কাজী নজরুলের স্বপ্নের বাংলাদেশ

অ+ অ-

 

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন তখন ভারতবর্ষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। তখন সমাজ জড়তাগ্রস্থ এবং আর্থ-সামাজিকভাবে শোষিত ও বৈষম্যপূর্ণ অবস্থায় ছিল। কৃষকের উপর ভারী কর, জমিদারি প্রথা ও দারিদ্র্য সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস তুলেছিল। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার শুরু হলেও তা সীমিত ছিল, মুসলমান সমাজ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিল। তখন ব্রিটিশদের ‘Divide and Rule’ নীতি হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ বাড়িয়ে তোলে। বঙ্গভঙ্গ এই বিভাজনকে আরও তীব্র করেছিল। একই সময়ে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলমানদের আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় জোরদার হয়। গ্রামাঞ্চলে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাব থাকলেও ধর্মীয় গোড়ামী, কুসংস্কার, কূপমণ্ডুকতা ও ছুঁৎমার্গ প্রবল ছিল। এসময়ে শহরাঞ্চল ও রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস বৃদ্ধি পেতে থাকে। সে সময় ভারতবর্ষে মানুষকে জন্ম, বর্ণ ও ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা হতো, যা মানবতার পরিপন্থী ছিল। নজরুল দেখেছিলেন-অনেকেই নিজেদের উচ্চজাত দাবি করলেও তাদের কাজ ও চরিত্র সেই দাবির সঙ্গে মিলত না; অর্থাৎ তারা জাতের নামে জালিয়াতি করছিল।

নজরুলের জীবনে জাত-পাত, ছুঁৎমার্গের ঘটনা একাধিকবার ঘটেছিল। বেঙ্গলী রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দিলে স্কুল জীবনের বন্ধু শৈলজানন্দের সাথে যোগাযোগ করে কলকাতায় তার মেসে ঠাঁই নেন। দিনের বেলায় সবাই একসঙ্গে আহারাদির পর মেসের বন্ধুরা আবিষ্কার করলেন নজরুল মুসলমান। শৈলজা একজন মুসলমানকে মেসে ঠাঁই দেওয়ার অপরাধে তাদেরকে মেস থেকে তাঁরা তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরকম বিপত্তি নজরুলের জীবনে পরবর্তীকালে অনেকবারই ঘটেছে। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের কন্যার বিবাহে পংক্তি ভোজনের সময় আর একবার নলিনাক্ষ সান্যালের বিয়ের সময় মুসলমান বলে তাঁর সঙ্গে খেতে বসতে আপত্তি জানান অভ্যাগত নিমন্ত্রিত ব্যক্তিরা। ছুঁৎমার্গে আহত হয়ে এই ভণ্ডামিকে ব্যঙ্গ করতেই তিনি জাত জালিয়াৎ কবিতাটি রচনা করেন।  

জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া! 
ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া॥  
হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি
ভাব্‌লি এতেই জাতির জান,  
তাইত বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে একশ'-খান। 
--- --- --- --- --- ---

বলতে পারিস, বিশ্ব-পিতা ভগবানের কোন সে জাত?  
কোন্ ছেলের তার লাগলে ছোঁয়া অশুচি হন জগন্নাথ?   
ভগবানের জাত যদি নাই তোদের কেন জাতের বালাই? 
ছেলের মুখে থুথু দিয়ে মার মুখে দিস ধূপের ধোঁয়া॥

পাশাপাশি তিনি সমাজে প্রচলিত ভণ্ডামি, কৃত্রিম জাতভেদ এবং ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং বোঝাতে চান, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার মানবতা, কোনো কৃত্রিম জাত বা বর্ণ নয়। তার লেখনির মাধ্যমে তিনি সমতা, ন্যায় ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দেন এবং সমাজকে ভেদাভেদ ছেড়ে এক হওয়ার আহ্বান জানান। নজরুলের মূল লক্ষ ছিল হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে গালাগালি থেকে গলাগলিতে নিয়ে আসা। তিনি ছুঁৎমার্গ প্রবন্ধে লিখেছিলেন—‘মানুষ হইয়া মানুষকে কুকুর-বিড়ালের মতো এত ঘৃণা করা-মনুষ্যত্বের ও আত্মার অবমাননা করা নয় কি? আত্মাকে ঘৃণা করা আর পরমাত্মাকে ঘৃণা করা একই কথা।

তিনি ধর্মের বিভাজনকে অস্বীকার করে মানবতাকেই বড় পরিচয় দিয়ে কান্ডারী হুঁশিয়ার কবিতায় বলেছেন‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?/ কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার...’। সব ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে মানুষের সমতার কথা জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। মানুষ কবিতায় তিনি বলেছেন—‘গাহি সাম্যের গানমানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।তিনি মনে করতেন হিন্দু-মুসলমানকে আলাদা করে ভাবার সুযোগ নেই এ যেন গাছের একই বোঁটায় দু'টি ফুল। পুতুলের বিয়ে নাটকে তিনি লিখেছেন—‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।পরিচিত এই গান ছাড়াও হিন্দু-মুসলিমের ঐক্য ও তাদের পরস্পর কামনা করে নজরুল বহু গান লিখেছেন

ক.

হিন্দু-মুসলমান দুটি ভাই
ভারতের দুই আঁখি-তারা
এক বাগানে দুটি তরু দেবদারু আর কদম-চারা।

খ.

ভায়ে ভায়ে হেথা নাহি প্রেম-বোধ
কেবলি কলহ কেবলি বিরোধ,
দেয়ালের পরে তুলিয়া দেয়াল নিজেরা নিজেরা করিছে শেষ।
হে দেশ বিধাতা, দূর কর এই লজ্জা ও গ্লানি, এ দীন বেশ।

হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির জন্য তিনি তাঁর যুগবাণী প্রবন্ধ গ্রন্থের নবযুগ প্রবন্ধে লিখেছেন—‘এস ভাই হিন্দু! এস মুসলমান! এস বৌদ্ধ! এস ক্রিশ্চিয়ান! আজ আমরা সব গণ্ডি কাটাইয়া, সব সঙ্কীর্ণতা, সব মিথ্যা সব স্বার্থ চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি। আজ আমরা আর কলহ করিব না। চাহিয়া দেখো, পাশে তোমাদের মহা শয়নে শায়িত ঐ বীর ভ্রাতৃগণের শব। ঐ গোরস্থান-ঐ শ্মশানভূমিতে-শোনো শোনো তাহাদের তরুণ আত্মার অতৃপ্ত ক্রন্দন।’

এই ভাবনা তাঁর বহু রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে। ইসলামী সংগীত যেমন—‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’, তেমনি তিনি শ্যামাসংগীতে ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন।/(তার) রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব যার হাতে মরণ বাঁচন।’ এছাড়া কীর্তন ও ভক্তিগীতিও রচনা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন—বাংলাদেশ এমন একটি দেশ হওয়া উচিত যেখানে ধর্ম নয়, মানবতাই হবে সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাঁর নাটক ও গল্পে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বার্তা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

প্রকৃতপক্ষে মানুষ হৃদয়ের মাঝে স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করে বলেই মসজিদে/মন্দিরে উপাসনা করতে যায়। কেউ যদি হৃদয়ের মাঝে স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব না করত, সে কখনোই উপসনালয়ে যওয়ার তাগিদ অনুভব করত না। তাই তিনি 'সাম্যবাদী; কবিতায় যথার্থই বলেছেন প্রকৃতপক্ষে মানুষ হৃদয়ের মাঝে স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করে বলেই মসজিদে/মন্দিরে উপাসনা করতে যায়। কেউ যদি হৃদয়ের মাঝে স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব না করত, সে কখনোই উপসনালয়ে যওয়ার তাগিদ অনুভব করত না। তাই তিনি 'সাম্যবাদী; কবিতায় যথার্থই বলেছেন‘মিথ্যা শুনিনি ভাইএই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।’

নজরুলের স্বপ্নের বাংলাদেশ ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত একটি স্বাধীন দেশ। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল তলোয়ারের মতো তীক্ষ্ণ। তাঁর বিখ্যাত কবিতা বিদ্রোহী-তে তিনি ঘোষণা করেন—  

আমি চির-বিদ্রোহী বীর 
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!

এই বিদ্রোহ তাঁর ব্যক্তিগত অহংকার নয়, বরং অত্যাচার ও দাসত্বের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতির প্রতিবাদ। গোটা জাতিকে তাদের শক্তিমত্তা বুঝিয়ে দেওয়া। সেই সময়ে বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে কোনো কথা বললে, প্রতিবাদ করলে শাস্তি ছিল জেল-জুলুম, দীপান্তর। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, ভয় না পেতে এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে উৎসাহ দেওয়ার জন্য ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় স্বদেশ বাসীকে সাহস জোগানোর জন্য লিখেছিলেন—‘কারার ঐ লৌহ-কপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট। এই আহ্বান নিপীড়িত মানুষকে মুক্তির সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে। এখানে কারাগারের লোহার দরজা ভাঙার কথা দিয়ে আসলে অত্যাচার আর পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান বোঝানো হয়েছে। ফলে বোঝা যায়, তিনি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে, ভাবতে ও বাঁচতে পারবে।

নজরুলের কল্পিত বাংলাদেশ ছিল সাম্য ও ন্যায়বিচারের দেশ। তিনি সমাজের ধনী-গরিব বিভাজন মেনে নিতে পারেননি। তাঁর কবিতা সাম্যবাদী-তে তিনি বলেন

গাহি সাম্যের গান 
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।

এই পঙক্তির মাধ্যমে তিনি এমন এক সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখান, যেখানে কোনো শ্রেণিভেদ থাকবে না, সকল মানুষ সমান মর্যাদা পাবে। তাঁর প্রবন্ধ যুগবাণী-তেও তিনি শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই অর্জিত হবে, যখন সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে।

নজরুলের স্বপ্ন ছিলনারী পুরুষের সাম্য প্রতিষ্ঠা, নারীমুক্তি এবং সভ্যতার অগ্রগতিতে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া। তিনি পুরুষতান্ত্রিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদা প্রদান ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন মানব সভ্যতার অর্ধেক অবদান নারীর, এবং তাদের অবহেলা করা মানে পুরো মানবজাতির অবক্ষয়। পৃথিবীতে যদি খারাপ কিছু ঘটে থাকে তার অর্ধেক অংশীদার পুরুষ। সুতরাং সমাজে প্রচলিত বৈষম্য, নারীর প্রতি অবহেলা ও তাদের 'পণ্য' হিসেবে দেখার প্রথার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। নজরুল নারী-পুরুষ সমতার প্রবল সমর্থক ছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে নারী কোনোভাবেই পুরুষের চেয়ে নিকৃষ্ট নয়। তাঁর বিখ্যাত কবিতা নারী-তে তিনি লিখেছেন

বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর 
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।   
বিশ্বে যা কিছু এল পাপ তাপ বেদনা অশ্রুবারি,  

অর্ধেক তার আনিয়াছে নর অর্ধেক তার নারী।

এই পঙক্তির মাধ্যমে তিনি নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং সমাজে তাদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর উপন্যাস ও নাটকেও নারীর শক্তিশালী চরিত্র দেখা যায়, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সক্ষম। ফলে বোঝা যায়, তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশে নারী-পুরুষ উভয়েই সমানভাবে সমাজ গঠনে অংশগ্রহণ করবে।

জন্ম বা পেশার কারণে কোনো মানুষ ঘৃণার যোগ্য নয় এবং সবাই সমান মর্যাদার অধিকারী। তিনি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে তথাকথিত অবৈধ জন্ম থেকেও মহান ব্যক্তির জন্ম হতে পারে। অবৈধ জন্মের জন্য শুধু নারী দোষী নয় পুরুষও সমান দোষে দোষী। সমাজ ও রাষ্ট্রে বৈষম্যের শিকার নারীর সম্মান সমুন্নত রেখে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে তিনি 'বারাঙ্গনা' কবিতায় বলেছেন,

শুনো ধর্মের চাঁই  
জারজ কামজ সন্তানে দেখি কোনো সে প্রভেদ নাই!    
অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ-পুত্র হয়,    
অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়!

কাজী নজরুল ইসলাম জানতেন, দেশ গড়তে হলে সব শ্রেণী ও পেশার মানুষকে সম্মান দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখে। যখন মানুষ সম্মান পায়, তখন তারা কাজের প্রতি আরও দায়িত্বশীল ও উৎসাহী হয়ে ওঠে। এতে সমাজে বৈষম্য ও হিংসা কমে গিয়ে পারস্পরিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়। সকল পেশার প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তি গড়ে তোলে। ফলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে একটি শক্তিশালী ও উন্নত দেশ গঠন সম্ভব হয়। তাই তিনি তাঁর রচিত সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত জীবন-বন্দনা কবিতায় কবি শ্রমজীবী, অবহেলিত এবং সাধারণ মানুষের জয়গান গেয়েছেন, যারা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সভ্যতা ও পৃথিবী গড়ে তোলে। এই কবিতায় মানুষের অদম্য জীবনশক্তি, সাহস ও প্রকৃতির ওপর বিজয়ের কথা তুলে ধরেছেন

গাহি তাহাদের গান   
ধরণীর হাতে দিল যারা আনি' ফসলের ফরমান। 
শ্রম-কিণাঙ্ক-কঠিন যাদের নির্দয় মুঠি-তলে
ত্রস্তা ধরণী নজরানা দেয় ডালি ভরে ফুলে ফলে।
  
বন্য-শ্বাপদ-সংকুল জরা-মৃত্যু-ভীষণা ধরা   
যাদের শাসনে হল সুন্দর কুসুমিতা মনোহরা।  
যারা বর্বর হেথা বাঁধে ঘর পরম অকুতোভয়ে   
বনের ব্যাঘ্র মরুর সিংহ বিবরের ফণী লয়ে।

কুলি-মজুর কবিতায় নজরুল শ্রমজীবী মানুষদের ওপর ধনী ও ক্ষমতাবানদের অন্যায় ও অবিচারের চিত্র তুলে ধরেছেন। যাদের শ্রমে সমাজের উন্নয়ন হয়, তারাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও নির্যাতিত। তিনি ভবিষ্যতের একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন যেখানে শ্রমিকরাই তাদের অধিকার ফিরে পাবে এবং সম্মানিত হবে। তিনি বলেছেন, একজন মানুষের অপমান মানেই সমগ্র মানবজাতির অপমান, তাই সকলের মধ্যে সমতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা জরুরি। তিনি বলেছেন

আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ!

--- --- ---  --- --- ---

তুমি শুয়ে রবে তেতালার পরে, আমরা রহিব নিচে,
অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে-ভরসা আজ মিছে!   
সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটির মমতা-রসে 
এই ধরণীর তরণীর হাল রবে তাহাদেরি বশে!

নজরুলের স্বপ্নের দেশ বিনির্মাণে তিনি চাষীদের নিয়ে জাগ্রত করা জন্য লিখেছেন

ওঠ্‌ রে চাষি, জগদ্বাসী, ধর ক'ষে লাঙ্গল। 
আমরা   মরতে আছি
ভাল করেই মর্‌ব এবার চল্‌

নজরুল শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর ছিলেন। তাঁর কবিতা দারিদ্র্য-তে তিনি বলেন—   

হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান্‌।   
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান!

এখানে তিনি দারিদ্র্যকে কেবল দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখেননি; বরং তা থেকে উঠে দাঁড়ানোর শক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বহু রচনায় শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট, বঞ্চনা ও সংগ্রামের চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি এমন একটি সমাজ চেয়েছিলেন যেখানে কোনো মানুষ অভুক্ত থাকবে না, কেউ অবহেলিত হবে না।

নজরুলের সাহিত্য-সাধনার কাল ১৯১৯ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত। সময়টা ছিল বৃটিশ-সাম্রাজ্যবাদের শাসন-শোষণের যুগ। সেই শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে যে-সংগ্রাম শুরু হয়েছিল নজরুল ছিলেন তার নিবেদিতকর্মী-একনিষ্ঠ সৈনিক। সে-যুগের রাজনৈতিক আন্দোলন অহিংস-অসহযোগিতার পথে, নিয়মতান্ত্রিকতার পথে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার কথা ভেবেছে। নজরুল সেই নীতি মেনে নিতে পারেননি। তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যয় ও আদর্শ অহিংসা এবং নিয়মতান্ত্রিকতাকে লংঘন করেছে বার বার। এই জন্য বৃটিশ সরকার তাঁর পত্রিকাও বই নিষিদ্ধ করেছে। সে-যুগের রাজনৈতিক নেতা মহাত্মা গান্ধী (১৮৬১-১৯৪৮) দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ (১৮৭০-১৯২৫) প্রমুখের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও তিনি অহিংসাকে বিদ্রূপ করেছেন। আনন্দময়ীর আগমনে (যে কবিতার জন্য নজরুল জেল খেটেছেন) কবিতায় লিখেছেন

বিষ্ণু নিজে বন্দী আজি ছয় বছরী ফন্দী কারায়
চক্র তাহার চরকা বুঝি, ভণ্ড হাতে শক্তি হারায়!
মহেশ্বর আজ সিন্ধুতীরে যোগাসনে মগ্ন ধ্যানে
অরবিন্দ-চিত্ত তাহার ফুটবে কখন কে তা জানে?
সদ্য অসুরগ্রাস-চ্যূত ব্রহ্মা চিত্তরঞ্জনে, হায়!
কমণ্ডলুর শান্তিবারী সিঞ্চি যেন চাঁদ নদীয়ায়

১৯২১ সালের দিকে ভারতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ-উভয় সংগঠনই ব্রিটিশ বিরোধী অবস্থানে ছিল, তবে ভারতের স্বাধীনতা সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য ছিল। কংগ্রেস তখন মূলত স্বরাজ বা স্বশাসনের দাবিতে আন্দোলন করছিল এবং অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে জনসাধারণকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত করছিল। ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা তখনও তাদের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য ছিল না। অন্যদিকে মুসলিম লীগের ভেতরে মতভেদ থাকার কারণে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান একমুখী ছিল না। মুসলিম লীগ শুরুতে ব্রিটিশদের সাথে তুলনামূলকভাবে সমঝোতার পথে চলত এবং সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে অধিকার আদায়ের কৌশল অনুসরণ করত। তারা মুসলিমদের পৃথক প্রতিনিধিত্ব ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখত। তবে পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে তাদের ভিন্নমত ছিল। ১৯২১-এর ডিসেম্বরে মুসলিম লীগের অধিবেশনে মৌলানা হসরৎ মোহানি সভাপতির অভিভাষণে বিভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্র নিয়ে ভারতীয় ফেডারেশন গঠনের দাবি উপস্থিত করেন। অধিবেশন শেষে লীগের অধিকাংশ নেতা তখনও তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন এবং ব্রিটিশদের সাথে সরাসরি সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের দাবি তোলার ব্যাপারে একমত হননি। ফলে মোহানীর প্রস্তাবটি তাৎক্ষণিকভাবে গৃহীত না হয়ে মূলত আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অন্যদিকে লীগ তখন মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার, পৃথক প্রতিনিধিত্ব এবং চলমান খেলাফত আন্দোলনের সমর্থনের মতো বিষয়গুলোকেই অগ্রাধিকার দেয়। মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করার মাধ্যমে তিনি স্বরাজ অর্জনের সংগ্রামকে ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ দেন। মৌলানা হসরৎ মোহানী স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রস্তাব রাজনৈতিক মহলেই সীমাবদ্ধ ছিল, গণমানুষের কাছে এ দাবি পৌঁছেনি। তবুও পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব তুলেছিলেন বলে মৌলানা হসরৎ মোহানীর বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকার মামলা রুজু করেমামলায় তাঁর দুবছরের জেল হয়। উল্লেখ্য, মৌলানা হসরৎমোহানী ছিলেন উত্তর ভারতের একজন উর্দুভাষী মুসলিম নেতা।

কাজী নজরুল ইসলাম মুসলিম লীগের রাজনৈতিক কৌশল ও মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বরাজ অর্জনের বিষয়টি সরাসরি প্রত্যাখান করেন। তিনি পত্রিকায় সম্পাদকীয়, বক্তৃতা-বিবৃতি, কবিতা প্রভৃতির মাধ্যমে স্পষ্টভাবে স্বাধীনতার দাবি তোলেন। নজরুল ধূমকেতুর ১ম বর্ষ ১৩ সংখ্যায় (২৬ আশ্বিন ১৩২৯, ১৩ অক্টোবর ১৯২২ শুক্রবার) ধূমকেতুর পথ নামে এক সম্পাদকীয় লিখে তিনি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাঁর মত ব্যক্ত করেন

অনেকেই প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছেন ধূমকেতুর পথ কি? সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝিনা। কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীদের অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশীর মোড়লী করার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এদেশে মোড়লী করে দেশকে শ্মশানভূমিতে পরিণত করেছেন, তাঁদের পাততাড়ি গুটিয়ে বোঁচকা পুটলি বেঁধে সাগর পারে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করলে তাঁরা শুনবেন না। তাঁদের অতটুকু সুবুদ্ধি হয়নি এখনো। আমাদের এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষা করার কুবুদ্ধিটুকুকে দূর করতে হবে।

পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল নিয়মকানুন, বাঁধন, শৃঙ্খলা মানা বাধা নিষেধের বিরুদ্ধে। আর এই বিদ্রোহ করতে হ'লে সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে।... বিদ্রোহ মানে কাউকে না মানা নয়, বিদ্রোহের মানে যেটা বুঝি না সেটাকে মাথা উঁচু করে বুঝি না বলা। ...ধূমকেতুর মত হচ্ছে এই যে, তোমার মন যা চায় তাই কর। ধর্ম সমাজ রাজা দেবতা কাউকে মেনো না।... সত্যকে জানবার জন্য বিদ্রোহ চাই। নিজেকে শ্রদ্ধা প্রশংসার লোভ থেকে রেহাই দেওয়া চাই।... বিদ্রোহের মতো বিদ্রোহ যদি করতে পার, প্রলয় যদি আনতে পার তবে নিদ্রিত শিব জাগবেই কল্যাণ আসবেই।

তৎকালীন ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলে ধরে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য স্বরাজের বিরুদ্ধে তিনি আমার কৈফিয়ৎ নামক কবিতায় বলেছেন

ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন, 
বেলা ব
য়ে যায়, খায়নি ক বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন। 
কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,  
স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!  
কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছে কি? কালি ও চুন 
কেন ওঠে না ক
তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?   
আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!   
কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস
এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!  
টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।  
মা
র বুক হতে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস!
হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!

এদিক বিবেচনা করলে কাজী নজরুল ইসলামই প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রকাশ্যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করে জনমত তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। এর জন্য তিনি ইংরেজ শাসনের রোষানলে পড়ে জুলুমের শিকার হয়েছেন, হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরেছেন, জেল খেটেছেন। রাজনীতির বাইরে থেকে স্বপ্নের দেশ গঠন করা সম্ভব নয় বুঝতে পেরে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক সম্মেলনাদিতে যোগদান করার ফলে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সদস্য হন (১৯২৫ নভেম্বর: ১৩৩২ অগ্রহায়ণ)। কংগ্রেস শ্রমিক-কৃষকদের সম্পর্কে ভাবনাচিন্তা বেশি করেনিবাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে কংগ্রেসের প্রতি আকৃষ্ট করার দিকেই তাদের প্রধান দৃষ্টি ছিল। কংগ্রেসের মধ্যে একদল শ্রমিক-কৃষক সংগঠন গড়ার দিকে মনোযোগী হন। ১৯২৫ সালের নভেম্বরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যেই শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ পার্টি (Labour Swaraj Party of the Indian National Congress) গড়ে তোলেন। উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, হেমন্তকুমার সরকার, আবদুল হালিম (১৯০৪-১৯৬৬), কুতবুদ্দীন আহমদ এবং শামসুদ্দীন হুসয়ন। ১৯২৫-এর ১ নভেম্বরে প্রকাশিত পার্টির গঠনতন্ত্রে উদ্দেশ্য হিসাবে ঘোষিত হয়েছিল ভারতবর্ষের পরিপূর্ণ স্বাধীনতাযে স্বাধীনতার ভিত্তি হবে নর-নারীর অর্থনৈতিক সামাজিক এবং রাজনৈতিক মুক্তি। এই পার্টির মুখপত্র হিসাবে ১৬ ডিসেম্বর ১৯২৫ মোতাবেক ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ১লা পৌষ থেকে সাপ্তাহিক 'লাঙল' বের হতে থাকে। এর প্রধান পরিচালক ছিলেন নজরুল। শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায়ের গঠনতন্ত্র ও কর্মকৌশল নির্ধারণ করেন। এই পার্টির ২টি চরম দাবি ছিল

১. আধুনিক কলকারখানা, খনি, রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ, ট্রামওয়ে, স্টিমার প্রভৃতি সাধারণের হিতকারী জিনিস লাভের জন্য ব্যবহৃত না হইয়া দেশের উপকারের জন্য ব্যবহৃত হইবে এবং এতৎসংক্রান্ত কর্মিগণের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সম্পত্তি-রূপে পরিচালিত হইবে।

২. ভূমির চরম স্বত্ব আত্মঅভাব-পূরণ-ক্ষম স্বায়ত্তশাসন-বিশিষ্ট পল্লীতন্ত্রের উপর বর্তিবে-এই পল্লী-তন্ত্র ভদ্র শূদ্র সকল শ্রেণীর শ্রমজীবীর হাতে থাকিবে।

এই পার্টি শ্রমিকের জন্য ৮টি ও কৃষকের জন্য ৬টি নির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেন। এখানে এমন কিছু দাবির কথা বলা হয় যা শ্রমিকের জীবনযাত্রা ও কাজের পরিবেশ উন্নত করার জন্য জরুরি। ন্যূনতম মজুরি আইন দ্বারা নির্ধারণ, সপ্তাহে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি কাজ না করানো এবং নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আলাদা সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের আবাসন, চিকিৎসা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, অসুখ, দুর্ঘটনা, বেকারত্ব ও বার্ধক্যে সহায়তা প্রদান করার জন্য আইন প্রণয়নের কথা উল্লেখ আছে। বড় কারখানায় লাভের অংশ শ্রমিকদের দেওয়া, মালিকদের খরচে শ্রমিকদের শিক্ষা নিশ্চিত করা, এবং শ্রমিক সংগঠন ও ধর্মঘটের অধিকার স্বীকার করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সমবায় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ও কারখানার আশেপাশে অনৈতিক পরিবেশ দূর করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে কৃষকদের জন্যও বিভিন্ন অধিকার ও সুরক্ষার দাবি উত্থাপন করা হয়, যাতে তারা শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। জমির করের একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, জমিতে স্থায়ী অধিকার নিশ্চিত করা এবং অন্যায় উচ্ছেদ ও অতিরিক্ত আদায় বন্ধ করার কথা বলা হয়। কৃষকদের জমি হস্তান্তর, গাছ কাটা, পুকুর বা কুয়ো খোঁড়া ও বাড়ি নির্মাণের স্বাধীনতা দেওয়ার কথাও উল্লেখ ছিল। মহাজনের সুদের হার নিয়ন্ত্রণ, সমবায় ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ ঋণের ব্যবস্থা, এবং কৃষি যন্ত্রপাতি কিস্তিতে বা ভাড়ায় দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এছাড়া মাছ ধরার নিয়ম নির্ধারণ এবং পাট চাষে কৃষকদের ন্যায্য লাভ নিশ্চিত করার বিষয়টিও এখানে গুরুত্ব পেয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালে আইন পরিষদের (Legislative Council) নির্বাচনে প্রার্থী হলেও শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারেননি। ব্রিটিশ শাসনের দমননীতি ও রাজনৈতিক জটিলতায় হতাশ হয়ে তিনি লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মনোযোগ দেন এবং রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পরেন। কিন্তু তার হৃদয়ে সব সময়ই ছিল স্বপ্নের বাংলাদেশ।

স্বপ্নের বাংলাদেশের জন্য ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় নজরুলের গান যুগিয়েছে প্রেরণা। স্বাধীনতার পর ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে, ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে নজরুলের গান ও কবিতা প্রেরণা যুগিয়েছে কিন্তু তার স্বপ্নের সেই সাম্যবাদী, অসাম্প্রদায়িক এবং মানবিক মূল্যবোধ সমৃদ্ধ দেশ আজও বিনির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।

দেশে আজ কারো ভারত প্রীতি, কারো পাকিস্তান প্রীতি এই নিয়ে রেশারেশি বাদানুবাদ চলছে। কিন্তু নজরুল ছিলেন সব সময়ই বাংলাদেশপন্থী। তিনি বাঙালিদের মধ্যে দেশপ্রেম, সাহস ও ঐক্যের চেতনা জাগ্রত করার আহ্বান জানিয়ে বাঙালির বাংলা প্রবন্ধে লিখেছেন-বাঙালিকে, বাঙালির ছেলেমেয়েকে ছেলেবেলা থেকে শুধু এই এক মন্ত্র শেখাও:

এই পবিত্র বাংলাদেশ
বাঙালির-আমাদের।
দিয়া ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’
তাড়াব আমরা, করি না ভয়
যত পরদেশী দস্যু ডাকাত
‘রামা’দের ‘গামা’দের।

কবির বাংলাদেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মালিকানার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন, যেখানে দেশকে বাঙালিদের নিজস্ব পবিত্র ভূমি হিসেবে তুলে ধরে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছেন যে, দেশের উপর কোনো বিদেশি আক্রমণ বা শোষণ মেনে নেওয়া হবে না।

কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানবিক মর্যাদা, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা, নারীর অধিকার, ন্যায়বিচার এবং আত্মমর্যাদাবোধে পরিপূর্ণ একটি রাষ্ট্র। তাঁর গান, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও নাটকের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়তিনি এক সংগ্রামী, জাগ্রত, মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন লালন করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে, তেমনি ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও মানবতার সুর অনুরণিত হয়। ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জন করলেও নজরুলের স্বপ্নের সেই মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি বাস্তবে রূপ নেয়নি।

[প্রবন্ধটি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে স্মরণিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিধ্বনির পাঠকদের জন্য প্রবন্ধটি পত্রস্থ করা হলো।]