কী সুন্দর প্রেম, আবার কী ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞ!

অ+ অ-

 

একটা পুরনো এভারগ্রিন অরিজিনাল হাতে পেলাম। বই না, যেন পকেট-সাইজের একখানা সাংস্কৃতিক ধ্বংসাবশেষ। কালো বর্ডার, লাল জমি, মুখ আছে অথচ পুরো দেখা যাচ্ছে না, মেরুদণ্ডের কাছে ছাপা দাম ১ ডলার ৯৫ সেন্ট। আজকাল ওই দামে কফির কাপের ঢাকনাও পাওয়া যায় কি না সন্দেহ, আর এককালে ওই দামে মানুষ কিনে ফেলত Hiroshima Mon Amour। প্রচ্ছদে  লেখা, Alain Resnais-এর ছবির জন্য Marguerite Duras-এর টেক্সট, সঙ্গে সত্তরের বেশি ছবি। এই কথাটাই আসল কাণ্ড। বইটি নিজেকে ভদ্রভাবে চুপ করে স্ক্রিনপ্লে বলতে পারত, ফিল্ম-সুভেনির বলতে পারত, মডার্নিস্ট সিনেমার স্মারক বলতে পারত। কিন্তু সে সব নামের ভিতর ঢুকলেই জিনিসটার দম বন্ধ হয়ে যায়।

কারণ এ বই সিনেমা থেকে জন্মেছে, কিন্তু সিনেমার চাকর হতে রাজি নয়। ছবির সংলাপ এখানে ছাপার অক্ষরে এসে দাঁড়িয়েছে, ফোটোগ্রাফ এসে সাদা-কালো প্রমাণপত্রের মতো সাজছে, স্মৃতি এসে কাঁধে হাত রাখছে, আর বিপর্যয় এসে বলছে, দাঁড়াও বাবা, তোমরা এত তাড়াতাড়ি আমাকে বুঝে ফেললে কী করে?

১৯৫৯ সাল। Alain Resnais ক্যামেরা ধরলেন, আর Marguerite Duras শব্দের বুননে বুনে দিলেন এক শরীরের গভীরতর আখ্যান। শুনতে খুব একটা মায়াবী আর্ট-ফিল্মের মতো শোনাতে পারে। এক ফরাসি অভিনেত্রী শান্তি নিয়ে ছবি বানাতে হিরোশিমায় এলেন, আর দেখা হয়ে গেল এক জাপানি স্থপতির সঙ্গে। দুজনের প্রেম, কিংবা শরীরী লেনদেনযাকে সমাজসম্মত কোনো মোড়কে ভরে ড্রয়িংরুমের আলাপ হিসেবে নিরাপদ করে নেওয়া যায়। সময় মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার এদিক-ওদিক। কিন্তু হিরোশিমার মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রেমের সহজ গল্পের প্রত্যাশা করা আসলে এক নিদারুণ ভ্রম; যেন কেউ এক ধ্বংসস্তূপের ওপর পিকনিকের চাদর বিছিয়ে বসার দুঃসাহস দেখাচ্ছে।

শুরুতেই ছবিটি এক বিরাট ধমক দেয়, তবে সে ধমক স্কুলের হেডমাস্টারি ধমক নয়। নারীটি বলে, সে হিরোশিমা দেখেছে। হাসপাতাল দেখেছে, মিউজিয়াম দেখেছে, ধ্বংসের নিদর্শন দেখেছে, সংবাদচিত্র দেখেছে, স্মৃতিস্তম্ভ দেখেছে। দেখার যত সরকারি, পর্যটনসম্মত, শিক্ষিত ব্যবস্থা আছে, সব মোটামুটি করেছে। পুরুষটি বলে, তুমি হিরোশিমায় কিছুই দেখোনি।

মানুষ রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়কে ব্যক্তিগত ভাষার ভিতর দিয়েই ছোঁয়। আমরা ইতিহাস পড়ি, কিন্তু কাঁদি প্রায়ই কোনো মুখ দেখে। আমরা যুদ্ধ বুঝি মানচিত্রে, কিন্তু ভয় পাই মায়ের হাত, শিশুর জুতো, দরজার পাশে পড়ে থাকা চশমা দেখে। সমস্যা তখনই, যখন আমার কান্না অন্যের মৃত্যুর ওপর নিজের পতাকা গেঁড়ে বসে।

এই রূঢ় অস্বীকার শুনে আপাতদৃষ্টিতে একে একপ্রকার শিষ্টাচারহীনতা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এক নারী হিরোশিমার উত্তপ্ত রাস্তায় হেঁটেছেন, টিকিট কেটে পর্যটনের দায় মিটিয়েছেন, এমনকি দস্তুরমতো বিষণ্ণ মুখে সভ্যতার স্খলন নিয়ে গভীর ভাব প্রকাশ করেছেন; অথচ তাকেই সপাটে বলে দেওয়া হলো, তার এই দেখা আদতে অসার? এখানেই শিল্পকর্মটি তার প্রথম পাঠটি দেয়। দেখা আর অনুধাবন করা যে এক মেরুর বাসিন্দা নয়, আর্কাইভের তথ্য আর রক্ত-মাংসের অভিজ্ঞতা যে সমান্তরাল রেখাএই সত্যটিই এখানে বড় হয়ে ওঠে। মিউজিয়ামের কাচঘেরা প্রকোষ্ঠে সাজানো ঝলসানো পরিধেয়, স্তূপীকৃত চুল কিংবা থেমে যাওয়া ঘড়ি বড়জোর ইতিহাসের শুকনো সাক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু এই নথিগুলো চোখের সামনে মেললে কি আর সেই আগুনের হাহাকার শরীরে মাখা যায়? যে মহাজাগতিক দহন ত্বক লেহন করেছে কিংবা আস্ত এক জনপদকে নিমিষেই ল্যাবরেটরির অবুঝ নমুনায় রূপান্তরিত করেছে, তাকে চটজলদি দেখেছি বলে দাবি করার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ানক আত্মতৃপ্তির চোরাবালি।

ছবি বা বইটি চুপ করে থাকে না। বলে না, যেহেতু হিরোশিমা বোঝা যায় না, তাই চলো সবাই মুখে আঙুল দিয়ে বসে থাকি। বরং সে বারবার দেখায়, বোঝার চেষ্টা করতে হয়, কিন্তু নিজের বোঝাকে মালিকানা বানানো চলবে না। সংলাপ বারবার ফিরে আসে। একই কথা আবার বলা হয়, কিন্তু দ্বিতীয়বারে তার মানে বদলে যায়। ছবি এসে ছবির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। প্রেমিক-প্রেমিকা কথা বলে, আবার কথার ভেতরেই ফাঁক পড়ে। নিশ্চিত উচ্চারণ এখানে সন্দেহজনক বস্তু, ঠিক যেমন খুব চকচকে শোকসভা সন্দেহজনক, যেখানে বক্তারা মৃতের চেয়ে নিজেদের বাকশক্তিকে বেশি সম্মান জানায়।

এবার ছবির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা। হিরোশিমার সঙ্গে Nevers এসে জুড়ে যায়। Nevers, ফ্রান্সের এক প্রাদেশিক শহর, যেখানে এই নারী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এক জার্মান সৈনিককে ভালোবেসেছিল। সৈনিকটি মারা যায়। যুদ্ধশেষে মেয়েটিকে শাস্তি দেওয়া হয়, মাথা কামিয়ে জনসমক্ষে অপমান করা হয়, পরিবার তাকে লুকিয়ে রাখে। হিরোশিমায় এসে সেই স্মৃতি ফিরে আসে। অর্থাৎ একদিকে পারমাণবিক বোমায় বিধ্বস্ত শহর, অন্যদিকে এক তরুণীর প্রেম, লজ্জা, অপমান, শোক। এখানে সামান্য অসতর্ক হলেই লেখক-পরিচালক ধপাস করে নৈতিক গর্তে পড়তেন। বলতেন, দেখো, দুটোই ট্রমা। দুঃখের আন্তর্জাতিক সম্মেলন বসুক, সবাই ব্যাজ পরে ঢুকুন।

DurasResnais সেই সস্তা সমতা তৈরি করেন না। নারীর Nevers হিরোশিমার ব্যাখ্যা নয়। তার ব্যক্তিগত ক্ষত হিরোশিমার দরজা খোলার মাস্টার-কি নয়। তবু তার স্মৃতি মিথ্যে নয়, অপ্রাসঙ্গিকও নয়। কারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়কে ব্যক্তিগত ভাষার ভিতর দিয়েই ছোঁয়। আমরা ইতিহাস পড়ি, কিন্তু কাঁদি প্রায়ই কোনো মুখ দেখে। আমরা যুদ্ধ বুঝি মানচিত্রে, কিন্তু ভয় পাই মায়ের হাত, শিশুর জুতো, দরজার পাশে পড়ে থাকা চশমা দেখে। সমস্যা তখনই, যখন আমার কান্না অন্যের মৃত্যুর ওপর নিজের পতাকা গেঁড়ে বসে।

১৯৫৯ সাল। Alain Resnais ক্যামেরা ধরলেন, আর Marguerite Duras শব্দের বুননে বুনে দিলেন এক শরীরের গভীরতর আখ্যান। শুনতে খুব একটা মায়াবী আর্ট-ফিল্মের মতো শোনাতে পারে। এক ফরাসি অভিনেত্রী শান্তি নিয়ে ছবি বানাতে হিরোশিমায় এলেন, আর দেখা হয়ে গেল এক জাপানি স্থপতির সঙ্গে। দুজনের প্রেম, কিংবা শরীরী লেনদেনযাকে সমাজসম্মত কোনো মোড়কে ভরে ড্রয়িংরুমের আলাপ হিসেবে নিরাপদ করে নেওয়া যায়। সময় মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার এদিক-ওদিক। কিন্তু হিরোশিমার মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রেমের সহজ গল্পের প্রত্যাশা করা আসলে এক নিদারুণ ভ্রম; যেন কেউ এক ধ্বংসস্তূপের ওপর পিকনিকের চাদর বিছিয়ে বসার দুঃসাহস দেখাচ্ছে।

 

জাপানি পুরুষটির গুরুত্ব এখানেই। সে নারীর স্মৃতিকে বাতিল করে না, কিন্তু তার করুণাকে হিরোশিমার ওপর রাজত্ব করতে দেয় না। সে যেন বারবার বলে, তোমার দুঃখ তোমার, আমার শহর আমার। তুমি আমার সঙ্গে শোও, কথা বলো, কাঁদো, মনে করো, কিন্তু আমার ধ্বংসকে তোমার আত্মজীবনীর অলংকার বানিও না। প্রেমের ভিতরেও এই দূরত্ব রাখা যায় কি না, ছবিটি সেই অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে।

পুরনো পেপারব্যাকটি হাতে ধরলে এই প্রশ্ন আরও বস্তুগত হয়ে ওঠে। প্রচ্ছদে লাল-কালো মুখ। ভিতরে ছবি। ছবি মানে যেন প্রবেশাধিকার। এই দেখুন, দৃশ্য আছে। এই দেখুন, সিনেমা আপনার হাতে। এই দেখুন, ইতিহাস ছোট হয়ে পৃষ্ঠা-সংখ্যায় বাঁধা। কিন্তু বইটি নিজের ছবিগুলোকেই পুরো বিশ্বাস করে না। সে জানে ছবি দরকার। সাক্ষ্য দরকার। ধ্বংসের নথি দরকার। না হলে ক্ষমতাবানরা খুব তাড়াতাড়ি বলবে, কিছু হয়নি, অতিরঞ্জন, যুদ্ধ তো যুদ্ধই, বিজ্ঞান এগোচ্ছে, সামান্য কোল্যাটারাল। কিন্তু ছবি আবার অলস বিবেকের আরামকেদারাও হতে পারে। আমরা ছবি দেখি, বুকের ওপর হাত রাখি, বলি ভীষণ, ভয়ংকর, মানবসভ্যতার লজ্জা, তারপর রাতের খাবারে কী হবে ভাবতে শুরু করি।

আজকের সময়ে এই কথাটা আরও কড়া। অত্যাচারের ছবি, যুদ্ধের ক্লিপ, নজরদারির ফুটেজ, সাক্ষাৎকার, আর্কাইভ, ড্রোন-ভিডিয়ো, মৃতদেহের ওপর স্ক্রল করা আঙুল, সব আমাদের সামনে। দেখার অভাব নেই। সমস্যাটা বরং এত দেখা যে দেখা নিজেই এক ধরনের অসাড়তা তৈরি করে। আমরা ভাবি, দেখলাম মানে দায়িত্ব পালন হলো। হিরোশিমা মন আমুর সেই আত্মতুষ্টির গালে ঠান্ডা জল ছিটিয়ে দেয়। বলে, দেখা শুরু মাত্র। দেখা শেষ নয়।

শিরোনামে প্রেম আছে, কিন্তু এই প্রেম দুধ-সন্দেশের প্রেম নয়। এখানে প্রেম ক্ষণস্থায়ী, অসম, দগ্ধ, অসম্পূর্ণ। দুজন মানুষ একে অপরকে পুরো বোঝে না। বোঝার অভিনয়ও বেশিক্ষণ চালাতে পারে না। কিন্তু অল্প সময়ের জন্য তারা এমন এক ভাষা বানায়, যেখানে একজন অন্যজনের অসম্ভব ভূগোল হয়ে ওঠে। শেষে তারা একে অপরকে নাম দেয়: “Hiroshima” এবং “Nevers কী সুন্দর, আবার কী ভয়ংকর। মানুষ নেই, শহর আছে। প্রেমিক নেই, স্মৃতির স্থান আছে। নামের বদলে ভূগোল, শরীরের বদলে ইতিহাস, আলিঙ্গনের বদলে ধ্বংসের মানচিত্র।

এই নামকরণের গভীরে সান্ত্বনার চেয়ে দহনের ভাগই বেশি। একে অপরের সত্তায় লীন হওয়ার যে চিরকালীন আকাঙ্ক্ষা, তা এখানে পূর্ণতা পায় না; বরং এক অদ্ভুত বিচ্ছিন্নতা বজায় থাকে। প্রেমের আঙিনায় ইতিহাসের যে অনুপ্রবেশ, তা কোনো আরোগ্য দেয় না। আর ঠিক এই কারণেই দগদগে ক্ষতের মতো এই শিল্পকর্মটি আজও আমাদের স্বস্তিতে থাকতে দেয় না। অনেক সময়েই শিল্প ট্রমাকে এক রৈখিক পাঠে পরিণত করে, যার শেষে খুব চেনা কিছু নীতিকথা ঝুলে থাকেযুদ্ধ বর্জনীয় কিংবা স্মৃতিই পরম। এসব আপ্তবাক্য শুনতে ভালো হলেও তা বড্ড তাড়াতাড়ি দেওয়াল লিখনের মতো নিষ্প্রাণ হয়ে যায়। ড্যুরাস ও রেনে কোনো পোস্টার সাজাতে বসেননি। তাঁরা এমন এক অবয়ব তৈরি করেছেন যেখানে স্মৃতির ভিত টলমল করে, উচ্চারণ বারবার হোঁচট খায় এবং দৃশ্য নিজেই নিজের সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে। ফলে দর্শক তাঁর সহানুভূতির যে সভ্য আব্রু নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে ঢোকেন, শিল্পকর্মটি শেষ পর্যন্ত তাঁকে সেই ভদ্রতার পোশাক খুলে নিজের নগ্ন সত্তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

যে দহন আমাদের ত্বক স্পর্শ করেনি, যে হাহাকার আমরা যাপন করিনি, তাকে স্মরণ করার ব্যাকরণটি আসলে ঠিক কী? অন্যের চরম বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমি দেখেছি বলার ভেতরে যে একপ্রকার আত্মতুষ্টির চোরাবালি লুকিয়ে থাকে, তা এড়িয়ে গিয়ে কী ভাবে আমরা অজানাকে স্বীকার করব? অন্যের ব্যক্তিগত বা জাতীয় ক্ষতকে কী ভাবে নিজের অভিজ্ঞতার নির্যাস বানাব, অথচ তাকে কোনোভাবেই নিজের বয়ানের অলংকার বা আসবাব হতে দেব না?

পাতায় পড়লে Duras আরও তীক্ষ্ণ। সিনেমায় কণ্ঠস্বর, মুখ, শরীর, কাট, মঁতাজ আমাদের টেনে নিয়ে যায়। বইয়ে শব্দ থেমে থাকে। আমরা চাইলে একই বাক্যের ওপর বসে থাকতে পারি। তখন বোঝা যায়, তার সংলাপ কবিতার মতো কেন। কারণ সে ব্যাখ্যা দিয়ে বাক্যকে নিরাপদ করে না। পুনরাবৃত্তি এখানে আলসেমি নয়, চাপ। প্রথমবার যে বাক্য দৃঢ় লাগে, দ্বিতীয়বারে তা অনুনয় হয়ে যায়, তৃতীয়বারে প্রায় ভেঙে পড়ে। স্মৃতি বলা যত এগোয়, স্মৃতি তত নিশ্চিত হয় না, বরং আরও পিচ্ছিল হয়ে ওঠে।

এই battered copy-র জীর্ণ শরীরটি তাই এক অদ্ভুত সংগতি খুঁজে পায়। Grove Press-এর মডার্নিস্ট পেপারব্যাক সংস্কৃতির এই সুলভ অথচ দুঃসাহসী ফসলটি হাতে স্পর্শ করলে প্রতীয়মান হয় যে, নশ্বর কাগজও কখনো কখনো প্রখর দলিলে রূপান্তরিত হতে পারে। মূল্য সামান্য হলেও এর অন্তর্দাহ বেশ বিপজ্জনক। বইটি হিরোশিমাকে স্মরণ রাখার কোনো ছকে বাঁধা ব্যাকরণ আমাদের হাতে তুলে দেয় না; বরং আমাদের সেই চিরাচরিত স্মৃতির পদ্ধতির ওপরই এক বিরাট সন্দেহের চিহ্ন এঁকে দেয়। সে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়আমাদের শোকের মেকি আবহে কতখানি লুকিয়ে আছে আত্মমুগ্ধতা, কতখানি সেই নিরাপদ পর্যটনসুলভ সৌজন্য, আর কতখানিই বা প্রকৃত ইতিহাসের দায়।

যে দহন আমাদের ত্বক স্পর্শ করেনি, যে হাহাকার আমরা যাপন করিনি, তাকে স্মরণ করার ব্যাকরণটি আসলে ঠিক কী? অন্যের চরম বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমি দেখেছি বলার ভেতরে যে একপ্রকার আত্মতুষ্টির চোরাবালি লুকিয়ে থাকে, তা এড়িয়ে গিয়ে কী ভাবে আমরা অজানাকে স্বীকার করব? অন্যের ব্যক্তিগত বা জাতীয় ক্ষতকে কী ভাবে নিজের অভিজ্ঞতার নির্যাস বানাব, অথচ তাকে কোনোভাবেই নিজের বয়ানের অলংকার বা আসবাব হতে দেব না?

Hiroshima mon amour আমাদের হাতে কোনো সমাপ্ত পাঠ বা নিশ্চিত নীতিকথা তুলে দেয় না। এমন কোনো আরোগ্য বা উত্তর দিলে তার ধ্রুপদী অবয়বটিই হয়তো ম্লান হয়ে যেত। বরং সে আমাদের সেই উত্তর খোঁজার আগের যে দগদগে অস্বস্তি, সেখানেই অবিচল আটকে রাখে। মহৎ শিল্প বোধহয় এই কাজটাই করে; সে আমাদের চটজলদি জ্ঞানী হওয়ার প্রলোভন না দেখিয়ে, আমাদের সেই অতি-উৎসাহী এবং পর্যটনসুলভ জ্ঞানকে গভীর এক লজ্জার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।