমাস দেশে আছি। দেখা-সাক্ষাৎ হইতেই থাকবে। টেনশন নিও না।

কায়সার বললো, আপনার ছবিতে কিন্তু জলের ব্যাপারটা আছে। একটা মরমিয়া দর্শন আছে। খুব সাইলেন্টলি বাংলার জল ও জীবনের আবহ টের পাওয়া যায়।

আখতার ভাই বললো, বাংলা তো আমি ছাড়ি নাই। নিয়া বেড়াইতেছি।

মাথায় আঙ্গুল দিয়ে বললো, এইখানে কইরা নিয়া বেড়াইতেছি। ছবি দেখলে খালি চোখে তো তুমি কিছু পাইবা না। কোনো ফিগার নাই। কোনো দৃশ্য নাই। যে জল দেখেছে সেই বুঝবে জল আছে। যে বাংলার মরমিয়া ভাবটা বোঝে সে সেই ভাবটা পাবে কালারের মধ্যে, রেখার গতির মধ্যে। ইউরোপীয়রা জিনিশটা নিয়া একটা ধাঁধার মধ্যে থাকে। আমি খালি ওদের ফর্মটা নিছি। ওরা দেখে, আমি ওদের ফর্মে বেস্টটা দেই। কিন্তু কন্টেটে ঢুকতে গিয়া বোঝে এইটা ওদের কাছে অচেনা। এইটা কোথা থেকে আসলো? খুঁজতে গিয়া ওরা আমার ছবির মধ্যে হারায়ে যায়। তুমি যদি সব বুইঝা যাও তাইলে তো তুমি বুইঝা গেলাই। আরও গভীরে গিয়া বোঝার চেষ্টা তোমার মধ্যে আর থাকবে না। এই জন্য একটা রহস্য দরকার হয়। মানুষ আমার মধ্যে আছে। মানুষের চিন্তাধারা আমি বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু আমার মধ্যে বোঝা না বোঝার একটা রহস্যও আছে। এটা হয়তো আমার ভেতর থেকে আসে। সেইটারে আমি নিজেও ব্যাখ্যা করতে পারি না। বুঝলা মঈন, শিল্পী যদি সব বুইঝা ফেলে তাইলে হয় না। কিছু কিছু জিনিশ বুঝার বাইরে রাখতে হয়। আমাদের কাজ হইলো, না বুইঝা ডুব দেওয়া। ব্লাইন্ড খেলতে না পারলে তুমি আর্টিস্ট হইতে পারবা না। সব জানলে তুমি নিজের অজান্তে জাজমেন্টাল হয়ে যাবা। তুমি হইবা গিয়া সমালোচক।

আমি বললাম, আপনি কখনো ফিগারেটিভ কিছু মনে হয় আঁকেন নাই?

আখতার ভাই বললো, আমি তো পোস্ট এক্সপ্রেশনিস্টদের দলে চইলা গেলাম। মেলাদিন অ্যাবস্ট্রাক্ট আঁকছি। এখন আবার অ্যাবস্ট্র্যাক্ট অ্যান্ড ফিগারেটিভের মিশ্রণটা ফিরে আসতেছে। কিন্তু, সরাসরি ফিগার আমি ওইভাবে আঁকি নাই আসলে। মানে আমার আঁকা ফিগারেটিভ ছবি লোকে দেখে নাই। ধরো, পাবলিকলি কেউ দেখে নাই যে, আমি কারো পোর্ট্রেইট করছি। কিন্তু নিজের হাতে তো কিছু জিনিশ রাইখা দিতে হয়। দুনিয়ার সবাই জানে তুমি এই একটা কাজ করো না। তুমি সবার চোখের আড়ালে সেই জিনিশটা করতে থাকলা। এই কন্ট্রাডিকশনটা শিল্পীদের মধ্যে থাকে। আসো তোমাদের একটা জিনিশ দেখাই।

আখতার ভাই আমাদের তার স্টুডিওতে নিয়ে গেলেন।

তোয়ালা সামলাইও মিয়ারা। কী যে একটা ভিজা দিছো। অবশ্য ভিজাই উচিত। এই বয়সে না ভিজলে আর ভিজবা কখন। তোমাদের দেইখা আমারও ভিজতে ইচ্ছা করতেছিল। কী মজাটা তোমরা মারলা আমারে দেখায়ে দেখায়ে। বয়সটা একটু কম হইলে কইতাম, চলো আবার বের হই। এক ভিজা দিয়া আসি। কিন্তু এখন ভয় ধরছে। আমার শরীর তো আর দেশের পানি চিনে না, বুঝো না? ভিজলে জ্বরজারি হইতে পারে। তাই আর কইলাম না। তবে ভিজে আইসা তোমরা আমার মন জয় কইরা নিছো।

স্টুডিওতে ঢুকেই আমরা অবাক। বড় ক্যানভাসে এক নারীর ছবি ফুটে উঠতেছে। এখনও পেন্সিলের দাগ পুরো ক্যানভাসে। শুধু গলার জায়গাটায় রংয়ের ছিটা বসেছে।

কায়সার বললো, এইটা কী ফুমাতো টেকনিক? আপনি প্রোর্ট্রেইট করতেছেন?

তোমরা আমার মন জয় কইরা নিলা মিয়ারা। দেইখাই বুঝলা ফুমাতো করতেছি?

আমি বলি, আর্ট রিভিউতে আপনার ওপর লিখেছিল। সেইখানে তারা বলছে, আখতারুল ইসলাম কখনো পোর্ট্রেইট করেন নাই।

রাখো, তোমার আর্ট রিভিউ। তোমাদের একটু আগে কী কইলাম? আমার কথার চাইতে কাগজের কথা বড় মনে হইলো? বিদেশি কাগজে লিখছে বলে বিশ্বাস করলা? দেশে আসছি না? দেশে তো নতুন কিছু করতে হবে। ভাল কইরা দেখো। চিনছো মেয়েটারে?

কায়সার বললো, চেনা চেনা লাগে। কোথায় যেন দেখছি।

দেখছো তো অবশ্যই। এইটা খাতাটা দেখো। বলে আখতার ভাই তার স্কেচ বুকটা আমাদের দিকে বাড়িয়ে দেন। এই ছবি আঁকার জন্য ইতিমধ্যে প্রায় ৫০টা স্কেচ করেছেন মেয়েটার। বোঝা যায়, ভাল স্ট্যাডি করেছেন অল্প সময়ে।

কাউরে কইবা না কিন্তু। মিঠু যেন কোনোভাবে না জানে, কায়সার।

সুহাসিনী রহমান? আমি বললাম স্কেচগুলো দেখতে দেখতে।

ঠিক ধরছো। প্যারিসে থাকতে সুহাসিনীর গান আমি নিয়মিত শুনতাম। ওর চোখ দেখছো? স্মোকি আইজ। বড় বড় ভাসা ভাসা চোখ। যখনই দেখবা মনে হবে মাত্র ঘুম থেকে উঠলো। সবসময় একটা হাসি লেগে থাকে, সাথে একটা বিষণ্ণতার ছায়া। চোয়াল দেখো। না হাসলেও মৃদু একটা হাসি যেন ছুঁয়ে আছে চিবুকে। লঙ লেগস, টল, আঁকাবাঁকা ফিগার। আমি ভাবতাম দেশে আইলে, ওর লগে আলাপ করবো। শেরাটনের অনুষ্ঠানে তো মঈন যাও নাই, কায়সার গেছিল। ওইখানে দেখি সুহাসিনী গান করতেছে। আমি মনে মনে কই, মিঠু হালার পো করছে কী? আমি মনে মনে সুহাসিনীর লগে আলাপ করার জন্য বেচইন হয়ে আছি। ডিনারের সময় সে নিজেই এগিয়ে এসে বললো, আপনার ছবি আমার এত ভাল লাগে। আমি যদি আপনার মতো আঁকতে পারতাম।

আমি কই, আঁকবা। সমস্যা কী? আমি যে কয়দিন আছি ফাঁকে ফাঁকে আইসা শিখে নিও। আমি তোমারে গোপন কিছু টেকনিক শিখায়ে দেবো। আমি ভাবছি, কথার কথা কইছে মেয়েটা। বিখ্যাত শিল্পী না? দেশে তো এক নাম্বারে ওই এখন। ভুল কইলাম? আসবে না জাইনাও ঠিকানা দিয়া রাখছিলাম। বলছিলাম, সন্ধ্যার পর আসবা। পরদিন সন্ধ্যায় দরজা খুলে দেখি শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে সুহাসিনী। পৃথিবীর সেরা সুন্দরীদের একজন।

আখতার ভাই আমাদের দিকে তাকিয়ে থামলো। কিছুক্ষণ পর বললো, আজকে রাতে আবার আসবে।

এই বৃষ্টির মধ্যে?

আসবে তো কইলো। ধানমণ্ডিতে আশেপাশেই কই যেন থাকে। ভাপা ইলিশ রান্না কইরা আনবে। তোমরা থাকলে খাইতে পারতা। কিন্তু তোমাদের সামনে সুহাসিনী সহজ হইতে পারবে না। তাই খাওয়ার কথা বলতে পারতেছি না।

আমাদের সঙ্গে আখতার ভাইয়ের কথা আর ফুরাচ্ছিল না। কিন্তু সুহাসিনী যেহেতু আসবে, আর আমাদের দেখলে বিব্রত হবে, তাই আমরা দ্রুত আখতার ভাইয়ের বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামলাম।

বৃষ্টি তো চলছেই, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঝড়ো বাতাস।

নিম্নচাপ হলো নাকি? কায়সার বললো।

আমি বললাম, রাখেন আপনার নিম্নচাপ। আপনি ভাবতে পারছেন, সুহাসিনী রহমানকে অল্পদিনে পটিয়ে ফেলেছে আখতার ভাই?

কায়সার নির্লিপ্তভাবে বললো, আপনার ভাল লাগে নাকি ওনাকে?

শুধু ভাল লাগে? সুহাসিনী আমার ক্র্যাশ। আখতার ভাই আর কয়টা গান শুনছে সুহাসিনীর। আমি ওর সব গান শুনছি। ওর গান না শুনলে আমার মাথাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কী কণ্ঠ, কী গায়কী। আর দশজনের মতো গলা দিয়ে না, হৃদয় দিয়ে গায়। আপনি ভাবতে পারছেন, কায়সার? এই জল-বৃষ্টির দিনে সুহাসিনী নিজের হাতে ভাপা ইলিশ রান্না করে ভিজতে ভিজতে আখতার ভাইয়ের দরজায় কলিং বেল বাজাবে একটু পর। বৃষ্টিভেজা সুহাসিনীকে দেখে আখতার ভাই কী করবে? তোয়ালে এনে নিজের হাতে মাথা মুছিয়ে দেবে। মুখ মুছিয়ে দেবে। গলা মুছিয়ে দেবে। তারপর বলবে, সব খুলে তোয়ালে পরে নাও। কল্পনা করতেই তো আমার কান গরম হয়ে যাচ্ছে।

কায়সার বললো, আপনার কি ঈর্ষা হচ্ছে?

আমি বলি, ঠিক ঈর্ষা না। ব্যাপারটা যে কী? খানিকটা উত্তেজনাও হচ্ছে। বুঝতে পারছি, ম্যাচটা ভাল হয়েছে। একজন গ্রেট শিল্পীর সঙ্গে একজন বেস্ট গায়িকার জুটি। বলে না, গঙ্গা-যমুনার মিলন? পরের দৃশ্যগুলো আমি ভাবতে পারছি না, কায়সার।

কী ভাবতে পারছেন না?

এতক্ষণে হয়তো সুহাসিনী পৌঁছে গেছে আখতার ভাইয়ের ফ্ল্যাটে। আখতার ভাই আয়েশ করে গন্ধ ওঠা ভাপা ইলিশ দিয়ে ভাত খেতে শুরু করেছে।

কায়সার বললো, আপনি কিন্তু অনেক বেশি ভাবছেন, মঈন। আপনার কি মনে হয়, এই বয়সে আখতার ভাই কিছু করতে পারবে? এত বয়সে অভ্যাস থাকে?

কী বলেন আপনি, আর্লি এজ থেকে প্যারিসে থাকে। পৃথিবীর বেস্ট ফল-মূল খায়। একটু ভুড়ি হলেও কেমন গোছানো শরীর দেখলেন না? সকাল-বিকাল ওয়ার্ক আউট করে। আমার তো ধারণা ভদ্রলোক এখনও দারুণ চোদেন।

আমার মুখে চোদেন কথাটা শুনে অপেক্ষাকৃত ভদ্রলোক কায়সার হতচকিত হয়ে যায়।

সে হয়তো হবে। কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজে ভাপা ইলিশ নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সুহাসিনী আখতার ভাইয়ের ওখানে যাবে সেটা বোধহয় নাও হতে পারে।

কেন এই ধারণা হলো আপনার?

আমরা আখতার ভাইয়ে গলি থেকে বেরিয়ে মিরপুর রোডের দিকে এগুনোর সময় একটা চকলেট কালারের এলিয়ন গাড়ি গলি ধরে যাচ্ছিল, দেখেছেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকার লাগানো সামনের উইন্ড শিল্ডে?

না তো।

দেখার কথা নয়। আপনি তখন ভাবছেন, আখতার ভাই সুহাসিনীকে নিয়ে কীভাবে কী করবে। ওই গাড়িটাতেই সুহাসিনী বসা ছিল।

বলেন কী?

হা।

সুহাসিনী এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। অধ্যাপক আইনুদ্দিন ভিসি হয়েই তাকে নিয়েছেন গানস অব নাভারন বিভাগে। এটা নতুন সাবজেক্ট। শোনা যায়, সুহাসিনী বেগম আইনুদ্দিনেরও খুব ঘনিষ্ট।

আমি বললাম, কায়সার আপনি তো ভাল লোক নন। আমার কল্পনাটা নষ্ট করে দিতে চাইছেন। আমি কোথায় বিউটি অ্যান্ড বিউটি কম্বিনেশন নিয়ে ভাবছি, আর আপনি বিউটি অ্যান্ড বিস্ট কম্বিনেশন আনলেন এর মধ্যে।

কায়সার হাসে।

রূপকথার বিস্ট কিন্তু আসলে বিস্ট না। নায়িকা তাকে চুমো দিলে সেও বিউটিফুল রাজপুত্র হয়ে ওঠে। সুহাসিনী চুমো দিলে আইনুদ্দিনের সুদর্শন রাজপুত্র হয়ে উঠতে কতক্ষণ লাগে?

আমি বললাম, আমাকে ভাবতে দেন তো। সুহাসিনী তো ভেজা থাকবে না। দরজা খুলে আখতার ভাই তাকে শুকনাই পাবে। আখতার ভাই কী করবে তখন? তাকে দরজায় ঠেসে ধরবে? নাকি স্টুডিওতে নিয়ে যত্ন করে বসিয়ে শাড়ি খুলতে খুলতে ওর শরীরের বিভঙ্গগুলো স্ট্যাডি করতে থাকবে?

 

অনেক ভেবে আমি কায়সারকে ফোন দিলাম। এখন আর্ট ক্রিটিকের বাতিক মাথা থেকে নামিয়ে পুরোদস্তুর আর্কিটেক্ট বনে গেছে। বনানীতে নিজের ফার্ম দিয়েছে। ঢাকার মার্কেটে তার ভাল ডিমান্ড। আয়-রোজগার বাড়ার পর আর্ট কালেক্টর বনে গেছে। শোনা যায়, ভেতরে ভেতরে তার কালেকশন এখন মিঠু ভাইকেও ছাড়িয়ে গেছে। ঢাকার এলিট আর্ট কালেক্টররা তাকে খাতির করে চলে।

ফোন ধরেই কায়সার বললো, কী খবর লেখক। এতদিনে আমাকে মনে পড়লো?

মনে তো পড়েই। কিন্তু ব্যস্ত আছেন নাকি ফ্রি তা তো বুঝতে পারি না।

আপনার এই এক সমস্যা। নিজে থেকে কত কিছু যে ভেবে রাখেন। আমি ব্যস্ত আছি না ফ্রি আছি এটা আপনার ভাবার দরকার কী? ফোন দেবেন।

শোনেন, বড় খবর আছে। আপনার সেই বৃষ্টির সন্ধ্যার কথা মনে আছে? আখতার ভাইয়ের ওখানে যে গেলাম?

সে কি ভোলা যায়? সব ডিটেইল মনে আছে। আপনার কাল্পনিক কথাবার্তাসহ। এই বৃষ্টি দেখে আপনার সেদিনের কথা মনে হলো নাকি? এত বছরেও দেখেন ঢাকার জলাবদ্ধতা দূর হলো না। ২০ বছর হয়ে গেছে না? বৃষ্টিতে কিন্তু শহর আজও  ডুবলো।

বৃষ্টির জন্য না আসলে। আখতার ভাইয়ের আঁকা আরেকটা পোর্ট্রেইটের খোঁজ পাওয়া গেছে। সেটা জানাতেই আপনাকে ফোন দিলাম।

কী বলেন? আপনি কোথায়? হোয়াটসঅ্যাপে লোকেশন শেয়ার করেন। আমার ড্রাইভার নিয়ে আসবে আপনাকে। আপনি রেডি হয়ে চলে আসেন। কোথাও বসে কফি খেতে খেতে গল্পটা শুনি। আসার সময় আপনার বাঘা তেঁতুল উপন্যাসটা নিয়ে আসবেন।

চারদিকে তো পানি। আমার গলিতেই কোমর পানি। গাড়ি আসবে?

আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি শুধু লোকেশন শেয়ার করে রাখেন।

আমি শেভ করে, গোসল সেরে একটা খামে বাঘা তেঁতুল উপন্যাসটা নিলাম। রেডি হয়ে ফেসবুক চেক করতে বসেছি, অমনি আননোন নাম্বার থেকে ফোন।

স্যার, আমি আপনার বাসার নিচে। কায়সার স্যার পাঠাইছে।

জানালা দিয়ে দেখলাম, বাসার নিচে মিনিবাসের সমান একটা প্রাডো গাড়ি দাঁড়ানো। কোমর সমান পানি গাড়িটাকে কাবু করতে পারেনি।

কায়সারের অফিসের কফি কর্নারে বসে কফি খেতে খেতে গল্প শুরু করলাম আমরা। দুপুরের খাবারের অর্ডারও দিয়ে রাখলো কায়সার। বাঘা তেঁতুল উপন্যাস নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলো।

আপনার উপন্যাস আমার ভাল লাগে, মঈন। যৌনতা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কিন্তু গভীর। বাস্তবে আপনি যতটা কল্পনাপ্রবণ, উপন্যাসে কিন্তু ততটা নন। খুবই যৌক্তিভাবে যৌনতাকে ডিল করতে পারেন।

আপনি তো একেবারেই উল্টো। যৌনতা নিয়ে আপনাকে কখনোই অতো ইন্টারেস্টেড দেখা যায় না।

কায়সার রহস্য করে  বললো, এখন বোধহয় খানিকটা পরিবর্তন এসেছে।

শুনে আমি একটু হাসি।

অনেকদিন পর দেখা। আমরা পুরনো দিনের কথাবার্তা ঝালাই করি। ধীরে ধীরে কফি খাই। বাইরের বৃষ্টি দেখি। কফি কর্নারে সাজানো পাইন আর ফার্নের টবগুলোতে বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছে।

আমি অধীর হয়ে আছি তাকে আখতার ভাইয়ের ছবির গল্প বলবো বলে। কিন্তু পুরনো দিনের কথা বলতেই তার ভাল লাগছে যেন। আমারও খারাপ লাগছে না। সময় তো পড়ে আছে। বৃষ্টি একটা অলস দিন দিয়েছে ব্যস্ত কায়সারকেও হয়তো।

আমি বলি, আপনি সবসময় খুব প্যাশনেট। আপনার অভিনিবেশের কারণেই আখতার ভাইয়ের মনে আমরা ছাপ ফেলতে পেরেছিলাম। আপনি জোর না করলে আমরা কিন্তু বিক্রমপুর যেতাম না।

কায়সার বললো, ওরকম আরেকজন গ্রেট শিল্পী আমরা আর কোথায় পাবো বলেন? পিকাসোকে তো আমরা দেখিনি। আখতারুল ইসলামকে দেখেছি। কেমন সহজ একজন মানুষ। কিন্তু জীবন সম্পর্কে কী গভীর উপলদ্ধি। আমার জীবনের মোড় তিনি কয়েকদিনেই ঘুরিয়ে দিতে পেরেছিলেন। হয়তো আপনারও।

প্রথমদিন আখতার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে ফেরার পর দুদিন কায়সারের সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। ঢাকা শহরের পানি তখনও পুরোটা নামেনি। শহর দেখে মনে হচ্ছিল মহাপ্লাবণ মাত্র শেষ হয়েছে। নূহের নৌকা থেকে একটা দুটো পাখি দূর থেকে গাছে পাতা সংগ্রহ করে জাহাজে ফিরে এসেছে। সেটা দেখে জাহাজের সকল প্রাণীর মধ্যে তীব্র উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে।

পানি পুরো নেমে যাবার পর কায়সার আমার অফিসে এসে হাজির।

শুক্রবার আমরা বিক্রমপুর যাবো। যতদূর শুনেছি, অতীশ দীপঙ্করের ভিটার খুব কাছেই ছিল আখতার ভাইদের বাড়ি। ওখানে ওনার চাচাতো ভাইরা আছে। আমরা দুজন শুক্রবার যাচ্ছি বিক্রমপুর।

আমি বললাম, যাওয়া যায় অবশ্য।

কায়সার বললো, অবশ্যই আমরা যাচ্ছি। শুক্রবার ভোরে। রোদ ওঠার আগেই বিক্রমপুর পৌঁছাতে হবে। বর্ষার রোদ কিন্তু সহ্য করা মুশকিল।

বিক্রমপুর গিয়ে কায়সার ঠিকই বের করে ফেললো আখতার ভাইদের পুরনো বাড়ি। তার দুই চাচা মারা গেছে। চাচাতো ভাইদেরও বয়স হয়েছে। তারা ঢাকায় থাকে। গ্রামে শুধু এক চাচাতো ভাইয়ের নাতি থাকে। আখতার ভাই সম্পর্কে তার দাদা। তার নাম জানে। কিন্তু তিনি যে পৃথিবী বিখ্যাত শিল্পী সেকথা সে জানে না। স্থানীয় এক সাংবাদিক আমাদের সঙ্গে ছিল বলে তার মন পেতে আমাদের সমস্যা হলো না। আমাদের ঘুরে ঘুরে পুরনো বাড়ি দেখালো। এই পরিবারের বেশির ভাগ লোক দেশের বাইরে থাকে। গ্রামে থাকার লোক নেই। ফলে, বাড়ির ওপর চাপ পড়েনি তেমন। পুরনো ঘর যেমন ছিল তেমনি রয়ে গেছে। আখতার ভাইয়ের বাবা ভাইদের কাছে যেমন বাড়ি বিক্রি করে ঢাকা এসেছিলেন বাড়ি তেমনই আছে।

আমাদের পরামর্শে গ্রামে থাকা সেই নাতি দাদা সম্বোধন করে আখতার ভাইকে চিঠি লিখলো। তাকে একবারের জন্য বিক্রমপুর ঘুরতে আসার নিমন্ত্রণ জানালো।

আমরা সেই চিঠি আখতার ভাইয়ের হাতে দেওয়ার পর আখতার ভাই বললো, করছো কি মিয়ারা। তোমরা দুইটা তো সহজ লোক না। তোমরা তো আমারে কিনা নিলা।

আমরা ভাবছিলাম, চিঠি পেয়ে আখতার ভাই আবেগে থরোথরো হয়ে কেঁদে ফেলবেন। কিন্তু তিনি সেটা করলেন না।

বললো, জীবনের দুঃখরে যেমনে নিছো, আনন্দরেও সেইভাবে নাও। তীব্র বেদনায় কান্না কইরো না, আবার বিপুল সুখেও উল্লাস কইরো না। জীবনে অনেক কিছু যেমন তুমি পায়া পায়া পরিণতির দিকে আসছো, তেমনি হারায়ে হারায়েও আসছো। কোন হিসাবটা তুমি রাখবা বলো? পাওয়ারটা না হারানোরটা? এইটাই জীবন।

আমরা তার দিকে তাকায়ে আছি দেখে বললো, তো কী? ডিসিশন হয়ে গেল। একটা বৃষ্টির দিন দেইখা রাইখো। বিক্রমপুরে বৃষ্টি হইলেই আমরা তিনজন চইলা যাবো। তোমরা খালি খোঁজ রাইখো, বিক্রমপুরের আকাশে মেঘ করছে কি না।

আমি স্টুডিওর দিকে ঘন ঘন তাকাইতেছি দেখে আখতার ভাই বললো, বুঝছি তো। কফি বানায়ে চলো। দেখাই কতদূর আগাইলো।

বড় ক্যানভাসে আজ অনেক রঙের ছিঁটা। পুরো এক আস্তর রং পুরো ক্যানভাস জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তার মধ্যে কিছু রং সুহাসিনীর গলা থিকে নিচের দিকে স্তনের আভাস তৈরি করছে।

আখতার ভাই বললো, ওইটা দেখে এখনই কিছু বুঝবা না। স্কেচ দেখো। আমরা দেখলাম সুহাসিনীর আরো কিছু স্কেচ তৈরি করেছেন আখতার ভাই। একটা স্কেচ দেখে আমার প্লীহা চমকে উঠলো। কায়সার সংকোচে আমার দিকে তাকাতে পারছে না। আখতার ভাই আমাদের মুখে দিকে তাকিয়ে হাসছেন।

আখতার ভাই সুহাসিনীর ভরাট স্তনের স্কেচ করেছেন। তারপরের স্কেচটা তার স্তন থেকে নাভি ছড়িয়ে আরো নিচ পর্যন্ত এঁকেছে। সবসময় শাড়িতে ফরমাল ভঙ্গিতে সেজে থাকে বলে বোঝা যায় না সুহাসিনীর শরীর কেমন ভরাট আর সুবিন্যস্ত।

আমি সাহস করে বললাম, এ কি আপনার কল্পনা না বাস্তব?

আখতার ভাই বললো, বাস্তব মানুষটা কাছে থাকতে আমি কল্পনা করতে যাবো কোন দুঃখে? মেয়েটা ভাল মেনটেন করে। সব একদম পার্ফেক্ট। স্তন দেখছো না? এরকমই ডাঁসা। আমি একটুও বাড়িয়ে আঁকিনি। কিছুই বাড়িয়ে আঁকিনি। তোমরা শিল্পী মানুষ। তোমরা তো বুঝবা। বহুদিন পর বাঙালি ফিগারটা সুহাসিনীর মধ্যে আমি পাইলাম। আদর্শ বাঙালি ফিগার। অনেকদিন ধরে খুঁজতেছি। তোমরা সুহাসিনীর স্কেচ দেখতেছ। আর আমি দেখতেছি ফার্স্ট সাইটে তোমাদের মধ্যে জেগে ওঠা বিস্ময়। সুহাসিনীর যে ছবিটা আমি আঁকবো, সেটা হবে বাঙালি জাতির জন্য একটা লাইফ টাইম শক। এটা আমি তোমাদের দুজনের এক্সপ্রেশন দেইখাই বুঝতেছি। তবে ছবিটা তো কেউ দেখবে না। আমি এইটা সুহাসিনীরে দিয়া যাবো। সে যদি কখনো প্রকাশ করতে চায় করবে। কিন্তু এই আর্টের সাক্ষী হিসাবে তোমরা দুইজন থাকলা। তোমাদের বিশ্বাস কইরা সাক্ষী বানাইলাম।

আখতার ভাইয়ের বাসা থেকে ফিরতে ফিরতে আমরা দুজন আলাপ করছিলাম, সুহাসিনীর ফিগার নিয়ে। মূলত আমি কথা বলছিলাম। কায়সার চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল।

কায়সার আগের দিনের মতো বলছিল, এই বয়সে আখতার ভাই কতটা আর কী করতে পারবে?

আমি জোর দিয়ে বলছিলাম, কীভাবে ডাঁসা শব্দটা বললো খেয়াল করেননি? এইসব স্কেচ করার সময় কী সিচুয়েশন তৈরি হয়েছিল আপনি কল্পনা করতে পারছেন? অবশ্যই কিছু একটা হয়েছে। আপনি আখতার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন? ওনার মধ্যে একটা তৃপ্তির হাসি লেগেছিল। আমাদের স্কেচ দেখিয়ে দেখিয়ে উনি সুখ পাচ্ছিলেন। দুজন তরুণকে তিনি দেখাচ্ছিলেন তাদেরই প্রিয় পরম আরাধ্য একজন গায়িকাকে তিনি কীভাবে এঁকেছেন, উপভোগ করেছেন। আপনি সেটা খেয়াল করেননি?

কায়সার খুব উদাসভাবে বললো, যৌনতা খুব রহস্যময় ও ব্যাখ্যাতীত ব্যাপার।

 

সেই ঘটনার কুড়ি বছর পর কায়সার আবারও একই ডায়ালগ দিলো। আমার বাঘা তেঁতুল বইটা হাতে নিয়ে বললো, যৌনতা খুব রহস্যময় ও ব্যাখ্যাতীত ব্যাপার।

আমি বললাম, কেন বললেন এই কথা। অনেক আগেও একবার আপনার মুখ থেকে একই কথা শুনেছিলাম।

আপনাকে দেখে সেই পুরনো কথাটা মনে পড়লো। এবার বলেন তো, আখতার ভাইয়ের আরেকটা ছবির খোঁজ আপনি কোথায় পেলেন?

আমি বললাম, আমার বন্ধু ময়মুনাকে কি আপনি চেনেন? আপনার চেনার কথা নয় অবশ্য। একটা ইন্টারন্যাশনাল এনজিওতে বড় পদে কাজ করে। চারদিন আগে সে আমাকে ফেসবুকে নক দিয়ে বললো, তৃণার ওয়ালে একটু যাবা? ও একটা লেখা লিখেছে পড়ো।

তৃষিতা তৃণা?

আমি অবাক হয়ে কায়সারের দিকে তাকাই। কায়সার ক বলতেই কলকাতা বুঝে নিয়েছে।

হা। তৃষিতা তৃণা।

ময়মুনা আর তৃণা ভিকারুননেছা নুনের ব্যাচমেট। ময়মুনার সূত্রেই তৃণার সঙ্গে আমার পরিচয়। হায়দারকেও তো আপনি চেনেন। শর্টফিল্ম করতো যে। আমাদের সার্কেলের আরেক বন্ধু হলো নায়লা চৌধুরী, কবি। আপনার সঙ্গে তো এখন যোগাযোগ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। এদের সঙ্গেই টুকটাক যোগাযোগ আড্ডা-আলোচনা হয়। অন্যদের মতো তৃণাও খুব পড়াশোনা করে। কোনো বই পড়ার পর সেটা নিয়ে কথা বলতে উদগ্রীব হয়ে থাকে।

ময়মুনার কথা শুনে আমি তৃষিতা তৃণার ওয়ালে গেলাম। আপনার মনে আছে, সেই সময় টিভি খুললেই তৃণাকে দেখা যেত? সে ছিল বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের পছন্দের শীর্ষে।

কায়সার বললো, এখন দেখলে বোঝা যায় না, এই তৃণা সেই সময় কত সুন্দর ছিল। এখন কেমন মোটা হয়ে গেছে। ওকে দেখে খুব খারাপ লাগে। নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না মেয়েটা। দর্শকদের স্মৃতি থেকেও একেবারে হারিয়ে গেছে। সে সময় একবার ওকে কাছ থেকে দেখেছিলাম। দেখে মনে হয়েছিল মাখন নিয়ে তৈরি করা হয়েছে দেহটা। উজ্জ্বল হলুদাভ গায়ের রঙ। কী দাপুটে উপস্থিতি তার। ও সামনে থাকলে আর কোনো দিকে তাকাতে পারতো না কেউ।

কায়সারের মুখে তৃণার বর্ণনা শুনে একটু অবাক লাগে আমার। অনেক পরিবর্তন হয়েছে তার।

আমি তৃণার ওয়ালে গিয়ে দেখলাম, একটা লম্বা স্টেটাস দিয়েছে। ভুল বানান ভুল বাক্যে স্মৃতিকথা ধরনের একটা লম্বা প্যারা লিখেছে। তাতে সে জানিয়েছে, জীবনে অনেক ফটোশ্যুট সে করেছে, নিজের অনেক সুন্দর ছবি তার কালেকশনেও আছে। কিন্তু তার ছবি কেউ আঁকেনি। ব্যতিক্রম ছিলেন শুধু বিশ্বখ্যাত বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শিল্পী আখতারুল ইসলাম।

আখতার ভাই যে বার ঢাকায় এলেন,  সেবার তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল তৃণা। কে তাকে আখতার ভাইয়ের কাছে নিয়ে গিয়েছিল তা আজ আর তার মনে নেই। কিন্তু দেখা হওয়ার পর আখতার ভাই বলেছিলেন, তিনি তৃণার মায়াময়ী মুখটা এঁকে রাখতে চান। কথামতো এঁকেছিলেনও। আখতার ভাই প্যারিস যাবার আগে ছবিটা তাকে দিয়ে যান। তখন নায়লা, ময়মুনা ও হায়দার কাজ করতো ভোরের কাগজে। তৃণা ও ময়মুনা ভিকারুননেছা নুনের ক্লাসমেট হলেও মাঝে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল। তৃণা মাঝে মাঝে সঞ্জীবদার কাছে আসতো। সেই সূত্রে ময়মুনার সঙ্গে তার পুরনো বন্ধুত্ব আবার জোড়া লাগে। যদিও তখন সেটা এখনকার মতো ঘনিষ্টতার পর্যায়ে ছিল না।

তৃণাই ময়মুনাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আখতারুল ইসলামের আঁকা ছবিটা সে সুন্দরভাবে বাঁধাই করে রাখতে চায়। ময়মুনা তাকে পরামর্শ দিয়েছিল, হায়দারকে দিয়ে কাজটা করাতে। ময়মুনার ধারণা ছিল, তৃণাকে সে ছবি বাঁধাইয়ের কাজে সহযোগিতা করতে পারবে। হায়দারও উৎসাহ দেখালো বেশ। কিন্তু ছবিটা নিয়ে বাঁধাই করানোর জন্য নিয়ে অনেক সময়ক্ষেপন করতে থাকলো সে।

তৃণা তখন মহাব্যস্ত মডেল। সে হয়তো ভুলে গিয়েছিল বা ছবিটার মর্ম বুঝতে পারেনি। কিন্তু ভোরের কাগজে এলে সে হায়দারকে তাড়া দিতো। ময়মুনা ও নায়লাও হায়দারকে মাঝে মাঝে বলতো, ছবিটা যেন সে তৃণাকে ফেরত দেয়। কিন্তু হায়দার একথা সেকথা বলে এড়িয়ে যেত। একসময় বলতে শুরু করে, ছবিটা সে হারিয়ে ফেলেছে।

তৃণা তার স্টেটাসে লিখেছে, ময়মুনার পরামর্শে হায়দারকে ছবিটা বাঁধাই করতে দিয়ে সে ভুল করেছে। আখতার ভাইয়ের আঁকা মূল্যবান ছবিটা হায়দার হারিয়ে ফেলেছে। যা তার জীবনে অপূরণীয় একটা ক্ষতি হয়ে থাকলো।

কায়সার বললো, আপনি ভাবতে পারছেন, আখতার ভাইয়ের সাইন করা ওই ছবিটার দাম কত আজকের বাজারে? কমপক্ষে দশ কোটি টাকা।

তৃষিতা তৃণার স্টেটাস পড়ে আমি ময়মুনাকে বললাম, পড়লাম তো।

ময়মুনা বললো, তুমি কখনো শুনেছো আখতারুল ইসলাম পোর্ট্রেইট এঁকেছেন? সম্ভবত এটাই তার করা একমাত্র পোর্ট্রেইট। আঁকবে না-ই বা কেন? সেই সময়কার তৃণাকে তো দেখেছো। ও ছিল সেক্সসিম্বল। ওর ছবি ছাপা হলে ভোরের কাগজের সার্কুলেশন বেড়ে যেত।

আমি ময়মুনাকে কিছুই বলিনি।

শুধু জিজ্ঞেস করলাম, তুমি ছবিটা দেখেছো?

ময়মুনা বললো, দেখেছে। প্যাস্টেলে আঁকা। ছবিটা দেখলে মনে হয়, তৃণা একটা জলাধার থেকে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু মোটেও কোনো জলাধার আঁকা হয়নি ব্যাকগ্রাউন্ডে। চোখ দুটো কোনো দিকে নিবদ্ধ নয়। চঞ্চল। দূরে কোথায় তাকিয়ে আছে। সবার চেনা তৃণা ছবিতে এক রহস্যময়ী অচেনা নারী। খানিকটা যেন ভয়ংকরও। নিচে আখতারুল ইসলামের সিগনেচার।

আমি কায়সারকে বললাম, তার মানে দাঁড়ালো, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে প্রদর্শনীতে বিক্রমপুর সিরিজের যে তিনটি ছবি দেখানো হয়েছিল তার বাইরে তিনি আরও দুটি ছবি এঁকেছিলেন। একটি সুহাসিনী রহমানের। যে ছবিটি প্রকাশ্যে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। আরেকটি তৃষিতা তৃণার। যেটি আসলে হারিয়ে গেছে।

কায়সার বললো, হায়দার আসলে বাটপার। সে জানতো আখতারুল ইসলামের ছবির দাম কত। ফলে মওকা বুঝে ছবিটা মেরে দিয়েছে।

আমি বললাম, কিন্তু শুধু কি এই দুইজন? একমাস সময়ে আর কোনো নারী কি আখতার ভাইয়ের কাছে গিয়েছে? শুধু কি এই দুইটা পোর্ট্রেইট তিনি এঁকেছেন?

কায়সার আমার কথার উত্তর না দিয়ে বললো, আপনার বিক্রমপুর সিরিজের ছবি তিনটার কথা মনে আছে? আখতার ভাই কত বড় একটা ক্যানভাস নিলেন। অতো বড় করে ভাবার সাহসই হবে না এদেশের অন্য কোনো শিল্পীর। বিক্রমপুরে বৃষ্টির আভাস পুরো ছবির মধ্যে ছড়ানো। কিন্তু কোথাও জল নেই। বাতাস নেই। কিন্তু দেখে মনে হবে পুরো ক্যানভাস জুড়ে  অতীত মেঘ আকাশ বৃষ্টি সবুজ স্মৃতি বর্তমান কেমন তীব্র গতিতে প্রবহমান। ছবি তিনটা পরপর সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। মনে আছে?

আমি বললাম, মনে না থাকার কারণ নেই। ওই ছবি তিনটা আমার মনে ভেতর আরেকটা ছবি তৈরি করেছিল। যা আমি কখনো হয়তো ভুলবো না। সাবলাইম।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি দুজন। কায়সার হয়তো গভীর কোনো চিন্তায় ডুব দিতে থাকে।

দুপুরের খাবার সাজিয়ে খবর দেওয়া হলে আমরা দুজন খেতে বসি।

আমি বলি, ময়মুনাকে আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করেছি তৃণা আসলে আখতার ভাইয়ের কাছে কীভাবে পৌঁছেছিল?

ময়মুনা হয়তো ভেবেছে, আমি অসাবধানতাবশত পরিচয় না থাকার পরও আখতারুল ইসলামকে ভাই বলে সম্বোধন করছি। কিন্তু বিষয়টা নিয়ে আমার অতিরিক্ত আগ্রহ ওকে সতর্ক করে দেয়। যদিও সব কথাই আমাকে বলেছে। কিন্তু তৃণা কীভাবে আখতার ভাইয়ের কাছে পৌঁছেছে সেটা আমি বের করতে পারিনি।

কায়সার বললো, আমি সম্ভবত জানি। সেই সময় পিকো নামে একটা ব্র্যান্ড ছিল মনে আছে? পিকো বিস্কুট, পিকো চিপস, পিকো সাবান। সবগুলোর মডেল হয়েছিল তৃণা। পিকো গ্রুপের চেয়ারম্যান ছিলেন দিদারুল ইসলাম। তৃণা ছিল তার বান্ধবী। বিক্রমপুর সিরিজের একটা ছবি কিনেছিলেন দিদারুল ইসলাম। জুলাইয়ের মাঝামাঝি আখতার ভাইয়ের সম্মানে একটা পার্টিও দিয়েছিলেন ঢাকা ক্লাবে। হতে পারে ঢাকা ক্লাবেই তৃণার সঙ্গে আখতার ভাইয়ের দেখা হয়। এখন হয়তো সেসব কথা শেয়ার করতে চাইছে না তৃণা। এখন তো সে বুদ্ধিজীবী হয়ে গেছে।

ময়মুনা বললো, তৃণার স্টেটাসটা পড়ে তার খুব মন খারাপ হয়েছে। মনে হয়েছে, তৃণা ছবিটা হারানোর জন্য তাকে দায়ী করছে। কিন্তু সে নিজে হায়দারকে কতবার অনুরোধ করেছে। কতবার তাড়া দিয়েছে। হায়দার কিছুতেই ছবিটা ফেরত দেয়নি। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, কোনো একটা আড্ডায় নায়লা হায়দারকে বলতে শুনেছে তার কাছে আখতারুল ইসলামের একটা অরিজিনাল আছে।

কায়সার বললো, আর্ট কালেক্টর হিসেবে আমরা সব ছবির খবর রাখি। কার কাছে কয়টা জয়নুল আছে, সুলতান কোথায় কোথায় আছে। আখতার ভাইয়ের কাজগুলোর খবরও আছে। আমি যতদূর জানি, দিদারুল ইসলামই তৃষিতা তৃণার পোর্ট্রেইটটা হায়দারের কাছ থেকে সেই সময়ই কিনে নিয়েছিল।

আমি বললাম, তাহলে তো সে ছোটলোক।

কায়সার বললো, আপনাদের বন্ধু। একই সার্কেলে মেশেন। আপনারা ভাল বুঝবেন। তবে আমার মনে হয়, উনি কারো বন্ধু হতে পারেন না। এত মেধাহীন মানুষ আমি কম দেখেছি। আখতার ভাই কী বলেছিলেন মনে আছে? মেধা, প্রজ্ঞা, পর্যবেক্ষণ সবই একেকটা কমিউনিকেশন সিস্টেম।

আমি বাকী কথাটা জুড়ে দেইতুমি যদি সিকোয়েন্স মেলাতে পারো তবে কমিউনিকেশন হয়ে যাবে। মানুষে মানুষে এই যোগাযোগটা অনেকটা এপিফ্যানির মতো। মুক্তি আস্বাদ দেয়।

কায়সার বললো, আপনি ময়মুনা বা তৃণাকে কিছু বলবেন না। তাছাড়া বেশি কিছু বলতে যাওয়াও ঠিক হবে না। আমরা তো তাদের চেয়ে কিছুটা হলেও বেশি জানি। সব হিসাব মেলালে আপনার ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, আখতার ভাই তৃণাকেও বেশ চুদেছে।

আমি মুচকি হাসি।

কায়সার বললো, আপনি বেশ সিরিয়াস হয়ে গেছেন দেখছি। আগের মতো কল্পনাপ্রবণ বোধহয় আর নেই। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে কি? নাকি কাছের বন্ধু বলে তৃণাকে নিয়ে বলা কথাটায় ততোটা উল্লসিত হতে পারলেন না?

আমি বললাম, তৃণা তো আগে আমাদের কাছে কখনো ইন্টেলেকচুয়াল এলিমেন্ট ছিল না। সে কারণে তাকে নিয়ে কোনো যৌনতার বোধ আমাদের মধ্যে তৈরি হয়নি। হয়তো খুব সুন্দর ছিল, সাধারণের কাছে সেক্সসিম্বল ছিল। কিন্তু আমরা তাকে কখনো কামনা করিনি। আমরা সবসময় সুহাসিনী রহমানকেই কামনা করেছি।

কায়সার বললো, কিন্তু আখতার ভাই? আখতার ভাই তৃণার মধ্যে কিছু নিশ্চয় পেয়েছিল?

আমি বললাম, এখন অবশ্য ঘনিষ্টভাবে তৃণার সঙ্গে মিশে আমার মনে হয় ওর মধ্যে গভীরতা আছে। চিন্তা আছে। পর্যবেক্ষণ আছে। তাছাড়া আমরা তো ওর মডেল পরিচয়ের আড়ালে ভুলে বসে আছি ও খুব ভাল নাচতো। দিল্লি থেকে কত্থক শিখে এসেছিল। আখতার ভাই পাকা জহুরি। হয়তো এক দেখায় ওর বিভঙ্গ থেকে নৃত্যরতা তৃণাকে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। মডেল তৃণার আড়ালে নৃত্যশিল্পী তৃণাকে আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। আর তার ফলেই তার আরেকটি বিরল পোর্ট্রেইট আঁকা হয়ে গিয়েছিল।

কায়সার বললো, শিল্পীদের তৃতীয় নয়ন থাকে, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় থাকে। এই দৃষ্টিটা সাধারণ মানুষ কখনো পায় না। আপনিও শিল্পী। আমার তো মনে হয়, ওই অর্ন্তদৃষ্টিটা আপনার মধ্যেও আছে।

আমি বললাম, আপনি কেমন? আপনি আর্ট ক্রিটিক করতেন একসময়। আপনার মধ্যেও একটা শিল্পী মন আছে।

আমি আর্ট কালেকক্টর। আর্ট কালেকক্টররা শিল্পকে টাকার অংকে বিচার করে। এটা অশ্লীল নেশার মতো। ধরুন, পৃথিবীতে একটা মাস্টারপিস তৈরি হলো। ওই মাস্টারপিসটা কিনে নিয়ে আপনি ঘরে রাখলেন। কোটি কোটি টাকা দাম সেটার। সাধারণ মানুষ জানে না সেটা আপনার ঘরে। জানার দরকারও নেই। কিন্তু যারা জানার তারা জানে। তারা আপনাকে আপনার কালেকশনের জন্য ঈর্ষা করে। শিল্প সমালোচকরা যে ছবিটার অরিজিনাল হয়তো কখনো চোখে দেখেনি। সারাজীবন কপি দেখে, কপির কপি দেখে শব্দের পর শব্দ লিখে গেছে সেটা আপনার ঘরে শোভা পাচ্ছে। এটার মধ্যে আলাদা একটা গর্ববোধ আছে। সেটা খানিকটা আপত্তিকরও।

খুবই নৃশংস একটা শিল্পবোধ।

একদম ঠিক কথাটা বলেছেন। কিন্তু আর্ট কালেকক্টররা না থাকলে শিল্পীরা ভাল থাকবে কেমনে। যদিও আমি মনে করি, যে আর্টপিসগুলো ক্ল্যাসিক হয়ে গেছে সেগুলো পাবলিক গ্যালারিতেই থাকা উচিত।

খাওয়া শেষ হলে কায়সার তার অফিসের দোতলায় আমাকে নিয়ে যায়। এটা মূলত গ্যালারি। কায়সারের আর্ট কালেকশনের একটা অংশ এখানে রাখা হয়েছে। চারুকলা থেকে পাশ করা ছিপছিপে তরুণী তানিয়া গ্যালারিটা কিউরেট করে। তানিয়ার সঙ্গে পরিচয় হলে সে আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। ওই হাসি অনুসরণ করে কায়সার আমার দিকে তাকায়। আমি তানিয়াকে কীভাবে দেখি পর্যবেক্ষণ করে।

প্রত্যেকটা ছবি দেখাতে দেখাতে কায়সার বললো কীভাবে কার মাধ্যমে এই ছবি কালেক্ট করেছে। ছবির দাম কত। এই শিল্পীর আর কোন ছবি বাংলাদেশে কার কাছে আছে। কোন আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে এই ছবি গিয়েছিল। ছবিটা সম্পর্কে তার মূল্যায়ন কী?

একসময় আমি আপন মনে ছবি দেখতে থাকলে কায়সার চুপ হয়ে যায়। তারপর নিজের মনে কথা বলতে থাকে

একটা কথা আপনাকে কখনো বলা হয়নি, মঈন। আখতার ভাই তো বটেই, সুহাসিনীকে নিয়ে আপনার অবসেশনও আমাকে খুব প্রভাবিত করেছিল। আপনি যখন সুহাসিনীকে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন, তখন আমি নির্লিপ্ত থাকতাম। কিন্তু পরে বিষয়টা আমার ভেতর খুব ক্রিয়া করতো। একসময় আমি খেয়াল করলাম, আপনার মতো করে আমি সুহাসিনীকে ভাবছি। আখতার ভাইয়ের সঙ্গে তার কী কী হতে পারে ভাবছি। আপনার চেয়ে বেশি করে ভাবছি। তার গান টুকটাক শুনতাম। কিন্তু একসময় রিলিজিয়াসলি তার সব গান শুনতে শুরু করলাম। কিন্তু আমি তো আপনার মতো কল্পনাবিলাসী নই। বাস্তববাদী। আমি যখন অনুভব করলাম, সুহাসিনীর জন্য আমার ভেতর একটা উতল বাসনা একটা ব্যাকুল কামনা জেগে উঠছে তখন আমি প্রাকটিক্যালি ভাবতে শুরু করলাম। আমি ভাল করে জানতাম, সুহাসিনীকে পাওয়া সহজ নয়। সুহাসিনী সবসময় সাধারণ মানুষের ফ্রিকোয়েন্সির ওপর দিয়ে চলে। আমি নিজে যখন ওপরে উঠতে শুরু করলাম তখন তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হলো। টুকটাক ক্যাজুয়াল যোগাযোগ অনেক বছরে বন্ধুত্বে রূপ নিলো। আমার মাথায় শুধু ওই স্কেচগুলো ঘুরতো। আমার মনে হতো, ওই স্কেচগুলো হয়তো আখতার ভাই প্যারিসে নিয়ে যাননি। সুহাসিনীর কাছেই রেখে গেছেন। ছবিটা সুহাসিনীকে তিনি দিয়ে যাবেন আমাদেরকেই বলেছিলেন। ছবিটা শেষ পর্যন্ত কেমন দাঁড়িয়েছিল আমরা দেখিনি। কিন্তু যতটুকু বুঝেছি তাতে তৃষিতা তৃণার মতো নিজের ছবিটা সুহাসিনী আর কাউকে দেখাতে পারবে না। ওটা তো তার নগ্ন পোর্ট্রেইট ছিল। আমার মাঝে মাঝে ওই ছবিটা দেখার ইচ্ছা হতো। আর ওই স্কেচগুলো। কিন্তু সেগুলো তো আমাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে চিরতরে।

গতমাসে আমি সুহাসিনীকে বললাম, চলেন বেইজিং যাই। আমাকে অবাক করে দিয়ে সুহাসিনী রাজি হলো। বললো, চীন দেশটাই শুধু ভাল করে দেখা হলো না।

আমি বললাম, কী বলেন!

কায়সার বললো, বেইজিং গিয়ে আপনার কথাটাই তাকে বললাম। বললাম, আমি বহু বছর ধরে আপনার গান শুনি আর ভাবি আপনি বৃষ্টিতে ভিজে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। আপনার চুল ভিজে গেছে। শাড়ি ভিজে গেছে। আমি একটা মোলায়েল তোয়ালে নিয়ে আপনার মাথা মুছে দিচ্ছি। আপনার গলা, ঘাড়, পিঠ, বুক মুছে দিচ্ছি।

উনি কী বললেন শুনে?

উনি বললেন, তুমি তো কবি দেখছি। কী সুন্দর করে বলো।

তুমি-আপনি?

সুহাসিনী আমাদের চেয়ে কয়েক বছরের বড় হবেন। এখন ফিফটি প্লাস। আপনি বলাই  ভাল নয়? শ্রদ্ধাভক্তি থাকলে সমস্যা কী?

তারপর কী হলো? আপনি আপনি বলেই?

কায়সারের সঙ্গে সুহাসিনীর সম্পর্কের লেভেল কত গভীর তা আমি জানি না। ফলে চুদলেন শব্দটা মনে এলেও মুখে এলো না।

কায়সার ব্যাপারটা খেয়াল করলো।

বেইজিংয়ের হোটেল রুমে সুহাসিনীর পোশাক খুলতে খুলতে তার গলায় যখন আমি চুমো খাচ্ছিলাম তখন সুহাসিনী একেবারে মোমের মতো গলে যাচ্ছিল। তখন আপনার কথা মনে হচ্ছিল। যেন আপনার হয়ে তাকে আদর করছি আমি।

তার স্তন উন্মুক্ত করে আমি নয়ন ভরে দেখছিলাম। স্কেচে, ছবিতে যেমন দেখেছিলাম ঠিক তেমনি রয়ে গেছে কুড়ি বছর পরও। আমি বলেছিলাম, আপনার স্তনের ছবি কেউ আঁকেনি? আমি শিল্পী হলে অবশ্যই আঁকতাম। কিন্তু আমি তো আর্টিস্ট না, আর্ট কালেক্টর।

কথাটা শুনে সুহাসিনী খুব উত্তেজিত হয়ে উঠলো। আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি তার স্তন, কোমর, পিঠ জুড়ে আদর করতে থাকলাম। বললাম, আপনি আপনার গানের মতো সুন্দর।

তাকে বিছানায় নেওয়ার পর আবার জিজ্ঞেস করলাম, কোনো শিল্পীর নজর পড়েনি আপনার ওপর?

সুহাসিনী চরম উত্তেজনায় বললো, পড়েছে। একজন এঁকেছে।

হুয়া হুথাংয়ে ঘুরতে ঘুরতে সুহাসিনী আমাকে বিস্তারিত বললো সেই সময়ের কথা। কীভাবে আখতার ভাইয়ের সঙ্গে তার দেখা হলো। কীভাবে তার বাসায় যেতে শুরু করলো। কীভাবে আখতার ভাই তার পোর্ট্রেইট আঁকার প্রস্তাব দিলো সব।

আমরা যে জানি সে কথা তাকে বললেন?

সেটা কি কখনো বলা যায়? আখতার ভাই বিশ্বাস করে আমাদের একটা গহীন রহস্য বলেছেন। আমরা সেই গোপনীয়তার জিম্মাদার। সেটা ফাঁস করলে আখতার ভাইয়ের প্রতি সম্মান দেওয়া হয় না। সুহাসিনীর মতো বড় শিল্পীর সম্মানটাও রক্ষা করা হয় না।

চীন থকে ফিরে অবশেষে একদিন সুহাসিনীর বাসায় গিয়ে সেই ছবি আর স্কেচগুলো দেখতে পেলাম। মূল্যবান সেই সম্পদ নিয়ে সুহাসিনী খুব পেরেশানির মধ্যেই আছে। যত্ন করে একটা সিন্দুকে রেখেছে। সে জানে এটা অনেক মূল্যবান। কিন্তু এটা বিক্রি করা যাবে না বা কাউকে দেখানো যাবে না এটা আরও ভাল করে জানে। স্বাভাবিক কারণে সুহাসিনী সিন্দুকে কোন গোপন জিনিশ গচ্ছিত রেখেছে তা নিয়ে বাসার সবাই ভীষণ আগ্রহী। কতদিক দিয়ে বিপদ।

কায়সার আমাকে একটা তালাবদ্ধ ঘরের সামনে নিয়ে গেল। তালা খুলে ঘরে ঢুকিয়ে ঘরটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল।

আমি ঘরে ঢুকে হতভম্ব হয়ে গেলাম।

এটাই কি সেই...

হা, এটাই সেই সিন্দুক।

এই সিন্দুকটার একটা আলাদা গল্প আছে। সুহাসিনী এটা পেয়েছিল তার মায়ের কাছ থেকে। তার মা পেয়েছে নানার কাছ থেকে। সে গল্প আরেকদিন বলবো।

কখনোই এই ছবি কাউকে দেখানো যাবে না, এই শর্তে সুহাসিনী আমাকে ছবি আর স্কেচগুলো দিয়েছে। এর জন্য আমি তাকে দশ কোটি টাকা সম্মানী দিয়েছি। আপনি তো জানেন, আমি কতটা জিতেছি। এই ছবি, সঙ্গে ৭৬টা স্কেচ আর এর পেছনের গল্পটা মেলালে এটা কমপ্লিট প্যাকেজ। ইউরোপের বাজারে ছাড়লে আমি আজই ১০০ কোটি টাকার মালিক বনে যেতে পারি। কিন্তু সেটা করবো না। এই গোপন সম্পদটা এভাবেই থাকুক।

কতদিন ধরে এটা আপনার কাছে আছে?

কায়সার বললো, আপনাকে খুব বেশি ঠকাইনি আমি। আপনার গল্প শুনতে শুনতে হিসাব করছিলাম। যেদিন ময়মুনা আপনাকে তৃষিতা তৃণার স্টেটাস পড়তে বলেছিল সম্ভবত সেদিনই সিন্দুকটা আমি এখানে নিয়ে এসেছি।

সিন্দুক খুলে ছবিটা যত্ন করে আমার সামনে মেলে ধরে কায়সার।

বললো, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ফুমাতো টেকনিকে এঁকেছিলেন মোনালিসা। আখতারুল ইসলাম সুহাসিনীকেও ওই টেকনিকে এঁকেছেন। আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। জ্যান্ত একটা নগ্ন শরীর ফুটে আছে ছবিতে। কী অসাধারণ সুহাসিনীর অভিব্যক্তি। সেই স্মোকি আইজ, চিবুকে হাসি, চোখের নিচে গভীর  বিষণ্নতা। ঘাড়ে দৃঢ়তা। ডাঁসা স্তনে পেলবতা।

কায়সার বললো, আপনি ফোন না দিলে আমিই আপনাকে ফোন দিতাম। ছবিটা আসার পর থেকে শুধু আপনার কথা ভাবছি। আপনাকে ছাড়া আর কাকে দেখাবো? আর কাউকে তো দেখানো যাবে না।

আমি বললাম, এই বয়সে বেশ খানিকটা গম্ভীর হয়েছে না, সুহাসিনী?

কায়সার হাসলো, বললো, মোটেও না। বাইরে থেকে অবশ্য তেমনই মনে হয়। আপনি ঠিক ছিলেন। আসলেই অবসেশড হয়ে থাকার মতো নারী উনি। আখতার ভাই কেন তাকে নিয়ে এত মোহে পড়েছিলেন এখন খুব বুঝতে পারি আমি।

স্কেচগুলো হাতে নিয়ে এক এক করে দেখতে থাকি আমি। দ্বিতীয়বার দেখতে গিয়ে প্রথম বারের মতো প্লীহা চমকানোর মতো ঘটনা ঘটে না। তবু আমি মমতা নিয়ে দেখি। আখতার ভাইয়ের বিদেহী আত্মার স্মৃতিমাখা কাগজগুলো মমতার সঙ্গে হাতে ধরি। ছবিটা কয়েকবার দেখি।

বৃষ্টি থেমে গিয়ে রোদ উঠেছে। রাস্তাঘাটে জমা পানির মধ্যে এই রোদ ঠিক যেন মানাচ্ছে না। এখন আকাশে মেঘ থাকলে ভাল হতো। আর তুমুল বৃষ্টি। কায়সারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ার পর একটা বিষাদ আমার মনের মধ্যে হু হু করে বাড়ছে। তীব্র একটা হাহাকার কান্নায় রূপ নিচ্ছে। আমি যত আগাচ্ছি ততো বাড়ছে বুকের ভেতর একটা অচেনা চিনচিনে অনুভূতি।

হাঁটতে হাঁটতে একসময় ঘামে ভিজে গেলাম আমি। কী ভীষণ হিউমিডিটি এখন।

বিরক্ত হয়ে একসময় আমি বললাম, ধুর বাল!