ফাঁদ
|| ১ ||
‘স্টেশন মহানায়ক উত্তমকুমার!’
হুড়মুড়িয়ে একদল লোক ভিড় ঠেলে ভিড়ের ভেতর ঢুকে পড়ে।
‘হ্যালো, হ্যালো মধুমিতা সরকার বলছেন?’
ধুর, এই মহানায়ক ঢোকার মুখে এই জায়গাটা রোজ ফোনটা কেটে যায়। আজকের মধ্যে এটাকে মুরগি করতে না পারলে এ মাসেও টার্গেটটা ফুলফিল হবে না। এই মেয়ের স্কুলের ফিস, এল আই সি র টাকা, বাড়িতে ঢুকলেই রিমির সেই এক বকবকানি। এতো চাপ আর নেওয়া যাচ্ছে না।
রবীন্দ্র সদন মেট্রো স্টেশনের এস্ক্যালেটর দিয়ে উঠতে উঠতে ফোনটা বেজে ওঠে রক্তিমের ‘হ্যালো, মধুমিতা সরকার বলছেন? বলছি আজ আসতে বলেছিলেন ওই স্কিমটার ব্যাপারে, বিকেলের দিকে তাহলে যাবো?’
—আচ্ছা, আসুন।
যাক, একটু স্বস্তি পেলো রক্তিম। মনে মনে ভাবলো নিজেই যেতে বললো যখন আজ যে করেই হোক মাছ ছিপে ফেলতেই হবে।
যথাসময়ে রক্তিম পৌঁছে গেলো। একটা এক কামড়ার ফ্ল্যাটে একাই থাকেন মধুমিতা দেবী। ছিমছাম মধ্যবিত্ত অন্দরসজ্জা। চা ও ঘরোয়া খাবারে আতিথেয়তা সারছেন মধুমিতা। টুকটাক আলাপ সারবার পর বললেন
‘আচ্ছা, আপনাকে তো বলেছিলাম ট্রিটিক্স ব্যাঙ্কের সেভিংস অ্যাকাউন্টে আমার কিছু টাকা আছে, সেগুলো আমি ওই ব্যাঙ্কেরই এন পি এস স্কিমের আওতায় রাখতে চাই। ওটার সুবিধে অসুবিধে গুলো একটু ডিটেইলসে জানাবেন।’
—হ্যাঁ ম্যাডাম আমি এখনই সমস্ত ডিটেইলস আপনাকে বুঝিয়ে বলছি।
—আর জানেন আজ আপনাকে আসতে বলার পেছনে অন্য একটি কারণ আছে। আচ্ছা, তুমি করেই বলছি, তুমি তো আমার ছেলের বয়সী। যাই হোক যেটা বলছিলাম, আজকের দিনটা আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। কেন জানো? আজ থেকে ঠিক দু’বছর আগে আজকের দিনে আমার মেয়েটা আমায় ছেড়ে চলে যায়, তার কর্মক্ষেত্রের ক্যাম্পাসে আত্মহত্যা করে।
আত্মহত্যার কারণ আজও সেভাবে জানা যায়নি, তবে খুঁজে বেড়াচ্ছি। আচ্ছা তোমার কী মনে হয়, ও কেন এমনটা করলো?
রক্তিম মনে মনে ভাবতে থাকে মাতৃহারা হয়ে এই মহিলা বোধহয় একটু ভারসাম্যহীন হয়ে গেছে, তা নয়তো ওকে ডেকে এসব খামোখা বলতেই বা যাবে কেন? ‘এ তো মহা ফ্যাসাদে পরলাম, করতে এলাম টার্গেট মিট, আর এই মহিলা তো সেন্টিমেন্টাল সব ইস্যু নিয়ে পড়লো।’
ফোন বেজে ওঠে রক্তিমের, ‘শোনো না, ফেরার সময় বাবার ওষুধগুলো মনে করে একটু নিয়ে এসো, আমি হোয়াটসঅ্যাপে ওষুধের লিস্টটা পাঠিয়ে রেখেছি। তুমি বোধহয় দেখোনি।’
‘উফফ তুমি সারাদিন ঘরে বসে কী করো, এইটুকু করতে পারো না?’ ঠিকাছে রাখো এখন, কাজে আছি, নিয়ে আসব’ ফোন কেটে দেয় ও।
‘তুমি তো এখনও কিছু খাওনি রক্তিম। এই পনির পকোড়াটা খাও, আমার মেয়ে আমার হাতের এই পকোড়াটা খেতে খুব ভালোবাসতো’—এসব হাবিজাবি কথার মাঝে মধুমিতা আবার বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা, তুমি কী জানো ও কেন এমনটা করলো?’
রক্তিম হতভম্ভ হয়ে বললো ‘আমি কি করে জানবো?’
তারপর নিজেকে সামলে বললো, ‘দেখুন মাসিমা, সন্তানহারা মায়ের যন্ত্রণা আমি বুঝি, কিন্তু কি করবেন বলুন, আপনার তো কিছু করার ছিল না, আমি কামনা করি ভগবান যেন এই শোক সামলে ওঠার শক্তি দেন আপনাকে। যাই হোক যে কারণে আমার আজ এখানে আসা...’
বলতে বলতেই আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন মধুমিতা, ‘আমরা নিজেরা দেখেশুনে একটা বিয়ে দিয়েছিলাম। যদিও তেমন খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। বিয়ের পর মেয়েটার ওপর খুব অত্যাচার করতো ওরা, থাকতে পারেনি, চলে এসেছিল। আমি আর ওর বাবাও চেয়েছিলাম ও যাতে ভালো থাকে তাই করুক। ডিভোর্সের পর ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়েছিল, একটা চাকরিও করছিল। তারপর হঠাৎ কি যে হলো…’
বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রিমি বারবার ফোন করছে। ‘ধুর, আজকের দিনটা বেকার হয়ে গেল’—মনে মনে বকবক করতে থাকে রক্তিম অথচ এমন পরিস্থিতিতে কী আর পেনশন স্কিমের প্ল্যান বোঝানো যায়?
মাথাটা ধরেছে। কেমন ঘুম ঘুম পাচ্ছে। কেনো হঠাৎ এরকম চোখ বুজে আসছে? বুঝতে পারে না রক্তিম। মনে হচ্ছে চোখ টেনে খুলে রাখতে পারছে না। তারপর হঠাৎ সব ঝাপসা…
জ্ঞান ফিরলো যখন, একাধিক অপরিচিত মহিলা ওকে ঘিরে রেখেছে। অদ্ভুত সব সাজপোশাক তাদের, বড় বড় লাল টিপ, লাল জোব্বা ধরনের পোশাক পরা, চোখে ধ্যাবরা কাজল সব মিলিয়ে তান্ত্রিক মার্কা চেহারা তাদের সব। জানলা বন্ধ একটা স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে টিমটিম করে বিষণ্ণ হলুদ আলো জ্বলছে, নিভছে। দেওয়ালে প্রকাণ্ড ভয়ঙ্কর সব ছবি ঝুলছে। কোনো ছবিতে একটা পুরুষের যৌনাঙ্গ কাটা আবার কোনো ছবিতে ছুরির গা বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। ছবিগুলো দেখেই গা শিউরে ওঠে রক্তিমের।
‘আপনারা কারা? কী চান? আমি বা এখানে এই অবস্থায় কেনো? আমায় এভাবে বন্দী করার অর্থ কী?’
বিকট হাসিতে ভরে উঠলো ঘর। কোনো উত্তর মিললো না। সে পরিস্কার বুঝতে পারছে একটা ভয়ঙ্কর রকম ফাঁদে পড়েছে। কিন্তু এই ফাঁদ থেকে বেরোবে কী করে এখন সে? ভাবতে ভাবতে সারারাত কেটে গ্যালো। রক্তিমের ফোনটাও তার কাছে এখন নেই। বাড়িতে যোগাযোগ করার কোনো রাস্তাও নেই। কেনো মনে হচ্ছে এর পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র আছে ...
‘আছেই তো …’ কোথা থেকে যেন উত্তর ভেসে এলো। রক্তিম পেছন ফিরে দেখল এ তো আগের দিন সন্ধ্যার সেই কান্নায় ভেঙে পড়া মধুমিতা সরকার। কিন্তু মাতৃহারা অসহায় রূপ এখন আর তার নেই, এখন তার রুদ্রমূর্তি, সে এখানে সকলের পার্বতী মা।
—তুই কি ভেবেছিলি তোর পাপের হিসেব কোথাও জমা হবে না?
—মানে?
—এদের চিনতে পারছিস?
‘পৌলমী, ঋষিতা, মানালি... তোমরা? এখানে?’
—কি ভেবে ছিলি, তোর জীবন থেকে এদের ছেটে ফেলে দিবি, আর জ্বালাতে আসবে না? এরা সব তোর খেলার পুতুল? আমার মেয়েটাকে তো তিলে তিলে যন্ত্রণা দিয়ে মেরে ফেললি, এতো যন্ত্রণা দিলি যে সে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হলো।
সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার পর রক্তিম আর মৃত্তিকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি। ফলে তার আত্নহত্যার খবর ও তার অজানা ছিল। আজ মৃত্তিকার মা মধুমিতা দেবীর কাছে ওর মৃত্যুর খবর শুনে সত্যি কী ভেঙে পড়লো রক্তিম? কিছু বলার ভাষা নেই ওর এখন। নির্বাক চেয়ে আছে শুধু।
‘দিনের পর দিন একের পর এক নারীসঙ্গ করবি, প্রেমের ফাঁদে ফেলে যৌনক্রীড়া করবি, তারপর অপারগতা, অসহায়তার গল্প শুনিয়ে কেটে পড়বি, আর নিতান্তই কেউ ছাড়তে না চাইলে ব্ল্যাকমেল করে ছেড়ে দিতে বাধ্য করবি। তারপর আবার নতুন মুরগি... কী ভেবেছিলি তোর এই খেলা কেউ ধরতে পারবে না?’
—হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আমি অন্যায় করেছি কিন্তু এতো সব আপনি জানলেন কী করে?
—যে পাপ তুই এতদিন করে এসছিস, সেই সব পাপের প্রায়শ্চিত্ত তোকে আজ সুদে-আসলে মেটাতে হবে।
তারপর হঠাৎ চারদিক অন্ধকার। রক্তিম দেখে তার সেইসব প্রাক্তন প্রেমিকারা একে একে ছুটে আসছে। কেউ খুবলে নিচ্ছে চোখ, কেউ টিপছে গলা, কেউ কাটছে যৌনাঙ্গ। শুধু প্রাণে মারছে না। হৃদপিণ্ডটুকু ঢিপঢিপ করে উঠছে, নামছে। এই জ্যান্ত আধমরা প্রাণটুকু নিয়ে সে কী করবে এখন? শরীর ভর্তি ক্ষিদে নিয়ে সে হাঁটু গেড়ে হাত পেতে বসে পার্বতী মার সামনে। চারদিক রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে কাম। ভেসে যাচ্ছে দৃষ্টি।
এদিকে রক্তিমকে ফোনে না পেয়ে বাড়ির লোক চিন্তা শুরু করে। অফিস, বন্ধু-বান্ধব কেউ কোনো তথ্য জানে না। পুলিশে ডায়রি করা হলো। গোটা একটা দিন কেটে গেছে ওর কোনো খবর নেই। বৃদ্ধা বাবা, মা, স্ত্রী রিমি অসহায়ের মতো কান্নাকাটি করছে। বাচ্চা শিশুটি বারবার জিজ্ঞেস করছে, ‘মা, বাবা কখন আসবে?’ মেয়ের প্রশ্নের সামনে অসহায় রিমি অঝোরে কাঁদতে থাকে।
দিন যায়, রাত যায়। রক্তিমের খোঁজ মেলে না। জীবন চলতে থাকে জীবনের গতিতে নিজেদের মতো করে মেনে নিয়ে মানিয়ে নিয়ে। মাস কাটে, বছর কাটে। কেউ খোঁজ দিতে পারে না। কোথা থেকে যে কী হয়ে গেলো…
|| ২ ||
আজ যা ঠান্ডা পড়েছে, সারাদিন শুয়ে শুয়ে ল্যাদ খাচ্ছে রাই। কলেজ যেতে ইচ্ছে করছে না আজ। আর গিয়েই বা কি হবে, ঠিক মত ক্লাস হচ্ছে না। মা এর বয়স হয়েছে। ঘরে থাকলে একটু হেল্প হয়, সারাজীবন তো একাই কষ্ট করে রাইকে বড় করলো রিমি। পরশু ছাত্রীদের নিয়ে এক্সকারসানে যাওয়া হবে গোরুমারা, লাটাগুড়ি। তিন রাত্রি, চারদিনের একটা ছোটো ট্রিপ। এখনো কোথাও যাওয়ার হলে রিমিই রাইয়ের প্রয়োজনীয় সব গুছিয়ে ব্যাগে ভরে দেয়।
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের পথ। একটা অফবিট ডেস্টিনেশন। রিসর্টের পাস দিয়ে মূর্তি নদী একে বেঁকে গেছে দূরের পাহাড়ঘেরা জঙ্গলে। রিসর্টে পৌঁছেই এডভেঞ্চারপ্রেমী রাই ওর সহকর্মী রূপমকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো চারপাশের জঙ্গল ঘুরে দেখতে। রূপমের সঙ্গে ওর ইদানিং একটু বেশিই ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। ব্যাপারটা যে অন্য সহকর্মীদের নজরে পড়েনি, এমনটা নয়। একেই রাইয়ের অন্যত্র বিয়ের কথা সকলে জেনেছে, এদিকে আবার রূপমের সাথেও ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। সব মিলিয়ে স্টাফ রুমে সহকর্মীদের মধ্যে এখন ওকে নিয়ে হেব্বি গসিপ। ওসবে যদিও ভ্রূক্ষেপ নেই ওর।
সামনেই একটা ছোট পাহাড়ি নদী। নাম ঝালং। হাঁটুর নীচ অবধি জল। ওপাশের জঙ্গল থেকে হাতি আসে এখানে জল খেতে। রাই রূপমের হাতটা ধরে বললো, ‘চল, নদীটা পেড়িয়ে আরও কিছুটা যাই।’
—আর যাওয়াটা সেফ হবেনা আমাদের, রেসর্টে সবাই অপেক্ষা করছে, এরপর রাস্তা গুলিয়ে গেলে ফিরতে পারবো না, একটু পরেই বিকেল হয়ে যাবে, চল ফিরে যাই।
—তুই না বড্ড ভিতু, তুই যা তাহলে ফিরে, আমি একটু পর যাচ্ছি।
অগত্যা এই অচেনা জঙ্গলে রাইকে একা ছেড়ে যেতে পারল না রূপম, চললো ওর পিছু পিছু। পথ, পথের বাঁক পেরিয়ে তারা এগিয়ে চললো আরও গভীরে। হঠাৎই চোখে পড়ল একটি কুড়েঘর…
‘এরকম গভীর জঙ্গলে কুড়েঘর? এখানে মানুষ থাকে কী করে?’ ভাবতে ভাবতে ঘরটার দিকে এগিয়ে গেলো ওরা। সামনে ছোট্ট একটা ভাঙ্গা ফলকে লেখা—‘পার্বতী মার আশ্রম’। কীরকম অদ্ভুত গা ছমছমে পরিবেশ। ‘আশ্রম লেখা যখন একবার ঢু মেরে আসাই যায়, কী বল !’ বলে কালো একটা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লো ওরা।
‘পার্বতী মা আছেন?’
কারোর কোনো সাড়া নেই।
ভেতর থেকে একটা কান্নার স্বর ভেসে এলো। কে যেনো ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বলছে, ‘তুই এসেছিস মা? আমি জানতাম তুই ঠিক একদিন আসবি !’
বুকটা হু হু করে ওঠে। সেই কোন ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে রাই। বাবার মুখটাও তেমন মনে পড়ে না। তবু এই মুহূর্তে কেমন যেন বুকটা কেঁপে উঠল রাইয়ের। যেন বাবার আর্তনাদ শুনতে পেলো এখানে এসে। তবু কেউ কোত্থাও নেই। ‘বাবা, ও বাবা’—করে ডাকতেই কোত্থেকে খসে পড়ল চোখ, হাত, গলা, বুক।
ওদিকে রূপম চিৎকার করছে, ‘রাই আর ভেতরে যাস না। ওটা মরীচিকা বা কোনো ফাঁদ হতে পারে। কাকু আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন বহুবছর আগে, কেন মেনে নিতে পারছিস না?’
দূরের গ্রাম থেকে একদল বহুরূপী গান গাইতে গাইতে নদীর দিকে হেঁটে যাচ্ছে—
‘ফাঁদে এবার পড়লে ভালো/ বাপের টানে মেয়ে এলো/ শিকার শিকার খেলতে/ কারোর পিরিত লাগে না/ এই পিরিত পিরিত করিস ও মন/ পিরিত যেন ছাড়ে না!’
রাই দেখছে দু’হাত বাড়িয়ে তার বাবা যেন ডাকছে, অসহায় দৃষ্টিতে, কাতর কণ্ঠে...
অথচ কেউ কারোর কাছে ছুটে আসতে পারছে না, জড়িয়ে ধরতে পারছে না…



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন