জসীমউদ্দীনের গ্রামবাংলার অন্তর্গত রূপ
জসীমউদ্দীনের সাহিত্য গ্রামবাংলার জীবনকে জীবন্ত করে তুলেছে। তাঁর লেখায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম, সুখ-দুঃখ, প্রেম ও নৈতিক অনুভূতিও প্রতিফলিত হয়েছে। এই প্রবন্ধে লক্ষ্য করা হবে, তাঁর দেখানো গ্রাম কি কেবল স্মৃতি ও কবিতার বিষয়, নাকি আধুনিক সময়ে কিছু অবশিষ্ট আছে। পাশাপাশি আলোচিত হবে গ্রামীণ জীবনযাত্রার পরিবর্তন—চাষের সরঞ্জাম, ঘরবাড়ি, পথঘাট এবং সামাজিক প্রথা—যাতে বোঝা যায়, জসীমউদ্দীনের গ্রাম এখনো কতটা রূপান্তরিত হয়েছে এবং তার সাহিত্যিক মূল্য কতটা প্রাসঙ্গিক।
বাংলা সাহিত্যের সমসাময়িক দুই পথিক—কাজী নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীনের—দু’জনেই অনন্য প্রতিভাধর কবি। তাদের সাহিত্যিক পথ আলাদা হলেও, উভয়েই ১৯২০-এর দশকে সক্রিয় ছিলেন। সাহিত্যিক উত্থান ও প্রসারকাল পুরোপুরি একই না হলেও উভয়ের লেখনী বাংলাসাহিত্যে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দিককে তুলে ধরে।
নজরুল ইসলামের লেখায় নগরজীবনের আলো-আঁধারি, বিদ্রোহ, শ্রমজীবী মানুষের ক্ষোভ এবং সামাজিক অন্যায় স্পষ্ট হয়। তাঁর কবিতায় শহরের ধুলো, কলকারখানার শব্দ এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জীবন্ত হয়ে ওঠে। নগরের মানুষকে তিনি সংগ্রামী, সচেতন এবং সমাজ পরিবর্তনের সক্ষম সত্তা হিসেবে দেখেছেন।
অন্যদিকে, জসীমউদ্দীনের সাহিত্য গ্রাম বাংলার শান্ত জীবনকে কাব্যিক দলিল হিসেবে ফুটিয়ে তোলে। তাঁর লেখায় শহরের কোলাহল নেই; সেখানে দেখা যায় জোসনার আলোয় ভিজে থাকা উঠোন, মাঠের ধারে ফুটে থাকা বুনো ফুল, কৃষকের হাতে কোদাল ও কাস্তে। মাঠ-ঘাট, নদী-খাল, কুঁড়েঘর ও মাটির ঘর, বকুল আর শালুকের গন্ধ, নকশী কাঁথা, শাড়ি, আলনা, শ্মশান ও কবরের স্তব্ধতা মিলিয়ে তৈরি হয় এক পরিচিত জীবনজগৎ। ধানক্ষেত, খেতের আল, খড়ের গাদা, নৌকা, বৈঠা এবং ঘাটকেন্দ্রিক মানুষের সরল জীবনযাপন স্বাভাবিক ছন্দে প্রবাহিত হয়। গ্রাম তার কাছে পটভূমি হয়ে থাকে না; এটি হয়ে ওঠে মাটির গন্ধমাখা জীবন্ত সত্তা, আন্তরিক মানচিত্র। যেখানে মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম এবং বিচ্ছেদ নিজের গতিতে চলমান।
নজরুল ইসলাম যেখানে সমাজ পরিবর্তনের ডাক দেন, জসীম উদ্দীন সেখানে মানুষের অন্তর্নিহিত অনুভূতি প্রকাশ করেন। একজন উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ জানান, অন্যজন নীরব যন্ত্রণার ভাষা দেন। এই পার্থক্য বাংলা সাহিত্যে বৈচিত্র্য তৈরি করেছে। জসীমউদ্দীনের গ্রামবাংলা মানবিকতার প্রতিচ্ছবি। তাঁর কবিতা ও গল্পে মানুষ দুঃখী হলেও সংবেদনশীল থাকে। অভাব থাকে, হৃদয়ের সংকীর্ণতা দেখা যায় না। সংকটের মাঝেও সহানুভূতির ধারা প্রবাহিত হয়।
শিল্প-সাহিত্যের দৃষ্টিতে তাঁর লেখা অত্যন্ত তাথৎপর্যপূর্ণ। গ্রামীণ জীবনকে তিনি সাহিত্যিক মর্যাদা দিয়েছেন। লোকজ ভাষা, আঞ্চলিক শব্দ এবং কথ্য ভঙ্গি তাঁর লেখাকে স্বতন্ত্র করেছে। তাঁর কাব্যে কৃত্রিম অলংকারের ছাপ নেই; চিত্রকল্প সরাসরি প্রকৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। নদীর ঢেউ, ধানের ক্ষেত, সন্ধ্যার আলো—সবই আবেগের বাহন হয়ে ওঠে। নজরুল ইসলামের সাহিত্য শক্তির প্রতীক, জসীমউদ্দীনের সাহিত্য অনুভূতির আশ্রয়। একজন মানুষের প্রতিবাদী সত্তা জাগান, অন্যজন মানুষের কোমল মন উন্মোচিত করেন। এই দুই ধারাই সমাজের অত্যাবশ্যক দিককে প্রকাশ করে। নগরের বাস্তবতা সমাজের অসাম্য বোঝায়। গ্রামের জীবন মানবিক শিকড়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। জসীমউদ্দীন দেখিয়েছেন সংস্কৃতি কেবল শহরে জন্মায় না। লোকজ জীবনেও গভীর শিল্পবোধ বিরাজ করে। গ্রামীণ মানুষ অশিক্ষিত হলেও অনুভূতিতে দরিদ্র নয়।
তার সাহিত্য পাঠককে ধীর হতে শেখায়। চুপচাপ জীবনের ভেতর তাকাতে উৎসাহ দেয়। হৃদয়ের ক্ষুদ্র অনুভূতিগুলোর মূল্য বোঝায়। এই কারণে জসীমউদ্দীনের গ্রামবাংলা কেবল স্মৃতির বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি বাঙালির মানবিক পরিচয় ও সংস্কৃতির এক অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর লেখা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ কেমন করে মানুষ থাকে। নজরুল ও জসীম উদ্দীন—দু’জনেই বাস্তবতার কথা বলেছেন। পথ আলাদা হলেও লক্ষ্য ছিল মানুষের মুক্তি। এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
জসীমউদ্দীন যে গ্রামকে তাঁর কবিতা ও গদ্যে ধারণ করেছেন, সেই গ্রাম আজ আর আগের মতো অক্ষত নেই। সময়ের প্রবাহ গ্রামীণ জীবনের গায়ে নতুন রেখা এঁকেছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এই বদলের ভেতরেও কি তাঁর দেখানো গ্রামের কিছু চিহ্ন টিকে আছে? মানুষের স্মৃতিতে, আচরণে, সম্পর্কের ভাঁজে কি সেই গ্রাম এখনো শ্বাস নেয়? এক সময় গ্রামের সকাল শুরু হতো ঢেঁকির শব্দে, গরুর গাড়ির চাকার ধীর ঘূর্ণনে, কুয়োর পাশে কলসি ভরার নরম কোলাহলে। আজ সেই শব্দ অনেকটাই ম্লান। ঢেঁকির জায়গায় এসেছে মিল, গরুর গাড়ির পথ দখল করেছে মোটরসাইকেল আর ভ্যান। তবু ভোরের আলো যখন ধানক্ষেত ছুঁয়ে যায়, তখন গ্রাম এখনো তার চিরচেনা রূপ কিছুক্ষণের জন্য ফিরে পায়। চাষের পদ্ধতিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। কোদাল ও কাস্তে এখনও দেখা যায়, যদিও তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে পাওয়ার টিলার, সেচ পাম্প আর যন্ত্রচালিত হারভেস্টার। কৃষকের হাতের ছন্দ বদলেছে, শ্রমের গতি বেড়েছে। তবু মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। বীজ বোনার সময়, ফসল কাটার ক্ষণে, মাঠের আল ধরে হাঁটার অভ্যাসে সেই পুরোনো ঘনিষ্ঠতা আজও টিকে আছে।
ঘরবাড়ির চেহারাও পাল্টেছে। মাটির ঘরের জায়গায় টিন আর পাকা দেয়াল উঠেছে। কুঁড়েঘরের সংখ্যা নেই বললেই চলে। আলনার পাশে ঝোলানো শাড়ির দৃশ্য আগের মতো চোখে পড়ে না। তবু কোনো কোনো বাড়িতে এখনো নকশী কাঁথা যত্নে রাখা থাকে, স্মৃতির মতো করে। এই কাঁথা শুধু ব্যবহার্য বস্তু হিসেবে বিবেচিত হয় না; এটি প্রজন্মের হাতে হাতে পৌঁছে যাওয়া অনুভূতির নথি। পথঘাটের রূপান্তর গ্রামীণ জীবনের গতি বদলে দিয়েছে। কাঁচা রাস্তার ধুলো ঢেকে গেছে পিচে। নৌকা ও বৈঠার ব্যবহার সীমিত হয়েছে। যদিও বর্ষার সময় নদী-খালের পুরোনো জীবন এক ঝলক দেখা দেয়। ঘাট এখন আর প্রতিদিনের মিলনস্থল না হলেও উৎসব বা সংকটের দিনে মানুষ সেখানে জড়ো হয়, যেমন আগে হতো।
সবচেয়ে গভীর পরিবর্তন এসেছে সামাজিক সম্পর্কে। যৌথ পরিবারের জায়গায় ছোট পরিবার বেড়েছে। মানুষ আগের মতো সারাক্ষণ একে অপরের খোঁজে থাকে না। তবু বিপদের সময়, মৃত্যুর পরে, বড় উৎসবে গ্রাম এখনো একত্র হয়। এই একত্র হওয়ার প্রবণতাই প্রমাণ করে— জসীমউদ্দীনের গ্রাম পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তিনি যে মানবিক গ্রাম দেখিয়েছেন, তা কেবল বস্তুগত কাঠামোর উপর দাঁড়ানো ছিল না। সেই গ্রাম গড়ে উঠেছিল সহানুভূতি, সম্পর্ক আর নীরব সহমর্মিতায়। আজ প্রযুক্তি, যোগাযোগ আর জীবিকার চাপ সেই কাঠামোকে বদলে দিয়েছে। তবু মানুষের চোখে চোখ রাখার অভ্যাস, কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। এই রূপান্তরের ভেতরেই জসীমউদ্দীনের সাহিত্য নতুনভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে। তাঁর গ্রাম আজ আর হুবহু বাস্তবের ছবির মতো নেই; এটি একটি মানদণ্ড, যার সঙ্গে বর্তমান গ্রামের তুলনা চলে। এই তুলনার মধ্য দিয়েই বোঝা যায়, আমরা কী হারিয়েছি, আর কী এখনো ধরে রেখেছি।
উদাহরণ ও বিশ্লেষণে বলা যায়— জসীমউদ্দীনের সাহিত্য গ্রামকে সাজানো দৃশ্য হিসেবে উপস্থাপন করে না; তিনি গ্রামকে জীবনের ভেতর থেকে তুলে আনেন। তাঁর কবিতা ও কাব্য কাহিনীতে গ্রামীণ মানুষের শ্রম, সম্পর্ক, অভাব এবং আবেগের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। প্রকৃতি সেখানে আলাদা কোনো অলংকারের মতো উপস্থিত ছিল না; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হিসেবে ছিল।
‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কাব্যে গ্রামীণ জীবনের এই বাস্তব রূপ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। সাজুর জীবন দারিদ্র্য, সামাজিক বাধা ও অসম্পূর্ণ প্রেমে ভরা। তার ঘর, মাঠ, নদী এবং নকশী কাঁথার দৃশ্য উপাদান হিসেবে আসে না; এগুলো সাজুর জীবনের দীর্ঘশ্বাস বহন করে। নকশী কাঁথা এখানে স্মৃতি, শ্রম এবং না-বলা কথার প্রতীক। গ্রামীণ নারী কীভাবে সেলাইয়ের ভেতর নিজের যন্ত্রণা গেঁথে রাখে, তা এই কাব্যে নীরবভাবে প্রকাশ পায়।
‘কবর’ কবিতায় জসীমউদ্দীন গ্রামবাংলার মৃত্যুচেতনা ও আত্মীয়তার অনুভবকে সামনে আনেন। গ্রামের মানুষ মৃত্যু এড়িয়ে চলে না; মৃত্যু তাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কবর এখানে ভয় বা আতঙ্কের চিহ্ন হয় না, বরং সম্পর্কের শেষ আশ্রয়। কবিতাটিতে শোক উচ্চকণ্ঠে প্রকাশ না পেয়ে, নীরবতা দিয়েই গভীর অনুভব তৈরি করেছে।
‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’-এ নদী গ্রামীণ জীবনের প্রাণস্রোত হয়ে ওঠে। নদী মানুষকে জীবিকা দেয়, আবার বিচ্ছেদও তৈরি করে। সোজনের প্রেম নদীর মতোই প্রবাহমান, আবার অনিশ্চিত। ঘাট এখানে মিলনস্থল ও বিচ্ছেদের চিহ্ন একসঙ্গে বহন করে। গ্রামে প্রেম ব্যক্তিগত অনুভবের হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমাজ, সম্মান এবং বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।
জসীমউদ্দীনের কবিতায় কৃষকের কোদাল ও কাস্তে, ধানক্ষেতের আল, খড়ের গাদা, নৌকা ও বৈঠা বারবার ফিরে আসে। এগুলো শ্রমের চিহ্ন, জীবনের ছন্দ। তিনি গ্রামীণ মানুষের কাজকে গৌণ করে দেখেন না; শ্রমকে জীবনের সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। গ্রামের নারীচিত্র তাঁর লেখায় বিশেষভাবে গুরুত্ব বহন করে। তাঁরা ঘরের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকলেও অনুভূতিতে শক্তিশালী। প্রেম প্রকাশ পায় সংযমে, দায়িত্বে এবং অপেক্ষায়। এই নারীরা উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করে না; তাদের সহ্যশক্তি জীবনের ভার বহন করে।
তাঁর গ্রামচিত্রে আনন্দ আছে, পাশাপাশি দীর্ঘশ্বাসও থাকে। উৎসব আসে, আবার শোকও আসে। কোনো অনুভূতিকে আলাদা করে বড় করে তোলা হয় না; জীবন যেমন, লেখাও তেমনভাবে প্রবাহিত হয়। এই স্বাভাবিকতাই তাঁর গ্রামকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। এই গ্রাম অতীতের ছবি প্রকাশ করে না। এটি একটি মানবিক মানচিত্র, যেখানে সম্পর্ক, দায়িত্ব, সহানুভূতি এবং সংযম একসঙ্গে কাজ করে। জসীমউদ্দীন গ্রামকে রোমান্টিক কল্পনায় বাঁধেননি; তিনি গ্রামকে তার সত্যিকার রূপেই তুলে ধরেছেন।
জসীমউদ্দীনের প্রাসঙ্গিকতা ও মূল্যায়ন—তার গুরুত্ব প্রায়ই শুধু অতীতের কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা সম্পূর্ণ সত্যকে প্রতিফলিত করে না। তিনি কেবল একটি সময়ের ছবি এঁকেছিলেন, এমন কথা বলা যায় না। তাঁর সাহিত্য আজকের গ্রাম বোঝার একটি নির্ভরযোগ্য মানচিত্র।
বর্তমান গ্রামে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তবে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে এসেছে পরিপূরক নতুন যন্ত্রের ব্যবহার। এই রূপান্তরের ভেতরে প্রশ্ন জাগে—মানুষের সম্পর্ক কি একই রকম রয়ে গেছে? সহমর্মিতা, অপেক্ষা, সংযম কি আগের মতো বহমান? জসীমউদ্দীনের লেখা এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি দেখান সম্পর্কের গভীর কাঠামো। পরিবেশ বদলালেও অনুভূতির মূল স্রোত কোথায় থাকে। তার গ্রাম কোনো স্থির ছবি নয়। সেখানে জীবন এগোয়, কষ্ট আসে, সময় গড়ায়। মানুষ হার মানে না, আবার স্বপ্নও দেখে। আজ গ্রাম স্মৃতিতে পরিণত হলে সমাজ অনেক কিছু হারায়। মানুষের ধৈর্য হারায়। সহজ সম্পর্কের উষ্ণতা ফিকে হয়ে যায়। জীবনের গতি বাড়ে, অনুভূতির গভীরতা কমে। জসীমউদ্দীন সেই ক্ষয়কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখান। তিনি স্মৃতিচারণ করেন না। তিনি সতর্ক করেন। তাঁর সাহিত্য শেখায়—উন্নয়ন মানে কাঠামোর পরিবর্তন না। মানুষের ভেতরের মানবিক সত্তা টিকিয়ে রাখাও সমান জরুরি। এই কারণে জসীমউদ্দীন আজও পাঠযোগ্য। তাঁর লেখা বর্তমানকে বিচার করার আয়না। রূপান্তরের ভেতরেও মানুষ যেন মানুষ থাকে—এই বার্তাই তার সাহিত্যের গভীর তাৎপর্য।
তাঁর সাহিত্য আমাদের গ্রামকে দেখার চোখ শিখিয়ে দেয়। তাঁর লেখায় গ্রাম কোনো অতীতচিত্র হয়ে আটকে থাকে না; তা মানুষের অনুভূতি, সম্পর্ক এবং নৈতিক চর্চার জীবন্ত পরিসর হয়ে ওঠে। সময় বদলেছে, জীবনের গতি পাল্টেছে, তবু তাঁর দেখানো মানবিক মূল্যবোধ আজও অর্থবহ। রূপান্তরের ভেতর দাঁড়িয়ে তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—গ্রাম হারিয়ে গেলে একটি ভূগোল হারায় না, মানুষের সহমর্মিতা ও সংযমের গভীর ভুবনও ফিকে হয়ে যায়। এই কারণেই তাঁর সাহিত্য স্মৃতির খোলসে বন্দি রাখা হয়নি; তা বর্তমানকেও বুঝতে সাহায্য করে। গ্রামকে মাটির টুকরো হিসেবে দেখা যায় না; এটি মানুষের অনুভূতি, সংগ্রাম ও জীবনধারার এক চিরন্তন আয়না। আর এটিই মানুষের হৃদয় ও মানবিকতা রক্ষা করাই সাহিত্যিক চেতনার প্রকৃত মূল্য।
তথ্যসূত্র
১. জসীম উদ্দীন: নকশী কাঁথার মাঠ; ঢাকা: জাতীয় প্রকাশনী, পুনঃসংস্করণ ২০২৩
২. জসীম উদ্দীন, বেদের মেয়ে; ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশন, ১৯৫১
৩. জসীম উদ্দীন, পদ্মাপাড়, ঢাকা: পলাশ প্রকাশনী, ১৯৫০, সপ্তম সংস্করণ ২০১৪
৪. মুহম্মদ হোসেন, বাংলা সাহিত্যে গ্রাম্য জীবন ও মানবিকতা, ঢাকা: সাহিত্য গবেষণা কেন্দ্র, ২০১৮
টীকা: উপরের তথ্যসূত্রগুলো মূলত পাঠ্য ও গবেষণার সহায়ক। জসীমউদ্দীনের কবিতা, গল্প ও নাটক থেকে গ্রামীণ জীবনচিত্রের উদাহরণ নেওয়া হয়েছে।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন