কবরহীন কবি
সাবদার সিদ্দিকী বললেন, তুমি আবার প্ল্যানচেটের মোম জ্বালিয়েছ, তাই দেখা করতে এলাম। তুমি দেখছি আমার গল্পটা ছেপে দিয়েছ। কিন্তু আমি তো আরো কথা বলবো। এমন এক্সক্লুসিভ স্টোরি লিখে আর তর সইলো না? শুনেছি পাঠকেরা বলাবলি করছে ঢাকার এক উদ্বাস্তু কবি, যে কবরস্থানে রাত কাটায়, বেশ্যার ঘরে ভাত খায়, সে কিভাবে প্রমিত বাংলায় কথা বলে? ওরে, আমি তো কলকাতায় বড় হয়েছিলাম রে! ঢাকার রাস্তার ভাষা জানি না, তা নয়। ঠিক আছে, যখন গল্পের দরকারে বলতে হয়, তখন না হয় বলবো।
আমি সেদিন ভাবলাম, র্যাঁবো যে নানা দেশে ঘুরে বেড়ালেন, কবিতা ছেড়ে আফ্রিকায় গিয়ে ব্যবসা ধরলেন, জাভা দ্বীপে গিয়ে হারিয়ে গেলেন—উনার কি পাসপোর্ট ছিল? উনিও তো বর্ডারলেস পোয়েট। ক্রিস্টোফার মার্লো ছিলেন আর এক রহস্যময় কবি ও নাট্যকার। তুমি নাকি প্রথম অনুবাদ করতে শুরু করেছিলে মার্লোর ‘ডক্টর ফস্টাস’ থেকে? শুনলাম, তাঁর কবরটাও নাকি আমার মতোই অজ্ঞাত স্থানে আছে! যিনি রাখাল সেজে লিখলেন, মোর প্রিয়া হবে এসো রাখালরাণীর মতো একটা কবিতা, তিনি কি করে হাজারটা অপকর্মে জড়ালেন, আর কি ছিল তাঁর ঊনত্রিশ বছর বয়সে মৃত্যু রহস্য? আমি যাবো কিনা?—হ্যাঁ মার্লোর সাথে আমি দেখা করতে যাবো।
“Why should you love him whom the world hates so?
Because he love me more than all the world.”
―Christopher Marlowe
চলে গেলাম মার্লোর সাথে দেখা করতে। কিন্তু ওনার তো কবর নাই। লন্ডনের ডেপটফোর্ডের সেন্ট নিকোলাস চার্চের দেয়ালে তাঁর নামে একটা স্মারক ঝোলানো আছে। কবর কোথায় কে জানে? টেমস নদীর জলেও তাঁর সমাধি হওয়া সম্ভব। ওনাকে মোমবাতি জ্বালিয়েই খুঁজে বের করতে হলো।
মার্লোর তীক্ষ্ণ নাক আর গভীর বাম চোখটা যেন সবসময় কিছু একটা অনুসন্ধান করছে। ডান চোখটা নাই। চোখের মনি এতটাই গভীর যে, আমার দিকে তাকাতেই মনে হলো আমার মন ভেদ করছেন। মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি, একটা এলিজাবেথীয় চেহারা দিয়েছে। মার্লোর স্কিন হালকা বাদামি—রোদে পোড়া, কিন্তু সতেজ। মাথার চুল লম্বা আর এলোমেলো, যেন ভিঞ্চির হাতে আঁকা রুক্ষ পোর্ট্রেট। চুলগুলো পেছনে বাঁধা, কিন্তু একটু বাতাসেই এলোমেলো হয়ে যায়।
আমাকে দেখেই বললেন, কি রে পাগলা, কি চাস? তোকে কে ভিসা দিলো?
—ওস্তাদ, আমার তো ভিসা লাগে না। মইরা গিয়া ভিসাবিহীন বিশ্ব পাইছি।
—চল তোকে সুন্দর একটা জায়গায় নিয়ে গিয়ে জমিয়ে বসি। তারপর গল্প করি।
আমরা মুহূর্তের মধ্যে মধ্যযুগের রোমান শহর ইয়র্কে চলে গেলাম। মার্লো বললেন, এই রাস্তার নাম স্যাম্বলস। এই শহরে রোমানরা এসেছিলো, ভাইকিংরাও এসেছিলো। আমার জন্মের আগ থেকেই এখানে বাঁশের ঘরবাড়ি। এখনো তাই আছে। কসাইখানা ছিল। এই রাস্তায় গাড়ি চলা নিষেধ। ইউরোপের সবচাইতে লম্বা পায়ে হাঁটার পথ। দেখো, এখন কত জৌলুস! সারা দুনিয়ার লোক হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। ওই যে, হ্যারি পটারের সুটিং হয়েছিল ওই দোকানগুলোতে। চল, টার্কিস টি খেতে খেতে কথা বলি।
—আপনি কি জীবিত অবস্থায় এই এলাকায় ছিলেন কখনো?
—আমি কোথায় ছিলাম না বলো? পড়তাম তো কেমব্রিজে। বাবা তো জুতা বানাতো। স্কলারশিপ পেতাম। স্কলারশিপের পয়সায় কবিতা নাটক করতাম। নাটক হয়ে গেল সুপারহিট। নাটক থেকে যে টাকা আসতো, তাতে কেমব্রিজের মতো জায়গায় অত টাকা উড়ানো সম্ভব ছিলো না। রাণির লোকেরা আমাকে গুপ্তচরের দলে ঢুকিয়ে দিলো। ক্ষমতা পেয়ে গেলাম। টাকাও আসতে লাগলো। যা খুশি তাই করতাম। এর মধ্যে ‘ট্যাম্বারলেন’ লিখে ফেললাম। কিন্তু দেশ বিদেশ ঘুরে আর সাহিত্য করে তো ক্লাস করতে পারি নাই। ইউনিভার্সিটি আমার এমএ ডিগ্রি আটকে দিলো। রাজদরবার থেকে সদাচারী শুদ্ধাচারীর সার্টিফিকেট পাঠালো। কেমব্রিজ আমাকে ডিগ্রি দিতে বাধ্য হলো। আমি তো শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রি করে জ্ঞান অর্জন করেছি, টাকাও রোজগার করেছি! আমিই ডক্টর ফস্টাস! মেসেঞ্জার আর এঞ্জেলদের চাইতেও ডেঞ্জারাস হতে চেয়েছিলাম।
—আমি বিশ্বাস করি না। তাহলে আপনি যে এরেস্ট হইছিলেন? সেইটা কীভাবে?
—নেদারল্যান্ডে এক লোককে খুন করতে গিয়েছিলাম। ওখানে গিয়ে বিস্তর টাকা পয়সা খরচ করে বসে আছি। পাখি তো ধরা দেয় না। তখন সোনার টাকা জাল করলাম। ওখান থেকে বের করে দিল। মারপিট করে শ্রীঘরে তো ছিলামই।
—আপনি! এটাও বিশ্বাস করবো?
—হ্যাঁ, আমি তো খুনও করেছি দুই একটা। আমার নাটকের মধ্যেও আমার নিজের এই রকম একটা চরিত্র আছে। এখন গবেষকরা, মানে তোমাদের জীবনানন্দের সমারূঢ় অজর অমর অধ্যাপকেরা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করে ফেলছে সব। চাইলেই আমাকে আরেকবার ফাঁসি দেয়া যাবে! হা হা হা!
মার্লোর মুখে চাঁদের আলো পড়েছে। তাঁকে তাঁর ছবির চেয়েও সুন্দর, দিব্যকান্তি লাগছে। কিছুটা জীর্ণ হালকা বাদামি রঙের লিনেন শার্টের হাতার বোতামগুলো খোলা। ধূসর একটা প্যান্ট, পায়ে চামড়ার বুটজোড়াও কম পুরোনো নয়, কাদা-মাটির দাগে ভরা। ঊনত্রিশ বছরের যুবক, মাথার ভেতরে সৃষ্টির আগুন, আর সেই সাথে কি এমন ঝড় বইছিলো যে, নাটক দিয়ে দিগ্বিজয় করে সুনাম আর অঢেল টাকা হাতে পেয়েও এত সব দুস্কর্ম করে বেড়াতেন! আমি এই সুন্দর ঝলমলে পোশাক-পরা রাজপুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর কোনো কথাই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
—দ্যাখো, আমাকে মেরে ফেলেও হজম করতে পারবে না বুঝে রানী আমার লাশ গুম করে ফেললো। নাটক সাজালো। নাটকটা বরং আমাকে দিয়ে লিখালে পারতো। প্লটটা নিখুঁত আর বিশ্বাসযোগ্য হতো। ব্ল্যাংক ভার্সের ডায়ালগ দিতাম! লোকে এখনো সেই নাটক মঞ্চায়ন করতো! শেক্সপিয়ার কিন্তু ঠিকই সব বুঝতে পেরেছিলো। সে তাঁর একটা নাটকে সেই ইঙ্গিত দিয়েছে, যারা বুঝবার তাঁরা বুঝেছে।
— ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’?
—বিলকুল। আর কিছু বোকার দল ভেবেছে আমি আর শেক্সপিয়ার মিলে মরার নাটক সাজিয়ে আমি ভেগে গেছি। ফ্রান্সে বসে বসে নাটক লিখে শেক্সপিয়ারকে পাঠাতাম, আর তোমাদের ‘দ্য বার্ড’ নাকি নিজের নামে নাটক চালিয়ে দিতো। যত সব আহাম্মকের দল! Fools that will laugh on earth, most weep in hell.
আমরা হাঁটতে হাঁটতে মেরির অ্যাবির সবুজ ঘাসে ভরা মাঠে এসে পড়েছি। কাঠবিড়ালীগুলো লুকিয়ে গেলো। ভাঙ্গাচোরা অ্যাবির ফাঁক ফোকরে চাঁদের আলো আসছে। পরিবেশটা বদলে যাচ্ছে। নদীর পাড়ে এসে মার্লো আমাকে বসতে বললেন। মার্লোর কোমরে ঝোলানো চামড়ার ব্যাগ, যেটাকে অনেকে ডাকাতদের ব্যাগ বলে মজা করতো, সেই ব্যাগের ভেতর থেকে নোটবুক আর কলম সরিয়ে দুটো ছোট ছোট বোতল বার করলেন।
—এই নাও, স্কচ চলে?
—কি যে বলেন ওস্তাদ? আমি সারা জীবন চলছি বাংলা আর মৃত সঞ্জীবনীর উপর। তবে, খুব একটা নেশা ছিল - এমনও না।
—এ নদীর নাম জানো? আউজ নদী।
—এটাকে নদী বলে? আমাদের দেশে এগুলোকে খাল বলে। নদী হচ্ছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কর্ণফুলি, ব্রহ্মপুত্র ...
—কেন তোমাদের দেশে ধানসিড়ি আছে না? ধানসিড়ি যদি একজন কবিকে জন্ম দিতে পারে, সেই নদীকে তো আর খাল বলতে পারবা না...
এই চাঁদের আলোয়, নদীর পাড়ে বসে, পাকস্থলি ভরা আগুন নিয়ে এবারে মার্লোকে তাঁর মৃত্যুর গল্পটা শোনাবার আবদার করা যায়।
—ওস্তাদ, আপনি একুশ বছর বয়সেই দুনিয়ার নাট্যশালাকে বদলে দিলেন, আর আপনাকে ওরা মেরে ফেললো!
—All live to die, and rise to fall! আরে, আমার নামে তো অনেক কমপ্লেইন। আমি নাকি ধর্মবিরোধী, ইউনিভার্সিটিতে হরহামেশাই যীশু আর মাদার মেরিকে নিয়ে খিস্তি করি। আমাকে জেলে ভরলো। বিচারক নাই দেখে জামিনে ছেড়ে দিলো। তার কয়দিন পরে রানীর প্রাসাদের এক কর্মচারির বোনের বাড়িতে গুপ্তচরদের একটা দল আমাকে গোপন মিটিং-এ ডাকলো। আমি তো বুঝতে পেরেছি, নতুন কোনো এসাইনমেন্ট আসছে! জেলে থাকার চাইতে পয়সা কামাই করা ভালো না?
—আপনি তো নাটক লিখে অনেক পাউন্ড আয় করতেন। অকল্পনীয় পরিমান টাকা। তাই তো জানি।
—ওই যে তোমাদের কবি বলেছেন না, এ জগতে হায় সেই বেশি চায়! আর তাছাড়া নাটক লেখার প্রেরণার জন্য এমন রোমাঞ্চ কোথায় পাবো? আন্ডারগ্রাউন্ড লাইফ ছাড়া এমন দারুণ জীবন আর কোথায়?
—তারপর?
—হ্যাঁ, ওই যে, বুল বেটির বাড়ির ছোট সরাইখানায় গেলাম। রবার্ট পোলি এলো—সে ছিল মহারাণীর গোপন পত্রবাহক। আর ছিলো নিকোলাস স্কেয়ার্স নামের একজন গুপ্তচর। আমার স্পাইগিরির হাতে খড়ি ফ্রান্সিসের কাছে; তাঁর ভাই টমের চাকর ফ্রিজারও ছিলো। টম নিজেও একজন স্পাই ছিলো। টমকে আমি ‘হিরো এন্ড লিয়েন্ডার’ উৎসর্গ করেছিলাম। টমই আমাকে যেতে বলেছিলো। বলছিলো, কাজ আছে। টম নিজে মিটিং আসে নাই।
—কী কাজ ছিলো?
—সারাদিন খুব খানাপিনা, মৌজ মাস্তির ফাঁকে ফাঁকে দু-একটা কাজের কথা হচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম এগুলো আসল কথা না। আসল কাজটা নিশ্চয়ই খুব গুরুতর কিছু। সেকেন্ড রাত্রে আমাকে বেশি বেশি মদ খাইয়ে আমার বাবার পেশা নিয়ে খুব বাজে ভাবে কথা বলল, আমার জন্ম নিয়েও বাজে কথা বলতে লাগলো। আমি সারাজীবন মানুষকে গালি দিয়ে এসেছি, আমি কি চুপ থাকতে পারি? পলিকে ইচ্ছামতো গালাগালি দিলাম। জানি না ওরা এতক্ষণ অভিনয় করছিলো কিনা, এবারে দেখলাম ওরা সত্যি সত্যি খেপে গেল। পলি বললো, মেরে ফেল শালাকে! কিছু বুঝে উঠবার আগেই ফ্রিজার একটা ধারালো ছুরি বের করে আমাকে গেঁথে ফেলতে চাইলো। আমি সরে যাচ্ছিলাম। ছুরিটা এসে ঢুকলো আমার ডান চোখের ভেতরে। ফরেনসিক বলেছে, দুই ইঞ্চির মতো গর্ত হয়েছিল। ব্রেন পর্যন্ত তো ঢুকেছিলই। একদিকে ব্লিডিং অন্যদিকে ব্রেইন ইনজুরি। আমি ওই বুলের ঘরেই মারা গেলাম। এটা কিন্তু শেক্সপিয়ার বলেছে।
—ছোট্ট ঘরে বড় দেনা পাওনা?
—হ্যাঁ
—দেনাপাওনাটা কি ছিলো?
—রানীর লোকেরা গল্প সাজালো যে, আমরা নাকি থাকা, খাওয়া আর মদের বিল নিয়ে ঝগড়া করছিলাম। আমি ওই চাকরটার সাথে বিবাদে জড়াই আর তাঁকে মাথায় দুটো ঘুষি দিই। তখন সে নাকি ‘আত্মরক্ষার্থে’ আমাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে দুজনেই জানে বেঁচে যায়। সরকারি তদন্ত রিপোর্টে এটাই আছে। ফ্রিজার মেরেছে তাও লিখেছে। কিন্তু হারামজাদাকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়।
তার কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে আসছে, যেন কোথাও দূর থেকে গমগম করছে। তার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি লেগে আছে, যেন পৃথিবীর কোনো গোপন তথ্য বলবেন, কিংবা বলবেন না। সেই হাসিটা এমন যে, তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যাচ্ছে না, আবার অবিশ্বাসও করা সম্ভব না।
—ওস্তাদ, আপনি কি সত্যিই ফ্রিজারকে ঘুষি মারেননি? পুরো ঘটনাটা কি সাজানো ছিল?
মার্লো হেসে বললেন, ‘তোমার কি মনে হয়? আমি একজন গুপ্তচর ছিলাম, একজন কবি ছিলাম, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলাম। আর মানুষ তো খালি মিথ্যা কথা আর অন্যের নামে খারাপ গল্প গুজব শুনতে ভালোবাসে। হয়তো গল্পটা সাজানো হয়েছিল আমাকে দোষী প্রমাণ করার জন্য। হয়তো আমি সত্যিই কিছু ভুল করেছিলাম। কিন্তু পৃথিবীতে সত্য বলে কি কিছু আছে? আমি যে কোনো একটা কমুনিটির পক্ষে জোর প্রতিবাদ করছিলাম, সে কথা কি ইতিহাস বইতে আছে?
If we say that we have no sin,
We deceive ourselves, and there's no truth in us.
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। তাঁর কথাবার্তা আমার বিশ্বাস নাড়িয়ে দিচ্ছিলো।
—আপনার কি মনে হয়, আপনার মতো প্রতিভাবান মানুষকে কেন এমনভাবে শেষ হতে হলো?
—হয়তো এটাই শিল্পীদের নিয়তি। আমরা নিজেদের সৃষ্টি দিয়ে বেঁচে থাকি। কিন্তু সৃষ্টিই কখনো কখনো আমাদের ধ্বংস করে। Come not, Lucifer! I'll burn my books!
—বুঝেছি। শেক্সপিয়ার আপনাকে নিয়ে বানানো সেই মৃত্যুর নাটককে ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, ছোট্ট ঘরের বড় দেনাপাওনা মিটাতে গিয়ে পশুপালকের মৃত্যু!
—পশুপালকটা কে জানো তো?
আমি আর আবেগ সংযত করতে পারলাম না। মার্লোর পায়ের ধুলি নিয়ে বাঙালি একসেন্টে The Passionate Shepherd to His Love থেকে আওড়ালাম,
Come live with me and be my love,
And we will all the pleasures prove,
That Valleys, groves, hills, and fields,
Woods, or steepy mountain yields.
And we will sit upon the Rocks,
Seeing the Shepherds feed their flocks,
By shallow Rivers to whose falls
Melodious birds sing Madrigals.
কবিতাটা নজরুলের গানের মতো লাগে—মোর প্রিয়া হবে এসো রাণি। মার্লোর কবিতার বাকিটা বাংলায় শুনুন,
তোমার জন্য আমি বানাব গোলাপের বিছানা,
আর হাজারো সুগন্ধি ফুলের তোড়া,
ফুল দিয়ে সাজানো মুকুট আর
জারুল পাতার নকশা বোনা কাপড়।
সবার সেরা ভেড়ার লোমে বানানো পোশাক,
আমাদের ছোট্ট মেষশাবকের শরীর থেকে তোলা,
ঠাণ্ডার জন্য সুন্দর একজোড়া জুতো,
যার ফিতায় থাকবে খাঁটি সোনার কুড়ুপ।
খড় আর আইভির কুঁড়ি দিয়ে তৈরি বেল্ট,
লাল প্রবালের বন্ধনী আর হীরের অলংকার:
যদি এইসব আনন্দ তোমাকে টানে,
তাহলে এসো, সঙ্গে থাকো, প্রিয়া হও আমার।
রাখালের সাথীরা নাচবে আর গাইবে,
প্রতিটি মে মাসের সকালে তোমার খুশির জন্য:
যদি এইসব আনন্দ তোমার মন ভরায়,
তাহলে এসো, সঙ্গে থাকো, প্রিয়া হও আমার।
মার্লো আমার পাঠ শুনে পছন্দ করলেন। আমাকে হেড়ে গলায় নজরুলের গানটাও গেয়ে শোনাতে হলো। তিনি বললেন, খোঁপায় তারার ফুল, কানে সামার মুনের টপস, গলায় হাঁসের সারির নেকলেস, মেঘ রং চুলে বিজলির জরির ফিতা, রেইনবোর লাল রঙের আলতা, মুনলাইটের সাথে স্যান্ডাল উড মাখিয়ে দিচ্ছেন প্রিয়ার শরীরে— আমি তো পাগল হয়ে যাবো! এই ইমাজিনেশন তো সারা দুনিয়াতে নাই! কবিকে আমার স্যালুট পৌঁছে দিও।
—হ্যাঁ, আমার পাড়াতেই ইউনিভার্সিটি মস্কের পাশে গ্রেট নজরুল থাকেন। তিনি আমাদের ন্যাশনাল পোয়েট। অবশ্য সেই বাসা থেকে আমি কিছুদিন আগে মেট্রো রেলের কারণে উচ্ছেদ হয়েছি। কিন্তু নজরুলের মাজারে আমার যাওয়া আসা আছে। আমার নিজেরও এখন কবর নাই। আপনার মতোই।
তিনি শেষবারের মতো গলা ভিজিয়ে বললেন, সেই একই রাজপরিবার তো এখনো আছে। ওরা আমাকে বলেছে আমি বিদ্রোহী, গুপ্তচর, নাস্তিক, সমকামী, খামখেয়ালি, জালিয়াত, রাস্তার গুন্ডা এটসেট্রা এটসেট্রা এটসেট্রা। তোরা আমাকে কবি স্বীকৃতি না দিলে সারা দুনিয়া কি আমাকে পড়তো না? পাঁচশো বছর পরেও ক্রিস্টোফার মার্লোর কবিতা মানুষ পড়ে না? তোরা আমাকে মেরে ফেললি, বিচার করে প্রকাশ্যে মারতি? আমি নাটকের জন্ম দিয়েছি, আর আমাকে নিয়ে নাটক করিস? ভণ্ডামির একটা সীমা থাকা উচিৎ! আমাকে একটা কবর পর্যন্ত দিতে পারলি না। আর এখন ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবির ‘পোয়েটস কর্নার’-এ আমাকে নিয়ে স্মারক বসাতে হয় কেন? পাপ কি ঢাকা পড়ে? আমার পাপ আমার বাপকে ছাড়ে নাই। তোদের পাপও তোদের মাকে ছাড়বে না!
আমি বুঝতে পারছিলাম, অপ্রিয় প্রসঙ্গে না এসে নিছক আড্ডা দিলেই ভালো হতো। মার্লোর সঙ্গে এই সাক্ষাৎ হয়তো শেষের দিকে এগোচ্ছে। তাঁর চোখে বিষণ্নতার ছায়া। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার মৃত্যু নিয়ে যে রহস্য, আপনি কি চান, মানুষ সেটা জানুক?’
মার্লো গভীর নিশ্বাস নিয়ে বললেন, ‘লন্ডনে তখন প্লেগ ছড়াচ্ছে। অপঘাতে না মরলেও, ধার্মিকদের মতে মৃত্যুর দিন যদি নির্দিষ্ট হয়েই থাকে, তাহলে আমি হয়তো প্লেগেও মারা যেতে পারতাম। আফসোস করি না। মানুষ রহস্য ভালোবাসে। আমার মৃত্যু, আমার কবরহীনতা, আমার সৃষ্টির আগুন—সব মিলিয়েই আমি আজ স্মরণীয়। আমার কবর নেই, কিন্তু আমি তোমাদের স্মৃতির মধ্যে বেঁচে আছি। আমার কবর খুঁজো না সাবদার সিদ্দিকী। বরং আমার কবিতায়, নাটকে, চরিত্রে আমাকে খুঁজে নাও। ওখানেই আমার আসল সমাধি।’
আমি চুপ করে গেলাম। তাঁর কথাগুলো আমার মনের ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তাঁর দিকে শেষবারের মতো তাকাই। পূর্ণ চাঁদের আলো তাঁর মুখে পড়ে তাঁকে দেবদূতের মতো লাগছিল। তিনি উঠে বললেন, ‘ওই যে ঘাটে একটা নৌকা বাঁধা আছে। র্যাঁবোর মাতাল তরণী। তুমি উঠে পড়ো।’
মার্লো তাঁর লম্বা আঙুল দিয়ে একটা পাথর তুলে নদীর পানিতে ছুঁড়ে দিলেন। একটা শব্দ হলো। তিনি বললেন: ‘আমার নামে যে সব অভিযোগ ছিল, তার অর্ধেক মিথ্যা আর অর্ধেক সত্য। তবে আমার মৃত্যুর ঘটনাটা একটা ষড়যন্ত্র ছিলো।’
তিনি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি নদীর পাড়ে বসে রইলাম, যেন স্বপ্ন থেকে জেগে উঠতে পারছি না।
এসো পর্বতমালা এসো আমাকে আচ্ছাদিত করে ফেলো
ঈশ্বর প্রেরিত প্রেতাত্মার কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলো এই নিরাশ্রয়কে
পৃথিবী বাঁচাবে আমাকে?
বিপুলা পৃথিবীর দিকে আমি এক অন্ধ দৌড়বাজ
হায়! গ্রহের মতো দেখতে এ বিশাল হাঙ্গর আমাকে দেবে না ছাড়
নক্ষত্রের দল! আমার জন্ম-মুহূর্তকে করেছো শাসন
তোমাদের হস্তক্ষেপে নির্ধারিত হয় মৃত্যু আর নরক,
আমাকে হীনপ্রভ কুজ্ঝটিকার মতো উঠিয়ে নিয়ে যাও
ওই গর্ভবতী মেঘেদের ভেতরে।
তারপর মেঘ, যখন তুমি বমন করবে বাতাসে
আমার শরীর তোমার ধূমল মুখবিবর থেকে নির্গত হয়ে যাবে
আমার আত্মা হয়তোবা আরোহন করবে স্বর্গের সিঁড়িপথে ।
ওহ! অভিশপ্ত আত্মাদের কোনো মৃত্যু নাই মৃত্যু থাকে না
দেহ থেকে এই আত্মা দেবে উড়াল, আমার রূপান্তর হবে
কোনো পশুর আত্মায়।
পশুরাও কতো সুখী! মৃত্যুর সাথে সাথে
ওদের আত্মা দ্রুত দ্রবীভুত হয়ে যায় বস্তুর ভেতর;
আর আমার আত্মা রয়ে যাবে অবিনশ্বর, নরকের দুর্বিপাকে।
আত্মা আমার আত্মা, ক্ষুদ্র জলবিন্দুতে পরিণত হও
পতিত হও বিশাল সমুদ্রে – কেউ পাবে না খুঁজে আর!
(ক্রিস্টোফার মার্লো, ‘ডক্টর ফস্টাস’-এর অংশবিশেষ, লেখকের অনুবাদ)
পড়ুন ► অন দ্য বর্ডার



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন