আমেরিকার গণমানুষের সঙ্গীতশিল্পী ডলি পারটন

অ+ অ-

 

ডলি পারটনকে ভাবলেই তার গানের সঙ্গে সঙ্গে মনে আসে উঁচু করে বাঁধা সোনালি চুল, কড়া মেকআপ, চড়া সাজসজ্জা, চকচকে পোশাক আর দক্ষিণের সেই হিলবিলি বাচনভঙ্গি। সেইসাথে অনাবিল হাসি, হাস্যরস আর ঝিকিমিকি চোখ। নিজের দিকে তাকিয়েও যে মানুষ অবলীলায় হাসতে পারে, সেই হাসি। ছোটবেলায় তার এলাকার এক নারীকে দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন, যাকে এলাকার ভদ্রসমাজ খুব একটা ভালো চোখে দেখত না। বড় হয়ে ডলি মজা করে বলতেন, সেই নারীকেই তার কাছে সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়েছিল। তাই বড় হয়ে তিনি ঠিক সেই নারীটির মতোই হতে চেয়েছিলেন। 

নিজেকে নিয়ে হাসিতামাশা করতে তার কোন দ্বিধা ছিল না। বলতেন, নিজেকে এত সস্তা দেখাতে কিন্তু অনেক টাকা খর্চা করতে হয়। যতই তাকে জানা যায়, ততই মনে হয় তার প্রায়সব রসিকতার নিচে অন্য কোন কথা যেন লুকিয়ে থাকত। তিনি জানতেন, সংগীত প্রতিভার আগে মানুষ তার চুল, শরীর, পোশাক আর উচ্চারণ দিয়ে তাকে বিচার করবে। অনেকেই হাসবে। তাই প্রথম হাসিটা নিজেই হাসতেন। এভাবে যেন তিনি চাইতেন নিজের ক্যারিকেচার নিজেই আঁকবেন, অন্য কারও হাতে সেই নিয়ন্ত্রণ তুলে দেবেন না।

খ্যাতির তুঙ্গে থাকা অবস্থায় একবার তিনি একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। কে কতটা ডলি পারটনের মত দেখতে সেটাই ছিল প্রতিযোগিতার বিষয়। ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলেসের একটি বারে পুরুষেরা তার মত সেজে প্রতিযোগিতা করছিল। ডলি নিজের সাজ আরও একটু বাড়িয়ে-চড়িয়ে ঢুকে পড়েছিলেন তাদের সঙ্গে। এবং মজার ব্যাপার হলো হেরে গিয়েছিলেন সেই প্রতিযোগিতায় তিনি। পরবর্তীকালে ভারি মজা করে গল্পটা বলতেন তিনি। নিজেকে নিয়ে এমন নির্দ্বিধায় হাসতে পারা একজন মানুষের জীবনে এর চেয়ে মানানসই ঘটনা আর কী হতে পারে!

এই সাজসজ্জা আর হাস্যরসের আড়ালে ছিলেন অসাধারণ সফল একজন গীতিকার। গায়িকা হিসেবে যত বড়ই হয়ে থাকুন, নিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হিসেবে তিনি বারবার ফিরেছেন গীতিকার হিসেবে। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, অন্যসব কিছুর চেয়ে নিজেকে গীতিকার হিসেবেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। গান লেখা তার কাজ, আনন্দ, থেরাপি সবকিছু। তার ভাষায়, যেসব গান তিনি লিখেছেন তার প্রায় সবকটির মধ্যে নিজের জীবনের ছোট ছোট কথাগুলো ছড়িয়ে আছে। গানের মাঝে ছড়িয়ে থাকা এইসব টুকরো কথাগুলোতে মনোযোগ দিলে বোঝা যায় কীভাবে আমেরিকার ভীষণ দরিদ্র পাহাড়ি পরিবারের সেই মেয়েটি একসময় শুধু কান্ট্রি মিউজিকের তারকা নয়, আমেরিকার গণমানুষের শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন।

 

স্মোকি মাউন্টেনসের সেই শহর

ডলি রেবেকা পারটনের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি, টেনেসি অঙ্গরাজ্যের গ্রেট স্মোকি মাউন্টেনস অঞ্চলে। ছয় ভাই আর ছয় বোন এই বারো ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। তারা থাকতেন একঘরের একটি কেবিনের মত বাড়িতে। বিদ্যুৎ ছিল না। ব্যাটারিচালিত রেডিওতে শুনতেন কান্ট্রি মিউজিকের আয়োজন গ্র্যান্ড ওল ওপ্রি১। পাঁচ বছর বয়সেই গান বানাতে শুরু করেছিলেন ডলি। দশ বছর বয়সে নক্সভিলের টেলিভিশন প্রোগ্রামে গান গেয়ে সপ্তাহে বিশ ডলার আয় করতেন। ১৯৬৪ সালে পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে হাই স্কুল শেষ করার পরদিনই কার্ডবোর্ডের সুটকেস হাতে বাসে উঠে চলে যান ন্যাশভিলে।

ডলি পারটনের শুরুর গল্প শুনতে আমেরিকান ড্রিমের মতো মনে হয়। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে, হাতে কার্ডবোর্ডের সুটকেস, চোখে তারকা হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু ডলির জীবন স্রেফ দারিদ্র্য জয় করে বড় হওয়ার গল্পও নয়। সংগীতের জগতে প্রবেশের পর একসময় তিনি দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু দারিদ্র্যের স্মৃতি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। অভাবের গল্প বলার সময়ও রসিকতা করতেন। তাঁদের বাড়িতে কলের পানি বা রানিং ওয়াটার ছিল কি না জানতে চাইলে মজা করে বলতেন, ছিল তো, পানি আনতে দৌড়ে যেতে হতো। ছাদ নিয়েও তার একই ধরনের রসিকতা ছিলমাথার ওপর ছাদ ছিল ঠিকই, তবে মাঝে মাঝে সেটি দিয়ে পানিও পড়ত।

দারিদ্র্যকে কিন্তু তাই বলে কোনো রোম্যান্টিক রূপ দিয়ে সঙ্গীতে প্রকাশ করেননি তিনি। তার গান শুনলে আমরা দেখি ক্ষুধা, লজ্জা, মানুষের তাচ্ছিল্য এসব উঠে এসেছে। তবে সেই কষ্টের ভেতরে পরিবার, মা-বাবা, গান, ধর্মবিশ্বাস আর ভালোবাসার উপস্থিতিও ছিল। এই দুদিক একসঙ্গে বলতে পারার ক্ষমতাই হয়তো তার গানকে সাধারণ মানুষের এত কাছে নিয়ে গিয়েছিল। যেমনটা আমরা দেখি কোট অফ মেনি কালারস বা নানারঙের কোট গানটিতে।

ছবি: ডলি পারটন ইমাহিজনেশন লাইব্রেরির সৌজন্যে

রঙবেরঙের পুরোনো কোটের গান

ডলির মা এভি লি একবার নানা রঙের পুরোনো কাপড়ের টুকরো জোড়া দিয়ে মেয়ের জন্য একটি কোট বানিয়েছিলেন। সেলাই করতে করতে তিনি বাইবেলের যোসেফ আর তার রঙবেরঙের কোটের গল্প বলছিলেন। ছোট্ট ডলির কাছে তাই নতুন কোটটি হয়ে উঠেছিল প্রায় রাজকীয় পোশাক। ডলি তার গানে বলছেন

আমাদের কোনো টাকাপয়সা ছিল না,
তবু নিজেকে আমার যতটা ধনী মনে হওয়া সম্ভব,
ঠিক ততটাই ধনী মনে হতো
মায়ের বানানো সেই রঙবেরঙের কোটটা পরে।

স্কুলের অন্য শিশুরা অবশ্য সেভাবে দেখেনি। প্যান্টে তালি, জুতোয় ফুটো আর পুরোনো কাপড়ের টুকরো দিয়ে বানানো কোট পরে যাওয়া মেয়েটিকে দেখে তারা হাসাহাসি করেছিল। সেই অপমানের স্মৃতি বহুবছর তার ভেতরে থেকে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে কোন এক বাসযাত্রায় একদিন স্মৃতিটা গানের রূপ নিতে থাকে। হাতের কাছে লেখার কাগজ ছিল না। পোশাকের লন্ড্রির ট্যাগ ছিঁড়ে তাতেই কথাগুলো লিখেছিলেন। লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসের সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, গানটি লেখার আগ পর্যন্ত সেই পুরোনো কষ্ট তিনি বয়ে বেড়াতেন। লিখে ফেলার পরে যেন তার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। কষ্টের একটা স্মৃতিকে তিনি বদলে দিয়েছিলেন ভালোবাসা, আত্মমর্যাদা আর নিজেকে গ্রহণ করার গল্পে। গানের মাঝে শোতাদের ভাবনার জন্য প্রশ্ন রেখে গিয়েছিলেনএকটা জিনিসের দাম আসলে ঠিক করে কে? কাপড়ের গায়ে দামের ট্যাগ নাকি স্কুলের অন্য শিশুরা? নাকি যে মা সারারাত বসে ভালোবেসে কাপড়ের টুকরোগুলো সেলাই করেছেন তার ভালোবাসা?

এই গানটি তাই শুধু তাঁর নিজের শৈশবের স্মৃতি হয়ে থাকেনি। সাধারণ মানুষ নিজেদের গল্পও এই গানে খুঁজে পেয়েছে। গানটির সাংস্কৃতিক গুরুত্বও পরে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১১ সালে লাইব্রেরি অফ কংগ্রেস এটিকে ন্যাশনাল রেকর্ডিং রেজিস্ট্রিতে অন্তর্ভুক্ত করে। তাদের বর্ণনাতেও গানটির আত্মজীবনীমূলক চরিত্র এবং দারিদ্র্যের ভেতর ভালোবাসা ও আত্মমর্যাদার গল্পটি গুরুত্ব পেয়েছে।

সম্ভবত এটাই গণমানুষের শিল্পী হয়ে ওঠার প্রথম শর্তনিজের কষ্টের কথা এমনভাবে বলা, যাতে তা শুধু আর নিজের হয়ে না থাকে।

 

নিজের গান, নিজের পথ

ন্যাশভিলে চলে আসার পর ডলি রাতারাতি তারকা হয়ে যাননি। গান লিখেছেন, দরজায় দরজায় ঘুরেছেন, ছোটখাটো বহু রেকর্ডিং করেছেন। ১৯৬৭ সালে ডাম্ব ব্লন্ড বা বোকা স্বর্ণকেশী ছিল তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য সলো হিটগুলোর একটি। একই বছর তাকে পোর্টার ওয়াগনারের জনপ্রিয় টেলিভিশন প্রোগ্রামে আসতে দেখা যায়। এরপর থেকে সারা আমেরিকার মানুষের কাছে তার কণ্ঠ আর মুখ পরিচিত হয়ে উঠতে শুরু করে।

পোর্টারের সঙ্গে জুটি তাকে দেশজুড়ে পরিচিত করে তোলে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক তার স্বাধীনতার জন্য বাধাও হয়ে ওঠে। ডলি নিজের পথে চলতে চাইছিলেন। আর পোর্টার চাইছিলেন তাকে ধরে রাখতে। সরাসরি যা তিনি বোঝাতে পারছিলেন না শেষ পর্যন্ত একটা গান লিখে সেটা জানিয়েছিলেন

তোমায় চিরকাল ভালোবেসে যাবো
যদি আমি থেকে যাই, 
শুধু তোমার পথে কাঁটা হয়ে রব
তাই আমি চলে যাব।
জানি, যেতে যেতে বারবার
তোমার কথাই মনে পড়বে।
তোমায় চিরকাল ভালোবেসে যাব।
চিরকাল ভালোবেসে যাব।
মধুর আর বেদনার কিছু স্মৃতি
এইটুকুই সঙ্গে নিয়ে যাই
বিদায়। কেঁদো না।
দুজনেই জানি, তোমার যা প্রয়োজন
আমি তা নই।
তবু আমি তোমায় চিরকাল ভালোবেসে যাব।
চিরকাল ভালোবেসে যাব।

আজ গানটি শুনলে শ্রোতাদের কাছে প্রেমিক-প্রেমিকার বিচ্ছেদের গান মনে হয়, বিশেষ করে হুইটনি হিউস্টনের ১৯৯২ সালের অসাধারণ সংস্করণটির পরে। কিন্তু ডলি গানটি লিখেছিলেন পোর্টার ওয়াগনারের জন্য। গানটির মর্ম ছিল তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা থাকবে, কিন্তু আমাকে আমার নিজের পথে যেতে হবে।

এই ঘটনাটাও ডলির চরিত্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা আর নিজের জীবন তার হাতে তুলে দেওয়া যে একই ব্যাপার নয় তিনি সেটা বুঝতেন। পরে এলভিস প্রিসলি গানটি রেকর্ড করতে চেয়েছিলেন। শর্ত ছিল গানের স্বত্বের একটা বড় অংশও তাদের দিতে হবে। ডলি রাজি হননি। এলভিস প্রিসলি তার গান গাইবেন একজন তরুণ গীতিকারের জন্য এর চেয়ে বড় সুযোগ তখন ভাবা কঠিন ছিল। তবু তিনি গানটির স্বত্ব ছাড়েননি। বহু বছর পরে হুইটনি হিউস্টন যখন গানটিকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিলেন, ডলির সেই সিদ্ধান্তের কতটা তাৎপর্য ছিল তা বোঝা গিয়েছিল।

 

নয়টা থেকে পাঁচটা

গানের মাঝে শুধু নিজের জীবনের গল্প বলেই যে গণমানুষের শিল্পী হওয়া যায় তা নয়। ডলির বড় সাফল্য ছিল, একসময় তিনি নিজের গানে অন্য মানুষের জীবনকেও ভাষা দিতে পেরেছিলেন।  ১৯৮০ সালে জেন ফন্ডা আর লিলি টমলিনের সঙ্গে নাইন টু ফাইভ (নয়টা পাঁচটা) চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে ডলি ঠিক সেই চেষ্টাই করলেন। সিনেমার বিষয় ছিল কর্মক্ষেত্রে নারীর অসম পারিশ্রমিক, অসম্মান, যৌন হয়রানি আর পুরুষ ঊর্ধ্বতনের ক্ষমতার অপব্যবহার। ডলি আগে কখনো সিনেমায় অভিনয় করেননি। জেন ফন্ডার প্রস্তাবে রাজি হওয়ার সময় শর্ত দিয়েছিলেন সিনেমার থিম-সং তাকে লিখতে দিতে হবে।

শুটিং সেটে বসে গানটি লিখতে লিখতে একদিন নিজের নখ ঠুকে শব্দ করছিলেন। শব্দটা তার কাছে টাইপরাইটারের শব্দের মত শোনাচ্ছিল। সেই ছন্দই ঢুকে গিয়েছিল গানের মধ্যে। রেকর্ডের ক্রেডিট অংশে নাকি মজা করে লেখা হয়েছিলডলির নখ।’

গানটি নারীবাদী মেনিফেস্টো নয়। কোনো জটিল রাজনৈতিক শব্দও নেই। সকালে বিছানা থেকে উঠে কফি বানিয়ে কাজে ছোটা, ঊর্ধ্বতনের উপরে ওঠার সিঁড়ির একটা ধাপ হয়ে থাকা, নিজের স্বপ্ন অন্যের মুনাফার নিচে চাপা পড়ে যাওয়াএইসব সাধারণ কথার মাধ্যমেই শ্রোতাদের সাথে হয়েছিল অসাধারণ যোগাযোগ। এই গান শুনে একজন সেক্রেটারি, শ্রমিক কিংবা অফিসকর্মী নিজের জীবনকে চিনতে পারত। বিশেষ করে নারীরা সেই সময়কার কর্মজীবনে যে বৈষম্য আর অসম্মানের মুখোমুখি হতেন, গানটি তার রূপ সহজ ভাষায় মানুষকে শুনিয়েছিল। পিবিএসের তথ্যচিত্রে গানটিকে কর্মজীবি নারীদের প্রতীকী সঙ্গীত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এর চেয়ে ভালো একটা জীবন আছে
তুমিও তো তার স্বপ্ন দেখো, তাই না?
যে নামেই ডাকুক, খেলাটা শেষতক ধনীদেরই।
তুমি সারাজীবন খেটে তাদের পকেট ভরে যাও।  

ডলি কিন্তু নিজেকে নারীবাদি বলতে খুব আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর ধারণা ছিল এইসব বড় বড় তকমার চেয়ে জীবনে কী করেছেন সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজের অবস্থান বোঝাতে গিয়ে প্রায় হেঁয়ালির ভাষায় বলেছিলেন, তিনি ফেস্টুন বয়ে বেড়ানো সক্রিয় একটিভিস্ট নন, নারীবাদিও নন; আবার এক অর্থে তিনি দুটোই। হয়তো এখানেই ছিল তার মানুষের আপন হয়ে ওঠার রহস্য।

ছবি: ডলি পারটন ইমাহিজনেশন লাইব্রেরির সৌজন্যে

সম্পদের সাম্রাজ্য

ডলি পারটন অসাধারণ ব্যবসামনস্ক ছিলেন। সঙ্গীত সিনেমা আর টেলিভিশনের নানান স্বত্ব ও অন্যান্য সবকিছু মিলিয়ে ফোর্বসের ২০২৫ সালের হিসাবে তার সম্পদের হিসাব বলা হয়েছিল আনুমানিক ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তিনি অত্যন্ত ধনী ছিলেন। মৃত্যুর পরে সোশ্যাল মিডিয়াতে যে কথাটি খুব ছড়িয়েছেডলি চাইলে বিলিয়েনার হতে পারতেন, অথচ সব টাকা মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন বলে হননি। কথাটা শুনতে ভালো হলেও সমস্যা হলো, সেটা প্রমাণ করার উপায় নেই। তিনি যদি কখনো দান না করতেন, সব অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করতেন, তার মূল্য আজ কত হতো এগুলো কাল্পনিক হিসাব। তাকে অসাধারণ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে এই বয়ানের হয়ত প্রয়োজন নেই।

তিনি একদিকে সম্পদ গড়ে তোলার ব্যাপারে খুব সচেতন ছিলেন। নিজের গান আর ব্যবসার স্বত্ব ধরে রেখেছিলেন। অন্যদিকে সেই অর্থের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বহু দশক ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগের ত্রাণ আর নিজের এলাকার মানুষের জন্য খরচ করেছেন। রয়টার্স তার মৃত্যুর পরে যেমন লিখেছে, তিনি একটা বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। আবার সেই একই মানুষ মানুষের জন্যও বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন।

 

নিরক্ষর বাবার মেয়ে

ডলির বাবা রবার্ট লি পারটন ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী মানুষ। মেয়ের চোখে তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান মানুষ। কিন্তু পড়তে-লিখতে শেখেননি। বাবার এই অভাবটি ডলিকে সারাজীবন নাড়া দিয়েছে। তিনি মনে করতেন, নিরক্ষরতার কারণে বাবার জীবনের অনেক সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।

১৯৯৫ সালে নিজের সেভিয়ার কাউন্টির শিশুদের জন্য শুরু করলেন ডলি পারটন ইমাজিনেশন লাইব্রেরি। এর কার্যক্রমটি ছিল সহজ অথচ অসাধারণ। শিশুর জন্ম থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি মাসে তার বাড়িতে বিনামূল্যে একটি করে বই আসবে। আর বইটি আসবে শিশুর নিজের নামে। হয়ত তিন বা চার বছর বয়সের একটা শিশু ডাকবাক্স খুলত আর প্যাকেটের গায়ে নিজের নাম দেখত। বইটা মা-বাবা, স্কুল বা পাবলিক লাইব্রেরির নয়। একেবারে তার নিজের। সম্ভবত একটি শিশুকে বই ভালোবাসতে শেখানোর জন্য এর চেয়ে সুন্দর আইডিয়া আর হয় না।

কাউন্টির ছোট্ট এই কার্যক্রম পরে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে আরও কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ডলির মৃত্যুর সময় পর্যন্ত এই প্রোগ্রাম থেকে ৩০ কোটিরও বেশি বই পাঠানো হয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু হিসাবে সংখ্যাটি ৩৩ কোটিরও বেশি।

এখানে একটি ছোট্ট সুন্দর ঘটনা উল্লেখ করতে হয়। ডলি তার বাবাকে এই কার্যক্রমে যুক্ত করেছিলেন। বাবা মৃত্যুর আগে মেয়েকে জানিয়েছিলেন, তার এত গান, সিনেমা, পুরস্কার আর খ্যাতির মধ্যে ইমাজিনেশন লাইব্রেরি নিয়েই তিনি সবচেয়ে বেশি গর্বিত। শিশুরা ডলি-কে ডাকত বুক লেডি। পড়তে না-জানা একজন বাবার মেয়ের সবচেয়ে প্রিয় পরিচয় হয়ে গেল বইওয়ালি। ঘটনাটা প্রায় গল্পের মতো সুন্দর, কিন্তু সত্যি।

 

হৃদয় থেকে

২০১৬ সালে পূর্ব টেনেসির ভয়াবহ দাবানলে বহু পরিবার ঘর হারানোর পরে তার ডলিউড ফাউন্ডেশন গঠন করেছিল মাই পিপল ফান্ড। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরাসরি অর্থসাহায্য দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া শিশুদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা গবেষণায়ও তিনি অর্থ দান করেন। পরবর্তীতে ২০২০ সালে কোভিড চিকিৎসার গবেষণার জন্য ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে অর্থ সহযোগিতা প্রদান করেন। সেই অর্থ সহায়তা পাওয়া গবেষণার কিছু অংশ মডার্না ভ্যাক্সিন তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিল। ঘূর্ণিঝড় হেলেনের পরে আবারও নিজের এলাকার মানুষের জন্য বড় অঙ্কের সহায়তা দেন। ২০২২ সালে জনহিতৈষী কাজের জন্য কার্নেগি মেডাল প্রদানের সময় জানতে চাওয়া হয়েছিল তার পরোপকারের পেছনের দর্শন কি? ডলি জবাব দিয়েছিলেন—‘আমি শুধু হৃদয় থেকে দিয়ে যাই।’

তবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ব্যাপারটা তার কাছে শুধু অর্থ সহায়তা দেওয়ার মধ্যেই আটকে ছিল না। কখনো কখনো কথা বলেছেন। হয়ত রাজনৈতিক বক্তৃতার ভাষায় নয়। ২০২০ সালে জর্জ ফ্লয়েড হত্যার পরে যখন ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়, ডলি কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক বক্তৃতা না দিয়ে সোজা প্রশ্ন করেছিলেনকৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জীবন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। নাকি আমরা ভাবি শুধু আমাদের সাদা পশ্চাৎদেশটাই গুরুত্বপূর্ণ?’

ছবি: আমেরিকান লাইব্রেরি ম্যাগাজিনের সৌজন্যে

মানুষের মর্যাদার রাজনীতি

ডলি রাজনীতি পছন্দ করতেন না। রাজনীতি নিয়ে তাঁর অনীহা লুকানোর চেষ্টা করতেন না। এক সাক্ষাৎকারে সোজাসুজিই বলেছিলেন, তিনি রাজনীতি ঘৃণা করেন। এর কারণ প্রকাশ করতে গিয়েও তিনি ছিলেন অকপট। রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়লে অর্ধেক ভক্তশ্রোতা হারাবেন তিনি। তার নিজের পরিবারেও রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট, ট্রাম্প-বাইডেন নিয়ে খাবার টেবিলে ঝড় উঠত। ডলি বলেছিলেন, তার যেমন রিপাবলিকান ভক্ত আছে, তেমনি ডেমোক্র্যাট ভক্তও আছে। কাউকে তিনি অপমান করতে চাইতেন না।

শুনে মনে হতে পারে, এ যেন নিখুঁত ব্যবসার কৌশল। তবে দলীয় রাজনীতি এড়িয়ে গেলেও মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে তিনি নীরব থাকেননি। এটা নীতিগত দৃঢ়তা ছিল, নাকি অসাধারণ রাজনৈতিক ভারসাম্যবোধ নিশ্চিত করে বলা কঠিন। হয়ত দুটোই।

 

এত কৃত্রিম, অথচ এত খাঁটি

চুলের বড় অংশ ছিল উইগ বা পরচুলা। মেকআপ ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত। পোশাক যেন দূর থেকে না দেখলে তার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ। নিজে বানিয়ে নিয়েছেন নিজের এই ইমেজ। সেইসাথে এই কৃত্রিমতাটুকু যে ইচ্ছাকৃত সেটাও অকপটে স্বীকার করেছেন। কথায় দক্ষিণের উচ্চারণ পাল্টে তার পাহাড়ি শৈশব মুছে ফেলেননি। দরিদ্র পরিবারের কথা বারবার বলেছেন।

এখানেই হয়তো শুরুতে বলা সেই প্রতিযোগিতার গল্পটার অন্য মানে পাওয়া যায়। নিজের সাজানো চেহারাটাকে তিনি কখনো স্বাভাবিক সৌন্দর্য বলে চালানোর চেষ্টা করেননি। সবাই জানত তার এই উপস্থিতি সচেতনভাবে তৈরি করা। সবচেয়ে বেশি জানতেন তিনি নিজে। অথচ সেই অভিনয়ের আড়ালের মানুষটাকে লুকানোর চেষ্টা করেননি।

বিখ্যাত মানুষ আর ভক্তদের মাঝে যে অদৃশ্য দেয়াল থাকে ডলির সাথে তার ভক্তদের তা ছিল না। তার সঙ্গীত আর ভাষার অকপট সরল প্রকাশ তাকে স্থান দিয়েছিল শ্রোতাদের হৃদয়ে।

 

জনপ্রিয়তার শীর্ষে

ডলি পারটন ২৫ আগস্ট ২০২৬ আশি বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। বহু দশকের ক্যারিয়ারে তিন হাজারের বেশি গান লিখেছেন, একশ মিলিয়নের বেশি রেকর্ড তার বিক্রি হয়েছে, বহু টপচার্টে এক নম্বর স্থান দখল করেছেন, ১১টি গ্র্যামি জিতেছেন। সঙ্গে সিনেমা, ডলিউড, ব্যবসা, বই, শিশুদের পাঠ কার্যক্রম,  ‍দুর্যোগের ত্রাণতার কর্মের তালিকা বিশাল।

কিন্তু এসব সংখ্যা দিয়ে তার জনপ্রিয়তার সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা ধরা যায় না। আর তা হলো সব শ্রেণির মানুষের ভালোবাসা প্রাপ্তি। কীভাবে একই মানুষকে টেনেসির গির্জায় যাওয়া বৃদ্ধা, নয়টা-পাঁচটার অফিসকর্মী, কৃষ্ণাঙ্গ সংগীত শিল্পী কিংবা নিউ ইয়র্কের ড্র্যাগ কুইন প্রত্যেকে একটু করে নিজের মানুষ বলে ভাবতে পারল? 

তিনি দারিদ্র্য থেকে উঠে এসেছেন, কিন্তু তা নিয়ে কখনো লজ্জিত ছিলেন না। সফল হতে গিয়ে নিজেকে বদলে ফেলেননি। কর্মক্ষেত্রে নারীরা যে বৈষম্যের শিকার হয় তা গানে গানে বলতে গিয়ে শ্লোগান নয় বরং সহজ কথায় পৌঁছে দিয়েছেন মানুষের কাছে। ঈশ্বরে বিশ্বাস করেছেন, কিন্তু ঈশ্বরের প্রতিনিধি হয়ে মানুষকে বিচার করতে চাননি। ব্যবসা করেছেন, অর্থ উপার্জন করেছেন প্রচুর, অথচ সেই টাকার উল্লেখযোগ্য অংশ দিয়ে নিজের শৈশবের মানুষগুলোর কাছে বারবার ফিরে গেছেন। খ্যাতি আর সম্পদের চূড়ায় বসেও নিজেকে নিয়ে রসিকতা করার ক্ষমতা হারাননি।

একজন গীতিকার ও শিল্পী হিসেবে গানে গানে ছুঁয়ে গেছেন শ্রোতাভক্তদের মন অসংখ্যবার। ভালোবাসার কথা বলে গেছেন সহজ সুরে, ছন্দে ও কথায়। কখনো গানের কথায় ফুটে উঠেছে সরল আবেগের বাণী আবার কখনো তার কবিত্ব।

সব গান অবশ্য তার নিজের জীবনের ঘটনা নয়। নিজের জীবনের বাইরে গিয়েও মানুষের মনের এমন কিছু জায়গা তিনি ধরতে পারতেন, যেগুলো খুব ব্যক্তিগত বলে মনে হয়। দ্য গ্রাস ইজ ব্লুতেমন একটি গান। এখানে রয়েছে ভালোবাসা হারানোর কষ্টকে ভুলতে গোটা পৃথিবীর নিয়ম উল্টে দেওয়ার চেষ্টা। গানটিতে আমরা ডলি পারটনের ভিতরকার সেই গীতিকবির দেখা পাই।

খুঁজে নিতে হলো আমায় বাঁচার একটা উপায়
বললে যেদিন সবশেষ, আর জানালে আমায় বিদায়
সত্যিটা ঠিক উল্টো—যদি না করি এই ভান
তোমায় ছাড়া কাটবে না মোর সারাটা দিনমান

উজানে বয় নদী, নিচুভূমি আকাশ ছোঁয়
পাহাড়গুলো সমতল, সত্য মিথ্যে হয়ে রয়  
এই তো বেশ ভালো আছি, তোমায় ভুলেছে অন্তর
আকাশটা আজ সবুজ আর নীল রঙ এই প্রান্তর

ভাঙা এ হৃদয়, অস্থির মন কতটা সইতে পারে?
কোথায় সে সীমা যার পরে এসে সবকিছু ভেঙে পড়ে?
দুঃখ কি ফুরায়, সেই সীমানা যখন যাই পেরিয়ে
বোধ হারানোর স্বস্তিতে যদি যেতে পারি হারিয়ে

গরম দেশে তুষার, সূর্যের গায়ে হিম
মেরুতে আছে উষ্ণতা আর কান্নায় সুখ অসীম
এখন আমি দারুণ সুখী, নেই কিছু বাকি আর 
আকাশটা আজ সবুজ, নীল রঙ এই প্রান্তর

নদী বয় উজানে, শুকিয়ে গেছে চোখের জল
হাঁস ঘৃণা করে সাঁতার, মেলে না ডানা ঈগল
আমি এখন ভালো আছি, তোমায় ভুলেছে অন্তর
আকাশটা আজ সবুজ আর নীল রঙ এই প্রান্তর

আমি তোমায় ভালোবাসি না
আর ঘাসের রংটা নীল 

সদ্যপ্রয়াত ভালোবাসার এই শিল্পীকে শ্রোতারা চিরকাল ভালোবেসে যাবে।