শিল্পে নিমজ্জন: ইমার্সিভ অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিকতা
ইমার্সিভ আর্ট সমসাময়িক শিল্পচর্চায় এক নতুন অধ্যায়, যেখানে দর্শক আর নিছক পর্যবেক্ষক নয় বরং সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। এই ধারায় শিল্পকর্ম একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পুরো পরিবেশ, সময়, এবং দর্শকের উপস্থিতি মিলেই শিল্পের অর্থ তৈরি করে।
প্রথাগত চিত্রকলা বা ভাস্কর্যের বিপরীতে, ইমার্সিভ আর্ট দর্শককে শারীরিক ও মানসিকভাবে সম্পৃক্ত করে। আলো, শব্দ, গন্ধ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি এই শিল্পমাধ্যম দর্শককে একটি বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার মধ্যে নিমজ্জিত করে। ফলে শিল্প এখানে শুধু দেখা নয়, বরং অনুভব করা। এটি হয়ে ওঠে অনুভূতির একটি পরিপূর্ণ পরিবেশ।
গত ১৩ মার্চ ২০২৬ কলাকেন্দ্র গ্যালারিতে শুরু হয়েছে "উপাত্ত / আকাঙ্খা / পরম" শিরোনামে শিল্পী তানভীর পারভেজের একক প্রদর্শনী। এটি শিল্পী পারভেজের দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী।
শিল্পী পারভেজের আঁকাআঁকির শুরু কিছুটা শৈশবেই ঘটে। পরবর্তীতে স্কুল জীবনের উপরিভাগে এসে শিল্পীর হাতে এসে পড়ে, "বিচিত্রা" ম্যাগাজিন। যেখানে প্রখ্যাত শিল্পী মনিরুল ইসলামের একটি সাক্ষাৎকার চোখে পড়ে, যা শিশু পারভেজের মধ্যে শিল্পী হয়ে ওঠার বীজ বপন করে। প্রথাগত মধ্যবিত্ত পরিবারের আপত্তি অগ্রাহ্য করে, তিনি চারুকলায় পড়ার অনুমতি আদায় করেন। এভাবেই শিল্পী পারভেজ চট্টগ্রাম চারুকলায় পাঠ নেওয়া শুরু এবং সমাপ্তি। ইমার্সিভ আর্ট মূলত ন্যারেটিভ নির্ভর না হলেও, শিল্পী পারভেজের মায়ের সাথে গড়ে ওঠা পেছনের গল্প, তাকে ইমার্সিভ আর্ট শুরু করার পেছনে ধাবিত করে।

আমাদের দেশে প্রচলিত শিল্পধারা যেখানে সাধারণত ক্যানভাস বা গ্যালারিতে সীমাবদ্ধ, সেখানে ইমার্সিভ আর্ট সেই সীমা ভেঙে দর্শককে শিল্পের ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ করে দেয়। যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই, শিল্পী পারভেজের প্রদর্শনীতে। পারভেজের ইমার্সিভ আর্ট দর্শককে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানায়। ফলে দর্শক একটি নির্মিত পরিবেশের ভেতরে প্রবেশ করে এবং অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে, ইমার্সিভ আর্টের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় ২১শ শতাব্দীতে। বিশেষ করে অ্যালান কাপ্রোর "হ্যাপেনিংস" ধারণা, দর্শককে শিল্পকর্মের অংশে পরিণত হওয়ার পথ খুলে দেয়। পরবর্তীতে ফ্লুক্সাস আন্দোলন, শিল্প ও জীবনের সীমারেখাকে ভেঙে দেয়। যা ইমার্সিভ অভিজ্ঞতার ভিত্তি তৈরি করে। ডিজিটাল যুগে এসে টিমল্যাব-এর মতো শিল্পীগোষ্ঠী প্রযুক্তির সহায়তায় ইমার্সিভ আর্টকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
শিল্পীর ভাষ্যে, ইমার্সিভ আর্টের ধারণা অনুধাবন করতে হলে ‘ইমার্শন (Immersion)’ শব্দটি উপলব্ধির গভীরতা অন্বেষণ প্রয়োজন। রোমান দেবতা জেইনাসের পৌরাণিক চরিত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। দেবতা জেইনাস ছিলেন দুই মাথাযুক্ত এক দেবতা, যিনি একই সঙ্গে দুই দিকে দেখতে পারেন। যিনি দ্বিমুখী দর্শনের মাধ্যমে অতীত ও ভবিষ্যৎ এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় বাস্তবতা একসঙ্গে উপলব্ধি করতে পারতেন। এ প্রতীকী রূপান্তর ইমার্শনের মূল দর্শনকে তুলে ধরে, যেখানে যুক্তির একরৈখিক পথ পরিহার করে বহুমুখী ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণযোগ্যতা দেয়া হয়।
এ প্রেক্ষাপটে ইমার্সিভ আর্ট প্রথাগত দৃশ্যকলায় সাধারণত দর্শকের শুধু দৃষ্টিকেন্দ্রিক শিল্পশৈলী অবলোকনের মাত্রাকে ভেঙে মাল্টিসেন্সরি বা বহু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথা শ্রবণ, স্পর্শ, গন্ধ প্রভৃতি অনুভূতির সক্রিয় উদ্দীপনা ঘটায়। এর ফলে শিল্পকর্ম দর্শকের জন্য হয়ে ওঠে একটি নিখাদ, আন্তঃক্রিয়াশীল অভিজ্ঞতা। যা তাদের একটি নতুন চেতনার উন্নততর জগতে নিয়ে যায়, যেখানে দর্শক শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে ইমার্শন অভিজ্ঞতা লাভ করে। এভাবে ইমার্সিভ আর্ট ঐতিহ্যগত দৃশ্যকলার সীমা অতিক্রম করে, একটি নতুন বাস্তবতার দিক উন্মোচন করে, যেখানে দৃশ্যশিল্প আজ ডিজিটাল জগতে একটি বহুমাত্রিক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

শিল্পী পারভেজ আরও জানান, শিল্পী ওলাফুর এলিয়াসনের বিখ্যাত শিল্পকর্ম ‘দ্য ওয়েদার প্রজেক্ট’ (২০০৩) এ ইমার্সিভ আর্টের এক চমৎকার দৃষ্টান্ত বলা যায়। এ স্থাপনা শিল্পে কৃত্রিম সূর্য ও কুয়াশার মাধ্যমে দর্শকের শরীর ও ইন্দ্রিয়কে সরাসরি শিল্পের অংশ হতে উৎসাহিত করা হয়। এতে দর্শকের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও চেতনা শিল্পের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার মাধ্যমে তারা ‘লিভড এক্সপেরিয়েন্স’ স্তরে পৌঁছে যায়। মার্লো-পন্তির দর্শন ও এলিয়াসনের শিল্পের এ মেলবন্ধন প্রমাণ করে যে সার্থক ইমার্সিভ শিল্পকর্ম দর্শকের শারীরিক ও মানসিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে গভীর ও অর্থবহ অভিজ্ঞতা তৈরি করে। দর্শন ও শিল্পের এ আন্তঃসম্পর্ক প্রমাণ করে যে শিল্প ও দর্শন মানুষের জীবন-বাস্তবতাকে নতুনভাবে উপলব্ধি ও অনুধাবনের পথ তৈরি করে এবং মানুষের চেতনাকে এক উন্নততর স্তরে পৌঁছে দেয়।
বৈশ্বিক এই শিল্প অনুঘটক—অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি এবং উপলব্ধির পারস্পরিক সম্পর্কের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। মূলত, ইমার্সিভ আর্ট শিল্পকর্ম এবং দর্শকের মধ্যকার সীমানা ভেঙে দিতে চায়। ডিজিটাল প্রজেকশন, সাউন্ড ডিজাইন, স্পেশাল ইনস্টলেশন, এবং কখনও ভার্চুয়াল বা অগমেন্টেড রিয়ালিটির ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পীরা এমন বহু-ইন্দ্রিয় পরিবেশ তৈরি করেন যা দর্শককে ঘিরে ফেলে। এই পরিবেশগুলো প্রায়ই আবেগগত, মানসিক, এমনকি শারীরিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, ফলে অভিজ্ঞতাটি হয়ে ওঠে গভীরভাবে ব্যক্তিগত। এখানে দর্শক কেবল অর্থ ব্যাখ্যা করে না, বরং সেই অর্থের ভেতর বাস করে। ইমার্সিভ আর্টের শক্তি তার অংশগ্রহণমূলক প্রকৃতিতে। এটি আমাদের শেখায় যে শিল্প কোনো দূরবর্তী বস্তু নয় বরং আমরা নিজেরাই তার ভেতরে অবস্থান করি। এই দৃষ্টিভঙ্গি শিল্প ও জীবনের মধ্যকার সীমানাকে ধীরে ধীরে মুছে দেয়। অন্যদিকে, সফল ইমার্সিভ কাজগুলো দর্শককে কেবল চমক দেয় না, বরং তাকে ভাবতে বাধ্য করে। নিজের অবস্থান, পরিবেশ, এবং বাস্তবতার নতুন ব্যাখ্যা নিয়ে। এই ধরনের শিল্পকর্মে প্রযুক্তি একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, উদ্দেশ্য নয়।
শিল্পী পারভেজ বলেন, আজকের অভিজ্ঞতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমরা দেখতে পাই ইমার্সিভ আর্টের সূত্রপাত ঘটেছে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় প্রবেশের অনেক আগে। তাই আলোচনার সুবিধার্থে পারসেপচুয়াল ইমার্সিভ আর্টের অভিজ্ঞতা নিয়েই আমরা প্রবেশ করব ভার্চুয়াল দুনিয়ায়।

‘সূর্যের নিচে নতুন কিছু নেই’—প্রবাদ বাক্যকে পাথেয় করে বলা যায়, আজকের দিনের ইমার্সিভ বা অবগাহী শিল্পের ধারণাটি কোনো আকস্মিক উদ্ভাবন নয়, বরং এর শেকড় মানবসভ্যতার অনেক গভীরে প্রোথিত। জার্মান শিল্প- ইতিহাসবিদ অলিভার গ্রাউয়ের মতে, কম্পিউটার সহায়তায় তৈরি ভার্চুয়াল বাস্তবতার বহু আগেই মানুষ ইমার্শন বা অবগাহী অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত ছিল। এর সবচেয়ে আদিম উদাহরণ পাওয়া যায় প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর জীবনে। শিকার শেষে রাতের আগুনে সঙ্গীদের কাছে নিজেদের বীরত্বগাথা বর্ণনা করার সময় তারা যে সংবেদনশীল ও কাল্পনিক দৃশ্যপট তৈরি করতেন, সেখানেই লুকিয়ে ছিল ইমার্শনের প্রাথমিক রূপ। তবে কল্পনাপ্রসূত সেই ইমার্শন এবং আজকের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ইমার্শনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মনে রাখতে হবে, কাল্পনিক গল্প বলার ক্ষমতা ছিল মানবজাতির বিবর্তনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লম্ফন।
ডিজিটাল যুগের বহু আগে চিত্রকলায় নিমগ্ন বা ইমার্সিভ অভিজ্ঞতার এক প্রভাবশালী রূপ প্রকাশ পায় ফরাসি ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পী ক্লদ মনেঁর (১৮৪০-১৯২৬) ‘ওয়াটার লিলি’ সিরিজে। সিরিজটি শুধু ইমপ্রেশনিজমের একটি চূড়ান্ত নিদর্শন নয়, বরং আধুনিক ইমার্সিভ আর্টের মৌলিক পূর্বসূরি হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। এ চিত্রমালার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে কোনো দিগন্তরেখা বা আকাশ অনুপস্থিত। শুধু জল, আলো ও রঙের ছায়া-প্রতিচ্ছায়ায় তৈরি হয় এক অদ্ভুত পরিপ্রেক্ষিতহীনতা, যেখানে দর্শকের অবস্থানগত সচেতনতা বিলীন হয়ে যায়। ফলে দর্শক যেন বাস্তবতা ও বিমূর্ততার মধ্যবর্তী এক তরল অভিজ্ঞতায় অবগাহন করে।

তবে বলা ভালো ইমার্সিভ আর্টের সমালোচনাও কম নয়। অনেক সমালোচকের মতে, এই ধারার শিল্প প্রায়ই প্রযুক্তিনির্ভর চমকের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যেখানে ধারণাগত গভীরতা কমে যেতে পারে। ফরাসি দার্শনিক Guy Debord তাঁর The Society of the Spectacle-এ যে “দৃশ্য-নির্ভর সমাজ”-এর কথা বলেছেন, ইমার্সিভ আর্ট কখনো কখনো তারই প্রতিফলন বলে মনে হতে পারে। যেখানে অভিজ্ঞতা হয় তাৎক্ষণিক কিন্তু ক্ষণস্থায়ী। অন্যদিকে, এই শিল্পধারা নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করছে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR), অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) এবং ইন্টার্যাক্টিভ প্রযুক্তির মাধ্যমে শিল্প এখন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গণমুখী হয়ে উঠছে। দর্শক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারছে, যা একেকজনের জন্য একেক রকম। সর্বোপরি, ইমার্সিভ আর্টকে একদিকে যেমন প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার এক চমকপ্রদ সংমিশ্রণ হিসেবে দেখা যায়, তেমনি অন্যদিকে এটি আমাদের শিল্প উপলব্ধির মৌলিক ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি জিজ্ঞেস করে, শিল্প কি কেবল দেখার বস্তু নাকি অনুভব করার একটি পরিসর? এই প্রশ্নের ভেতরেই ইমার্সিভ আর্টের আসল শক্তি এবং তার সীমাবদ্ধতা দুটিই অন্তর্নিহিত রয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, ইমার্সিভ আর্ট একদিকে যেমন শিল্পের অভিজ্ঞতাকে গণতান্ত্রিক ও সহজলভ্য করেছে, অন্যদিকে এটি শিল্পের মৌলিক প্রশ্ন, “শিল্প কী?” তা নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। এর সার্থকতা নির্ভর করে কেবল কতটা নিমজ্জন তৈরি করতে পারলো তার উপর নয়, বরং সেই নিমজ্জন দর্শকের মনে কতটা স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে তার উপর।
প্রদর্শনীটি চলবে ১১ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত গ্যালারি খোলা থাকবে।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন