জন্মান্তরের আলো
প্রথম
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি মাটিতে নেমে আসেনি।
কুয়াশার নরম চাদর মুড়ে রয়েছে মাখালতোড় গ্রাম। মুর্শিদাবাদের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। পাশ দিয়ে চলে গেছে, কুরিচা গ্রামের রাস্তা।
সরু কাঁচা পথ ধরে লাঙল কাঁধে মাঠে যাচ্ছেন কৃষকেরা। দূরে শালিকের ডাক, গরুর ঘণ্টার শব্দ আর ভেজা মাটির গন্ধে ভরে আছে চারদিক। এই গ্রামেই জন্ম অর্পণ হালদারের। ছোটবেলা থেকেই সে অন্যদের মতো ছিল না। মাঠে ছুটে বেড়ানোর চেয়ে সে বেশি ভালবাসত নদীর ধারে বসে আকাশ দেখা, গাছের পাতার শব্দ শোনা, কিংবা খাতার পাতায় অদ্ভুত সব শব্দ লিখে রাখা।
বাবা গদাধর হালদার দিনমজুর। নিজেদের মাত্র দুই বিঘে জমি। অন্যের জমিতে মুনিষের কাজ করে, নিজের জমিতে চাষ করে কোনমতে সংসার চলে। মা সরলা সংসারের হাল সামলান দায়িত্ববোধ নিয়ে। ছোট বোন পূর্ণিমা তখন স্কুলে পড়ে।
অভাব ছিল, কিন্তু সেই অভাবের মধ্যে ভালবাসা ছিল অঢেল।
দর্শনে অনার্স নিয়ে বি.এ. পাশ করার পর অর্পণের বিশ্বাস ছিল, একদিন শিক্ষকতার চাকরি হবেই। প্রাইমারি টিচার ট্রেনিংটাও করা হয়ে গেছে। কিন্তু বছর পাঁচেক কেটে গেলেও নিয়োগের দরজা খুলল না। পরীক্ষার পর পরীক্ষা, আবেদনপত্রের পর আবেদনপত্র—সবশেষে শুধু অপেক্ষা।
এই দীর্ঘ অপেক্ষার সময়টাতেই কবিতা হয়ে উঠল তার আশ্রয়।
কৈশোর থেকেই সে কবিতা লিখত। গ্রামের লাইব্রেরি থেকে বই এনে জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ পড়ত। কবিতা পড়তে পড়তে তার মনে হতো, মানুষের না-বলা কথাগুলোই কবিতার ভাষা। ধানের শীষের দোলা, শ্রমিকের ঘামে ভেজা জামা, মায়ের হাঁড়িতে ফুটতে থাকা ভাতের গন্ধ—এসবও কবিতার বিষয় হতে পারে।
প্রায়ই বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে লেখা পাঠাত। অধিকাংশই পত্রিকা দপ্তর নীরব থেকে যেত।
কোন সম্পাদক উত্তরও দিতেন না। তবু সে নিরাশ হতো না। একদিন একটি ছোট পত্রিকায় তার কবিতা ছাপা হল। নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখে সে আনন্দ ধরে রাখতে পারছিল না। একশো টাকার সম্মানী পেয়ে নতুন জামা কেনেনি; কিনেছিল কয়েকটি কবিতার বই। বন্ধুদের বলেছিল—
—‘কবিতা মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। শুধু শব্দ নয়, কবিতা মানুষকে নিজের ভেতরের মানুষটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।’
বন্ধুদের মধ্যে সৌগত হেসে বলেছিল—
—‘আগে নিজের জীবনটা গুছিয়ে নে, তারপর পৃথিবী বদলাবি।’
অর্পণ হেসেছিল। তখনও সে বুঝতে পারেনি, কথাটার ভেতরে কতখানি সত্যি লুকিয়ে আছে।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে বাবা ক্লান্ত শরীরে উঠোনে বসে থাকতেন।
একদিন বললেন—
—‘ওরে, কবিতা লিখবি, তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু জমিটাও তো আমাদের। আমি আর কতদিন পারব?’
অর্পণ চুপ করে রইল।
সে মনে মনে ভাবল, বাবা তার স্বপ্ন বোঝেন না।
রাতে মা ভাত বাড়তে বাড়তে বললেন—
—‘বাবা, তোর বাবার শরীর ভেঙে যাচ্ছে। একটু মাঠে গেলে কি খুব ক্ষতি হবে?’
—‘চাকরি হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে মা। আর একটু অপেক্ষা করো।’
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
—‘অপেক্ষা ভালো, কিন্তু অপেক্ষা যেন দায়িত্বকে ভুলিয়ে না দেয়।’
সেই কথা শুনেও অর্পণ আবার খাতা খুলে লিখতে বসে।
কিন্তু আশ্চর্য, সেদিন কোনো কবিতাই শেষ করতে পারল না। বারবার বাবার ফাটা হাত, মায়ের ক্লান্ত মুখ ভেসে উঠছিল।
দিন গড়াতে লাগল।
সংসারের অভাব আরও বাড়ল। বাবার শরীরে আগের মতো জোর নেই। তবু ভোর হলে মাঠে বেরিয়ে যান। মা সবকিছু চেপে রেখে সংসার সামলান। এরই মধ্যে সরলার শরীর খারাপ হতে শুরু করল। প্রথমে সামান্য জ্বর, তারপর কাশি, দুর্বলতা। ডাক্তার দেখাতে টাকা লাগে। বাবা ধার করলেন। অর্পণ নিজের বইয়ের আলমারির দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হল, কত বই কিনেছে, অথচ মায়ের চিকিৎসার জন্য তেমন কিছুই করতে পারছে না।
এক রাতে মা তাকে পাশে ডাকলেন।
—‘বাবা, তুই লেখালেখি ছাড়িস না। কিন্তু মনে রাখিস, কলমের সবচেয়ে বড় কাজ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। নিজের মানুষকে কাঁদিয়ে যে কবিতা লেখা হয়, সেই কবিতা কখনও পূর্ণ হয় না।’
অর্পণের চোখ ভিজে উঠল।
—‘মা, আমি সব ঠিক করে দেব।’
মা শুধু মৃদু হেসে তার মাথায় হাত রাখলেন।
কয়েকদিন পর সরলা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
শ্মশান থেকে ফিরে অর্পণ নিজের ঘরে এসে কবিতার খাতা খুলল মানসিক কষ্ট নিয়ে।
একটি অসমাপ্ত কবিতার নিচে লেখা ছিল—‘মানুষ হওয়ার আগে কবি হওয়া যায় না।’ নিজেরই লেখা সেই লাইন সেদিন যেন তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিল। সে সারারাত ঘুমোতে পারল না।
পরদিন সূর্য ওঠার আগেই বাবা যখন মাঠে যাওয়ার জন্য লাঙল কাঁধে তুললেন, তখন পিছন থেকে অর্পণের গলা ভেসে এল—
—‘বাবা... দাঁড়াও। আজ আমি তোমার সঙ্গে মাঠে যাব।’
গদাধর অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
দ্বিতীয়
গদাধর হালদার কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
—‘তুই মাঠে যাবি?’
অর্পণ শান্ত গলায় বলল—
—‘হ্যাঁ বাবা। এতদিন শুধু নিজের স্বপ্ন নিয়েই ভেবেছি। এবার আমাদের স্বপ্নের কথাও ভাবতে চাই।’
বাবার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। তিনি আর কিছু বললেন না। শুধু লাঙলটা কাঁধ থেকে নামিয়ে ছেলের হাতে তুলে দিলেন।
প্রথম দিনেই অর্পণ বুঝতে পারল, মাটির সঙ্গে লড়াই করা সহজ নয়। রোদের উত্তাপ, কাদামাটির টান, ঘামে ভিজে যাওয়া শরীর—সব মিলিয়ে দুপুরের আগেই সে হাঁপিয়ে উঠল। কোদাল ধরতে গিয়ে হাতের তালুতে ফোস্কা পড়ে গেল। তবু বাবার দিকে তাকিয়ে একবারও অভিযোগ করল না।
বাড়ি ফিরে রাতে ব্যথায় ঘুম এল না। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা কবিতার খাতাটা খুলে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তারপর লিখল—
‘আজ প্রথম বুঝলাম, কৃষকের হাতের ফাটলও এক একটি কবিতা। শুধু তার ভাষা কালি দিয়ে নয়, ঘাম দিয়ে লেখা।’
সেদিনের পর থেকে অর্পণের দিন বদলে গেল। ভোরে মাঠ, বিকেলে সংসারের কাজ, রাতে বই আর লেখা। তবে তার কবিতার বিষয়ও বদলে গেল। আগে সে শুধু আকাশ, মেঘ, স্বপ্ন আর একাকীত্ব নিয়ে লিখত। এখন তার কবিতায় উঠে আসতে লাগল বীজ বোনার আশাবাদের কাহিনী, বৃষ্টির জন্য কৃষকের অপেক্ষা, শ্রমের মর্যাদা, মায়ের ত্যাগ আর মানুষের দায়িত্ব।
একদিন সাহিত্যচক্রের বন্ধুরা তাকে ডাকতে এল।
—‘অর্পণ, অনেকদিন তুই আড্ডায় আসিস না। নতুন কবিতা লিখছিস?’
অর্পণ হেসে বলল—
—‘লিখছি। তবে এখন কাগজের আগে মাটিতে লিখি। মাঠ আমাকে এমন সব শব্দ শিখিয়েছে, যা কোন বইয়ে পাইনি।’
বন্ধুরা অবাক হয়ে শুনছিল।
সে আবার বলল—
—‘আগে ভাবতাম কবিতা মানুষকে বদলে দেয়। এখন বুঝেছি, মানুষের জীবনকে না বুঝে লেখা কবিতা অপূর্ণ থেকে যায়। মাটির গন্ধ না চিনলে ফসলের গান লেখা যায় না।’
তার কথায় সবাই কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল।
ঋতু বদলাতে লাগল। আষাঢ় এল। ধানের চারা রোপণ হলো। শ্রাবণের বৃষ্টিতে মাঠ সবুজ হয়ে উঠল। আশ্বিনের রোদে সেই সবুজ ধীরে ধীরে সোনালি রঙে রূপ নিল।
অর্পণ প্রতিদিন নতুন চোখে প্রকৃতিকে দেখতে শিখল। একটি বীজ কীভাবে ধীরে ধীরে শস্য হয়ে ওঠে, তা দেখে তার মনে হতো—মানুষের চরিত্রও ঠিক তেমনই। যত্ন, ধৈর্য আর শ্রম ছাড়া কোনো জীবন পূর্ণতা পায় না।
এক সন্ধ্যায় পূর্ণিমা বলল—
—‘দাদা, তুই এখন আগের মতো সারাদিন কবিতা লিখিস না?’
অর্পণ মৃদু হেসে উত্তর দিল—
—‘লিখি তো। তবে এখন আমার কবিতার অর্ধেক থাকে খাতায়, আর অর্ধেক থাকে এই মাঠে।’
পূর্বের তুলনায় অর্পণের লেখা আরও গভীর হয়ে উঠল। একটি কৃষি বিষয়ক পত্রিকায় তার গদ্য প্রকাশিত হল—‘মাটির কাছে আমার ঋণ’। পরে কয়েকটি কবিতাও ছাপা হলো। সম্পাদক চিঠিতে লিখলেন, ‘আপনার লেখায় গ্রামজীবনের সত্যিকারের গন্ধ আছে।’
চিঠিটি পড়ে অর্পণ অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। সে বুঝেছিল, এই স্বীকৃতি শুধু তার নয়; তার বাবা-মায়ের জীবনেরও স্বীকৃতি।
এদিকে গদাধর হালদারের মুখে অনেকদিন পর হাসি ফিরল। ছেলে পাশে থাকায় জমির ফলনও আগের চেয়ে ভাল হল। ঋণের বোঝা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল।
তৃতীয়
ধান কাটার দিন।
পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে। সোনালি ধানের শিষে শেষ আলো ঝিলমিল করছে। অর্পণ একা মাঠের আলে দাঁড়িয়ে ছিল। বাতাস ধানের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, যেন অসংখ্য অদৃশ্য হাত তাকে স্পর্শ করছে।
হঠাৎ তার মনে হল, ধানের ঢেউয়ের ওপারে সাদা শাড়ি পরা একটি পরিচিত অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে।
সে জানে, এ হয়তো চোখের ভুল, হয়তো স্মৃতির আলোছায়া। তবু সেই মুখ চিনতে তার একটুও ভুল হলো না।
মা।
মুখে সেই চিরচেনা স্নেহের হাসি।
বাতাসে যেন ভেসে এল মায়ের কণ্ঠের সেই বীজ মন্ত্র—
—‘অর্পণ, প্রকৃত মানুষ হও।’
তার চোখ বেয়ে জল নেমে এল। সে দু’হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হল, মায়ের আশীর্বাদ ধানের শীষের মতই মাথা নত করে তাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
সেই মুহূর্তে অর্পণ উপলব্ধি করল—প্রকৃত মানুষ হওয়া মানে শুধু বড় কবি হওয়া নয়, শুধু চাকরি পাওয়া নয়, শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণও নয়। প্রকৃত মানুষ সে-ই, যে নিজের শিকড়কে ভালোবাসে, নিজের পরিবারের দায়িত্ব পালন করে, শ্রমকে সম্মান করে এবং মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
তারপর থেকে অর্পণ লেখালেখি বন্ধ করেনি। বরং আরো মন দিয়ে লিখতে শুরু করল। তবে তার কলমে আর আত্মপ্রতিষ্ঠার অহংকার ছিল না; ছিল জীবনের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা। সাহিত্য সভায় গেলে সে প্রায়ই বলত—
—‘কলম আর লাঙল—দুটোই সৃষ্টির প্রতীক। একটি মানুষের মনের জমি চাষ করে, আর অন্যটি পৃথিবীর জমি। এই দুইয়ের মিলেই মানুষের জীবন পূর্ণ হয়।’
কয়েক বছর পর তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলো। উৎসর্গপত্রে লেখা ছিল—
‘আমার মা সরলা দেবী, বাবা গদাধর হালদার এবং সকল পরিশ্রমী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য—যাঁরা শিখিয়েছেন, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পেশা নয়, তার মনুষ্যত্ব।’
গ্রামের মানুষ বইটি হাতে নিয়ে গর্ব অনুভব করল। কিন্তু অর্পণের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল অন্য একটি দৃশ্য।
এক বিকেলে ফসল ঘরে তোলার পর বাবা ধীরে ধীরে বললেন—
—‘আজ তোর মা থাকলে খুব খুশি হতো।’
অর্পণ আকাশের দিকে তাকাল। অস্তগামী সূর্যের আলোয় মাঠ সোনালি হয়ে উঠেছে। তার মনে হল, মায়ের সেই আশীর্বাদের বাক্য আজও বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
সে নত হয়ে একমুঠো মাটি তুলে কপালে ছুঁইয়ে নিল।
তার মনে আর কোন দ্বিধা রইল না। সে জানল, কবি হওয়ার পথের শেষ প্রান্তে নয়, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই প্রকৃত কবিতার জন্ম। এ যেন এক জন্মান্তর!
অর্পণ অনুধাবন করল, পৃথিবীতে বড় লেখক হওয়ার চেয়েও বড় কথা—প্রকৃত মানুষ হওয়া।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন