অস্কার ওয়াইল্ড: সৃজনশীল শিখর থেকে ভিক্টোরীয় কারাগারে

অ+ অ-

 

দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে প্রকাশের পর অস্কার ওয়াইল্ডকে ঘিরে যে বিতর্ক, সাহিত্যিক আক্রমণ এবং সামাজিক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল, তা তাঁর সৃষ্টিশক্তিকে স্তব্ধ করতে পারেনি; বরং পরবর্তী কয়েক বছর তাঁর সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে উর্বর ও নাটকীয় পর্বে পরিণত হয়। অনেক লেখকের ক্ষেত্রে সমালোচনা আত্মসংশয় তৈরি করে, অথচ ওয়াইল্ডের ক্ষেত্রে তা যেন তাঁর শিল্পীসত্তাকে আরও ক্ষুরধার করে তুলেছিল। উপন্যাসটির বিরুদ্ধে অশ্লীলতা, অবক্ষয় এবং বিপজ্জনক নান্দনিকতার অভিযোগ উঠলেও তিনি নিজের শিল্পদর্শন থেকে সরে যাননি। সৌন্দর্য, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সামাজিক ভণ্ডামি এবং তার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কামনা সম্পর্কে তাঁর চিন্তা আরও সুসংহত হয়ে নাটকের সংলাপ, চরিত্র ও পরিস্থিতির মধ্যে নতুন রূপ লাভ করে।

এই সময়েই তিনি রচনা করেন লেডি উইন্ডারমিয়ারের ফ্যান, আ উইম্যান অব নো ইম্পর্ট্যান্স, অ্যান আইডিয়াল হাজব্যান্ড এবং তাঁর নাট্যপ্রতিভার পূর্ণতম নিদর্শন দ্য ইম্পর্ট্যান্স অব বিইং আর্নেস্ট। এই নাটকগুলিতে ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের সামাজিকতা, বিবাহপ্রথা, উচ্চবিত্ত সমাজের আত্মপ্রবঞ্চনা, পুরুষের সুবিধাবাদ এবং নারীর ওপর আরোপিত শুদ্ধতার দায়কে তিনি এমন এক কৌতুকময় ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে হাসির আড়ালেই সামাজিক বিচারের তীক্ষ্ণতা লুকিয়ে থাকে। ওয়াইল্ডের কৌতুক ছিল প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহ। তাঁর নাটকের চরিত্রেরা সভ্যতার ভাষায় কথা বলে, অথচ তাদের আচরণ প্রকাশ করে সেই সভ্যতার অন্তর্গত অসঙ্গতি। ফলে দর্শক প্রথমে হাসে, পরে বুঝতে পারে যে হাসির লক্ষ্য অন্য কেউ নয়, তার নিজের সমাজ, নিজের  নিশ্চয়তা এবং নিজের শ্রেণিগত ভণ্ডামি।

বস্তুত ১৮৯৫ সালের এপ্রিল নাগাদ ওয়াইল্ড তাঁর সৃজনশীল ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছিলেন। লন্ডনের নাট্যমঞ্চে তাঁর নাটক বিপুল সাফল্য লাভ করছিল, অভিজাত সমাজে তাঁর উপস্থিতি ছিল আলোচনার কেন্দ্র, তাঁর পোশাক, রসবোধ, বাকচাতুর্য ও জীবনযাপন তাঁকে এক ধরনের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তিনি তখন একজন ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের আত্মসন্তুষ্ট তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক দৃশ্যমান প্রতীক। অথচ এই সাফল্যের ভিতরেই তাঁর পতনের উপাদানগুলো জমা হচ্ছিল। যে সমাজ তাঁর বুদ্ধি ও রসবোধে মুগ্ধ হয়েছিল, সেই সমাজই তাঁর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে প্রস্তুত ছিল।

ওয়াইল্ডের সঙ্গে কনস্ট্যান্স ওয়াইল্ডের বিবাহ হয়েছিল, তাঁদের দুই পুত্রও ছিল। পারিবারিক জীবনের এই সামাজিক কাঠামোর পাশাপাশি ওয়াইল্ড পুরুষদের সঙ্গে সমকামী সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন, এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও বিপর্যয়কর সম্পর্ক গড়ে ওঠে লর্ড আলফ্রেড ডগলাসের সঙ্গে, যিনি তাঁর চেয়ে ষোলো বছরের কনিষ্ঠ। এই সম্পর্ক ছিল আবেগ, আকর্ষণ, সামাজিক ঝুঁকি, শ্রেণিগত ক্ষমতা এবং পারস্পরিক অস্থিরতার জটিল সংমিশ্রণ। ডগলাসের সৌন্দর্য ও তারুণ্যে ওয়াইল্ড আকৃষ্ট হয়েছিলেন, অথচ তাঁদের সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল আত্মবিনাশী এক বেপরোয়া প্রবণতা। ডগলাসের পিতা, কুইন্সবেরির মার্কুইস, সম্পর্কটির ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ওয়াইল্ডের সংঘর্ষ শেষ পর্যন্ত আইনি বিপর্যয়ে রূপ নেয়, যার পরিণতি ওয়াইল্ড নিজেও প্রথমে অনুমান করতে পারেননি।

ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডে সমকামী সম্পর্ককে আইন অপরাধ হিসেবে গণ্য করত। ১৮৮৫ সালের ল্যাবুশের সংশোধনী পুরুষদের মধ্যে যৌন সম্পর্ককে গ্রস ইনডিসেন্সি বা গুরুতর অশালীনতা হিসেবে দণ্ডনীয় করেছিল। আইনটির ভাষা ইচ্ছাকৃতভাবে বিস্তৃত ও অস্পষ্ট ছিল, ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, চিঠিপত্র, সাক্ষাৎ এবং আচরণকে সহজেই অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেত। এই আইন রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত জীবনের অন্তরঙ্গ অঞ্চলে প্রবেশের ক্ষমতা দিয়েছিল। এক অর্থে ভিক্টোরীয় তা এখানে ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক শুদ্ধতার ধারণা এবং রাষ্ট্রীয় দণ্ডবিধির মিলিত রূপে প্রকাশিত হয়েছিল।

ওয়াইল্ড প্রথমে কুইন্সবেরির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছিলেন। কিন্তু বিচার এগোতে থাকলে তাঁর নিজের ব্যক্তিগত জীবনই আদালতের অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষের আইনজীবীরা ওয়াইল্ডের পরিচিত পুরুষদের, তাঁর চিঠি, তাঁর সামাজিক যোগাযোগ এবং তাঁর সাহিত্যকর্মকে এমনভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেন, যেন একজন শিল্পীর কল্পনা তাঁর ব্যক্তিগত অপরাধের দলিল। মামলা প্রত্যাহার করেও ওয়াইল্ড রক্ষা পাননি। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, এবং ১৮৯৫ সালের মে মাসে গ্রস ইনডিসেন্সি-র অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের কঠোর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এই বিচারের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য গভীর। আদালতে ওয়াইল্ডের জীবন এবং তাঁর সাহিত্যকে পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, যেন শিল্পকর্মকে শিল্পের শর্তে বিচার করার কোনও স্বাধীন ক্ষেত্র নেই। গবেষক নিকোলাস ফ্রাঙ্কেল ও অন্যান্য ওয়াইল্ড-বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে যে ডোরিয়ান গ্রে তাঁর বিরুদ্ধে সামাজিক সন্দেহ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল। কায়ের মতে, উপন্যাসটির লিপিনকটস মান্থলি ম্যাগাজিন-এ প্রকাশিত অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট সমকামী ইঙ্গিতপূর্ণ অংশগুলি আদালতে উচ্চস্বরে পড়ে শোনানো হয়েছিল। ফলে একটি উপন্যাসের চরিত্র, আকাঙ্ক্ষা ও সংলাপকে লেখকের  চরিত্রের প্রমাণে পরিণত করা হয়।

এখানে ভিক্টোরীয় বিচারব্যবস্থার একটি মৌল বিরোধ প্রকাশিত হয়। সমাজ ওয়াইল্ডের শিল্পরস গ্রহণ করেছিল, তাঁর নাটক দেখে হাসছিল, তাঁর বুদ্ধিমত্তাকে উদ্যাপন করছিল; অথচ সেই শিল্পের অন্তর্গত যৌন ও  জটিলতা যখন তাঁর ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে হলো, তখন প্রশংসাই দ্রুত শাস্তির দাবিতে রূপ নিল। সভ্যতা শিল্পীর ভাষা গ্রহণ করেছিল, শিল্পীর স্বাধীন অস্তিত্বকে গ্রহণ করতে পারেনি। যে সমাজ মুখোশের সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, ওয়াইল্ড সেই মুখোশের নির্মাণপ্রক্রিয়াই প্রকাশ করেছিলেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে বিচার ছিল একজন ব্যক্তির বিচার, একই সঙ্গে সমাজের আত্মরক্ষার এক নিষ্ঠুর উদ্যোগ।

ওয়াইল্ডের কারাবাস ছিল শারীরিক ও মানসিক উভয় অর্থেই ধ্বংসাত্মক। তাঁকে কঠোর শ্রম করতে হয়েছে, দীর্ঘ সময় একাকী থাকতে হয়েছে, অপ্রতুল খাদ্য ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সহ্য করতে হয়েছে। কারাগারের শৃঙ্খলা ব্যক্তিকে সংশোধন করার ভাষায় নির্মিত হলেও বাস্তবে তার উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তিসত্তাকে ভেঙে দেওয়া। ওয়াইল্ডের মতো একজন মানুষ, যার জীবন ভাষা, আলাপ, সামাজিক উপস্থিতি, সৌন্দর্যবোধ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, তাঁর জন্য এই নৈঃসঙ্গ্য ছিল বিশেষভাবে যন্ত্রণাদায়ক। কারাগার তাঁর শরীরকে দুর্বল করেছিল, তাঁর সামাজিক মর্যাদা নষ্ট করেছিল, তাঁর পরিবার থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করেছিল এবং তাঁর সৃষ্টিশীল আত্মবিশ্বাসকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল।

কারাগারে অবস্থানকালে তিনি লর্ড আলফ্রেড ডগলাসকে উদ্দেশ করে দীর্ঘ আত্মজিজ্ঞাসামূলক পত্র লেখেন, যা পরে ডে প্রোফান্ডিস নামে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি প্রেম, অহংকার, ভোগ, অপমান, দায়, আত্মপ্রবঞ্চনা এবং যন্ত্রণার অর্থ নিয়ে চিন্তা করেন। এই রচনায় তাঁর আগের নাটকগুলোর ঝলমলে বাকচাতুর্য অনেকখানি সরে যায়; তার জায়গায় আসে পরাজিত অথচ চিন্তাশীল এক মানুষের কণ্ঠস্বর। তিনি বুঝতে চেষ্টা করেন কীভাবে সৌন্দর্যের উপাসনা আত্মবিনাশে রূপ নিতে পারে, কীভাবে প্রেম ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যে বিকৃত হয়, এবং কীভাবে যন্ত্রণা মানুষকে তার নিজের অন্ধতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।

কারাগার থেকে মুক্তির পর ওয়াইল্ড আর আগের জীবনে ফিরে যেতে পারেননি। ইংল্যান্ডের সমাজে তাঁর নাম কলঙ্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে, তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে পড়েছে, তাঁর আর্থিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে এবং তাঁর স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতির দিকে গেছে। তিনি মূলত ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন কাটান। এই সময় তাঁর সৃষ্টিশীলতা প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায়। তিনি কিছু কবিতা ও গদ্য লিখলেও নাট্যকার হিসেবে যে ধারাবাহিক সৃষ্টি ১৮৯০-এর দশকের প্রথমার্ধে দেখা গিয়েছিল, তা আর ফিরে আসেনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য পরবর্তী রচনা দ্য ব্যালাড অব রিডিং গল, যেখানে কারাগারের অভিজ্ঞতা, অপরাধ, মৃত্যুদণ্ড এবং মানবিক সহমর্মিতা এক বিষণ্ন কাব্যিক রূপ লাভ করে।

১৮৯৭ সালে মুক্তির মাত্র তিন বছর পর, ১৯০০ সালের ৩০ নভেম্বর প্যারিসে ওয়াইল্ড মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ছেচল্লিশ বছর। এই অকালমৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের পরিণতি নয়; এটি এমন এক সভ্যতার  ব্যর্থতার নিদর্শন, যে সভ্যতা একজন শিল্পীর প্রতিভাকে গ্রহণ করেছিল, অথচ তাঁর মানবিক অস্তিত্বকে আইনের দণ্ডে চূর্ণ করেছিল।

ওয়াইল্ডের জীবন তাই শিল্প, তা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে একটি স্থায়ী প্রশ্ন রেখে যায়। শিল্পী কি তাঁর শিল্পকর্মের চরিত্র, কল্পনা ও আকাঙ্ক্ষার জন্য ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্ত হতে পারেন? সমাজ কেন শিল্পের স্বাধীনতাকে প্রশংসা করে, অথচ শিল্পীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে ভয় পায়? এবং যে তা মানুষের অন্তরঙ্গ জীবনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত করে, সেই তা সভ্যতার রক্ষক, নাকি তার গোপন নিষ্ঠুরতার ভাষা?

ওয়াইল্ডের পতন তাঁর শিল্পের পরাজয় ঘটাতে পারেনি। বরং ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে বিচার করলে দেখা যায়, যে আইন তাঁকে অপরাধী করেছিল তা বিলুপ্ত হয়েছে, যে সমাজ তাঁকে অপমান করেছিল তার  ধারণা বদলে গেছে, অথচ তাঁর নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও চিঠি এখনও পাঠ করা হয়। তাঁর বিচারকের নাম ইতিহাসের পাদটীকায় থেকে গেছে, তাঁর বাক্য এখনও জীবিত। এই বৈপরীত্যই সম্ভবত ওয়াইল্ডের জীবনের শেষ এবং সবচেয়ে গভীর বিদ্রূপ।