আবুল হাসানের বহুমাত্রিক ‘রাজহাঁস’

অ+ অ-

 

বাংলা কবিতায় রাজহাঁস একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক প্রতীক। ভারতীয় পুরাণ ও সংস্কৃত সাহিত্যে হংস বা রাজহংস জ্ঞান, পবিত্রতা, সৌন্দর্য ও আত্মিক উৎকর্ষের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সরস্বতীর বাহন হংস; উপনিষদে পরমহংস শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সংসার অতিক্রমী জ্ঞানীর অর্থে। এই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বাংলা কবিতাতেও প্রবাহিত হয়েছে, তবে বিভিন্ন কবির হাতে রাজহাঁসের অর্থ ও তাৎপর্য বদলে গেছে। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় হংস সাধারণত সৌন্দর্য, গতি ও আত্মিক মুক্তির অনুষঙ্গ। ভারতীয় কাব্য-ঐতিহ্যে হংস যুগল অবিচ্ছেদ্য প্রেমের রূপক; নজরুল সেই ঐতিহ্যকে ব্যবহার করে মোরা আর জনমে হংস-মিথুন ছিলাম গীতিকবিতায় প্রেমকে পার্থিব সীমা অতিক্রমী, জন্মান্তরব্যাপী এক আত্মিক বন্ধনে উন্নীত করেছেন।

জীবনানন্দ দাশের হাতে বনহংস বা বনহংসী হয়ে ওঠে প্রেম, অন্তরঙ্গতা এবং হারানো স্বর্গের প্রতীক। কিন্তু আবুল হাসানের কবিতায় এসে এই রাজহাঁস এক বিশেষ অর্থ লাভ করে। এটি আর কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; বরং হয়ে ওঠে যুদ্ধবিধ্বস্ত সময়ের বিরুদ্ধে এক শুভ্র অবস্থান, শহীদ হয়ে যাওয়া প্রিয়জনের স্মৃতি, ভালোবাসার পুনরাগমন এবং মৃত্যুকে অতিক্রম করে বেঁচে থাকার এক প্রতীকী ভাষা। আবুল হাসানের মৃত্যুর পর নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী যখন তাঁর বিখ্যাত রাজহংস কবিতাটি লেখেন, তখন সেটি যেন আবুল হাসানেরই রূপান্তরিত অবয়ব হয়ে ফিরে আসে। রাজহংস কবিতায় নীরেন্দ্রনাথ লিখছেন

দর্পিত ভঙ্গিতে নেমে আসছে রাজহাঁস।
জলের দুই দিক থেকে বৃক্ষ লতাগুল্ম আর ঘাস
দেখে নেয় তাকে...
এমনকি আকাশও চোখ রাখে
শাল্মলী ও সেগুনের জানালায়।
রাজহংস ছুটে আসে, ছুটে আসতে-আসতে থেমে যায় 
কখনো-বা।
নির্জনতা স্তব্ধ হয়ে দেখে তার শোভা।
তরঙ্গ শোনায় তাকে গান।
আবুল হাসান,
তুমি নেই, কিন্তু সব মৃত্যুর উত্তরে 
ছবিটা এখনো মনে পড়ে।

(রাজহংস, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী)

 

এই কবিতায় রাজহাঁসের আগমন আসলে এক মৃত কবির প্রত্যাবর্তন। মৃত্যুর পরও যে সৌন্দর্য, বিশ্বাস ও স্মৃতি টিকে থাকে, রাজহাঁস তারই প্রতীক, সেই অমরতার বাহন। আবুল হাসানের অনেক কবিতায় রাজহাঁসের একাধিক প্রতীক আছে। নীরেন্দ্রনাথের কবিতার রাজহাঁস কবির কবিতার হারানো চরিত্রগুলোকেও বহন করেস্মৃতির প্রতীক হিসেবে।

রাজহাঁসের এই প্রতীকী ইতিহাসের সূত্র আরও পেছনে খুঁজে পাওয়া যায়। ডব্লিউ বি ইয়েটস তাঁর বিখ্যাত The Wild Swans at Coole কবিতায় রাজহাঁসকে সময়ের বিরুদ্ধে স্থিতি, যৌবনের স্মৃতি এবং মানুষের ক্ষয়িষ্ণু জীবনের বিপরীতে এক চিরন্তন সৌন্দর্যের প্রতীক করেছিলেন। ইয়েটস বৃদ্ধ হচ্ছেন, তাঁর চারপাশের পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, কিন্তু হ্রদের ওপর ভেসে থাকা রাজহাঁসেরা একই রকম তরুণ ও দীপ্ত। সেখানে রাজহাঁস সময়কে অতিক্রম করে চলমান এক অস্তিত্ব: 

এখনও তারা ক্লান্তিহীন, যুগল থেকে যুগলে,
শীতল অথচ সঙ্গময় স্রোতে ভেসে চলে,
অথবা আকাশে উড়ে যায় অবলীলায়;
তাদের হৃদয় আজও বার্ধক্য জানে না;
প্রেম কিংবা বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা,
যেদিকেই যাক, তাদের সঙ্গ ছাড়ে না।

বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশ সেই রাজহাঁসকে আরও অন্তরঙ্গ ও ব্যক্তিগত স্তরে নিয়ে আসেন। তাঁর কবিতায়

আমি যদি হতাম বনহংস,
বনহংসী হতে যদি তুমি...

এখানে রাজহাঁস প্রেমের, সহাবস্থানের এবং পৃথিবীর কোলাহল থেকে দূরে একটি নির্জন আশ্রয়ের প্রতীক। মানুষের ইতিহাস, যুদ্ধ, রাজনীতি ও নগরজীবনের বিপরীতে তারা প্রেম ও অস্তিত্বের এক গোপন ভূগোল নির্মাণ করে। তাঁর কবিতায় পাখিটি মূলত অন্তরঙ্গতার এবং হারিয়ে যাওয়া স্বর্গের প্রতীক। জীবনানন্দের বনহংস ও বনহংসী ইতিহাসের নয়, রাজনীতির নয়; তারা দুজন মানুষের অন্তরঙ্গ স্বপ্নের বাসিন্দা। তাদের উড্ডয়ন বাস্তব পৃথিবী থেকে কল্পনার রুপালি শস্যক্ষেতের দিকে

তোমার পাখনায় আমার পালক,
আমার পাখনায় তোমার রক্তের স্পন্দন

নজরুলের মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী, দেবো খোঁপায় তারার ফুল গানেও হংস বা রাজহাঁসের এক অভূতপূর্ব  অনুষঙ্গ আছে

কণ্ঠে তোমার পরাবো বালিকা
হংস-সারির দুলানো মালিকা 

ভারতীয় নন্দনতত্ত্বে হংস জ্ঞান, সৌন্দর্য ও প্রেমের বাহক। তাই নজরুলের কবিতা ও গানে হংস-মিথুন, হংস-মালিকা কিংবা রাজহাঁসের চিত্রকল্প বারবার প্রেমের এক উচ্চতর, প্রায় স্বর্গীয় রূপকে প্রকাশ করে। কিন্তু আবুল হাসান এসে এই ঐতিহ্যের ভেতর একটি মৌলিক ভাঙন ঘটান। আবুল হাসান রাজহাঁসকে সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক ও মানবিক অর্থ দেন। তিনি নিসর্গ, জন্মান্তরের প্রেম, স্বপ্নলোক থেকে বেরিয়ে এসে রাজহাঁসকে নিয়ে আসেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের বাস্তবতায়। তাঁর কবিতায় রাজহাঁস হয়ে ওঠে স্মৃতি, শোক, হারিয়ে যাওয়া মানুষ এবং ইতিহাসের ক্ষতের বাহক। কারণ তাঁর কবিতার পটভূমি মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, হারিয়ে যাওয়া মানুষ এবং বিপর্যস্ত সমাজ।

উচ্চারণগুলি শোকের কবিতায় তিনি লিখছেন

লক্ষ্মী বউটিকে আমি আজ আর কোথাও দেখি না,
হাটি হাটি শিশুটিকে কোথাও দেখি না,
কতগুলি রাজহাঁস দেখি,
নরম শরীর ভরা রাজহাঁস দেখি।

এখানে রাজহাঁস আসলে অনুপস্থিত মানুষের উপস্থিতি। লক্ষ্মী বউ, শিশুটি, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছোট ভাইটিসবকিছু রাজহাঁসের শরীরে প্রতীকীভাবে ফিরে আসে। যুদ্ধের পরেও শহীদ স্মৃতি অমোচনীয়। সেই স্মৃতিরই শুভ্র অবয়ব  রাজহাঁস।

'উচ্চারণগুলি শোকের' প্রথম ছাপা হয়েছিলো ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি দৈনিক বাংলার রোববারের সাহিত্য পাতায়। সেই কবিতায় শুরুতেই আছে আছে শাদা বউ, আর বইতে কবিতাটি শুরু হয়েছে লক্ষ্মী বউ দিয়ে। গ্রন্থাকারে প্রকাশের আগে তিনি শাদা বউকে লক্ষ্মী বউ করে দিয়েছেন। তিনি কি এমন কাউকে চিনতেন যে বউটি তাঁর শ্বশুরবাড়িতে বা পাড়ায় শাদা বউ নামে পরিচিত ছিলেন। হয়ত তাঁর একটি শিশুও ছিল, স্বামীর সংসারে ছিল সুখী গৃহকোণ। মুক্তিযুদ্ধের পর সেই বউটিকে আর চোখে পড়েনি। শাদা বউকে তিনি রাজহাঁসের প্রতীকে চিত্রায়িত করলেন। শাদা বউ আর রাজহাঁসের শুভ্রতা আমাদেরকে গৌরবময় মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দেয়। 

যারা দেশ স্বাধীন করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন, অবশেষে তাঁরা কি ধীরে ধীরে এই দেশের নিসর্গ ও প্রকৃতির ভেতর মিশে গেলেনকোনো ধন্যবাদ ছাড়াই, কোনো কৃতজ্ঞতা ছাড়াই, কোনো স্বীকৃতি না পেয়েই?

তবে কি বউটি রাজহাঁস?
তবে কি শিশুটি আজ সবুজ মাঠের সূর্য, সবুজ আকাশ ?

অনেক যুদ্ধ গেলো,
অনেক রক্ত গেলো,
শিমুল তুলোর মতো সোনারূপো ছড়ালো বাতাস।

আবার আবুল হাসানের স্রোতে রাজহাঁস আসছে কবিতায় রাজহাঁস সম্পূর্ণ ভিন্ন এক তাৎপর্যে আবির্ভূত হয়। এখানে তারা শোক, অনুপস্থিতি কিংবা হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতির প্রতীক নয়; বরং পুনরাগমন, পুনর্জন্ম এবং আশার প্রতীক। কবি লিখছেন

পুনর্বার স্রোতে ভাসছে হাঁস, ভাসতে দাও
কোমল জলের ঘ্রাণ মাখুক হাঁসেরা;
বহুদিন পর ওরা জলে নামছে, বহুদিন পর ওরা কাটছে সাঁতার
স্রোতে রাজহাঁস আসছে, আসতে দাও,

বহুদিন পর যেনো রোদ আসছে, আসতে দাও
নত হতে দাও আকাশকে,
আর একটু নত হোক আলো
আর একটু নির্জন হোক অন্ধকার!

এই কবিতায় রাজহাঁসের আগমন প্রকৃতপক্ষে আলোর প্রত্যাবর্তনের সমার্থক। রাজহাঁস আসছে মানে রোদ আসছে, অন্ধকার আরও পেছনে সরে যাচ্ছে। ফলে রাজহাঁস এখানে একটি জীবন্ত প্রতীক, যা  ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও জীবনের পুনর্গঠনের সম্ভাবনাকে বহন করে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সামাজিক ও মানসিক বাস্তবতায় এই চিত্রকল্প বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যুদ্ধ মানুষের ঘরবাড়ি, সম্পর্ক, বিশ্বাস ও স্বপ্নকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল; কিন্তু সেই ধ্বংসের মধ্যেও জীবন থেমে থাকেনি। রাজহাঁসের জলে ফিরে আসা সেই স্বাভাবিক জীবনশক্তিরই কাব্যিক রূপ।

কবিতার শেষাংশে প্রতীকটি আরও বিস্তৃত অর্থ ধারণ করে

আমরা নৌকার জলে ভাসতে ভাসতে যেনো প্রতীকের হাঁস
ঐ রাজহাঁস
জল থেকে আরো জলে,
ঢেউ থেকে আরো ঢেউয়ে ছড়াতে ছড়াতে
পৌঁছে যাবো আগে।

এক পর্যায়ে মনে হয় কবি নিজেই রাজহাঁসের রূপ ধারণ করছেনস্মৃতি, শোক, স্বপ্ন ও আশার শুভ্র ডানায় ভর করে ইতিহাসের অন্ধকার অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছেন। এই রাজহাঁস ভবিষ্যতের দিকে যাত্রার প্রতীক, যা স্থবিরতা অতিক্রম করে আরো বড় ও ভিন্নতর পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আবুল হাসানের রাজহাঁস সৌন্দর্যের অনুষঙ্গের ঊর্ধে উঠে মানুষের টিকে থাকার ইচ্ছা, পুনর্নির্মাণের শক্তি এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

এই দিক থেকে আবুল হাসানের রাজহাঁস নজরুলের হংসমিথুন, জীবনানন্দের বনহংস কিংবা ইয়েটসের বুনো রাজহাঁসের চাইতে  আলাদা। জীবনানন্দের বনহংস প্রেম ও নির্জন আশ্রয়ের স্বপ্ন বহন করে, ইয়েটসের রাজহাঁস সময়ের বিরুদ্ধে স্থিত জীবনীশক্তির প্রতীক, আর আবুল হাসানের রাজহাঁস ইতিহাসের ক্ষত বয়ে নিয়েও ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসরমান মানুষের প্রতিরূপ। তাই তাঁর কবিতায় রাজহাঁস কখনো শোকের, কখনো স্মৃতির, আবার কখনো পুনর্জাগরণ ও আশার চলিষ্ণু প্রতীক হয়ে ওঠে।

একটা কিছু মারাত্মক কবিতায় অনেক প্রশ্নের সাথে আবুল হাসানের আরেকটি বিখ্যাত প্রশ্ন ছিল

একটা কিছু মারাত্মক ঘটেছে কোথাও,
নইলে নয়টি অমল হাঁস
থেঁতলে যায় ট্রাকের চাকায়?

এই প্রশ্নটি কেবল কয়েকটি পাখির মৃত্যুর প্রশ্ন নয়। এটি একটি সভ্যতার নৈতিক বিপর্যয়ের প্রশ্ন। যে সমাজে অমল হাঁস পিষ্ট হয়, সেই সমাজে ভালোবাসাও বিপন্ন হয়ে পড়ে। তাই কবি পরক্ষণেই জিজ্ঞেস করেন

ভালোবাসা, কেবলই... কেবল একটি
বাজেয়াপ্ত শব্দের তালিকা হয়?

এখানে রাজহাঁস আর নিছক শুভ্র সুন্দরের প্রতীক নয়; বরং শুভ্রতার ওপর সংঘটিত সহিংসতার প্রতীক। যুদ্ধ, গুম, হত্যা, প্রতিশোধ ও রাষ্ট্রীয় নির্মমতার বিপ্রতীপ কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নিরীহ সৌন্দর্যের প্রতীক। 

এই কারণেই আবুল হাসানের রাজহাঁসকে কেবল প্রকৃতির পাখি হিসেবে পড়লে ভুল হবে। এটি তাঁর কবিতার অন্যতম কেন্দ্রীয় রূপক। কখনো হারিয়ে যাওয়া মানুষ, কখনো স্মৃতি, কখনো স্বাধীনতা, কখনো প্রেম, কখনো মৃত্যুর পরও টিকে থাকা বিশ্বাসসবকিছুরই বাহক এই রাজহাঁস। এর অনেক বছর পর আবুল হাসানের অগ্রজ কবি আল মাহমুদও ভিন্ন এক রাজহাঁসকে শনাক্ত করে আরব্য রজনীর রাজহাঁস শিরোনামে সমার্থবোধক কবিতা লিখেছেন

আমি বলি, হে আরব্যরজনীর রাজহাঁস,
তুমি কেন পৃথিবীর পাশব শিকারীদের মধ্যে নেমে এলে?
তোমার ডানায় বেহেস্তের গন্ধ। তোমার মাংসে 
লবণপর্বতের হাওয়ার আস্বাদ।
হায় হতভাগ্য পাখি।

আবুল হাসানের কবিতায় রাজহাঁস স্মৃতি, শোক, মৃত্যু, ভালোবাসা এবং পুনর্জাগরণের এক বহুমাত্রিক প্রতীক। ইয়েটসের রাজহাঁস সময়ের ক্ষয়ের বিরুদ্ধে চিরন্তন জীবনীশক্তির প্রতীক, জীবনানন্দের বনহংস প্রেম ও নির্জন আশ্রয়ের স্বপ্ন বহন করে; কিন্তু আবুল হাসান সেই ঐতিহ্যকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতায় এনে নতুন অর্থ দেন। উচ্চারণগুলি শোকের-এ রাজহাঁস নানা বয়সী নারী ও পুরুষ শহীদদের  স্মৃতি বহন করে, স্রোতে রাজহাঁস আসছে-তে তারা পুনর্জন্ম, আলোর প্রত্যাবর্তন ও ভবিষ্যতের আশার প্রতীক হয়ে ওঠে, আর একটা কিছু মারাত্মক কবিতায় তারা পিষ্ট মানবতা ও আহত শুভ্রতার রূপ ধারণ করে। এ কারণেই নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী আবুল হাসানের মৃত্যুর পর রাজহাঁসের মধ্যেই কবির পুনরাগমন দেখতে পান, আর আল মাহমুদের রাজহাঁসও নিষ্ঠুর পৃথিবীর বিপরীতে সৌন্দর্য ও পবিত্রতার প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। ফলে রাজহাঁসের নরোম শরীর আর জলের ঘ্রাণ মাখা সাঁতারের উল্লেখে আবুল হাসানের কবিতায় স্নিগ্ধতা ও নৈসর্গিক চিত্র ফুটিয়ে তুলে না তা নয়, কিন্তু শেষাবধি তা প্রচলিত প্রতীক ভেঙে তাঁর কাব্যজগতের কেন্দ্রীয় রূপক হয়ে দাঁড়িয়েছেযেখানে ইতিহাসের রক্তাক্ত অন্ধকার ও বারুদের গন্ধের মধ্যেও মানুষ, তার স্বাধীনতা, তার স্মৃতি, তার বিষাদ এবং আশার শুভ্রতা বেঁচে থাকে।